📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 ব্যবহারশাস্ত্র ও আইন প্রণয়নে সুন্নাহ

📄 ব্যবহারশাস্ত্র ও আইন প্রণয়নে সুন্নাহ


কুরআনের পর ব্যবহারশাস্ত্র ও আইন প্রণয়নের দ্বিতীয় উৎস সুন্নাহ্। সকল চিন্তাঘরানার লিখিত ব্যবহারশাস্ত্রের নীতিমালা সংক্রান্ত সকল বইপুস্তকে এ সম্পর্কে উপযুক্ত ও সুপরিসর আলোচনা হয়েছে। আল-আওজা'ঈ (মৃত্যু: ১৫৭ হি.) বলেন: ‘এই বইটি সুন্নাহর জন্য অধিক প্রয়োজন, যতটা প্রয়োজন বইটির সুন্নাহকে’২। তিনি এরকম বলেছেন, কারণ সুন্নাহ্ কুরআনে বর্ণিত সারাংশকে বিস্তারিত করে, এর মধ্যে মৌলিকত্বের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এবং এর মধ্যকার সাধারণকে বিশেষায়িত করে থাকে। কিছু লোক বলতে গিয়ে এতটাই অগ্রসর হয়েছেন যে, সুন্নাহ্ হচ্ছে কিতাবের চূড়ান্ত নির্দেশক’৩। কিন্তু আহমাদ ইবনে হাম্বল এ জাতীয় মন্তব্য অনুমোদন করেননি: আমি এমনটা বলার দুঃসাহস রাখি না। বরং আমি বলি, সুন্নাহ্ হচ্ছে কিতাবের ব্যাখ্যা। কুরআন ও সুন্নাহ্র সম্পর্ক সম্বন্ধে ঐ প্রকাশভঙ্গি আহমাদ ইবনে হাম্বলের উপলব্ধি ও আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। এটি একটি সুষম অবস্থান। কারণ এক হিসেবে সুন্নাহ্ কুরআনে যা কিছু রয়েছে তা স্পষ্ট করে; কিন্তু তারপর এমনকি যেসব বিষয় সরাসরি কিতাবে নেই, সেখানেও সুন্নাহ্ এত দৃঢ়ভাবে তার কক্ষপথে থাকে যে, তারপরেও এর শিক্ষা কুরআনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কাজ করে।
ইবাদতের নিয়মপদ্ধতি এবং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে আইন প্রণয়নের উৎস হিসেবে সুন্নাহ্ সম্বন্ধে কোনো মতপার্থক্য নেই। আল-শাওকানী বলেন: শেষ কথা হচ্ছে এই যে, সুন্নাহ্র প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠিত এবং [উৎস হিসেবে] নির্দেশনা সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে এর স্বাধীনতা দ্বীনী দাবি। এতে কেউ দ্বিমত করবে না সেই ব্যক্তি ব্যতীত, দ্বীন ইসলামে যার কোনো অংশ নেই।৪
ইসলামি আইনশাস্ত্র বিষয়ক যেকোনো ঘরানার বইপুস্তকেই কাওলি, ফে'লি ও তাকরিরি সুন্নাহ্ সমর্থনে অজস্র প্রমাণ রয়েছে। ফিকহ'র ইতিহাসে আহলুল হাদিস (হাদিসপন্থী) ও আহলুদূর রায় (মতামতপন্থী) বলে পরিচিত দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রশ্নে কোনো পার্থক্য নেই। উভয় গোষ্ঠীই মৌলিক নীতিমালার সমর্থন করে, বিশদকরণের ক্ষেত্রে এবং বাস্তব প্রয়োগের বেলায়ই কেবল মতপার্থক্য এসেছে, তাদের মধ্যে হাদিস গ্রহণ এবং তদনুযায়ী কাজ করার মান নির্ণয়ে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে।
হানাফি মাজহাবের (যাকে রায় মাজহাব বলে চিহ্নিত করা হয়) বইপুস্তকের মধ্যে প্রচুর সংখ্যক হাদিস রয়েছে, যেগুলো গবেষকগণ প্রমাণস্বরূপ ব্যবহার করেন। এধরনের একটি আদর্শ গ্রন্থ হচ্ছে ইবন্ মাওদূদ আল-হানাফী আল-মাওসিলী (মৃত্যু: ৬৮৩ হি.) রচিত আল-ইখতিয়ার শারহ আল-मुखतार। আল-আজহারের সাথে সংযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের অধ্যয়নে (আমি হানাফি ছাত্রদেরকে বুঝাতে চাচ্ছি) এই গ্রন্থ পাঠ করতে বলা হয়। আরেকটি হচ্ছে আল-মারগীনানী রচিত আল-হাদিদ, যা আল-আজহারে সুপ্রতিষ্ঠিত শারিয়াহ অনুষদের হানাফি ছাত্রদের পাঠ্য এবং এর ভাষ্য, ফাতহুল কাদীর, যার লেখক হচ্ছেন সুপ্রতিষ্ঠিত হানাফি আলেম কামালউদ্দিন ইবনুল হুমাম। এসব গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদিসসমূহ সযত্নে পাঠ করলে যথেষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে যে, আহলুর রায়গণ সুন্নাহকে দেখেছেন সমর্থনকারী হিসেবে, যেমনটা দেখেছেন আহলুল আছারগণ (ঐতিহ্যপন্থী)।
