📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি বাস্তবোচিত পদ্ধতি

📄 একটি বাস্তবোচিত পদ্ধতি


সুন্নাহ্ একটি বাস্তবতা সম্পন্ন পদ্ধতিও বটে। এটা মানুষকে এমন মনে করে না যে, তারা ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতা। বরং বিবেচনা করে মানুষ হিসেবেই, যারা খাদ্য গ্রহণ করে এবং হাটে বাজারে থাকে, যাদের রয়েছে রিপু ও আবেগ, তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তাদের রয়েছে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা যা তাদেরকে পৌঁছে দিতে পারে জান্নাতের মেজবানের কাছাকাছি। তারা সৃজিত হয়েছিল মৃত্তিকা ও ছাঁচে ঢালা দ্বারা, কিন্তু তাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার অধ্যাত্ম নিঃশ্বাসও ছিল। অতঃপর সামান্য বিস্ময় এই যে, মানব সন্তান উন্নত হয় এবং অবনত হয়। তার হয় উন্নতি ও সে হয় অধঃপতিত, অর্থাৎ সে পরিচালিত হয় ও উৎসন্নে যায়, কিংবা সে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকে কিংবা পথভ্রান্ত হয়, সে আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতা করে এবং অনুশোচনা করে।
একজন সাহাবি অনুভব করলেন যে, তিনি মুনাফিক হয়ে গেছেন। কারণ যখন বাড়িতে থাকেন তখনকার মনের অবস্থা এবং নবি সা.-এর সাথে থাকাকালীন মনের অবস্থার পার্থক্য ঘটে। তিনি নবি সা.-এর কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। তিনি রসুল সা.-এর কাছে তার মুনাফিকী ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, যখন তিনি তাঁর সা. সাথে থাকেন তখন তার হৃদয় দ্রবীভূত ও কোমল থাকে, চক্ষু থাকে অশ্রুসিক্ত এবং তিনি তাঁর প্রভুর জিকিরে রত থাকেন, তিনি তার সামনে যেন পরকালীন জীবনকে নিজ চোখে দেখতে পান। তারপর যখন তিনি তার পরিবারে ফিরে যান, সন্তান-সন্ততির সাথে কৌতুক করেন, স্ত্রীর সাথে ক্রীড়ায় মত্ত হন, তখন তার মধ্যে পূর্বেকার অবস্থা অবলুপ্ত হয়ে যায়। একথা শুনে রসুল সা. বললেন, ওহে হানযালা! আমার সাথে থাকাকালীন মনের অবস্থা যদি তুমি ধরে রাখতে পারতে, তাহলে রাস্তাঘাটে ফেরেশতারা তোমার সাথে মুসাফাহা করতো। কিন্তু হানযালা, এটার জন্য এক রকম সময় এবং ওটার জন্য সময় অন্য রকম।
এটি একটি সুপরিচিত কথা যে, মানুষ স্বচ্ছ ও স্পষ্ট, অতঃপর তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং ঢুলুঢুলু। এতে কোনো ক্ষতি নেই যদি তার সময় এবং জীবন তার জন্য যা কল্যাণকর তাতে এবং তার প্রভুর হক আদায়ের মাঝে ব্যয়িত হয়, অথবা ইহকাল ও পরকালের মধ্যে, যেমনটা বলা হয়েছে এই আপ্ত বাক্যে, এক ঘণ্টা তোমার আত্মার জন্য এবং এক ঘণ্টা তোমার প্রভুর জন্য।
এটার অনুমোদন বা স্বীকৃতিস্বরূপ সুন্নাহ্ মানবীয় দুর্বলতার জন্য অবকাশ দিয়েছে। এটা বৈধ বিষয়বস্তুর সীমা প্রশস্ত করেছে এবং নিষিদ্ধতার সীমা করেছে সংকুচিত, যেমন এই হাদিসে বলা হয়েছে: আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল এবং তিনি যা নিষিদ্ধ করেছেন তা হারাম এবং যেই বিষয়ে তিনি নীরব রয়েছেন তা এর (নির্দেশনা থেকে) বাইরে। অতএব আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত সীমারেখা গ্রহণ করো। কারণ নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কখনই কোনোকিছু সম্পর্কে উদাসীন নন। অতঃপর রসুল সা. তিলাওয়াত করলেন, তোমার প্রতিপালক কখনই ভুলে যান না (সুরা মারইয়াম, ১৯: ৬৪)১০।
মানবীয় দুর্বলতার আরো স্বীকৃতির বিষয়ে সুন্নাহ্ পরিস্থিতি অনুযায়ী সেসব ক্ষেত্র বৈধ করেছে যা সাধারণভাবে অবৈধ। এমনকি প্রয়োজনের পরিপ্রক্ষিতে এমন কিছুকে বৈধ করা হয়েছে যা স্বাভাবিকভাবেই অবৈধ। উদাহরণস্বরূপ, রসুল সা. তাঁর দুজন সাহাবিকে তাঁদের চর্মরোগের কারণে রেশমি বস্ত্র পরিধানের অনুমতি দিয়েছেন।
মানব জীবনে বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্নাহ্ নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে এবং সেই ব্যক্তির প্রতি দয়ার্দ্র হয়েছে যখন সে অবাধ্যতায় পতিত হয়। অনুশোচনার সময়ে এটি দরজা বন্ধ করেনি। বরং তার সামনে উন্মুক্ত করেছে প্রশস্তভাবে, যাতে সে ওই দরজার কড়া নাড়তে পারে প্রভুর সামনে অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে অধোবদনে। যেমনটা হাদিসে বলা হয়েছে: রজনীব্যাপী আল্লাহ তায়ালা তাঁর হস্ত প্রসারিত করেন, যাতে তিনি দিনের বেলার কৃত অপরাধের অনুশোচনা গ্রহণ করতে পারেন এবং তিনি দিনের বেলায় তাঁর হস্ত প্রসারিত করেন যাতে তিনি রাত্রে কৃত অপরাধের জন্য অনুশোচনা গ্রহণ করতে পারেন- যতদিন পর্যন্ত না সূর্য পশ্চিমে উদিত হয়"।
