📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি সংহত পথ

📄 একটি সংহত পথ


নবি সা.-এর সুন্নাহ্ হচ্ছে একটি ঐকতানের বা সংহতির পথ। এটি বিশ্বাসের সাথে বুদ্ধিবৃত্তির সংহতি সাধন করে, প্রত্যাদেশের সাথে যুক্তির সমন্বয় করে, যাতে এসব থেকে প্রবাহিত হয় জ্যোতির ওপর জ্যোতি (সুরা নূর, ২৪: ৩৫)।
এটি আইনের সাথে নৈতিক নির্দেশনা সংযুক্ত করে। সুন্নাহ্ হচ্ছে নির্দেশনার গঠন, ভিত্তি ও পরিচালনা। আইন প্রণয়নে এটি প্রতিরক্ষার সাথে, বল প্রয়োগের সাথে, শৃঙ্খলা ও শান্তির সাথে জড়িত। আইন ব্যতিরেকে নৈতিক নির্দেশনার কার্যকারিতা কমই এবং ঠিক তেমনি নৈতিক নির্দেশনা ছাড়া আইনের বাধ্যবাধকতা সামান্যই। নবি সা. একত্রে এ দুটির জন্যই দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুন্নাহর মধ্যে শক্তি ও ন্যায়ের সম্মিলন ঘটেছে। রাষ্ট্র ক্ষমতার সাথে কুরআনের, দ্বীনের প্রতি আহ্বানের। কারণ, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা সেই কর্তৃত্বের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করেন যা কুরআনের দ্বারা করেন না। যদি লোকদেরকে তাদের সৎ বিবেক মন্দকাজ থেকে বিরত রাখতে না পারে, তাহলে শক্তি তাদেরকে বিরত রাখতে পারে এবং যে এই আহ্বানের বিরোধিতা করে রাষ্ট্র তাকে শৃঙ্খলায় আনতে সমর্থ। কারণ প্রত্যেক অবস্থার জন্যই সহিষ্ণুতার একটি সীমা রয়েছে, যার বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই, যাতে তা মিথ্যা দ্বারা দলিত না হয়ে যায়। নবি সা. একই সাথে দ্বীনের দিকে আহ্বানও করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে, তিনি দ্বন্দ্ববিরোধের মীমাংসা করেছেন এবং তাদের নিয়ে প্রশাসন চালিয়েছেন, শান্তির সময়ে এবং যুদ্ধাবস্থায়। তিনি এমন ছিলেন না, যেমনটা বনি ইসরাঈল তাদের অগ্রগতির পর্যায়ে ছিল- একজন নবি যিনি তাদেরকে পরিচালনা করেছেন ও দ্বীনের দাওয়াতে দিকনির্দেশ করেছেন এবং রাজার মতো রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যাবলীতে তাদের প্রশাসন ও পরিচালনে নেতৃত্ব দিয়েছেন-যেমনটা কুরআন আমাদের সামনে বর্ণনা করেছে যে, তাদের নবি ইসরাঈলিদের সামনে বলেছেন,
আল্লাহ তালুতকে তোমাদের রাজা করেছেন (সুরা বাকারা, ২: ২৪৭)।
ইসলামি রীতিনীতির ধারাবাহিকতায় নবিগণের ক্ষেত্রে জীবনকে (কর্তব্যকে) আল্লাহ তায়ালা এবং সিজারের মধ্যে বিভক্ত করে নেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই, যেমনটা মসিহ (খ্রিস্টানদের যিশু) সম্পর্কে পাওয়া যায়। তাতে বলা হয় যে, ধর্ম আল্লাহ তায়ালার জন্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা সিজারের জন্য। বরং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে (রসুল সা.) একথাই উচ্চারণ করতে বলেছেন,
আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ- সবই বিশ্বজগতের প্রভু প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই (সাথী নেই)। বরং আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং মুসলিমদের মধ্যে (আল্লাহ কাছে আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে) আমিই প্রথম (সুরা আন'আম, ৬: ১৬৩-১৬৪)।
এভাবে এ সমাজটি প্রশাসিত হয়েছে এবং এর জীবন সামগ্রিকভাবে পরিচালিত হয়েছে কিতাব ও ন্যায়নীতির ভারসাম্য দ্বারা। যে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, সে-ই শৃঙ্খলায় এসেছে, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