এতসত্ত্বেও, আমাদের যুগের কিছু লোক বলেন যে, আবু হানীফা মাত্র সতেরটি হাদিসের বিশুদ্ধতা প্রত্যায়ন করেছেন। এই অভিমত কারো কাছেই কোনো অর্থ বহন করবে না, যারা ঐ যুগের জ্ঞান ঘরানার মেজাজ সম্বন্ধে অবহিত এবং তাদের আলেমগণের প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত। আবু হানীফা জ্ঞানের কূফী ঘরানা হতে এসেছিলেন, যার মধ্যে একত্রিত হয়েছিল ব্যবহারশাস্ত্র ও হাদিস, মহান সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কর্তৃক এর প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই। এই ঘরানা খলিফা আলী ইবন আবু তালিব রা.-এ জ্ঞান ও আশীর্বাদ নিয়ে গড়ে ওঠে। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি বলেন: আল্লাহ তায়ালা ইবনে উম্মে আবদকে (অর্থাৎ ইবনে মাসউদ) দয়া করুন, কারণ তিনি নিঃসন্দেহে এই শহরকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করেছেন।
এটা বিশেষভাবে অভিনব যে, যারা আবু হানীফা সম্বন্ধে যারা ঐরূপ মত দিয়েছেন, তারা এটা আরোপ করেছেন বিশিষ্ট বিদ্বান ইবনে খালদুন-এর প্রতি। এমনটা এই প্রবণতার কারণে তারা সংশ্লিষ্ট সমগ্র অনুচ্ছেদ অথবা তাৎক্ষণিক প্রসঙ্গেও না জেনে বা এ ব্যাপারে অবহিত না হয়ে এমন ধরনের শব্দগুচ্ছ প্রকাশ করেন। আমরা যদি ইবনে খালদূনের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে আমরা দেখি যে, ভাববাচ্যে অভিমত প্রকাশিত হয়েছে (একটা সার্বজনীন পদ্ধতি যার সাহায্যে উল্লেখিত অভিমতে দুর্বলতার ইঙ্গিত করা হয়), তিনি এটাকে তাঁর নিজ অভিমত বলে তুলে ধরেননি (বা অবলম্বন করেননি); তাছাড়া তিনি এটা বলেছেন তা বাতিল হওয়ার পর।
প্রশ্নাধীন এই পথ তার মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থে উলূমুলহাদিস (হাদিস বিজ্ঞান) অধ্যায়ে রয়েছে। নেতৃস্থানীয় মুজতাহিদগণ মতপার্থক্য করেছেন এই বস্তুর/বিষয়ের কতটুকু ও কত অল্প, সে প্রসঙ্গে অর্থাৎ হাদিস, যা তারা সমর্থন/গ্রহণ করেছেন ও প্রচার করেছেন। এখন আবু হানীফা সম্বন্ধে বলা হয় যে, তিনি সতেরটি হাদিসের কিংবা কাছাকাছি (পঞ্চাশ পর্যন্ত) বর্ণনা প্রচার করেছেন এবং ইমাম মালিক - আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি দয়া করুন-মালিকের মতে বিশুদ্ধ যা কেবল তাই তার গ্রন্থের (আল-মুয়াত্তা) মধ্যে স্থান পেয়েছে। এদের সংখ্যা ৩০০ কিংবা এর কাছাকাছি। যেখানে আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তার মুসনাদ গ্রন্থে গ্রহণ করেছেন ৩০,০০০ হাদিস। এঁদের প্রত্যেকেই তাঁদের কাছে বর্ণিত বিষয়সমূহের নিজ নিজ ন্যায়নীতি প্রয়োগ করেছেন।
এরপরেও কিছুসংখ্যক ইন্দ্রিয়পরায়ণ গোঁড়া লোক বলে: তাদের মধ্যে একজনের [অর্থাৎ আবু হানীফা] হাদিস বিষয়ে সামান্যই জ্ঞান ছিল এবং এজন্য এর বর্ণনায় সামান্যই অবদান ছিল। কিন্তু মহামতি ইমামগণের ক্ষেত্রে এই মত প্রদানের কোনো অবকাশ নেই। কারণ বিধিবিধান বা হুকুম আহকাম চয়ন করা হয়েছে কেবল কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে এবং হাদিসের সম্পদে যার সামান্য অংশও আছে তিনি তা অন্বেষণ ও বর্ণনায় বাধ্য এবং তাতে অধ্যবসায়ী ও উদ্যমী, যাতে তিনি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে দ্বীনকে উদ্ধৃত করতে পারেন এবং নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারেন সেই লোকদের কাছ থেকে, যাদের এগুলো ছিল, যারা [পর্যায়ক্রমে] তা পৌঁছিয়েছেন আল্লাহ তায়ালার কাছে থেকে। মহামতি ইমামদের