📄 উপলব্ধির অক্ষমতাহেতু হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করা
এখানে আমি যে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হচ্ছে সুন্নাহ্ ও সহিহ হাদিসকে প্রত্যাখান করা। এটা সেই ব্যক্তির মনে উদয় হয়, যে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয় এবং এ বিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। এটা আমাদেরকে নিশ্চিত করেছে যে, সূচনার সময়ের দাবি হচ্ছে সুন্নাহ্ কিভাবে বুঝতে হবে তা অনুসন্ধান এবং নিবিড়ভাবে সংজ্ঞায়িত গবেষণা, সেই সাথে এর উৎস এবং এর কর্তৃত্ব বিষয়ে বুদ্ধিদীপ্ত আশ্রয় বা অবলম্বন গ্রহণ করা। পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহে আমরা এ বিষয়ের প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষণ করব।
📄 ক্ষীণ উপলব্ধির কারণে সহিহকে প্রত্যাখ্যান করা
সুন্নাহর জন্য ক্ষতিকর বিষয়াদির মধ্যে রয়েছে যে, কোনো হঠকারী ব্যক্তি একটি হাদিস পাঠ করে, এর জন্য তার নিজস্ব একটা অর্থ অনুমান করে এবং তদনুযায়ী ব্যাখ্যা করে। ঐ অর্থ তার কাছে অগ্রহণযোগ্য হলে তখন সে হাদিসকে এর প্রত্যাখ্যাত অর্থসহ বাতিল করে দেয়। কিন্তু যদি সে সৎ হতো, মনোযোগ দিয়ে দেখত ও অনুসন্ধান করত, তাহলে বুঝত, সে যেভাবে বুঝেছে, হাদিসের অর্থ তেমন নয়। সে জানতে পারত, এর জন্য যে ব্যবস্থা সে দিয়েছে তার বিচারবোধ ও পছন্দের সাথে সংগতি রেখে, তা এমন এক অর্থ প্রকাশ করে যার অস্তিত্ব না কুরআনে আছে, আর না আছে সুন্নাহ'তে, যার সাথে আরবদের ভাষার সংগতি নেই এবং যার পক্ষে তার পূর্বেকার বিদগ্ধ বিদ্বান আলেমদের সমর্থন নেই।
আয়শা রা. বর্ণিত হাদিস: তিনি আমাকে ইজার (অন্তর্বাস) পরার নির্দেশ দিতেন, তারপর আমার সাথে ঘনিষ্ট হতেন আমার ঋতুকালীন সময়ে।
এই হাদিসটি একটি উদাহরণ। আল-বুখারি ও অন্যান্যদের থেকে আয়শা রা. কর্তৃক বর্ণিত যে, তিনি বলেন: আল্লাহর রসুল আমাকে আমার মাসিকের সময় ইজার (অন্তর্বাস) পরিধান করার নির্দেশ দিতেন, তারপর তিনি আমার সাথে ঘনিষ্ট হতেন।৩৮
এক শতাব্দীর এক তৃতীয়াংশের কাছাকাছি পূর্বে কুয়েতী জার্নাল আল-আরাবি তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে এক ব্যক্তি এই হাদিসটিকে বাতিল করে দেন। তার যুক্তি কুরআনের এই আয়াতের দাবির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল:
লোকেরা তোমাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, তা অশুচি। কাজেই ঋতুকালে স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকো এবং যে পর্যন্ত না পবিত্র হয়, তাদের নিকটবর্তী হয়ো না (সুরা বাকারা, ২: ২২২)।
লেখক বলেন, কুরআন ঋতুকালীন সময়ে স্ত্রীলোকের কাছ থেকে পৃথক থাকতে আদেশ দিচ্ছে, অথচ হাদিসে বলা হচ্ছে যে, রসول সা. ইজারের ওপর তাঁর স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ট হতেন।৩৯
আমরা অন্যত্র বিশদভাবে এই যুক্তি খণ্ডন করেছি। মূলকথা হচ্ছে এখানে হাদিস ও কুরআনের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, যেমনটা এই লেখক বুঝেছেন। বরং হাদিসটি কুরআনের ভাষ্য প্রদান করেছে; এটা ইনতিজাল (পৃথক থাকা) এর অর্থ স্পষ্ট করেছে নির্দেশ বিষয়ে। এখানে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা (ইজতিনাব) অভিপ্রায় নয়- যেমনটা ইহুদিরা করে, যারা স্ত্রীর এমন সময়ে তার সাথে রাত্রি যাপন করে না। ইনতিজাল সম্পর্কে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে লোকেরা যৌন সহবাসের শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হতে বিরত থাকবে। পারস্পরিক আনন্দলাভ হচ্ছে এর থেকে পৃথক কিছু, এটা ঐ বিষয়ের অংশ নয় যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
হাদিস: হে আল্লাহ তায়ালা, আমাকে ভিখারির জীবন দাও...
