📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 প্রতিবেশীর হক ও তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার সাওয়াব

📄 প্রতিবেশীর হক ও তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার সাওয়াব


২৪৯. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُؤْذِي جَارَهُ.
“যে-ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ওপর এবং কিয়ামাত দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।"[২৬০]
২৫০. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، لَا وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ.
“আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়।"
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি?'
তিনি বলেন,
الْجَارُ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ.
“যে-লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।”[২৬১]
২৫১. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُسْلِمُ عَبْدُ حَتَّى يُسْلِمَ قَلْبُهُ وَلِسَانُهُ، وَلَا يُؤْمِنُ حَتَّى يَأْمَنَ جَارُهُ بَوَائِقَهُ.
“সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, কেউ পরিপূর্ণ মুসলিম হতে পারবে না যতক্ষণ না তার অন্তর ও জিহ্বা সংযত থাকে। আর কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে।" ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা জিজ্ঞেস করলাম, 'অনিষ্ট কী?' তিনি বলেন,ظلمه "অন্যায় ও অত্যাচার।”[২৬২]
২৫২. আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوْصِيْنِي بِالْجَارِ، حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرَتُهُ.
"জিবরীল (আলাইহিস সালাম) প্রতিবেশীর ব্যাপারে আমাকে এত বেশি উপদেশ দিতেন যে, আমার মনে হতো তিনি তাকে ওয়ারিস বানিয়ে দিবেন।”[২৬৩]
২৫৩. আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু'জন প্রতিবেশী আছে। এ দু'জনের কাকে আমি হাদিয়া দেবো? তিনি বললেন,
بِأَقْرَبِهِمَا مِنْكِ بَابًا.
“এ দু’জনের মধ্যে যার দরজা তোমার বেশি নিকটে।”[২৬৪]
২৫৪. আবূ যার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বলেছেন,
يَا أَبَا ذَرٍّ، إِذَا طَبَخْتَ قِدْرًا، فَأَكْثِرِ الْمَرَقَةَ، وَتَعَاهَدُ جِيْرَانَكَ، أَوِ اقْسِمْ بَيْنَ جِيْرَانِكَ.
“হে আবূ যার! তুমি তরকারি রান্না করলে তাতে ঝোল বাড়িয়ে দিয়ো এবং তোমার প্রতিবেশীর প্রতি খেয়াল রেখো অথবা তিনি বলেছেন, তোমার প্রতিবেশীদেরকেও (তার একটি অংশ) পাঠিয়ে দিয়ো।”[২৬৫]
২৫৫. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'আমি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি—
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعُ
"সে ব্যক্তি মুমিন নয়—যে নিজে পরিতৃপ্ত থাকে অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী থাকে ক্ষুধার্ত।”[২৬৬]
২৫৬. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলা হলো-'হে আল্লাহর রাসূল! অমুক মহিলা রাতভর সালাতে মগ্ন থাকে এবং দিনে সিয়াম পালন করে, তবে সে তার প্রতিবেশীদেরকে মুখের কথায় কষ্ট দেয়।' তখন রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
لَا خَيْرَ فِيْهَا هِيَ فِي النَّارِ
"তার মাঝে কোনও কল্যাণ নেই। সে জাহান্নামি।" পরে আরেকজন মহিলার ব্যাপারে তাঁকে বলা হলো-'অমুক মহিলা শুধু ফরজ সালাত আদায় করে ও রমাদানের সিয়াম পালন করে এবং কিছু দান-খয়রাতও করে। এছাড়া তার অন্য কোনও আমল নেই। তবে সে কাউকে কষ্ট দেয় না।'
তখন রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, هِيَ فِي الْجَنَّةِ "সে জান্নাতি।”[২৬৭]
২৫৭. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,
كَمْ مِّنْ جَارٍ مُتَعَلَّقٍ بِجَارِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يَقُولُ : يَا رَبِّ، هَذَا أَغْلَقَ بَابَهُ دُوْنِي، فَمَنَعَ مَعْرُوفَهُ.
