📄 ইসলামের মনোভাবের ব্যাখ্যা
একটি সহিহ হাদিস খোঁজ করা হয় ইবাদতের বিষয়াদি, প্রতিদিনের কার্যাবলী এবং বৈধ-অবৈধ সংক্রান্ত সমাধানের জন্য, খোঁজ করা হয় ইসলামের মনোভাব উপলব্ধিতে ভাব, শিক্ষা, উত্তম আচরণ ও অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রণয়নের জন্য। যদি উদাহরণস্বরূপ, আমরা পার্থিব জীবন সম্পর্কে ইসলামের মনোভাব ব্যাখ্যার ইচ্ছা করি এ জীবনে অস্বীকৃতি অথবা উত্তম বস্তুসমূহ আত্মস্থ করার জন্য, সেক্ষেত্রে দুর্বল হাদিসসমূহ যথেষ্ট হবে না। একই ধরনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার প্রতি নির্ভরতায় ইসলামের মনোভাব (তথাকথিত প্রাকৃতিক অথবা মাধ্যমিক); প্রতিষেধক ঔষধাদি বা আরোগ্যকর ঔষধাদি; জন্তুজানোয়ার ও গাছপালার সংরক্ষণ; বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নতির নিদর্শনাদি; অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও মোজেজা বিয়য়ে ইসলামের মনোভাব।
এসব বিষয় এবং এগুলোর মতো অন্যান্য বিষয়ে মতানৈক্যপূর্ণ হাদিসগুলো উদ্ধৃত করা যথেষ্ট নয়। বরং ঐসকল হাদিসকে অবলম্বন করা আবশ্যক যেগুলো প্রমাণের দিক থেকে মজবুত ও প্রত্যায়িত এবং উপস্থাপনে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। তাছাড়া কারো উচিত নয় প্রাসঙ্গিক একক হাদিসে সন্তুষ্ট থাকা। বরং নীতি এমন হবে যাতে অনেক হাদিস ঐ ছবির ওপর আলোকপাত করে এবং এই অথবা ঐ বিষয়ে ইসলামের মনোভাবকে উজ্জ্বলভাবে উপস্থাপন করে। অবশ্য এটা ব্যতীত, যখন তা কুরআনের আয়াত হবে এবং অতঃপর তা হবে উৎস ও উদ্ধৃতির ক্ষেত্র।
📄 প্রচার ও নির্দেশনায়
কুরআনের পর নবি সা.-এর সুন্নাহ্ হচ্ছে অক্ষয় উৎস ও ধনাগার, যার ওপর ধর্মীয় শিক্ষক, ধর্মপ্রচারক ও পরিচালকগণ তাদের পাঠ ও বক্তৃতা সংগ্রহ করতে পারেন। কারণ, যেহেতু সুন্নাহ্ হচ্ছে আদেশ নিষেধের বিধিমালা তৈরি এবং প্রাত্যহিক জীবনের ও ইবাদতের নিয়মাবলী নির্ধারণে ফিকহ'র সর্বসম্মত উৎস, তাই এটাই আত্মা শুদ্ধিকরণের সর্বসম্মত উৎসও। একারণেই উম্মাতের মধ্যে সম্মানপ্রাপ্ত প্রাথমিক যুগের তাসাউফপন্থী মহান ব্যক্তিগণসহ আত্মা সংক্রান্ত শিক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিগণ আল্লাহ তায়ালার সম্পর্ক ইত্যাদির ক্ষেত্রে তাকে সুন্নাহর অপরিহার্য বন্ধনে আবদ্ধ করতে অবিসংবাদিতভাবে একমত। ইমাম আল-জুনায়েদ (রহ.) বলেন: যারা আল্লাহর রসুল সা.-এর পথ অনুসরণ করে, তাদের গৃহীত পথ ব্যতীত -অন্য সকল পথই রুদ্ধ এবং যে ব্যক্তি কুরআন হিফয করল না এবং হাদিস লিপিবদ্ধ করল না এক্ষেত্রে তাকে [সুফিবাদ] অনুসরণ করা যাবেনা, কারণ আমাদের এই জ্ঞান কিতাব ও সুন্নাহ্ মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুফিদের পথ অনুসরণকারীদের অন্যতম নেতা আবু হাফস বলেন: যে ব্যক্তি তার কার্যাবলী ও অবস্থানকে কুরআন ও সুন্নাহ্র দ্বারা বিচার করে না, যে তার প্রবৃত্তিকে ভৎর্সনা করেনি, তাকে মানুষের খাতায় গণনা করা হয়নি। আবু সুলায়মান আল-দারানী বলেন: জনগণের কাহিনীর মধ্যে কোন কাহিনী আমাদের অন্তরে কয়েক দিনের জন্য প্রবেশ করতে পারে; কিন্তু আমি কোনো কিছু গ্রহণ করি না ঠিক দুটো সাক্ষী ছাড়া : কিতাব ও সুন্নাহ্। আহমাদ বিন আবী আল-হাওয়ারী বলেন: যে ব্যক্তি সুন্নাহ্ অনুসরণ না করে আমল করে, তার আমল বিনষ্ট হয়েছে।