আরেকটি উদাহরণ রয়েছে ইবনে মাজাহ কিতাবে আবু সাঈদ আল-খুদরি রা. এবং আল-তাবারানি গ্রন্থে উবাদা ইবনে সাবিত রা. থেকে: হে আল্লাহ তায়ালা! আমাকে মিসকিন (গরিব ভিখারি) হয়ে বাঁচতে এবং মিসকিন হয়ে মরতে দাও এবং পরকালে মিসকিনদের সঙ্গী করো।৪০ কোনো কোনো লোক হাদিসটি পাঠ করে এবং আল- মাসকানাহ (দারিদ্র্য) বলতে বুঝে বস্তুগত সম্পদের অভাবকে, অন্য মানুষের সামনে আনুসঙ্গিক প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে। এখন, অর্থের এই উপলব্ধি নবি সা.-এর দোয়া যা তিনি করতেন দারিদ্র্য জনিত কষ্ট ক্লেশ দূর করে আল্লাহ তায়ালার কাছে নেকি ও সমৃদ্ধ কামনায় তার প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে এবং সাদ রা. এর জন্য তাঁর সা. উক্তি: প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা সেই বান্দাকে ভালোবাসেন (যে) সমৃদ্ধিশালী, তাকওয়াসম্পন্ন এবং আড়ম্বরহীন৪৩ এবং আমর ইবনুল আস রা. এর প্রতি তাঁর সা. উক্তি: একজন পুণ্যবান লোকের হালাল সম্পদ নিঃসন্দেহে অতি উত্তম।৪৪
আপাত মতপার্থক্যের কারণে, এ ব্যক্তি উল্লিখিত হাদিসটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, এখানে আল-মাসকানাহ বলতে ঐ অর্থে দারিদ্র্য বুঝায় না। এটা কিভাবে মনে হতে পারে যে, তিনি সা.-এর থেকে পরিত্রাণের জন্য দোয়া করছেন এবং কিভাবে একই সাথে তা অবিশ্বাসের সাথে একত্রে উল্লেখ করছেন হে আল্লাহ তায়ালা, আমি তোমার কাছে অবিশ্বাস ও দারিদ্র্য হতে আশ্রয় চাই"৪১।
তাঁর প্রভু তাঁকে সমৃদ্ধি দ্বারা পূর্ণ করেছেন এবং তিনি তোমাকে নিঃস্ব পেয়েছেন, অতঃপর ধনশালী করেছেন (সুরা দুহা, ৯৩: ৮)।
আল-মাসকানাহ বলতে তাই বুঝায় যা ইবন আল-আসীর বলেছেন: এর দ্বারা তিনি আল্লাহ তায়ালার সামনে নীচতা এবং হীনতা বুঝিয়েছেন, যাতে মানুষ নির্যাতনকারী ও বেপরোয়া না হয়।
এই হচ্ছে রসুল সা.-এর জীবনযাপন পদ্ধতি- উদ্ধত বেপরোয়াদের জীবন থেকে বহুদূরে। তিনি ক্রীতদাস ও গরিবদের মতো পোশাক পরতেন, তারা যা খেত সেটাই খেতেন এবং যখন কোনো আগন্তুক আসত সে (আগন্তুক) তাঁকে সা. তাঁর সা. সাহাবিগণ থেকে পৃথক করতে পারত না। কারণ তিনি সা. তাদের (সাহাবিদের) সাথে এমনভাবে থাকতেন যে, তাঁকে আলাদা করা যেত না এবং বাড়িতে তিনি সা. নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন; তিনি তাঁর আলখাল্লা জড়াতেন; তাঁর ভেড়ার দুধ দোহন করতেন এবং তিনি সা. তাঁর মহিলা প্রতিবেশী ও দাসের যাঁতা ঘুরিয়ে শস্য পিষে দিতেন।
যখন কোনো লোক তাঁর কাছে আসত, তাঁর ভয়ে ভীত হয়ে কাঁপতে থাকত। তিনি সা. বলতেন, সহজ হও, কারণ আমি রাজা বাদশাহ নই। বরং আমি কুরাইশ বংশের সেই মহিলার সন্তান, যিনি মক্কায় অবস্থানকালে শুকনো গোশত খেতেন।৪২
টিকাঃ
৩৮. এই প্রত্যাখ্যানের বিষয় ঐ সময় পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় এবং আমাদের গ্রন্থ ফাওয়াও মু'আসিরাহ (সমসাময়িক ফতোয়া)'র মধ্যে, ১ম অংশ।
৩৯. প্রাগুক্তে সহিহ আল-বুখারির পক্ষে আমাদের ফতোয়া দেখুন।
