📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 ইয়াতীমের দায়িত্ব নেওয়ার পুরস্কার—জান্নাত

📄 ইয়াতীমের দায়িত্ব নেওয়ার পুরস্কার—জান্নাত


৩৪০. সাহল ইবনু সা'দ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ
"আমি এবং ইয়াতীমের দায়িত্ব-গ্রহণকারী-ব্যক্তি এই দুটির মতো এভাবে জান্নাতে থাকব।"
তিনি তখন তর্জনি ও মধ্যমা আঙ্গুল দুটির মাঝে সামান্য ফাঁকা রেখে তা দ্বারা ইশারা করেন।"[৩৫২]
৩৪১. মালিক ইবনু আমর কুশাইরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
مَنْ ضَمَّ يَتِيمًا مِّنْ أَبَوَيْنِ مُسْلِمَيْنِ إِلَى طَعَامِهِ وَشَرَابِهِ حَتَّى يُغْنِيَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ، وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
“যে-ব্যক্তি কোনও মুসলিম মা-বাবার ইয়াতীম সন্তানের পানাহারের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করার আগ পর্যন্ত, মৃত্যুর পর তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে।”[৩৫৩]

টিকাঃ
৩৫২ বুখারি, ৫৩০৪, ৬০০৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/৩৩৩。
৩৫৩, আহমাদ, ২০৩৩০; তাবারানি, কাবীর, ১৯/৩০০; হাইসামি, ৪/২৪৬; ইবনুল মুবারাক, কিতাবুয যুহদ, ২৩০。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 বিধবা ও মিসকিনকে সহযোগিতা করার সাওয়াব

📄 বিধবা ও মিসকিনকে সহযোগিতা করার সাওয়াব


৩৪২. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ، كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، أَوِ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ
“বিধবা ও মিসকীনদের অভাব দূর করার জন্য সচেষ্ট ব্যক্তি-আল্লাহর পথে জিহাদকারীর ন্যায়। অথবা রাতে (সালাতে) দণ্ডায়মান ও দিনে সিয়াম- পালনকারী ব্যক্তির মতো।"[৩৫৪]

টিকাঃ
৩৫৪. বুখারি, ৬০০৬, ৬০০৭; মুসলিম, ২৯৮২。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 যে অভাবীকে সাহায্য করে আল্লাহ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন

📄 যে অভাবীকে সাহায্য করে আল্লাহ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন


৩৪৩. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, كُلُّ مَعْرُوْفٍ صَدَقَةٌ "সব ধরনের ভালো কাজই সদাকা।"[৩৫৫]
৩৪৪. জাবির (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
كُلُّ مَعْرُوْفٍ صَدَقَةٌ، وَمِنَ الْمَعْرُوْفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ، وَأَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَّائِهِ
"সব ধরনের ভালো কাজই সদাকা। ভালো কাজের একটা এটাও যে, তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত করবে এবং তোমার বালতি থেকে তার পাত্রে (পানি) ঢেলে দিবে।”[৩৫৬]
৩৪৫. আবূ তামীমা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালো কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম।' তিনি বললেন,
لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوْفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تُعْطِيَ صِلَةَ الْحَبْلِ، وَلَوْ أَنْ تُعْطِيَ شِسْعَ النَّعْلِ، وَلَوْ أَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ الْمُسْتَسْقِي، وَلَوْ أَنْ تُنَجِّيَ الشَّيْءَ مِنْ طَرِيقِ النَّاسِ يُؤْذِيهِمْ، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ وَوَجْهُكَ إِلَيْهِ مُنْطَلِقُ، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ فَتُسَلَّمَ عَلَيْهِ، وَلَوْ أَنْ تُؤْنِسَ الْوَحْشَانَ فِي الْأَرْضِ
“কোনও ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করবে না। যদিও সেটি সামান্য রশি কিংবা জুতার ফিতা প্রদান করা হোক, বা তোমার বালতি থেকে পানি
সংগ্রহকারীর পাত্রে (পানি) ঢেলে দেওয়া হোক, বা জনবহুল রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক কোনও বস্তু সরিয়ে দেওয়া হোক, বা হাসিমুখে তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হোক, বা তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎকালে তাকে সালাম দেওয়া হোক কিংবা জমিনের বন্য কোনও প্রাণীর সাথে দয়ার আচরণ করা হোক।”[৩৫৭]
৩৪৬. সুলাইম ইবনু জাবির (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা গ্রামের লোক। আমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উপকৃত করবেন। তখন তিনি বললেন,
لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوْفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ الْمُسْتَسْقِي، وَلَوْ أَنْ تُكَلِّمَ أَخَاكَ وَوَجْهُكَ إِلَيْهِ مُنْبَسِطُ
"কোনও ভালো কাজকে ছোটো ও তুচ্ছ মনে করবে না। যদিও তা পানি সংগ্রহকারীর পাত্রে তোমার বালতি থেকে পানি ঢেলে দেওয়া হোক কিংবা তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা হোক।”[৩৫৮]
৩৪৭. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ ، مَنْ كَانَ فِي حَاجَةٍ أَخِيهِ، كَانَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةٌ، فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ بِهَا كُرْبَةٌ مِّنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا، سَتَرَهُ اللَّهُ تَعَالَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং তাকে জালিমের হাতে ছেড়েও দিবে না। আর যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করতে থাকবে আল্লাহও তার প্রয়োজন পূরণ করতে থাকবেন। যে- ব্যক্তি কোনও মুসলিমের বিপদ দূর করতে সাহায্য করবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন তার বিপদ দূর করে দিবেন। আর যে-ব্যক্তি কোনও মুসলিমের (দোষ-ত্রুটি) গোপন রাখবে আল্লাহ তাআলাও কিয়ামাতের দিন
তার (দোষ-ত্রুটি) গোপন রাখবেন।"[৩৫৯]
