📄 সুন্নাহ্ উপলব্ধিকরণে দক্ষতা
দ্বিতীয় নীতি হচ্ছে: নবি সা.-এর বাণীকে বুঝতে হলে ব্যক্তির প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকতে হবে। এটাকে বুঝার অর্থ হচ্ছে: বাণীর ভাষায় যে অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে সেই অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা একীভূত হওয়া। হাদিসের পথনির্দেশ (সাধারণ উদ্দেশ্য), এর বিশেষ পরিস্থিতি ও লক্ষ্য, পর্যায়ক্রমে কুরআন ও রসুল সা.-এর সমর্থন এবং সাধারণ নীতিমালা ও ইসলামের উদ্দেশ্যের সামগ্রিকতার কাঠামো বিচার্য হবে।
ইসলামের মহান বিদ্যাবত্তার অধিকারী, ভারতের আহমাদ ইবন আবদুর রহীম, যিনি শাহ ওয়ালীউল্লাহ (মুহাদ্দিস) আল দিহলভী (মৃত্যু: ১১৭৬ খ্রি.) নামে অধিক পরিচিত, তার মতানুযায়ী এসব কিছুই আল্লাহ তায়ালার প্রচারের পথ ধরে যা কিছু এসেছে এবং এপথে যা কিছু আসেনি, তার পৃথকীকরণ প্রয়োজনীয় হিসেবে দেখা যায় (আমাদের শিক্ষক, আল-আযহারের প্রাক্তন শায়খ মাহমুদ শালতুত এর মতে)। এই পার্থক্যেকে ভিন্ন পথে প্রয়োগ করা যায় যা আইন প্রণয়ন কারী সুন্নাহ্ এবং যা আইন সংশ্লিষ্ট সুন্নাহ্ নয় তার অংশ; আইন বিষয়ক সুন্নাহ্ মধ্যে সাধারণ ও স্থায়ী উপাদান রয়েছে এবং বিশেষ ও সময় নিয়ন্ত্রিত গুরুত্ব রয়েছে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার কারণ এই যে, সুন্নাহ্ বুঝার ব্যাপারে তারই মধ্যে ত্রুটি রয়েছে (আল-আফাত)।
সুন্নাহ্ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার ফল হিসেবে এসব ত্রুটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি কিন্তু উপলব্ধির ভুলের পরিণাম হিসেবে এটা ইতোমধ্যেই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ও প্রত্যয়িত হয়েছে। এই ভুল একটি প্রাচীন রোগ, এটা সুন্নাহকে সেইভাবে স্পর্শ করেছে যেভাবে করেছে কুরআনকে। বিদ্বানগণের মধ্য থেকে সত্যানুসন্ধানীগণকে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুলকে বুঝার ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
📄 শক্তিশালী বিধায় মূল পাঠই বিরোধমুক্ত
তৃতীয় নীতি হচ্ছে: বিরোধ থেকে আমরা মূল পাঠের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি এর চেয়ে শক্তিশালী কিছু দ্বারা। অনেক শক্তিশালী হলো, কুরআনের মূলপাঠ কিংবা অন্যান্য হাদিস যেগুলোর প্রচুর উৎস রয়েছে কিংবা বিশুদ্ধতার ব্যাপারে অধিকতর স্পষ্ট অথবা প্রকৃত নীতি (উসূল)র সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ, অথবা আইন বিষয়ক পদক্ষেপসমূহের উদ্দেশ্যের অধিকতর নিকটবর্তী অথবা এটি আইনের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে যা। কারণ এগুলো এক অথবা দুটি টেকসই কিছু হতে উদ্ভূত নয়, বরং তাদের প্রমাণের বিশুদ্ধতাসহ সুনির্দিষ্টতা ও নিশ্চয়তা অর্জন করেছে।
এটি উসূলে ফিকহ এবং উসূলে হাদিস উভয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনী ইস্যু হিসেবে সম্পৃক্ত (সাক্ষ্য প্রমাণের ভারসাম্যগত বিরোধ ও প্রমাণাদি)। বাহ্যিক রূপে মূলপাঠ কোনো কোনো সময় পরস্পর বিরোধী হয়, কিন্তু তাদের বাস্তবতা পরস্পরবিরোধী নয়। ফকিহ বা আলেম ব্যক্তির জন্য মূলপাঠ একত্রিত করে যেখানে সম্ভব বিরোধী দুরীভূত করা অত্যাবশ্যক। অথবা এতে ব্যর্থ হলে সাক্ষ্যের ভারসাম্য বিচার করা বাঞ্চনীয়।
