📄 গোপনে দান করার সাওয়াব
৩০১. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي ظِلَّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ، فَذَكَرَ مِنْهُمْ : وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ أَخْفَاهَا لَا تَعْلَمُ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ
"যেদিন কোনও ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ তাআলা নিজ আরশের ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষকে আশ্রয় দিবেন। তাদের মধ্যে একজন হবে সে, যে চুপিসারে দান করে। ডান হাত কী খরচ করে বাম হাতও তা জানতে পারে না।” [৩১৩]
৩০২. আবূ যার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ ثَلَاثَةً، فَذَكَرَ مِنْهُمْ : رَجُلًا كَانَ فِي قَوْمٍ، فَأَتَاهُمْ رَجُلٌ يَسْأَلُهُمْ بِقَرَابَةٍ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُمْ، فَيَخِلُّوْا عَنْهُ، وَخَلَفَ بِأَعْقَابِهِمْ، فَأَعْطَاهُ حَيْثُ لَا يَرَاهُ إِلَّا اللَّهُ وَمَنْ أَعْطَاهُ
"তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন। তাদের মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে একটি সম্প্রদায়ের সাথে ছিল। এমন সময় সেখানে এক লোক এসে আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে তাদের কাছে কিছু সাহায্য চাইল। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করল না। তখন সেই ব্যক্তিটি সবার থেকে সরে গিয়ে দরিদ্র লোকটিকে (গোপনে) এমনভাবে সাহায্য করল যে, তাকে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলা এবং যাকে সে দান করেছে কেবল সে-ই দেখে।"[৩১৪]
৩০৩. আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'ফেরেশতারা আশ্চর্য হয়ে বলল, 'হে আল্লাহ! বাতাসের চেয়েও শক্তিধর আপনার কোনও সৃষ্টি আছে?' তিনি বললেন,
نَعَمْ، اِبْنُ آدَمَ يَتَصَدَّقُ بِيَمِينِهِ يُخْفِيهَا مِنْ شِمَالِهِ
“হ্যাঁ, তা হলো সেই আদম সন্তান, যে ডান হাতে এমনভাবে দান করে যে, তার বাম হাত থেকেও তা গোপন রাখে। [৩১৫]
৩০৪. আবূ সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
صَدَقَةُ السِّرِّ تُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ تَبَارَكَ وَتَعَالَى
"গোপনে করা দানগুলো রবের ক্রোধ নিভিয়ে দেয়। "[৩১৬]
৩০৫. পূর্বে বর্ণিত আবূ তালহা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেছিলেন, 'আমার সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ হচ্ছে 'বাইরুহা' নামক বাগানটি। যদি আমার এটি গোপন করার সামর্থ থাকত তাহলে কাউকে-ই বলতাম না।[৩১৭]
৩০৬. আলি ইবনু হুসাইন (রহিমাহুল্লাহ)-এর মৃত্যুর পর একশ পরিবার তাদের খাদ্য- যোগান খুইয়েছিল। রাতের বেলা তিনি নিজের পিঠে বহন করে তাদের কাছে খাদ্য সরবরাহ করতেন। কিন্তু তারা কেউ জানত না, কে তাদেরকে খাদ্য সরবরাহ করত!?[৩১৮]
৩০৭. আবূ সাঈদ ইবনু আবী বকর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমার দাদা আবূ উসমান সীমান্ত উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রবন্দরের কারও কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সময় মতো সেখানে পৌঁছতে পারেননি। যার ফলে সাহায্য না পেয়ে তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। এমনকি তিনি জনসম্মুখেই কাঁদছিলেন। সন্ধ্যার পর আবু আমর ইবনু নুজাইদ একটি ব্যাগে দুই হাজার দিরহাম নিয়ে দাদার কাছে উপস্থিত হলেন। দাদাকে বললেন, 'সময় মতো পৌঁছতে না পারার কারণে আপনি এগুলো রেখে দিন।' দাদা অত্যন্ত খুশি হয়ে তার জন্য দুআ করলেন। পরদিন মজলিসে জনসম্মুখে দাদা ঘোষণা দিলেন, 'আমার জন্য আবূ আমর যা করেছে এজন্য আমি তার শুকরিয়া আদায় করছি। সে গোপনে আমাকে এসব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।' আবূ আমর সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এগুলো আমার মায়ের সম্পদ। মায়ের সন্তুষ্টি ছাড়াই আমি আপনাকে দিয়েছিলাম। আপনি সেই মালামালগুলো ফেরত দিন, আমি মাকে দিয়ে আসি।'
এই কথা শুনে আমার দাদা আবু উসমান জনসম্মুখে টাকার থলে ফেরত দিয়ে দিলেন।
মজলিস শেষে গভীর রাতে আবূ আমর আবার দাদার কাছে এলেন। তিনি বললেন, 'আমরা ছাড়া আর কেউ-ই জানবে না-এই শর্তে আপনি এগুলো রেখে দিন।' এই কথা শুনে দাদা তখন কেঁদেই দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বলতেন, 'আবূ আমরের সেই সহযোগিতায় এখনও আমি একটু একটু করে এগোচ্ছি।'[৩১৯]
টিকাঃ
৩১৩. বুখারি, ৬৬০, ১৪২৩, ৬৪৭৯; মুসলিম, ১০৩১; আহমাদ, ৯৬৬৫。