৩৪৮. আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ نَفْسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةٌ مِّنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةٌ مِّنْ كُرَبٍ يَوْمٍ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا، سَتَرَهُ اللهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ، يَسَّرَ اللهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَاللهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ، مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ، وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيْهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ، وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمُ فِي بَيْتٍ مِّنْ بُيُوتِ اللهِ، يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُوْنَهُ بَيْنَهُمْ، إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَحَقَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيْمَنْ عِنْدَهُ، وَمَنْ أَبْطَأَ بِهِ عَمَلُهُ، لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ
"যে-ব্যক্তি কোনও মুমিনের দুনিয়াবি বিপদ-আপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন তার বিপদ-আপদ দূর করে দিবেন। যে-ব্যক্তি কোনও অভাবী লোকের দুর্দশা লাঘব করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুর্দশা মোচন করবেন। যে-ব্যক্তি কোনও মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্যে নিয়োজিত থাকেন। যে-ব্যক্তি ইলম অর্জনের জন্য পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সুগম করে দেন। যখন কোনও সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরসমূহের কোনও একটিতে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পর (কুরআনের) আলোচনা বা দারসে লিপ্ত থাকে তখন তাদের ওপর প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়, বিশেষ রহমত তাদেরকে ঢেকে নেয় এবং ফেরেশতাগণ তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর নৈকট্যশীল (ফেরেশতাদের) মাঝে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে-ব্যক্তির আমল তাকে পিছিয়ে দেবে তার বংশ মর্যাদা তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।”[৩৬০]
৩৪৯. আবূ মূসা আশআরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ
"প্রত্যেক মুসলিমের ওপর সদাকা করা আবশ্যক।” সাহাবিগণ জানতে চাইলেন, 'কেউ যদি সদাকা করা মতো কিছু না পায়?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
يَعْمَلُ بِيَدَيْهِ، فَيَنْفَعُ نَفْسَهُ، وَيَتَصَدَّقُ
"সে ব্যক্তি নিজ হাতে কাজ করবে, এতে সে নিজেও লাভবান হবে এবং সদাকাও করতে পারবে।" তারা বললেন, 'যদি এরও সামর্থ্য না থাকে?' তিনি বললেন,
يُعِينُ ذَا الْحَاجَةِ الْمَلْهُوفَ
"তাহলে কোনও বিপদ্‌গ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করবে।" তারা বললেন, 'যদি এতটুকুরও সামর্থ্য না থাকে?' তিনি বললেন,
فَلْيَعْمَلْ بِالْمَعْرُوْفِ، وَلْيُمْسِكْ عَنِ الشَّرِّ فَإِنَّهَا لَهُ صَدَقَةٌ
"এ অবস্থায় সে যেন নেক আমল করে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে। কারণ এটাও তার জন্য সদাকা বলে গণ্য হবে।”[৩৬১]
৩৫০. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقِ، إِذِ اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشُ، فَوَجَدَ بِتْرًا، فَنَزَلَ فِيْهَا، فَشَرِبَ ثُمَّ خَرَجَ، فَإِذَا كَلْبُ يَلْهَتُ، يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ، فَقَالَ : لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الْكَلْبُ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلَ الَّذِي بَلَغَنِي، فَنَزَلَ الْبِثْرَ، فَمَلَأَ خُفَّهُ مَاءً، ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيْهِ حَتَّى رَقِي فَسَقَى الْكَلْبَ، فَشَكَرَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ، فَغَفَرَ لَهُ
"এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। তখন তার তীব্র পিপাসা লাগল। সে একটি কূপ পেয়ে তার ভেতর নামল এবং পানি পান করে উঠে এল। হঠাৎ দেখল একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে কাদা চাটছে। লোকটি ভাবল, এ কুকুরটি পিপাসায় ওইরকম কষ্ট পাচ্ছে, যেরকম কষ্ট আমার হয়েছিল। তখন সে আবারও কূপে নামল এবং তার মোজার মধ্যে পানি ভরল। এরপর মুখ দিয়ে তা (কামড়ে) ধরে ওপরে ওঠে এল। এরপর সে কুকুরটিকে পানি পান করালো। আল্লাহ তাকে এর প্রতিদান দিলেন এবং তার গুনাহ মাফ করে দিলেন।"
সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! জীব-জন্তুর সেবা করার মধ্যেও কি আমাদের জন্য পুরস্কার আছে?' তিনি বললেন,
فِي كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ رَحِبَةٍ أَجْرُ “হ্যাঁ, জীবন আছে এমন প্রতিটি জীবের সেবা করার মাঝেও পুরস্কার রয়েছে।"[৩৬২]
৩৫১. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَرَادَ أَنْ تُسْتَجَابَ دَعْوَتُهُ، وَأَنْ تُكْشَفَ كُرْبَتُهُ، فَلْيُرَوْحُ عَنْ مُعْسِرٍ “যে-ব্যক্তি চায় তার দুআ কবুল হোক এবং বিপদ দূর হোক, সে যেন অভাবগ্রস্তকে ছাড় দেয়।”[৩৬৩]
৩৫২. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
بَيْنَمَا كَلبُ يَطِيفُ بِرَكِيَّةٍ كَادَ يَقْتُلُهُ الْعَطَشُ، إِذْ رَأَتْهُ بَغِيٌّ مِّنْ بَغَايَا بَنِي إِسْرَائِيلَ فَنَزَعَتْ مُوْقَهَا فَسَقَتْهُ، فَغُفِرَ لَهَا "কূপের পাশে একটি কুকুর ঘুরঘুর করছিল। পিপাসায় সে মৃতপ্রায় ছিল।
এমন সময় বানী ইসরাঈলের এক ব্যভিচারিণী তাকে নিজের মোজা খুলে পানি পান করালো। ফলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।"[৩৬৪]
৩৫৩. আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
كُلُّ سُلَامُي مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيْهِ الشَّمْسُ، تَعْدِلُ بَيْنَ الْإِثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَتُعِينُ الرَّجُلَ عَلَى دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا، أَوْ تَرْفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ
"সূর্য উদিত হওয়ার প্রতিটি দিনে মানুষের প্রত্যেক জোড়ার ওপর সদাকা রয়েছে। দু'জন লোকের মধ্যে সুবিচার করাও সদাকা। কাউকে সাহায্য করে সওয়ারিতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা বাহনের ওপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়াও সদাকা। ভালো কথা বলাও সদাকা।"[৩৬৫]
৩৫৪. আবদুল্লাহ ইবনু উমর ও আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে বর্ণিত, তারা দু'জনে বলেন, 'আমরা রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি-
مَنْ مَشَى فِي حَاجَةِ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ حَتَّى يُتِمَّهَا لَهُ، أَظَلَّهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مَلِكٍ يَدْعُوْنَ لَهُ، وَيُصَلُّوْنَ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ صَبَاحًا حَتَّى يُمْسِي، وَإِنْ كَانَ مَسَاءً حَتَّى يُصْبِحَ، وَلَا يَرْفَعُ قَدَمًا إِلَّا كُتِبَ لَهُ بِهَا حَسَنَةٌ، وَلَا يَضَعُ قَدَمًا إِلَّا حُطَّ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ
“যে-ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের কোনও প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে চলবে, এমনকি তা পূরণও করে দিবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে পাঁচ হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে ছায়া প্রদান করবেন-যারা তার জন্য কল্যাণের দুআ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে। সকালে বের হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত আর সন্ধ্যায় বের হলে সকাল পর্যন্ত। সে এক কদম উঠানোর সাথে সাথে একটি নেকি লেখা হবে এবং এক কদম নামানোর সাথে সাথে তার থেকে একটি গুনাহ মুছে দেওয়া হবে।”[৩৬৬]
৩৫৫. আবু সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
فِعْلُ الْمَعْرُوْفِ يَقِي مَصَارِعَ السُّوْءِ "ভালো কাজ সম্পাদন করা-অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে।"[৩৬৭]
৩৫৬. আবু সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَيُّمَا مُؤْمِنٍ سَقَى مُؤْمِنًا شَرْبَةً عَلَى ظَمَا، سَقَاهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الرَّحِيقِ الْمَخْتُوْمِ وَأَيُّمَا مُؤْمِنٍ أَطْعَمَ مُؤْمِنًا عَلَى جُوْعٍ، أَطْعَمَهُ اللَّهُ مِنْ ثِمَارِ الْجَنَّةِ، وَأَيُّمَا مُؤْمِنٍ كَسَى مُؤْمِنًا تَوْبًا عَلَى عُرَى، كَسَاهُ اللَّهُ مِنْ خَضِرِ الْجَنَّةِ “যে-মুমিন অন্য মুমিনকে পিপাসার সময় পানি পান করাবে আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামাতের দিন সীলমোহরকৃত সুধা পান করাবেন। এবং যে- মুমিন অন্য মুমিনকে ক্ষুধার সময় খাবার খাওয়াবে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যে-মুমিন অন্য মুমিনকে বস্ত্রহীন অবস্থায় কাপড় পরিধান করাবে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের সবুজ পোশাক পরিধান করাবেন।”[৩৬৮]
৩৫৭. আবূ সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ سَرَّ مُسْلِمًا بَعْدِي، فَقَدْ سَرَّنِي فِي قَبْرِي، وَمَنْ سَرَّنِي فِي قَبْرِي، سَرَّهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ "আমার মৃত্যুর পর যে-ব্যক্তি কোনও মুসলিমকে খুশি করল, সে যেন কবরে আমাকেই খুশি করল। আর যে-ব্যক্তি কবরে আমাকে খুশি করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামাতের দিন খুশি করবেন।”[৩৬৯]
৩৫৮. আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الدَّالُ عَلَى الْخَيْرِ كَفَاعِلِهِ، وَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ إِغَاثَةَ اللَّهْفَانِ
“কল্যাণকর কাজের পথ-প্রদর্শনকারী সে কাজ সম্পাদনকারীর মতোই (সাওয়াব পায়)। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করা ভালোবাসেন।"[৩৭০]
৩৫৯. হাসান বাস্ত্রী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'অনেকে হাজ্জ করা সত্ত্বেও বলে- 'আমি আবার হাজ্জ করব! আবার হাজ্জ করব!-ভাই! তুমি তো একবার হাজ্জ করেছ-ই। এবার আত্মীয়তার সম্পর্কের দিকে নজর দাও। বিপদে আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে দাঁড়াও। প্রতিবেশীদের প্রতি খেয়াল রাখো।' [৩৭১]
৩৬০. মালিক ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাসান বাস্ত্রী একবার মুহাম্মাদ ইবনু নূহ এবং হুমাইদকে কোনও এক মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজনে পাঠালেন এবং তাদের বলে দিলেন, যাওয়ার সময় যেন সাবিত বুনানিকেও নিজেদের সাথে নিয়ে নেয়। তারা সাবিত বুনানিকে যাওয়ার কথা বললে তিনি জানালেন, এখন তিনি ই'তিকাফে বসবেন। হুমাইদ ফিরে গিয়ে হাসান বাস্ত্রীকে এই কথা জানাল। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি গিয়ে তাকে বলো, 'আপনি জানেন না যে, বারবার হাজ্জ করার তুলনায় একজন ভাইয়ের সাহায্যার্থে ছুটে যাওয়া অধিক উত্তম?' একথা শোনার পর সাবিত বুনানি ই'তিকাফ ছেড়ে তাদের সাথে রওনা হলেন।' [৩৭২]
৩৬১. ইবনু উতাইবা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনার কাছে কোন কাজটি সবচেয়ে প্রিয়?' তিনি বললেন, 'মুমিনকে আনন্দিত করা।' তাকে আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, 'কোন কাজ করে এখনও আপনি তৃপ্ত হননি?' তিনি বললেন, 'দ্বীনি ভাইদের জন্য অবদান রাখার কাজে। [৩৭৩]
