📄 কাউকে ঋণ দেওয়া সাওয়াব
২৬৩. আবূ উমামা বাহিলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
دَخَلْتُ الْجَنَّةَ، فَرَأَيْتُ عَلَى بَابِهَا: الصَّدَقَةُ بِعَشْرِ، وَالْقَرْضُ بِثَمَانِيَةَ عَشَرَ.
"(মি'রাজের রাতে) জান্নাতে প্রবেশ করে দেখি এর দরজায় লেখা আছে— দান-খয়রাতে দশ গুণ সাওয়াব এবং ঋণ প্রদানে আঠারো গুণ।” আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে প্রশ্ন করলাম, 'দান-খয়রাতে দশ গুণ সাওয়াব আর ঋণ প্রদানে আঠারো গুণ কেন?' তিনি বললেন, 'দান- খয়রাত ধনী-গরিব সবার হাতেই যায় কিন্তু ঋণ যায় কেবল অভাবী ব্যক্তির হাতে।' [২৭৪]
২৬৪. আবদুল্লাহ ইবনু আবী রাবীআ মাখযূমি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুনাইনের যুদ্ধের সময় তার নিকট থেকে ত্রিশ বা চল্লিশ হাজার দিরহাম ধার নিয়েছিলেন। এরপর যুদ্ধ থেকে ফিরে তার পাওনা পরিশোধ করে দেন তিনি। অতঃপর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেন,
بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْوَفَاءُ، وَالْحَمْدُ.
"আল্লাহ তোমাকে এবং তোমার পরিবার ও সম্পদে বারাকাহ দান করুন। ঋণের প্রতিদান হলো-তা পরিশোধ করা এবং প্রশংসা করা।”[২৭৫]
টিকাঃ
২৭৪. সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৩/৫১৯; মুনাবি, ফায়যুল কাদীর, ৩/৫১৯。
২৭৫. নাসাঈ, ৪৬৮৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, ২৪২৪; আহমাদ, ৪/৩৬。
📄 অভাবীকে ছাড় দেওয়ার প্রতিদান
২৬৫. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
كَانَ رَجُلٌ يُدَايِنُ النَّاسَ، فَيَقُولُ لِفَتَاهُ: إِذَا أَتَيْتَ مُعْسِرًا، فَتَجَاوَزُ عَنْهُ لَعَلَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَتَجَاوَزُ عَنَّا، فَلَقِيَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ فَتَجَاوَزَ عَنْهُ.
"এক ব্যক্তি মানুষকে ঋণ দিত। সে তার কর্মচারীকে বলে দিয়েছিল, যখন কোনও গরিব ব্যক্তির কাছে ঋণ আদায় করতে যাবে তখন তাকে মাফ করে দিয়ো। হয়তো আল্লাহ তাআলা এ কারণে আমাদেরকে মাফ করে দিবেন। অতঃপর সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।”[২৭৬]
২৬৬. হুযাইফা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ رَجُلًا مِّمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ أَتَاهُ مَلَكُ لِيَقْبِضَ نَفْسَهُ، فَقَالَ لَهُ : هَلْ عَمِلْتَ مِنْ خَيْرٍ؟ فَقَالَ : مَا أَعْلَمُ قِيلَ لَهُ : انْظُرُ. قَالَ : مَا أَعْلَمُ شَيْئًا، غَيْرَ أَنِّي كُنْتُ أَبَايِعُ النَّاسَ وَأُحَارِفُهُمْ فَأُنْظِرُ الْمُعْسِرَ، وَأَتَجَاوَزُ عَنِ الْمُوْسِرِ، فَأَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের এক ব্যক্তির কাছে জান কবজ করার জন্য ফেরেশতা আগমন করে জানতে চাইল, 'কোনও ভালো কাজ করেছ?' লোকটি বলল, 'আমি জানি না।' ফেরেশতা বলল, 'মনে করার চেষ্টা করো।' সে বলল, 'কিছুই মনে আসছে না। তবে মানুষের সাথে আমি ক্রয়-বিক্রয় ও লেন-দেন করতাম। গরিবদেরকে মূল্য পরিশোধের জন্য সময় দিতাম এবং ধনীদের থেকে দাম কম রাখতাম।' অতঃপর (এই আমলের বিনিময়ে) তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।"[২৭৭]
২৬৭. আবূ মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
حُوسِبَ رَجُلٌ مِّمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوْجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ رَجُلًا مُوْسِرًا، وَكَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوْا عَنِ الْمُعْسِرِ، فَقَالَ اللهُ: نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوْا عَنْهُ.
"তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তির হিসাব গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তার নিকট কোনও প্রকার ভালো আমাল পাওয়া যায়নি। তবে সে মানুষের সাথে লেন-দেন করত এবং সে সচ্ছল ছিল। ফলে সে দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল। রাসূল
(সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 'তারপর আল্লাহ বললেন-ক্ষমা করার ব্যাপারে আমিই তার চেয়ে অধিক যোগ্য-একে ক্ষমা করে দাও।”[২৭৮]
২৬৮. আবুল ইয়াসার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا، أَوْ وَضَعَ عَنْهُ، أَظَلَّهُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى فِي ظِلَّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ.