মধ্য থেকে যারা হাদিস বর্ণনা কম করে ছিলেন, তাঁরা এমন ছিলেন বর্ণনা বিরোধীদের [বর্ণনাকরণে] কটাক্ষের কারণে এবং সেইসব ত্রুটি যা এর বর্ণনা পরম্পরাকে বাধাগ্রস্ত করেছে, বিশেষত যখন উৎসকে চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নবিদ্ধ করে, সমালোচনা অনেকের জন্য সেই সময় অগ্রাধিকার লাভ করে। অতঃপর ব্যক্তিগত রায় তাকে কোনো কোনো হাদিসের গ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে এর প্রতি ঐ ধরনের বিরোধিতার কারণে, হাদিস ও এর সনদের সাথে যা সংশ্লিষ্ট। সেই সময় এর একটি বড় পরিমাণ ছিল। এতসত্ত্বেও হিজাযের লোকেরা ইরাকের লোকদের চেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন, কারণ মদিনা ছিল হিজরতের পাদপ্রদীপ এবং সাহাবিদের আশ্রয়স্থল। তাদের মধ্যে যারা ইরাকে পুনঃবসতি স্থাপন করেন, তারা প্রায়ই জিহাদে ব্যস্ত থাকতেন। ইমাম আবু হানীফার হাদিস বর্ণনা এত স্বল্প ছিল, কারণ তিনি হাদিসের বর্ণনা ও বিশুদ্ধতার [পরিমাপে] শর্তাদির ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর এবং তিনি হাদিসকে দুর্বল ঘোষণা করতেন যদি প্রতিষ্ঠিত যুক্তি এর বিরোধী হতো এবং তাই তিনি এটাকে জটিল বিবেচনা করতেন।
তিনি একারণে তার হাদিসের বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করতেন এবং তাই তার হাদিস সংখ্যা কম হয়েছে। এটা এমন নয় যে, হাদিস বর্ণনা ছেড়ে দেওয়া তার পরিকল্পিত নীতি ছিল। কারণ এই যে, তার ঘরানায় যাদের সম্মতিতে এবং তার ওপরে যাদের নির্ভরতায় হাদিস উপস্থাপিত হতো তিনি ছিলেন হাদিস বিজ্ঞানের সেইসব মুজতাহিদের অন্যতম। হাদিস বর্জনে বা গ্রহণে তার রায় গ্রহণ করা হতো। এমন হাদিস বিশেষজ্ঞগণ [মুহাদ্দিসীন] ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা হাদিস গ্রহণের শর্ত শিথিল করে তাদের হাদিসের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন এবং সকলেই তাদের ব্যক্তিগত রায়ের ভিত্তিতে এমন করেছেন। বাস্তবিকপক্ষে তাঁর পরবর্তীতে তাঁর সহকর্মীগণ [ইরাকের আলেমগণের মধ্যে তার ছাত্র ও সহযোগীগণ] হাদিস গ্রহণের শর্ত শিথিল করে তাদের বর্ণনার সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। আল-তাহাবী [উদাহরণস্বরূপ] বিশাল আকারে এমন করে হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তার মুসনাদ রচনা করেছেন। দুটি সহিহ'র মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানে তিনি ছিলেন উচ্চ পর্যায়ভুক্তদের একজন। তিনি এটা করার কারণ এই যে, সহিহকরণে আল-বুখারি ও মুসলিম যেসব শর্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন তা উম্মাতের মধ্যে ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়েছে, ঠিক যেমনটা তারা [মুহাদ্দিসগণ] বলেছেন, আল-তাহাবী প্রদত্ত শর্তাদির বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি হাদিসের বিষয়।৫
এটাই হচ্ছে তাঁরা যা ইবনে খালদুন আবু হানীফা ও তার মাজহাব সম্পর্কে বলেছেন। এটাই হচ্ছে জ্ঞানসমৃদ্ধ ঐতিহাসিক, যথাযথ তথ্যসমৃদ্ধ ও স্বচ্ছ অন্তরবিশিষ্টদের ভাষ্য।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 সকল আইনবিদই সুন্নাহর সূত্র উল্লেখ করেন

📄 সকল আইনবিদই সুন্নাহর সূত্র উল্লেখ করেন


আমরা পূর্ণাঙ্গ নিশ্চয়তা সহকারে বর্ণনা করতে পারি যে, বিভিন্ন ঘরানা, বিভিন্ন শহরের মুসলিম সম্প্রদায়ের আইনবিদগণ, যাদের মতবাদ টিকে রয়েছে বা বাদ দেওয়া হয়েছে, যারা অনুসৃত হন বা অনুসৃত হন না-তারা সুন্নাহ্ গ্রহণে এবং নির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে সুন্নাহ্'র সমর্থন গ্রহণের ব্যাপারে একমত ছিলেন। এই ক্ষেত্রে [যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে] রায়পন্থীগণ এবং হাদিসপন্থীগণ ছিলেন অভিন্ন। আল-বাইহাকী'র নিম্নে বর্ণিত প্রতিবেদনে এরই বিস্তারিত বর্ণনা মেলে:
উসমান ইবন উমার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একটি লোক মালিকের কাছে এল এবং তাকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করল। তখন মালিক তাকে বললেন: আল্লাহর রসুল এমন এমন বলেছেন। তখন লোকটি বলল:
এটাই কি আপনার অভিমত? একথা শুনে মালিক উদ্ধৃত করলেন: ঐসব লোক সতর্ক হওয়া উচিত যারা তাঁর [রসুল] নির্দেশের বিরোধিতা করে, তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসুক কিংবা আপতিত হোক কঠিন শাস্তি (সুরা নূর, ২৪: ৬৩)।
ইবনে ওয়াহাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
মালিক বলেছেন: কখনই লোকদের মধ্যে ফতোয়া প্রদানকারী এমন একজন ছিলেন না যে একজন [লোকদেরকে] বললেন, আমি কেন ওটা বলেছি?৬ লোকেরা এ বর্ণনায় সন্তুষ্ট হলো।
ইয়াহইয়া ইবনে যুরাইজ বলেন:
আমি দেখেছি একটি লোক সুফিয়ানের কাছে এলো এবং বলল: আবু হানীফার বিরুদ্ধে আপনার কাছে কী রয়েছে? তিনি বললেন: তার কাছে কি ভুল মনে হয়? আমি তাকে বলতে শুনেছি: আমি আল্লাহ তায়ালার কিতাব থেকে নিই এবং যদি আমি না পাই [যা আমি খুঁজেছি] আল্লাহ তায়ালার কিতাবে বা তাঁর রসুল সা.-এর সুন্নাহয়, আমি তাঁর সাহাবিদের বর্ণনা গ্রহণ করি। আমি যাকে পছন্দ করি তার কথা নিই যাকে করি না এবং তার কথা বাদ দিই। কিন্তু তাদের অন্যদের কথায় আমি সায় দিই না। অতঃপর বিষয়টি ইবরাহীম অথবা আল-শা'বী ও ইব্ন সীরীন, আল হাসান ও আতা এবং ইবনুল মুসাইয়্যিব'র কাছে পৌঁছে এবং তিনি লোকটিকে পরিমাপ করেন একথা বলে লোকেরা ইজতিহাদ করে এবং যেহেতু তারা করে আমিও ইজতিহাদ করি।
আল-রাবি থেকে, তিনি বলেন:
একদিন আল-শাফিঈ একটি হাদিস বর্ণনা করলেন এবং একটি লোক তাকে বলল: এটি কি গ্রহণ করবেন, হে আবু আবদুল্লাহ?” তারপর [আল-শাফিঈ] বললেন: যখন আমি আল্লাহর রসুল থেকে একটি সহিহ হাদিস বর্ণনা করি এবং তা' গ্রহণ না করি, তখন আমি তোমাদের কাছে প্রত্যায়ন করি যে, নিশ্চিতই আমার মন চলে গেছে!
আল-রাবি থেকে, তিনি বলেছেন:
যদি তুমি আমার গ্রন্থে আল্লাহর রসুল সা.-এর সুন্নাহবিরোধী কিছু পাও, তাহলে সুন্নাহ্ অনুযায়ী অভিমত পোষণ করো এবং আমার কথা পরিত্যাগ করো'৭।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 হাদিস ও ফিকহকে যুক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা

📄 হাদিস ও ফিকহকে যুক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা


যেহেতু সুন্নাহ্ হচ্ছে ফিকহ্'র মৌলিক উৎস, এক্ষেত্রে আইনবিদগণের অন্যতম কর্তব্য হচ্ছে হাদিস বিজ্ঞানে গভীরভাবে মনোনিবেশ করা। একইভাবে হাদিস বিশেষজ্ঞদের কর্তব্য হচ্ছে ফিকহবিজ্ঞানকে আয়ত্ত করা। এই দুটির মধ্যে বিরাজমান জ্ঞানের ব্যবধান পূরণ করা উচিত। এটা এমন বিষয় যা বেশ কয়েক বছর পূর্বেই বলেছিলাম।
