📄 মা-বাবার বন্ধু-বান্ধব ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে ভালো আচরণ করবে
১৬৫. আবদুল্লাহ ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'একবার হাজ্জের সফরে ইবনু উমরের পাশ দিয়ে এক বেদুঈন পথ অতিক্রম করছিল। তাকে দেখে ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, 'আপনি অমুকের ছেলে অমুক না?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' তারপর ইবনু
উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তার বাহন ক্লান্ত হওয়ার পর যে-গাধার ওপর সওয়ার হতেন সেই গাধাটি এবং নিজের পাগড়িটি সেই বেদুঈনকে দিয়ে দিলেন।
ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সামনে এগুচ্ছেন। সে সময় আমাদের একজন তাঁকে বললেন, 'আপনি নিজের সওয়ার-হওয়ার-গাধা ও মাথায় বাঁধার পাগড়ি সেই বেদুঈনকে দিয়ে দিলেন? সে তো এক দিরহাম পেলেই সন্তুষ্ট হয়ে যেত।' উত্তরে ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ أَبَرَّ الْبِرِّ : صِلَةُ الْمَرْءِ أَهْلَ وُدَّ أَبِيْهِ بَعْدَ أَنْ تُوَلَّي
"পিতার মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে-সর্বোত্তম নেককাজ।" [১৭১]
১৬৬. আবদুল্লাহ ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন, 'কোনও এক সফরে ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর পাশ দিয়ে এক বেদুঈন যাচ্ছিল। সেই বেদুঈনের বাবা ছিলেন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বন্ধু। ইবনু উমর সেই বেদুঈনকে বললেন, 'আপনি অমুকের ছেলে না?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' তখন ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সফরে থাকাকালেই তাঁর সওয়ার-হওয়ার-গাধাটি এবং মাথার পাগড়ি খুলে তাকে দিয়ে দিলেন।
এটি দেখে তাঁর সঙ্গীদের একজন বললেন, 'আপনি তাকে এত কিছু দিলেন? তাকে দুই দিরহাম দিলেই তো যথেষ্ট ছিল।' তখন ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
احْفَظْ وُدَّ أَبِيكَ لَا تَقْطَعْهُ فَيُطْفِئَ اللَّهُ نُوْرَكَ
"তুমি তোমার বাবার বন্ধুদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রেখো। তাঁদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করো না। (সম্পর্কচ্ছেদ করলে) আল্লাহ তাআলা তোমার আলো নিভিয়ে দিবেন।" [১৭২]
১৬৭. নাফি' (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আবূ বুরদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মদীনায় এলে ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। সালাম বিনিময়ের পর তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। বিদায় নেওয়ার সময় বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ مِنْ أَبَرُ الْبِرِّ مَنْ بَرَّ أَبَاهُ بَعْدَ مَوْتِهِ بِصِلَتِهِ أَهْلَ وُدَّ أَبِيْهِ
“সর্বোত্তম নেককাজের একটি হলো—বাবার মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে বাবার সাথে সদাচার করা।” আমার বাবা আপনার বাবার বন্ধু ছিলেন। তাই আপনার সাথে সদাচরণের মাধ্যমে আমি আপনার প্রতি আমার আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটালাম।' এরপর তিনি সেখান থেকে উঠে এলেন।[১৭৪]
১৬৮. আমরা ইতিপূর্বে আবূ উসাইদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস বর্ণনা করেছি। এক ব্যক্তি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! পিতামাতার মৃত্যুর পরে কি তাদের প্রতি সদাচার করার মতো কিছু রয়েছে?' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
نَعَمْ، خِصَالُ أَرْبَعُ، فَذَكَرَ مِنْهُنَّ : وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا
"হ্যাঁ, চারটি বিষয় রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে—তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।"[১৭৫]
১৬৯. উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'যে-ব্যক্তি তাঁর বাবার মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রতি সদাচার প্রদর্শন করতে চায়, সে যেন তাঁর বাবার বন্ধু-বান্ধব ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে ভালো ব্যবহার করে।[১৭৬]
টিকাঃ
১৭১. মুসলিম, ২৫৫২; তিরমিযি, ১৯০৩; আবু দাউদ, ৫১৪৩。
