📄 সন্তানের ওপর পিতামাতার বদদুআর প্রভাব
১৩۹. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لَّهُنَّ، لَا شَكٍّ فِيهِنَّ : dَعْوَةُ الْمَظْلُومِ، وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ، وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ
"তিন ব্যক্তির দুআ নিঃসন্দেহে কবুল হয়ে যায়- ۱. নিপীড়িত ব্যক্তির দুআ ۲. মুসাফিরের দুআ এবং ۳. সন্তানের বিরুদ্ধে মা-বাবার বদদুআ।"[১৪۵]
১৪۰. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "বানী ইসরাঈলে জুরাইজ নামে এক
ব্যক্তি ছিল। সে সবসময় তার গির্জায় ইবাদাত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকত। সেই গির্জাতে এক গরুর রাখালও আশ্রয় নিয়েছিল। একদিন জুরাইজের মা তার কাছে এলেন। তিনি জুরাইজের নাম নিয়ে ডাক দিলেন। এদিকে জুরাইজ তখন সালাতে দাঁড়িয়েছিল। সে মনে মনে ভাবল, মায়ের ডাকে সাড়া দেবো, নাকি সালাতেই রত থাকব? সে সালাতে দাঁড়িয়ে থাকাকেই প্রাধান্য দিল। জুরাইজের মা দু' তিনবার আহ্বান করার পর সাড়া না পেয়ে গোস্সায় বললেন, 'হে জুরাইজ! পতিতা নারীদের মুখ না দেখিয়ে আল্লাহ যেন তোমায় মৃত্যু না দেন।' একথা বলে তিনি চলে গেলেন। এদিকে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জুরাইজের ইবাদাতের সুনাম বানী ইসরাঈলের লোকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। এক পতিতা নারী লোকদেরকে বলল, 'তোমরা যদি চাও, আমি জুরাইজকে ধোঁকায় ফেলতে পারি।' তারপর সে জুরাইজের কাছে এসে প্ররোচনা দিল কিন্তু জুরাইজ তাকে পাত্তা দিল না। এরপর সেই মেয়ে গির্জায় আশ্রয় নেওয়া ওই রাখালের কাছে কুপ্রস্তাব দিলে রাখাল তা গ্রহণ করে নেয়। এর কিছুদিন পর সেই মেয়েটির গর্ভ থেকে একটি শিশুর জন্ম হয়। এলাকাবাসী জিজ্ঞেস করল, 'এই সন্তান কার?' সে বলল, 'জুরাইজের।' তারপর সবাই মিলে কুঠার-কুড়াল দিয়ে জুরাইজের গির্জা ভেঙে দিল এবং জুরাইজের হাত রশি দিয়ে কাঁধের সঙ্গে বেঁধে নিল। তারপর তাকে পতিতা মেয়েদের পাশ দিয়ে নিয়ে গেল। তখন তাদেরকে দেখে সে মুচকি হাসল।
বাদশাহ তাকে বলল, 'মেয়েটি দাবি করছে, তার কোলের সন্তানটি তোমার।' সে বলল, 'সেই বাচ্চাটি কোথায়?' বাচ্চাটিকে আনা হলে সে বাচ্চাটির দিকে এগিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার বাবা কে?' বাচ্চাটি বলল, 'অমুক রাখাল।' অলৌকিকভাবে আসল ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বাদশাহ মুগ্ধ হয়ে বলল, 'আমরা কি তোমার গির্জাটি স্বর্ণ দিয়ে তৈরি করে দেবো?' সে বলল, 'না, তার কোনও প্রয়োজন নেই। আপনারা আমার গির্জাটি মাটি দিয়েই তৈরি করে দিন।' বাদশাহ জিজ্ঞেস করল, 'তুমি পতিতাদের দেখে মুচকি হাসছিলে কেন?' সে বলল, 'একটি বিষয় মনে পড়ে গেল তাই। আমার ওপর আমার মায়ের বদদুআ কার্যকর হয়েছে।' তারপর সে তাদেরকে পূর্ণ ঘটনা শোনাল। [১৪۶]
১৪۱. হাকাম কাইসি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হাসান বাসরি (রহিমাহুল্লাহ)-এর থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, 'পিতামাতার বদদুআ সন্তানের জান-মাল ধ্বংস করে দেয়। [১৪۷]
অন্য বর্ণনায় আছে, হাসান বাসুরি (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'সন্তানের জন্য পিতামাতার দুআ কী কাজে আসে?' তিনি বললেন, 'মুক্তি।' আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, 'সন্তানের ওপর পিতামাতার বদদুআ কী ক্ষতি করে?' তিনি বললেন, 'ধ্বংস। [১৪۸]
টিকাঃ
১৪۵, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ۲/۲۵۸; আবু দাউদ তয়ালিসি, আল-মুসনাদ, ۳۲۹; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ২৮; আবু দাউদ, ৩৬۴; তিরমিযি, ۱۹۰۵; ইবনু মাজাহ, ৩৮۶۲。
১৪۶. বুখারি, ۳۴۳۶; মুসলিম, ۱۹۷۶-۱۹۷۷; ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ২৫۵۰。
১৪۷. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ۴۵।
📄 নিজ পিতা বা সন্তান থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করার গুনাহ
۱۴۲. সাহল ইবনু মুআয জুহানি (রহিমাহুল্লাহ) তার বাবা মুআয ইবনু আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ لِلَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عِبَادًا، لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ
"আল্লাহ তাআলা তার কিছু বান্দাদের সাথে কিয়ামাতের দিন কথা বলবেন না। তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করবেন না।"
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা?'
