📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 আইন প্রণয়ন ও নির্দেশনার উৎস

📄 আইন প্রণয়ন ও নির্দেশনার উৎস


ইসলামের আইন প্রণয়ন ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে সুন্নাহ্ হচ্ছে দ্বিতীয় উৎস। ফকিহগণ এদিকেই আলোকপাত করেন আইনী আদেশ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে। একইভাবে প্রচারক ও শিক্ষকগণও এমন করেন এর থেকে উৎসাহব্যঞ্জক অর্থ, মূল্যবান নির্দেশনা এবং গভীর জ্ঞান বের করার জন্য। সেই সাথে লোকদেরকে কল্যাণকর কাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং অকল্যাণের কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য।
সুন্নাহ্ যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালন করতে পারে সেজন্য যে কোনো ব্যক্তি অবশ্যই একে অধিকতর মূল্য দেবে রসুল সা. হতে উৎসারিত বলে প্রমাণিত হলে। এটা হাদিস বিজ্ঞানের বাগধারার মধ্যে সহিহ (বিশুদ্ধ, নির্ভরযোগ্য) বা হাসান (উত্তম) হাদিসরূপে সত্যায়িত। সহিহ হচ্ছে অতি উত্তম বা খুব ভালো (যেহেতু এমন শব্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির জন্য বোধগম্য); হাসান হচ্ছে ভালো যা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের। এর বাইরে হাসান-এর উচ্চতর পর্যায়কে 'সহিহ'র কাছাকাছি গণ্য করা হয়; একইভাবে এর নিম্নতর পর্যায়কে যঈফ (দুর্বল) এর নিকটতর বিবেচনা করা যায়।
সহিহ হাদিস এমন হাদিসকে বলা হয় যার বর্ণনাকারী তার সততার জন্য সুপরিচিত এবং অন্য বর্ণনাকারী থেকে শুনে স্মৃতিতে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার পূর্ণতার জন্যও। এটা হতে হবে সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, এর মধ্যে কোনো শূন্যতা বা বিচ্ছিন্নতা থাকবে না এবং যখন তা রসুল সা.-কে সংযুক্ত করবে। একটি সহিহ হাদিস অনিয়ম ও ত্রুটি থেকেও মুক্ত।
এভাবে কেউ ঐ হাদিসকে গ্রহণ করবে না যা অপরিচিত উৎসের কোনো বর্ণনাকারী বা তার অপরিচিত অবস্থা বর্ণিত হচ্ছে, কিংবা যার সততা বা সংরক্ষণে পূর্ণতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, বা যদি তার সাথে অন্য বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় বিচ্ছিন্নতা কিংবা শূন্যতা থাকে। কিংবা তার দ্বারা বর্ণিত হাদিসটি অনিয়মিত হয়, যার ফলে সেটা তার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অন্য কারো নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিরোধী হয়, অথবা ঐ হাদিসে যদি ত্রুটির কোনো চিহ্ন থাকে কিংবা অন্যকিছু আপত্তিকর থাকে এর সনদ বা এর মতনে (মূলপাঠের প্রতিবেদন থাকলে)।
যে লোকেরা তা পৌঁছে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে কারো যেন এমন ধারণা না থাকে যে, উম্মতের আলেমগণ এমনকিছু গ্রহণ করেছেন, তা তাদের কাছে নিয়ে যেই আসুক না কেন, যেমন কেউ তাদের কাছে এসে বলল 'অমুক এবং অমুক থেকে অমুক এবং অমুক, তারপর আল্লাহর রসুল থেকে এবং তার উত্তর দিলেন: তুমি সত্য বলেছ!