অন্য এক হাদিসে এসেছে : যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, তোমরা যদি পাপকাজ না করো এবং ক্ষমা না চাও, তিনি তোমাদেরকে অপসারিত করবেন এবং পরিবর্তে এমন লোকদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবেন যারা অন্যায় করবে ও ক্ষমা চাইবে তাঁর কাছে এবং তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন।১২
মানুষের অবস্থাগত ভিন্নতা এবং পারস্পরিক ভিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে সুন্নাহ্ অবকাশ দিয়েছে, সে ভিন্নতা সহজাতই হোক কিংবা অর্জিতই হোক। এসব ভিন্নতা বিবেচনায় রসুল সা. কয়েকজন লোকের একটি প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন জবাব দিয়েছেন। তাই তিনি ঐ (মুয়ামালাত) ব্যাপারে বৃদ্ধ ব্যক্তিকে এমন নির্দেশ দেননি যা দিয়েছেন একজন যুবককে, অথবা অভাবীকে দেননি এমন নির্দেশ যা প্রাচুর্যের অধিকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অথবা যে ব্যক্তি কাজে কর্মে স্বাধীন। একইভাবে, তিনি লোকদের প্রথা ও বৈচিত্র্য বিবেচনায় রেখেছেন। তাই তিনি সা. আবিসিনীয়দেরকে ঈদের দিনে তাঁর মসজিদে তাদের বর্শা নিয়ে খেলার অনুমতি দিয়েছেন এবং আয়শা রা. কে তাঁর (রসুল সা.) পিছনে দাঁড়িয়ে তা উপভোগের অনুমতি দিয়েছেন। একইভাবে তিনি (রসুল সা.) বালিকাদের আয়শা রা. আনহু-এর সাথে খেলার অনুমতি দিয়েছেন আয়শা রা. আনহু-এর তরুণ বয়সের কথা বিবেচনায়। তাই তিনি বিবাহ শাদিতে বা কারো দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির পর প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এবং অন্য এধরনের উপলক্ষকে কেন্দ্র করে মানুষের বিনোদন ও আনন্দ উপভোগের নিমিত্ত আমোদ প্রমোদের অনুমতি দিয়েছেন।১৩
সুন্নাহ্ মধ্যে অন্তর্নিহিত এ বাস্তবতা অনেক উদাহরণ দিয়েই বর্ণনা করা যেতে পারে। কিন্তু এর সবই আল্লাহ তায়ালা-নির্দেশিত রসুল সা.-এর নমুনার মডেল সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করা উদ্দেশ্যে।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি সহজীকৃত পথ

📄 একটি সহজীকৃত পথ


সুন্নাহ্ পথের আরেকটি বিশেষ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর আনুকূল্য, এর সুবিধা এবং এর সহিষ্ণুতা। পূর্বতন কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জিলের মধ্যে বর্ণিত নবি সা.-এর গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তাদের নির্দেশ দেবেন যা সত্য তা প্রতিপালনের এবং নিষেধ করবেন খারাপ থেকে; তিনি তাদের জন্য উত্তম বস্তুনিচয়কে বৈধ করবেন এবং অধম বস্তুনিচয়কে অবৈধ করবেন এবং তিনি তাদেরকে ভারমুক্ত করবেন এবং বিরাজমান বাধা দূর করবেন” (আল-আরাফ, ৭ : ১৫৭)। সুতরাং রসুল সা.-এর সুন্নাহর মধ্যে এমন কিছু নেই যা মানুষের দ্বীনী জীবনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে (দ্বীনকে বাধাগ্রস্ত করা) অথবা তাদেরকে পার্থিব জীবনে (দুনিয়ায়) নির্যাতিত করতে পারে।
বরং, রসুল সা. তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেন: প্রকৃতপক্ষে আমাকে তোমাদের জন্য উপহারস্বরূপ প্রদান করা হয়েছে। তাঁর এ কথা কুরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যা:
এবং আমরা আপনাকে বিশ্বজগতের রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি (সুরা আম্বিয়া, ২১: ১০৭)।
তিনি (রসুল সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্লেশদায়ক করে প্রেরণ করেননি, কারো জন্য কষ্ট বহন করে আনুক এমন কাজেও পাঠাননি; বরং তিনি আমাকে শিক্ষক এবং অন্যের কষ্ট লাঘবের উপায় করে প্রেরণ করেছেন"১৪।
রসুল সা. আবু মুসা রা. ও মুয়ায রা. কে সংক্ষিপ্ত ও ব্যাপক অর্থবোধক নির্দেশনা দিয়ে ইয়েমেন যাত্রায় বিদায় জানিয়েছিলেন: মানুষের জন্য সহজ করে দিও, কঠিন করে দিও না; শুভ সংবাদ দিও (যাতে তারা আশান্বিত হয়) এবং তাদের মধ্যে বিরূপ ভাব উস্কে দিও না; পরস্পরের কথা শুনো এবং দূরত্বের বিস্তার ঘটাবে না।১৬ তাঁর উম্মাতকে শিক্ষাদান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সহজতর করো, কঠিনতর করো না ও উত্তম প্রত্যাশা জাগিয়ে দিও, বিচ্ছেদ উস্কে দিও না"১৭।