তাদরীব আর-রাবি গ্রন্থে আল-সুয়ূতী বলেন যে, সাক্ষ্যের ভারসাম্য একশ প্রকারেরও অধিক।
📄 আইন প্রণয়ন ও নির্দেশনার উৎস
ইসলামের আইন প্রণয়ন ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে সুন্নাহ্ হচ্ছে দ্বিতীয় উৎস। ফকিহগণ এদিকেই আলোকপাত করেন আইনী আদেশ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে। একইভাবে প্রচারক ও শিক্ষকগণও এমন করেন এর থেকে উৎসাহব্যঞ্জক অর্থ, মূল্যবান নির্দেশনা এবং গভীর জ্ঞান বের করার জন্য। সেই সাথে লোকদেরকে কল্যাণকর কাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং অকল্যাণের কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য।
সুন্নাহ্ যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালন করতে পারে সেজন্য যে কোনো ব্যক্তি অবশ্যই একে অধিকতর মূল্য দেবে রসুল সা. হতে উৎসারিত বলে প্রমাণিত হলে। এটা হাদিস বিজ্ঞানের বাগধারার মধ্যে সহিহ (বিশুদ্ধ, নির্ভরযোগ্য) বা হাসান (উত্তম) হাদিসরূপে সত্যায়িত। সহিহ হচ্ছে অতি উত্তম বা খুব ভালো (যেহেতু এমন শব্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির জন্য বোধগম্য); হাসান হচ্ছে ভালো যা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের। এর বাইরে হাসান-এর উচ্চতর পর্যায়কে 'সহিহ'র কাছাকাছি গণ্য করা হয়; একইভাবে এর নিম্নতর পর্যায়কে যঈফ (দুর্বল) এর নিকটতর বিবেচনা করা যায়।
সহিহ হাদিস এমন হাদিসকে বলা হয় যার বর্ণনাকারী তার সততার জন্য সুপরিচিত এবং অন্য বর্ণনাকারী থেকে শুনে স্মৃতিতে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার পূর্ণতার জন্যও। এটা হতে হবে সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, এর মধ্যে কোনো শূন্যতা বা বিচ্ছিন্নতা থাকবে না এবং যখন তা রসুল সা.-কে সংযুক্ত করবে। একটি সহিহ হাদিস অনিয়ম ও ত্রুটি থেকেও মুক্ত।
এভাবে কেউ ঐ হাদিসকে গ্রহণ করবে না যা অপরিচিত উৎসের কোনো বর্ণনাকারী বা তার অপরিচিত অবস্থা বর্ণিত হচ্ছে, কিংবা যার সততা বা সংরক্ষণে পূর্ণতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, বা যদি তার সাথে অন্য বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় বিচ্ছিন্নতা কিংবা শূন্যতা থাকে। কিংবা তার দ্বারা বর্ণিত হাদিসটি অনিয়মিত হয়, যার ফলে সেটা তার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অন্য কারো নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিরোধী হয়, অথবা ঐ হাদিসে যদি ত্রুটির কোনো চিহ্ন থাকে কিংবা অন্যকিছু আপত্তিকর থাকে এর সনদ বা এর মতনে (মূলপাঠের প্রতিবেদন থাকলে)।
যে লোকেরা তা পৌঁছে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে কারো যেন এমন ধারণা না থাকে যে, উম্মতের আলেমগণ এমনকিছু গ্রহণ করেছেন, তা তাদের কাছে নিয়ে যেই আসুক না কেন, যেমন কেউ তাদের কাছে এসে বলল 'অমুক এবং অমুক থেকে অমুক এবং অমুক, তারপর আল্লাহর রসুল থেকে এবং তার উত্তর দিলেন: তুমি সত্য বলেছ!