৪০. দেখুন সহিহ আল-জামি'আল সাগির, নম্বর ১২৬১। কিছু আলেম অভিযোগ করেছেন যে, এই হাদিসটি যঈফ (দুর্বল)। কিন্তু এটা আয়িশাহ রা. হতে একইভাবে এবং এটা দুটি মাত্র উৎস হতে উদ্ধৃত হয়নি।
৪১. আল-বুখারি ও মুসলিম এটা আয়িশাহ রা. হতে বর্ণনা করেছেন। প্রাগুক্ত নম্বর ১২৮৮
৪২. মুসলিম, আল-তিরমিজি ও ইবন মাজাহ এটা ইবন মাস'উদ হতে বর্ণনা করেছেন। প্রাগুক্ত নম্বর ১২৭৫।
📄 প্রত্যেক শতাব্দীতে দ্বীনের সংস্কার সম্পর্কিত হাদিস
আরেকটি উদাহরণ সেই হাদিস যাতে আবু দাউদ ও আল হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং একাধিক মুহাদ্দিস প্রত্যায়ন করেছেন। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রসুল সা. বলেছেন: প্রত্যেক শতাব্দীর প্রারম্ভে আল্লাহ তায়ালা এ উম্মাহর কাছে একজনকে প্রেরণ করবেন যিনি এই দ্বীনকে সংস্কার করবেন (পুনর্জীবন দান করবেন) ৪৬। কেউ কেউ এই হাদিসটি পাঠ করেন এবং সংস্কার (তাজদিদ) বলতে বোঝেন এমন কিছু যাতে সংস্কারক দ্বীনের উন্নয়ন সাধন এবং একে সময়োপযোগী করার জন্য পরিবর্তন করবেন। তিনি যুক্তি দেন: 'কিন্তু দ্বীন নবায়নের বিষয় নয়, এটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং এর পরিবর্তন ঘটে না। উন্নয়নের সাথে খাপ খাওয়ানো দ্বীনের দায়িত্ব নয়; বরং উন্নয়নেরই দায়িত্ব হচ্ছে দ্বীনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া।
এখন যদি নবায়ন বলতে এমনই বুঝায় যে, প্রত্যেক যুগে (বলতে গেলে) আমাদেরকে দ্বীনের একটি নতুন সংস্করণ-এর নীতিগত ও শিক্ষাগত, পাশাপাশি জনগণের প্রয়োজনের সাথে সংগতিপূর্ণ এবং উন্নয়নের যাত্রাপথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং এটা দ্বীনের সত্যতাকে উল্টিয়ে দেবে, সেক্ষেত্রে এ ধরনের আবেদনপূর্ণ হাদিসকে বাস্তবিকপক্ষেই প্রত্যাখ্যান করা বিধেয়। এই ব্যক্তি সঠিক হতো, যদি আল-তাজদিদ সম্পর্কে তার অভিপ্রায়ের সাথে ব্যাখ্যার মিল থাকত। কিন্তু তা হয়নি। যেমনটা আমি অন্যত্র ব্যাখ্যা করেছি।৪৭ নবায়ন বা সংস্কারের অর্থ হচ্ছে দ্বীনকে এর আকিদা ও আমলসহ উপলব্ধি করা। কোনো কিছুর নবায়ন বা সংস্কারের অর্থ, এমন এক কার্যক্রম গ্রহণ করা, যা দ্বারা সেই জিনিসকে এর উৎপত্তিলাভের চেহারায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় এবং অতঃপর এটা এর প্রাচীনত্ব সত্ত্বেও নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। এটা অর্জন করা যাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া অংশগুলোকে সবল করে এবং সময়ের বিবর্তনে অবনতিশীল বিষয়গুলোকে মেরামত করে এবং ক্ষয়ে যাওয়া স্থানে তালি দিয়ে এমনভাবে, যেন এটি প্রকৃত রূপে ফিরে আসে। অতএব নবায়ন মানে এই নয় যে, প্রাচীন প্রকৃতির পরিবর্তন বা অন্যকিছু দ্বারা স্থানান্তর করা যা অভিনব ও নতুনভাবে সৃষ্ট। নবায়নের ব্যাপারে এভাবে কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই।