আমি আমার রসুলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও (সত্যমিথ্যার) মানদণ্ড, যাতে মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে (সুরা হাদিদ, ৫৭: ২৫)।
ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, লোকদের হেদায়াতের জন্য কিতাব এবং সমর্থনের জন্য লৌহ (শক্তি) থাকতেই হবে।
এবং পথ প্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট (সুরা ফুরকান, ২৫: ৩১)।
নেতৃত্ব এবং জনগণকেও একত্রে সন্নিবেশ করা হয়েছিল। নেতা এমন কোনো ফেরেশতা নয় যা আসমানে ঘুরে বেড়াবে, বরং একজন মানব সন্তান যিনি বাস করবেন মাটির পৃথিবীতে। নেতা এমনও হবেন না যিনি বেদুঈনের মতো মনুষ্য বিবর্জিত পরিবেশে থাকবেন। বরং তার জন্য এটা বাধ্যতামূলক যে, তিনি তাদের একজন হয়ে তাদের সাথে থাকবেন, তাদের আনন্দ ও বেদনার ভাগীদার হবেন, তাদের সংকট ও সমস্যায় থাকবেন তাদের পাশেই। এটাই প্রকৃতপক্ষে তেমন, যেমনটা নবি সা. ছিলেন।
খাদ্যাভাব ঘটলে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ক্ষুধার্ত থাকতেন এবং সেই ব্যক্তি যিনি সবার পরে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতেন; যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান হতো সবার শীর্ষে; প্রার্থনায় তিনি মানুষের নেতা এবং আচার ব্যবহারে তাদের আদর্শ। যখন কোনো আগন্তুক আসত, সে লোকজনের মধ্যে নবি সা. কে আলাদা করতে পারত না এবং তাই জিজ্ঞাসা করত, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে? লোকেরা যখন মসজিদ নির্মাণ করত এবং পাথর বহন করত। তিনিও তাদের সাথে টানতেন, নির্মাণ কাজে তাদের সাথে তাঁর শ্রম যুক্ত করতেন, ফলে তাদের কেউ কেউ বলত: নবি সা. যখন পরিশ্রম করেন, তখন যদি আমরা বসে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য তা হবে নিন্দনীয়।
এই আদর্শিক প্যাটার্নের ছায়াতলে বিশ্বাসীগণ তাদের সমাজ যথার্থ গঠনের কাজে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, এটাকে আদর্শ করার উদ্দেশ্যে, যাতে করে তারা সমগ্র পৃথিবীর কাছে তাদের বাণী পৌছাতে পারেন। তাদের দ্বারা এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদনের দাবি ছিল সংহতি ও পারস্পরিক বুঝাপড়ার মধ্য দিয়ে তা করার, যার যেখানে স্থান এবং যার যেমন সামর্থ্য সে অনুযায়ী। বিদ্বান অবাধে তার বিদ্যা বিতরণ করতেন, ধনী বিলাতেন তার ধন, যশস্বী তার যশ এবং যার যেমন ক্ষমতা বা সামর্থ্য ছিল তারা তা সাধ্যানুযায়ী ব্যয় করতেন। আল্লাহ তায়ালাও তার বান্দার ওপর এমন বোঝা চাপান না যা বহনের সামর্থ্য তাকে তিনি দেননি। লোকদের মধ্যে দুর্বলতর ব্যক্তির দায়িত্বকে সম্মান করা হতো, তাদের মধ্যে শক্তিমানকে টানা হতো অন্যের সাহায্যার্থে এবং একত্রে তারা তাদের বিরোধী কিছুর মোকাবেলায় পরস্পর সহায়ক ছিলেন। সুতরাং তারা ছিলেন পরস্পরের বন্ধু, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রসুল-এর আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করেন (সুরা তাওবা, ৯: ৭১)।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি বাস্তবোচিত পদ্ধতি

📄 একটি বাস্তবোচিত পদ্ধতি