এক বেদুঈন যখন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল, তখন সাহাবিরা রা. উত্তেজিত হয়ে উঠলে তিনি (রসুল সা.) বললেন, তোমরা এমন এক জাতিরূপে আবির্ভূত হয়েছ যারা সহজ করে দেবে, কঠিন করবে না।১৮ তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাত সম্পর্কে তিনি বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি একটি সহিষ্ণু সত্য দ্বীন (প্রচার ও প্রতিষ্ঠা) এর দায়িত্ব নিয়ে এসেছি।১৯ তিনি বলেন, হে লোক সকল! তোমাদের ওপর ঐ সব দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে যা তোমরা পালন করার সামর্থ্য রাখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষান্ত হন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা ক্ষান্ত হও২০।
কুরআনের জ্যোতির ধাঁচে রসুল সা. বিষয়াদিকে সহজ করেছিলেন, যাতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য সহজ করতে চান, কাঠিন্য চান না এবং তিনি দ্বীনের দায়িত্ব পালনে তাদের ওপর কোনো বোঝা চাপাতে চান না। সেমতে, তিনি বিশুদ্ধতা অর্জনমূলক আয়াতের শেষে বলেছেন:
আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর সংকীর্ণতা চাপিয়ে দিতে চান না (সুরা মায়েদা, ৫: ৬)।
এবং বিবাহে নিষেধাজ্ঞার পর্যায় বর্ণনার পর বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ভার হাল্কা করতে চান, কারণ মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে (সুরা নিসা, ৪: ২৮)।
তাই বলা যায় যে, রসুল সা. দ্বীনের বিষয়ে অকারণ পাণ্ডিত্য প্রদর্শন ও বাড়াবাড়ির ক্ষেত্রে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। এ কারনেই তিনি কৌমার্য অবলম্বন ও সন্ন্যাস অবলম্বন করতে কিংবা জীবনের জন্য হিতকর বিষয়াদি বর্জন করতে নির্দেশ দান করেননি। বরং তিনি সুষমভাবে জীবনকে উপভোগ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদেরকে দেওয়া আনুকূল্যের প্রকাশ দেখতে চান। তিনি উদার হতে বলেছেন এবং পবিত্রতা অর্জন (ওজু), নামাজ, রোজা ও হজের কর্তব্যকর্মকে হালকা করেছেন। তাই তিনি প্রয়োজনে ওজুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করার বিধান দিয়েছেন; সালাতকে সংক্ষিপ্ত ও দুই সালাতকে একত্রিত করতে বলেছেন; অসুস্থতা বা অপারগতার ক্ষেত্রে বসে, শুয়ে বা ইশারায় সালাত আদায় করতে বলেছেন এবং রমজান মাসে অসুস্থ ব্যক্তি, মুসাফির, গর্ভবতী স্ত্রীলোক ও দুগ্ধমাতার জন্য সিয়াম ভাঙার ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। সফররত অবস্থায় মাথার ওপর ছায়া দিয়ে রাখা হচ্ছিল এবং গায়ে পানির ঝাপটা দেওয়া হচ্ছিল এমন এক ব্যক্তি সম্বন্ধে রসুল সা. বলেছেন, সফরকালে সিয়াম পালনে কোনো পুণ্য নাই। অর্থাৎ লম্বা সফরের উদ্দেশে ভ্রমণ কষ্টকর ও ক্লান্তিকর। বৃষ্টির মতো বাধা সৃষ্টিকারী অবস্থায় অনুপস্থিতি বা সফরের অবস্থা ব্যতিরেকেই তিনি মদিনা থাকাকালীন সময়ের জন্য জোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে পড়ার অনুমতি দিয়েছেন। এ হাদিসের বর্ণনাকারী ইবনে আব্বাস রা. কে যখন প্রশ্ন করা হলো: এর দ্বারা তিনি কি বুঝিয়েছেন? তিনি বলেছেন, তাঁর মনোভাব ছিল উম্মাহকে কষ্ট না দেওয়া। অন্য কথায় তিনি তাঁর উম্মাহর ওপর থেকে বোঝা প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন যে, তোমরা তাঁর অভিপ্রায় অনুযায়ী কাজ করবে এবং তিনি তাঁর অবাধ্যতাকে ঘৃণা করেন এবং আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন তাঁর অভিপ্রায় চরিতার্থ হওয়াকে, যেমন তিনি চান তোমরা তাঁর নির্দেশ মোতাবেক আমল করো২৬।
একদিন তাঁর কয়েকজন সাহাবি তাঁর কাছে এই বলে অভিযোগ করলেন যে, আমর ইবনুল আস অপবিত্র (বড় ধরনের নাপাকী) হয়েছেন, কিন্তু গোসল না করে কেবল তায়াম্মুম করেই তাদের সাথে সালাত আদায় করেছেন। এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে আমর বললেন, ঐ রাত্রে ভীষণ ঠাণ্ডা ছিল এবং আমার স্মৃতিতে আল্লাহ তায়ালার এই উক্তি জাগরুক ছিল যে,
মহামহিমান্বিত তিনি এবং তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য পরম দয়ালু (সুরা নিসা, ৪: ২৯)।
একথা শুনে আল্লাহর রসুল সা. মুচকি হাসলেন-এটা ছিল আমরের ঐ কাজ অনুমোদনের ইঙ্গিত।
