📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি সুবিস্তৃত নমুনা

📄 একটি সুবিস্তৃত নমুনা


আল্লাহ তায়ালা বলেন, এবং আমরা আপনার প্রতি নাজিল করেছি এই কিতাব, প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্টকরণের উন্নয়ন হিসেবে (সুরা নাহল, ১৬: ৮৯)।
সে মতে, সুন্নাহ্ হচ্ছে সেই নকশা বা আদর্শ যার বিস্তৃতি ও পূর্ণাঙ্গতা অনন্য, সমগ্র মানবজীবনের পরিধি তথা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা অন্তর্ভুক্ত। দৈর্ঘ্য বলতে আমরা বুঝি এর ইহজাগতিক বা উল্লম্ব পরিসীমাকে, জন্ম থেকে মৃত্যু, প্রকৃতপক্ষে ভ্রুণের জীবন পর্যায় থেকে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন অবধি। প্রস্থ বলতে আমরা বুঝি আদিগন্ত বিস্তারকে, যা জীবনের সকল ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। নবি সা.-এর নির্দেশনা সবকিছুতেই পৌঁছে: গৃহে, বাজারে, মসজিদে, পথে, কাজে, আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের সাথে, পরিবারের সাথে, মুসলিমদের সাথে, অমুসলিমদের সাথে এবং সাধারণভাবে মানবজাতির সাথে, জীবন্ত প্রাণী ও জড় বস্তুর সাথে। গভীরতা বলতে আমরা বুঝি মানবজীবনের গভীরতর পরিসীমাকে। তবে এটি শরীরের সাথে সাথে মন ও আত্মাকে যেমন, তেমনি অন্তঃস্থের পাশাপাশি বহিঃস্থ এবং সর্বোপরি কথা, কাজ এবং অভীপ্সাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছুসংখ্যক মুসলিম দাড়ি বড় করে রাখা এবং পোশাক সংক্ষিপ্ত করা ছাড়া সামান্যই জানেন সুন্নাহ্ সম্পর্কে। সেই সাথে আরাক (arak) গাছের দাঁতন (miswak) দ্বারা দাঁত পরিষ্কার করা পর্যন্তই। তারা নবি সা.-এর আদর্শের ব্যাপকতা ভুলে যান, যার মধ্যে অবস্থা বা পরিবেশের ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রত্যেকেই তাদের মডেল প্রাপ্তির সুযোগ লাভ করতে পারেন।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি

📄 একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি


সুন্নাহকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা যায় এর ভারসাম্য দ্বারা। এ ভারসাম্য হচ্ছে আত্মা ও দেহ; মন ও হৃদয়; এই পৃথিবী ও এর পরবর্তী জীবন; ভাবগত এবং প্রকৃত; তত্ত্ব ও বাস্তব; অদৃশ্য ও দৃশ্যমান; স্বাধীনতা ও দায়িত্ব; ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সমূহবাদ; সাদৃশ্য ও উদ্ভাবন সামর্থ্য ইত্যাদির মধ্যে। তাই এটাকে হতে হয়েছে একটি মডারেট সমাজের জন্য একটি মডারেট বা উপযোগী আদর্শিক পদ্ধতি যার মধ্যে অতিরিক্ত বোঝা চাপানো কিংবা একেবারেই সামান্য কাজের অবকাশ নেই।
আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন: যাতে তোমরা ভারসাম্য লঙ্ঘন না করো। ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিও না (সুরা আর রহমান, ৫৫: ৮-৯)।