বরং প্রকৃত কথা হচ্ছে, যারাই তাদের কাছে হাদিস নিয়ে এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের সম্বন্ধেই তারা অবশ্যই কতকগুলো প্রশ্ন রেখেছেন: (ক) তিনি কোন ঘরানার আলেম বা ছাত্রদের অন্তর্ভুক্ত? (খ) তার শিক্ষক কারা? (গ) তার সহপাঠী ছাত্র কারা, হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়নের সময় কে তার সাথে ছিলেন? (ঘ) তার শিক্ষক, সঙ্গীসাথী ও ছাত্রদের দৃষ্টিতে তার চরিত্র ও আচরণ কেমন? (ঙ) লোকেরা কি তার সততা ও তার আল্লাহ তায়ালাভীতি (তাকওয়া) সত্যায়ন করে থাকে? (চ) সংরক্ষণে কি ধারাবাহিকতা রয়েছে? (ছ) তিনি কি জীবনভর এটা অব্যাহত রেখেছেন অথবা জীবনের শেষ বছরগুলোতে পরিবর্তন করেছেন? (জ) তার বৃদ্ধ বয়সে তার ছাত্রদের মধ্যে কে কে তার কাছে পড়াশোনা করেছেন এবং (ঝ) তার পরিবর্তনের পূর্বে কে তার অধীনে অধ্যয়ন করেছেন? এবং এভাবে আরো।
উম্মাহর বিশিষ্ট আলেমগণ একমত হয়েছেন, যেসব হাদিস আমলের ক্ষেত্রে আইনী হুকুম হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়, যা ফিকহশাস্ত্রের স্তম্ভ বিশেষ এবং হালাল ও হারামের ভিত্তি, সেগুলোকে অবশ্যই সহিহ বা হাসান হতে হবে। তবে, যেসব হাদিস আমলের উন্নতির সাথে সম্পৃক্ত বা দোয়া, যা হৃদয়কে নরম করে, তারগিব (আল্লাহ তায়ালার প্রতি স্পৃহা বৃদ্ধি করে) বা তারহিব (আল্লাহ তায়ালার ভয় বৃদ্ধি করে) এবং এধরনের অন্য কিছু, যেগুলো অবিসংবাদিতভাবে আইন প্রণয়নের শিরোনামে আসে না, সেগুলোর ব্যাপারে তারা ভিন্নমত পোষণ করেন।
প্রাথমিক যুগের বিদ্বান আলেমগণ (সালাফ) এর মধ্যে কেউ কেউ এমন ছিলেন, যাদেরকে এই ধরনের বর্ণনার হাদিস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং এগুলো প্রচারে কোনো ক্ষতি লক্ষ্য গোচর হয়নি। তবে এই অব্যাহতি নিরঙ্কুশ নয়, যেমনটা কেউ কেউ মনে করেন। বরং এর জন্য ক্ষেত্র ও যুক্তি রয়েছে। তবে, অনেকেই এই অব্যাহতির মানের অপব্যবহার করেছেন (কারণ হাদিসগুলো আইন দ্বারা স্থিরীকৃত আমলের সাথে জড়িত নয়), তাই সরল পথের উল্টো এবং দুষ্ট লোকেরা নির্ভেজাল ইসলামের প্রশস্ত পথকে দূষিত করেছে।
বাণী প্রচারের কিতাবাদি যা কিছু অন্তরকে কোমল করে, সুফিবাদের গ্রন্থসমূহে এই সব ধরনের হাদিস প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। তবে, আমরা এই মত পোষণ করি যে, এগুলোর অধিকাংশই দুর্বল ও অশুদ্ধ হাদিসে ভারাক্রান্ত। বরং বলা যায়, এসব পুস্তকে এমন উক্তি অনুসরণ করা হয়েছে যার কোনো উৎস বা সনদ নেই, এগুলোর মধ্যে কতকগুলো এমন যা বিরোধপূর্ণ এবং আল্লাহর রসুল সা.-কে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। মুহাদ্দিসগণ এসব হাদিসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এবং এমন গ্রন্থ সংকলন করেছেন যা স্পষ্টভাবে ওদের কৃত্রিমতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।
মুহাদ্দিসরা এধরনের দুর্বল বা মিথ্যা বর্ণনা নিষিদ্ধকরণে সর্ববাদীসম্মত মতে উপনীত হয়েছেন, তাদের (ব্যক্তিগত) মিথ্যাচার ও অসারতা উন্মুক্ত করা ব্যতীত। তাদের কাজের ফলে সর্বসমক্ষে এগুলোর আর কোনো প্রচার হয়নি।