অন্য এক ঘটনা: এক লোক জখম হয়েছিল, তারপর সে জুনুবি (নাপাক) হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলল যে, জখম হওয়া সত্ত্বেও তাকে গোসল করাতে হবে, গোসলের পর তার অবস্থার অবনতি হলো এবং শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল। এ সংবাদ নবি সা.-এর কাছে পৌছালে তিনি বললেন, ওরা তাকে হত্যা করল! আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে হত্যা করুন! তারা যেটা জানে না, সেটা সম্বন্ধে কেন জিজ্ঞাসা করে না? জ্ঞানহীনতার একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে প্রশ্ন করা'২৭।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 সুন্নাহর প্রতি মুসলিমদের কর্তব্য

📄 সুন্নাহর প্রতি মুসলিমদের কর্তব্য


যেমনটা আমরা বলেছি, মুসলিম ব্যক্তি এবং মুসলিম সমাজজীবনের জন্য সুন্নাহ্ হচ্ছে জীবনযাপনের বিস্তারিত প্যার্টান বা নকশা এবং এটা হচ্ছে কুরআনের ব্যাখ্যার প্রতিফলন। ইসলাম জীবন জুড়ে অঙ্গীভূত। মুসলিমদের কর্তব্য হচ্ছে: রসুল সা.- এর এই বিস্তারিত প্যাটার্নকে জানা এর স্বতন্ত্র উপাদানসহ, বিশেষত এর ব্যাপকতা ও পূর্ণাঙ্গতা, এর ভারসাম্য, এর বাস্তবতা এবং এর সুবিধা সম্পর্কে জানা। তাদের জানা উচিত মর্মমূলে প্রোথিত দয়ার্দ্রতা, মহান মানবতা এবং নির্ভেজাল গুণাবলী কত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তারা তাদের সামগ্রিক জীবনযাপনে তাঁকেই উত্তম আদর্শিক নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে।
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তায়ালা ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহ তায়ালাকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য আল্লাহর রসুল-এর মধ্যে উত্তম আদর্শ (সুরা আহযাব, ৩৩: ২১)।
রসুল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো, আর তোমাদেরকে যা থেকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো (সুরা হাশর, ৫৯: ৭)।
বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসতে চাও, তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন (সুরা আলে ইমরান, ৩: ৩১)।
এটি এই সুন্নাহ্ সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টিগত দক্ষতা শিক্ষাকে মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক করে, কিভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে, বুঝাপড়া এবং যথাযথ শিষ্টাচারের সাথে। কারণ এই উম্মাহর সর্বোত্তম প্রজন্ম তা কার্যকর করেছেন, যারা আন্তরিকতার সাথে শিক্ষালাভ করেছেন হজরত মুহাম্মদ সা.-এর শিক্ষালয়ে। তাঁর সাহাবিগণ এবং তাদের পরবর্তীগণ (তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ি) তাঁর শিক্ষাগ্রহণে চরম উৎকর্ষ লাভ করেছেন, তারপর যা তারা শিখেছেন তা কাজে প্রয়োগ করেছেন এবং আমলের ক্ষেত্রেও চরম উৎকর্ষ দেখিয়েছেন। তারপর তারা শিখিয়েছেন ইসলামের নেতৃত্ববৃন্দকে এবং শিক্ষাদানেও তারা ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের।
সাম্প্রতিককালে যে সংকট মুসলিমগণ মোকাবেলা করছে তার মধ্যে সর্বপ্রথম হচ্ছে চিন্তাগত সংকট। আমার মতে, এটা বিবেকের সংকটের ওপর স্থান নিয়েছে। এটা সর্বদাই সেই চিন্তাধারা গঠনে- যা অন্তরায় সৃষ্টি করে- তার পথ তৈরি করে যাচ্ছে। তারপর আসছে আন্দোলন, এরপর চিন্তার তৈরি নকশার সাথে ধারণার মেলবন্ধন হচ্ছে। চিন্তার সংকটে যা সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে তা সুন্নাহ্ সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টি এবং এর প্রয়োগের সংকট। এটাই ছিল ইসলামি পুনর্জাগরণে কিছু আন্দোলনের বিশেষ প্রপঞ্চ।
অধিকতর লক্ষ্যণীয় হলো, ঐসব আন্দোলনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ এবং এগুলোর ওপর প্রত্যাশা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং বিশ্বময় উম্মাহর নেতৃবৃন্দের নিজেদেরকে প্রত্যাশার দিকে নিবদ্ধ করা। প্রায়ই ঐসব আন্দোলন সুন্নাহ্ সম্বন্ধে ভুল বুঝাপড়ার ভিত্তিতে ইস্যু উপস্থাপন করে থাকে। এ সম্বন্ধে তাদের মতামত অপর্যাপ্ত। এটি সুন্নাহকে বাহ্যিক প্রদর্শনী এবং আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করা ছাড়া কিছুই নয়, যার মধ্যে রসুল সা.-এর নমুনার জ্ঞানের গভীরে অন্তঃপ্রবেশের বালাই ছিল না, যাঁর বিশেষ গুণাবলীর বিবরণ আমরা পূর্বেই প্রদান করেছি।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 তিনটি পাপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি

📄 তিনটি পাপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি


