📄 হাদিস ও ফিকহকে যুক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা
যেহেতু সুন্নাহ্ হচ্ছে ফিকহ্'র মৌলিক উৎস, এক্ষেত্রে আইনবিদগণের অন্যতম কর্তব্য হচ্ছে হাদিস বিজ্ঞানে গভীরভাবে মনোনিবেশ করা। একইভাবে হাদিস বিশেষজ্ঞদের কর্তব্য হচ্ছে ফিকহবিজ্ঞানকে আয়ত্ত করা। এই দুটির মধ্যে বিরাজমান জ্ঞানের ব্যবধান পূরণ করা উচিত। এটা এমন বিষয় যা বেশ কয়েক বছর পূর্বেই বলেছিলাম।
ফিকহশাস্ত্রের সর্বোত্তম গবেষকগণ হাদিসের নিয়মকানুন আয়ত্ত করেন না অথবা এর শাস্ত্রীয় জ্ঞানের গভীরে যান না। বিশেষ করে তারা জারহ ও তা'দিল (গ্রহণ বা বর্জনের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীদেরকে আনুপুঞ্জিক নিরীক্ষা) শাস্ত্রে প্রবেশ করেন না এবং তাই বর্ণনাকারীদেরকে নির্ভরযোগ্য বা দুর্বল হিসেবে শ্রেণিকরণের পরিস্থিতি উপলব্ধিতে ব্যর্থ হন। এর ফলে, নেতৃস্থানীয় হাদিস বিশ্লেষকদের পর্যালোচনায় যে হাদিস প্রতিষ্ঠিত বিবেচিত হয়নি, তা তাদের কাছে অভিন্ন মুদ্রা'য় পরিণত হয়। তাছাড়া এ ধরনের হাদিসগুলোকে তারা তাদের গ্রন্থে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং সিদ্ধ ও নিষিদ্ধ বা বাধ্যতামূলক ও অনুকূলতার আইনী শ্রেণিতে নির্দেশনারূপে উদ্ধৃত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এসময় এমনকি হাদিস হতে যুক্তি পেশ করেন ফেলে এমন হাদিস যার উৎস ও সনদ অজানা। মুহাদ্দিসগণের মধ্য থেকে একটি কথা ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হয়েছে এটা আইনবিদদের হাদিস থেকে যার দ্বারা তারা বুঝান যে, এর কোনো সুপরিচিত উৎস নেই।
অন্যদিকে, হাদিসের সর্বোত্তম চর্চাকারীগণ ফিকহ বা এর নীতিমালার জ্ঞানের উত্তম অধিকারী নন। এর বিধানাবলী আবিষ্কার এবং এর অমূল্য ভাণ্ডার ও সুক্ষ্মতা চয়নে তাদের কোনো দক্ষতা নেই। তারা এর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, তাদের শাস্ত্রীয় বহুমুখিতা এবং তাদের লক্ষ্য অথবা তাদের ব্যক্তিগত বিচারবোধের বৈচিত্র্য সম্বন্ধে জ্ঞাত নন।
ফিকহ ও হাদিসের বিশেষজ্ঞগণের উভয় পক্ষই একটি অন্যটির জ্ঞানের অর্জনের ওপর জোর দিতে হবে, যাতে তাদের জ্ঞান ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হয়। আইনবিদগণকে অবশ্যই হাদিস জানতে হবে, কারণ ফিকহ'র অধিকাংশ সিদ্ধান্তই সুন্নাহ্ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত। মুহাদ্দিসগণেরও ফিকহ জানা অপরিহার্য, যা জানা হচ্ছে তা বুঝার জন্য, একজন সামান্য বাহক মাত্র (নাকূল) না হওয়ার জন্য এবং যা জানা হচ্ছে তা বেঠিক পথে উপলব্ধিকে এড়াবার জন্য।
প্রাথমিক যুগের আলেমগণ এ চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর অসম্মানকে তারা নিন্দা করেছেন, এই সীমা পর্যন্ত যে, তাদের মধ্যকার সর্বোচ্চ শিক্ষিত, দৃষ্টান্ত হিসেবে, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়: যদি এই ব্যাপারটি আমাদের হাতে থাকত তাহলে আমরা খেজুর ডাল (জারিদ) দ্বারা এমন প্রত্যেক মুহাদ্দিসকে আঘাত করতাম যারা ফিকহ নিয়ে ব্যস্ত নন এবং এমন প্রত্যেক ফকিহকে (আইনবিদ) তা করতাম, যারা নিজেরা হাদিস চর্চায় নিয়োজিত নন।