একই ধরনের অসার ও বাতিল বর্ণনা তাফসিরের অনেক কিতাবেই দেখা যায়, এটা এমন হয়েছে যে, তারা অভ্যাসবশতই এসব কুখ্যাত জাল বর্ণনা কুরআনের নির্দিষ্ট সুরাসমূহের ক্ষেত্রে করেছে। তারা এমনটা করেছে এমনকি 'হাদিস বিশেষজ্ঞ (হুফ্ফায) গণ এর দুর্বলতা প্রকাশ এবং অসারতা ব্যাখ্যা করা সত্ত্বেও, যাতে পরবর্তীতে কেউ এসব বর্ণনা করতে কিংবা তার বইয়ের পৃষ্ঠাসমূহ এর দ্বারা মসীলিপ্ত করতে না পারে। এতদসত্বেও আল-যামাখশারী, আল-সা'আলিবী, আল-বায়যাভী, ইসমাঈল হাক্কী প্রমুখ মিথ্যা হাদিস উপস্থাপনের কাজ অব্যাহত রেখেছেন।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 জাল হাদিসের পক্ষে প্রদত্ত অপযুক্তি খণ্ডন

📄 জাল হাদিসের পক্ষে প্রদত্ত অপযুক্তি খণ্ডন


এ ধরনের জাল হাদিস উপস্থাপনার চেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে একজন কুরআনের ভাষ্যকার খুঁজে বের করা। উদাহরণস্বরূপ, রূহ আল-বায়ান-এর রচয়িতা হাদিস উদ্ধৃতকরণকে যুক্তিসম্মত করতে এবং তা রক্ষা করতে ইচ্ছুক। এই গ্রন্থকার, সুরা আত-তাওবার তাফসিরের শেষের দিকে বেপরোয়াভাবে বর্ণনায় এতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন একথা বলে:
জেনে রাখুন, আল-কাশাফ এর গ্রন্থকার এই সুরার শেষে যা উদ্ধৃত করেছেন সেসব হাদিস সম্পর্কে (এবং আল-কাযী আল-বায়যাভী এবং আল-মাওলা আবু আল-সা'উদ তাকে অনুসরণ করেছেন [একাজে], আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে দয়া করুন, যারা কুরআনের ভাষ্যকারদের প্রধান), বিদ্বান আলেমগণ প্রায় আলোচনায় (থাকতেন) [এবং মতবিরোধেও] কোনো কোনো পণ্ডিতের সাথে যারা (ঐসব হাদিস) প্রত্যয়ন করতেন, অন্যরা তা মিথ্যা হওয়ার ভিত্তিতে বাতিল করতেন, ইমাম আল-সাঘানী এবং অন্যদের মতো।
এই হতভাগ্য আল্লাহ তায়ালার বান্দার জন্য যা দৃশ্যমান, তার জন্য যা প্রাপ্য তাতে আল্লাহ তায়ালা দয়া করুন, তা হলো ঐ হাদিসসমূহকে হয় বিশুদ্ধ না হয় শক্তিশালী হতেই হবে, অথবা হতে হবে দুর্বলকৃত বা দুর্বল, অথবা মিথ্যা বা বানোয়াট।
যদি ঐগুলো বিশুদ্ধ ও সবল হয়, তাহলে ওগুলোর ব্যাপারে কোনো আলোচনা [যথাযথ ও প্রয়োজনীয়] নয়। কিন্তু যদি ওগুলোর সনদ দুর্বল হয় তখন হাদিসবেত্তাগণ একমত যে, দুর্বল হাদিসের উপর তারগিব ও তারহিবের জন্য কাজ করা অনুমোদিত, যেমনটা আল-নববী'র আল-আযকার, আলী ইব্‌ন বুরহান আল- দীন আল-হালাবী'র ইনসান আল-উয়ূন এবং ইবন ফখর আল-দীন আল-রুমী'র আল-আসরার আল-মুহাম্মাদীয়‍্যা এবং অন্যান্য (কিতাব)।
ঐগুলো যদি জাল করা হয়, সে ক্ষেত্রে আল-হাকিম ও অন্যরা উল্লেখ করেন যে, সাধকদের মধ্য হতে একজন লোক কুরআন এবং এর সুরাসমূহের পবিত্রতার ওপর কিছু হাদিস রচনার দায় গ্রহণ করেন এবং এরপর তার কাছে বলা হলো: আপনি কেন এটা করেন? সে বলল, আমি দেখলাম লোকদেরকে কুরআন অস্বীকার করতে এবং আমি ইচ্ছা করলাম তাদেরকে এর প্রতি উৎসাহিত করতে। তখন তাকে বলা হলো, নবি সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি কোনো মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা করে নিল। তারপর সে বলল, আমি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বলিনি; বরং আমি তাঁর সা. জন্য মিথ্যা বলেছি।
