📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 বোন ও মেয়েসন্তানদের সাথে উত্তম আচরণের প্রতিদান

📄 বোন ও মেয়েসন্তানদের সাথে উত্তম আচরণের প্রতিদান


১৮০. আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'একমহিলা তার দুই মেয়েকে সাথে করে নিয়ে এসে আমার কাছে ভিক্ষা চাইল। তখন একটি খেজুর ছাড়া তাকে দেওয়ার মতো আর কোনোকিছুই আমার কাছে ছিল না। আমি সেই খেজুরটিই তাকে দিয়ে দিলাম। সে তা নিয়ে দুই টুকরো করে দুই মেয়ের মাঝে ভাগ করে দিল, নিজে কিছুই খেলো না। তারপরে সে তার দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে সেখান থেকে উঠে চলে গেল। পরে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট এলে আমি ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। তখন তিনি বললেন,
مَنِ ابْتُلِي مِنَ الْبَنَاتِ بِشَيْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِّنَ النَّارِ
“যে-ব্যক্তিকে মেয়েসন্তান দান করে পরীক্ষা করা হয়, সে যদি তাদের প্রতি উত্তম আচরণ করে, তাহলে সেই মেয়েরা তার জন্য জাহান্নামে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।" [১৮৮]
১৮১. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كُنَّ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ يُؤَدِّبُهُنَّ، وَيَرْحَمُهُنَّ، وَيَكْلُفُهُنَّ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ الْبَتَّةً
"যে-ব্যক্তির তিনজন মেয়ে থাকবে এবং সে তাদেরকে উত্তম আচার-আচরণ শিখাবে, তাদের প্রতি দয়া করবে ও তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে—অবশ্যই তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।" কেউ একজন জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! যদি দুইজন মেয়ে থাকে?' তিনি বললেন,
وَإِنْ كَانَتَا اثْنَتَيْنِ
"যদি দুইজন থাকে, তবুও।" [১৮৯]
১৮২. আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ تُدْرَكُ لَهُ ابْنَتَانِ فَيُحْسِنُ إِلَيْهِمَا مَا صَحِبَتَاهُ، أَوْ صَحِبَهُمَا إِلَّا أَدْخَلَتَاهُ الجنة
"যে-মুসলিম দুইজন মেয়েসন্তান লাভ করে অতঃপর তারা তার সাথে যতদিন থাকে তাদের প্রতি সদাচার করে, তাহলে নিশ্চিতভাবে মেয়েসন্তান দু'জন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।"[১৯০]
১৮৩. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ أُخْتَانِ، فَأَحْسَنَ صُحْبَتَهُمَا، دَخَلَ بِهِمَا الْجَنَّةَ
"যার দুইটি বোন আছে আর সে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, তাহলে তাদের মাধ্যমে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" [১৯১]
১৮৪. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ ابْنَةُ، فَلَمْ يُؤْذِهَا، وَلَمْ يُهِنْهَا، وَلَمْ يُؤْثِرُ وَلَدَهُ عَلَيْهَا يَعْنِي الذُّكُورَ، أَدْخَلَهُ اللهُ بِهَا الْجَنَّةَ
“যে-ব্যক্তি মেয়েসন্তানের বাবা হওয়ার পর যদি তাকে কষ্ট না দেয়, তুচ্ছজ্ঞান না করে এবং তার ওপর ছেলেসন্তানকে প্রাধান্য না দেয়, তাহলে এর প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।"[১৯২]
১৮৫. আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، أَوْ ثَلَاثُ أَخَوَاتٍ اِتَّقَى اللهَ عَزَّ وَجَلَّ، وَأَقَامَ عَلَيْهِنَّ، كَانَ مَعِي في الْجَنَّةِ هُكَذَا
“যে-ব্যক্তির তিনজন মেয়ে বা তিনজন বোন আছে আর সে (তাদের ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের যথাযথ খেয়াল রাখে, সে জান্নাতে আমার সাথে এভাবে থাকবে।” একথা বলে তিনি তাঁর চার আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন।"[১৯৩]
১৮৬. উকবা ইবনু আমির (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ، وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَتِهِ، كُنَّ حِجَابًا لَهُ مِنَ النَّارِ
"যদি কারও তিনজন মেয়ে থাকে এবং সে তাদের (প্রতিপালনে) ধৈর্যধারণ করে ও তাদেরকে সাধ্যানুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করায়, তাহলে সেই মেয়েরা তার জন্য জাহান্নামের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।" [১৯৪]