ফিকহশাস্ত্রের সর্বোত্তম গবেষকগণ হাদিসের নিয়মকানুন আয়ত্ত করেন না অথবা এর শাস্ত্রীয় জ্ঞানের গভীরে যান না। বিশেষ করে তারা জারহ ও তা'দিল (গ্রহণ বা বর্জনের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীদেরকে আনুপুঞ্জিক নিরীক্ষা) শাস্ত্রে প্রবেশ করেন না এবং তাই বর্ণনাকারীদেরকে নির্ভরযোগ্য বা দুর্বল হিসেবে শ্রেণিকরণের পরিস্থিতি উপলব্ধিতে ব্যর্থ হন। এর ফলে, নেতৃস্থানীয় হাদিস বিশ্লেষকদের পর্যালোচনায় যে হাদিস প্রতিষ্ঠিত বিবেচিত হয়নি, তা তাদের কাছে অভিন্ন মুদ্রা'য় পরিণত হয়। তাছাড়া এ ধরনের হাদিসগুলোকে তারা তাদের গ্রন্থে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং সিদ্ধ ও নিষিদ্ধ বা বাধ্যতামূলক ও অনুকূলতার আইনী শ্রেণিতে নির্দেশনারূপে উদ্ধৃত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এসময় এমনকি হাদিস হতে যুক্তি পেশ করেন ফেলে এমন হাদিস যার উৎস ও সনদ অজানা। মুহাদ্দিসগণের মধ্য থেকে একটি কথা ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হয়েছে এটা আইনবিদদের হাদিস থেকে যার দ্বারা তারা বুঝান যে, এর কোনো সুপরিচিত উৎস নেই।
অন্যদিকে, হাদিসের সর্বোত্তম চর্চাকারীগণ ফিকহ বা এর নীতিমালার জ্ঞানের উত্তম অধিকারী নন। এর বিধানাবলী আবিষ্কার এবং এর অমূল্য ভাণ্ডার ও সুক্ষ্মতা চয়নে তাদের কোনো দক্ষতা নেই। তারা এর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, তাদের শাস্ত্রীয় বহুমুখিতা এবং তাদের লক্ষ্য অথবা তাদের ব্যক্তিগত বিচারবোধের বৈচিত্র্য সম্বন্ধে জ্ঞাত নন।
ফিকহ ও হাদিসের বিশেষজ্ঞগণের উভয় পক্ষই একটি অন্যটির জ্ঞানের অর্জনের ওপর জোর দিতে হবে, যাতে তাদের জ্ঞান ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হয়। আইনবিদগণকে অবশ্যই হাদিস জানতে হবে, কারণ ফিকহ'র অধিকাংশ সিদ্ধান্তই সুন্নাহ্ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত। মুহাদ্দিসগণেরও ফিকহ জানা অপরিহার্য, যা জানা হচ্ছে তা বুঝার জন্য, একজন সামান্য বাহক মাত্র (নাকূল) না হওয়ার জন্য এবং যা জানা হচ্ছে তা বেঠিক পথে উপলব্ধিকে এড়াবার জন্য।
প্রাথমিক যুগের আলেমগণ এ চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর অসম্মানকে তারা নিন্দা করেছেন, এই সীমা পর্যন্ত যে, তাদের মধ্যকার সর্বোচ্চ শিক্ষিত, দৃষ্টান্ত হিসেবে, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়: যদি এই ব্যাপারটি আমাদের হাতে থাকত তাহলে আমরা খেজুর ডাল (জারিদ) দ্বারা এমন প্রত্যেক মুহাদ্দিসকে আঘাত করতাম যারা ফিকহ নিয়ে ব্যস্ত নন এবং এমন প্রত্যেক ফকিহকে (আইনবিদ) তা করতাম, যারা নিজেরা হাদিস চর্চায় নিয়োজিত নন।
অবাক ব্যাপার হলো ফিকহ'র গ্রন্থসমূহে অনেক দুর্বল হাদিস রয়েছে। এখন অনেকেই কোনো কোনো আমলের (ফজিলত) শিক্ষাদানে অথবা আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশে দীর্ঘসময় অতিবাহনে (তারগিব) এবং তাঁর ভয় সৃষ্টিতে (তারহিব) এইসব দুর্বল হাদিসের ব্যবহার সমর্থন করেন। কিন্তু সাধারণ ঐকমত্য এই যে, অনুশাসন চয়নে দুর্বল হাদিস ব্যবহার করা যাবে না। এতসত্ত্বেও, ফিকহ গ্রন্থসমূহে দুর্বল হাদিসের দেখা মেলে, অতিশয় দুর্বল ও মিথ্যা এবং কিছু এমন, যেগুলোর আসলেই কোনো উৎস নেই। এটা মহৎ হাদিস বিশেষজ্ঞকে হাদিসের উৎস সম্বন্ধীয় ঐসব সমালোচনা প্রবন্ধ (তাখরিজ উল হাদিস) সমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনায় উৎসাহিত করেছে, যা আইনবিদগণ তাদের গ্রন্থে উদ্ধৃত করে থাকেন। এই হাদিসগুলো মু'আল্লাক (ঝুলন্ত, অসমর্থিত) হিসেবে উদ্ধৃত অর্থাৎ এর কোনো সনদ নেই। আল-জাওযী উৎস- বিচারমূলক এমন একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, 'আল-তাহকিক ফি তাখরিজ আল- তা'আলিক নামে, যা তার পরবর্তীতে, ইবন আবদুল হাদী তাঁর তানকিহ আল- তাহকিক গ্রন্থে পরিমার্জন করেছেন।