সে ব্যক্তি বুঝাল: তাঁর সা. বিরুদ্ধে ঐ মিথ্যাচার নিয়ে গেছে ইসলামের ভিত্তিকে ধ্বংসের দিকে এবং তুচ্ছ প্রতিপন্ন করেছে হুকুম আহকাম ও বিধিবিধানকে এবং এটা অন্যটির জন্য মিথ্যা বলার মতো নয়। অর্থাৎ তাঁর জন্য মিথ্যা বলা হচ্ছে তাঁর আইন অনুসরণে উৎসাহিতকরণ এবং তাঁর পথে বা তাঁর গতিপথে চলার জন্য। শাইখ 'ইয্য আল-দীন ইবন আবদুস সালাম বলেন: কথা বলা হচ্ছে লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার উপায়। অতঃপর প্রত্যেক প্রশংসনীয় উদ্দেশ্যে লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে দুটোর যেকোনো একটির সাহায্যে-সত্য [বলা] এবং মিথ্যাচার [করা]। মিথ্যাচার [করা] নিষিদ্ধ। অতঃপর যদি মিথ্যাচার করে লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব হয় এবং সত্য বলে তা সম্ভব না হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা বৈধ (মুবাহ)। শর্ত, ঐ লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার অনুমতি থাকতে হবে এবং এটা বাধ্যতামূলক [ওয়াজিব) হবে, যদি লক্ষ্য বাধ্যতামূলক হয়। সুতরাং এটা হচ্ছে এ ধরনের অবস্থার নিয়ন্ত্রক নীতি।
এখানে আমরা সাহায্য করতে পারি না, কিন্তু একথা বলে আমাদের বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারি-লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ এবং 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন: আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কারো কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই এবং আমরা আল্লাহ তায়ালারই জন্য এবং তাঁর কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।
আল্লাহ তায়ালার কিতাবের ভাষ্যকার হিসেবে একজন স্বেচ্ছাতালিকাভুক্ত ব্যক্তি থেকে এই প্রবন্ধ পুস্তকের মতোই আরেকটি পুস্তক প্রকাশিত হয় ঔদ্ধত্যের সাথে, নীতিবহির্ভূতভাবে। কোনো কোনো লোক তাকে ফকিহ (আইনবিদ যিনি ইসলামের আইনকানুন বুঝেন) এবং উসূলী (ফিকহ'র উসূল বা নীতির ব্যাপারে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন) বলে বর্ণনা করেন! কিন্তু কি ধরনের অভিজ্ঞতা (ফিকহ) এই লোকটির রয়েছে, প্রকৃত আলেমদের মতে, প্রাথমিক বিষয়বস্তু সম্বন্ধেই যে অজ্ঞ? এই শেখ (তার একটি সুফি ঝোঁকপ্রবণতা রয়েছে) জানে না যে, আল্লাহ তায়ালা এই দ্বীনকে আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং সেহেতু আমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত সম্পূর্ণ করেছেন, সুতরাং আমরা কোনো প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করি না যে, কেউ আমাদের জন্য নিজ থেকে হাদিস বানিয়ে এটাকে পরিপূর্ণতা দান করবে। যদি বলা হয় যে, সে স্পর্ধা দেখায় আল্লাহ তায়ালাকে সংশোধন অথবা তাঁর রসুল সা. কে শক্তিশালী করার জন্য; ফলত: সে রসুল সা. কে বলে 'আমি আপনার জন্য মিথ্যা বলি যাতে আপনার দ্বীনের সীমাবদ্ধতা পরিপূরণ করা যায় এবং আমার তৈরি করা হাদিস দ্বারা এর শূন্যতা পূরণ করি।
ইবন আবদুস সালামের বক্তব্য অনুযায়ী এটা গ্রহণ করা হয়েছে পুরাপুরি অপ্রাসঙ্গিকভাবে। যা কিছু এটা অনুমোদন করে তা হলো নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট ধরনের কথা, যেমন, যুদ্ধে চাতুর্য অবলম্বন এবং দুই দলের মধ্যে শান্তি স্থাপন এবং অত্যাচারীর কাছে থেকে পলায়মান ব্যক্তিকে সহায়তা দেওয়া এবং ঐ ধরনের অন্যান্য ব্যবস্থা যা এ প্রসঙ্গে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেকোনো ক্ষেত্রে ইবন আবদুস সালামের বক্তব্য নিজেই এই