📄 ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত
অপর্যাপ্ত বুঝের ফলে আমাদের সময়ে সহিহ হাদিস প্রত্যাখ্যানের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ এই যে, কিছু লোক অত্যন্ত মশহুর হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছে- এর একটি মুসলিম যুব সম্প্রদায় ও বয়স্কগণ, সাধারণ ও এলিট সম্প্রদায় মনে রেখেছে এবং এটা হচ্ছে ইবনু উমার ও অন্যান্যের (বর্ণিত) হাদিস: ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত-এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রসুল; সালাত কায়েম করা; জাকাত প্রদান করা; রামজানের সিয়াম পালন এবং যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার ঘরে [কাবায়] হজ করা।
এ হাদিসটি প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে দুঃসাহসী হঠকারিতার কারণ হচ্ছে, এই হাদিসে জিহাদের উল্লেখ নেই, ইসলামে এর (জিহাদের) বিশাল গুরুত্ব সত্ত্বেও এবং এটিই হচ্ছে এ হাদিসটি প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি।
এই দৃষ্টিভঙ্গি এই অপরিহার্য সত্যতা সম্পর্কে অজ্ঞতা হেতু যে, জিহাদ কিছু সংখ্যক লোকের জন্য অবশ্য কর্তব্য, অন্যদের জন্য নয়; এটা বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত কোনো ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয় অধিকাংশ নির্দিষ্ট বিবেচনায়। এটি পাঁচটি ভিত্তির থেকে খুবই ভিন্ন।
হাদিসটি প্রত্যাখ্যানকারীদের কারো যুক্তি যদি শুদ্ধ হতো, তাহলে তা কুরআনের ঐ সমস্ত আয়াতকে প্রত্যাখ্যান/বাতিল করা অনিবার্য করে তুলত, যেগুলোতে ইমানদারদের উত্তম বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা রয়েছে : যারা আল্লাহভীরু, দয়ালু মেহেরবানের দাসানুদাস, পুণ্যবান ও সৎ, উত্তম আমলকারী, যাদের আধ্যাত্মিক দীপ্তি রয়েছে এবং রয়েছে অন্যান্য গুনা যা নিয়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর গ্রন্থে সবিশেষ প্রশংসা করেছেন এবং তাদের জন্য প্রভৃত প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এসব উত্তম গুণাবলীর মধ্যে তিনি জিহাদকে অন্তর্ভুক্ত করেননি।
এসবের ওপরে পাঠ করুন সুরা বাকারার প্রথম দিকের আয়াতসমূহে (সুরা বাকারা, ২: ২-৫) আল্লাহ তায়ালা ভীরুদের গুণাবলী, পূণ্যবান ও সত্যনিষ্ঠদের সম্পর্কে এতে কোনো কল্যাণ নেই... (সুরা বাকারা, ২: ১৭৭); সুরা আল-আনফালের শুরুতে (৮: ২-৪) ইমানদারদের গুণাবলী; ঐ সমস্ত ব্যক্তির গুণাবলী যাদের রয়েছে আত্মিক উৎকর্ষ, সুরা আর-রা'দে (১৩: ২০-২২); বিশ্বাসী ও ফেরদাউস (জান্নাতের) এর উত্তরাধিকারীগণ সম্পর্কে সুরা মুমিনের প্রারম্ভে (২৩: ১-১০); সুরা ফুরকানের শেষদিকে (২৫ : ৬৩-৭৭) দয়াময়ের দাসদের গুণাবলী সম্পর্কে; আল্লাহভীরু ও নেক আমলকারীদের সম্পর্কে সুরা আয-যারিআতে (৫১: ১৫-২৩); আল্লাহর জান্নাতে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে সুরা আল-মাআরিজে (৭০: ২২-৩৫)।
এসবের কোনো আয়াতে জিহাদের উল্লেখ নেই। তাহলে যে ব্যাপক অজ্ঞতার ফলে হাদিসটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে তা কি কুরআন থেকে এসব আয়াতকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে?