সুতরাং ফিকহ'র ছাত্র ও ব্যবহারকারীদের মতোই শিক্ষক ও প্রচারকগণ সুন্নাহ্ চাহিদাসম্পন্ন। সুন্নাহর মধ্যে তারা উজ্জ্বল নির্দেশনা পান, অকাট্য যুক্তি পান এবং বাগ্মিতাপূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন, সংক্ষিপ্তসার (চুম্বক শব্দাবলী) ও সূত্র পান, পান প্রভাবক পরামর্শ, নীরব দৃষ্টান্তসমূহ এবং উপদেশপূর্ণ কাহিনী; বিচিত্র ধরনের আদেশ ও নিষেধ, আল্লাহ তায়ালার জন্য দীর্ঘ কিয়ামের প্রেরণা ও ভয়ের সতর্কতা, কঠোর হৃদয়কে কোমল করতে, ক্ষয়িষ্ণুকে জীবনদান করতে ও বিস্মৃতিপ্রবণ মনকে জাগাতে পান অনুপ্রেরণা। কুরআনের কাঠামোর মধ্যে বিস্তৃত সুন্নাহ্ সমস্তকিছুকে উদ্দেশ্য করে মন, হৃদয় ও বিবেককে, পরিপূর্ণ মুসলিম ব্যক্তিত্ব গঠনে সাধনাকে সহায়তা করে- এমন একটি মন তৈরি করে যা সতর্ক, একটি হৃদয় যা বিশুদ্ধ, এমন সংকল্প যা সবল এবং এমন শরীর যা সামর্থ্যবান।
এর ওপর নির্ভরশীল বিষয়সমূহের সর্বপ্রথম করণীয় হচ্ছে কিতাব ও সুন্নাহ্ থেকে এর উৎস গ্রহণ করা। সর্বপ্রথমে বলতে হয়, সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম-এদুটোই উম্মাতের কাছে অবিসংবাদিতভাবে গৃহীত। এ দুটোর কোনোটিই সমালোচিত নয়, মাত্র গুটিকতক হাদিস ব্যতীত। এ দুই গ্রন্থের পরে সুন্নাহর অন্যান্য গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত গ্রন্থাদির মধ্যে রয়েছে চারখানি সুন্নাহ্ গ্রন্থ (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা), মালিকের মুয়াত্তা, আহমাদ ইবনে হাম্বলের মুসনাদ, দারিমী'র সুনান, ইবনে খুযায়মার সহিহ, সহিহ ইবনে হিববান, মুস্তাদরাক আল-হাকিম, আবু ইয়ালা ও বায্যারের মুসনাদদ্বয়, তাবারানির আল-মা'আজিম এবং আল-বায়হাকির শু'আব আল-ইমান। এরপর অন্যান্য গ্রন্থ রয়েছে, যেগুলোর হাদিস সমূহকে বিশেষজ্ঞগণ সহিহ কিংবা হাসান বলে অভিহিত করেছেন। প্রত্যেক দাওয়াতদাতারই কর্তব্য হচ্ছে ঐসব হাদিসের ওপর নির্ভর না করা, যেগুলো যঈফ বা প্রত্যাখ্যাত কিংবা জাল বলে চিহ্নিত। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এধরনের হাদিসগুলোই খতিব ও ধর্মীয় পরামর্শকদের সাধারণ পণ্যে পরিণত হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালার মেহেরবাণীতে এইসব গ্রন্থের মূলপাঠ ইতোমধ্যেই মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। সুন্নাহ্র সেবক মুহাম্মদ ফুয়াদ 'আবদুল বাকীকে ধন্যবাদ, আল্লাহ তায়ালা তাকে দয়া করুন, মুয়াত্তা মালিক, সহিহ মুসলিম এবং সুনান ইবনে মাজাহ সম্পাদিত ও প্রকাশিত হয়েছে, এর হাদিসগুলোকে ক্রমিক নম্বর প্রদান করে ইনডেক্সভুক্ত করা হয়েছে।
একইভাবে সুনান আবু দাউদ এবং সুনান তিরমিজিও প্রকাশিত হয়েছে ইয্যত উবায়িদ আল-দা'স কর্তৃক। আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহকে আল্লাহ তায়ালা দয়া করুন, তিনি নাসায়ি'র কিতাব সম্পাদনা করেছেন আল-মু'জাম আল-মাফারিস লি আল-আলফাজ আল-হাদিস-এর রীতি অনুযায়ী।
এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে রিজাল এবং হাদিসের স্তর নির্ধারণ, সহিহ ও দূষণযুক্ত হাদিস পৃথক করা। এক্ষেত্রে শায়খ নাসির আল-দীন আল-আলবানি, হাদিস বিশেষজ্ঞ, নিম্নবর্ণিত সমালোচনা গ্রন্থাদি প্রণয়ন করেছেন: সহিহ ইবনে মাজাহ, সহিহ আল-তিরমিজি এবং সহিহ আল-নাসায়ি। তার সহিহ আবী দাউদ যন্ত্রস্থ। এভাবে আরো সমাপ্তির পথে রয়েছে সহিহ ইবনে হিববান'র অংশবিশেষ, সনদ পর্যালোচনাসহ সম্পাদনা করেছেন শু'আইব আল-আরনা'উত। এর পূর্বে, মুস্তফা আল-আ'যামী সহিহ ইবনে খুযায়মাহ সম্পাদনা এবং আল-আলবানির সাথে একত্রে উৎস-বিচার করে প্রকাশ করেছেন।