কতিপয় হুফ্ফায সেইসব হাদিসের উৎসবিচার সংক্রান্ত গ্রন্থ রচনা করেছেন যেগুলো প্রশংসিত ও বিখ্যাত ফিকহ লেখনীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে নাস্ব আল-রায়াহ লি-আহাদিস আল-হিদায়া নামক গ্রন্থ, গ্রন্থকার হচ্ছেন আল- হাফিয জামিল আল-দীন আল-যায়লায়ী (মৃত্যু: ৭৬২ হি.)। এটা বিভিন্ন সময়ে চার খণ্ডে ছাপা হয়েছে। আল-হাফিয ইবনে হাজার তাঁর গ্রন্থ আল-দিরায়াহ ফি তাখরিজ আহাদিস আল-হিদায়াতে-এর সারসংক্ষেপ করেছেন। এতে তিনি কিছু তথ্যমূলক ও নির্দেশনামূলক নোট সংযোজন করেছেন। এটা একক খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। হিদায়া হচ্ছে হানাফি ফিকহ'র অন্যতম মূল গ্রন্থ। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ইবনে হাজারের হাদিসের উৎস বিচারমূলক গ্রন্থ ফতহুল আযিয ফী শারহ আল- ওয়াজিয। শারহ আল-ওয়াজিয হচ্ছে আল-গাজ্জালির আল-ওয়াজিয এর ওপর আল-রাফিঈ লিখিত বিশাল ভাষ্যগ্রন্থ। ইবনে হাজারসহ একদল আলেম তাঁর বিখ্যাত তালখিসুল হাবির গ্রন্থে এর উৎস উন্মোচন করেন। আল-রাফিঈর ভাষ্য হচ্ছে শাফিঈ ফিকহ'র প্রধান মূল পাঠের অন্যতম।
কিছু আইনবিদ নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের পরবর্তীগণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুর্বল শ্রেণির হাদিসের ওপর আস্থাশীল হয়েছেন। সুতরাং তাদের ওপর আস্থাশীল হওয়ায় ক্ষমা করা যেতে পারে। কিন্তু যাদের কাছে তাদের দুর্বলতা প্রকাশিত হয়েছে তাদের জন্য তাদের প্রতি নির্ভর করা ক্ষমার্হ নয়। দুর্বল বা যঈফ বলে প্রতিষ্ঠিত হাদিসের ভিত্তিতে নির্দেশনার অধিকার পরিত্যক্ত হয়েছে, যতক্ষণ ঐ নির্দেশনার অন্য আইনের মূলগ্রন্থ বা এর সাধারণ নীতিমালা বা সামগ্রিকভাবে এর লক্ষ্য বিষয়ে প্রমাণ (দলিল) না থাকে। এমনটা করার অধিকার সম্বন্ধে সহজেই দেখা যেতে পারে প্রচলিত ঘরানাগুলোর উৎসবিচার সম্বন্ধীয় প্রসিদ্ধ ফিকহ গ্রন্থাদিতে। উদাহরণস্বরূপ, আল-যায়লায়ী লিখিত নাসব আল-রায়াহ লি-আহাদিস আল-হিদায়া; ইবনে হাজার লিখিত তালখিসুল হাবির ফি তাখরিজ আহাদিস শারহ আল-রাফি' আল-কাবির; আল-আলবানি লিখিত ইরওয়া আল-গালিল ফি তাখরিজ আহাদিস মানার আল-সাবিল (মানার আল-সাবিল হাম্বলি ফিকহ গ্রন্থাদির অন্যতম) এবং আহমাদ ইবনে সিদ্দীক আল-গামারী লিখিত আল-হিদায়া ফি তাখরিজ আহাদিস আল-বিদায়াহ (আল-বিদায়াহ ইবনে রূশদ এর বিদায়াত আল-মুজতাহিদ হতে নিঃসৃত)।
জাকাতের ফিকহ নিয়ে গবেষণাকালে আমি নিজে লক্ষ্য করেছি, ফিকহপন্থী ঘরানার বিদ্বানগণ কিছুসংখ্যক হাদিসের ওপর নির্ভর করেন এবং এগুলো হাদিসের নেতৃস্থানীয় বিদ্বানগণ চ্যালেঞ্জ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ:
শাকসবজির ওপর কোনো সদকাহ নেই।
উশর ও খারাজ একত্র করবে না।
জাকাত ব্যতীত সম্পদের ওপর কোনো কর [হক] নেই।
শেষ হাদিসটি আইনবিদদের নিকট সুপরিচিত। এদের মধ্যে কিছু মহৎ ব্যক্তি এটা উদ্ধৃত করেন। উদাহরণস্বরূপ আল-আহকাম আল-সুলতানিয়া গ্রন্থে আল-মাওয়ার্দি, আল-মুহায্যাব গ্রন্থে আল-শিরাযী এবং আল-মুগনী গ্রন্থে ইবনে কুদামাহ। আল-মাজুমাআ গ্রন্থে আল-নাবাবী এ সম্পর্কে বলেন: এটা অত্যন্ত দুর্বল হাদিস; এটা অপরিচিত। তার পূর্বে আল-সুনান গ্রন্থে আল-বায়হাকি বলেন: আমাদের সহকর্মীগণ তাদের ভাষ্যে এটা বর্ণনা করেছেন, কিন্তু আমি এর কোনো ইসনাদ স্মরণ করতে পারি না। ইবনে মাজাহ, তিরমিজি ও আল-তাবারির তাফসির অনুযায়ী এই হাদিসটির প্রকৃত রূপ হচ্ছে: জাকাত ছাড়াও সম্পদের হক [অধিকার] রয়েছে। আসলে ইবনে মাজাহ'র বিশেষ প্রতিলিপিতে একটি সুপরিচিত নকল প্রমাদ ঘটেছে এবং লাইসা শব্দটি হাদিসের শুরুতে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। এই প্রমাদই ছড়িয়ে গেছে এবং স্থায়ী হয়েছে। আবু যারাহ ইবনুল হাফিজ যাইনুদ্দীন আল-ইরাকী তারহ আল-তাশরিব ফি শারহ আল-তাকরিব (চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্টা ১৮) নামক গ্রন্থে এই ভুলটি ধরিয়ে দেন। আহমদ শাকীর আল-তাবারীর তাফসির (প্রতিবেদন নম্বর ২৫২৭) এর উৎস বিচারমূলক গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা করেছেন এবং তিনি এর বিপক্ষে কতগুলো প্রমাণ উপস্থাপন করেন যা মন ও হৃদয়কে স্থিত করে।