৩১৪. আহমাদ, ২১৩৫৬; বাইহাকি, কুবরা, ৯/১৬০; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ২/৮৯。
৩১৫. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১২২৫৩; তিরমিযি, ৩৩৬৯; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৩৪৪১。
৩১৬. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৩৪৪২; সুয়ূতি আল-জামিউস সগীর, ৪৯৭৮; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৩/১১৮。
৩১৭. বুখারি, ১৪৬১; মুসলিম, ২৩৬২。
৩১৮. যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ৬/৪৩৩; মিযযি, তাহযীবুল কামাল, ২০/৩৯২。
৩১৯. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১৬/১৪৭; তাজুদ্দীন সুবকি, তবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাতিল কুবরা, ৩/২২৩。
📄 গরিব ব্যক্তির দান সর্বোত্তম দান
৩০৮. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট জানতে চাইলেন, 'কোন দান সর্বোত্তম?' তিনি উত্তরে বললেন, جَهْدُ الْمُقِلَ، وَابْدَأُ بِمَنْ تَعُولُ "সামান্য সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির দান। আর সে যেন নিজ পরিবার থেকেই দান করা শুরু করে।”[৩২০]
৩০৯. আবূ যার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'সর্বোত্তম দান কোনটি?' তিনি বললেন,
جَهْدُ مِّنْ مُّقِلٌ، وَسِرُّ إِلَى فَقِيْرٍ "সামান্য অর্থ-কড়ির মালিক হয়েও দান করা এবং অভাবী লোককে গোপনে দান করা। "[৩২১]
টিকাঃ
৩২০. আবু দাউদ, ১৬৭৭; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ১/৪১৪。
৩২১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/১৭৬; বাইহাকি, কুবরা, ৪/১৮০。
📄 অল্প হলেও সামর্থ্যানুযায়ী দান করা
৩১০. উম্মু বুজাইদ (রদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর নিকট বাইআত গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'কিছু কিছু হতদরিদ্র মানুষ আমার কাছে আসে। কিন্তু তাকে দেওয়ার মতো কোনোকিছুই আমার কাছে থাকে না।' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
إِنْ لَمْ تَجِدِي لَهُ شَيْئًا تُعْطِيْهِ إِيَّاهُ إِلَّا ظِلْفًا تُحَرَّقًا، فَادْفَعِيْهِ إِلَيْهِ فِي يَدِهِ
"শুধু রান্না-করা-পায়া বাদে তাকে দেওয়ার মতো আর কিছুই না পাও, তবে সেটিই তার হাতে তুলে দাও।" [৩২২]
৩১১. আবুল আলিয়া (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)- এর এক মজলিসে বসা ছিলাম। তাঁর কাছে আরও অনেক মহিলাও ছিল। হঠাৎ সেখানে এক ভিক্ষুক উপস্থিত হলো। তিনি তাকে একটি আঙুর দিতে বললেন। উপস্থিত মহিলারা আশ্চর্য হয়ে বলল, 'সেখানে তো অনেক পিঁপড়া দেখা যাচ্ছে!' (অর্থাৎ, পিঁপড়ে ধরা একটি আঙুরও দান করছেন?) [৩২৩]
টিকাঃ
৩২২, তিরমিযি, ৬৬৫; আবূ দাউদ, ১৬৬৭; নাসাঈ, ৫/৮৬; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬/৩৮২; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ১/৪১৭。
৩২৩. আহমাদ ইবনু হাম্বাল, কিতাবুয যুহদ, ১১৭৯; যাইলাঈ, তাখরীজু আহাদীসিল কাশশাফ, ১/২২৪。
📄 ভিক্ষুকের অধিকার
৩১২. হুসাইন ইবনু আলি ইবনি আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لِلسَّائِلِ حَقٌّ، وَلَوْ جَاءَ عَلَى فَرَسٍ
“ঘোড়ায় চড়ে এলেও ভিক্ষুকের একটা অধিকার থাকে।”[৩২৪]
৩১৩. ইবনু বুজাইদ তার দাদী উম্মু বুজাইদ (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رَدُّوا السَّائِلَ وَلَوْ بِظلف محرق “ভিক্ষুককে (পশুর পায়ের) একটি পোড়া খুর হলেও দাও”।[৩২৫]
৩১৪. হাকাম ইবনু উতাইবা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যখন ভিক্ষুক আবেদন করে তখন তার অধিকার সাব্যস্ত হয়ে যায়। বেশি হোক কিংবা কম-কিছু না কিছু তাকে দেওয়া উচিত।'
৩১৫. হাসান বাস্ত্রি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি কিছু লোক সম্পর্কে জানি, যারা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারবেন যে, তাদের স্ত্রীগণ কখনও কোনও ভিক্ষুককে কিছু না দিয়ে (শূন্য হাতে) বিদায় করেন না।।[৩২৬]
৩১৬. মূসা ইবনু আবী জা'ফর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আলি ইবনু হুসাইন (রহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে কোনও অভাবী লোক এলে তাকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলতেন, 'এমন ব্যক্তিকে স্বাগতম! যে আমার সম্পদ আখিরাত পর্যন্ত পৌঁছে দিবে।'
টিকাঃ
৩২৪. আবূ দাউদ, ১৬৬৫, আহমাদ, ১৭৩০; বাইহাকি, সুনান, ৭/২৩; আবু নুআইম, হিলইয়া, ৮/৩৭৯。
৩২৫. আবূ দাউদ, ১৬৬৭; তিরমিযি, ৬৬৫; নাসাঈ, ২৫৬৪; মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ২/৯২৩; আহমাদ, ২৭৪৯১。
৩২৬. ইবনু আবী শাইবা, ৩৫৩২২。