এর পূর্বে, মুসনাদ আহমদ এর পনেরটি খণ্ড পাওয়া যায়, সনদ বিচারসহ সম্পাদনা করেন আহমাদ মুহাম্মাদ শাকীর, এর সম্পূর্ণটা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। শায়খ আহমাদ আবদুর রহমান পূর্বেই মুসনাদকে বিষয়ে বিন্যস্ত করেছেন, এর ওপর ভাষ্য লিখেছেন এবং এটা তেইশ খণ্ডে প্রকাশ করেছেন। এটাকে তিনি ফাতহুর রাব্বানী নাম দিয়েছেন এবং এর ভাষ্য হচ্ছে বালাগুল আ-মা-নি। শায়খ শাকীর ইবনে কাসীরের তাফসিরের ওপর কিছু প্রচেষ্টা চালান, নির্বাচন করেন, শুদ্ধ করেন, উৎস বিচার করেন। তিনি এটার নাম দেন 'উমদাত আল-তাফসির, তিনি এর পাঁচটি অংশ প্রকাশ করেন, কিন্তু শেষ করতে অসমর্থ হন। তিনি এবং তার সবচেয়ে শিক্ষিত ভাই, মাহমুদ মুহাম্মদ শাকীর ইমাম আল-তাহাবী (মৃত্যু: ৩১০ হি.)-এর দশ অংশেরও বেশি বের করেন এর মধ্যকার হাদিস ও আসার সমূহের সম্পাদনা ও উৎস-বিচারসহ। জ্যেষ্ঠ ভাই শায়খ আহমদের মৃত্যুর পর প্রফেসর মাহমুদ তার নিজেরটার পর আরো দু'খণ্ড বের করেন। তারপর এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজ থেমে যায়।
আবদুর রায্যাক আল-সানা'আনী (মৃত্যু: ২১১ হি.)-এর আল-মুসান্নাফ এগার অংশে বের হয়, সম্পাদিত হয় ভারতীয় হাদিস বিশেষজ্ঞ শায়খ হাবিবুর রহমান আল আ'যামী কর্তৃক; ভারতীয় আল-দার আল-সালাফিয়্যাহ হতে শায়খ মুখতার আল-নাদভী কর্তৃক সম্পাদিত মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা (মৃত্যু: ২২৫ হি.) প্রকাশিত হয়।
মাধ্যমিক পর্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহও বের হয়। মিশকাতউল মাসাবিহ, লেখক শায়খ আল-খাতীব আল-তাবরিযী (মৃত্যু: ৭৩২ হি.), সংক্ষিপ্ত উৎস-বিচারসহ আল-আলবানি কর্তৃক সম্পাদিত হয়। আল-আলবানি আল-সুয়ূতীর সহিহ আল- জামী আল-সাগির এবং এর সম্পূরক গ্রন্থের সহিহ হাদিসগুলোকে যঈফ হতে পৃথক করেন এবং সেগুলোকে দুটো পৃথক খণ্ডে প্রকাশ করেন। আবদুল কাদীর আল- আরনা'উত ইবনুল আসীরের (মৃত্যু: ৬০৬ হি.) জামীউল উসূল সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন।
নূর আল-দীন আল-হায়সামির (মৃত্যু: ৮০৭ হি.) মাজমা আল-জাওয়ায়িদ কিছু পূর্বেই বের হয়, কিন্তু সম্পাদিত হয়নি-এর বৈশিষ্ট্য পার্থক্য হচ্ছে, গ্রন্থটি সহিহ ও যঈফ হাদিস বিচার করে এবং হাদিসের ছয়টি গ্রন্থ থেকে মালমশলা সংগ্রহ করে: মুসনাদ আহমাদ ও মুসনাদ আল-বায্যার ও মুসনাদ আবু ইয়ালা এবং মা'আজিম আল-তাবারানির তিনখণ্ড। আমার মনে হয় এ তিনটি গ্রন্থ সম্পাদিত হয়েছে, যদিও আমি আমাদের প্রয়োজনীয় পুস্তকাদি সম্পর্কে বর্তমান সময়ের সম্পাদনাকারীদের ব্যাপারে শঙ্কিত। তারা ভাষ্যের আধিক্য যুক্ত করে বই সম্পাদনা করে থাকেন, যার মাত্র সামান্যই প্রয়োজন রয়েছে এবং যা তারা প্রতিটি বইতেই পুনরাবৃত্তি করেন, গরিব পাঠকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করার মানসে কেবল আকার বৃদ্ধি করেন।
যেসব বই পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, কিন্তু সম্পাদিত হয়নি বা উৎস যাচাই করা হয়নি সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে: মুসতাদরাক আল-হাকিম (মৃত্যু: ৪০৫ হি.) এবং আয-যাহাবী (মৃত্যু: ৭৪৮ হি.) কর্তৃক এর সারসংক্ষেপন। গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে উদাহরণ রয়েছে সেগুলোর যেগুলো সম্পাদিত ও উৎসযাচাইকৃত। এর মধ্যে রয়েছে: যাদ আল-মা'আদ, লেখক ইবনুল কাইয়্যিম (মৃত্যু: ৭৫১ হি.), সম্পাদনা করেছেন শু'আইব আল-আরনাউত, আল-রিসালাহ পাঁচ খণ্ডে এটি প্রকাশ করেন পরিশিষ্ট সংক্রান্ত ৬ষ্ঠ খণ্ডসহ এবং রয়েছে আল-নববী (মৃত্যু: ৬৭৬ হি.)-এর রিয়াদুস সালেহীন। এটি এমন একটি গ্রন্থ যা প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে আর্শীবাদধন্য ও অপূর্ব। শু'আইব আল-আরুনাউত ও আল-আলবানি এর সম্পাদনা করেন এবং এর সকল উৎস যাচাই করেন।