অবাক ব্যাপার হলো ফিকহ'র গ্রন্থসমূহে অনেক দুর্বল হাদিস রয়েছে। এখন অনেকেই কোনো কোনো আমলের (ফজিলত) শিক্ষাদানে অথবা আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশে দীর্ঘসময় অতিবাহনে (তারগিব) এবং তাঁর ভয় সৃষ্টিতে (তারহিব) এইসব দুর্বল হাদিসের ব্যবহার সমর্থন করেন। কিন্তু সাধারণ ঐকমত্য এই যে, অনুশাসন চয়নে দুর্বল হাদিস ব্যবহার করা যাবে না। এতসত্ত্বেও, ফিকহ গ্রন্থসমূহে দুর্বল হাদিসের দেখা মেলে, অতিশয় দুর্বল ও মিথ্যা এবং কিছু এমন, যেগুলোর আসলেই কোনো উৎস নেই। এটা মহৎ হাদিস বিশেষজ্ঞকে হাদিসের উৎস সম্বন্ধীয় ঐসব সমালোচনা প্রবন্ধ (তাখরিজ উল হাদিস) সমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনায় উৎসাহিত করেছে, যা আইনবিদগণ তাদের গ্রন্থে উদ্ধৃত করে থাকেন। এই হাদিসগুলো মু'আল্লাক (ঝুলন্ত, অসমর্থিত) হিসেবে উদ্ধৃত অর্থাৎ এর কোনো সনদ নেই। আল-জাওযী উৎস- বিচারমূলক এমন একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, 'আল-তাহকিক ফি তাখরিজ আল- তা'আলিক নামে, যা তার পরবর্তীতে, ইবন আবদুল হাদী তাঁর তানকিহ আল- তাহকিক গ্রন্থে পরিমার্জন করেছেন।
কতিপয় হুফ্ফায সেইসব হাদিসের উৎসবিচার সংক্রান্ত গ্রন্থ রচনা করেছেন যেগুলো প্রশংসিত ও বিখ্যাত ফিকহ লেখনীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে নাস্ব আল-রায়াহ লি-আহাদিস আল-হিদায়া নামক গ্রন্থ, গ্রন্থকার হচ্ছেন আল- হাফিয জামিল আল-দীন আল-যায়লায়ী (মৃত্যু: ৭৬২ হি.)। এটা বিভিন্ন সময়ে চার খণ্ডে ছাপা হয়েছে। আল-হাফিয ইবনে হাজার তাঁর গ্রন্থ আল-দিরায়াহ ফি তাখরিজ আহাদিস আল-হিদায়াতে-এর সারসংক্ষেপ করেছেন। এতে তিনি কিছু তথ্যমূলক ও নির্দেশনামূলক নোট সংযোজন করেছেন। এটা একক খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। হিদায়া হচ্ছে হানাফি ফিকহ'র অন্যতম মূল গ্রন্থ। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ইবনে হাজারের হাদিসের উৎস বিচারমূলক গ্রন্থ ফতহুল আযিয ফী শারহ আল- ওয়াজিয। শারহ আল-ওয়াজিয হচ্ছে আল-গাজ্জালির আল-ওয়াজিয এর ওপর আল-রাফিঈ লিখিত বিশাল ভাষ্যগ্রন্থ। ইবনে হাজারসহ একদল আলেম তাঁর বিখ্যাত তালখিসুল হাবির গ্রন্থে এর উৎস উন্মোচন করেন। আল-রাফিঈর ভাষ্য হচ্ছে শাফিঈ ফিকহ'র প্রধান মূল পাঠের অন্যতম।