দাবিদারের দাবিকে খণ্ডন করে। কারণ ইবন আবদুস সালাম বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক প্রশংসামূলক লক্ষ্য যা সত্য এবং মিথ্যা উভয় ধরনের কথা বলেই অর্জন করা যায়, সেক্ষেত্রে মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ। সুতরাং এখানে এই আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলতে পারেন- যদি সব কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য যা জাল হাদিস দ্বারা প্ররোচিত এবং সকল অস্বীকৃত লক্ষ্য যা হতে তারা নিবৃত্ত হয়েছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে সহিহ ও হাসান হাদিস দ্বারা অর্জনের যোগ্য, তাহলে মিথ্যাচার নিষিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে এটা হচ্ছে বিরাট বিরাট পাপের মধ্যে সর্ববৃহৎ।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 সহিহকে প্রত্যাখ্যান করা জালকে গ্রহণ করার সমান

📄 সহিহকে প্রত্যাখ্যান করা জালকে গ্রহণ করার সমান


বাতিল ও জালকৃত হাদিস গ্রহণ এবং তা রসুল সা.-এর সাথে জুড়ে দেওয়া একটি বড় অপরাধ। সেটা ঘটে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুল সা.-এর চেয়ে বেশি জানার উদ্ভট দাবি ও অহংকার থেকে। এমন কাজ একটি মন্দ অনুমানকে উম্মাহর জন্য অনিবার্য করে তোলে; এর আলেমগণ, এর সর্বোত্তম যুগের নেতৃবৃন্দ এবং মহান শীর্ষ ব্যক্তিগণের জন্যও। অতীত কালে জনগণের বৃহদাংশে দুর্বল ও জাল হাদিস গ্রহণের প্রবণতা ছিল। বর্তমান সময়ে, সাধারণ লোকদের মধ্যে অনেকেই কোনো জ্ঞান, কোনো নির্দেশনা (হিদায়াত) এবং কোনো আলোকিত গ্রন্থ ছাড়াই প্রমাণিত হাদিসসমূহ বর্জন বা বাতিল করার প্রবণতাসম্পন্ন। আমরা সাধারণ লোকজন বলতে অশিক্ষিত এবং তাদের মতো লোকদের বুঝাচ্ছি না- কারণ তারা (সাধারণ লোকেরা) ঐ লোকদের মতো নয় যারা ঠিকমতো না জেনেই নিজেদের জ্ঞানী বলে জাহির করে। আমরা সাধারণ লোক বলতে বুঝিয়েছি কেবলমাত্র আত্মম্ভর ও প্রতারক লোকদেরকে-যারা কখনও দরজা দিয়ে বাড়ির বাইরে বের হয় না (অর্থাৎ যারা ঘোরপ্যাঁচ ও জটিলতা পছন্দ করে), যারা কখনও সূত্র উল্লেখ করে জ্ঞানকে শক্তিশালী করে না, যারা জ্ঞানের খোসার দিক জানে, মধ্যম পর্যায়ের সূত্র থেকে হাতিয়ে নেয়, অথবা প্রাচ্যবিদ ও মিশনারী বা তাদের মতো লোকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সহিহ হাদিসকে বাতিল করা দ্বীনের মধ্যে বাতিল হাদিসকে গ্রহণ করার মতো।
যা দ্বীনের নয় সেই মিথ্যা হাদিস এর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে; বিশুদ্ধ হাদিসকে প্রত্যাখ্যান দ্বীনকে তার মূল থেকে বের করে নেয়। নিঃসন্দেহে, উভয়ই নিন্দনীয় ও একইভাবে তিরস্কারযোগ্য।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 সুন্নাহর পুরাতন শত্রুদের সন্দেহ

📄 সুন্নাহর পুরাতন শত্রুদের সন্দেহ


প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধবাদী ও উদ্ভাবকগণ সুন্নাহকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে সন্দেহ ও অভিযোগ উত্থাপন করে আসছে। বিদ্বান আলেমগণ ও সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তিগণ তাদেরকে পর্যদস্ত ও হতাশ করার জন্য তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমন একজন বিদ্বান আলেম ছিলেন আল-শাতিবী।
