📄 সন্তান তার নেক আমল অব্যাহত রাখবে
১৫১. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُوْ لَهُ
"মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর তার আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যায়। তবে তিন জিনিসের মধ্যস্থতায় (মৃত্যুর পরও) সে নেকি পেতে থাকে।
১. সদাকা জারিয়া বা চলমান সদাকা।
২. এমন জ্ঞান, যার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়।
৩. (দুনিয়ায় রেখে যাওয়া) এমন নেকসন্তান, যে তার জন্য দুআ করে।”[১৫৯]
১৫২. আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
سَبْعَةُ يَجْرِي لِلْعَبْدِ أَجْرُهُنَّ وَهُوَ فِي قَبْرِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ : مَنْ عَلَّمَ عِلْمًا، أَوْ كَرَى نَهَرًا، أَوْ حَفَرَ بِئْرًا، أَوْ غَرَسَ نَخْلًا، أَوْ بَنِى مَسْجِدًا، أَوْ وَرَّتَ مُصْحَفًا، أَوْ تَرَكَ وَلَدًا يَسْتَغْفِرُ لَهُ بَعْدَ مَوْتِهِ
“মৃত্যুর পরেও বান্দার জন্য কবরে নেকির ধারা জারি রাখে যে-সাতটি বিষয়-
১. কাউকে ইলম শিক্ষা দেওয়া।
২. নদী খনন করা।
৩. কূপ খনন করে দেওয়া।
৪. গাছ লাগানো।
৫. মাসজিদ নির্মাণ করা।
৬. কাউকে কুরআনের উত্তরাধিকার বানিয়ে দেওয়া।
৭. মৃত্যুর পর এমন নেকসন্তান রেখে যাওয়া, যে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।”[১৬০]
১৫৩. উসাইদ ইবনু আলি (রহিমাহুল্লাহ)-এর বাবা আবূ উসাইদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)- কে বলতে শুনেছেন যে, তিনি বলেছেন, 'এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! মৃত্যুর পর আমার মাতাপিতার খেদমত করার কি কোনও সুযোগ আছে?' তিনি বললেন,
نَعَمْ، خِصَالُ أَرْبَعُ : الدُّعَاءُ لَهُمَا، وَالاسْتِغْفَارُ لَهُمَا، وَإِنْفَاذُ وَعْدِهِمَا، وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا رَحِمَ إِلَّا مِنْ قِبْلِهِمَا
"হ্যাঁ, চারটি বিষয় আছে—
১. তাদের জন্য কল্যাণের দুআ করা।
২. তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৩. তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করা।
৪. যাদের সাথে কেবল পিতামাতার সম্পর্ক রয়েছে—কোনও ধরনের আত্মীয়তার বা অন্য কোনও প্রকারের সম্পর্ক নেই—তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।”[১৬১]
১৫৪. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيَرْفَعُ الدَّرَجَةَ لِلْعَبْدِ الصَّالِحِ فِي الْجَنَّةِ، فَيَقُولُ : يَا رَبِّ، أَنِّي لِي هَذِهِ؟ فَيَقُولُ : بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ
"আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তাঁর নেক বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। তখন সে বলবে, 'হে আল্লাহ! এটি আমার কোন আমলের বিনিময়ে হলো? উত্তরে তিনি বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনা করার বিনিময়ে।" [১৬২]
১৫৫. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ هَدِيَّةَ الْأَحْيَاءِ إِلَى الْأَمْوَاتِ الاسْتِغْفَارُ لَهُمْ وَ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيُدْخِلُ عَلَى أَهْلِ الْقُبُورِ مِنْ دُعَاءِ أَهْلِ الْأَرْضِ أَمْثَالَ الْجِبَالِ
"জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃতদের জন্য উপহার হচ্ছে-তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা। পরিবার-পরিজনদের দুআর কারণে আল্লাহ তাআলা কবরবাসীর নিকট পাহাড়ের মতো বড়ো বড়ো (নেকি) পৌঁছিয়ে দেন।”[১৬৩]
১৫৬. আমর তার বাবা শুআইব থেকে, শুআইব তার দাদা আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا عَلَى أَحَدِكُمْ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَتَصَدَّقَ أَنْ يَجْعَلَهَا لِوَالِدَيْهِ إِذَا كَانَا مُسْلِمَيْنِ، فَيَكُوْنَ لِوَالِدَيْهِ أَجْرُهُمَا، وَيَكُوْنَ لَهُ مِثْلَ أُجُوْرِهِمَا مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْتَقِصَ مِنْ أُجُورِهِمَا شَيْئًا