সুন্নাহ্ একটি বাস্তবতা সম্পন্ন পদ্ধতিও বটে। এটা মানুষকে এমন মনে করে না যে, তারা ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতা। বরং বিবেচনা করে মানুষ হিসেবেই, যারা খাদ্য গ্রহণ করে এবং হাটে বাজারে থাকে, যাদের রয়েছে রিপু ও আবেগ, তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তাদের রয়েছে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা যা তাদেরকে পৌঁছে দিতে পারে জান্নাতের মেজবানের কাছাকাছি। তারা সৃজিত হয়েছিল মৃত্তিকা ও ছাঁচে ঢালা দ্বারা, কিন্তু তাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার অধ্যাত্ম নিঃশ্বাসও ছিল। অতঃপর সামান্য বিস্ময় এই যে, মানব সন্তান উন্নত হয় এবং অবনত হয়। তার হয় উন্নতি ও সে হয় অধঃপতিত, অর্থাৎ সে পরিচালিত হয় ও উৎসন্নে যায়, কিংবা সে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকে কিংবা পথভ্রান্ত হয়, সে আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতা করে এবং অনুশোচনা করে।
একজন সাহাবি অনুভব করলেন যে, তিনি মুনাফিক হয়ে গেছেন। কারণ যখন বাড়িতে থাকেন তখনকার মনের অবস্থা এবং নবি সা.-এর সাথে থাকাকালীন মনের অবস্থার পার্থক্য ঘটে। তিনি নবি সা.-এর কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। তিনি রসুল সা.-এর কাছে তার মুনাফিকী ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, যখন তিনি তাঁর সা. সাথে থাকেন তখন তার হৃদয় দ্রবীভূত ও কোমল থাকে, চক্ষু থাকে অশ্রুসিক্ত এবং তিনি তাঁর প্রভুর জিকিরে রত থাকেন, তিনি তার সামনে যেন পরকালীন জীবনকে নিজ চোখে দেখতে পান। তারপর যখন তিনি তার পরিবারে ফিরে যান, সন্তান-সন্ততির সাথে কৌতুক করেন, স্ত্রীর সাথে ক্রীড়ায় মত্ত হন, তখন তার মধ্যে পূর্বেকার অবস্থা অবলুপ্ত হয়ে যায়। একথা শুনে রসুল সা. বললেন, ওহে হানযালা! আমার সাথে থাকাকালীন মনের অবস্থা যদি তুমি ধরে রাখতে পারতে, তাহলে রাস্তাঘাটে ফেরেশতারা তোমার সাথে মুসাফাহা করতো। কিন্তু হানযালা, এটার জন্য এক রকম সময় এবং ওটার জন্য সময় অন্য রকম।
এটি একটি সুপরিচিত কথা যে, মানুষ স্বচ্ছ ও স্পষ্ট, অতঃপর তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং ঢুলুঢুলু। এতে কোনো ক্ষতি নেই যদি তার সময় এবং জীবন তার জন্য যা কল্যাণকর তাতে এবং তার প্রভুর হক আদায়ের মাঝে ব্যয়িত হয়, অথবা ইহকাল ও পরকালের মধ্যে, যেমনটা বলা হয়েছে এই আপ্ত বাক্যে, এক ঘণ্টা তোমার আত্মার জন্য এবং এক ঘণ্টা তোমার প্রভুর জন্য।
এটার অনুমোদন বা স্বীকৃতিস্বরূপ সুন্নাহ্ মানবীয় দুর্বলতার জন্য অবকাশ দিয়েছে। এটা বৈধ বিষয়বস্তুর সীমা প্রশস্ত করেছে এবং নিষিদ্ধতার সীমা করেছে সংকুচিত, যেমন এই হাদিসে বলা হয়েছে: আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল এবং তিনি যা নিষিদ্ধ করেছেন তা হারাম এবং যেই বিষয়ে তিনি নীরব রয়েছেন তা এর (নির্দেশনা থেকে) বাইরে। অতএব আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত সীমারেখা গ্রহণ করো। কারণ নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কখনই কোনোকিছু সম্পর্কে উদাসীন নন। অতঃপর রসুল সা. তিলাওয়াত করলেন, তোমার প্রতিপালক কখনই ভুলে যান না (সুরা মারইয়াম, ১৯: ৬৪)১০।
মানবীয় দুর্বলতার আরো স্বীকৃতির বিষয়ে সুন্নাহ্ পরিস্থিতি অনুযায়ী সেসব ক্ষেত্র বৈধ করেছে যা সাধারণভাবে অবৈধ। এমনকি প্রয়োজনের পরিপ্রক্ষিতে এমন কিছুকে বৈধ করা হয়েছে যা স্বাভাবিকভাবেই অবৈধ। উদাহরণস্বরূপ, রসুল সা. তাঁর দুজন সাহাবিকে তাঁদের চর্মরোগের কারণে রেশমি বস্ত্র পরিধানের অনুমতি দিয়েছেন।