টিকাঃ
১৮৮. বুখারি, ১৪১৮, ৫৯৯৫; মুসলিম, ২০২৭, ২৬২৯; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২১২; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৮৬৮৫。
১৮৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৪২৪৭; হুসাইন ইবনু হারব, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১৯০。
১৯০. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৭৩৫১; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১/২৩৫。
১৯১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২১০৪; ইবনু মাজাহ, ৩৬৭০; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৭৮。
১৯২, আবু দাউদ, ৫১৪৬; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৭৭。
১৯৩. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১২৫৯৩; ইবনু হিব্বান, ৪৪৭。
১৯৪. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৭৪০৩; ইবনু মাজাহ, ৩৬৬৯; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৮৬৮৮。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 তালাকপ্রাপ্তা মেয়ের জন্য খরচ করার নেকি

📄 তালাকপ্রাপ্তা মেয়ের জন্য খরচ করার নেকি


১৮৭. সুরাকা ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন যে, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেছেন,
يَا سُرَاقَهُ، أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى أَعْظَمِ الصَّدَقَةِ، أَوْ مِنْ أَعْظَمِ الصَّدَقَةِ؟
"হে সুরাকা! আমি কি তোমাকে সর্বোত্তম সদাকার কথা বলে দেবো না?' তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! হ্যাঁ। অবশ্যই।' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
ابْنَتُكَ مَرْدُوْدَةٌ إِلَيْكَ، لَيْسَ لَهَا كَاسِبٌ غَيْرَكَ
"তোমার মেয়ে (র জন্য খরচ করা) যে (তালাকপ্রাপ্তা হয়ে) তোমার কাছে ফিরে এসেছে। তুমি ছাড়া যার অন্য কোনও উপার্জনকারী নেই।”[১৯৫]

টিকাঃ
১৯৫. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৮০; ইবনু মাজাহ, ৩৬৭১。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 খালার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব

📄 খালার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব


১৮৮. আলি ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা যখন মক্কা থেকে বিদায়ের উদ্দেশ্যে বের হলাম, তখন হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কন্যা 'চাচা! চাচা!' বলে ডাকতে ডাকতে আমাদের পেছনে দৌড়ে এল। আমি তার হাত ধরে কোলে তুলে নিলাম এবং ফাতিমার কাছে দিয়ে বললাম, 'এই নাও, তোমার চাচার মেয়ে।' এরপর আমরা যখন মদীনায় আসলাম তখন তার প্রতিপালন কে করবে—এই নিয়ে জা'ফর, যাইদ ইবনু হারিসা ও আমার মধ্যে বিরোধ দেখা দিল। জা'ফর বললেন, 'সে আমার চাচার মেয়ে আর তার খালা আসমা বিনতু উমাইস আমার স্ত্রী। সুতরাং আমিই তার প্রতিপালনের সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখি।' যাইদ ইবনু হারিসা বললেন, 'সে আমার ভাইয়ের মেয়ে। সুতরাং আমিই তাকে লালন-পালন করব।' আর আমি বললাম, 'আমি তাকে মক্কা থেকে নিয়ে এসেছি এবং সে আমার চাচার মেয়ে। সুতরাং তার প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আমিই অধিক উপযুক্ত।' তখন আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
أَمَّا أَنْتَ يَا جَعْفَرُ، فَأَشْبَهْتَ خَلْقِي وَخُلُقِي، وَأَمَّا أَنْتَ فَمِنِّي وَأَنَا مِنْكَ، وَأَمَّا أَنْتَ يَا زَيْدُ فَأَخُوْنَا وَمَوْلَانَا، وَالْجَارِيَةُ عِنْدَ خَالَتِهَا فَإِنَّ الْخَالَةَ وَالِدَةٌ
"হে জা'ফর! তুমি চেহারা এবং চরিত্রে আমার মতো হয়েছ। আর (হে আলি!) তুমি আমার থেকে এবং আমি তোমার থেকে। আর যাইদ! তুমি আমাদের ভাই এবং বন্ধু। মেয়েটি তার খালার কাছেই থাকুক। কারণ খালা মায়ের মতোই।”[১৯৬]
১৮৯. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি অনেক বড়ো গুনাহ করে ফেলেছি। আমার জন্য কি তাওবার কোনও সুযোগ আছে?' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, 'তোমার মা-বাবা কি জীবিত আছেন?' সে বলল, 'না।' তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার খালা কি আছেন?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন তাকে বললেন, 'তাহলে তুমি তাঁর সেবা করতে থাকো। ১৯৭]