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ উল্লিখিত পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলামের প্রতিষ্ঠার ব্যাখ্যায় কিছুদূর অগ্রসর হয়েছেন এবং কেন অন্যান্য মৌলিক কর্তব্য উল্লেখ করা হয়নি, যেমন জিহাদ অথবা পিতামাতার প্রতি যত্ন আত্তির পূণ্য, নিকটাত্মীয়দের হক এবং এধরনের অন্যান্য বিষয়-এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, যা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তা এই: আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতি যেগুলো ফরজ করেছেন সেই বাহ্যিক আমলসমূহের সংখ্যা যদি পাঁচ-এর অধিক হয়, তিনি কেন এটা বলেছেন: ইসলাম কি এই পাঁচটি? কিছু লোক উত্তর দিয়েছে যে, এগুলো [পাঁচটি] হচ্ছে ইসলামের অধিকতর দৃশ্যমান এবং অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতীক এবং বান্দা কর্তৃক এগুলো সম্পাদিত হলে তার ইসলাম পরিপূর্ণ হলো এবং এগুলো পরিত্যাগ করার অর্থ হলো, ইসলামে তার বাধ্যবাধকতার সীমা হতে বিচ্যুত হওয়া।
আরো সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো: রসুল সা. সেই দ্বীন সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যা বান্দাকে পুরোপুরি তার প্রভুর প্রতি আত্মসমর্পিত করবে, যথা আল্লাহ তায়ালার হক বান্দার উপর, তা হচ্ছে বান্দা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে। সুতরাং তিনি প্রত্যেকের জন্য এই কর্তব্য স্থির করেছেন যে, সামর্থ্য অনুসারে সে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করবে এবং দ্বীনকে পুরোপরি তাঁরই জন্য খালেস করবে।
বরং এই সব ভিন্ন ফরয গঠিত হয় যৌথ দায়িত্ব সাপেক্ষে - যেমন জিহাদ এবং ভালোকাজের আদেশ এবং খারাপ কাজ থেকে বিরতকরণে এবং যা (প্রয়োজনে) কর্তৃত্বের মাধ্যমে এবং শাসন ও আইনগত তথ্য প্রদান [পাণ্ডিত্যপূর্ণ বা দার্শনিক), অনুসন্ধান এবং হাদিসের প্রচার এবং অন্যান্য এমন ধরনের কর্তব্য দ্বারা।
অথবা ঐসব কর্তব্য যেগুলো ব্যক্তির হক সংক্রান্ত বিষয়ে আবশ্যকীয়। ঐ হক দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়, যার ওপর এটা পালন করা ফরয। যেমন এক ব্যক্তির হক অন্য ব্যক্তির হককে নির্ধারণ করে, যার জন্য ঐ হক কর্তব্যে পরিণত হয়।
তারপর রয়েছে আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের অধিকারসমূহ। উদাহরণস্বরূপ : ঋণ সাব্যস্তকরণ, অন্যায় দখল থেকে [বস্তু] পুনরুদ্ধার এবং ঋণের বিষয় এবং নিরাপদ রক্ষণের গ্যারান্টি এবং রক্ত সম্পর্ক, সম্পদ ও জমিজমা সঠিকভাবে পুনরুদ্ধার করা।
বাস্তবিকপক্ষে এগুলো ব্যক্তিমানুষের অধিকার এবং যখন তারা তাদের থেকে এসব অধিকার অবমুক্ত করে, এই অধিকারসমূহ বাতিল হয়ে যায়, এক জনের বাধ্যবাধকতায় থাকে, অন্যের নয়। একটা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে অন্যটি নয়। এগুলো প্রতিটিই প্রত্যেক বান্দার জন্য বাধ্যতামূলক নয়, যেমনটা আল্লাহ তায়ালার নির্ভেজাল ইবাদত। এ কারণেই মুসলিমরা এসব ক্ষেত্রে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অংশীদার হয়। এই পাঁচটি স্তম্ভ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বাধ্যবাধকতা, কারণ প্রকৃতই এগুলো মুসলিমদের পার্থক্যকারী।