নবি করিম সা. যখন তাঁর সাহাবিদের মধ্যে চরম কোনো কিছু লক্ষ্য করতেন, তখন তিনি দৃঢ়তার সাথে তাদেরকে মিতব্যয়ের দিকে ফেরাতেন এবং বাড়াবাড়ি বা অপর্যাপ্ততার পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করতেন। তিনি ঐ তিনটি লোকের কাজকে বাতিল করে দিয়েছেন যারা তাঁর ইবাদত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল এমনভাবে যে, তারা এটাকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে এবং আত্মনিবেদনের ক্ষেত্রে তাদের তৃষ্ণা মেটেনি। তাদের একজন বলেছিল, সে সারাজীবন সিয়াম পালন করবে এবং তাতে কোনো বিরতি দেবে না; অন্যজনের বক্তব্য ছিল, সে সারা রাত্রি সালাতে দণ্ডায়মান থাকবে, বিশ্রাম নেবে না; তৃতীয়জন বলেছিল, সে স্ত্রীলোক থেকে দূরে থাকবে এবং বিবাহ করবে না। তাদের কথাবার্তা যখন তাঁর কানে পৌছাল, তিনি বললেন, সাবধান! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বেশি ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশি আল্লাহ তায়ালা-সচেতন; তা সত্ত্বেও আমি সিয়াম পালন করি এবং খাই, আমি সালাত আদায় করি এবং বিশ্রাম নিই এবং স্ত্রীলোককে বিবাহ করেছি। অতঃপর যে ব্যক্তি আমার এ সুন্নাহকে বাদ দিয়ে (অন্যকিছু) বেছে নিল, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়’৬। সিয়াম পালনে আবদুল্লাহ ইবনে আমরের বাড়াবাড়ি কিংবা রাত্রি জেগে সালাতে কুরআন তেলাওয়াত দেখে তিনি তাকে পরিমিতর দিকে ফিরিয়ে দেন একথা বলে, প্রকৃতপক্ষে তোমার কাছে তোমার শরীরের হক রয়েছে (তা হচ্ছে বিশ্রাম), তোমার চোখের হক রয়েছে (তা হচ্ছে ঘুম) এবং তোমার অতিথিদের হক রয়েছে (অর্থাৎ তাদের আতিথেয়তা ও সঙ্গ প্রদান)’৭। অন্য কথায়: প্রত্যেক প্রাপককে তার অধিকার প্রদান করা।
নবি সা. তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী তাঁর সুন্নাহ্ ও জীবনেতিহাসের মাধ্যমে ভারসাম্য ও মিতাচারের সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেছেন- তাঁর প্রভু পরোয়ারদিগারের সাথে, তাঁর নিজের সাথে, পরিবারের সাথে, সাহাবিগণের সাথে এবং সামগ্রিকভাবে তাঁর উম্মাতের লোকদের সাথে লেনদেনের মধ্য দিয়ে।
অধিকাংশ সময় যেজন্য তিনি প্রার্থনা করতেন তা কুরআনের মধ্যে উদ্ধৃত হয়ে রয়েছে:
হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে ইহজীবনের কল্যাণ দান করো এবং কল্যাণ দান করো পরজীবনে এবং আমাদেরকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন হতে (সুরা বাকারা, ২: ২০১)।
তাঁর প্রার্থনার মধ্যে ছিল, হে মালিক আমার, আমার দ্বীনকে এমন করে দাও, যা আমার আমলের রক্ষাকবচ হবে; আমার পৃথিবীকে আমার অনুকূল করো, যেখানে আমার জীবন ও জীবিকা রয়েছে এবং আমার পরকালীন জীবনকে সুন্দর করো, যেখানে আমার প্রত্যাবর্তন; প্রতিটি ভালো কাজের দ্বারা আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করো এবং আমার মৃত্যুকে করো সকল মন্দ হতে বিরতির বস্তু’৮।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি সংহত পথ

📄 একটি সংহত পথ


নবি সা.-এর সুন্নাহ্ হচ্ছে একটি ঐকতানের বা সংহতির পথ। এটি বিশ্বাসের সাথে বুদ্ধিবৃত্তির সংহতি সাধন করে, প্রত্যাদেশের সাথে যুক্তির সমন্বয় করে, যাতে এসব থেকে প্রবাহিত হয় জ্যোতির ওপর জ্যোতি (সুরা নূর, ২৪: ৩৫)।