রসুল সা. থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নবুওতের জ্ঞান ও রিসালাতের উত্তরাধিকার চরমপন্থীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে এবং লক্ষ্যবস্তু হবে মিথ্যুক ও মূর্খদের। এটা ইবনে জরিরের বর্ণনায় এসেছে তামিম ও তার ফাওয়ায়িদ ইবনে আদি ও অন্যদের কর্তৃক নবি সা. থেকে। তিনি সা. বলেন, প্রত্যেক প্রজন্ম থেকে 'এর ন্যায়বান ও সৎ লোকেরা এই জ্ঞান বহন করবে, চরমপন্থীদের দ্বারা সার্বিক বিকৃতি, মিথ্যুকদের অনাচার এবং মূর্খদের ব্যাখ্যা থেকে একে পরিশোধন করবে'২৮। ওরাই প্রকৃতপক্ষে তিনটি ধ্বংসাত্মক আক্রমণকারী এদের প্রত্যেকেই রসুল সা.-এর উত্তরাধিকারের পথে বিপদ।
ক). চরমপন্থীদের বিকৃতি
বিকৃতির জন্ম হয়েছে চরম মতবাদ ও একগুঁয়েমি হতে, দ্বীনের বৈশিষ্ট্যমূলক নমনীয়তা বর্জন থেকে। মিতাচারের প্রতি ঘৃনা হতে যা এ দ্বীনকে বিশেষত্ব দান করেছে, সহিষ্ণুতা যা এই পুণ্যবান সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য এবং সেই সুযোগসুবিধা যা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাকে উৎকীর্ণ করেছে। এটা আমাদের পূর্বেকার সেই চরম মতবাদ, যা আহলে কিতাবকে ধ্বংস করেছে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ ধর্মমত, ইবাদত বন্দেগী বা আচার-আচরণের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। তারা দ্বীনের সুবিধা বিসর্জন দিয়েছে, আল্লাহ তায়ালা যা কখনো বলেননি তার ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে এবং আল্লাহ তায়ালার ঘোষিত হালালকে হারাম করেছে। এভাবে লোকদেরকে নিয়ম পদ্ধতি ও বাধ্যবাধকতার ভারে ন্যুজ করেছে যা আল্লাহ তায়ালা কখনো তাদের জন্য আবশ্যকীয় করেননি। কুরআনের ঘোষণাই এসব কিছু তাদের বিরুদ্ধে রেকর্ড করেছে এই বলে:
বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করো না, আর সেই সম্প্রদায়ের খেয়াল খুশির অনুসরণ করো না, যারা ইতোপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, আর সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে (সুরা মায়েদা, ৫:৭৭)।
ইবনে আব্বাস নবি সা. থেকে বর্ণনা করেন: দ্বীনে বাড়াবাড়ির ব্যাপারে সাবধান থাকবে, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীগণ বাড়াবাড়ির ফলেই ধ্বংস হয়ে গেছে।২৯ ইবনে মাসউদ তাঁর সা. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি সা. বলেছেন এবং তিনবার বলেছেন : একগুঁয়ে চরমপন্থীরা ধ্বংস হয়ে গেছে।২১
এখানে উল্লেখযোগ্য, এ হাদিস চরমপন্থাকে দ্বীনের জন্য ধ্বংসাত্মক বিবেচনা করে। কারণ এই যে, এ মতবাদ দ্বীনকে এর সহজতা, সুবিধা ও মধ্যপন্থার বৈশিষ্ট্যগত মেজাজ থেকে অন্য মেজাজের দিকে নিয়ে যায়, লোকদের বাড়াবাড়িতে ভারাক্রান্ত করে এবং তাদের ওপর কষ্টক্লেশ চাপিয়ে দেয়।
খ). মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের বিকৃতি সাধন
বিকৃতি ঐগুলোই যা নবি সা.-এর পদ্ধতি-এর মধ্যে প্রবিষ্ট করা হয়েছে অথচ এগুলো তা নয় এবং কিছু অভিনব ও উদ্ভাবিত বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে যা এর মেজাজ গ্রহণ করে না, এর ধর্মমত ও এর আইন প্রবলভাবে তা বাতিল করে দেয় এবং যা এর মূল ও শাখাপ্রশাখা উপড়ে দিতে চায়। এখন এই মিথ্যা প্রতিপন্নকারীরা কুরআনের মধ্যে কোনো কিছু অনুপ্রবিষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ এর আয়াতসমূহ মানব মনে সংরক্ষিত রয়েছে, লিখিত কপিতে খোদিত রয়েছে এবং ইমানদারদের জিহ্বা তা তেলাওয়াত করে থাকে। সুতরাং তারা ভেবে দেখে যে, সুন্নাহকে বিকৃত করলে তাদের পথ মসৃণ হবে, তখন তাদের পক্ষে একথা উল্লেখ করা সম্ভব হবে কোনো সাক্ষ্য ছাড়াই যে, আল্লাহর রসুল সা. বলেছেন।
কিন্তু এই উম্মাতের দোষগুণ বিচারে পারদর্শী বিদ্বান ও অভিভাবকগণ এদের পথের প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করেন এবং তাদের কৃত প্রতিটি বিকৃতির আবর্জনা পরিষ্কার করেছেন। তারা সনদ (বর্ণনার ধারাবাহিকতা) ব্যতীত একটি হাদিসও এবং এগুলোর বর্ণনাকারীর প্রত্যেককে একে একে পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে গ্রহণ করেননি, যতক্ষণ না জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার ব্যক্তিসত্তা ও চরিত্র স্পষ্টভাবে জানা গেছে। তারা তার শিক্ষক, সঙ্গী-সাথী ও ছাত্রদেরকেও খুঁজে বের করেছেন। তারা তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও আল্লাহ তায়ালা ভীতি (তাকওয়া) শুনে কোনোকিছু সংরক্ষণে তার নির্ভুলতা, বিশ্বাসযোগ্য সুপরিচিত বর্ণনাসমূহের ব্যাপারে তার সামঞ্জস্য এবং সুপরিচিত নয় এমন বিষয়াদিতে তার একক বর্ণনার গুণাগুণ বিচার করেছেন।