মানব জীবনে বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্নাহ্ নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে এবং সেই ব্যক্তির প্রতি দয়ার্দ্র হয়েছে যখন সে অবাধ্যতায় পতিত হয়। অনুশোচনার সময়ে এটি দরজা বন্ধ করেনি। বরং তার সামনে উন্মুক্ত করেছে প্রশস্তভাবে, যাতে সে ওই দরজার কড়া নাড়তে পারে প্রভুর সামনে অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে অধোবদনে। যেমনটা হাদিসে বলা হয়েছে: রজনীব্যাপী আল্লাহ তায়ালা তাঁর হস্ত প্রসারিত করেন, যাতে তিনি দিনের বেলার কৃত অপরাধের অনুশোচনা গ্রহণ করতে পারেন এবং তিনি দিনের বেলায় তাঁর হস্ত প্রসারিত করেন যাতে তিনি রাত্রে কৃত অপরাধের জন্য অনুশোচনা গ্রহণ করতে পারেন- যতদিন পর্যন্ত না সূর্য পশ্চিমে উদিত হয়"।
অন্য এক হাদিসে এসেছে : যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, তোমরা যদি পাপকাজ না করো এবং ক্ষমা না চাও, তিনি তোমাদেরকে অপসারিত করবেন এবং পরিবর্তে এমন লোকদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবেন যারা অন্যায় করবে ও ক্ষমা চাইবে তাঁর কাছে এবং তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন।১২
মানুষের অবস্থাগত ভিন্নতা এবং পারস্পরিক ভিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে সুন্নাহ্ অবকাশ দিয়েছে, সে ভিন্নতা সহজাতই হোক কিংবা অর্জিতই হোক। এসব ভিন্নতা বিবেচনায় রসুল সা. কয়েকজন লোকের একটি প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন জবাব দিয়েছেন। তাই তিনি ঐ (মুয়ামালাত) ব্যাপারে বৃদ্ধ ব্যক্তিকে এমন নির্দেশ দেননি যা দিয়েছেন একজন যুবককে, অথবা অভাবীকে দেননি এমন নির্দেশ যা প্রাচুর্যের অধিকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অথবা যে ব্যক্তি কাজে কর্মে স্বাধীন। একইভাবে, তিনি লোকদের প্রথা ও বৈচিত্র্য বিবেচনায় রেখেছেন। তাই তিনি সা. আবিসিনীয়দেরকে ঈদের দিনে তাঁর মসজিদে তাদের বর্শা নিয়ে খেলার অনুমতি দিয়েছেন এবং আয়শা রা. কে তাঁর (রসুল সা.) পিছনে দাঁড়িয়ে তা উপভোগের অনুমতি দিয়েছেন। একইভাবে তিনি (রসুল সা.) বালিকাদের আয়শা রা. আনহু-এর সাথে খেলার অনুমতি দিয়েছেন আয়শা রা. আনহু-এর তরুণ বয়সের কথা বিবেচনায়। তাই তিনি বিবাহ শাদিতে বা কারো দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির পর প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এবং অন্য এধরনের উপলক্ষকে কেন্দ্র করে মানুষের বিনোদন ও আনন্দ উপভোগের নিমিত্ত আমোদ প্রমোদের অনুমতি দিয়েছেন।১৩
সুন্নাহ্ মধ্যে অন্তর্নিহিত এ বাস্তবতা অনেক উদাহরণ দিয়েই বর্ণনা করা যেতে পারে। কিন্তু এর সবই আল্লাহ তায়ালা-নির্দেশিত রসুল সা.-এর নমুনার মডেল সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করা উদ্দেশ্যে।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি সহজীকৃত পথ

📄 একটি সহজীকৃত পথ