"অনেক প্রতিবেশী কিয়ামাতের দিন তার প্রতিবেশীকে অভিযুক্ত করে বলবে, 'হে আমার রব! এই ব্যক্তি আমার জন্য তার দুয়ার বন্ধ করে রেখেছিল এবং আমাকে তার সদাচার থেকে বঞ্চিত করেছিল।”[২৬৮]
২৫৮. উকবা ইবনু আমির (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَوَّلُ خَصْمَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ جَارَانِ
"কিয়ামাতের দিন প্রথম বাদী-বিবাদী হবে—দুই প্রতিবেশী।”[২৬৯]
২৫৯. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
خَيْرُ الْخَيْرَانِ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ.
"আল্লাহর নিকট সেই প্রতিবেশী সর্বোত্তম যে তার প্রতিবেশীর নিকট সর্বোত্তম।”[২৭০]
২৬০. আবূ আবদির রহমান হুবুলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে তার প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এল। তিনি তাকে বললেন,
كُفَّ عَنْهُ أَذَاكَ، وَاصْبِرْ لِأَذَاهُ، فَكَفَى بِالْمَوْتِ مُفَرِّقًا.
"তাকে কষ্ট দিয়ো না। সে কষ্ট দিলে ধৈর্য ধারণ কোরো। আর মনে রেখো
মৃত্যুই তোমাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।”[২৭১]
২৬১. আবূ যার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الرَّجُلَ لَهُ الْجَارُ السُّوْءُ، يُؤْذِيْهِ، فَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُ وَيَحْتَسِبُهُ، حَتَّى يَكُفَّهُ اللَّهُ بِحَيَاةٍ أَوْ مَوْتٍ.
"আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে ভালোবাসেন যার রয়েছে অসৎ প্রতিবেশী। যে প্রতিবেশী তাকে কষ্ট দেয় আর সে সাওয়াবের আশায় সেই কষ্ট সহ্য করে। অবশেষে ইহকালেই কিংবা মৃত্যুর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। "[২৭২]
২৬২. হাতিম তাঈ-এর স্ত্রী নাওয়ার-এর কাছে তাঁর স্বামী হাতিমের ঘটনা শোনানোর আবেদন করা হলে তিনি বলেন-'তাঁর সবকিছুই ছিল আশ্চর্যজনক। একবার আমরা দুর্ভিক্ষে পড়ি। এতে আমাদের সবকিছুই শেষ হয়ে যায়। তখন খরা শুরু হয়। জমিন শুকিয়ে যায়। দুগ্ধবতী নারীর দুধ কমে আসে। উটের দুধ আসাও বন্ধ হয়ে যায়।
কোনও এক নির্জন রাতে ক্ষুধার তাড়নায় হঠাৎ আমাদের সন্তান আবদুল্লাহ, আদি ও সাফফানা চিৎকার করে কেঁদে উঠল। আল্লাহর শপথ! তখন তাদেরকে শান্ত করার মতো আমাদের কাছে কিছুই ছিল না। হাতিম এক বাচ্চার কাছে ছুটে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। আমিও একজনকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। অনেকক্ষণ পর তারা দু'জন শান্ত হলো। তারপর আমরা আমাদের আরেক বাচ্চার কাছে গিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। একসময় সে-ও চুপ করল।
তারপর আমরা সবাই এক কামরায় শুয়ে পড়লাম। বাচ্চাদেরকে রাখলাম আমাদের দু'জনের মাঝখানে। পরে হাতিম আমার কাছে এসে আমাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ঘুমিয়ে যাওয়ার ভান ধরে থাকলাম। সে আমাকে বলল, 'কী হয়েছে তোমার, ঘুমাওনি?' আমি আগের মতোই অসাড় পড়ে রইলাম।
কিছুক্ষণ পর হাতিম স্বগোক্তি করল, 'মনে হয় সে ঘুমিয়ে গেছে।' অথচ আমি তখনও ঘুমাইনি। তারপর রাত গভীর হলো। আকাশে তখন খেলা করছিল তারার মেলা। কোলাহল থেমে চারপাশে শব্দহীন অখণ্ড নীরবতা। সে সময় কামরার পাশে এক
ব্যক্তিকে দেখা গেল। হাতিম হাঁক ছাড়ল, 'কে ওখানে?' সাথেসাথে লোকটি সেখান থেকে চলে গেল। শেষরাতে বা তার কাছাকাছি সময়ে লোকটি আবার এল। হাতিম জানতে চাইল, 'কে?' এক মহিলা জবাব দিল, 'আবু আদি! আমি আপনার অমুক প্রতিবেশী। আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে আস্থাভাজন পাইনি। কয়েকজন বাচ্চাকে রেখে আপনার কাছে এসেছি। ক্ষুধার তাড়নায় ওরা আর্তনাদ করছে।'