এ কারণেই আলেমগণ বলেন: সনদসমূহ দ্বীনের অংশ। কারণ, সনদ না থাকলে সে যা ইচ্ছা করবে তাই বলবে! 'অন্ধকারে জ্বালানি কাঠ খোঁজ করার সাথে' তারা ইসনাদ অন্বেষণ ছাড়া জ্ঞান অন্বেষণের তুলনা করেছেন। তাই তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সনদের ধারাবাহিকতা না থাকলে কোনো হাদিস গ্রহণ করেননি, বিশ্বস্ততার সাথে এরূপ হয়েছে স্বচ্ছ মনের অধিকারী বর্ণনাকারীদের কাছ থেকে যারা তাদের কাছে আগত বিষয় সংরক্ষণে বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে কোনো শূন্যতা রাখেননি, তা স্পষ্ট হোক কিংবা প্রচ্ছন্ন হোক এবং সব ধরনের অনিয়ম, ত্রুটি বা আপত্তিকর হওয়া থেকে নিরাপদ বিবেচিত হলে তবেই তা গ্রহণ করা হয়েছে।২৩
সনদ সংগ্রহে এর উপাদান ও বৈশিষ্ট্যগত বিশুদ্ধতা মুসলিম উম্মাহর বিশেষ গুণাবলীর অন্যতম। তারা সমসাময়িক সভ্যতার অনেক অগ্রবর্তী ছিলেন এই অর্থে যে, এরা সেই সব মানুষ যারা ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন।
তা সত্ত্বেও এটা দুঃখজনক যে, এই সম্প্রদায় সূত্র ও ইসনাদ ছাড়াই আল হাদিস প্রচার করেছে। এটাও দুঃখজনক যে, জ্ঞান সমৃদ্ধ আলেমগণও এগুলো জালকরণ ও মিথ্যাকরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাছাড়া এটা সাধারণ লোকদের মধ্যে অভিন্ন মুদ্রা'য় পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, মহিলাদের সম্পর্কে এধরনের হাদিস: কন্যাদের জীবন্ত সমাধিস্থকরণ গৌরবজনক কাজের অন্যতম এবং প্রথমে (নারীদের সাথে) পরামর্শ করো, তারপর তাদের বিরোধিতা করো এবং ওপরের তলার কক্ষ (মহিলাদের) বরাদ্দ দিও না এবং লিখিতভাবে তাদেরকে শিক্ষাদান করো না ইত্যাদি। এসব হাদিসের কোনো কোনোটি তাওহিদের মূল বাণীকেই লঙ্ঘন করেছে। উদাহরণস্বরূপ: তোমাদের কেউ যদি দৃঢ়ভাবে পাথরে বিশ্বাস রাখো, তাহলে এটি তার উপকার করবে। আবার কিছু মিথ্যা কুসংস্কারও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রসুল সা.-এর ঘাম থেকে গোলাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এ অবস্থা উম্মাহর কিছু আলেমকে জাল হাদিসের গ্রন্থ সংকলনে উদ্যোগী করে, যাতে তাদেরকে হুঁশিয়ার করা যায় এবং বিশেষ করে যেহেতু নৈতিকতার নির্দেশনা সম্বলিত গ্রন্থাদি যা অন্তরকে কোমল করে, তাসাউফ (সুফিবাদ) এবং অন্যান্য, তাদের দ্বারা পূর্ণ হয়েছিল- এমনকি তাদের কিছু হাদিসের কিতাবও। এসব পণ্ডিতের মধ্যে ছিলেন: আল-মাগানী, ইবন জাওযী, আল-সুযুতী, আল-ক্বারী (মোল্লা আলী ক্বারী), ইবন-আরাক, আল-শাওকানী, আল-লাখনা এবং সাম্প্রতিক কালের আল- আলবানি প্রমুখ। সুতরাং তাদের গ্রন্থাদি ব্যবহার করা আমাদের কর্তব্য।
গ). মূর্খদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা
ভুল ব্যাখ্যা এমন কিছু যাতে ইসলামের বাস্তবতা ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে, এতে যথাযথ প্রসঙ্গ থেকে শব্দাবলী বিকৃত করা হয় এবং এর দ্বারা ইসলামের প্রধান উপাদানসমূহ দুর্বল হয়ে পড়ে এমনভাবে যে, এর মৌলিক ইস্যু ও নির্দেশনা হারিয়ে যায়। মিথ্যাশ্রয়ী লোকেরা এমনভাবে বিকৃতি সাধন করেছে যে, ইসলামের কোনোই অংশ নয় এমন কিছু ইসলামে সংযুক্ত হয়ে গেছে। এগুলো করা হয়েছে এর অগ্রাধিকার বিকৃত করে, যেগুলোর হক অগ্রভাগে আসা উচিত সেগুলোকে পেছনে রেখে দেওয়া হয়েছে এবং যেগুলো পেছনে থাকার কথা সেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ করে সম্মুখে আনা হয়েছে।
ভুল ব্যাখ্যা এবং পচনশীল অনুধাবন ঐসব লোকের সর্বাগ্রে করণীয় যারা তাদের দ্বীন সমন্ধে অজ্ঞ, যারা কখনো এর প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করতে পারেনি এবং এর বাস্তবতা সম্পর্কে এদের কোনো গভীর জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি নেই। জ্ঞানের গভীরতায় তাদের কোনো প্রকার শেকড় নেই, না সত্যের প্রতি রয়েছে তাদের নিরপেক্ষ মানসিকতা। তারা উপলব্ধির ক্ষেত্রে বিকৃতি ও বিচ্যুতি পরিহার করে না। তারা কুরআনের আয়াতের স্পষ্ট আদেশ নির্দেশ অর্থাৎ আহকাম পরিহার করে এবং মুতাশাবিহাত আয়াতের পিছনে ছোটে, যেগুলো রূপক বা আলংকারিক। তারা এমনটা করে মতভেদ সৃষ্টির জন্য, যাতে এসব আয়াতের ব্যাখ্যা মনের মাধুরী মিশিয়ে করে আল্লাহ তায়ালার পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া যায়।