আল-ইহসান ফি তাকরিব সহিহ ইবন্ হিব্বান এর উৎস সমালোচনা এখনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শাইখ শু'আইব আরনাউত ষোল খণ্ডে, পরিশিষ্টের জন্য আরো দুটি খন্ডসহ, এটিকে সম্পাদনা করেছেন। তিনি আল-রিসালাহ'রও সম্পাদনা করেন।
একই ধরনের হাদিসের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী ঐটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মুসনাদ ইমাম আহমাদ, চল্লিশেরও বেশি খণ্ডে প্রকাশিত, শায়খ শু'আইব কর্তৃক সম্পাদিত। তার সাথে ছিলেন তার পাঁচজন বিশিষ্ট বিদ্বান সহকর্মী। সৌদি সরকারের সহায়তায় আল-রিসালা-এর প্রকাশনা সমাপ্ত হয়েছে।
এখানে কারো কর্তব্য হচ্ছে পুরাতন উৎস-পরীক্ষা গ্রন্থাদির সূত্রে উপকৃত হওয়া। উদাহরণস্বরূপ, যইন আল-দীন আল-ইরাকী কর্তৃক (মৃত্যু: ৮০৭ হি.) আল-গাযালীর (মৃত্যু: ৫০৫ হি.) আল-ইয়া গ্রন্থের হাদিসসমূহ বিশ্লেষণ, যিনি এটাকে আল-মুগনী 'আন হামল আল-আফসার ফি তাখরিজ মা-ফী আল-ইহয়া মিন আল-আখবার নামে অভিহিত করেছেন। ইহয়া সম্পর্কে প্রান্তিক নোটসহ এটা মুদ্রিত হয়। আল-ইয়া পাঠকদের কর্তব্য হচ্ছে, এটার উদ্ধৃতি দেওয়া। মানুষ জানে গাযালী কর্তৃক উদ্ধৃত হাদিসের অবস্থান। কতগুলো অত্যন্ত দুর্বল হাদিস এতে রয়েছে, অন্যগুলোর কোনো উৎসই নেই এবং অন্যগুলো জাল বলে ঘোষিত! আরেকটি হচ্ছে ইবনে হাজার আল-আসকালানীকৃত তাফসির আল-কাশাফ-এর মধ্যকার হাদিসের উৎস-বিচারি গ্রন্থ। এটা কুরআনের ভাষ্যকারগণ কর্তৃক উদ্ধৃত অনেক হাদিসের দৃষ্টিকোণ হতে প্রয়োজনীয় এবং এগুলো পরবর্তী ভাষ্যকারগণ নকল করেছেন।
প্রচার ও সতর্কীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর অন্যতম হচ্ছে আল-মুনযিরীকৃত আল-তারগিব ওয়া আল-তারহিব। আল্লাহ তায়ালা তার ওপর দয়া করুন। এই গ্রন্থের দুর্বলতা হলো-এর মধ্যে অনেক যঈফ হাদিস রয়েছে এবং এর কতকগুলো অতিমাত্রায় দুর্বল। এমনও হতে পারে যে, এগুলো এমনকি জাল হাদিসেরও নিম্নস্তরে, ঐ পর্যন্ত যে এটা আল-মুনযিরীরই নিজের মন্তব্য। কিন্তু অনেক সতর্ককারী ও খতিব আল-মুনযিরীর ভূমিকা পাঠ করেননি, যাতে তারা তাঁর কৌশল ও পরিভাষা জানতে পারেন। এ কারণই আমাকে পেছনে চালিত করে এবং এর জটিল বিষয়গুলো নির্বাচন করে (মুনতাফা) বইটির উৎকর্ষ সাধন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে এর অন্তর্ভুক্ত সহিহ ও হাসান পর্যায়েরগুলো, এর মধ্যে দুর্বোধ্যগুলো সম্বন্ধে নোট, এর উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যা এবং এর মধ্যে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের জবাব। संক্ষেপে এটি সন্দেহ দূর করে এবং ভুল বুঝাকে শুদ্ধ করে। এর শিরোনাম হচ্ছে আল-মুনতাকা মিন আল-তারগিব ওয়া আল-তারহিব।১৫
সুপরিচিত গ্রন্থাদির ভাষ্য সম্পর্কে বলতে গেলে, এগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ফাতহ আল-বারি ফি শারহ আল-বুখারি, লেখক ইবন হাজার। এটা সেই বই যার সম্পর্কে আল-শাওকানী (সুপরিচিত কথার মধ্যে মারপ্যাঁচসহ) বলেন: বিজয়ের পর হিজরত (বিজয়ের পর হিজরত নেই।) এর পূর্বেকার আল-বুখারির সমসাময়িক, এর পরবর্তী ভাষ্য রয়েছে। এর সবগুলোর ব্যবহার হওয়া প্রয়োজন। উদাহরণ হচ্ছে আল-কিরমানী (মৃত্যু: ৬৭৫ হি.), আল-আইনী (মৃত্যু: ৮৫৫ হি.) এবং আল-কাস্তালানী (মৃত্যু: ৯২৩ হি.)।
সহিহ মুসলিমের ভাষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে শারহ আল-নববী, আল-ইয়্যাদ, আল- আরাবি ও আল-সানূসীর লিখিত গ্রন্থ। সাম্প্রতিক কালে একজন ভারতীয় আলেম, মাওলানা শাব্বীর আহমদ আল-উসমানী, ফাতহুল মুসলিম বি-শারহ সহিহ মুসলিম নামে একটি পুস্তক প্রণয়ন করেছেন। তিনি এটাকে চার অংশে বিন্যস্ত করেছেন, কিন্তু সমাপ্ত করেননি। আমাদের বন্ধু শাইখ মুহাম্মাদ তাকী আল-উসমানী এর সমাপ্তিকরণের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি এই ভাষ্যের সাথে সময়ের কিছু জ্ঞান এবং এর অসুবিধার ব্যাপারে সমাধান যুক্ত করেছেন, যা এই ভাষ্য গ্রন্থকে বিভাগগুলো (ফি বা-বিহি) সহ অতুলনীয় করেছে। তিনি এর ছয় খণ্ড বের করেছেন।