সুন্নাহ্ পথের আরেকটি বিশেষ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর আনুকূল্য, এর সুবিধা এবং এর সহিষ্ণুতা। পূর্বতন কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জিলের মধ্যে বর্ণিত নবি সা.-এর গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তাদের নির্দেশ দেবেন যা সত্য তা প্রতিপালনের এবং নিষেধ করবেন খারাপ থেকে; তিনি তাদের জন্য উত্তম বস্তুনিচয়কে বৈধ করবেন এবং অধম বস্তুনিচয়কে অবৈধ করবেন এবং তিনি তাদেরকে ভারমুক্ত করবেন এবং বিরাজমান বাধা দূর করবেন” (আল-আরাফ, ৭ : ১৫৭)। সুতরাং রসুল সা.-এর সুন্নাহর মধ্যে এমন কিছু নেই যা মানুষের দ্বীনী জীবনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে (দ্বীনকে বাধাগ্রস্ত করা) অথবা তাদেরকে পার্থিব জীবনে (দুনিয়ায়) নির্যাতিত করতে পারে।
বরং, রসুল সা. তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেন: প্রকৃতপক্ষে আমাকে তোমাদের জন্য উপহারস্বরূপ প্রদান করা হয়েছে। তাঁর এ কথা কুরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যা:
এবং আমরা আপনাকে বিশ্বজগতের রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি (সুরা আম্বিয়া, ২১: ১০৭)।
তিনি (রসুল সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্লেশদায়ক করে প্রেরণ করেননি, কারো জন্য কষ্ট বহন করে আনুক এমন কাজেও পাঠাননি; বরং তিনি আমাকে শিক্ষক এবং অন্যের কষ্ট লাঘবের উপায় করে প্রেরণ করেছেন"১৪।
রসুল সা. আবু মুসা রা. ও মুয়ায রা. কে সংক্ষিপ্ত ও ব্যাপক অর্থবোধক নির্দেশনা দিয়ে ইয়েমেন যাত্রায় বিদায় জানিয়েছিলেন: মানুষের জন্য সহজ করে দিও, কঠিন করে দিও না; শুভ সংবাদ দিও (যাতে তারা আশান্বিত হয়) এবং তাদের মধ্যে বিরূপ ভাব উস্কে দিও না; পরস্পরের কথা শুনো এবং দূরত্বের বিস্তার ঘটাবে না।১৬ তাঁর উম্মাতকে শিক্ষাদান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সহজতর করো, কঠিনতর করো না ও উত্তম প্রত্যাশা জাগিয়ে দিও, বিচ্ছেদ উস্কে দিও না"১৭।
এক বেদুঈন যখন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল, তখন সাহাবিরা রা. উত্তেজিত হয়ে উঠলে তিনি (রসুল সা.) বললেন, তোমরা এমন এক জাতিরূপে আবির্ভূত হয়েছ যারা সহজ করে দেবে, কঠিন করবে না।১৮ তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাত সম্পর্কে তিনি বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি একটি সহিষ্ণু সত্য দ্বীন (প্রচার ও প্রতিষ্ঠা) এর দায়িত্ব নিয়ে এসেছি।১৯ তিনি বলেন, হে লোক সকল! তোমাদের ওপর ঐ সব দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে যা তোমরা পালন করার সামর্থ্য রাখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষান্ত হন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা ক্ষান্ত হও২০।
কুরআনের জ্যোতির ধাঁচে রসুল সা. বিষয়াদিকে সহজ করেছিলেন, যাতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য সহজ করতে চান, কাঠিন্য চান না এবং তিনি দ্বীনের দায়িত্ব পালনে তাদের ওপর কোনো বোঝা চাপাতে চান না। সেমতে, তিনি বিশুদ্ধতা অর্জনমূলক আয়াতের শেষে বলেছেন:
আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর সংকীর্ণতা চাপিয়ে দিতে চান না (সুরা মায়েদা, ৫: ৬)।
এবং বিবাহে নিষেধাজ্ঞার পর্যায় বর্ণনার পর বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ভার হাল্কা করতে চান, কারণ মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে (সুরা নিসা, ৪: ২৮)।