বরং প্রকৃত কথা হচ্ছে, যারাই তাদের কাছে হাদিস নিয়ে এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের সম্বন্ধেই তারা অবশ্যই কতকগুলো প্রশ্ন রেখেছেন: (ক) তিনি কোন ঘরানার আলেম বা ছাত্রদের অন্তর্ভুক্ত? (খ) তার শিক্ষক কারা? (গ) তার সহপাঠী ছাত্র কারা, হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়নের সময় কে তার সাথে ছিলেন? (ঘ) তার শিক্ষক, সঙ্গীসাথী ও ছাত্রদের দৃষ্টিতে তার চরিত্র ও আচরণ কেমন? (ঙ) লোকেরা কি তার সততা ও তার আল্লাহ তায়ালাভীতি (তাকওয়া) সত্যায়ন করে থাকে? (চ) সংরক্ষণে কি ধারাবাহিকতা রয়েছে? (ছ) তিনি কি জীবনভর এটা অব্যাহত রেখেছেন অথবা জীবনের শেষ বছরগুলোতে পরিবর্তন করেছেন? (জ) তার বৃদ্ধ বয়সে তার ছাত্রদের মধ্যে কে কে তার কাছে পড়াশোনা করেছেন এবং (ঝ) তার পরিবর্তনের পূর্বে কে তার অধীনে অধ্যয়ন করেছেন? এবং এভাবে আরো।
উম্মাহর বিশিষ্ট আলেমগণ একমত হয়েছেন, যেসব হাদিস আমলের ক্ষেত্রে আইনী হুকুম হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়, যা ফিকহশাস্ত্রের স্তম্ভ বিশেষ এবং হালাল ও হারামের ভিত্তি, সেগুলোকে অবশ্যই সহিহ বা হাসান হতে হবে। তবে, যেসব হাদিস আমলের উন্নতির সাথে সম্পৃক্ত বা দোয়া, যা হৃদয়কে নরম করে, তারগিব (আল্লাহ তায়ালার প্রতি স্পৃহা বৃদ্ধি করে) বা তারহিব (আল্লাহ তায়ালার ভয় বৃদ্ধি করে) এবং এধরনের অন্য কিছু, যেগুলো অবিসংবাদিতভাবে আইন প্রণয়নের শিরোনামে আসে না, সেগুলোর ব্যাপারে তারা ভিন্নমত পোষণ করেন।
প্রাথমিক যুগের বিদ্বান আলেমগণ (সালাফ) এর মধ্যে কেউ কেউ এমন ছিলেন, যাদেরকে এই ধরনের বর্ণনার হাদিস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং এগুলো প্রচারে কোনো ক্ষতি লক্ষ্য গোচর হয়নি। তবে এই অব্যাহতি নিরঙ্কুশ নয়, যেমনটা কেউ কেউ মনে করেন। বরং এর জন্য ক্ষেত্র ও যুক্তি রয়েছে। তবে, অনেকেই এই অব্যাহতির মানের অপব্যবহার করেছেন (কারণ হাদিসগুলো আইন দ্বারা স্থিরীকৃত আমলের সাথে জড়িত নয়), তাই সরল পথের উল্টো এবং দুষ্ট লোকেরা নির্ভেজাল ইসলামের প্রশস্ত পথকে দূষিত করেছে।
বাণী প্রচারের কিতাবাদি যা কিছু অন্তরকে কোমল করে, সুফিবাদের গ্রন্থসমূহে এই সব ধরনের হাদিস প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। তবে, আমরা এই মত পোষণ করি যে, এগুলোর অধিকাংশই দুর্বল ও অশুদ্ধ হাদিসে ভারাক্রান্ত। বরং বলা যায়, এসব পুস্তকে এমন উক্তি অনুসরণ করা হয়েছে যার কোনো উৎস বা সনদ নেই, এগুলোর মধ্যে কতকগুলো এমন যা বিরোধপূর্ণ এবং আল্লাহর রসুল সা.-কে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। মুহাদ্দিসগণ এসব হাদিসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এবং এমন গ্রন্থ সংকলন করেছেন যা স্পষ্টভাবে ওদের কৃত্রিমতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।
মুহাদ্দিসরা এধরনের দুর্বল বা মিথ্যা বর্ণনা নিষিদ্ধকরণে সর্ববাদীসম্মত মতে উপনীত হয়েছেন, তাদের (ব্যক্তিগত) মিথ্যাচার ও অসারতা উন্মুক্ত করা ব্যতীত। তাদের কাজের ফলে সর্বসমক্ষে এগুলোর আর কোনো প্রচার হয়নি।
একই ধরনের অসার ও বাতিল বর্ণনা তাফসিরের অনেক কিতাবেই দেখা যায়, এটা এমন হয়েছে যে, তারা অভ্যাসবশতই এসব কুখ্যাত জাল বর্ণনা কুরআনের নির্দিষ্ট সুরাসমূহের ক্ষেত্রে করেছে। তারা এমনটা করেছে এমনকি 'হাদিস বিশেষজ্ঞ (হুফ্ফায) গণ এর দুর্বলতা প্রকাশ এবং অসারতা ব্যাখ্যা করা সত্ত্বেও, যাতে পরবর্তীতে কেউ এসব বর্ণনা করতে কিংবা তার বইয়ের পৃষ্ঠাসমূহ এর দ্বারা মসীলিপ্ত করতে না পারে। এতদসত্বেও আল-যামাখশারী, আল-সা'আলিবী, আল-বায়যাভী, ইসমাঈল হাক্কী প্রমুখ মিথ্যা হাদিস উপস্থাপনের কাজ অব্যাহত রেখেছেন।