মুয়াত্তা'র ভাষ্যসমূহের মধ্যে আমরা উল্লেখ করতে পারি আবু ওয়ালিদ আল-রাজী'র (মৃত্যু: ৪৭৪ হি.) আল-মুনতাকা এবং আল-সুয়ূতীর তানভীর আল-হাওয়ালিক।
আবু দাউদ-এর বৃহত্তম ভাষ্য সমূহের মধ্যে রয়েছে আল-खাত্তাবীকৃত (মৃত্যু: ৩৮৮ হি.) মা'আলিম আল-সুনান। ইবনুল কাইয়্যিম-এর ভাষ্যের নাম তাযহিব সুনান আবী দাউদ। ভারতের হাদিস ভাষ্যসমূহ হচ্ছে: 'আউন আল-মা'বুদ যা আল- দিয়ানভীকৃত এবং আল-সাহারানপুরীকৃত (মৃত্যু: ১৩৪৬ হি.) বাদল আল-মাজহুদ ফি হাল্লি আবি দাউদ; এর সাথে রয়েছে শায়খুল হাদিস আল-কান্দলবির ভাষ্য এবং সাইয়্যিদ আবু হাসান আল-নাদভী'র মুখবন্ধ। শাইখ মাহমুদ খাত্তাব আল-সুবকীর (যিনি আল-জামিআ আল-শারিয়াহ'র প্রতিষ্ঠাতা) মানহাল আল-আদব আল- মাওরুদ পর্যাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য। তিনি এটির দশটি খণ্ড বের করেন, কিন্তু তা সমাপ্ত করেননি। আল্লাহ তায়ালা তাকে রহম করুন।
তিরমিজির সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রাচীন ভাষ্য হচ্ছে ইমাম আবু বাকর ইবনুল আরাবিকৃত (মৃত্যু: ৫৪৩ হি.) আরিদাত আল-আহবিদি। নতুন ভাষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তুহফাতুল আহওয়াযী, যা সুপরিচিত ভারতীয় আলেম আল-মুবারকপুরী রচনা করেছেন।
আবু দাউদ ও তিরমিজির ওপর যেমন ভাষ্য রচিত হয়েছে, নাসায়ির ওপর তেমনটা হয়নি। তবে আল-সুয়ূতী'র লিখিত হাশিয়া রয়েছে, আল-সিব্দিও (মৃত্যু: ১১৩৯ হি.) একগুচ্ছ হাশিয়া লিখেছেন। তাদের দু'জনের এসব হাশিয়া মূল নাসায়ির সাথে সংযুক্ত হয়েছে।
মিশকাতুল মাসাবিহ'র ভাষ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হচ্ছে আলী আল- ক্বারীকৃত (মৃত্যু: ১০১৪ হি.) মিরকাত আল-মাফাতিহ। পাঁচ খণ্ডে এটি মুদ্রিত।
একটি নতুন ও পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য লিখেছেন ভারতের অন্যতম আলেম উবায়দুল্লাহ আল- মুবারকপুরী, নাম মির'আতুল মাফাতিহ। (এই গ্রন্থটি ভারতের বেনারস শহরের আল-জামি'আহ আস-সালাফিইয়াহ'য় ৯ (নয়) খণ্ডে, যতটা মনে পড়ে, ভাগ করে দেওয়া হয়।)
প্রচারকের জন্য প্রয়োজনীয় সম্মানিত ভাষ্যসমূহের মধ্যে রয়েছে আবদুর রউফ আল-মানাবী কর্তৃক আল-সুয়ূতীর জামীউস সাগির এর ভাষ্য। এটা সেই গ্রন্থ যা ফায়যুল কাদির ফী শারহ আল-জামীউস সাগির শিরোনামে ছয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এটা প্রয়োজনীয় গ্রন্থ, তবে এর সম্পাদনা হওয়া প্রয়োজন।
রিয়াদুস সালেহীন-এর সুপরিচিত ভাষ্য হচ্ছে ইবন আল্লানকৃত (মৃত্যু: ১০৫৪ হি.) আট অংশে মুদ্রিত দালিল আল-ফালিহিন। সুবহি আল-সালিহ (আল্লাহ তায়ালা তাকে রহমত করুন)-এর মানহাল আল-ওয়ারিদিন নামে একটি নতুন ভাষ্যগ্রন্থ রয়েছে। মুসতাফা আল-খান ও তার সহকর্মীদের রচিত নুজহাত আল-মুত্তাক্বিন নামে আরেকটি পুস্তক পাওয়া যায়।