তখন হাতিম বলল, 'তাদেরকে তাড়াতাড়ি আমার কাছে নিয়ে আসুন।'
তার কথা শুনে আমি লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। তাকে বললাম, 'একি করছেন আপনি? আপনার বাচ্চারা চিৎকার করে কেঁদেছে, তাদেরকে দেওয়ার মতো কিছু পাননি। এখন তাহলে এই বাচ্চাদেরকে খাবার দিবেন কীভাবে?'
সে বলল, 'চুপ থাকো। আল্লাহ চান তো নিশ্চয়ই তোমাকেসহ তাদেরকেও আমি পরিতৃপ্ত করব।'
সেই মহিলা দু'জনকে কোলে করে নিয়ে এল। তার সাথে ছিল আরও চারজন। সে যেন এক উটপাখি; আর তার পাশে রয়েছে বাচ্চাদের একঝাঁক।
হাতিম তার ঘোড়ার কাছে ছুটে গিয়ে তরবারি দিয়ে ঘোড়াটিকে জবাই করে ফেলল এবং ধারালো একটি ছুরি দিয়ে তার চামড়া ছিলে জ্বলন্ত আগুনে ভুনা করল। এরপর মহিলার কাছে গিয়ে ছুরি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'ধরুন, আপনার বাচ্চাদেরকে নিয়ে এসে এখান থেকে আহার করুন।' মহিলা তার বাচ্চাদের নিয়ে আসার পর হাতিম ভাবল, অন্যান্য প্রতিবেশীদেরকে রেখেই আমরা খেয়ে ফেলব! তাই সে গিয়ে আশপাশের সবাইকে ডাকল। তখন অন্যরাও সেই ঘোড়ার গোশত খেতে এল। ওদিকে হাতিম কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে আমাদের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল। আল্লাহর শপথ! সে সেখান থেকে এক টুকরোও খায়নি। অথচ তাদের চেয়ে তার প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি। সকালবেলা দেখি শুধু ঘোড়ার হাড়গোড় ও পায়ের খুর মাটিতে পড়ে আছে।[২৭৩]

টিকাঃ
২৬০. বুখারি, ৬০১৮, ৬১৩৬; মুসলিম, ৪৭; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২৬৭。
২৬১. বুখারি, ৬০১৬; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৫৯৩৫, ২৬৬২。
২৬২, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১/৩৮৭; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১৬৪。
২৬৩. বুখারি, ৬০১৪; মুসলিম, ২৬২৪。
২৬৪. বুখারি, ২৫৯৫; বাইহাকি, সুনান, ৭/২৮。
২৬৫. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১১৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২১৩২৬。
২৬৬. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১১২; ইবনু রজব হাম্বালি, জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/৩৮৪。
২৬৭. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১১৮; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৬৬。
২৬৮. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১১১; সুযুতি, আল-জামিউস সগীর, ৯৭৫১。
২৬৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৭৩৭২, তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ১৪২৫২, ১৪২৬৮。
২৭০, তিরমিযি, ১৯৪৪, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬৫৩০, ইবনু খুযাইমা, ২৫৩৯; হাকিম, মুসতাদরাক, ১/৪৪১。
২৭১. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ২৪৮৯৮。
২৭২. খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ১০/১৩৩; আলি মুত্তাকী, কানয, ২৪৮৯৩; সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৩৬২২, দঈফ。
২৭৩. ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৫৫-২৫৭; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ১১/৩৬৫-৩৬৬。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 কাউকে ঋণ দেওয়া সাওয়াব

📄 কাউকে ঋণ দেওয়া সাওয়াব


২৬৩. আবূ উমামা বাহিলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
دَخَلْتُ الْجَنَّةَ، فَرَأَيْتُ عَلَى بَابِهَا: الصَّدَقَةُ بِعَشْرِ، وَالْقَرْضُ بِثَمَانِيَةَ عَشَرَ.