📄 জাল হাদিসের পক্ষে প্রদত্ত অপযুক্তি খণ্ডন
এ ধরনের জাল হাদিস উপস্থাপনার চেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে একজন কুরআনের ভাষ্যকার খুঁজে বের করা। উদাহরণস্বরূপ, রূহ আল-বায়ান-এর রচয়িতা হাদিস উদ্ধৃতকরণকে যুক্তিসম্মত করতে এবং তা রক্ষা করতে ইচ্ছুক। এই গ্রন্থকার, সুরা আত-তাওবার তাফসিরের শেষের দিকে বেপরোয়াভাবে বর্ণনায় এতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন একথা বলে:
জেনে রাখুন, আল-কাশাফ এর গ্রন্থকার এই সুরার শেষে যা উদ্ধৃত করেছেন সেসব হাদিস সম্পর্কে (এবং আল-কাযী আল-বায়যাভী এবং আল-মাওলা আবু আল-সা'উদ তাকে অনুসরণ করেছেন [একাজে], আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে দয়া করুন, যারা কুরআনের ভাষ্যকারদের প্রধান), বিদ্বান আলেমগণ প্রায় আলোচনায় (থাকতেন) [এবং মতবিরোধেও] কোনো কোনো পণ্ডিতের সাথে যারা (ঐসব হাদিস) প্রত্যয়ন করতেন, অন্যরা তা মিথ্যা হওয়ার ভিত্তিতে বাতিল করতেন, ইমাম আল-সাঘানী এবং অন্যদের মতো।
এই হতভাগ্য আল্লাহ তায়ালার বান্দার জন্য যা দৃশ্যমান, তার জন্য যা প্রাপ্য তাতে আল্লাহ তায়ালা দয়া করুন, তা হলো ঐ হাদিসসমূহকে হয় বিশুদ্ধ না হয় শক্তিশালী হতেই হবে, অথবা হতে হবে দুর্বলকৃত বা দুর্বল, অথবা মিথ্যা বা বানোয়াট।
যদি ঐগুলো বিশুদ্ধ ও সবল হয়, তাহলে ওগুলোর ব্যাপারে কোনো আলোচনা [যথাযথ ও প্রয়োজনীয়] নয়। কিন্তু যদি ওগুলোর সনদ দুর্বল হয় তখন হাদিসবেত্তাগণ একমত যে, দুর্বল হাদিসের উপর তারগিব ও তারহিবের জন্য কাজ করা অনুমোদিত, যেমনটা আল-নববী'র আল-আযকার, আলী ইব্ন বুরহান আল- দীন আল-হালাবী'র ইনসান আল-উয়ূন এবং ইবন ফখর আল-দীন আল-রুমী'র আল-আসরার আল-মুহাম্মাদীয়্যা এবং অন্যান্য (কিতাব)।
ঐগুলো যদি জাল করা হয়, সে ক্ষেত্রে আল-হাকিম ও অন্যরা উল্লেখ করেন যে, সাধকদের মধ্য হতে একজন লোক কুরআন এবং এর সুরাসমূহের পবিত্রতার ওপর কিছু হাদিস রচনার দায় গ্রহণ করেন এবং এরপর তার কাছে বলা হলো: আপনি কেন এটা করেন? সে বলল, আমি দেখলাম লোকদেরকে কুরআন অস্বীকার করতে এবং আমি ইচ্ছা করলাম তাদেরকে এর প্রতি উৎসাহিত করতে। তখন তাকে বলা হলো, নবি সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি কোনো মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা করে নিল। তারপর সে বলল, আমি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বলিনি; বরং আমি তাঁর সা. জন্য মিথ্যা বলেছি।
সে ব্যক্তি বুঝাল: তাঁর সা. বিরুদ্ধে ঐ মিথ্যাচার নিয়ে গেছে ইসলামের ভিত্তিকে ধ্বংসের দিকে এবং তুচ্ছ প্রতিপন্ন করেছে হুকুম আহকাম ও বিধিবিধানকে এবং এটা অন্যটির জন্য মিথ্যা বলার মতো নয়। অর্থাৎ তাঁর জন্য মিথ্যা বলা হচ্ছে তাঁর আইন অনুসরণে উৎসাহিতকরণ এবং তাঁর পথে বা তাঁর গতিপথে চলার জন্য। শাইখ 'ইয্য আল-দীন ইবন আবদুস সালাম বলেন: কথা বলা হচ্ছে লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার উপায়। অতঃপর প্রত্যেক প্রশংসনীয় উদ্দেশ্যে লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে দুটোর যেকোনো একটির সাহায্যে-সত্য [বলা] এবং মিথ্যাচার [করা]। মিথ্যাচার [করা] নিষিদ্ধ। অতঃপর যদি মিথ্যাচার করে লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব হয় এবং সত্য বলে তা সম্ভব না হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা বৈধ (মুবাহ)। শর্ত, ঐ লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার অনুমতি থাকতে হবে এবং এটা বাধ্যতামূলক [ওয়াজিব) হবে, যদি লক্ষ্য বাধ্যতামূলক হয়। সুতরাং এটা হচ্ছে এ ধরনের অবস্থার নিয়ন্ত্রক নীতি।