একইভাবে রক্ত সম্পর্কের বন্ধনকে সম্মান করা। স্ত্রী, সন্তান, প্রতিবেশী এবং ব্যবসায় অংশীদার ও গরিবদের অধিকারকে সম্মান জানানো বাধ্যতামূলক এবং প্রশংসা বর্ণনাকে সম্মান দেখানো অবশ্য করণীয় এবং আইনী নির্দেশ জারি করা; রায় প্রদান করা; শাসন করা এবং ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দকাজ থেকে বিরত করা এবং জিহাদ : এগুলো সবই শর্তযুক্ত ঘটনাক্রমে অবশ্যই পালনীয় কিছু সংখ্যকের ওপর ও সবার জন্য নয়। এই ধরনের কর্তব্য বিরাজ করে উপকার প্রাপ্তি আকর্ষণ করতে বা ক্ষতি এড়াতে; যদি এ লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয় এক ব্যক্তির কাজের মাধ্যমে, তাহলে এগুলো বাধ্যতামূলক থাকবে না। এজন্য যা লোকদের মধ্যে ভাগাভাগি করা যায় তা সম্মিলিতভাবে বাধ্যতামূলক এবং যা একক তা একজন বিশেষ ব্যক্তি, যেমন : জায়িদের জন্য বাধ্যতামূলক, অন্য ব্যক্তি আমর'র জন্য নয়।
প্রত্যেক যোগ্য ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য কর্তব্য পালনে সকলের অংশগ্রহণ নিষ্প্রয়োজন, ঐ পাঁচটি ব্যতীত। কারণ বাস্তবেই যায়িদ এবং তার নিকটাত্মীয়গণ আমরের স্ত্রী ও তার নিকটাত্মীয় নয়, সুতরাং এটা এই একটির জন্য বাধ্যতামূলক নয় যেমন এই অন্যটির জন্য বাধ্যতামূলক। পৃথক হচ্ছে রামাজানে সিয়াম এবং কাবায় হজ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং জাকাত। বাস্তবিকপক্ষে জাকাত, যদিও সম্পত্তির ওপর অধিকার, তথাপি এটা আল্লাহ তায়ালার প্রাপ্য এবং আট প্রকার [গ্রাহক] মাত্র হচ্ছে এর আইনসম্মত ব্যয়ের খাত। এ কারণেই এখানে নিয়াত বাধ্যতামূলক এবং এটা অনুমতিযোগ্য নয় এজন্য যে অন্য ব্যক্তি এটা করে [যেমন জাকাতের কর্তব্য পালন করা] তার অনুমতি ব্যতিরেকে এবং কেন এটা অবিশ্বাসীগণ দাবি করেন।৪৯
টিকাঃ
৪৯. ইবন তাইমিইয়াহ'র মাজমু'আল-ফাতাওয়া কিতাবের খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩১৪-১৬ তে কিতাব আল-ইমান অধ্যায় হতে।
📄 সহিহ প্রত্যাখ্যানে হঠকারী প্রস্ততা এবং এ ক্ষেত্রে সন্দেহের উদ্রেক হওয়া
সহিহ ও প্রত্যায়িত হওয়া সত্ত্বেও তাড়াহুড়ো করে কোনো হাদিস প্রত্যাখান আমাদের মতে সন্দেহপূর্ণভাবে হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা কখনই সহিহ হাদিস বাতিলকরণে হঠকারিতাকে প্রশ্রয় দেবেন না। বরং তারা উম্মাহর পূর্ববর্তী প্রজন্মের (সালাফ) মতামত সমর্থন করবেন। কারণ যখন এটা প্রতিষ্ঠিত যে, তাঁরা কোন হাদিস গ্রহণ করেছেন এবং কোনো বিশিষ্ট নেতা তার নিন্দা করেননি, তাহলে অবশ্যই তারা অনিয়মের অজুহাতে কোনো সমালোচনা অনুমোদন করেননি বা এর প্রতি আপত্তির কোনো কারণ দেখাননি।
একজন পক্ষপাতশূন্য মনের অধিকারী ব্যক্তি অবশ্যই এই হাদিসটিকে সমর্থন করবেন এবং বোধগম্য অর্থ বুঝে দেখবেন অথবা যথাযথ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবেন। এটাই হচ্ছে মুতা'জিলা (যুক্তিবাদী) ও আহলুস সুন্নাহ্দের (সুন্নীগণ যারা সুন্নাহ্ অনুসরণ করেন) মধ্যে বিভাজনের ক্ষেত্র। প্রথম দল ধর্ম ও জ্ঞানের যে নীতিমালা গ্রহণ করেছেন, তার আলোকে কোনো হাদিসে কোনো অসামঞ্জস্য দৃষ্টি হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করতে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ্গণ জটিল হাদিস ব্যাখ্যায় তাদের মনন ব্যবহার করেন এবং বাহ্যিকদৃষ্টিতে প্রতীয়মান, এমন ভিন্নতাগুলোকে একত্রিত করে বিরোধিতা নিরসনের প্রয়াস গ্রহণ করেন।