এখন আমরা অনুভবযোগ্য বিষয়ের উদাহরণ নিতে পারি। আমরা যদি একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক কাঠামোর নবায়ন করতে চাইতাম, তার অর্থ হতো: এর মালমসলা, এর বৈশিষ্ট্য, ঐসব স্থান মেরামত করতাম যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এর প্রবেশমুখ উন্নত করে, এর সূচনাস্থলের সুবিধা বাড়িয়ে, এর বিশেষত্ব বিস্তারিত করে, ইত্যাদিসহ নবায়ন করতাম। যা আমাদের ধ্বংস করা উচিত তাতে নবায়নের কিছু নেই, বরং তদস্থলে সর্বশেষ স্টাইলের একটি জাঁকজমকপূর্ণ দালান নির্মাণ করাই সংগত।
দ্বীন সম্বন্ধেও একই কথা। এর নবায়ন মানে এর কোনো নতুন সংস্করণ বের করা নয়। বরং এর অর্থ হলো রসুল সা. ও তাঁর সাহাবিগণের সময় দ্বীনের যে রূপ ও ব্যঞ্জনা ছিল সেই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া এবং তাদের মতো করে যাঁরা নিবি ও সাহাবাদের] অনুসরণ করতেন পূর্ণ আন্তরিকতা সহযোগে। এর অর্থ হচ্ছে এর মধ্যে ইজতিহাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠাকরণ এবং এর প্রকৃত ধারায় ফিরিয়ে দেওয়া, গোঁড়ামি ও সাদৃশ্য (তাকলিদ) হতে মুক্ত করা, এর উত্তরাধিকারকে সমালোচনার চোখ দিয়ে পরীক্ষা করা, যাতে এর ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং এর সীমাবদ্ধতার স্থানগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যায়। চিন্তাধারায় নবায়ন/সংস্কার হচ্ছে আরেক ধরনের সংস্কার এবং তা হচ্ছে দ্বীনী আকিদার সংস্কার, এর মহামূল্যবান মূল্যবোধের ও নীতিমালার প্রতি উৎসর্গিত হওয়া, এর প্রতি দাওয়াতকে যুগের অবস্থা ও চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ করা, যেমন এসেছে হাদিসে: ইমান তোমাদের অন্তরে জীর্ণ হয়ে যায়, যেমন বহির্বাস ছিঁড়ে যায় (তোমাদের বাইরে)।৪৮
অতএব, আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করো, যাতে তিনি তোমাদের ইমানকে নবায়ন করে দেন।
টিকাঃ
৪৬. কিতাব আল-মালাহিম (যুদ্ধ) অধ্যায়ে তার সুনানে আবু দাউদ এটা বর্ণনা করেছেন, নম্বর ৪২৭০, আল-হাকিম আল-মুসতাদরাক মধ্যে (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫২২); আল-বায়হাকি মা'রিফাত আল-সুনান ওয়া আল-আসার গ্রন্থে এবং অন্যরা। আল-ইরাকী এর সত্যায়ন করেছেন এবং আল-সুয়ূতি এটি ফায়িদ আল-কাদির খণ্ড ২, ২৮২ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত করেছেন।
৪৭. দেখুন, আমাদের গবেষণা; তাজদিদ আল-দীন ফি দাঅ'আল-সুন্নাহ্ (২য় সংস্করণ, কাতার: মারকাজ বুহুত আল-সুন্নাহ্ ওয়া আল-সিরাহ), পৃষ্ঠা-২৯। আমার বই: মিন আজলি সাহওয়া রাশিদা (বৈরুত: আল-মাকতাব আল-ইসলামি) তেও মুদ্রিত হয়েছে।
৪৮. আল-তাবারানি ও আল-হাকিম ইবন'আমর হতে এটা বর্ণনা করেছেন। উদ্ধৃত হয়েছে সহিহ আল-জামি'আল-সাগির'র মধ্যে।
📄 ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত
অপর্যাপ্ত বুঝের ফলে আমাদের সময়ে সহিহ হাদিস প্রত্যাখ্যানের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ এই যে, কিছু লোক অত্যন্ত মশহুর হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছে- এর একটি মুসলিম যুব সম্প্রদায় ও বয়স্কগণ, সাধারণ ও এলিট সম্প্রদায় মনে রেখেছে এবং এটা হচ্ছে ইবনু উমার ও অন্যান্যের (বর্ণিত) হাদিস: ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত-এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রসুল; সালাত কায়েম করা; জাকাত প্রদান করা; রামজানের সিয়াম পালন এবং যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার ঘরে [কাবায়] হজ করা।
এ হাদিসটি প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে দুঃসাহসী হঠকারিতার কারণ হচ্ছে, এই হাদিসে জিহাদের উল্লেখ নেই, ইসলামে এর (জিহাদের) বিশাল গুরুত্ব সত্ত্বেও এবং এটিই হচ্ছে এ হাদিসটি প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি।
এই দৃষ্টিভঙ্গি এই অপরিহার্য সত্যতা সম্পর্কে অজ্ঞতা হেতু যে, জিহাদ কিছু সংখ্যক লোকের জন্য অবশ্য কর্তব্য, অন্যদের জন্য নয়; এটা বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত কোনো ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয় অধিকাংশ নির্দিষ্ট বিবেচনায়। এটি পাঁচটি ভিত্তির থেকে খুবই ভিন্ন।
হাদিসটি প্রত্যাখ্যানকারীদের কারো যুক্তি যদি শুদ্ধ হতো, তাহলে তা কুরআনের ঐ সমস্ত আয়াতকে প্রত্যাখ্যান/বাতিল করা অনিবার্য করে তুলত, যেগুলোতে ইমানদারদের উত্তম বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা রয়েছে : যারা আল্লাহভীরু, দয়ালু মেহেরবানের দাসানুদাস, পুণ্যবান ও সৎ, উত্তম আমলকারী, যাদের আধ্যাত্মিক দীপ্তি রয়েছে এবং রয়েছে অন্যান্য গুনা যা নিয়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর গ্রন্থে সবিশেষ প্রশংসা করেছেন এবং তাদের জন্য প্রভৃত প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এসব উত্তম গুণাবলীর মধ্যে তিনি জিহাদকে অন্তর্ভুক্ত করেননি।
এসবের ওপরে পাঠ করুন সুরা বাকারার প্রথম দিকের আয়াতসমূহে (সুরা বাকারা, ২: ২-৫) আল্লাহ তায়ালা ভীরুদের গুণাবলী, পূণ্যবান ও সত্যনিষ্ঠদের সম্পর্কে এতে কোনো কল্যাণ নেই... (সুরা বাকারা, ২: ১৭৭); সুরা আল-আনফালের শুরুতে (৮: ২-৪) ইমানদারদের গুণাবলী; ঐ সমস্ত ব্যক্তির গুণাবলী যাদের রয়েছে আত্মিক উৎকর্ষ, সুরা আর-রা'দে (১৩: ২০-২২); বিশ্বাসী ও ফেরদাউস (জান্নাতের) এর উত্তরাধিকারীগণ সম্পর্কে সুরা মুমিনের প্রারম্ভে (২৩: ১-১০); সুরা ফুরকানের শেষদিকে (২৫ : ৬৩-৭৭) দয়াময়ের দাসদের গুণাবলী সম্পর্কে; আল্লাহভীরু ও নেক আমলকারীদের সম্পর্কে সুরা আয-যারিআতে (৫১: ১৫-২৩); আল্লাহর জান্নাতে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে সুরা আল-মাআরিজে (৭০: ২২-৩৫)।
এসবের কোনো আয়াতে জিহাদের উল্লেখ নেই। তাহলে যে ব্যাপক অজ্ঞতার ফলে হাদিসটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে তা কি কুরআন থেকে এসব আয়াতকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে?