৩৬২. মাতর ওয়াররাক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি একবার মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি' (রহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে গেলাম। তিনি আমাকে দেখে চোখ দিয়ে তাঁর পায়ের দিকে ইশারা করে বসতে বললেন। আমি তাঁর চেহারার দিকে তাকানোর চেষ্টা করলেও তিনি মাথা উঠালেন না। এরপর আমি সেখান থেকে উঠে চলে এলাম। কয়েকদিন পর তিনি সাতশ রৌপ্যমুদ্রা ভর্তি একটি থলে নিয়ে এসে আমাকে দিলেন। আমি তখন আমার দোকানে ছিলাম। ভাবলাম, তাঁর যখন দরকার পড়বে তখন তিনি মুদ্রাগুলো নেওয়ার জন্য খবর পাঠাবেন। কিন্তু বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও তিনি কোনও খবর পাঠালেন না। তাই একদিন আমি নিজেই তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, 'হে আবু আবদিল্লাহ! আপনি তো আপনার প্রয়োজনেও (মুদ্রাগুলো নেওয়ার জন্য) কোনও লোক পাঠাচ্ছেন না!' তিনি জবাব দিলেন, 'আমার আবার কী প্রয়োজন পড়ছে? তুমি যখন আমার কাছে এসেছিলে, তখন ভেবেছিলাম হয়তো তোমার কোনও প্রয়োজন আছে। তাই আমি তোমার দিকে সংকোচে তাকাতে পারছিলাম না।' আমি বললাম, 'আমার কোনও অসুবিধা নেই। আমি ভালো আছি।' তিনি বললেন, 'তোমার যা ইচ্ছা করো। কিন্তু মুদ্রাগুলো আমাকে আর ফিরিয়ে দিয়ো না।'[৩৭৪]
৩৬৩. মুআররিক ইজলি (রহিমাহুল্লাহ) চার-পাঁচশ রৌপ্যমুদ্রা ভর্তি থলে নিয়ে এসে কিছু মানুষের কাছে আমানত রাখতেন। পরে তাদের সাথে দেখা হলে বলতেন, 'এগুলো তোমরা নিজেদের কাজে লাগাও। তোমরা এখন সেগুলোর মালিক।'[৩৭৫]
৩৬৪. ইকরিমা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত আছে, 'ইবলীস তার সবচেয়ে দক্ষ অনুসারীকে ওই ব্যক্তির পেছনে লাগায়, যে ভালো কাজে লিপ্ত থাকে।'[৩৭৬]
৩৬৫. আহমাদ ইবনু হুসাইন মন্ত্রী হওয়ার আগের একটি ঘটনা তুলে ধরে বলেন, 'আমি খলীফা মুতাওয়াক্কিলের মা সুজা-এর ব্যক্তিগত মুন্সি ছিলাম। একরাত্রে আমি আমার কর্মস্থলে বসে ছিলাম। এমন সময় একজন চাকর একটি থলে নিয়ে আমার কাছে এল এবং ডাক দিয়ে বলল, 'হে আহমাদ! আমীরুল মুমিনীনের মা তোমাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, 'এখানে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা আছে। এগুলো নিয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিদেরকে বণ্টন করে দাও এবং তাদের নাম, বংশ ও ঘরের ঠিকানা লিখে রেখো। যাতে করে এই জাতীয় দান করার সুযোগ হলে সহজেই তাদের কাছে পৌঁছান যায়।'
আমি সেই থলেটি নিলাম এবং ঘরে ফিরে গিয়ে আমার বিশ্বস্ত ব্যক্তিদেরকে আমীরুল মুমিনীনের মায়ের আদেশের কথা শোনালাম। তারপর অভাবী এবং অসহায় মানুষদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা অনেকের নাম বলল। আমি ওইসব ব্যক্তিদের মাঝে প্রায় তিনশ স্বর্ণমুদ্রা বিতরণ করে দিলাম। ইতিমধ্যে রাত হয়ে গেল।
তখনও আমার কাছে অবশিষ্ট স্বর্ণমুদ্রাগুলো রয়ে গিয়েছিল। ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি সেই স্বর্ণমুদ্রাগুলো নিয়ে চিন্তা করছিলাম-আর কাকে কাকে দেওয়া যায়। এমন সময় শুনলাম বাহিরে দরজায় কেউ নক করছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বংশের এক ব্যক্তি দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে ভেতরে আসার জন্য বললাম। সে ভেতরে প্রবেশ করে সালাম দিয়ে নিজের অভাবের কথা বলল। আমি তাকে একটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দিলাম।
লোকটি শুকরিয়া আদায় করে বের হয়ে গেল। এরপর আমার স্ত্রী এসে আমাকে বলল, 'আমীরুল মুমিনীনের মা তোমাকে এই স্বর্ণমুদ্রাগুলো দিয়েছেন উপযুক্ত ব্যক্তিদের মাঝে বিতরণ করার জন্য। রাসূলের নাতিদের থেকে আর কে বেশি উপযুক্ত হতে পারে? তার ওপর সে নিজে তোমার কাছে এসে তার অভাবের কথা জানিয়েছে। এক কাজ করো, তাকে পুরো থলেটা দিয়ে দাও।'
আমি এই কথা শুনে স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ভর্তি থলেটা ওই ব্যক্তিকে দিয়ে দিলাম। সে চলে যাওয়ার পর শয়তান আমাকে কুমন্ত্রণা দিতে থাকল যে, মুতাওয়াক্কিল তো এই লোককে পছন্দ করে না। সুতরাং সে জানতে পারলে তুমি এর কী জবাব দিবে? তখন আমার স্ত্রীকে বললাম, 'তুমি আমাকে এমন একটা কাজের মধ্যে ফেলেছ, যেটার কারণে আমি শঙ্কাবোধ করছি।' আমি আমার আশঙ্কার কথা তাকে খুলে বললাম। তখন সে বলল, 'আমরা তাদের দাদার ওপর ভরসা করছি।' এরপর আমি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরেই আমীরুল মুমিনীনের মা একজন দূত পাঠিয়ে আমাকে তার কাছে ডেকে নিলেন। আমি ঘরে প্রবেশ করতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আহমাদ! এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার হিসাব দাও। বিশেষ করে সাতশ স্বর্ণমুদ্রা কি করেছ সেটা বলো।' এটা বলে তিনি কেঁদে দিলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, সম্ভবত এই স্বর্ণমুদ্রার ঘটনা লোকটি মানুষদেরকে বলে দিয়েছে এবং খলীফা তা জানতে পেরে আমাকে হত্যার আদেশ দিয়েছেন। আর তাই তার মা আমার জন্য কান্না করছেন।
এরপর তিনি আবারও বললেন, 'হে আহমাদ! এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার হিসাব দাও। বিশেষ করে সাতশ স্বর্ণমুদ্রা কি করেছ সেটা বলো।' এই কথা বলে তিনি আবারও কেঁদে দিলেন। তিনবার তিনি এরকম করলেন।
একসময় কান্না থামিয়ে তিনি আমাকে হিসাব দিতে বললেন। যা সত্য আমি তা-ই তাকে বলে দিলাম। কাকে কাকে টাকা দিয়েছি হিসাব দিতে দিতে যখন রাসূলের বংশের লোকটির কথা বললাম, তখন তিনি কেঁদে দিয়ে বললেন, 'হে আহমাদ! আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং তোমার ঘরে থাকা তোমার স্ত্রীকেও উত্তম প্রতিদান দিন। তুমি জানো রাত্রে কি হয়েছে?' আমি বললাম, 'না, জানি না।' তখন তিনি বললেন, 'আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এমন সময় স্বপ্নে দেখি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বলছেন, 'আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আহমাদকেও উত্তম প্রতিদান দিন এবং তার ঘরে যে আছে তাকেও উত্তম প্রতিদান দিন। কারণ তোমরা রাতের বেলায় আমার তিনজন সন্তানকে চিন্তামুক্ত করেছ। তাদের কাছে খরচ করার মতো কোনও অর্থ-সম্পদ ছিল না।'
এরপর আমীরুল মুমিনীনের মা আমাকে বললেন, 'এই অলংকার, কাপড় এবং স্বর্ণমুদ্রাগুলো নাও এবং এগুলো রাসূলের বংশের সেই ব্যক্তিকে দিয়ে এসো। তাকে বলবে, 'আমরা আপনার কাছে এই জাতীয় আরও উপহার পাঠাব।' আর এই অলংকার, কাপড় এবং সম্পদগুলো নিয়ে তোমার স্ত্রীকে দিবে এবং তাকে বলবে, 'এমন উত্তম পন্থা বাতলে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।' আর এই যে সম্পদ এবং কাপড়-এগুলো তোমার জন্য, হে আহমাদ!'