ফিকহ এবং এর বিভিন্ন বিভাগের (আবওয়াব) ওপর লিখিত অনেক গ্রন্থে এই ধরনের হাদিস রয়েছে অর্থাৎ এমন হাদিস যার সনদ হুফ্ফাযগণের কাছে অপরিচিত। নাস্ত্র আল-রায়াহ গ্রন্থে আল-যায়লায়ী এসব হাদিসকে গারিব (অজানা) বলে চিহ্নিত করেন। এটা তার কাছে একটা অদ্ভুত শব্দ, এমন নির্দেশক যে, তিনি এ হাদিসের জন্য কোনো সনদ দেখতে পাননি। একই বিষয় উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনে হাজার দিরায়াহ গ্রন্থে এমনভাব প্রকাশ করেন আমি এটা দেখিনি বা এটাকে আমি মারফু মনে করি না কিংবা এধরনের শব্দাবলী। ফিকহ'র কিছু বিভাগে এমন অনেক হাদিস রয়েছে, বাস্তবিকই এত বেশি, যে তা দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
কুরবানির জবাই বিষয়ের ওপর হাদিস অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমি আল-দিরায়াহ গ্রন্থে কুড়িটিরও বেশি হাদিস দেখেছি, এর কিছু সহিহ ও কিছু যঈফ এবং কিছু সম্পর্কে ইবনে হাজার বলেন, তিনি এটা জানতেন না বা দেখেননি। কিছু দৃষ্টান্ত:
হাদিস তাদের [পারসিক পুরোহিতদের] সাথে এমন সম্পর্ক রক্ষা করো যা একইভাবে [সুন্নাহ্ আহলে কিতাবের সাথে রক্ষা করা হয়, তাদের স্ত্রীলোকদের বিবাহ করা এবং তাদের জবাইকৃত পশুর গোশত খাওয়া ব্যতীত। (ইবনে হাজার বলেন: আমি এসব শব্দে এটা পাইনি। তিনি বুঝাতে চান: স্ত্রীলোকদের বিবাহ করা ইত্যাদি শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে)।
হাদিস মুসলিমগণ আল্লাহ তায়ালার নাম নিয়ে জবাই করে, তাতে তারা আল্লাহ তায়ালার নাম উচ্চারণ করে থাকুক অথবা না করে থাকুক (ইবনে হাজার বলেন: আমি এসব শব্দে এটা দেখিনি)।
ইবনে মাসউদ এর হাদিস: সাদৃশ্যপূর্ণকে বঞ্চিত করো [প্রত্যেক বস্তুর ক্ষেত্রে অর্থাৎ কেবল সাদৃশ্যপূর্ণ (তাসমিয়্যাহ) বলো]
(ইবনে হাজার বলেন: আমি এসব শব্দে এটাকে পাইনি)।
হাদিস উৎসর্গ (অর্থাৎ কর্তন] হবে ঐস্থানে যেটা বুকের ওপরে এবং চিবুকের নিচে (ইবনে হাজার বলেন: আমি এটা পাইনি)।
হাদিস যা দিয়ে ইচ্ছা শিরা কেটে দাও (ইবনে হাজার বলেন: আমি এটা পাইনি)।
হাদিস নবি সা. তোমাদেরকে ছাগলের শ্লেষ্মা ফেলে দিতে বলেছেন যখন তোমরা জবাই করবে (গ্রন্থকার বলেন: অর্থাৎ [যখন] ছুরি নিয়ে শ্লেষ্মার কাছে পৌঁছাবে) (ইবনে হাজার বলেন: আমি এটা দেখিনি)।
হাদিস রসুল সা. আয়িশাকে টিকটিকি খেতে নিষেধ করলেন যখন তিনি (আয়িশা) এটা (খাওয়া যাবে কিনা) জানতে চান (ইবনে হাজার বলেন: আমি এমনটা দেখিনি)।
হাদিস রসুল সা. বাগদা চিংড়ি বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন (ইবনে হাজার বলেন: "আমি এটা দেখিনি)।
এমনি একই রকম অন্যান্য হাদিস পাওয়া যায়'৮।
যেমনটা বলা হয়, দুর্বল হাদিস উদ্ধৃতকরণে শৈথিল্য আহলুর রায় এর গ্রন্থাদিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে কেউ সাধারণভাবে বিদ্যমান আইনের ঘরানাসমূহের পুস্ত-কাদিতে দুর্বল হাদিস, এমনকি সূত্রবিহীন হাদিসও দেখতে পাবে। তবে, শৈথিল্য আরোপের ক্ষেত্রে ঘরানা হতে ঘরানার পার্থক্য রয়েছে।