"(মি'রাজের রাতে) জান্নাতে প্রবেশ করে দেখি এর দরজায় লেখা আছে— দান-খয়রাতে দশ গুণ সাওয়াব এবং ঋণ প্রদানে আঠারো গুণ।” আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে প্রশ্ন করলাম, 'দান-খয়রাতে দশ গুণ সাওয়াব আর ঋণ প্রদানে আঠারো গুণ কেন?' তিনি বললেন, 'দান- খয়রাত ধনী-গরিব সবার হাতেই যায় কিন্তু ঋণ যায় কেবল অভাবী ব্যক্তির হাতে।' [২৭৪]
২৬৪. আবদুল্লাহ ইবনু আবী রাবীআ মাখযূমি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুনাইনের যুদ্ধের সময় তার নিকট থেকে ত্রিশ বা চল্লিশ হাজার দিরহাম ধার নিয়েছিলেন। এরপর যুদ্ধ থেকে ফিরে তার পাওনা পরিশোধ করে দেন তিনি। অতঃপর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেন,
بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْوَفَاءُ، وَالْحَمْدُ.
"আল্লাহ তোমাকে এবং তোমার পরিবার ও সম্পদে বারাকাহ দান করুন। ঋণের প্রতিদান হলো-তা পরিশোধ করা এবং প্রশংসা করা।”[২৭৫]

টিকাঃ
২৭৪. সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৩/৫১৯; মুনাবি, ফায়যুল কাদীর, ৩/৫১৯。
২৭৫. নাসাঈ, ৪৬৮৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, ২৪২৪; আহমাদ, ৪/৩৬。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 অভাবীকে ছাড় দেওয়ার প্রতিদান

📄 অভাবীকে ছাড় দেওয়ার প্রতিদান


২৬৫. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
كَانَ رَجُلٌ يُدَايِنُ النَّاسَ، فَيَقُولُ لِفَتَاهُ: إِذَا أَتَيْتَ مُعْسِرًا، فَتَجَاوَزُ عَنْهُ لَعَلَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَتَجَاوَزُ عَنَّا، فَلَقِيَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ فَتَجَاوَزَ عَنْهُ.
"এক ব্যক্তি মানুষকে ঋণ দিত। সে তার কর্মচারীকে বলে দিয়েছিল, যখন কোনও গরিব ব্যক্তির কাছে ঋণ আদায় করতে যাবে তখন তাকে মাফ করে দিয়ো। হয়তো আল্লাহ তাআলা এ কারণে আমাদেরকে মাফ করে দিবেন। অতঃপর সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।”[২৭৬]
২৬৬. হুযাইফা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ رَجُلًا مِّمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ أَتَاهُ مَلَكُ لِيَقْبِضَ نَفْسَهُ، فَقَالَ لَهُ : هَلْ عَمِلْتَ مِنْ خَيْرٍ؟ فَقَالَ : مَا أَعْلَمُ قِيلَ لَهُ : انْظُرُ. قَالَ : مَا أَعْلَمُ شَيْئًا، غَيْرَ أَنِّي كُنْتُ أَبَايِعُ النَّاسَ وَأُحَارِفُهُمْ فَأُنْظِرُ الْمُعْسِرَ، وَأَتَجَاوَزُ عَنِ الْمُوْسِرِ، فَأَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের এক ব্যক্তির কাছে জান কবজ করার জন্য ফেরেশতা আগমন করে জানতে চাইল, 'কোনও ভালো কাজ করেছ?' লোকটি বলল, 'আমি জানি না।' ফেরেশতা বলল, 'মনে করার চেষ্টা করো।' সে বলল, 'কিছুই মনে আসছে না। তবে মানুষের সাথে আমি ক্রয়-বিক্রয় ও লেন-দেন করতাম। গরিবদেরকে মূল্য পরিশোধের জন্য সময় দিতাম এবং ধনীদের থেকে দাম কম রাখতাম।' অতঃপর (এই আমলের বিনিময়ে) তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।"[২৭৭]
২৬৭. আবূ মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
حُوسِبَ رَجُلٌ مِّمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَلَمْ يُوْجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ، إِلَّا أَنَّهُ كَانَ رَجُلًا مُوْسِرًا، وَكَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ، فَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوْا عَنِ الْمُعْسِرِ، فَقَالَ اللهُ: نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوْا عَنْهُ.
"তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তির হিসাব গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তার নিকট কোনও প্রকার ভালো আমাল পাওয়া যায়নি। তবে সে মানুষের সাথে লেন-দেন করত এবং সে সচ্ছল ছিল। ফলে সে দরিদ্র লোকদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল। রাসূল
(সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 'তারপর আল্লাহ বললেন-ক্ষমা করার ব্যাপারে আমিই তার চেয়ে অধিক যোগ্য-একে ক্ষমা করে দাও।”[২৭৮]
২৬৮. আবুল ইয়াসার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا، أَوْ وَضَعَ عَنْهُ، أَظَلَّهُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى فِي ظِلَّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ.
“যে-ব্যক্তি গরিবকে ঋণ পরিশোধ করার সময় দেয় অথবা পাওনা ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তাকে সেদিন নিজের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোনও ছায়া থাকবে না।”[২৭৯]
২৬৯. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا أَوْ وَضَعَ لَهُ، أَظَلَّهُ اللَّهُ فِي ظِلَّ عَرْشِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে-ব্যক্তি অভাবী ঋণগ্রস্তকে ঋণ পরিশোধের জন্য সময় দেয়, অথবা ঋণ মাফ করে দেয় কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন।”[২৮০]
২৭০. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَرَادَ أَنْ تُسْتَجَابَ دَعْوَتُهُ، وَأَنْ تُكْشَفَ كُرْبَتُهُ، فَلْيُفَرِّجْ عَنْ مُعْسِرٍ
“যে-ব্যক্তি চায় তার দুআ কবুল হোক এবং তার কষ্ট-ক্লেশ লাঘব হোক, সে যেন কোনও দরিদ্র ব্যক্তির কষ্ট দূর করে।”[২৮১]
২৭১. ইমরান ইবনু হুসাইন (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ كَانَ لَهُ عَلَى رَجُلٍ حَقٌّ، فَمَنْ أَخَرَهُ كَانَ لَهُ بِكُلِّ يَوْمٍ صَدَقَةٌ
“যে-ব্যক্তি ঋণগ্রস্তকে ঋণ পরিশোধের জন্য সময় দেয়, সে প্রতিদিন একটি করে সদাকার সাওয়াব লাভ করে।”[২৮২]
۲ ৭۲. মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “আবূ কাতাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) এক ব্যক্তির কাছে ঋণ পাওনা ছিলেন। লোকটি তার থেকে পালিয়ে বেড়াত। একদিন তিনি ঋণ আদায়ের জন্য তার বাড়িতে আসলেন। ঘর থেকে ছোট্ট একটি শিশু বের হয়ে এল। তিনি বাচ্চাটিকে সেই লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, 'হ্যাঁ। তিনি বাড়িতে খাযীরাহ (ছোটো ছোটো গোশতের টুকরো, পানি ও ময়দা দিয়ে তৈরীকৃত খাবার) খাচ্ছেন।' আবু কাতাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) লোকটিকে ডাকলেন, 'হে অমুক! বেরিয়ে আসুন। আমি জানি আপনি বাড়িতে আছেন।' লোকটি তখন বের হয়ে এল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কীসে আপনাকে আমার থেকে দূরে দূরে রাখে?' সে বলল, 'আসলে আমি অনেক অভাবী। আমার কাছে ঋণ পরিশোধের মতো কোনোকিছুই নেই।' তিনি বললেন, 'সত্যিই আপনি অভাবী?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' একথা শুনে (গভীর এক আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে) আবূ কাতাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) কেঁদে ফেলেন। এরপর বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে বলতে শুনেছি-
مَنْ نَفْسَ عَنْ غَرِيْمِهِ، أَوْ مَحَى عَنْهُ، كَانَ فِي ظِلَّ الْعَرْشِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কষ্ট দূর করবে কিংবা তার পাওনা ক্ষমা করে দিবে কিয়ামাতের দিন সে আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবে।”[২৮৩]
২৭৩. যাইদ ইবনু আরকাম (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَنْظُرَ مُعْسِرًا بَعْدَ حُلُوْلٍ أَجَلِهِ، كَانَ لَهُ بِكُلِّ يَوْمٍ صَدَقَةٌ.