আল-নাবাবীর গ্রন্থ আল-আযকার-এর জন্য ইবন আল্লান আল-ফুতুহাত আল-রাব্বানিইয়াহ নামে সাত খণ্ডে মুদ্রিত ভাষ্য রচনা করেছেন। তার ক্ষুদ্র অথচ বিখ্যাত গ্রন্থ আল-আরবা'ইন আল-নাবাবীয়া'র অনেক ভালো ভাষ্য রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে উৎকর্ষপূর্ণ, জনপ্রিয় ও উপকারী হচ্ছে ইবন রাজাব আল-হাম্বলীকৃত (মৃত্যু: ৭৯০ হি.) জামি'উল উলূম ওয়া আল-হুম। যে চল্লিশটি হাদিস সমাপ্ত হয়েছে তা পর্যবসিত হয়েছে পঞ্চাশটিতে এবং মুহাম্মদ আল-আহমাদী আবু আল-নূর এগুলোর সম্পাদনা করেছেন'১৩। শাইখ শু'আইব আল-আরনাউত আল-আরবাঈন আল-নাবাবীয়ার হাদিসগুলোর সম্পাদনা ও উৎস-বিচার করেছেন এবং হাশিয়া সংযুক্ত করেছেন। মু'আসসাত আল-রিসালাহ দুই খণ্ডে বৈরুতে মুদ্রিত হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পুস্তকগুলোর মধ্যে সেই গ্রন্থটি অন্যতম, যেটি হাদিসের পেছনের বিষয় - এগুলোর গোপন বিষয়াদি এবং এর মধ্যে নিহিত সামাজিক ও দ্বীনী জ্ঞান নিয়ে আলোচনায় সমৃদ্ধ। সেটির নাম হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ। রচয়িতা শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দিহলাভী (মৃত্যু: ১১৭৬ হি.)।
একজন ধারণাকারী প্রচারক সেই সমস্ত বইপত্র ও অধ্যায় সম্বন্ধে জানবে যা হাদিসের উৎস হতে এসেছে এবং অন্যদের চেয়ে তার কাছে তা বেশি প্রয়োজনীয়। সন্দেহ নেই, এসব বই ও অধ্যায় হচ্ছে ইমান ও তাওহিদ সম্পর্কিত, ইবাদতের বিধিনিয়ম সম্বলিত এবং জ্ঞান, উত্তম আচরণ, অনাসক্তি (জুহদ), হৃদয় কোমলকারী বাণী এবং আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও দোয়ায় পরিপূর্ণ এবং পুণ্য, প্রার্থনার নিয়মাবলী, পরকালীন জীবনের অবস্থা, জান্নাত ও জাহান্নাম, নবি সা.-এর সিরাত ও যুদ্ধের বর্ণনাপূর্ণ এবং দৃষ্টান্তমূলক কাহিনী ও ইতিহাসসমৃদ্ধ এবং এধরনের আরো-
এর সবই অধিকাংশ সময়ই সরাসরি নির্দেশমূলক হাদিস দ্বারা দাওয়াতদাতার মনোযোগ আকর্ষণ করে। যদি দাওয়াতদাতা [প্রচারক] সুদক্ষ হন ও তার বিস্তারিত জ্ঞান থাকে, তাহলে তিনি এমনকি নির্দেশমূলক হাদিসসমূহসহ হাদিসের সকল প্রকরণ ব্যবহার করবেন।
📄 প্রমাণ হিসেবে কোনো হাদিসকে পেশ করার পূর্ব প্রস্তুতি
দাওয়াতদাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তিনি সাক্ষ্য হিসেবে যেসব হাদিস পেশ করবেন সেগুলো তালাশ করা অর্থ বের করা, মূল্য ও এর অবস্থান নির্ণয় করা। প্রকৃতপক্ষে, সর্বজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিগণের দায়িত্ব হচ্ছে প্রত্যায়িত উৎসের ওপর নির্ভর করা এবং মিথ্যা, বাতিল ও জাল হাদিস এবং উৎসহীন হাদিস থেকে নিজেকে মুক্ত করা। এমনটা সেইসব হাদিসের ক্ষেত্রেই ঘটতে হবে, যেগুলো দিয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার বইপুস্তককে ঠেসে ভর্তি করা হয়েছে, অতঃপর সহিহ ও হাসান-এর সাথে প্রকারভেদের পার্থক্য না করেই মিশ্রিত করা হয়েছে গ্রহণীয় ও বর্জনীয়কে। সাধারণ্যে সুপরিচিত হাদিস দ্বারা প্রতারিত করা হয়েছে। এটা বইপুস্তকে বা কথাবার্তার মধ্যে প্রচারিত হয়েছে এবং লোকদের স্মরণে থাকার ফলেই তা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং অনুমোদন প্রাপ্ত হয়েছে চারদিকে আরো ছড়াতে ও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে। কিন্তু অতি সতর্ক আলেমদের কাছে এটা অতি সুবিদিত যে, হাদিস মুখে মুখে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে, এমনকি বিদ্বানদের বইপুস্তকেও এবং একজন থেকে অন্যরা নকল করেছে, অতিশয় যঈফ হওয়া সত্ত্বেও, উৎস না থাকার পরেও, এমনকি প্রক্ষিপ্ত হলেও।