ইমাম আল-শাতিবী বলেন: বিরুদ্ধবাদী উদ্ভাবকদের বিদ্রোহের মধ্যে [নির্দিষ্ট] উপদলগুলো একসময় হাদিস প্রত্যাখ্যানকে বৈধতা দেয় [এই যুক্তি দ্বারা] যে, তারা ঐগুলো পেয়েছে তাদের অনুমানের মধ্যে এবং এটাকে কুরআনে ভৎর্সনা করা হয়েছে-যেমন রয়েছে মহীয়ান আল্লাহ তায়ালার কালামে:
তারা তো অনুমান আর প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে (সুরা নাজম, ৫৩: ২৩)
এবং
তারা কেবল অনুমানেরই অনুসরণ করছে এবং প্রকৃত সত্যের মোকাবেলায় অনুমান কোনোই কাজে আসে না (সুরা নাজম, ৫৩: ২৮)।
এবং [অন্য সুরায়] এর অর্থ এসেছে [তারা যুক্তির এই অবস্থানে এসে অতিশয়োক্তি করে]। ঐ পর্যন্ত যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসুল সা.-এর জবানে যা নিষিদ্ধ করেছেন, যদিও কুরআনের মূলপাঠে তা নিষিদ্ধ হয়নি। তাই তারা এর অনুমতি দিয়েছে। তারা তাদের মনের কিছু ধারণাকে গ্রহণীয় করার জন্য এটা করেছে।
এই সব আয়াতে এবং হাদিসেও অনুমান বলতে তাই বুঝানো হয়েছে, যা তাদের ওজর বা দাবি ছিল। আমরা দেখেছি যে, এর তিনটি উপায় আছে:
প্রথমত দ্বীনের উসূল (মূলনীতি বা বুনিয়াদ) সম্বন্ধে অনুমান। আলেমদের মতে এর কোনো প্রয়োগ নেই, কারণ সত্যের সম্ভাব্য বিরোধিতা করা হয়েছে অনুমানকারীর অনুমানে। সংজ্ঞানুযায়ী অনুমান হয় সত্য না হয় মিথ্যা; এর মিথ্যা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা একে আইনের বুনিয়াদ তৈরিতে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে। ফুরুয়ি' [আইনের শাখা বা আইন থেকে উদ্ভূত বিষয়াদি) ব্যাপারে অনুমান ভিন্ন বিষয়। কারণ, আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সাক্ষ্যদ্বারা প্রদর্শনের ফলে কার্যকর হয়। সুতরাং ফুরূয়ি বিষয় না হলে অনুমান নিন্দনীয় এবং এটা বিদ্বান আলেমগণ উল্লেখ করেছেন [অর্থাৎ তারা আইনের বিশদ আলোচনার ক্ষেত্রে শর্তযুক্তভাবে অনুমানের ভূমিকা অনুমোদন করেছেন, এর মূল বিষয়াদির ক্ষেত্রে নয়]।
দ্বিতীয়ত, দুটি পরস্পরবিরোধী সম্ভাবনার মধ্যে অনুমান [একটির জন্য] কোনো প্রকার প্রদর্শনী ছাড়াই অন্যটিকে অগ্রাধিকার দেয়। [সেখানে] কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি নিন্দনীয়, কারণ এটি একটি এক তরফা রায়। ঐ কারণে এই আয়াতে অনুমান নিজ প্রবৃত্তি'র অনুসারী বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার বাণী: তারা তাদের অনুমান ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। সুতরাং তারা সংস্কার ও খেয়ালখুশি ছাড়াই কোনো বিষয়ে ঝুঁকে পড়ে। যে অনুমানের পর্যায়গুলো প্রদর্শিত হয় তা ভিন্ন। তারপর তা [ঘটনাসমূহের] সাধারণত্বের ক্ষেত্রে নিন্দনীয় নয়, কারণ এটা নিছক খেয়াল খুশির জন্য বেরিয়ে আসে। ঐ কারণে, এটা নিশ্চিত করা হয় এবং কার্যকর হয়, এর চাহিদামতো, যখন এটা কাজের উপযুক্ত মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ফুরূয়ির ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে থাকে।