এটাই প্রকৃতপক্ষে মূর্খদের ব্যাখ্যা, যদিও তাদের অঙ্গে বিদ্বানগণের পোশাক শোভা পায় কিংবা তাদের নিজেদেরকে উপস্থাপন করে জ্ঞানী দার্শনিকদের পদবি ব্যবহার করে। এ সম্বন্ধে সচেতন ও সতর্ক হওয়া অপরিহার্য, এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা কর্তব্য এবং এর মধ্যে অধঃপতিত হওয়ার আশঙ্কা দূর করার প্রয়োজনে শৃঙ্খলা বিধান জরুরি। বিপর্যস্ত মাজহাব ও উপদলগুলোর অধিকাংশই উম্মাহ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। বিচ্যুত হয়েছে এর দ্বীনী আকিদা হতে ও বিধিবিধান থেকে। যেসব দল সরল পথ থেকে সরে গিয়েছে, তারা ধ্বংস হয়েছে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে গলদের ফলেই।
এ অবস্থানে এসে আল্লাহর রসুল সা.-এর অন্তর্দৃষ্টির বৈশিষ্ট্যগত প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যিম'র আলোকিত বর্ণনা প্রণিধানযোগ্য। তিনি তাঁর আর-রূহ নামক গ্রন্থে এটা উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য থেকেই আমরা উদ্ধৃত করতে পারি: এটা প্রয়োজনীয় যে, রসুল সা.-এর কাছে থেকে একজন কোনো প্রকার অতিশয়োক্তি বা সংক্ষেপন ছাড়াই উপলব্ধি করলেন, কারণ তাঁর সা. কথা এমন কিছু বহন করে না যা ধারণযোগ্য নয়, না এতে তাঁর সা. মনোবৃত্তি বা উদ্দেশ্যের বিষয়ে, নির্দেশনা বা ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কমতি রয়েছে। এটার প্রতি অবহেলা এবং এটাকে পরিত্যাগ করার কারণেই নিশ্চিতভাবে সঠিক পথনির্দেশ থেকে ভ্রান্তির মধ্যে বিপথগামী হয়েছে, যা আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কারো জানা নেই।
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুল সম্বন্ধে ভুল আকিদা প্রত্যেক বিরোধী মত উদ্ভাবন এবং ইসলামে ভুলভ্রান্তির প্রবৃদ্ধির মূল। বরং বলা চলে, এটাই (দ্বীনের) শেকড় ও শাখা প্রশাখার প্রতিটি ব্যর্থতার মূল, যদি তা সৎ উদ্দেশ্যের কারণেও হয়। আহা কী দুর্দশা দ্বীনের এবং এর লোকদের (যা পরিদর্শন করা হয়েছে) এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন! কাদিরিয়া ও মুরজিয়ারা, খারেজি ও মুতাযিলী, জাহমিয়া ও রাফেযিরা এবং অবশিষ্ট বিরুদ্ধবাদী গোষ্ঠীসমূহ আর্বিভূত হয় এবং বিবাদ সৃষ্টি করে কেবল আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুল সা. সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদার কারণে। [এই অবস্থা চলতেই থাকে] যতক্ষণ না এই দ্বীন অধিকাংশ লোকের কাছে চলে যায়, যাদের প্রতি এই ভুল ধারণা চালিত হয়েছে। কিন্তু ওটা (দ্বীন) তাই যেভাবে সাহাবিগণ একে বুঝেছিলেন এবং তারা যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছেন আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুল সা. হতে প্রাপ্ত নির্দেশনা দ্বারা, তখন তা পরিত্যক্ত হয়েছিল এবং ঐসব লোকেরা এদিকে না ফিরে দেখেছেন, না এর প্রতি মনোযোগী হয়েছেন, এতদূর পর্যন্ত যাতে করে যদি আপনি [এসব ব্যক্তির] লেখা শুরু হতে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন এর লেখকের [এমনকি] একটি স্থানও নেই যাতে মনে হতে পারে যে, তিনি আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসুল সা. থেকে তাঁর ভাবধারা যেমনটা প্রয়োজন বুঝতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি কেবল তাই জানেন যা তিনি জেনেছেন জনগণের জানা [অভিমত] হতে এবং রসুল সা.-এর কাছ থেকে যা এসেছে তা সরিয়ে রেখেছেন একপাশে। যে ব্যক্তি এর বিপরীত করেছেন, এ বিষয়ে এভাবে বিন্যাস করেছেন যা রসুল সা. থেকে আগত অথচ এর আগে দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করা হয়েছে এবং প্রচারে এসেছে এবং অন্ধভাবে অনুসরণ করা হয়েছে তার কাছে বেশি আকর্ষণীয় আন্দাজ অনুমানকে। তাই তাকে এবং তার পছন্দকৃত বিষয়কে বাতিল করো এবং তাকে সেই দায়িত্বই প্রদান করো যে দায়িত্ব সে নিজেই গ্রহণ করেছে। তাকে ধন্যবাদ জানাও যে তোমাকে এর দ্বারা নিষ্কলুষ করে রেখেছে।
মূল পাঠ কুরআন কিংবা সুন্নাহ্ যেখানেই হোক-এর বিকৃত ব্যাখ্যা একটি দীর্ঘমেয়াদী পাপ। মুসলিমরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেমন তাদের পূর্বের উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। এটি তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার দ্বীন থেকে বিচ্যুতির দিকে চালিত করেছে। চালিত করেছে তাঁর জ্যোতির্ময় শব্দাবলী বিকৃতকরণের দিকে এবং উদ্দেশ্যকে বিপথে নিয়েছে। সেই সূত্রে তিনি মনস্থ করেছেন মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে চালিত করতে।