কিছু আইনবিদ নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের পরবর্তীগণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুর্বল শ্রেণির হাদিসের ওপর আস্থাশীল হয়েছেন। সুতরাং তাদের ওপর আস্থাশীল হওয়ায় ক্ষমা করা যেতে পারে। কিন্তু যাদের কাছে তাদের দুর্বলতা প্রকাশিত হয়েছে তাদের জন্য তাদের প্রতি নির্ভর করা ক্ষমার্হ নয়। দুর্বল বা যঈফ বলে প্রতিষ্ঠিত হাদিসের ভিত্তিতে নির্দেশনার অধিকার পরিত্যক্ত হয়েছে, যতক্ষণ ঐ নির্দেশনার অন্য আইনের মূলগ্রন্থ বা এর সাধারণ নীতিমালা বা সামগ্রিকভাবে এর লক্ষ্য বিষয়ে প্রমাণ (দলিল) না থাকে। এমনটা করার অধিকার সম্বন্ধে সহজেই দেখা যেতে পারে প্রচলিত ঘরানাগুলোর উৎসবিচার সম্বন্ধীয় প্রসিদ্ধ ফিকহ গ্রন্থাদিতে। উদাহরণস্বরূপ, আল-যায়লায়ী লিখিত নাসব আল-রায়াহ লি-আহাদিস আল-হিদায়া; ইবনে হাজার লিখিত তালখিসুল হাবির ফি তাখরিজ আহাদিস শারহ আল-রাফি' আল-কাবির; আল-আলবানি লিখিত ইরওয়া আল-গালিল ফি তাখরিজ আহাদিস মানার আল-সাবিল (মানার আল-সাবিল হাম্বলি ফিকহ গ্রন্থাদির অন্যতম) এবং আহমাদ ইবনে সিদ্দীক আল-গামারী লিখিত আল-হিদায়া ফি তাখরিজ আহাদিস আল-বিদায়াহ (আল-বিদায়াহ ইবনে রূশদ এর বিদায়াত আল-মুজতাহিদ হতে নিঃসৃত)।
জাকাতের ফিকহ নিয়ে গবেষণাকালে আমি নিজে লক্ষ্য করেছি, ফিকহপন্থী ঘরানার বিদ্বানগণ কিছুসংখ্যক হাদিসের ওপর নির্ভর করেন এবং এগুলো হাদিসের নেতৃস্থানীয় বিদ্বানগণ চ্যালেঞ্জ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ:
শাকসবজির ওপর কোনো সদকাহ নেই।
উশর ও খারাজ একত্র করবে না।
জাকাত ব্যতীত সম্পদের ওপর কোনো কর [হক] নেই।
শেষ হাদিসটি আইনবিদদের নিকট সুপরিচিত। এদের মধ্যে কিছু মহৎ ব্যক্তি এটা উদ্ধৃত করেন। উদাহরণস্বরূপ আল-আহকাম আল-সুলতানিয়া গ্রন্থে আল-মাওয়ার্দি, আল-মুহায্যাব গ্রন্থে আল-শিরাযী এবং আল-মুগনী গ্রন্থে ইবনে কুদামাহ। আল-মাজুমাআ গ্রন্থে আল-নাবাবী এ সম্পর্কে বলেন: এটা অত্যন্ত দুর্বল হাদিস; এটা অপরিচিত। তার পূর্বে আল-সুনান গ্রন্থে আল-বায়হাকি বলেন: আমাদের সহকর্মীগণ তাদের ভাষ্যে এটা বর্ণনা করেছেন, কিন্তু আমি এর কোনো ইসনাদ স্মরণ করতে পারি না। ইবনে মাজাহ, তিরমিজি ও আল-তাবারির তাফসির অনুযায়ী এই হাদিসটির প্রকৃত রূপ হচ্ছে: জাকাত ছাড়াও সম্পদের হক [অধিকার] রয়েছে। আসলে ইবনে মাজাহ'র বিশেষ প্রতিলিপিতে একটি সুপরিচিত নকল প্রমাদ ঘটেছে এবং লাইসা শব্দটি হাদিসের শুরুতে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। এই প্রমাদই ছড়িয়ে গেছে এবং স্থায়ী হয়েছে। আবু যারাহ ইবনুল হাফিজ যাইনুদ্দীন আল-ইরাকী তারহ আল-তাশরিব ফি শারহ আল-তাকরিব (চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্টা ১৮) নামক গ্রন্থে এই ভুলটি ধরিয়ে দেন। আহমদ শাকীর আল-তাবারীর তাফসির (প্রতিবেদন নম্বর ২৫২৭) এর উৎস বিচারমূলক গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা করেছেন এবং তিনি এর বিপক্ষে কতগুলো প্রমাণ উপস্থাপন করেন যা মন ও হৃদয়কে স্থিত করে।