"তোমাদের কেউ কাউকে দান-সদাকা করতে চাইলে নিজের পিতামাতার উদ্দেশ্যে দান-সদাকা করবে-এতে কোনও অসুবিধা নেই; যদি তারা মুসলিম হয়। এরকম করলে মাতাপিতাও সাওয়াবের অধিকারী হবে এবং
সন্তানও তাঁদের মতো সাওয়াব পাবে। কারও সাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্রও কমানো ছাড়াই।"[১৬৪]
১৫৭. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মা মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি তাঁর জানাযায় উপস্থিত ছিলেন না। তাই তিনি একদিন রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা মারা গেলেন; কিন্তু তখন আমি তার কাছে উপস্থিত থাকতে পারিনি। এখন যদি আমি তাঁর নামে কোনোকিছু দান-সদাকা করি তাহলে কি তিনি উপকৃত হবেন?' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'হ্যাঁ, হবেন।' তিনি বললেন, 'আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে আমার খেজুর বাগানটি আমার মায়ের নামে দান করে দিলাম।[১৬৫]
১৫৮. সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মা মারা গেলে তিনি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রশ্ন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা মারা গেছেন, আমি কি তার পক্ষ থেকে কোনোকিছু সদাকা করতে পারব?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'হ্যাঁ, পারবে।' তিনি বললেন, 'কোন সদাকাটি সর্বোত্তম হবে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'পানি সরবরাহ করা।' তিনি বললেন, 'তাহলে মদীনায় সা'দ পরিবারের পানির নালাটি আমার মায়ের নামে দান করে দিলাম।[১৬৬]
১৫৯. হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার মায়ের প্রতি সদাচারী ছিলাম। তিনি মারা গেছেন। এখন যদি আমি তাঁর নামে দান-সদাকা বা গোলাম আযাদ করি তাহলে কি তিনি উপকৃত হবেন?' আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'হ্যাঁ, হবেন।' তখন তিনি বললেন, 'আমাকে কোনোকিছু সদাকা করার নির্দেশনা দিন।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'মানুষের পানি পানের ব্যবস্থা করো।' হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তারপর সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) মদীনায় দু'টো পানির নালার ব্যবস্থা করে দিলেন।[১৬৭]
১৬০. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা ইন্তিকাল করেছেন। এখন যদি আমি তাঁর নামে কোনোকিছু সদাকা করি তাহলে কি তিনি উপকৃত হবেন?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'হ্যাঁ, হবেন।' লোকটি বললেন, 'আমার একটি খেজুর বাগান আছে। আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে সেটি আমার মায়ের নামে সদাকা করে দিলাম। [১৬৮]
১৬১. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'আমার বাবা মারা গেছেন। তিনি ইন্তিকালের সময় কোনোকিছুর ওসিয়ত করে যাননি। এখন যদি আমি তাঁর পক্ষ থেকে কোনোকিছু সদাকা করি তাহলে কি তিনি উপকৃত হবেন?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'হ্যাঁ, হবেন। [১৬৯]
১৬২. আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'আমার মা মারা গেছেন। আমার প্রবল ধারণা, তিনি যদি কথা বলতে পারতেন তাহলে সদাকা করার নির্দেশ দিতেন। এখন যদি আমি তাঁর পক্ষ থেকে কোনোকিছু সদাকা করি তাহলে কি তিনি উপকৃত হবেন?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'হ্যাঁ, হবেন। [১৭০]
১৬৩. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ حَجَّ عَنْ أَبَوَيْهِ، أَوْ قَضَى عَنْهُمَا مَغْرَمًا، بُعِثَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ الْأَبْرَارِ
“যে-ব্যক্তি তার মৃত মা-বাবার পক্ষ থেকে হাজ্জ আদায় করবে বা তাদের কোনও ঋণ পরিশোধ করে দেবে, কিয়ামাতের দিন তাকে নেককার লোকদের সাথে উঠানো হবে।" [১৭১]
১৬৪. আবুল হাসান উকবারি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমার এক শাইখ আমাকে বলেছেন, 'তিনি স্বপ্নে দেখছেন যে, 'উকবারা' অঞ্চলের 'বানী ইয়াকতীন' নামক