টিকাঃ
১৯৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৭৭0; আবূ দাউদ, আস-সুনান, ২২৮০; সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ২২২৭১。
১৯৭, তিরমিযি, ১৯৬৮; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫৫。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 মেহমানকে সম্মান করার সাওয়াব

📄 মেহমানকে সম্মান করার সাওয়াব


১৯০. আবূ শুরাইহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، جَائِزَتُهُ يَوْمُ وَلَيْلَةُ، وَالضَّيَافَةُ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ، فَمَا كَانَ فَوْقَ ذَلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ، لَا يَحِلُّ لَهُ أَنْ يَثْوِيَ عِنْدَهُ حَتَّى يُخْرِجَهُ.
"যে-ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর ঈমান রাখে সে যেন মেহমানের সম্মান করে। মেহমানকে স্পেশাল যত্ন-আপ্যায়ন করা হবে একদিন-একরাত। এবং সাধারণ মেহমানদারি চলবে তিনদিন-তিনরাত। এরপরে যা হবে-তা সদাকা। তবে মেযবানকে কষ্ট দিয়ে তার নিকট অবস্থান করা মেহমানের জন্য হালাল নয়।" [১৯৮]
১৯১. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ.
"যে-ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানের সম্মান করে। "[১৯৯]
১৯২. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে মেহমান হয়ে আসলে তিনি মেহমানদারির জন্য নিজের স্ত্রীদের কাছে খবর পাঠালেন। তারা জানালেন যে, 'আমাদের কাছে পানি ছাড়া দেওয়ার মতো আর কিছুই নেই।'
এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'কে আছ এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসেবে আপ্যায়ন করাবে?'
তখন এক আনসারি সাহাবি (আবূ তালহা رضي الله عنه) বললেন, 'আমি।' এই বলে তিনি মেহমানকে তার সঙ্গে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মেহমানকে সম্মান করো।'
স্ত্রী বললেন, 'বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আমাদের ঘরে তো অন্য কিছুই নেই।'
সাহাবি (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাকে বললেন, 'তুমি খাবার প্রস্তুত করো এবং বাতি জ্বালাও আর বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দাও।'
স্ত্রী তাঁর কথা মতো খাবার প্রস্তুত করলেন, বাতি জ্বালালেন এবং বাচ্চাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। এরপর খাবার মেহমানের সামনে উপস্থিত করলেন। একসময় উঠে গিয়ে বাতি ঠিক করার বাহানায় বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর স্বামী-স্ত্রী দু'জনই খাওয়ার ভান ধরলেন এবং মেহমানকে বুঝালেন যে, তারাও তার সঙ্গে খাচ্ছেন।