এখানে আমরা সাহায্য করতে পারি না, কিন্তু একথা বলে আমাদের বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারি-লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ এবং 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন: আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কারো কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই এবং আমরা আল্লাহ তায়ালারই জন্য এবং তাঁর কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।
আল্লাহ তায়ালার কিতাবের ভাষ্যকার হিসেবে একজন স্বেচ্ছাতালিকাভুক্ত ব্যক্তি থেকে এই প্রবন্ধ পুস্তকের মতোই আরেকটি পুস্তক প্রকাশিত হয় ঔদ্ধত্যের সাথে, নীতিবহির্ভূতভাবে। কোনো কোনো লোক তাকে ফকিহ (আইনবিদ যিনি ইসলামের আইনকানুন বুঝেন) এবং উসূলী (ফিকহ'র উসূল বা নীতির ব্যাপারে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন) বলে বর্ণনা করেন! কিন্তু কি ধরনের অভিজ্ঞতা (ফিকহ) এই লোকটির রয়েছে, প্রকৃত আলেমদের মতে, প্রাথমিক বিষয়বস্তু সম্বন্ধেই যে অজ্ঞ? এই শেখ (তার একটি সুফি ঝোঁকপ্রবণতা রয়েছে) জানে না যে, আল্লাহ তায়ালা এই দ্বীনকে আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং সেহেতু আমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত সম্পূর্ণ করেছেন, সুতরাং আমরা কোনো প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করি না যে, কেউ আমাদের জন্য নিজ থেকে হাদিস বানিয়ে এটাকে পরিপূর্ণতা দান করবে। যদি বলা হয় যে, সে স্পর্ধা দেখায় আল্লাহ তায়ালাকে সংশোধন অথবা তাঁর রসুল সা. কে শক্তিশালী করার জন্য; ফলত: সে রসুল সা. কে বলে 'আমি আপনার জন্য মিথ্যা বলি যাতে আপনার দ্বীনের সীমাবদ্ধতা পরিপূরণ করা যায় এবং আমার তৈরি করা হাদিস দ্বারা এর শূন্যতা পূরণ করি।
ইবন আবদুস সালামের বক্তব্য অনুযায়ী এটা গ্রহণ করা হয়েছে পুরাপুরি অপ্রাসঙ্গিকভাবে। যা কিছু এটা অনুমোদন করে তা হলো নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট ধরনের কথা, যেমন, যুদ্ধে চাতুর্য অবলম্বন এবং দুই দলের মধ্যে শান্তি স্থাপন এবং অত্যাচারীর কাছে থেকে পলায়মান ব্যক্তিকে সহায়তা দেওয়া এবং ঐ ধরনের অন্যান্য ব্যবস্থা যা এ প্রসঙ্গে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেকোনো ক্ষেত্রে ইবন আবদুস সালামের বক্তব্য নিজেই এই দাবিদারের দাবিকে খণ্ডন করে। কারণ ইবন আবদুস সালাম বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক প্রশংসামূলক লক্ষ্য যা সত্য এবং মিথ্যা উভয় ধরনের কথা বলেই অর্জন করা যায়, সেক্ষেত্রে মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ। সুতরাং এখানে এই আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলতে পারেন- যদি সব কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য যা জাল হাদিস দ্বারা প্ররোচিত এবং সকল অস্বীকৃত লক্ষ্য যা হতে তারা নিবৃত্ত হয়েছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে সহিহ ও হাসান হাদিস দ্বারা অর্জনের যোগ্য, তাহলে মিথ্যাচার নিষিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে এটা হচ্ছে বিরাট বিরাট পাপের মধ্যে সর্ববৃহৎ।