প্রসিদ্ধ কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সেখানে যাত্রাবিরতি করলেন। তিনি দেখলেন, সব কবর আবরণমুক্ত হয়ে কবরবাসীরা বেরিয়ে এসেছে এবং নুয়ে নুয়ে সারা কবরস্থান জুড়ে কিছু একটা কুড়োচ্ছে। তারা কী কুড়োচ্ছিল আমি তা বলতে পারব না। এক ব্যক্তি সবার থেকে পৃথক হয়ে তার কবরের পাড়ে বসে আছে; কোনোকিছু কুড়োচ্ছে না। আমি তার কাছে গিয়ে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন।
আমি বললাম, 'আপনি নিজের জায়গাতেই বসে আছেন, অথচ এরা সবাই কত কিছু কুড়োচ্ছে!' তিনি আমাকে বললেন, 'এগুলো হচ্ছে তাদের-কাছে-পাঠানো মানুষের সাওয়াব। প্রত্যেক জুমুআর রাতে তাদের কাছে এগুলো পাঠানো হয়। তাদেরকে কবর থেকে বেরিয়ে আসার অনুমতি দেওয়া হলে সবাই বেরিয়ে এসে এগুলো কুড়িয়ে নেয়।'
আমি বললাম, 'আপনি কেন কুড়োচ্ছেন না?' তিনি আমাকে বললেন, 'পৃথিবীতে আমার একজন নেককার সন্তান আছে। সে প্রতি জুমুআর রাতে আমার জন্য দু'রাকাআত সালাত আদায় করে। সেখানে সে পঞ্চাশবার সূরা ইখলাস পাঠ করে এর সাওয়াব আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। এই দু'রাকাআত সালাতের কারণে আমার আর মানুষের দেওয়া দান-সদাকার প্রয়োজন হয় না।'
বর্ণনাকারী বলেন, 'এরপর আমি জাগ্রত হয়ে গেলাম। এভাবেই কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আরেকদিন স্বপ্নে দেখি, আমি আবার সেই কবরস্থানের পাড় দিয়েই যাচ্ছি আর মানুষগুলো আগের মতোই সাওয়াব কুড়োচ্ছিল। আমি সেই লোকটির জায়গায় গিয়ে দেখি এবার তিনিও কুড়োচ্ছেন। আমি তাকে সালাম দিলাম, তিনি সালামের জবাব দিলেন। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি কেন কুড়োচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'যে-নেক সন্তানের কথা বলেছিলাম সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে আমাদের কাছে চলে এসেছে। ফলে আমার কাছে তার পাঠানো হাদিয়া এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আমারও মানুষের পাঠানো দান-সদাকার সাওয়াবের প্রয়োজন, তাই কুড়োচ্ছি।' এরপর আমি জাগ্রত হয়ে গেলাম।'
টিকাঃ
১৫৯. মুসলিম, ১৬৩১; আবূ দাউদ, ২৮৮০; তিরমিযি, ১৩৭৬; নাসাঈ, ৬/২৫১; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/৩৭২。
১৬০. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৩৪৪৯; আবু নুআইম, হিলইয়া, ২/৩৪৪。
১৬১. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩৫; ইবনু আবী শাইবা, আল-আদাব, ১/১৫১, দঈফ。
১৬২ আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/৫০৮; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২১৩。
১৬৩. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৮৮৫৫。
১৬৪. তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, ৭৭২৬; সুযুতি, আল-জামিউস সগীর, ১১৮৯৩, দঈফ。
১৬৫. আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ১৬৩৩৭。
১৬৬, নাসাঈ, ৬/২৫৪-২৫৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/২৮৪-২৮৫。
১৬৭. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ১/৪৪১; ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১৩。
১৬৮. তিরমিযি, ৬৬৯; আবু দাউদ, আস-সুনান, ২৮৮২。
১৬৯, মুসলিম, ১৬৩০。
১৭০. বুখারি, ১৩৮৮; মুসলিম, ১০০৪。
১৭১. দারাকুতনি, আস-সুনান, ২৬০৮; তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ৭৮০০。
📄 মা-বাবার বন্ধু-বান্ধব ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে ভালো আচরণ করবে
১৬৫. আবদুল্লাহ ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'একবার হাজ্জের সফরে ইবনু উমরের পাশ দিয়ে এক বেদুঈন পথ অতিক্রম করছিল। তাকে দেখে ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, 'আপনি অমুকের ছেলে অমুক না?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' তারপর ইবনু
উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তার বাহন ক্লান্ত হওয়ার পর যে-গাধার ওপর সওয়ার হতেন সেই গাধাটি এবং নিজের পাগড়িটি সেই বেদুঈনকে দিয়ে দিলেন।
ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সামনে এগুচ্ছেন। সে সময় আমাদের একজন তাঁকে বললেন, 'আপনি নিজের সওয়ার-হওয়ার-গাধা ও মাথায় বাঁধার পাগড়ি সেই বেদুঈনকে দিয়ে দিলেন? সে তো এক দিরহাম পেলেই সন্তুষ্ট হয়ে যেত।' উত্তরে ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ أَبَرَّ الْبِرِّ : صِلَةُ الْمَرْءِ أَهْلَ وُدَّ أَبِيْهِ بَعْدَ أَنْ تُوَلَّي
"পিতার মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে-সর্বোত্তম নেককাজ।" [১৭১]
১৬৬. আবদুল্লাহ ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেন, 'কোনও এক সফরে ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর পাশ দিয়ে এক বেদুঈন যাচ্ছিল। সেই বেদুঈনের বাবা ছিলেন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বন্ধু। ইবনু উমর সেই বেদুঈনকে বললেন, 'আপনি অমুকের ছেলে না?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' তখন ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সফরে থাকাকালেই তাঁর সওয়ার-হওয়ার-গাধাটি এবং মাথার পাগড়ি খুলে তাকে দিয়ে দিলেন।
এটি দেখে তাঁর সঙ্গীদের একজন বললেন, 'আপনি তাকে এত কিছু দিলেন? তাকে দুই দিরহাম দিলেই তো যথেষ্ট ছিল।' তখন ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
احْفَظْ وُدَّ أَبِيكَ لَا تَقْطَعْهُ فَيُطْفِئَ اللَّهُ نُوْرَكَ
"তুমি তোমার বাবার বন্ধুদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রেখো। তাঁদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করো না। (সম্পর্কচ্ছেদ করলে) আল্লাহ তাআলা তোমার আলো নিভিয়ে দিবেন।" [১৭২]
১৬৭. নাফি' (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আবূ বুরদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মদীনায় এলে ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। সালাম বিনিময়ের পর তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। বিদায় নেওয়ার সময় বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ مِنْ أَبَرُ الْبِرِّ مَنْ بَرَّ أَبَاهُ بَعْدَ مَوْتِهِ بِصِلَتِهِ أَهْلَ وُدَّ أَبِيْهِ
“সর্বোত্তম নেককাজের একটি হলো—বাবার মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে বাবার সাথে সদাচার করা।” আমার বাবা আপনার বাবার বন্ধু ছিলেন। তাই আপনার সাথে সদাচরণের মাধ্যমে আমি আপনার প্রতি আমার আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটালাম।' এরপর তিনি সেখান থেকে উঠে এলেন।[১৭৪]
১৬৮. আমরা ইতিপূর্বে আবূ উসাইদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস বর্ণনা করেছি। এক ব্যক্তি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! পিতামাতার মৃত্যুর পরে কি তাদের প্রতি সদাচার করার মতো কিছু রয়েছে?' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
نَعَمْ، خِصَالُ أَرْبَعُ، فَذَكَرَ مِنْهُنَّ : وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا
"হ্যাঁ, চারটি বিষয় রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে—তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।"[১৭৫]
১৬৯. উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'যে-ব্যক্তি তাঁর বাবার মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রতি সদাচার প্রদর্শন করতে চায়, সে যেন তাঁর বাবার বন্ধু-বান্ধব ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে ভালো ব্যবহার করে।[১৭৬]
টিকাঃ
১৭১. মুসলিম, ২৫৫২; তিরমিযি, ১৯০৩; আবু দাউদ, ৫১৪৩。
১৭২. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৪০; তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ৮৬৩৩, দঈফ。
১৭৪. ইবনু আদি, আল-কামিল, ৮/৪০৬。
১৭৫. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/৪৯৮; তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ১৯/২৬৮; ইবনু আবী শাইবা, আল-আদাব, ১/১৫১, দঈফ。