তাই বলা যায় যে, রসুল সা. দ্বীনের বিষয়ে অকারণ পাণ্ডিত্য প্রদর্শন ও বাড়াবাড়ির ক্ষেত্রে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। এ কারনেই তিনি কৌমার্য অবলম্বন ও সন্ন্যাস অবলম্বন করতে কিংবা জীবনের জন্য হিতকর বিষয়াদি বর্জন করতে নির্দেশ দান করেননি। বরং তিনি সুষমভাবে জীবনকে উপভোগ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদেরকে দেওয়া আনুকূল্যের প্রকাশ দেখতে চান। তিনি উদার হতে বলেছেন এবং পবিত্রতা অর্জন (ওজু), নামাজ, রোজা ও হজের কর্তব্যকর্মকে হালকা করেছেন। তাই তিনি প্রয়োজনে ওজুর পরিবর্তে তায়াম্মুম করার বিধান দিয়েছেন; সালাতকে সংক্ষিপ্ত ও দুই সালাতকে একত্রিত করতে বলেছেন; অসুস্থতা বা অপারগতার ক্ষেত্রে বসে, শুয়ে বা ইশারায় সালাত আদায় করতে বলেছেন এবং রমজান মাসে অসুস্থ ব্যক্তি, মুসাফির, গর্ভবতী স্ত্রীলোক ও দুগ্ধমাতার জন্য সিয়াম ভাঙার ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। সফররত অবস্থায় মাথার ওপর ছায়া দিয়ে রাখা হচ্ছিল এবং গায়ে পানির ঝাপটা দেওয়া হচ্ছিল এমন এক ব্যক্তি সম্বন্ধে রসুল সা. বলেছেন, সফরকালে সিয়াম পালনে কোনো পুণ্য নাই। অর্থাৎ লম্বা সফরের উদ্দেশে ভ্রমণ কষ্টকর ও ক্লান্তিকর। বৃষ্টির মতো বাধা সৃষ্টিকারী অবস্থায় অনুপস্থিতি বা সফরের অবস্থা ব্যতিরেকেই তিনি মদিনা থাকাকালীন সময়ের জন্য জোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে পড়ার অনুমতি দিয়েছেন। এ হাদিসের বর্ণনাকারী ইবনে আব্বাস রা. কে যখন প্রশ্ন করা হলো: এর দ্বারা তিনি কি বুঝিয়েছেন? তিনি বলেছেন, তাঁর মনোভাব ছিল উম্মাহকে কষ্ট না দেওয়া। অন্য কথায় তিনি তাঁর উম্মাহর ওপর থেকে বোঝা প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন যে, তোমরা তাঁর অভিপ্রায় অনুযায়ী কাজ করবে এবং তিনি তাঁর অবাধ্যতাকে ঘৃণা করেন এবং আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন তাঁর অভিপ্রায় চরিতার্থ হওয়াকে, যেমন তিনি চান তোমরা তাঁর নির্দেশ মোতাবেক আমল করো২৬।
একদিন তাঁর কয়েকজন সাহাবি তাঁর কাছে এই বলে অভিযোগ করলেন যে, আমর ইবনুল আস অপবিত্র (বড় ধরনের নাপাকী) হয়েছেন, কিন্তু গোসল না করে কেবল তায়াম্মুম করেই তাদের সাথে সালাত আদায় করেছেন। এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে আমর বললেন, ঐ রাত্রে ভীষণ ঠাণ্ডা ছিল এবং আমার স্মৃতিতে আল্লাহ তায়ালার এই উক্তি জাগরুক ছিল যে,
মহামহিমান্বিত তিনি এবং তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য পরম দয়ালু (সুরা নিসা, ৪: ২৯)।
একথা শুনে আল্লাহর রসুল সা. মুচকি হাসলেন-এটা ছিল আমরের ঐ কাজ অনুমোদনের ইঙ্গিত।
অন্য এক ঘটনা: এক লোক জখম হয়েছিল, তারপর সে জুনুবি (নাপাক) হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলল যে, জখম হওয়া সত্ত্বেও তাকে গোসল করাতে হবে, গোসলের পর তার অবস্থার অবনতি হলো এবং শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল। এ সংবাদ নবি সা.-এর কাছে পৌছালে তিনি বললেন, ওরা তাকে হত্যা করল! আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে হত্যা করুন! তারা যেটা জানে না, সেটা সম্বন্ধে কেন জিজ্ঞাসা করে না? জ্ঞানহীনতার একমাত্র প্রতিকার হচ্ছে প্রশ্ন করা'২৭।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 সুন্নাহর প্রতি মুসলিমদের কর্তব্য

📄 সুন্নাহর প্রতি মুসলিমদের কর্তব্য