এ অবস্থার জন্যই একদল হাদিস বিশেষজ্ঞ উৎসাহিত হয়েছেন মুখে মুখে প্রচারিত প্রসিদ্ধ হাদিসগুলোর হিসাব গ্রহণে। এসবের মধ্যে রয়েছে: আল-যারকাশি (মৃত্যু: ৭৯৪ হি.) প্রণীত আত্-তাযকিরাহ বি আল-আহাদিস আল-মুশতাহিরাহ; ইবন দীবা'কৃত তামাঈয় আত্-তাইয়্যিব মিনাল খাতিব ফি মা ইয়াদুরু আল-আলসিনাত আন-নাস মিনাল হাদিস; ইবনে হাজারের (মৃত্যু: ৮৫২ হি) গ্রন্থ আল-লা'লি আল-মানসুরাহ ফি আল-আহাদিস আল-মাশূরাহ; আল-সুয়ূতীর (মৃত্যু: ৯১১ হি.) আদ্-দারার আল-মুনতাশিরাহ ফিল হাদিস আল-মুশতাহিরাহ; আল-সাখাভীর (মৃত্যু: ৯০২ হি.) আল-মাকাসিদুল হাসানাহ ফি মা ইশতাহরা মিনাল হাদিস আলাল আলসিনাহ [এটি সংক্ষেপকরণ করেন আল-যুরকানী (মৃত্যু: ১১২২ হি.)] এবং আল-আজলানী (মৃত্যু: ১১৬২ হি.) প্রণীত কাশফুল খাফা ওয়া-মুযিলুল আলবাস 'আম্মা ইশতারাহ মিনাল হাদিস আলা আলাসিনাতিন নাস। এছাড়া এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য পুস্তক লিখেছেন ইবনুল জাওযী, আল-সুয়ূতী, আল-কারী, আল- শওকানী, ইবন ইরাক, আল-আলবানি এবং অন্যরা যাতে জাল হাদিসগুলো যাচাই বাছাই করা হয়েছে।
তাসাউফের বইগুলোতে গ্রন্থকারগণ হৃদয় কোমল করা সম্পর্কিত এই ধরনের অনেক হাদিস (যঈফ, অস্পষ্ট/দুর্বোধ্য, জাল) উল্লেখ করেছেন। তাই, তাফসিরের বইগুলোতেও, বিশেষ করে বিভিন্ন সুরার ফজিলত, নবি রসুলগণের আ. ও পূণ্যবানদের কাহিনী সম্বন্ধে এবং ওহি নাজিলের (পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনায়) ব্যাপারে একই ধরনের হাদিস আমরা দেখতে পাই। এর মধ্যে খুব কমসংখ্যকই সহিহ বলে প্রত্যায়িত।
সম্প্রতি এক কনফারেন্সে উপস্থিত আলেমদের একজন সালাবা ইবনে হাতীবি'র কাহিনী উপস্থাপন করেন, যেটাকে কুরআনের ভাষ্যকারগণ এই আয়াত নাজিলের পরিপ্রেক্ষিত বলে উল্লেখ করেন:
এবং তাদের মধ্যে যেসব লোক আল্লাহ তায়ালার সাথে ওয়াদা করেছিল যদি তিনি আমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে দান করেন, তবে আমরা অবশ্যই দান করব, আর অবশ্যই সৎ লোকদের মধ্যে শামিল থাকব। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা যখন তাদেরকে স্বীয় করুণার দানে ধন্য করলেন, তখন তারা দান করার ব্যাপারে কার্পণ্য করল, আর বেপরোয়াভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল। পরিণামে তিনি আল্লাহ তায়ালার সাথে কৃত তাদের ওয়াদা ভঙ্গের এবং মিথ্যাচারে লিপ্ত থাকার কারণে তাদের অন্তরে মুনাফিকী বদ্ধমূল করে দিলেন; ঐ দিন পর্যন্ত যেদিন তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে (সুরা তাওবা, ৯: ৭৫-৭৭)।
কিন্তু এই কাহিনীর সনদ-যা ইবনে হাজার তার উৎসবিচারি আশ-কাশাফ গ্রন্থের পূর্বে বর্ণিত এই হাদিসকে যঈফ বলেছেন'।
📄 অনেক সতর্ককারীর ত্রুট বিচ্যুতি
সতর্ককারী ও প্রচারকদের মসজিদে প্রদত্ত বক্তৃতায় অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে সাধারণ যে ব্যর্থতা তা হচ্ছে তারা অন্ধকারে জ্বালানিকাঠ সংগ্রহ করেন। তারা ঐসব হাদিস উচ্চারণ করে থাকেন যা লোকদেরকে সরিয়ে দেয়, যেক্ষেত্রে ঐসব হাদিসের কোনোটাাই চোখে পড়ে না, উৎস বিচারে যেগুলো সহিহ বা হাসান বলে প্রত্যায়িত। আমি এমন কোনো শুক্রবারের খুতবা, সতর্ককারী পাঠের সাক্ষী। কিন্তু প্রায় সর্বদাই এমন একগুচ্ছ হাদিস শুনেছি যা যঈফ, মারাত্মকভাবে যঈফ এবং একই সাথে জালও। একদেশে আমি নবি সা.-এর জন্মদিন উদ্যাপন উপলক্ষে একটি বক্তৃতা শুনেছিলাম, যার মূল বিষয় ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর জীবনের বিশুদ্ধতা, আচরণের মাধুর্য এবং চরিত্রের মহত্ব। এটা এমন বিষয়বস্তু যা বিপুলধনে বিভূষিত, কুরআন থেকে নিঃসৃত সত্যের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং সহিহ সূত্রে বর্ণিত সুন্নাহ্ দ্বারা সজ্জিত।
কিন্তু বক্তা মাত্র দুই বা তিনটি হাদিস বর্ণনা করলেন সহিহ বা হাসান পর্যায়ের। তিনি তার গুদাম খালি করে ফেললেন ঐসব হাদিস দিয়ে যেগুলো উদ্ভট, প্রত্যাখ্যাত বা প্রক্ষিপ্ত অথবা যেগুলোর উৎস অজ্ঞাত। আলেমগণ এমন বিষয় সম্বন্ধে বলেছেন: এর কোনো নাক-বালা বা লাগাম নেই অর্থাৎ এর কোনো নিয়ন্ত্রণ, বাধা বা শৃঙ্খল নেই। এখানে এর কিছু উদাহরণ পেশ করা যায়:
আল্লাহ তায়ালা প্রথম [অস্তিত্ব] যা সৃষ্টি করেন তা হচ্ছে তাঁর নবির নূর।
আল্লাহ তায়ালা তার পিতামাতাকে জীবন দান করলেন এবং তারা তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করল।
যাকেই মুহাম্মাদ বলে ডাকা হবে তার জন্যই খাতনা ফরজ। (তাঁর জন্ম ইত্যাদি সম্পর্কে অতি প্রাকৃত বিভিন্ন প্রকার ঘটনা বলা হয়ে থাকে)।
নবি সা.-এর উম্মাহর মর্যাদা সম্বন্ধে যেসব অদ্ভুত জিনিস আমি শুনেছি তার মধ্যে এই হাদিসটি রয়েছে: আমার উম্মাতের বিদ্বানগণ বানি ইসরাঈলের নবিদের মতো। বক্তা একটি গল্প বলে এই হাদিসটির বিশুদ্ধতার সাফাই গাইলেন। এর সারসংক্ষেপ এমন: স্বপ্নে কিংবা আত্মার জগতে আবু হামীদ আল-গাজ্জালী মুসা আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। মুসা (যাকে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি ডেকেছেন) তাকে বললেন: তোমার নাম কি? তিনি বললেন: মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল- গাজ্জালী আল-তুসী... ইত্যাদি। মুসা আ. বললেন: আমি তোমার নাম জিজ্ঞেস করেছি, তোমার বংশবৃত্তান্ত জানতে চাইনি। তিনি বললেন: যখন আল্লাহ তায়ালা জানতে চেয়েছিলেন আপনার ডান হাতে কী রয়েছে, তখন আপনি তাঁকে বলেননি আমার লাঠি এবং চুপচাপ থাকলেন। বরং, আপনি বলেছেন: এটা আমার লাঠি। আমি এর ওপর ভর দিই এবং এর দ্বারা আমার মেষপালকে পাতা পেড়ে দিই এবং আরো বিভিন্নভাবে ব্যবহার করি। বক্তা মন্তব্য করলেন সুতরাং আল-গাজ্জালী মুসার আ. সাথে বিতর্ক করলেন। এইভাবে বক্তা একটি মিথ্যা হাদিসের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করলেন (আমার উম্মাতের বিদ্বানগণ বাণি ইসরাঈলের নবিদের মতো)।
ঐভাবে মূল্যহীন পণ্য বাজারে আনা হয়েছে যা তৈরি অদ্ভুত দ্রব্য দিয়ে, ইসরাঈলী ঐতিহ্যের গল্প ও স্বপ্ন দ্বারা এভাবে তা ছড়াচ্ছে ও বিস্তারলাভ করছে, ভালো পণ্যের অনুপস্থিতিতে অর্থাৎ সহিহ ও হাসান নামে প্রতিষ্ঠিত হাদিসের স্থলে। তারপর, যেমনটা অর্থনীতিবিদগণ বলে থাকেন, খারাপ মুদ্রা দূরীভূত করে ভালো মুদ্রাকে!
ব্যর্থতা পরিচিত বিষয়। এটা এমনকি এমন কিছু আলেমকে স্পর্শ করেছে যারা জ্ঞানবান ও যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি এবং হাদিস বর্ণনায় খুবই কঠোর, কিন্তু তারা কদাচ, সতর্ককরার ওপর প্রবন্ধ রচনা করেননি, শৈথিল্যের চূড়ান্ত করেছেন। এটার মতোই আমরা দেখেছি, আবু ফারাজ ইবনুল জাওযী (মৃত্যু: ৫৯৭ হি.)-এর সতর্ককরা সম্বন্ধীয় পুস্তক। উদাহরণস্বরূপ, দাম আল-হাওয়া; যেখানে একই আল-জাওযী কঠোরতা দেখিয়েছেন আল-মাওযুআত এবং আল-ইলাল আল-মুতানাহিয়া ফিল হাদিস আল ওয়াহিয়্যা এবং এমন বইপুস্তকে। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে আল-নাককাদ শামসুদ্দীন আল-দাহাবী (মৃত্যু: ৭৩৮ হি.), যিনি প্রায়শই শিথিল ছিলেন আল-কাবায়ির'র মধ্যে, কারণ এই বইটির মধ্যে সতর্ক করার বৈচিত্রর রয়েছে।
একইভাবে, আল-হাফিয আল-মুনযিরী তার বিস্তারিত গ্রন্থ আত তারগিব ওয়াত্ তারহিব এর মধ্যে করেছেন। তিনি এতে যথেষ্ট সংখ্যায় দুর্বল, প্রত্যাখ্যাত, এমনকি জাল হাদিসও উদ্ধৃত করেছেন। তার এগুলোর প্রয়োজন ছিল না। তার মুখবন্ধে তিনি পাঠকদের তথ্য প্রদান করেছেন, তার উদ্ধৃত নির্দেশকসমূহ ও পরিভাষাগত শ্রেণিবিভাগের বিষয়ে। সুতরাং তিনি ঐভাবে তার কর্তব্য পালন করেছেন, আল্লাহ তায়ালা তার ওপর মেহেরবান। তবে তার পাঠকগণ, বিশেষ করে আমাদের সময়ের, ঐ বিষয়ে মনোযোগী নয়। এটাই সেই কারণ যাতে আমাকে প্রস্তুত করতে হয়েছে আল-মুনযিরীর গ্রন্থ থেকে একটি দুই অংশের গ্রন্থ, আল-মুনতাকা, এর মধ্যকার সহিহ ও হাসান হাদিসের উৎস-বিচারসহ।