১৭২. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৪০; তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ৮৬৩৩, দঈফ。
১৭৪. ইবনু আদি, আল-কামিল, ৮/৪০৬。
১৭৫. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/৪৯৮; তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ১৯/২৬৮; ইবনু আবী শাইবা, আল-আদাব, ১/১৫১, দঈফ。
১৭৬. বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/৩৩。
📄 পিতামাতার কবর যিয়ারত করবে
১৭০. বুরাইদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট
১৭১. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেছেন। তিনি নিজেও কেঁদেছেন, পার্শ্ববর্তী মানুষগুলোকেও কাঁদিয়েছেন।' এরপর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَزُوْرَ قَبْرَهَا، فَأَذِنَ لِي، وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهُمْ، فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي
“আমি আমার রবের নিকট আমার মায়ের কবর যিয়ারতের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেছি। তিনি আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। আমি আমার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতিও চেয়েছি। কিন্তু আমাকে এর অনুমতি দেওয়া হয়নি।" [১৭৮]
১৭২. ফাদল ইবনু মুওয়াফফাক (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, 'আমি সবসময় আমার বাবার কবর যিয়ারত করতাম। একদিন কোনও এক জানাযায় অংশগ্রহণ করার পর জরুরি কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। ফলে সেদিন আর বাবার কবর যিয়ারতে যেতে পারিনি। সেই রাতে স্বপ্নে দেখি বাবা আমাকে বলছেন, 'হে আমার ছেলে! তুমি আজ কেন আসোনি?' আমি বললাম, 'বাবা! আপনি আমার সম্পর্কে খবর রাখেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই। তুমি যখন আমার কাছে আসো আমি তোমার পথের দিকে চেয়ে থাকি। দেখি, তুমি সেই পুলটি পার হচ্ছো, এরপর আমার কাছে এসে অবস্থান করছো এবং একসময় এখান থেকে বিদায় নিচ্ছ। তোমার চলে যাওয়ার সময়ও আমি তাকিয়ে থাকি, যতক্ষণ না তুমি সেই পুলটি পার হয়ে যাও। [১৭৯]
১৭৩. উসমান ইবনু সাওদা তফাবি (রহিমাহুল্লাহ) [১৮০] বর্ণনা করেন, 'আমার মা মুমূর্ষু অবস্থায় আসমানের দিকে দু'হাত তুলে বললেন,
يَا ذُخْرِي وَذَخِيرَتِي، وَيَا مَنْ عَلَيْهِ اعْتِمَادِي فِي حَيَاتِي وَبَعْدَ مَوْتِي، لَا تَخْذِلْنِي عِنْدَ الْمَوْتِ، وَلَا تُوْحِشْنِي فِي قَبْرِي
“হে আমার ভাণ্ডার! আমার পুঁজি! হে ঐ সত্তা, জীবনে এবং মরণে যার প্রতি আমার পূর্ণ ভরসা! মৃত্যুর সময় আমাকে লাঞ্ছিত কোরো না এবং কবরে আমায় একাকিত্বে রেখো না।”
এই দুআ করার পর তিনি মারা যান। প্রতি জুমুআর রাতে আমি মায়ের কবর যিয়ারত করতাম। তার জন্য এবং সমস্ত কবরবাসীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। একরাতে আমি আমার মাকে স্বপ্নে দেখে বললাম, ‘মা! আপনার কী অবস্থা?’ তিনি বললেন, ‘ছেলে আমার! মৃত্যু যন্ত্রণা খুবই কঠিন। আল্লাহর রহমতে খুব আনন্দের সাথেই আমি কবরের জীবন পার করছি। এখানে আমরা ফুলের বিছানায় ঘুমাই। আমাদের বালিশগুলো চিকন-মোটা রেশমি সুতো দিয়ে তৈরি। এভাবেই কিয়ামাত পর্যন্ত আমরা কাটিয়ে দেবো।’
আমি বললাম, ‘আপনার কোনোকিছুর প্রয়োজন আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে। তুমি আমাদের কবর যিয়ারত করা এবং আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা কখনও ছেড়ে দিয়ো না। কারণ জুমুআর দিন তুমি তোমার পরিবার ছেড়ে আমার কবর যিয়ারতে আসার কারণে আমাকে সুসংবাদ দেওয়া হয়। আমাকে বলা হয়, ‘হে রাহিবাহ! তোমার ছেলে তার পরিবার রেখে তোমার কবর যিয়ারত করতে চলে এসেছে।’ এটি শুনে আমি অনেক আনন্দিত হই। এর কারণে আমার আশে-পাশের মৃতব্যক্তিরাও আনন্দিত হয়। [১৮১]
টিকাঃ
১৭৭. তিরমিযি, ১০৫৪。
১৭৮. মুসলিম, ৯৭৬, ১০৮; আবু দাউদ, আস-সুনান, ৩২৩৪, নাসাঈ, ৪/৯০; ইবনু মাজাহ, ১/৫০১; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/৪৪১。
১৭৯. ইবনু আবিদ দুনইয়া, আল-মানারাত, ১৯; ইবনুল কাইয়্যিম, আর-রূহ, ১২১。
১৮০. তাঁর মা ছিলেন একজন ইবাদাতগুজারী বান্দী। তাঁকে সবাই 'রাহিবাহ' নামে ডাকত。
১৮১. ইবনু কাসীর, তাফসীর, ৬/৩২৬; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৫২৮; ইবনু রজব হাম্বালি, আহওয়ালুল কুবুর, ৮৮。