এটি আইনের সাথে নৈতিক নির্দেশনা সংযুক্ত করে। সুন্নাহ্ হচ্ছে নির্দেশনার গঠন, ভিত্তি ও পরিচালনা। আইন প্রণয়নে এটি প্রতিরক্ষার সাথে, বল প্রয়োগের সাথে, শৃঙ্খলা ও শান্তির সাথে জড়িত। আইন ব্যতিরেকে নৈতিক নির্দেশনার কার্যকারিতা কমই এবং ঠিক তেমনি নৈতিক নির্দেশনা ছাড়া আইনের বাধ্যবাধকতা সামান্যই। নবি সা. একত্রে এ দুটির জন্যই দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুন্নাহর মধ্যে শক্তি ও ন্যায়ের সম্মিলন ঘটেছে। রাষ্ট্র ক্ষমতার সাথে কুরআনের, দ্বীনের প্রতি আহ্বানের। কারণ, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা সেই কর্তৃত্বের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করেন যা কুরআনের দ্বারা করেন না। যদি লোকদেরকে তাদের সৎ বিবেক মন্দকাজ থেকে বিরত রাখতে না পারে, তাহলে শক্তি তাদেরকে বিরত রাখতে পারে এবং যে এই আহ্বানের বিরোধিতা করে রাষ্ট্র তাকে শৃঙ্খলায় আনতে সমর্থ। কারণ প্রত্যেক অবস্থার জন্যই সহিষ্ণুতার একটি সীমা রয়েছে, যার বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই, যাতে তা মিথ্যা দ্বারা দলিত না হয়ে যায়। নবি সা. একই সাথে দ্বীনের দিকে আহ্বানও করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে, তিনি দ্বন্দ্ববিরোধের মীমাংসা করেছেন এবং তাদের নিয়ে প্রশাসন চালিয়েছেন, শান্তির সময়ে এবং যুদ্ধাবস্থায়। তিনি এমন ছিলেন না, যেমনটা বনি ইসরাঈল তাদের অগ্রগতির পর্যায়ে ছিল- একজন নবি যিনি তাদেরকে পরিচালনা করেছেন ও দ্বীনের দাওয়াতে দিকনির্দেশ করেছেন এবং রাজার মতো রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যাবলীতে তাদের প্রশাসন ও পরিচালনে নেতৃত্ব দিয়েছেন-যেমনটা কুরআন আমাদের সামনে বর্ণনা করেছে যে, তাদের নবি ইসরাঈলিদের সামনে বলেছেন,
আল্লাহ তালুতকে তোমাদের রাজা করেছেন (সুরা বাকারা, ২: ২৪৭)।
ইসলামি রীতিনীতির ধারাবাহিকতায় নবিগণের ক্ষেত্রে জীবনকে (কর্তব্যকে) আল্লাহ তায়ালা এবং সিজারের মধ্যে বিভক্ত করে নেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই, যেমনটা মসিহ (খ্রিস্টানদের যিশু) সম্পর্কে পাওয়া যায়। তাতে বলা হয় যে, ধর্ম আল্লাহ তায়ালার জন্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা সিজারের জন্য। বরং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে (রসুল সা.) একথাই উচ্চারণ করতে বলেছেন,
আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ- সবই বিশ্বজগতের প্রভু প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই (সাথী নেই)। বরং আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং মুসলিমদের মধ্যে (আল্লাহ কাছে আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে) আমিই প্রথম (সুরা আন'আম, ৬: ১৬৩-১৬৪)।
এভাবে এ সমাজটি প্রশাসিত হয়েছে এবং এর জীবন সামগ্রিকভাবে পরিচালিত হয়েছে কিতাব ও ন্যায়নীতির ভারসাম্য দ্বারা। যে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, সে-ই শৃঙ্খলায় এসেছে, যেমনটা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
আমি আমার রসুলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও (সত্যমিথ্যার) মানদণ্ড, যাতে মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে (সুরা হাদিদ, ৫৭: ২৫)।
ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, লোকদের হেদায়াতের জন্য কিতাব এবং সমর্থনের জন্য লৌহ (শক্তি) থাকতেই হবে।
এবং পথ প্রদর্শক ও সাহায্যকারী হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট (সুরা ফুরকান, ২৫: ৩১)।
নেতৃত্ব এবং জনগণকেও একত্রে সন্নিবেশ করা হয়েছিল। নেতা এমন কোনো ফেরেশতা নয় যা আসমানে ঘুরে বেড়াবে, বরং একজন মানব সন্তান যিনি বাস করবেন মাটির পৃথিবীতে। নেতা এমনও হবেন না যিনি বেদুঈনের মতো মনুষ্য বিবর্জিত পরিবেশে থাকবেন। বরং তার জন্য এটা বাধ্যতামূলক যে, তিনি তাদের একজন হয়ে তাদের সাথে থাকবেন, তাদের আনন্দ ও বেদনার ভাগীদার হবেন, তাদের সংকট ও সমস্যায় থাকবেন তাদের পাশেই। এটাই প্রকৃতপক্ষে তেমন, যেমনটা নবি সা. ছিলেন।
খাদ্যাভাব ঘটলে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ক্ষুধার্ত থাকতেন এবং সেই ব্যক্তি যিনি সবার পরে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতেন; যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান হতো সবার শীর্ষে; প্রার্থনায় তিনি মানুষের নেতা এবং আচার ব্যবহারে তাদের আদর্শ। যখন কোনো আগন্তুক আসত, সে লোকজনের মধ্যে নবি সা. কে আলাদা করতে পারত না এবং তাই জিজ্ঞাসা করত, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে? লোকেরা যখন মসজিদ নির্মাণ করত এবং পাথর বহন করত। তিনিও তাদের সাথে টানতেন, নির্মাণ কাজে তাদের সাথে তাঁর শ্রম যুক্ত করতেন, ফলে তাদের কেউ কেউ বলত: নবি সা. যখন পরিশ্রম করেন, তখন যদি আমরা বসে থাকি, তাহলে আমাদের জন্য তা হবে নিন্দনীয়।
এই আদর্শিক প্যাটার্নের ছায়াতলে বিশ্বাসীগণ তাদের সমাজ যথার্থ গঠনের কাজে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, এটাকে আদর্শ করার উদ্দেশ্যে, যাতে করে তারা সমগ্র পৃথিবীর কাছে তাদের বাণী পৌছাতে পারেন। তাদের দ্বারা এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদনের দাবি ছিল সংহতি ও পারস্পরিক বুঝাপড়ার মধ্য দিয়ে তা করার, যার যেখানে স্থান এবং যার যেমন সামর্থ্য সে অনুযায়ী। বিদ্বান অবাধে তার বিদ্যা বিতরণ করতেন, ধনী বিলাতেন তার ধন, যশস্বী তার যশ এবং যার যেমন ক্ষমতা বা সামর্থ্য ছিল তারা তা সাধ্যানুযায়ী ব্যয় করতেন। আল্লাহ তায়ালাও তার বান্দার ওপর এমন বোঝা চাপান না যা বহনের সামর্থ্য তাকে তিনি দেননি। লোকদের মধ্যে দুর্বলতর ব্যক্তির দায়িত্বকে সম্মান করা হতো, তাদের মধ্যে শক্তিমানকে টানা হতো অন্যের সাহায্যার্থে এবং একত্রে তারা তাদের বিরোধী কিছুর মোকাবেলায় পরস্পর সহায়ক ছিলেন। সুতরাং তারা ছিলেন পরস্পরের বন্ধু, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন:
মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রসুল-এর আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করেন (সুরা তাওবা, ৯: ৭১)।

📘 সুন্নাহ্ র সান্নিধ্যে > 📄 একটি বাস্তবোচিত পদ্ধতি

📄 একটি বাস্তবোচিত পদ্ধতি