মুসলিম সম্প্রদায় পরস্পর বিরোধী ফিরকাসমূহের উপস্থাপন দ্বারা ক্ষতির শিকার হয়েছে, যাদের প্রত্যেকেই মূল পাঠকে এমন কৌশলে ব্যাখ্যা করেছে যাতে তাদের মাজহাবী মতবাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এক্ষেত্রে তুলনামূলক নীতিমালা ও সিদ্ধান্তমূলক মৌলিক আইনবিধি বা ভাষা বা যুক্তির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয়নি। এসবের মধ্যে এমন কিছু লোকও ছিল যারা সর্বপ্রকার সীমারেখার বাইরে চলে গিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, বাতেনপন্থীগণ, যারা অর্থ থেকে শব্দকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং এগুলো নিয়ে এমন এক রাস্তায় চলে গিয়েছে যা যুক্তি বা ঐতিহ্যের দ্বারা বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত।
এ অবস্থারই যুক্তিবাদী দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের এবং বিশেষভাবে বলতে গেলে মুতাজিলাদের পার্থক্য সৃষ্টিকারী ব্যাখ্যার ঘরানা গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রেও ফকিহদের মধ্যে থেকে যারা মূলপাঠের (কুরআনের) বিশেষত সুন্নাহ্ ব্যাখ্যাকে তাদের ঘরানার মতবাদের সমর্থনে ব্যবহার করেছেন, তা তারা করেছিল প্রতারণা ও শঠতার মাধ্যমে। তারা তাদের ঘরানার মতবাদকে উৎস এবং মূলপাঠ (কুরআন ও সুন্নাহ্) কে শাখা প্রশাখা হিসেবে গণ্য করেন। এটা ছিল ভয়াবহ অনুপ্রবেশ। কারণ এটা বাধ্যতামূলক যে, ঘরানা বা মতবাদসমূহকে তাদের সমর্থনে মূলপাঠ (কুরআন ও সুন্নাহ্) এর কর্তৃত্ব ও নির্দেশনা উল্লেখ করতে হবে। তার বাইরে কোনো পক্ষ নেই। মূলনীতি হচ্ছে, যা কিছু ভ্রান্ত বা বিরোধপূর্ণ সেসবের ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব ও নির্দেশনার জন্য অভ্রান্ত/অকাট্যকে নির্ভর করতে হবে:
এবং যদি তোমাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয় তবে তা আল্লাহ তায়ালা ও রসুল-এর কাছে সোপর্দ করো, যদি তোমাদের ইমান থাকে আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাত দিবসের প্রতি (সুর নিসা, ৪: ৫৯)।
ব্যাখ্যা বা স্পষ্টকরণ অবশ্যই অপরিহার্য, কিন্তু এর নিজস্ব স্থান রয়েছে, নিজস্ব শর্তাদি রয়েছে এবং রয়েছে নিয়ম শৃঙ্খলা। আমরা অন্যত্র এ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।৩১
কিছু ভ্রমাত্মক ব্যাখ্যার কারণ ছিল মূর্খতা বা অসচেতনমনস্কতা কিংবা আন্দাজ অনুমান। অন্য কথায় মানসিক অলসতা বা জ্ঞানের ঘাটতি। আরেক ধরনের খারাপ ব্যাখ্যা রয়েছে, যার কারণ খামখেয়ালীপূর্ণ প্রচেষ্টা। আহমাদ ইবন হাম্বল রা. এর বর্ণনায় এর একটি উদাহরণ দেখা যায় : মুয়াবিয়া রা.-এর কাছে আম্মার বিন ইয়াসার রা. এর একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছিল বিদ্রোহীদের গোষ্ঠী তোমাকে হত্যা করবে। তখন তিনি আমর আবনুল আস-কে বললেন : যে তাকে নিয়ে এসেছিল সেই হত্যা করেছে, এর অর্থ হচ্ছে আলী রা.। এটা এমন এক ব্যাখ্যা যা প্রতিটি দৃষ্টিকোণ থেকেই বাতিলযোগ্য।৩২ অন্যথায় আমাদেরকে অবশ্যই বলতে হবে যে, নবি সা. নিজেই তার সেনাবাহিনীর শহিদদের হত্যাকারী ছিলেন, যেমন তাঁর চাচা হামজা ও মুসআব বিন উমায়ের এবং অন্যান্যের। নিঃসন্দেহে এটা এমন একজনের ব্যাখ্যা যার উদ্দেশ্য ও মানসিকতা শঠতা ও প্রবঞ্চনায় পরিপূর্ণ।
ধর্মীয় ও ধর্মতাত্ত্বিক দল-উপদলের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছিল পরস্পরবিরোধী। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল নিজ নিজ ঘরানার মতবাদ সমর্থন করা, তা এমনকি ভণ্ডামি ও স্বেচ্ছাচারের মাধ্যমেও। আমাদের সময় আমরা এমন কিছু লোককে দেখতে পাই যারা সহিহ হাদিস গ্রহণে বিরুদ্ধভাবাপন্ন, এমনকি মহান কুরআনের আয়াতের ক্ষেত্রেও সুতরাং তারা এগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যা তাদের জন্য অভিনব-অচেনা। এটা তারা করে তাদের আত্মার প্রবৃত্তি ও ভণ্ডামির জন্য। ভণ্ডামি অন্ধ ও বধির করে দেয়।
আল্লাহ তায়ালার পথনির্দেশ ছাড়াই যে নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে (সুরা কাসাস, ২৮: ৫০)?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00