যেমনটা আমরা বলেছি, মুসলিম ব্যক্তি এবং মুসলিম সমাজজীবনের জন্য সুন্নাহ্ হচ্ছে জীবনযাপনের বিস্তারিত প্যার্টান বা নকশা এবং এটা হচ্ছে কুরআনের ব্যাখ্যার প্রতিফলন। ইসলাম জীবন জুড়ে অঙ্গীভূত। মুসলিমদের কর্তব্য হচ্ছে: রসুল সা.- এর এই বিস্তারিত প্যাটার্নকে জানা এর স্বতন্ত্র উপাদানসহ, বিশেষত এর ব্যাপকতা ও পূর্ণাঙ্গতা, এর ভারসাম্য, এর বাস্তবতা এবং এর সুবিধা সম্পর্কে জানা। তাদের জানা উচিত মর্মমূলে প্রোথিত দয়ার্দ্রতা, মহান মানবতা এবং নির্ভেজাল গুণাবলী কত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তারা তাদের সামগ্রিক জীবনযাপনে তাঁকেই উত্তম আদর্শিক নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে।
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ তায়ালা ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহ তায়ালাকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য আল্লাহর রসুল-এর মধ্যে উত্তম আদর্শ (সুরা আহযাব, ৩৩: ২১)।
রসুল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো, আর তোমাদেরকে যা থেকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাকো (সুরা হাশর, ৫৯: ৭)।
বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসতে চাও, তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন (সুরা আলে ইমরান, ৩: ৩১)।
এটি এই সুন্নাহ্ সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টিগত দক্ষতা শিক্ষাকে মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক করে, কিভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে, বুঝাপড়া এবং যথাযথ শিষ্টাচারের সাথে। কারণ এই উম্মাহর সর্বোত্তম প্রজন্ম তা কার্যকর করেছেন, যারা আন্তরিকতার সাথে শিক্ষালাভ করেছেন হজরত মুহাম্মদ সা.-এর শিক্ষালয়ে। তাঁর সাহাবিগণ এবং তাদের পরবর্তীগণ (তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ি) তাঁর শিক্ষাগ্রহণে চরম উৎকর্ষ লাভ করেছেন, তারপর যা তারা শিখেছেন তা কাজে প্রয়োগ করেছেন এবং আমলের ক্ষেত্রেও চরম উৎকর্ষ দেখিয়েছেন। তারপর তারা শিখিয়েছেন ইসলামের নেতৃত্ববৃন্দকে এবং শিক্ষাদানেও তারা ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের।
সাম্প্রতিককালে যে সংকট মুসলিমগণ মোকাবেলা করছে তার মধ্যে সর্বপ্রথম হচ্ছে চিন্তাগত সংকট। আমার মতে, এটা বিবেকের সংকটের ওপর স্থান নিয়েছে। এটা সর্বদাই সেই চিন্তাধারা গঠনে- যা অন্তরায় সৃষ্টি করে- তার পথ তৈরি করে যাচ্ছে। তারপর আসছে আন্দোলন, এরপর চিন্তার তৈরি নকশার সাথে ধারণার মেলবন্ধন হচ্ছে। চিন্তার সংকটে যা সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে তা সুন্নাহ্ সম্বন্ধে অন্তর্দৃষ্টি এবং এর প্রয়োগের সংকট। এটাই ছিল ইসলামি পুনর্জাগরণে কিছু আন্দোলনের বিশেষ প্রপঞ্চ।
অধিকতর লক্ষ্যণীয় হলো, ঐসব আন্দোলনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ এবং এগুলোর ওপর প্রত্যাশা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং বিশ্বময় উম্মাহর নেতৃবৃন্দের নিজেদেরকে প্রত্যাশার দিকে নিবদ্ধ করা। প্রায়ই ঐসব আন্দোলন সুন্নাহ্ সম্বন্ধে ভুল বুঝাপড়ার ভিত্তিতে ইস্যু উপস্থাপন করে থাকে। এ সম্বন্ধে তাদের মতামত অপর্যাপ্ত। এটি সুন্নাহকে বাহ্যিক প্রদর্শনী এবং আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করা ছাড়া কিছুই নয়, যার মধ্যে রসুল সা.-এর নমুনার জ্ঞানের গভীরে অন্তঃপ্রবেশের বালাই ছিল না, যাঁর বিশেষ গুণাবলীর বিবরণ আমরা পূর্বেই প্রদান করেছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00