সুন্নাহ্ একটি বাস্তবতা সম্পন্ন পদ্ধতিও বটে। এটা মানুষকে এমন মনে করে না যে, তারা ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতা। বরং বিবেচনা করে মানুষ হিসেবেই, যারা খাদ্য গ্রহণ করে এবং হাটে বাজারে থাকে, যাদের রয়েছে রিপু ও আবেগ, তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তাদের রয়েছে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা যা তাদেরকে পৌঁছে দিতে পারে জান্নাতের মেজবানের কাছাকাছি। তারা সৃজিত হয়েছিল মৃত্তিকা ও ছাঁচে ঢালা দ্বারা, কিন্তু তাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার অধ্যাত্ম নিঃশ্বাসও ছিল। অতঃপর সামান্য বিস্ময় এই যে, মানব সন্তান উন্নত হয় এবং অবনত হয়। তার হয় উন্নতি ও সে হয় অধঃপতিত, অর্থাৎ সে পরিচালিত হয় ও উৎসন্নে যায়, কিংবা সে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকে কিংবা পথভ্রান্ত হয়, সে আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতা করে এবং অনুশোচনা করে।
একজন সাহাবি অনুভব করলেন যে, তিনি মুনাফিক হয়ে গেছেন। কারণ যখন বাড়িতে থাকেন তখনকার মনের অবস্থা এবং নবি সা.-এর সাথে থাকাকালীন মনের অবস্থার পার্থক্য ঘটে। তিনি নবি সা.-এর কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। তিনি রসুল সা.-এর কাছে তার মুনাফিকী ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, যখন তিনি তাঁর সা. সাথে থাকেন তখন তার হৃদয় দ্রবীভূত ও কোমল থাকে, চক্ষু থাকে অশ্রুসিক্ত এবং তিনি তাঁর প্রভুর জিকিরে রত থাকেন, তিনি তার সামনে যেন পরকালীন জীবনকে নিজ চোখে দেখতে পান। তারপর যখন তিনি তার পরিবারে ফিরে যান, সন্তান-সন্ততির সাথে কৌতুক করেন, স্ত্রীর সাথে ক্রীড়ায় মত্ত হন, তখন তার মধ্যে পূর্বেকার অবস্থা অবলুপ্ত হয়ে যায়। একথা শুনে রসুল সা. বললেন, ওহে হানযালা! আমার সাথে থাকাকালীন মনের অবস্থা যদি তুমি ধরে রাখতে পারতে, তাহলে রাস্তাঘাটে ফেরেশতারা তোমার সাথে মুসাফাহা করতো। কিন্তু হানযালা, এটার জন্য এক রকম সময় এবং ওটার জন্য সময় অন্য রকম।
এটি একটি সুপরিচিত কথা যে, মানুষ স্বচ্ছ ও স্পষ্ট, অতঃপর তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং ঢুলুঢুলু। এতে কোনো ক্ষতি নেই যদি তার সময় এবং জীবন তার জন্য যা কল্যাণকর তাতে এবং তার প্রভুর হক আদায়ের মাঝে ব্যয়িত হয়, অথবা ইহকাল ও পরকালের মধ্যে, যেমনটা বলা হয়েছে এই আপ্ত বাক্যে, এক ঘণ্টা তোমার আত্মার জন্য এবং এক ঘণ্টা তোমার প্রভুর জন্য।
এটার অনুমোদন বা স্বীকৃতিস্বরূপ সুন্নাহ্ মানবীয় দুর্বলতার জন্য অবকাশ দিয়েছে। এটা বৈধ বিষয়বস্তুর সীমা প্রশস্ত করেছে এবং নিষিদ্ধতার সীমা করেছে সংকুচিত, যেমন এই হাদিসে বলা হয়েছে: আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল এবং তিনি যা নিষিদ্ধ করেছেন তা হারাম এবং যেই বিষয়ে তিনি নীরব রয়েছেন তা এর (নির্দেশনা থেকে) বাইরে। অতএব আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত সীমারেখা গ্রহণ করো। কারণ নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কখনই কোনোকিছু সম্পর্কে উদাসীন নন। অতঃপর রসুল সা. তিলাওয়াত করলেন, তোমার প্রতিপালক কখনই ভুলে যান না (সুরা মারইয়াম, ১৯: ৬৪)১০।