“যে-ব্যক্তি গরিবকে ঋণ পরিশোধ করার সময় দেয় অথবা পাওনা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে সেদিন নিজের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোনও ছায়া থাকবে না।”[২৭৯]
২৬৯. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا أَوْ وَضَعَ لَهُ، أَظَلَّهُ اللَّهُ فِي ظِلَّ عَرْشِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে-ব্যক্তি অভাবী ঋণগ্রস্তকে ঋণ পরিশোধের জন্য সময় দেয়, অথবা ঋণ মাফ করে দেয় কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন।”[২৮০]
২৭০. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَرَادَ أَنْ تُسْتَجَابَ دَعْوَتُهُ، وَأَنْ تُكْشَفَ كُرْبَتُهُ، فَلْيُفَرِّجْ عَنْ مُعْسِرٍ
“যে-ব্যক্তি চায় তার দুআ কবুল হোক এবং তার কষ্ট-ক্লেশ লাঘব হোক, সে যেন কোনও দরিদ্র ব্যক্তির কষ্ট দূর করে।”[২৮১]
২৭১. ইমরান ইবনু হুসাইন (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ كَانَ لَهُ عَلَى رَجُلٍ حَقٌّ، فَمَنْ أَخَرَهُ كَانَ لَهُ بِكُلِّ يَوْمٍ صَدَقَةٌ
“যে-ব্যক্তি ঋণগ্রস্তকে ঋণ পরিশোধের জন্য সময় দেয়, সে প্রতিদিন একটি করে সদাকার সাওয়াব লাভ করে।”[২৮২]
۲ ৭۲. মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “আবূ কাতাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) এক ব্যক্তির কাছে ঋণ পাওনা ছিলেন। লোকটি তার থেকে পালিয়ে বেড়াত। একদিন তিনি ঋণ আদায়ের জন্য তার বাড়িতে আসলেন। ঘর থেকে ছোট্ট একটি শিশু বের হয়ে এল। তিনি বাচ্চাটিকে সেই লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'হ্যাঁ। তিনি বাড়িতে খাযীরাহ (ছোটো ছোটো গোশতের টুকরো, পানি ও ময়দা দিয়ে তৈরীকৃত খাবার) খাচ্ছেন।' আবু কাতাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) লোকটিকে ডাকলেন, 'হে অমুক! বেরিয়ে আসুন। আমি জানি আপনি বাড়িতে আছেন।' লোকটি তখন বের হয়ে এল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কীসে আপনাকে আমার থেকে দূরে দূরে রাখে?' সে বলল, 'আসলে আমি অনেক অভাবী। আমার কাছে ঋণ পরিশোধের মতো কোনোকিছুই নেই।' তিনি বললেন, 'সত্যিই আপনি অভাবী?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' একথা শুনে (গভীর এক আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে) আবূ কাতাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) কেঁদে ফেলেন। এরপর বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে বলতে শুনেছি-
مَنْ نَفْسَ عَنْ غَرِيْمِهِ، أَوْ مَحَى عَنْهُ، كَانَ فِي ظِلَّ الْعَرْشِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কষ্ট দূর করবে কিংবা তার পাওনা ক্ষমা করে দিবে কিয়ামাতের দিন সে আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবে।”[২৮৩]
২৭৩. যাইদ ইবনু আরকাম (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَنْظُرَ مُعْسِرًا بَعْدَ حُلُوْلٍ أَجَلِهِ، كَانَ لَهُ بِكُلِّ يَوْمٍ صَدَقَةٌ.
“যে-ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সময় বাড়িয়ে দেয় সে প্রতিদিন একটি করে সদাকা করার সাওয়াব পায়।”[২৮৪]
২৭৪. সুফইয়ান সাওরি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “এক ব্যক্তি আমার কাছে আবেদন করল যে, আমি যেন মুহাম্মাদ ইবনু সূকাহ (রহিমাহুল্লাহ)-এর সাথে কথা বলি। মুহাম্মাদ ইবনু সূকাহ তার কাছে অনেক টাকা পাওনা। তিনি যেন তার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেন। আমি এসে দেখি মুহাম্মাদ ইবনু সূকাহ (রহিমাহুল্লাহ) তার দরজায় বসে আছেন। আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে জানতে চাইলেন, 'কোনও কাজে এসেছেন?'
আমি বললাম, 'আপনার কাছে ঋণী এমন এক ব্যক্তি আমার কাছে আবেদন করল, আমি যেন আপনাকে বলি তার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দিতে।'
তিনি বললেন, 'কে সে?' আমি বললাম, 'অমুক ব্যক্তি।' তিনি বললেন, 'তার কাছে তো আমাদের অনেক টাকা পাওনা। যাইহোক, আপনি আসার কারণে তার অর্ধেক ঋণ কমিয়ে দিলাম। আর যদি আপনি আমার সাথে পানাহার করেন তাহলে তার সব ঋণ মাফ করে দেবো।' আমি বললাম, 'আচ্ছা ঠিক আছে, পানাহার করব।' তিনি আমাকে উত্তম খাবার খাওয়ালেন। পানাহারের পর তিনি আমাকে একটি চিরকুট দিয়ে বললেন, এটা ধরুন। আমি এই টাকাগুলো তাকে অনুদান হিসেবে দিলাম এবং তাকে ক্ষমা করে দিলাম।'
টিকাঃ
২৭৬. বুখারি, ৩৪৮০; মুসলিম, ১৫৬২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২৬৩。
২৭৭. বুখারি, ২০৭৭, ২০৭৮; মুসলিম, ১৫৬০; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/৩৯৫。
২৭৮. মুসলিম, ১৫৬১; তিরমিযি, ১৩০৭; বাইহাকি, সুনান, ৫/৩৫৬。
২৭৯. মুসলিম, ৩০০৬; হাকিম, মুস্তাদরাক, ২/২৯。
২৮০. তিরমিযি, ১৩০৬; আহমাদ, ৮৭১১。
২৮১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২৩; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৪/১৩৬。
২৮২, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/৪৪২; সুয়ূতি, আদ-দুররুল মানসূর, ১/৩৬৯。
২৮৩. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/৩০০; দারিমি, আস-সুনান, ২/২৬১。
২৮৪. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ১৫৪০৯; খতীব বাগদাদি, তারীখ, ২৩/৩১০。