ফিকহ এবং এর বিভিন্ন বিভাগের (আবওয়াব) ওপর লিখিত অনেক গ্রন্থে এই ধরনের হাদিস রয়েছে অর্থাৎ এমন হাদিস যার সনদ হুফ্ফাযগণের কাছে অপরিচিত। নাস্ত্র আল-রায়াহ গ্রন্থে আল-যায়লায়ী এসব হাদিসকে গারিব (অজানা) বলে চিহ্নিত করেন। এটা তার কাছে একটা অদ্ভুত শব্দ, এমন নির্দেশক যে, তিনি এ হাদিসের জন্য কোনো সনদ দেখতে পাননি। একই বিষয় উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনে হাজার দিরায়াহ গ্রন্থে এমনভাব প্রকাশ করেন আমি এটা দেখিনি বা এটাকে আমি মারফু মনে করি না কিংবা এধরনের শব্দাবলী। ফিকহ'র কিছু বিভাগে এমন অনেক হাদিস রয়েছে, বাস্তবিকই এত বেশি, যে তা দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
কুরবানির জবাই বিষয়ের ওপর হাদিস অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমি আল-দিরায়াহ গ্রন্থে কুড়িটিরও বেশি হাদিস দেখেছি, এর কিছু সহিহ ও কিছু যঈফ এবং কিছু সম্পর্কে ইবনে হাজার বলেন, তিনি এটা জানতেন না বা দেখেননি। কিছু দৃষ্টান্ত:
হাদিস তাদের [পারসিক পুরোহিতদের] সাথে এমন সম্পর্ক রক্ষা করো যা একইভাবে [সুন্নাহ্ আহলে কিতাবের সাথে রক্ষা করা হয়, তাদের স্ত্রীলোকদের বিবাহ করা এবং তাদের জবাইকৃত পশুর গোশত খাওয়া ব্যতীত। (ইবনে হাজার বলেন: আমি এসব শব্দে এটা পাইনি। তিনি বুঝাতে চান: স্ত্রীলোকদের বিবাহ করা ইত্যাদি শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে)।
হাদিস মুসলিমগণ আল্লাহ তায়ালার নাম নিয়ে জবাই করে, তাতে তারা আল্লাহ তায়ালার নাম উচ্চারণ করে থাকুক অথবা না করে থাকুক (ইবনে হাজার বলেন: আমি এসব শব্দে এটা দেখিনি)।
ইবনে মাসউদ এর হাদিস: সাদৃশ্যপূর্ণকে বঞ্চিত করো [প্রত্যেক বস্তুর ক্ষেত্রে অর্থাৎ কেবল সাদৃশ্যপূর্ণ (তাসমিয়্যাহ) বলো]
(ইবনে হাজার বলেন: আমি এসব শব্দে এটাকে পাইনি)।
হাদিস উৎসর্গ (অর্থাৎ কর্তন] হবে ঐস্থানে যেটা বুকের ওপরে এবং চিবুকের নিচে (ইবনে হাজার বলেন: আমি এটা পাইনি)।
হাদিস যা দিয়ে ইচ্ছা শিরা কেটে দাও (ইবনে হাজার বলেন: আমি এটা পাইনি)।
হাদিস নবি সা. তোমাদেরকে ছাগলের শ্লেষ্মা ফেলে দিতে বলেছেন যখন তোমরা জবাই করবে (গ্রন্থকার বলেন: অর্থাৎ [যখন] ছুরি নিয়ে শ্লেষ্মার কাছে পৌঁছাবে) (ইবনে হাজার বলেন: আমি এটা দেখিনি)।
হাদিস রসুল সা. আয়িশাকে টিকটিকি খেতে নিষেধ করলেন যখন তিনি (আয়িশা) এটা (খাওয়া যাবে কিনা) জানতে চান (ইবনে হাজার বলেন: আমি এমনটা দেখিনি)।
হাদিস রসুল সা. বাগদা চিংড়ি বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন (ইবনে হাজার বলেন: "আমি এটা দেখিনি)।
এমনি একই রকম অন্যান্য হাদিস পাওয়া যায়'৮।
যেমনটা বলা হয়, দুর্বল হাদিস উদ্ধৃতকরণে শৈথিল্য আহলুর রায় এর গ্রন্থাদিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে কেউ সাধারণভাবে বিদ্যমান আইনের ঘরানাসমূহের পুস্ত-কাদিতে দুর্বল হাদিস, এমনকি সূত্রবিহীন হাদিসও দেখতে পাবে। তবে, শৈথিল্য আরোপের ক্ষেত্রে ঘরানা হতে ঘরানার পার্থক্য রয়েছে।