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ উল্লিখিত পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলামের প্রতিষ্ঠার ব্যাখ্যায় কিছুদূর অগ্রসর হয়েছেন এবং কেন অন্যান্য মৌলিক কর্তব্য উল্লেখ করা হয়নি, যেমন জিহাদ অথবা পিতামাতার প্রতি যত্ন আত্তির পূণ্য, নিকটাত্মীয়দের হক এবং এধরনের অন্যান্য বিষয়-এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, যা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তা এই: আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতি যেগুলো ফরজ করেছেন সেই বাহ্যিক আমলসমূহের সংখ্যা যদি পাঁচ-এর অধিক হয়, তিনি কেন এটা বলেছেন: ইসলাম কি এই পাঁচটি? কিছু লোক উত্তর দিয়েছে যে, এগুলো [পাঁচটি] হচ্ছে ইসলামের অধিকতর দৃশ্যমান এবং অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতীক এবং বান্দা কর্তৃক এগুলো সম্পাদিত হলে তার ইসলাম পরিপূর্ণ হলো এবং এগুলো পরিত্যাগ করার অর্থ হলো, ইসলামে তার বাধ্যবাধকতার সীমা হতে বিচ্যুত হওয়া।
আরো সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো: রসুল সা. সেই দ্বীন সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যা বান্দাকে পুরোপুরি তার প্রভুর প্রতি আত্মসমর্পিত করবে, যথা আল্লাহ তায়ালার হক বান্দার উপর, তা হচ্ছে বান্দা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে। সুতরাং তিনি প্রত্যেকের জন্য এই কর্তব্য স্থির করেছেন যে, সামর্থ্য অনুসারে সে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করবে এবং দ্বীনকে পুরোপরি তাঁরই জন্য খালেস করবে।
বরং এই সব ভিন্ন ফরয গঠিত হয় যৌথ দায়িত্ব সাপেক্ষে - যেমন জিহাদ এবং ভালোকাজের আদেশ এবং খারাপ কাজ থেকে বিরতকরণে এবং যা (প্রয়োজনে) কর্তৃত্বের মাধ্যমে এবং শাসন ও আইনগত তথ্য প্রদান [পাণ্ডিত্যপূর্ণ বা দার্শনিক), অনুসন্ধান এবং হাদিসের প্রচার এবং অন্যান্য এমন ধরনের কর্তব্য দ্বারা।
অথবা ঐসব কর্তব্য যেগুলো ব্যক্তির হক সংক্রান্ত বিষয়ে আবশ্যকীয়। ঐ হক দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়, যার ওপর এটা পালন করা ফরয। যেমন এক ব্যক্তির হক অন্য ব্যক্তির হককে নির্ধারণ করে, যার জন্য ঐ হক কর্তব্যে পরিণত হয়।
তারপর রয়েছে আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের অধিকারসমূহ। উদাহরণস্বরূপ : ঋণ সাব্যস্তকরণ, অন্যায় দখল থেকে [বস্তু] পুনরুদ্ধার এবং ঋণের বিষয় এবং নিরাপদ রক্ষণের গ্যারান্টি এবং রক্ত সম্পর্ক, সম্পদ ও জমিজমা সঠিকভাবে পুনরুদ্ধার করা।