আমি এগুলো নিয়ে বের হয়ে আসলাম। তারপর প্রথমেই ওই ব্যক্তিকে দিতে গেলাম। তার ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ার সাথে সাথে সে বের হয়ে এসে আমাকে বলল, 'তোমার সাথে কি আছে দাও।' আমি বললাম, 'তুমি এটা কীভাবে জানো?' সে বলল, 'আমি তোমার থেকে স্বর্ণমুদ্রাগুলো নিয়ে স্ত্রীর কাছে এসে তাকে সবকিছু খুলে বললাম। সে আমাকে বলল, 'চলো আমরা সালাত আদায় করে দুআ করি। তুমি দুআ করবে আর আমি আমীন আমীন বলব। অতঃপর আমরা সালাত আদায় করে দুআ করলাম। তারপর একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখি, আমার দাদা রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বলছেন, 'তারা তোমাকে যা দিয়েছে সেজন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। তারা তোমাকে আরও কিছু জিনিস দিবে। সেগুলো গ্রহণ করে নিয়ো।' এটা শোনার পর আমি তাকে খলীফার মায়ের পাঠানো উপহারগুলো দিয়ে দিলাম এবং সেখান থেকে বিদায় নিলাম। ঘরে এসে দেখি আমার স্ত্রী দাঁড়িয়ে সালাত পড়ছে এবং দুআ করছে। তারপর সে সালাত শেষে আমার কাছে আসলে আমি তাকে সবকিছু খুলে বললাম। সবকিছু শুনে সে বলল, 'বলেছিলাম তাদের দাদার ওপর
ভরসা করো। দেখলে তো কেমন ফল পেলে![৩৭৭]
৩৬৬. আবূ আলি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ওয়াসিত শহরের গভর্নর হামিদ ইবনুল আব্বাস একবার তার একটি বাগানের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখলেন এক বৃদ্ধ রাস্তায় বসে বসে কান্না করছে। তার পাশে কয়েকজন মহিলা এবং ছোটো ছোটো বাচ্চা আছে। তারাও তার মতন ধুলোমলিন হয়ে মাটির ওপর বসে আছে। তিনি সেখানে যাত্রা থামিয়ে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন তাকে একটি পুড়ে যাওয়া ঘর দেখিয়ে বলা হলো, ঘরটি এই বৃদ্ধের। গতরাতে তা আগুন লেগে পুড়ে গেছে এবং তিনি সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, তাই এভাবে কান্না করছেন। এই কথা শুনে গভর্নর তার একজন কর্মচারীকে আসতে বললেন এবং তাকে বললেন, এই যে দেখো, এই বৃদ্ধের অবস্থা! ব্যাপারটা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। আমি একটু ঘুরতে বের হয়েছিলাম। পথিমধ্যে তার দেখা পেলাম। তুমি এক কাজ করো, এই কাজের দায়িত্ব নাও এবং রাত্রে আমি ফিরে আসার আগেই যেন দেখতে পাই, বৃদ্ধের ঘর পরিপূর্ণভাবে মেরামত করে দেওয়া হয়েছে এবং তাতে সকল আসবাবপত্র ঠিক ঠিকভাবে বিদ্যমান আছে। এমনিভাবে তাদের কাপড়চোপড়সহ আরও যা যা লাগবে, সবকিছুর ব্যবস্থা করো। কর্মচারী বলল, 'আপনি আমাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করে দিন, আমি তাদের সব ঠিকঠাক করে দেবো।' এরপর তিনি সবকিছুর ব্যবস্থা করে বাগানের দিকে বের হয়ে গেলেন। এদিকে শ্রমিকরা কাজে নেমে পড়ল এবং বৃদ্ধ-বাড়িওয়ালাকে বলল, 'আপনার ঘরে কী কী ছিল সবকিছু আমাদেরকে লিখে দিন, যাতে কোনোকিছু বাদ না পড়ে।' যা কিছু হাতছাড়া হয়েছে বৃদ্ধ সব লিখে দিল। এমনকি হাড়ি-পাতিল-ঝাড়ু কিছুই বাদ দিল না। আসরের পর তার ঘর মোটামুটি মেরামত করা হয়ে গেল। নতুন দরজা লাগানো হলো। শুধুমাত্র রং করা বাকি ছিল। গভর্নরের কাছে সংবাদ পাঠানো হলো, আপনি আপনার বাগানেই অবস্থান করুন এবং ইশার সালাত পড়ে তারপর এইদিকে আসুন। গভর্নর এমনই করলেন। এই ফাঁকে তারা রং করা শেষ করে ফেলল। ঘর ঝাড়ু দিয়ে ধুয়েমুছে ঝকঝকে তকতকে করে দিল। বৃদ্ধ এবং তার পরিবারের লোকদেরকে কাপড়-চোপড় দিল এবং তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা করে দিল। রাতে গভর্নর যখন ফিরে আসছিলেন তখন সবকিছু ঠিকঠাক করা হয়ে গেছে। বৃদ্ধ এবং তার পরিবারের লোকেরা তার জন্য অনেক দুআ করল। এরপর গভর্নর তার কর্মচারীকে বললেন, 'আরও পাঁচশ দিরহাম অতিরিক্ত নিয়ে আসো।' সে তা উপস্থিত করলে গভর্নর ওই বৃদ্ধকে বলল, 'আপনাকে আরও
অতিরিক্ত পাঁচশ দিরহাম দিলাম। এটি আপনার কাছে রেখে দিন।' এরপর তিনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।[৩৭৮]