তালখিসুল হাবির এর মধ্যে ইবনে হাজার আল-রাফী কর্তৃক লিখিত আল-গাজ্জালির আল-ওয়াজিয (এরা দুজনেই নেতৃস্থানীয় শাফিঈ) গ্রন্থের ভাষ্যের হাদিসগুলো খুঁজে পেয়েছেন। যে যুক্তির ওপর গ্রন্থটি দাঁড়িয়ে আছে তার ওপরে তিনি অনেকগুলো দুর্বল হাদিস সম্বন্ধে মতামত ব্যক্ত করেছেন। ইবনে হাজার নিজে একজন শাফিঈ ছিলেন। কিন্তু কারো নিজ ঘরানার চাইতে সত্যকে অনুসরণ করাই অধিক শ্রেয়।
একইভাবে, আল-হাফিয আবু বাকর আহমাদ ইবন আল-হুসাইন আল-বায়হাকি (মৃত্যু: ৪৫৭ হি.) আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আল-জুওয়াইনি (মৃত্যু: ৪৩৮ হি.; ইমাম আল-হারামাঈনের পিতা) এর কাছে একটি শালীন সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রেরণ করেন। এতে কিছু ভ্রান্তিপূর্ণ হাদিস ও অনুমান সম্পর্কিত আলোচনা ছিল যা তার গ্রন্থ আল-মুহিতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই গ্রন্থের একেবারে প্রথম হাদিসটি সূর্যালোকের দিকে উন্মুক্ত পানি দ্বারা গোসল নিষিদ্ধ করা সম্পর্কিত। এটা একটা উদাহরণ। এটা একটা হাদিস যা সহিহ বলে প্রত্যায়িত নয়।
আল-বায়হাকির স্বচ্ছ অন্তঃকরণের প্রতি শ্রদ্ধা যে, তিনি তার শাফিঈ সহকর্মীদের মধ্যকার হাদিস বিশেষজ্ঞদেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি তাদের শৈথিল্যকে সমালোচনা করেছেন। কারণ যুক্তিপ্রদর্শনের ভিত্তি হিসেবে শুদ্ধ বর্ণনা এবং এমন সব বর্ণনা যা শুদ্ধ নয়-তার মধ্যে তারা কোনো প্রকার পার্থক্য পরিহার করেছেন। তিনি দুর্বল ও অপরিচিত বর্ণনাকারীদের সূত্রে বর্ণনার জন্য এবং অন্যান্য দুর্বলতার জন্য তাদেরকে সমালোচনাবিদ্ধ করেছেন তাঁর আল-রাসিনাহ আল-রাকিনাহ নামক গ্রন্থে।৯
বাস্তবিকভাবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, ব্যবহারশাস্ত্রের নীতিমালা (উসূলে ফিকহ) বিষয়ক গ্রন্থগুলোতে দুর্বল ও জাল এবং উৎসহীন হাদিসের অভাব নেই। এই হাদিসটি একটি উদাহরণ: আমার সাহাবিরা নক্ষত্রের মতো; তাদের মধ্যে যার দ্বারাই পরিচালিত হও না কেন, সে-ই তোমাদেরকে পথ দেখাবে। এটা অত্যন্ত দুর্বল হাদিস। প্রকৃতকথা এই যে, শায়খ আল-আলবানি এটাকে জাল হাদিস বলে প্রমাণ করেছেন। আরেকটি হচ্ছে: একজন মুসলিমের চোখে যা উত্তম, তা আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতেও উত্তম। আসলে এসব ইবনে মাসউদের উক্তি, মারফু হাদিস নয়, যাতে তা রসুল সা.-এর সাথে সংযুক্ত করা যেতে পারে। আরও একটি এরকম: আমার উম্মাতের ইখতিলাফ হচ্ছে রহমাত'১০। এছাড়া আরো অনেক এমন হাদিস রয়েছে যা উসূলে ফিকহর গ্রন্থাদিতে মশহুর এবং ছাত্রদের কাছে সুপরিচিত।
📄 ফিকহ’র উত্তরাধিকারের পাণ্ডিত্যপূর্ণ সংশোধনের দায়িত্ব