এরপর তারা উভয়েই সারারাত অভুক্ত অবস্থায় কাটিয়ে দিলেন। সকালে যখন তিনি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এলেন তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের গতরাতের কাণ্ড দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা বলেছেন খুশি হয়েছেন এবং এ আয়াত নাযিল করেছেন, وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوْقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ (۹) "তারা অভাবী হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদেরকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর যাদেরকে অন্তরের কৃপণতা হতে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফল।”[২০০]
১৯৩. আবূ জা'ফর দাইনাওয়ারি (রহিমাহুল্লাহ)-এর এক ভাই ছিলেন। তিনি কোনও গ্রামে একদিন ও একরাতের বেশি সময় অবস্থান করতেন না। একবার তিনি এক এলাকায় গিয়ে না খেয়ে অসুস্থ অবস্থায় সাত দিন পড়ে রইলেন। কিন্তু কেউ তাঁকে কিছু জিজ্ঞেসও করল না। এভাবেই একসময় তাঁর মৃত্যু হয়ে যায়। অষ্টম দিন সকালে এলাকার মানুষেরা দেখল অসুস্থ লোকটি মারা গেছে। তখন তারা তাঁকে গোসল দিয়ে, কাফন পরিয়ে দাফন করতে গেল। চারপাশ থেকে আরও অনেক লোকজন তাঁর জানাযার সালাত পড়তে এল। তারা বলাবলি করতে লাগল, 'আমরা শুনলাম, একজন জোরে আওয়াজে দিয়ে বলছে, 'আল্লাহর ওলির জানাযায় যদি অংশগ্রহণ করতে চাও তো অমুক গ্রামে যাও।'
জানাযা শেষে দাফনের কাজ সমাপ্ত হলো। পরদিন এলাকার মানুষ দেখল, তার
কাফনের কাপড় ও কিছু সুগন্ধি জানাযার সালাতের জায়গায় পড়ে আছে। সাথে রয়েছে একটি চিঠি। সেখানে লেখা- 'তোমাদের এই কাফনের কোনও প্রয়োজন নেই আমাদের। আল্লাহর এক ওলি তোমাদের এলাকায় সাতদিন অবস্থান করেছেন। তোমরা তাকে দেখতে আসোনি। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করোনি। তাকে পানাহারও করাওনি; এমনকি তার সাথে কেউ কথা পর্যন্ত বলোনি।'
ইমাম কাত্তানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এই ঘটনার পরে সেই এলাকাবাসী সেখানে একটি মেহমানখানা নির্মাণ করেছিল।'
১৯৪. আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফর (রহিমাহুল্লাহ)-এর গোলাম বুদাইহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফর (রহিমাহুল্লাহ)-এর সাথে একবার আমি সফরে গেলাম। একটি তাঁবুর পাশে আমরা যাত্রাবিরতি করি। তাঁবুর মালিক ছিলেন বানী উযরাহ গোত্রের লোক। এমন সময় এক বেদুঈন একটি উটনী নিয়ে আমাদের সামনে এসে বলল, 'একটি ছুরি দিন।' আমরা তাকে ছুরি দিই। সে উটনীটিকে জবাই করে বলল, 'এর থেকে আহার করুন।' দ্বিতীয় দিনও আমরা সেখানে অবস্থান করলাম। উযরাহ গোত্রের সেই লোক এবার আরেকটি উটনী নিয়ে এসে আমাদের কাছে আবার ছুরি চাইল। আমরা বললাম, 'আমাদের কাছে গোশত আছে।' সে বলল, 'আমি থাকতে আপনারা বাসি খাবার কেন খাবেন? দেন, ছুরি দেন।'
তার কথা মতো আমরা তাকে ছুরি দিই। সে ওই উটনীটিকেও জবাই করে বলল, 'এখান থেকে আহার করুন।' তৃতীয় দিনও আমরা সেখানে অবস্থান করলাম। দেখি, সেই লোক আবার আরেকটি উটনী নিয়ে এসেছে। আমাদের কাছে এসে আগের মতো ছুরি চাইল। আমরা বললাম, 'আমাদের কাছে পর্যাপ্ত গোশত আছে।' সে বলল, 'আমি থাকতে আপনারা বাসি গোশত খাবেন! মনে হচ্ছে আপনারা কৃপণ। দেন, একটা ছুরি দেন।' ছুরি নিয়ে সে এই উটনীটিকেও জবাই করে দিয়ে বলল, 'এখান থেকে আহার করুন।'