৩৬৭. ইসহাক ইবনু আব্বাদ বাস্ত্রি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একরাতে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখি কেউ একজন এসে আমাকে বলছে, 'অভাবীকে সাহায্য করো।' আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি ঘরের লোকদের জিজ্ঞেস করলাম, 'আমাদের প্রতিবেশীদের কেউ কি অভাবে আছে?' তারা বলল, 'না এমন কারও কথা তো জানি না।' এ কথা শুনে আমি তখন ঘুমিয়ে পড়লাম। আবার স্বপ্নে দেখলাম আমাকে একজন এসে বলছে, 'তুমি অভাবীকে সাহায্য না করে এখনও ঘুমাচ্ছ?' এটা শুনে আবার আমার ঘুম ভেঙে গেল। স্বপ্নটাকে অহেতুক মনে করে ফের ঘুমিয়ে পড়লাম। তৃতীয়বারও একই স্বপ্ন দেখলাম। এবার আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম এবং আমার চাকরকে বললাম, 'গাধার পিঠে গদি চড়াও।' এরপর আমি নিজের সাথে তিনশ রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে গাধার ওপর চড়ে বসলাম এবং লাগام ছেড়ে দিলাম। গাধাটি নিজের মতো চলতে লাগল। সে সেখানকার মাসজিদ পার হয়ে সামনের একটি খোলা ময়দানে গিয়ে পৌঁছল। তারপর কবরস্থানের পথ ধরে ডান দিকের একটা খালি জায়গায় গিয়ে থামল। সেখানে সাধারণত জানাযার সালাত আদায় করা হয়ে থাকে। সেখানে পৌঁছে দেখি ওখানে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছে। আমার আগমন টের পেয়ে সে পিছনে ফিরল। আমি তার কাছাকাছি গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'আল্লাহর বান্দা! এই সময়ে তুমি এখানে কি করছো?' সে বলল, 'আমি আসলে একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। আমার কাছে একশ দিরহাম ছিল। সম্প্রতি আমি তা হারিয়ে ফেলেছি। এদিকে আমার ঋণ আছে আরও দুইশ রৌপ্যমুদ্রা।' তখন আমি সাথে করে আনা তিনশ রৌপ্যমুদ্রা বের করে তাকে দিয়ে দিলাম এবং বললাম, 'তুমি কি আমাকে চেনো?' সে বলল, 'না, চিনি না।' আমি বললাম, 'আমার নাম ইসহাক ইবনু আব্বাদ। যদি আগামীতে এমন কোনও অসুবিধায় পড়ো তাহলে আমার কাছে চলে এসো। আমার ঘর অমুক এলাকার অমুক জায়গায়।' এই কথা শুনে লোকটি উত্তরে বলল, 'আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন! আমরা বরং অসুবিধায় পড়লে সেই সত্তার কাছেই ছুটে যাই, যিনি তোমাকে এই সময়ে ঘর থেকে বের করে এনে আমার কাছে উপস্থিত করেছেন।[৩৭৯]
৩৬৮. আহমাদ ইবনু নাসিহ (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, 'ইবাদাতগুজার এক বৃদ্ধলোক নিজের পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি সারাদিন তুলা দিয়ে সুতা
বানাতেন এবং সন্ধ্যায় সেই সুতা বাজারে বিক্রি করে পরিবারের লোকদের জন্য খাবার এবং নতুন তুলা কিনে আনতেন। তারপর সেই তুলে দিয়ে আবার সুতা বানাতেন এবং তা বিক্রি করতেন। একদিন তিনি সুতা নিয়ে রওনা হলেন এবং বাজারে তা বিক্রি করলেন। পথিমধ্যে এক লোকের সঙ্গে তার দেখা। লোকটি তার অভাবের কথা খুলে বলল।
বৃদ্ধ তাকে সুতা বিক্রির মূল্য দান করে দিলেন এবং খালি হাতে পরিবারের নিকট ফিরে এলেন। তারা তাকে বলল, 'তুলা কোথায়? খাবার কোথায়?' তিনি উত্তর দিলেন, 'রাস্তায় একজনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। সে তার অভাবের কথা বলায় আমি তাকে সুতা বিক্রির সবটুকু মূল্য দিয়ে দিয়েছি।' তারা বলল, 'তাহলে এখন আমরা কী করব? আমাদের কাছে তো খাওয়ার মতো কিছুই নেই।'
বৃদ্ধের ঘরে একটি ভাঙা বাটি ও কলস ছিল। এই দুটি নিয়ে আবার তিনি বাজারে রওনা হলেন। কিন্তু এগুলো পুরাতন ও ভাঙাচুরা হওয়ার কারণে কেউ কিনল না। তার পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি যাচ্ছিল। তার কাছে ফুলে যাওয়া একটি মাছ ছিল। নষ্ট হয়ে যাওয়ার দরুন কেউ তা ক্রয় করছিল না। মাছওয়ালা তাকে বলল, 'এক কাজ করুন, আমার এই চাহিদাহীন পণ্য দিয়ে আপনার এই অচল পণ্য অদল বদল করে নিন।' এই কথা শুনে বৃদ্ধ তার পাত্র দুটি ওই ব্যক্তিকে দিয়ে দিলেন এবং ফুলে যাওয়া মাছটি নিয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসলেন। তারা বলল, 'এই মাছ দিয়ে আমরা কী করব? এটি তো ফুলে গেছে!'