এ উদ্দেশ্যে আবু মুহাম্মদ ইবনে কুতায়বা (মৃত্যু: ২৬৭ হি.) তার সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ তা'বীল মুখতালাফ আল-হাদিস রচনা করেন। এতে কিছু সংখ্যক হাদিসকে ঘিরে মুতাজিলাদের ঝড়ো আঘাতের মোকাবিলা করেন, যাকে তারা কুরআন ও যুক্তির বিরোধী বলে অথবা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ধারণার আলোকে মিথ্যা বা অন্য হাদিসের বিরোধী বলে অভিহিত করেছিল। ইবনে কুতায়বার পরে, হানাফি মাজহাবের হাদিসবেত্তা আবু জাফর আত-তাহাবী (মৃত্যু: ৩২১ হি.) মুশকিল আল-আসার নামক গ্রন্থ রচনা করেন°। তিনি এসব হাদিসে জটিলতার স্থান নির্দেশ করেন, এগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে গ্রহণযোগ্য করেন এবং এগুলোকে যুক্তির পক্ষে সুবিধাদায়ক অবস্থান প্রদান করেন।
যখন নবি সা. থেকে কোনো হাদিসের সাক্ষ্য নিশ্চিত হয়, তখন এর অভ্যন্তরে একটি সুদূরপ্রসারী, পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে একে বুঝে নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে এবং এটাকে বাতিলকরণ প্রতিরোধে যথাযথ সাবধানতা থাকবে সম্প্রসারিত যুক্তির দাবি পূরণার্থে, যেগুলোতে লুকায়িত ভুলের সম্ভাবনা আছে সেগুলোর জন্য।
টিকাঃ
৫০. পরবর্তীতে মু'আস্সাত আল-রিসালাহ কর্তৃক ৮ খণ্ডে মুদ্রিত, সম্পাদনা করেছেন শু'আইব আল-আরনা'উত।
📄 কিছু নির্ধারিত হাদিস বিষয়ে আয়শা রা. এর অবস্থান
এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সেটাই, যা আয়শা রা. থেকে এসেছে। তিনি কতকগুলো হাদিসের ব্যাপারে নিন্দা প্রকাশ করেছেন, সেগুলো কুরআনের বিরোধী হওয়ায় তৎকর্তৃক বাতিল বা ইসলামের প্রতিষ্ঠিত নীতির বিরোধী হওয়ায় বা অন্য কোনো কারণে। একসময় এমনও ব্যাপার ছিল যে, সাহাবিদের দ্বারা বর্ণিত আরেক হাদিসকে তিনি বাতিল করেছেন, যদিও তাদের সত্যনিষ্ঠতা ছিল কিংবা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের সঠিকতা ছিল কিংবা হাদিসগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কিত সাধারণ গুরুত্বও যথেষ্ট ছিল।
বিড়াল সম্পর্কিত একটি হাদিস উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এর ওপর নির্যাতনের শাস্তি সম্বন্ধে যা এসেছে। আহমাদ ইবনে হাম্বল র. আলকামা (রহ.) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
আমরা আয়শা রা. এর সাথে ছিলাম। তখন আবু হুরায়রা এলো। তখন তিনি (আয়শা) বললেন, তুমিই কি সেই ব্যক্তি যে ঐ হাদিসটি বর্ণনা করেছে যে, এক মহিলা একটা বিড়ালকে বন্দী করে নির্যাতন করেছিল, একে খেতে দেয়নি, পানি পান করায়নি? তখন সে (আবু হুরায়রা) বলল, আমি এটা তাঁর [নবি সা.] কাছে হতে শুনেছি। তখন তিনি (আয়শা রা.) বললেন, তুমি কি জান ঐ মহিলাটি কে ছিল? সে সময় তিনি মনে করেছিলেন যে, সে ছিল একজন অবিশ্বাসিনী। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালার কাছে বিশ্বাসী অধিক সম্মানিত, যিনি সর্বশক্তিমান এবং মহীয়ান ও গরীয়ান। এ অবস্থায় একটি বিড়ালের জন্য তিনি তাকে শাস্তি দেবেন! অতএব যখন তুমি আল্লাহর রসুল সা. থেকে হাদিস বর্ণনা করো, তখন খেয়াল রেখো কিভাবে তুমি তা করছ! ৫১
বর্ণনার মধ্যে আবু হুরায়রা কর্তৃক নিজস্ব ভঙ্গিমার কারণে আয়শা রা. তা বাতিল করেছেন এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি (আবু হুরায়রা) রসুল সা. থেকে শ্রুত শব্দাবলী স্মরণ রাখতে পারেননি। তাঁর সা. যুক্তি এই যে, তিনি এটা খুব বেশি করে বিবেচনা করেছেন যে, একজন বিশ্বাসী মানুষ একটি বিড়ালের কারণে শাস্তি পাবে; আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক সম্মানিত একজন লোককে তিনি একটি নির্বোধ প্রাণীর জন্য আগুনে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তায়ালা আয়শাকে ক্ষমা করুন, কারণ এ বিষয়ে তিনি একটি জিনিস ভুলে গিয়েছেন, যা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে এই ঐ স্ত্রীলোকটির বিরুদ্ধে যা প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা তার কাজ অর্থাৎ অভুক্ত অবস্থায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত বিড়ালটি বন্দী ছিল। এটা হচ্ছে ঐ মহিলার হৃদয়ের কাঠিন্য এবং আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট দুর্বল প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার প্রমাণ এবং তাই সহানুভূতি বা দয়ার রশ্মি তার অন্তঃকরণে প্রবেশ করেনি। সহানুভূতি সম্পন্নগণ ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং যারা দয়া দেখায় তাদের ব্যতীত আল্লাহ তায়ালা দয়া দেখান না। ঐ স্ত্রীলোকটি যদি পৃথিবীতে কারো প্রতি দয়া দেখাত, তাহলে আসমানের প্রভুও তার প্রতি দয়া দেখাতেন।
এই হাদিস এবং একই ধরনের অন্য হাদিসগুলোকে ইসলামের গৌরবসহ দয়াগুণসম্পন্ন মূল্যবোধের পরিসীমায় গণনা করা উচিত, যা প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীকে সম্মান করে। কারণ ইসলাম প্রত্যেক কোমল যকৃতধারী প্রজাতির প্রাণীকে দয়া প্রদর্শনের জন্য পুরস্কার স্থির করেছে। অর্থপূর্ণ হচ্ছে তা-ই যা অন্য হাদিসে এসেছে, যা ইমাম বুখারিও বর্ণনা করেছেন এভাবে : একটি লোক এক কুকুরকে পানি দিয়েছিল, আল্লাহ তায়ালা এটা তার কাছ থেকে গ্রহণ করলেন এবং তাকে ক্ষমা করলেন এবং আরেকটি হচ্ছে: এক গণিকা একটি কুকুরকে পানি দিয়েছিল এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করেছেন।৫২
সর্বোপরি প্রকৃত কথা হচ্ছে যে, আবু হুরায়রা রা. একাই এ হাদিসের বর্ণনাকারী, যাতে মনে হতে পারে যে, তিনি এর শব্দগুলো ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেননি-এটা কিভাবে হতে পারে, যখন তিনি কোনো প্রকার ব্যতিক্রম ছাড়াই সাহাবিদের রা. মধ্যে স্মৃতিধারণে সবচেয়ে শক্তিশালী? তাছাড়া আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-বুখারি ও মুসলিম ইবনে উমার রা. হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: “এক মহিলাকে একটি বিড়ালের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল যাতে সে অনাহারে মারা যায়। অতঃপর সে ঐ [বিড়ালটির] কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: তুমি তাকে খেতে দাওনি এবং তাকে পানি দাওনি, যখন তুমি তাকে শক্ত করে ধরে বেঁধে রেখেছিলে। তুমি তাকে চলে যেতেও দাওনি, যাতে সে মাটিতে চলেফিরে কীটপতঙ্গ খেতে পারে”৫৩। আহমাদও জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: এক মহিলা একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে নির্যাতন করেছিল মারা না যাওয়া পর্যন্ত এবং ওটাকে চলে যেতে দেয়নি, যাতে সে মাটির ওপর চলাফেরা করে কীটপতঙ্গ খেতে পারে।
সুতরাং এই হাদিসটির বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা রা. একাই নন। তবে তিনি যদি একাও হতেন, তাহলেও এই বর্ণনার গুণাগুণ বা অর্থ কিছুতেই বিনষ্ট হতো না।
টিকাঃ
৫১. আল-হায়সামি এটা উদ্ধৃত করেছেন মাজমা আল-যাওয়া'ইদ (খণ্ড ১০, ১৯০ পৃষ্ঠা)-এ এবং বলেছেন: আহমদ [ইবন হাম্বল] এটা বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ খাঁটি ব্যক্তি। ঐ স্ত্রীলোকটির জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হচ্ছে বিড়ালটির প্রতি তার নিষ্ঠুরতা, এটা এভাবেই শাইখাইন আবু হুরাইরা হতে এবং অন্যরা বর্ণনা করেছেন। দেখুন সহিহ আল-জামি' আল-সাগির, হাদিস, নম্বর ৩৩৭৪।
৫২. দেখুন প্রাগুক্ত, দুটি হাদিস, নম্বর ৩৯৯৫, ৩৯৯৬।
৫৩. প্রাগুক্ত।