তৃতীয়ত, অনুমান দুই রকমের হয় [১] ঐ সমস্ত অনুমান যা সুনির্দিষ্ট নীতির ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হচ্ছে সেই অনুমান, যেগুলো প্রয়োজনমতো আইনের ওপর কাজ করে, কারণ এ ধরনের অনুমান একটি সুপরিচিত নীতির ওপর নির্ভরশীল এবং এটা সেই শ্রেণিভুক্ত যা সুবিদিত এবং [২] এমন অনুমান যা সুনির্দিষ্ট নীতির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি নীতি ছাড়া অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল এবং এটি নিন্দনীয়। যদি এটা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়, যা এর মতোই অনুমান এবং যদি ঐ অনুমানও সুনির্দিষ্ট নীতির ওপর ভিত্তিশীল হয়, তাহলে তা পূর্বের মতোই।
২৯ অন্যদিকে যদি অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তা হবে নিন্দনীয় বা বর্জনীয়।
সুতরাং পূর্বের সকল সংশ্লিষ্টতা দ্বারা বিশুদ্ধ সনদের অধিকারী একটি এক প্রতিবেদনের জন্য যা আইনে সুনির্দিষ্টতা সম্পন্ন নীতির ওপর নির্ভরশীল, এটা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য এবং তাই আমরা এটি অবিমিশ্রভাবেই গ্রহণ করি। একইভাবে, যেহেতু অবিশ্বাসীদের অনুমানসমূহ কোনো কিছুর ওপরেই ভিত্তিশীল নয়, তাই মানুষ তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে এবং এদের যোগ্যতা অস্তিত্বহীন বলে বিবেচিত হবে। এই শেষ সাড়া ধার নেওয়া হয়েছে একটি প্রকৃত জিনিস থেকে যা কিতাব আল-মুওয়াফাকাত এর মধ্যে রয়েছে এবং সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালারই জন্য।৩৬
ওদের মধ্যে কিছুসংখ্যক নিশ্চিতরূপে এই হাদিস প্রত্যাখ্যানে বিপথগামিতায় বহুদূরে চলে গেছে। তারা তাদের মতামত বাতিল করেছে যারা হাদিসে যা আছে তাতে আস্থাশীল হয়। ততদূর পর্যন্ত অন্যায়ভাবে আক্রমণ করা হয়েছে যেমন যুক্তির বিরোধিতা এবং সেই ব্যক্তিকে দায়ী করেছে যিনি এটাকে সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত বলেছেন।
আবু বাকার ইবনুল আরাবি কিছু লোকের বর্ণনা দিয়েছেন, যাদের সাথে তিনি পূর্ব দেশে সাক্ষাৎ করেছেন, যারা রুইয়া (ইমানদারদের জান্নাতে আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ লাভ) অস্বীকারকারী। এটা একজন রুইয়া অস্বীকারকারীকে বলা হয়েছিল: যিনি আল্লাহ তায়ালার দর্শনকে দৃঢ়ভাবে [নিশ্চয়তা সহকারে] বিশ্বাস করে তার ওপরে অবিশ্বাস আরোপ করা যায় কি না? তখন এই অস্বীকারকারী বলল: না! কারণ সে যা বলেছে তা যুক্তির বিচারে গ্রহণযোগ্য নয় এবং যুক্তির দ্বারা অগ্রহণযোগ্য বিষয় যেই বলুক, সে অবিশ্বাস করেনি। ইবনুল আরাবি বলেন: তাহলে এটাই হচ্ছে তাদের মতে আমাদের মর্যাদা [অর্থাৎ তারা আমাদেরকে পাগল ভাবে]। অতএব ভাগ্যবানদেরকে চিন্তা করতে দেওয়া হোক তারই ওপর, যেদিকে প্রবৃত্তি চালনা করে থাকে। আল্লাহ তায়ালা এসব থেকে তার দয়া দিয়ে আমাদেরকে রক্ষা করুন।
তা'বীল মুখতালিফ আল-হাদিস নামক গ্রন্থে ইবনে কুতায়বা অনেকগুলো আপাতসত্য সন্দেহ সাধারণভাবে ও স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করেন, যেগুলোতে সুন্নাহর শত্রুরা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তিনি ঐগুলো বাতিল করেছেন আপাতসত্য সন্দেহ দ্বারা আপাতসত্য সন্দেহকে, তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত নিবৃত্ত হননি যতক্ষণ না তাদের আগুন ছাই হয়েছে।

টিকাঃ
৩৬. আল-শাতিবী'র আল-ই'তিসাম (রক্ষাকবচ), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩৫ - ৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00