তিনি বললেন,
مُتَبَرِّئُ مِّنْ وَالِدَيْهِ رَاغِبُ عَنْهُمَا، وَ مُتَبَرِّئُ مِّنْ وَلَدِهِ، وَرَجُلٌ أَنْعَمَ عَلَيْهِ قَوْمٌ فَكَفَرَ نِعْمَتَهُمْ، وَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ
۱. বাবা-মা'র প্রতি অনাগ্রহী হয়ে তাঁদের থেকে সম্পর্ক-ছিন্নকারী সন্তান ۲. সন্তান থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন-ঘোষণাকারী-পিতা এবং ۳. যে-ব্যক্তির প্রতি কোনও গোত্রের লোকেরা অনুগ্রহ করার পরেও সে তাদের অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞা প্রদর্শন করে এবং তাদের থেকে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে।" [۱۴۹]
۱۴۳. আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন,
টিকাঃ
১৪۸. হুসাইন ইবনু হারব, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ۴۵。
۱۴۹. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ۳/۴۴۰; তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ۴۳۸。
📄 অন্যকে নিজের বাবা বলে পরিচয় দেওয়ার ভয়াবহতা
۱۴۴. আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমার নিকট যে-সহীফাটি রয়েছে ۱۵۱] সেখানে আছে, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيْهِ، أَوْ تَوَلَّى غَيْرَ مَوَالِيْهِ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
"যে-ব্যক্তি নিজ পিতা ব্যতীত অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, কিংবা আপন মনিব ব্যতীত অন্য কারও দিকে নিজেকে সম্বন্ধিত করে, তার ওপর আল্লাহ তাআলা, ফেরেশতাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ।"[১৫২]
۱۴۵. আবূ উসমান নাহদি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি সা'দ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'আমার এ দুটি কান শুনেছে এবং আমার অন্তর খুব ভালোভাবে স্মরণ রেখেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيْهِ، وَهُوَ يَعْلَمُ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ
"যে-ব্যক্তি জেনে-শুনে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।"
টিকাঃ
۱۵۰. আবূ দাউদ, ۲۲۶۳; নাসাঈ, ۶/۱۷۹-۱۸۰; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ۸۴۰۵; সুমৃতি, আদ-দুররুল মানসূর, ۵/۲۴。
۱۵۱. সহীফা মানে ছোটো গ্রন্থ। অনেক সাহাবিই নবিজির হাদীসকে লিখে রাখতেন। ফলে তাদের কাছে এমন নানান ধরনের পুস্তিকা ছিল, যা সহীফা নামে পরিচিত। (অনুবাদক)
۱۵۲, বুখারি, ۱۸۷۰; মুসলিম, ۱۳۷۰; তিরমিযি, ۲۱۲۷; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ۳۰۳۷。
📄 নিজের পিতামাতাকে অভিশাপ দেওয়া—সবচেয়ে বড়ো কবীরা গুনাহ
১৪৮. আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ
"সবচেয়ে বড়ো কবীরা গুনাহগুলোর একটি হলো, নিজের পিতামাতাকে অভিশাপ দেওয়া।"
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! মানুষ কীভাবে নিজের পিতামাতাকে অভিশাপ দেয়?'
তিনি বললেন,
يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ
"এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির পিতাকে গালি দেয়, ফলে সেই ব্যক্তিও তার পিতাকে গালি দেয়। আবার সে অন্যের মাকে গালি দেয় ফলে সেও তার মাকে গali দেয়। (এভাবে সে যেন নিজের পিতামাতাকেই গali দিল বা অভিশাপ দিল।) "[১৫৬]
টিকাঃ
১৫৩. বুখারি, ২৭৬৬, ২৭৬৭; মুসলিম, ১১১। যদি অনিচ্ছায় কেউ নিজ পিতা ছাড়া অন্য কারো দিকে সম্বন্ধিত হয়ে যায় তবে তার জন্য এই হুকুম প্রযোজ্য নয়। এটি মূলত ওই ব্যক্তির জন্য, যে ইচ্ছা করে এমন করে। যেমন: সাহাবি মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পিতার নাম আমর ইবনু সা'লাবা। কিন্তু তিনি আসওয়াদ নামে এক ব্যক্তির নিকট প্রতিপালিত হওয়ায় সেদিকে সম্বন্ধিত হয়েই পরিচিতি লাভ করেন।-ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ১২/৫৬। (অনুবাদক)
১৫৪. বুখারি, ৩৫০৭; মুসলিম, ১১১। এই কুফুরির হুকুম তখন আসবে, যখন কেউ এই বিষয়টি হারাম জানা সত্ত্বেও তা হালাল ভেবে নিজ পিতা ছাড়া অন্য কাউকে নিজের পিতা হিসেবে পরিচয় দিবে। আর কেউ কেউ বলেছেন, এখানে কুফুরি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, নিয়ামাতকে অস্বীকার করা।-ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৬/৬২৪। (অনুবাদক)
১৫৫. বুখারি, ৬৯৬৮; মুসলিম, ১১১。
১৫৬. বুখারি, ৫৯৭৩; মুসলিম, ১৪৬。