তালখিসুল হাবির এর মধ্যে ইবনে হাজার আল-রাফী কর্তৃক লিখিত আল-গাজ্জালির আল-ওয়াজিয (এরা দুজনেই নেতৃস্থানীয় শাফিঈ) গ্রন্থের ভাষ্যের হাদিসগুলো খুঁজে পেয়েছেন। যে যুক্তির ওপর গ্রন্থটি দাঁড়িয়ে আছে তার ওপরে তিনি অনেকগুলো দুর্বল হাদিস সম্বন্ধে মতামত ব্যক্ত করেছেন। ইবনে হাজার নিজে একজন শাফিঈ ছিলেন। কিন্তু কারো নিজ ঘরানার চাইতে সত্যকে অনুসরণ করাই অধিক শ্রেয়।
একইভাবে, আল-হাফিয আবু বাকর আহমাদ ইবন আল-হুসাইন আল-বায়হাকি (মৃত্যু: ৪৫৭ হি.) আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আল-জুওয়াইনি (মৃত্যু: ৪৩৮ হি.; ইমাম আল-হারামাঈনের পিতা) এর কাছে একটি শালীন সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রেরণ করেন। এতে কিছু ভ্রান্তিপূর্ণ হাদিস ও অনুমান সম্পর্কিত আলোচনা ছিল যা তার গ্রন্থ আল-মুহিতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই গ্রন্থের একেবারে প্রথম হাদিসটি সূর্যালোকের দিকে উন্মুক্ত পানি দ্বারা গোসল নিষিদ্ধ করা সম্পর্কিত। এটা একটা উদাহরণ। এটা একটা হাদিস যা সহিহ বলে প্রত্যায়িত নয়।
আল-বায়হাকির স্বচ্ছ অন্তঃকরণের প্রতি শ্রদ্ধা যে, তিনি তার শাফিঈ সহকর্মীদের মধ্যকার হাদিস বিশেষজ্ঞদেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি তাদের শৈথিল্যকে সমালোচনা করেছেন। কারণ যুক্তিপ্রদর্শনের ভিত্তি হিসেবে শুদ্ধ বর্ণনা এবং এমন সব বর্ণনা যা শুদ্ধ নয়-তার মধ্যে তারা কোনো প্রকার পার্থক্য পরিহার করেছেন। তিনি দুর্বল ও অপরিচিত বর্ণনাকারীদের সূত্রে বর্ণনার জন্য এবং অন্যান্য দুর্বলতার জন্য তাদেরকে সমালোচনাবিদ্ধ করেছেন তাঁর আল-রাসিনাহ আল-রাকিনাহ নামক গ্রন্থে।৯
বাস্তবিকভাবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, ব্যবহারশাস্ত্রের নীতিমালা (উসূলে ফিকহ) বিষয়ক গ্রন্থগুলোতে দুর্বল ও জাল এবং উৎসহীন হাদিসের অভাব নেই। এই হাদিসটি একটি উদাহরণ: আমার সাহাবিরা নক্ষত্রের মতো; তাদের মধ্যে যার দ্বারাই পরিচালিত হও না কেন, সে-ই তোমাদেরকে পথ দেখাবে। এটা অত্যন্ত দুর্বল হাদিস। প্রকৃতকথা এই যে, শায়খ আল-আলবানি এটাকে জাল হাদিস বলে প্রমাণ করেছেন। আরেকটি হচ্ছে: একজন মুসলিমের চোখে যা উত্তম, তা আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতেও উত্তম। আসলে এসব ইবনে মাসউদের উক্তি, মারফু হাদিস নয়, যাতে তা রসুল সা.-এর সাথে সংযুক্ত করা যেতে পারে। আরও একটি এরকম: আমার উম্মাতের ইখতিলাফ হচ্ছে রহমাত'১০। এছাড়া আরো অনেক এমন হাদিস রয়েছে যা উসূলে ফিকহর গ্রন্থাদিতে মশহুর এবং ছাত্রদের কাছে সুপরিচিত।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 ফিকহ’র উত্তরাধিকারের পাণ্ডিত্যপূর্ণ সংশোধনের দায়িত্ব

📄 ফিকহ’র উত্তরাধিকারের পাণ্ডিত্যপূর্ণ সংশোধনের দায়িত্ব


আমাদের সময়ের বিদ্বান সম্প্রদায়ের, আলেমগণের একটি কর্তব্য হলো ফিকহ'র উত্তরাধিকারের দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং তা হতে হবে ফিকহ ও এর নীতিমালার সাথে সংযুক্ত হাদিসের জ্ঞানের আলোকে, অন্তঃপ্রবিষ্ট ও ধারণাগত যুক্তি সহযোগে এবং দুর্বল হাদিসমূলে প্রবর্তিত অনুশাসনসমূহ অনুসন্ধান করে। কারণ এটা স্বীকৃত যে, দুর্বল হাদিসের সহায়তাপূর্ণ কোন হুকুম সমর্থিত হবে না। কেউ হালাল ও হারামের বাধ্যবাধকতা এর ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে না। এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ঐসব হুকুমআহকাম (যা আইনী আদেশ ও সম্মিলিত কর্তব্যের সাথে যুক্ত) যার দুর্বল হাদিস ব্যতীত কোনো কর্তৃত্বশীল ভিত্তি নেই, সেগুলো বেরিয়ে আসবে। এর কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে দেওয়া হলো:

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00