আমাদের সময়ের বিদ্বান সম্প্রদায়ের, আলেমগণের একটি কর্তব্য হলো ফিকহ'র উত্তরাধিকারের দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং তা হতে হবে ফিকহ ও এর নীতিমালার সাথে সংযুক্ত হাদিসের জ্ঞানের আলোকে, অন্তঃপ্রবিষ্ট ও ধারণাগত যুক্তি সহযোগে এবং দুর্বল হাদিসমূলে প্রবর্তিত অনুশাসনসমূহ অনুসন্ধান করে। কারণ এটা স্বীকৃত যে, দুর্বল হাদিসের সহায়তাপূর্ণ কোন হুকুম সমর্থিত হবে না। কেউ হালাল ও হারামের বাধ্যবাধকতা এর ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে না। এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ঐসব হুকুমআহকাম (যা আইনী আদেশ ও সম্মিলিত কর্তব্যের সাথে যুক্ত) যার দুর্বল হাদিস ব্যতীত কোনো কর্তৃত্বশীল ভিত্তি নেই, সেগুলো বেরিয়ে আসবে। এর কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে দেওয়া হলো:
📄 অমুসলিমের জন্য রক্ত পণ
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফৌজদারি বিধিমতে, কিভাবে আইনসম্মতভাবে জিম্মিদের রক্তপণ নির্ধারণ করা হবে? অধিকাংশ আইনবিদ মনে করেন যে, আহলে কিতাবের জন্য জিম্মির জিযয়া, আরো সংক্ষেপে বলতে গেলে ইসলামি শাসনের আওতাধীন (দারুল ইসলাম, যেভাবে আইনবিদগণ এটাকে উপস্থাপন করেন) লোকদের জন্য মুসলিমের রক্তপণের অর্ধেক'১১। এ ব্যাপারে তাদের পক্ষে কতকগুলো হাদিস মুসনাদ ও সুনান গ্রন্থে দেখা যায়। উভয় গ্রন্থের একটিতেও সহিহ হাদিস নেই। বরং এগুলো এমন হাদিস যা আলেমদের একদল সহিহ দাবি করলেও অন্যরা বাতিল করেছেন। উদাহরণ হিসেবে, তার পিতা ও দাদা থেকে আমর বিন শুয়াইব বর্ণিত হাদিস যে, নবি সা. বলেন মুসলিমের রক্তপণ হচ্ছে অবিশ্বাসীদের রক্তপণের অর্ধেক। আহমদ বিন হাম্বল এর বর্ণনাকারী, যেমন আল-নাসায়ি ও আল-তিরমিজি। পুনরায় আহমদ ও আল-নাসায়ি এবং ইবনে মাজাহও ভিন্নভাবে বর্ণনা করেন তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, দুই কিতাবের অনুসারীদের (ইহুদি ও খ্রিস্টানদের) রক্তপণ হচ্ছে মুসলিমের রক্তপণের অর্ধেক। [এখানে রক্তমূল্য (bloodwit) ও রক্তপণ (blood money) একই অর্থ বহন করে]।
অন্যান্য আলেম মনে করেন যে, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের রক্তপণ হচ্ছে মুসলিমের এক-তৃতীয়াংশ। তাদের এ ধরনের বর্ণনায় দেখা যায়, তাদের মত অনুযায়ী উদ্ধৃত হাদিস প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অন্যদিকে, আল-হুওরী, আল-যুহরী, যায়ীদ ইবনে আলী ও আবু হানীফা এবং তার প্রভাবশালী অনুসারীগণ মনে করেন যে, মুসলিমের রক্তপণ জিম্মির সমানই। তারা হাদিস ও আসারসহ উল্লেখ করেন যে, নবি সা. ও মুসলিমের নিয়ন্ত্রিত বন্দির রক্তপণ মুসলিমের সমান করেছেন এবং তিনি মুসলিমের জন্য রক্তপণ ঐ রকম দিয়েছেন যা একজন জিম্মির জন্য প্রাপ্য ছিল। কিন্তু যেসব আলেম এ হাদিসের সাথে একমত নন তারা এটাকে যঈফ গণ্য করেছেন।
বাস্তবতা হলো এই যে, দুই বিরোধী মতবাদের কোনোটিই সহিহ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি এবং এর কোনোটিই আহকাম হিসেবে গণ্য হয়নি। তাই, আইনের মূল পাঠ এবং সামগ্রিকভাবে এর লক্ষ্যসমূহ অবলম্বন ছাড়া গত্যন্তর নেই। এখন যদি আমরা কুরআনের দিকে দৃষ্টি ফেরাই, আমরা দেখি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটা অভিন্ন, তা সে মুসলিমই হোক অথবা মুসলিমের সাথে চুক্তিবদ্ধ লোকজনই হোক। উভয় ক্ষেত্রেই দায় হচ্ছে:
রক্তপণ তার লোকদেরকে দিতে হবে এবং মুমিন গোলাম (দাস) আজাদ হবে (সুরা নিসা, ৪: ৯২)।
এবং এটা মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য করে না। এটা মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে রক্তপাতের ক্ষেত্রে অভিন্ন এবং মহান মানবতার আবেগ ধারণকারী লোকদের প্রতি সমান আচরণের ক্ষেত্রে, বিশেষত স্বদেশের লোকদের মধ্যে, ইসলামি রাষ্ট্রের মধ্যে, একটি একক রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সহযোগী-নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটা সেই মতবাদ যা অনুযায়ী কয়েক শতাব্দীব্যাপী ইসলামি সরকারসমূহ শাসন করেছে আব্বাসীয় ও উসমানী খিলাফতের আমলে। তবে, বর্তমানের পরাশক্তিসমূহ অমুসলিম সংখ্যালঘুদের আইনগত মর্যাদাকে ব্যবহার করতে চায়, এই অভিযোগে যে, তারা দলিত এবং তাদের জন্য সমান আচরণ ইসলামী ব্যবহারশাস্ত্রের ফৌজদারী বিধিমালায় নেই।
📄 স্ত্রীলোকের জন্য রক্তপণ
স্ত্রীলোকের জন্য রক্তপণের ক্ষেত্রে মহান আইনবিদগণের অধিকাংশই মনে করেন যে, এটা পুরুষের অর্ধেক। তারা তাদের বিষয়টিকে মুয়াজ হতে মারফু হাদিসের ওপর ন্যস্ত করেন এই বলে যে, নবি সা. বলেন: একজন স্ত্রীলোকের রক্তপণ একজন পুরুষের অর্ধেক। আল-বায়হাকি এর সনদের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বলেন: এর সনদ প্রতিষ্ঠিত (সমর্থিত) নয়। তিনি আলী থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (আলী) বলেন, স্ত্রীলোকদের রক্তপণ (হিসাবমতে) পুরুষের রক্তপণের অর্ধেক। এটা আলী থেকে ইবরাহীম আল-নাখয়ীর একটা বর্ণনা। ইবনে আবী শুয়াইবও এটা বর্ণনা করেন, যিনি ইবরাহীম হতে শা'বীর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। এটা প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মৌকুফ (সাহাবি পর্যন্ত এসে সমাপ্ত) এবং আইনে অ-মারফু [অর্থাৎ খোদ নবি সা. হতে নয়]। সাব্যস্তকরণে জোরদার নয়। পুরুষলোকের ও স্ত্রীলোকের জরিমানা সম্পর্কে বিশদ নেই অর্থাৎ আঘাত কিংবা একই ধরনের কোনোকিছুর জন্য একটিমাত্র হাদিসও প্রতিষ্ঠিত নেই।
সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে তারা তাদের বিষয়কে ইজমা বা ঐকমত্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এখন ইজমা একটি প্রমাণ যাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই দৃষ্টান্তে ইজমা প্রতিষ্ঠিত নয়। কারণ লোকেরা বর্ণনা করেছে যে, এই বিষয়ের ওপরে সালাফ (পূর্ববর্তী) আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। এ দুজন হচ্ছেন আল-আসিম ও ইবন আল-আলবাহ। তাঁদের মতে, রক্তপণ স্ত্রীলোকের জন্য তেমনই যেমন পুরুষের জন্য।১২
টিকাঃ
১২. দেখুন দিয়াগত আল-মার'আহ অধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২২৪-২৭।