বৃদ্ধ বলল, 'কোনোরকমে আগুনে সেঁকে নাও। আমরা আপাতত এটাই আহার করি। আশা করি আল্লাহ তাআলা আমাদের উত্তম রিষ্কের ব্যবস্থা করবেন।' এরপর যখন মাছটি কাটা হলো তখন দেখা গেল—এর পেটে মূল্যবান একটি মুক্তা। বৃদ্ধকে এই খবর দেওয়ার পর তিনি বললেন, 'দেখো, এর মধ্যে কোনও ছিদ্র আছে কি না? যদি ছিদ্র থাকে তাহলে এটি কোনও মানুষের হবে। আর যদি ছিদ্র না থাকে তাহলে এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পাঠানো রিষ্ক, যা তিনি আমাদেরকে দান করেছেন।'
তারপর তারা দেখল তাতে কোনও ছিদ্র নেই। তাই বৃদ্ধ লোকটি সকালে মুক্তাটি নিয়ে একজন জুয়েলারির কাছে গেল এবং এটি তার কাছে দিয়ে দাম জানতে চাইল। জুয়েলারি তাকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি এটি কোথায় পেয়েছেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে এটি দান করেছেন।' জুয়েলারি বলল, 'আমি এর জন্য আপনাকে বিশ দিরহাম দিতে পারি। আপনি অমুকের কাছে যান। তিনি হয়তো আমার থেকে বেশি দাম দিতে পারবেন।' বৃদ্ধ মুক্তাটি নিয়ে ওই ব্যক্তির কাছে গেলেন। সে দেখে বলল, 'এটি তো খুবই সুন্দর মুক্তা। আপনি এটা কোথায় পেয়েছেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে এটি দান করেছেন।' লোকটি বলল, 'এটার দাম ত্রিশ দিরহাম দিতে পারব আমি। আপনি অমুকের কাছে যান। সম্ভবত তিনি আমার চেয়েও বেশি দাম দিয়ে
কিনতে পারবেন।' বৃদ্ধ এবার তৃতীয় ব্যক্তির কাছে গেল। তিনিও দেখে বললেন, 'এত সুন্দর মুক্তা আপনি কোথায় পেয়েছেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে এটি দান করেছেন।' লোকটি বলল, 'এর জন্য আমি আপনাকে সত্তর দিরহাম দেবো। এর বেশি দাম হওয়ার কথা না।' বৃদ্ধ তার কাছে মুক্তাটি বিক্রি করে বাড়ির দিকে রওনা হলেন।
ঘরের দরজায় পৌঁছতেই একজন ভিক্ষুকের সঙ্গে তার দেখা। সে তাকে বলল, 'আল্লাহ আপনাকে অনেক সম্পদ দিয়েছেন। এর থেকে আমাকে কিছু দান করুন।' তিনি বললেন, 'গতকালকে আমার অবস্থা ছিল তোমার মতোই। এক কাজ করো, তুমি এর অর্ধেক নিয়ে নাও।' এই কথা বলে তিনি তাকে অর্ধেক দিরহাম ভাগ করে দিলেন। ভাগ করা যখন শেষ হলো এবং প্রত্যেকেই নিজের অংশ নিয়ে নিল তখন ভিক্ষুক তাকে বলল, 'আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন! আমি ছিলাম আপনার রবের পক্ষ থেকে একজন দূত। তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য।'
৩৬৯. এরকম একটি ঘটনা বানী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির জীবনেও ঘটেছে। তাদের মাঝে একজন ইবাদাতগুজার ব্যক্তি ছিলেন। তিনি খেজুরগাছের পাতা দিয়ে ঝুড়ি বানিয়ে তা এক দিরহামে বিক্রি করতেন। তারপর এর কিছু অংশ দিয়ে নিজ পরিবারের জন্য খাবার কিনতেন এবং বাকিটা দিয়ে খেজুরপাতা কিনতেন আর তা দিয়ে নতুন ঝুড়ি বানাতেন। এক দিনের ঘটনা। তিনি এক দিরহামের বিনিময়ে একটি ঝুড়ি বিক্রি করে খাবার কেনার জন্য যাচ্ছিলেন। পথে এক ভিক্ষুকের সাথে তার দেখা হলো। তিনি তাকে দিরহামটি দান করে দিলেন এবং খালি হাতেই ঘরে ফিরে এলেন।
ঘরের লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, 'খাবার কোথায়?' তিনি বললেন, 'আমি তো একজন ভিক্ষুককে তা দান করে দিয়েছি। আশা করি আল্লাহ আমাদের বিনিময়স্বরূপ উত্তম রিযক দান করবেন।' এরপর তিনি তার কাছে থাকা অল্প কিছু খেজুরপাতা দিয়ে একটি ছোটো ঝুড়ি তৈরি করলেন এবং এক দিরহামের চেয়েও অনেক কম মূল্যে তা বাজারে বিক্রি করলেন। তিনি ভাবলেন, যদি আমি একটি রুটি কিনি এটা আমার পরিবারের জন্য যথেষ্ট হবে না। আর যদি নতুন কিছু খেজুরপাতা কিনি তাহলে আমার পরিবার না খেয়ে থাকবে।
এমন সময় তার পাশ দিয়ে একজন জেলে যাচ্ছিল। তার কাছে ছিল একটি মাছ। তিনি সেটি কিনে নিলেন এবং তা নিয়ে ঘরে ফিরে এসে স্ত্রীর হাতে তা তুলে দিয়ে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। স্ত্রী সেটি কাটতেই তার ভেতর থেকে ডিমাকৃতির একটি মুক্তা বের হয়ে এল এবং ঘরের চারপাশকে আলোকিত করে তুলল। স্ত্রী বলল, 'আল্লাহ কত দ্রুত তোমার দানের প্রতিদান দিয়ে দিলেন!' তিনি এটি নিয়ে বাদশাহর কাছে গেলেন। বাদশাহ এক লাখ দিরহাম দিয়ে কিনে নিল। এরপর সেই নেককার লোকটি তার স্ত্রীকে বলল, 'এই নাও সম্পদগুলো রাখো। আমি সালাতে দাঁড়াব।'
ইতিমধ্যে একজন ভিক্ষুক এসে কিছু চাইল। তিনি তাকে সেই সম্পদ থেকে মন মতো নিয়ে নিতে বললেন। ভিক্ষুক বলল, 'আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন?' তিনি বললেন, 'না, আমি সত্যি বলছি।' তারপর তিনি নিজে ভিক্ষুককে সেই দিরহামের বোঝা বহনে সহায়তা করে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। ভিক্ষুক এবার বলল, 'আমি আসলে ভিক্ষুক বেশে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো ফেরেশতা। তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য। আপনি কৃতজ্ঞ বান্দা বলে প্রমাণিত হয়েছেন। জেনে রাখুন, আল্লাহ আপনার আগের সেই দানকে কবুল করেছেন এবং একে বারো অংশে বিভক্ত করে এক অংশের এক লক্ষ ভাগের এক ভাগ মাত্র আপনাকে দুনিয়াতে দিয়েছেন। বাকিসব সঞ্চিত রয়েছে। সেগুলো আপনাকে জান্নাতে দেওয়া হবে। সেই সাথে আরও এমন অনেক নিয়ামাত দেওয়া হবে, যা কোনও চোখ দেখেনি, কোনও কান যার ব্যাপারে শুনেনি এবং কখনও কারও অন্তরে তার কল্পনাও আসে নি। এগুলো নিয়ে ঘরে চলে যান। আল্লাহ আপনার সম্পদে বারাকাহ দান করুন।'