“যে-ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সময় বাড়িয়ে দেয় সে প্রতিদিন একটি করে সদাকা করার সাওয়াব পায়।”[২৮৪]
২৭৪. সুফইয়ান সাওরি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “এক ব্যক্তি আমার কাছে আবেদন করল যে, আমি যেন মুহাম্মাদ ইবনু সূকাহ (রহিমাহুল্লাহ)-এর সাথে কথা বলি। মুহাম্মাদ ইবনু সূকাহ তার কাছে অনেক টাকা পাওনা। তিনি যেন তার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেন। আমি এসে দেখি মুহাম্মাদ ইবনু সূকাহ (রহিমাহুল্লাহ) তার দরজায় বসে আছেন। আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে জানতে চাইলেন, 'কোনও কাজে এসেছেন?'
আমি বললাম, 'আপনার কাছে ঋণী এমন এক ব্যক্তি আমার কাছে আবেদন করল, আমি যেন আপনাকে বলি তার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দিতে।'
তিনি বললেন, 'কে সে?' আমি বললাম, 'অমুক ব্যক্তি।' তিনি বললেন, 'তার কাছে তো আমাদের অনেক টাকা পাওনা। যাইহোক, আপনি আসার কারণে তার অর্ধেক ঋণ কমিয়ে দিলাম। আর যদি আপনি আমার সাথে পানাহার করেন তাহলে তার সব ঋণ মাফ করে দেবো।' আমি বললাম, 'আচ্ছা ঠিক আছে, পানাহার করব।' তিনি আমাকে উত্তম খাবার খাওয়ালেন। পানাহারের পর তিনি আমাকে একটি চিরকুট দিয়ে বললেন, এটা ধরুন। আমি এই টাকাগুলো তাকে অনুদান হিসেবে দিলাম এবং তাকে ক্ষমা করে দিলাম।'

টিকাঃ
২৭৬. বুখারি, ৩৪৮০; মুসলিম, ১৫৬২; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২৬৩。
২৭৭. বুখারি, ২০৭৭, ২০৭৮; মুসলিম, ১৫৬০; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/৩৯৫。
২৭৮. মুসলিম, ১৫৬১; তিরমিযি, ১৩০৭; বাইহাকি, সুনান, ৫/৩৫৬。
২৭৯. মুসলিম, ৩০০৬; হাকিম, মুস্তাদরাক, ২/২৯。
২৮০. তিরমিযি, ১৩০৬; আহমাদ, ৮৭১১。
২৮১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২৩; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৪/১৩৬。
২৮২, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/৪৪২; সুয়ূতি, আদ-দুররুল মানসূর, ১/৩৬৯。
২৮৩. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/৩০০; দারিমি, আস-সুনান, ২/২৬১。
২৮৪. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ১৫৪০৯; খতীব বাগদাদি, তারীখ, ২৩/৩১০。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00