১৭৬. বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/৩৩。
📄 পিতামাতার কবর যিয়ারত করবে
১৭০. বুরাইদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট
১৭১. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেছেন। তিনি নিজেও কেঁদেছেন, পার্শ্ববর্তী মানুষগুলোকেও কাঁদিয়েছেন।' এরপর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَزُوْرَ قَبْرَهَا، فَأَذِنَ لِي، وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهُمْ، فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي
“আমি আমার রবের নিকট আমার মায়ের কবর যিয়ারতের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেছি। তিনি আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। আমি আমার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতিও চেয়েছি। কিন্তু আমাকে এর অনুমতি দেওয়া হয়নি।" [১৭৮]
১৭২. ফাদল ইবনু মুওয়াফফাক (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, 'আমি সবসময় আমার বাবার কবর যিয়ারত করতাম। একদিন কোনও এক জানাযায় অংশগ্রহণ করার পর জরুরি কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। ফলে সেদিন আর বাবার কবর যিয়ারতে যেতে পারিনি। সেই রাতে স্বপ্নে দেখি বাবা আমাকে বলছেন, 'হে আমার ছেলে! তুমি আজ কেন আসোনি?' আমি বললাম, 'বাবা! আপনি আমার সম্পর্কে খবর রাখেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই। তুমি যখন আমার কাছে আসো আমি তোমার পথের দিকে চেয়ে থাকি। দেখি, তুমি সেই পুলটি পার হচ্ছো, এরপর আমার কাছে এসে অবস্থান করছো এবং একসময় এখান থেকে বিদায় নিচ্ছ। তোমার চলে যাওয়ার সময়ও আমি তাকিয়ে থাকি, যতক্ষণ না তুমি সেই পুলটি পার হয়ে যাও। [১৭৯]
১৭৩. উসমান ইবনু সাওদা তফাবি (রহিমাহুল্লাহ) [১৮০] বর্ণনা করেন, 'আমার মা মুমূর্ষু অবস্থায় আসমানের দিকে দু'হাত তুলে বললেন,
يَا ذُخْرِي وَذَخِيرَتِي، وَيَا مَنْ عَلَيْهِ اعْتِمَادِي فِي حَيَاتِي وَبَعْدَ مَوْتِي، لَا تَخْذِلْنِي عِنْدَ الْمَوْتِ، وَلَا تُوْحِشْنِي فِي قَبْرِي
“হে আমার ভাণ্ডার! আমার পুঁজি! হে ঐ সত্তা, জীবনে এবং মরণে যার প্রতি আমার পূর্ণ ভরসা! মৃত্যুর সময় আমাকে লাঞ্ছিত কোরো না এবং কবরে আমায় একাকিত্বে রেখো না।”
এই দুআ করার পর তিনি মারা যান। প্রতি জুমুআর রাতে আমি মায়ের কবর যিয়ারত করতাম। তার জন্য এবং সমস্ত কবরবাসীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। একরাতে আমি আমার মাকে স্বপ্নে দেখে বললাম, ‘মা! আপনার কী অবস্থা?’ তিনি বললেন, ‘ছেলে আমার! মৃত্যু যন্ত্রণা খুবই কঠিন। আল্লাহর রহমতে খুব আনন্দের সাথেই আমি কবরের জীবন পার করছি। এখানে আমরা ফুলের বিছানায় ঘুমাই। আমাদের বালিশগুলো চিকন-মোটা রেশমি সুতো দিয়ে তৈরি। এভাবেই কিয়ামাত পর্যন্ত আমরা কাটিয়ে দেবো।’
আমি বললাম, ‘আপনার কোনোকিছুর প্রয়োজন আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে। তুমি আমাদের কবর যিয়ারত করা এবং আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা কখনও ছেড়ে দিয়ো না। কারণ জুমুআর দিন তুমি তোমার পরিবার ছেড়ে আমার কবর যিয়ারতে আসার কারণে আমাকে সুসংবাদ দেওয়া হয়। আমাকে বলা হয়, ‘হে রাহিবাহ! তোমার ছেলে তার পরিবার রেখে তোমার কবর যিয়ারত করতে চলে এসেছে।’ এটি শুনে আমি অনেক আনন্দিত হই। এর কারণে আমার আশে-পাশের মৃতব্যক্তিরাও আনন্দিত হয়। [১৮১]
টিকাঃ
১৭৭. তিরমিযি, ১০৫৪。
১৭৮. মুসলিম, ৯৭৬, ১০৮; আবু দাউদ, আস-সুনান, ৩২৩৪, নাসাঈ, ৪/৯০; ইবনু মাজাহ, ১/৫০১; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/৪৪১。
১৭৯. ইবনু আবিদ দুনইয়া, আল-মানারাত, ১৯; ইবনুল কাইয়্যিম, আর-রূহ, ১২১。
১৮০. তাঁর মা ছিলেন একজন ইবাদাতগুজারী বান্দী। তাঁকে সবাই 'রাহিবাহ' নামে ডাকত。
১৮১. ইবনু কাসীর, তাফসীর, ৬/৩২৬; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৫২৮; ইবনু রজব হাম্বালি, আহওয়ালুল কুবুর, ৮৮。