৩৭০. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একজন সালাফের সখ ছিল বারবার হাজ্জ করা। একবছর তিনি জানতে পারলেন যে, হাজ্জ কাফেলা বাগদাদে এসে পৌঁছেছে। তখন তিনি তাদের সঙ্গে হাজ্জের সফরে বের হওয়ার ইচ্ছা করলেন এবং নিজের সাথে পাঁচশ স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে নিলেন। প্রথমেই তিনি বাজারে গিয়ে হাজ্জের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিলেন। তারপর চলতে চলতে রাস্তায় এক মহিলার সাথে দেখা হলো। সেই মহিলা তাকে বলল, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন! আমি একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা। আমার কয়েকটি মেয়েও আছে। আজকে চার দিন যাবত আমরা ক্ষুধার্ত। খাওয়ার মতন ঘরে কিছুই নেই।' মহিলার কথাগুলো তার হৃদয়ে আঘাত করল। তিনি নিজের সাথে-থাকা সবগুলো স্বর্ণমুদ্রা ওই মহিলাকে দিয়ে দিলেন এবং তাকে বললেন, 'আপনি ঘরে চলে যান এবং এই স্বর্ণমুদ্রাগুলো দিয়ে নিজের প্রয়োজন পূরণ করুন। মহিলা অত্যন্ত খুশি হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল এবং সেখান থেকে চলে গেল। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার অন্তর থেকে সে বছর হাজ্জ করার আকাঙ্ক্ষা উধাও করে দিলেন। তাই তিনি শূন্য হাতেই বাড়ি ফিরে গেলেন। এক সময় কাফেলার অন্যান্য সঙ্গীরা বাইতুল্লাহয় চলে গেল এবং হাজ্জ শেষে ফিরেও এল। তিনি ভাবলেন, আমি বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের সাথে সালাম-কালাম করে আসি। তো যখনই তিনি কোনও বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে সালাম দিয়ে বলছিলেন, 'আল্লাহ তোমার হাজ্জকে কবুল করুন এবং তোমার প্রচেষ্টার প্রতিদান দিন!' তখন সেও পাল্টা তাকে বলছিল, 'আল্লাহ তোমার হাজ্জকেও কবুল করুন এবং তোমার প্রচেষ্টারও প্রতিদান দিন!' এভাবে তিনি যার কাছেই যাচ্ছিলেন, সে-ই তার ব্যাপারে এমন দুআ করছিল
এবং তাকে হাজ্জ করার কারণে অভিবাদন জানাচ্ছিল। তিনি এর রহস্য বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এরপর ওই রাতে তিনি ঘুমিয়ে পড়ার পর স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি তাকে বললেন, 'মানুষ যে তোমাকে হাজ্জ করার কারণে অভিবাদন জানাচ্ছে-এটা দেখে তুমি অবাক হয়ো না। কারণ তুমি একজন দুর্বল ও অসহায়কে সাহায্য করেছ। তাই আমি আল্লাহ তাআলার কাছে তোমার জন্য দুআ করেছি। ফলে তিনি তোমার আকৃতিতে একজন ফেরেশতা তৈরি করেছেন। সে প্রতিবছর তোমার পক্ষ থেকে হাজ্জ করবে। এখন থেকে যদি তোমার মন চায় হাজ্জ করতে পারো, আর না চাইলে নাও করতে পারো।'

টিকাঃ
৩৫৫. বুখারি, ৬০২১。
৩৫৬, তিরমিযি, ১৯৭০; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/৩৬০。
৩৫৭, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৫৯৫১。
৩৫৮. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/৬৩。
৩৫৯. বুখারি, ২৪৪২; মুসলিম, ২৫৮০。
৩৬০, মুসলিম, ২৬৯৯; তিরমিযি, ১৪২৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২৫২。
৩৬১. বুখারি, ১৪৪৫, ৬০২২; মুসলিম, ১০০৮。
৩৬২ বুখারি, ১৭৩, ২৩৬৩; মুসলিম, ২২৪৪。
৩৬৩. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২৩, একজন বর্ণনাকারী দুর্বল。
৩৬৪. বুখারি, ৩৩২১, ৩৪৬৭; মুসলিম, ২২৪৫。
৩৬৫. বুখারি, ২৯৮৯; মুসলিম, ১০০৯。
৩৬৬. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ১৬৪৭৮。
৩৬৭. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৩৪৪২; সুযুতি, ১/৩৫৪。
৩৬৮. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/১৩-১৪。
৩৬৯. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ১৬৪১৩。
৩৭০. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/৩৩৭; আবূ ইয়ালা, আল-মুসনাদ, ৭/২৭৫。
৩৭১. আহমাদ, কিতাবুয যুহদ, ১৪৬৯。
৩৭২, ইবনু রজব হাম্বালি, জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম, ২/২৯৪。
৩৭৩. ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৩৫২৭৩。
৩৭৪. ইবনু আবিদ দুনইয়া, আল-ইখওয়ান, ১৮২; ইবনু কুদামা, আল-মুতাহাব্বীনা ফিল্লাহ, ১০২。
৩৭৫. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৫/২০৭; ইবনু আবিদ দুনইয়া, আল-ইখওয়ান, ১৮৩。
৩৭৬. সুমৃতি, আল-জামিউস সগীর, ৩২৮৩, দঈফ。
৩৭৭. ইবনু তরার মুআফি, আল-জালীসুস সালিহ, ২৬৩-২৬৪。
৩৭৮. তাবারি, তারীখ, ১১/২৩৬; যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ২৩/২৯১。
৩৭৯. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ১০৫৭; ইবনু রজব হাম্বালি, মাজমুউ রসাইল, ৩/১২৮-১২৯。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 অন্যের প্রয়োজন পূরণে সুপারিশ করলেও সাওয়াব

📄 অন্যের প্রয়োজন পূরণে সুপারিশ করলেও সাওয়াব


৩৭১. আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ كَانَ وَصْلَةٌ لِأَخِيهِ الْمُسْلِمِ إِلى ذِي سُلْطَانٍ فِي تَبْلِيغِ بِرَّ، أَوْ تَيْسِيْرِ عَسِيرٍ، أَعَانَهُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى إِجَازَةِ الصِّرَاطِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ دَحْضِ الْأَقْدَامِ
“যে-ব্যক্তি তার কোনও মুসলিম ভাইয়ের জন্য ভালো কোনও কাজের ক্ষেত্রে বা কষ্টকর কিছুকে সহজ করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতাশীল ব্যক্তির কাছে পৌঁছার মাধ্যম হবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামাতের দিন পা পিছলে যাওয়ার মুহূর্তে (পুলসিরাত পার হতে) সাহায্য করবেন।”[৩৮০]

টিকাঃ
৩৮০. বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ৮/১৬৭。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00