📄 কিছু নির্ধারিত হাদিস বিষয়ে আয়শা রা. এর অবস্থান
এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সেটাই, যা আয়শা রা. থেকে এসেছে। তিনি কতকগুলো হাদিসের ব্যাপারে নিন্দা প্রকাশ করেছেন, সেগুলো কুরআনের বিরোধী হওয়ায় তৎকর্তৃক বাতিল বা ইসলামের প্রতিষ্ঠিত নীতির বিরোধী হওয়ায় বা অন্য কোনো কারণে। একসময় এমনও ব্যাপার ছিল যে, সাহাবিদের দ্বারা বর্ণিত আরেক হাদিসকে তিনি বাতিল করেছেন, যদিও তাদের সত্যনিষ্ঠতা ছিল কিংবা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের সঠিকতা ছিল কিংবা হাদিসগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কিত সাধারণ গুরুত্বও যথেষ্ট ছিল।
বিড়াল সম্পর্কিত একটি হাদিস উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এর ওপর নির্যাতনের শাস্তি সম্বন্ধে যা এসেছে। আহমাদ ইবনে হাম্বল র. আলকামা (রহ.) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
আমরা আয়শা রা. এর সাথে ছিলাম। তখন আবু হুরায়রা এলো। তখন তিনি (আয়শা) বললেন, তুমিই কি সেই ব্যক্তি যে ঐ হাদিসটি বর্ণনা করেছে যে, এক মহিলা একটা বিড়ালকে বন্দী করে নির্যাতন করেছিল, একে খেতে দেয়নি, পানি পান করায়নি? তখন সে (আবু হুরায়রা) বলল, আমি এটা তাঁর [নবি সা.] কাছে হতে শুনেছি। তখন তিনি (আয়শা রা.) বললেন, তুমি কি জান ঐ মহিলাটি কে ছিল? সে সময় তিনি মনে করেছিলেন যে, সে ছিল একজন অবিশ্বাসিনী। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালার কাছে বিশ্বাসী অধিক সম্মানিত, যিনি সর্বশক্তিমান এবং মহীয়ান ও গরীয়ান। এ অবস্থায় একটি বিড়ালের জন্য তিনি তাকে শাস্তি দেবেন! অতএব যখন তুমি আল্লাহর রসুল সা. থেকে হাদিস বর্ণনা করো, তখন খেয়াল রেখো কিভাবে তুমি তা করছ! ৫১
বর্ণনার মধ্যে আবু হুরায়রা কর্তৃক নিজস্ব ভঙ্গিমার কারণে আয়শা রা. তা বাতিল করেছেন এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি (আবু হুরায়রা) রসুল সা. থেকে শ্রুত শব্দাবলী স্মরণ রাখতে পারেননি। তাঁর সা. যুক্তি এই যে, তিনি এটা খুব বেশি করে বিবেচনা করেছেন যে, একজন বিশ্বাসী মানুষ একটি বিড়ালের কারণে শাস্তি পাবে; আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক সম্মানিত একজন লোককে তিনি একটি নির্বোধ প্রাণীর জন্য আগুনে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তায়ালা আয়শাকে ক্ষমা করুন, কারণ এ বিষয়ে তিনি একটি জিনিস ভুলে গিয়েছেন, যা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে এই ঐ স্ত্রীলোকটির বিরুদ্ধে যা প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা তার কাজ অর্থাৎ অভুক্ত অবস্থায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত বিড়ালটি বন্দী ছিল। এটা হচ্ছে ঐ মহিলার হৃদয়ের কাঠিন্য এবং আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট দুর্বল প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার প্রমাণ এবং তাই সহানুভূতি বা দয়ার রশ্মি তার অন্তঃকরণে প্রবেশ করেনি। সহানুভূতি সম্পন্নগণ ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং যারা দয়া দেখায় তাদের ব্যতীত আল্লাহ তায়ালা দয়া দেখান না। ঐ স্ত্রীলোকটি যদি পৃথিবীতে কারো প্রতি দয়া দেখাত, তাহলে আসমানের প্রভুও তার প্রতি দয়া দেখাতেন।
এই হাদিস এবং একই ধরনের অন্য হাদিসগুলোকে ইসলামের গৌরবসহ দয়াগুণসম্পন্ন মূল্যবোধের পরিসীমায় গণনা করা উচিত, যা প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীকে সম্মান করে। কারণ ইসলাম প্রত্যেক কোমল যকৃতধারী প্রজাতির প্রাণীকে দয়া প্রদর্শনের জন্য পুরস্কার স্থির করেছে। অর্থপূর্ণ হচ্ছে তা-ই যা অন্য হাদিসে এসেছে, যা ইমাম বুখারিও বর্ণনা করেছেন এভাবে : একটি লোক এক কুকুরকে পানি দিয়েছিল, আল্লাহ তায়ালা এটা তার কাছ থেকে গ্রহণ করলেন এবং তাকে ক্ষমা করলেন এবং আরেকটি হচ্ছে: এক গণিকা একটি কুকুরকে পানি দিয়েছিল এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করেছেন।৫২
সর্বোপরি প্রকৃত কথা হচ্ছে যে, আবু হুরায়রা রা. একাই এ হাদিসের বর্ণনাকারী, যাতে মনে হতে পারে যে, তিনি এর শব্দগুলো ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেননি-এটা কিভাবে হতে পারে, যখন তিনি কোনো প্রকার ব্যতিক্রম ছাড়াই সাহাবিদের রা. মধ্যে স্মৃতিধারণে সবচেয়ে শক্তিশালী? তাছাড়া আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-বুখারি ও মুসলিম ইবনে উমার রা. হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: “এক মহিলাকে একটি বিড়ালের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল যাতে সে অনাহারে মারা যায়। অতঃপর সে ঐ [বিড়ালটির] কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: তুমি তাকে খেতে দাওনি এবং তাকে পানি দাওনি, যখন তুমি তাকে শক্ত করে ধরে বেঁধে রেখেছিলে। তুমি তাকে চলে যেতেও দাওনি, যাতে সে মাটিতে চলেফিরে কীটপতঙ্গ খেতে পারে”৫৩। আহমাদও জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: এক মহিলা একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে নির্যাতন করেছিল মারা না যাওয়া পর্যন্ত এবং ওটাকে চলে যেতে দেয়নি, যাতে সে মাটির ওপর চলাফেরা করে কীটপতঙ্গ খেতে পারে।
সুতরাং এই হাদিসটির বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা রা. একাই নন। তবে তিনি যদি একাও হতেন, তাহলেও এই বর্ণনার গুণাগুণ বা অর্থ কিছুতেই বিনষ্ট হতো না।
টিকাঃ
৫১. আল-হায়সামি এটা উদ্ধৃত করেছেন মাজমা আল-যাওয়া'ইদ (খণ্ড ১০, ১৯০ পৃষ্ঠা)-এ এবং বলেছেন: আহমদ [ইবন হাম্বল] এটা বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ খাঁটি ব্যক্তি। ঐ স্ত্রীলোকটির জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হচ্ছে বিড়ালটির প্রতি তার নিষ্ঠুরতা, এটা এভাবেই শাইখাইন আবু হুরাইরা হতে এবং অন্যরা বর্ণনা করেছেন। দেখুন সহিহ আল-জামি' আল-সাগির, হাদিস, নম্বর ৩৩৭৪।
৫২. দেখুন প্রাগুক্ত, দুটি হাদিস, নম্বর ৩৯৯৫, ৩৯৯৬।
৫৩. প্রাগুক্ত।