বাস্তবিকপক্ষে এগুলো ব্যক্তিমানুষের অধিকার এবং যখন তারা তাদের থেকে এসব অধিকার অবমুক্ত করে, এই অধিকারসমূহ বাতিল হয়ে যায়, এক জনের বাধ্যবাধকতায় থাকে, অন্যের নয়। একটা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে অন্যটি নয়। এগুলো প্রতিটিই প্রত্যেক বান্দার জন্য বাধ্যতামূলক নয়, যেমনটা আল্লাহ তায়ালার নির্ভেজাল ইবাদত। এ কারণেই মুসলিমরা এসব ক্ষেত্রে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অংশীদার হয়। এই পাঁচটি স্তম্ভ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বাধ্যবাধকতা, কারণ প্রকৃতই এগুলো মুসলিমদের পার্থক্যকারী।
একইভাবে রক্ত সম্পর্কের বন্ধনকে সম্মান করা। স্ত্রী, সন্তান, প্রতিবেশী এবং ব্যবসায় অংশীদার ও গরিবদের অধিকারকে সম্মান জানানো বাধ্যতামূলক এবং প্রশংসা বর্ণনাকে সম্মান দেখানো অবশ্য করণীয় এবং আইনী নির্দেশ জারি করা; রায় প্রদান করা; শাসন করা এবং ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দকাজ থেকে বিরত করা এবং জিহাদ : এগুলো সবই শর্তযুক্ত ঘটনাক্রমে অবশ্যই পালনীয় কিছু সংখ্যকের ওপর ও সবার জন্য নয়। এই ধরনের কর্তব্য বিরাজ করে উপকার প্রাপ্তি আকর্ষণ করতে বা ক্ষতি এড়াতে; যদি এ লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয় এক ব্যক্তির কাজের মাধ্যমে, তাহলে এগুলো বাধ্যতামূলক থাকবে না। এজন্য যা লোকদের মধ্যে ভাগাভাগি করা যায় তা সম্মিলিতভাবে বাধ্যতামূলক এবং যা একক তা একজন বিশেষ ব্যক্তি, যেমন : জায়িদের জন্য বাধ্যতামূলক, অন্য ব্যক্তি আমর'র জন্য নয়।
প্রত্যেক যোগ্য ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য কর্তব্য পালনে সকলের অংশগ্রহণ নিষ্প্রয়োজন, ঐ পাঁচটি ব্যতীত। কারণ বাস্তবেই যায়িদ এবং তার নিকটাত্মীয়গণ আমরের স্ত্রী ও তার নিকটাত্মীয় নয়, সুতরাং এটা এই একটির জন্য বাধ্যতামূলক নয় যেমন এই অন্যটির জন্য বাধ্যতামূলক। পৃথক হচ্ছে রামাজানে সিয়াম এবং কাবায় হজ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং জাকাত। বাস্তবিকপক্ষে জাকাত, যদিও সম্পত্তির ওপর অধিকার, তথাপি এটা আল্লাহ তায়ালার প্রাপ্য এবং আট প্রকার [গ্রাহক] মাত্র হচ্ছে এর আইনসম্মত ব্যয়ের খাত। এ কারণেই এখানে নিয়াত বাধ্যতামূলক এবং এটা অনুমতিযোগ্য নয় এজন্য যে অন্য ব্যক্তি এটা করে [যেমন জাকাতের কর্তব্য পালন করা] তার অনুমতি ব্যতিরেকে এবং কেন এটা অবিশ্বাসীগণ দাবি করেন।৪৯
টিকাঃ
৪৯. ইবন তাইমিইয়াহ'র মাজমু'আল-ফাতাওয়া কিতাবের খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩১৪-১৬ তে কিতাব আল-ইমান অধ্যায় হতে।