মানবীয় দুর্বলতার আরো স্বীকৃতির বিষয়ে সুন্নাহ্ পরিস্থিতি অনুযায়ী সেসব ক্ষেত্র বৈধ করেছে যা সাধারণভাবে অবৈধ। এমনকি প্রয়োজনের পরিপ্রক্ষিতে এমন কিছুকে বৈধ করা হয়েছে যা স্বাভাবিকভাবেই অবৈধ। উদাহরণস্বরূপ, রসুল সা. তাঁর দুজন সাহাবিকে তাঁদের চর্মরোগের কারণে রেশমি বস্ত্র পরিধানের অনুমতি দিয়েছেন।
মানব জীবনে বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্নাহ্ নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে এবং সেই ব্যক্তির প্রতি দয়ার্দ্র হয়েছে যখন সে অবাধ্যতায় পতিত হয়। অনুশোচনার সময়ে এটি দরজা বন্ধ করেনি। বরং তার সামনে উন্মুক্ত করেছে প্রশস্তভাবে, যাতে সে ওই দরজার কড়া নাড়তে পারে প্রভুর সামনে অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে অধোবদনে। যেমনটা হাদিসে বলা হয়েছে: রজনীব্যাপী আল্লাহ তায়ালা তাঁর হস্ত প্রসারিত করেন, যাতে তিনি দিনের বেলার কৃত অপরাধের অনুশোচনা গ্রহণ করতে পারেন এবং তিনি দিনের বেলায় তাঁর হস্ত প্রসারিত করেন যাতে তিনি রাত্রে কৃত অপরাধের জন্য অনুশোচনা গ্রহণ করতে পারেন- যতদিন পর্যন্ত না সূর্য পশ্চিমে উদিত হয়"।
অন্য এক হাদিসে এসেছে : যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, তোমরা যদি পাপকাজ না করো এবং ক্ষমা না চাও, তিনি তোমাদেরকে অপসারিত করবেন এবং পরিবর্তে এমন লোকদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবেন যারা অন্যায় করবে ও ক্ষমা চাইবে তাঁর কাছে এবং তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন।১২
মানুষের অবস্থাগত ভিন্নতা এবং পারস্পরিক ভিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে সুন্নাহ্ অবকাশ দিয়েছে, সে ভিন্নতা সহজাতই হোক কিংবা অর্জিতই হোক। এসব ভিন্নতা বিবেচনায় রসুল সা. কয়েকজন লোকের একটি প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন জবাব দিয়েছেন। তাই তিনি ঐ (মুয়ামালাত) ব্যাপারে বৃদ্ধ ব্যক্তিকে এমন নির্দেশ দেননি যা দিয়েছেন একজন যুবককে, অথবা অভাবীকে দেননি এমন নির্দেশ যা প্রাচুর্যের অধিকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অথবা যে ব্যক্তি কাজে কর্মে স্বাধীন। একইভাবে, তিনি লোকদের প্রথা ও বৈচিত্র্য বিবেচনায় রেখেছেন। তাই তিনি সা. আবিসিনীয়দেরকে ঈদের দিনে তাঁর মসজিদে তাদের বর্শা নিয়ে খেলার অনুমতি দিয়েছেন এবং আয়শা রা. কে তাঁর (রসুল সা.) পিছনে দাঁড়িয়ে তা উপভোগের অনুমতি দিয়েছেন। একইভাবে তিনি (রসুল সা.) বালিকাদের আয়শা রা. আনহু-এর সাথে খেলার অনুমতি দিয়েছেন আয়শা রা. আনহু-এর তরুণ বয়সের কথা বিবেচনায়। তাই তিনি বিবাহ শাদিতে বা কারো দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির পর প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এবং অন্য এধরনের উপলক্ষকে কেন্দ্র করে মানুষের বিনোদন ও আনন্দ উপভোগের নিমিত্ত আমোদ প্রমোদের অনুমতি দিয়েছেন।১৩
সুন্নাহ্ মধ্যে অন্তর্নিহিত এ বাস্তবতা অনেক উদাহরণ দিয়েই বর্ণনা করা যেতে পারে। কিন্তু এর সবই আল্লাহ তায়ালা-নির্দেশিত রসুল সা.-এর নমুনার মডেল সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করা উদ্দেশ্যে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00