পরের দিন আমরা সেখান থেকে রওনা হই। তখন আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফর (রহিমাহুল্লাহ) তার গোলামকে বললেন, 'তোমার কাছে কিছু আছে?' সে বলল, 'আমার কাছে এক টুকরো কাপড় ও চারশ দিরহাম আছে।'
তিনি বললেন, 'এগুলো নিয়ে উযরাহ গোত্রের লোকটির কাছে যাও।' গোলাম সেগুলো নিয়ে লোকটির তাবুর কাছে এল। সেখানে একজন মহিলাকে দেখতে পেয়ে বলল, 'এগুলো আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফরের পক্ষ থেকে হাদিয়া।' মহিলা উত্তর দিল,
'আমরা কারও থেকে মেহমানদারির বিনিময় নিই না।' গোলাম ফিরে এসে আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফর (রহিমাহুল্লাহ)-কে বিষয়টি জানাল। জবাবে তিনি বললেন, 'তুমি আবার যাও। মহিলা এগুলো গ্রহণ করলে করবে নইলে দরজায় রেখে চলে আসবে।'
গোলাম আবার রওনা হলো। মহিলা তাকে বলল, 'এগুলো নিয়ে ফিরে যান। আল্লাহ আপনাদের কল্যাণ করুন। আমরা কারও থেকে মেহমানদারির বিনিময় নিই না।' এই কথা শুনে গোলাম সেগুলো দরজায় রেখে চলে এল।
তারপর আমরা অল্প দূর এগোই। হঠাৎ দেখি, খুব দ্রুত গতিতে একজন আমাদের দিকে আসছে। কাছে আসার পর দেখি উযরাহ গোত্রের সেই লোকটি। সে আমাদের দেওয়া কাপড়ের টুকরো ও থলে সাথে করে নিয়ে এসেছে। তারপর সে সেগুলো রেখে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। আমরা তার ফিরে যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলাম। ভাবলাম, হয়তো একবারের জন্য হলেও সে ঘুরে দেখবে। কিন্তু না, সে অনেক দূরে চলে গেলেও পেছনে আর ফিরে তাকায়নি। তখন আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফর (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'উযরাহ গোত্রের লোকটি দানশীলতায় আমাদেরকে হার মানাল।[২০১]
১৯৫. এক ব্যক্তি হাতিম তাঈকে জিজ্ঞেস করল, 'আরবে আপনার চেয়েও কি দানবীর আছে?' তিনি জবাব দিলেন, 'আরবের সবাই আমার চেয়ে বড়ো দানবীর।' তারপর একটা ঘটনা বর্ণনা করলেন— 'একরাতে আমি আরবের এক ইয়াতীম যুবকের মেহমান হলাম। তার ছিল একশ বকরি। সেখান থেকে সে আমার জন্য একটি বকরি জবাই করল। বকরির মগজ খেয়ে আমি বললাম, 'এই মগজ তো বড়োই সুস্বাদু!' পরে সেই যুবক একেক করে মগজ আনতেই থাকে। এক পর্যায়ে আমি বলতে বাধ্য হই, 'আর লাগবে না, যথেষ্ট হয়েছে।' সকালবেলা দেখি, সে একশ বকরিই জবাই করে ফেলেছে। একটাও বাদ রাখেনি। লোকটি এবার হাতিম তাঈকে বলল, 'তারপর আপনি কী করলেন?' হাতিম তাঈ বললেন, 'যা কিছু-ই করি না কেন, সেই যুবকের কৃতজ্ঞতা আদায় করা কীভাবে সম্ভব! আমি তাকে আমার সেরা একশ উট হাদিয়া দিয়ে এসেছি।[২০২]

টিকাঃ
১৯৮. বুখারি, ৬০১৯; মুসলিম, ৪৮。
১৯৯. বুখারি, ৬০১৯; মুসলিম, ৪৮。
২০০. সূরা হাশর, ৫৯: ৯; বুখারি, ৩৭৯৮, ৪৮৮৯; মুসলিম, ২০৫৪。
২০১. ইবনু আবিদ দুনইয়া, কিতাবু কুরাদ দইফ, ২৩; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ২৭/২৭৮-২৭৯。
২০২, ইবনু আবিদ দুনইয়া, কিতাবু কুরাদ দইফি, ৩০; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৬১-২৬২。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00