📄 সন্তানের জন্য পিতামাতার দুআ দ্রুত কবুল হয়
১৩۳. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'তিন ব্যক্তির দুআ কখনও ফিরিয়ে দেওয়া হয় না— ۱. সন্তানের জন্য মা-বাবার দুআ ۲. মাযলুম ব্যক্তির দুআ এবং ۳. মুসাফিরের দুআ। [۱۴۱]
১৩۴. হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সন্তানের জন্য মা-বাবা যখন দুআ করে, তখন সেই দুআ সন্তানের জান ও মালকে সুরক্ষা করে।'
১৩۵. হাফস ইবনু আবী হাফস সিরাজ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক ব্যক্তি হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'সন্তানের জন্য পিতামাতা কী দুআ করবে?' তিনি বললেন, 'তারা তার মুক্তির জন্য দুআ করবে।১৪۲]
১৩۶. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সন্তানের জন্য পিতামাতার দুআ আল্লাহর কাছে পৌঁছতে কোনও বাধাগ্রস্ত হয় না।১৪۳]
১৩۷. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তিনটি জিনিস আল্লাহ তাআলার নিকট পৌঁছতে বাধাপ্রাপ্ত হয় না।
۱. সন্তানের জন্য মা-বাবার দুআ, ۲. নিপীড়িত ব্যক্তির দুআ এবং ۳. لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ -এর সাক্ষ্যদান।'
১৩۸. আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, 'এক মহিলা এসে ইবনু মাখলাদ (রহিমাহুল্লাহ)-কে বললেন, 'আমার ছেলেকে রোমের বাদশাহ বন্দী করে ফেলেছে। ধন-সম্পদ বলতে আমার শুধুমাত্র ছোট্ট একটি ঝুপড়ি আছে। আমি এটি বিক্রি করতেও অক্ষম। আপনি যদি তার মুক্তিপণের ব্যবস্থা করে দিতেন! কারণ, তার রাত-দিন, ঘুম, স্থিরতা সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।' (এরপর তিনি সেখান থেকে চলে যান।)
ইবনু মাখলাদ (রহিমাহুল্লাহ) মাথা উঠালেন। তাঁর দু'ঠোঁট কেঁপে উঠল।
আমরা আরও কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করলাম। দেখি, মহিলা তার ছেলেকে নিয়ে এদিকেই আসছেন। তিনি এসে ইবনু মাখলাদের জন্য দুআ করলেন এবং বললেন, 'আমার ছেলে আপনাকে কিছু বলতে চায়।'
যুবকটি বলল, 'আমি একদল বন্দীর সাথে রোমের বাদশাহর কাছে ছিলাম। সেখানে এক ব্যক্তি প্রতিদিন আমাদেরকে দিয়ে নানাবিধ কাজকর্ম করাতো। সে প্রতিদিন সকালে আমাদেরকে নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয় এবং সেখান থেকে পুনরায় শেকল পরিয়ে কারাগারে ফিরিয়ে আনে। একদিন মাগরিবের পর কাজ থেকে ফিরে দেখলাম, আমার পা থেকে এমনিতেই শেকল খুলে পড়ে গেল...' যুবকটি একে একে সেই দিন এবং সময়ের কথা উল্লেখ করল। দেখা গেল, সেই সময়টি তখন-ই ছিল, যখন তার মা
শাইখ ইবনু মাখলাদের কাছে এসেছেন এবং তিনি তার ছেলের জন্য দুআ করেছেন।
যুবকটি বলে চলল, 'শেকল খোলা দেখে জেলার আমার দিকে চিৎকার দিয়ে তেড়ে এসে বলল, 'তুই শেকল ভেঙে ফেলেছিস?' আমি বললাম, 'না। এটি এমনিতেই আমার পা থেকে খুলে পড়ে গেছে।' এটা শুনে সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। জল্লাদ এসে আমাকে আবার শেকল পরিয়ে দিল। আমি কয়েক কদম এগুতেই সেগুলো আবার খুলে পড়ে গেল। তারা আমার ব্যাপারটি দেখে অবাক হলো। তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতদের ডেকে নিয়ে এল। পণ্ডিতরা বলল, 'তোমার মা কি বেঁচে আছেন?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' তারা বলল, 'তোমার ব্যাপারে তাঁর দুআ আল্লাহ তাআলা কবুল করে নিয়েছেন এবং তোমাকে মুক্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং আমরা তোমাকে আর আটকে রাখতে পারব না।' তারপর তারা আমাকে মুসলিম সেনানিবাসের কাছে ছেড়ে দিয়ে গেল।[১৪৪]
টিকাঃ
১৪১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৭৪৩৬; আবু দাউদ, ১৫৩৬; তিরমিযি, ১৯০৫; ইবনু মাজাহ; ৩৮৬২。
১৪২. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৪৫।
১৪৩. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৫০。
১৪৪. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১৩/২৯০-২৯১; ইবনু মানযূর, মুখতাসারু তারীখি দিমাশক, ৫/২৩৫।
📄 সন্তানের ওপর পিতামাতার বদদুআর প্রভাব
১৩۹. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لَّهُنَّ، لَا شَكٍّ فِيهِنَّ : dَعْوَةُ الْمَظْلُومِ، وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ، وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ
"তিন ব্যক্তির দুআ নিঃসন্দেহে কবুল হয়ে যায়- ۱. নিপীড়িত ব্যক্তির দুআ ۲. মুসাফিরের দুআ এবং ۳. সন্তানের বিরুদ্ধে মা-বাবার বদদুআ।"[১৪۵]
১৪۰. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "বানী ইসরাঈলে জুরাইজ নামে এক
ব্যক্তি ছিল। সে সবসময় তার গির্জায় ইবাদাত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকত। সেই গির্জাতে এক গরুর রাখালও আশ্রয় নিয়েছিল। একদিন জুরাইজের মা তার কাছে এলেন। তিনি জুরাইজের নাম নিয়ে ডাক দিলেন। এদিকে জুরাইজ তখন সালাতে দাঁড়িয়েছিল। সে মনে মনে ভাবল, মায়ের ডাকে সাড়া দেবো, নাকি সালাতেই রত থাকব? সে সালাতে দাঁড়িয়ে থাকাকেই প্রাধান্য দিল। জুরাইজের মা দু' তিনবার আহ্বান করার পর সাড়া না পেয়ে গোস্সায় বললেন, 'হে জুরাইজ! পতিতা নারীদের মুখ না দেখিয়ে আল্লাহ যেন তোমায় মৃত্যু না দেন।' একথা বলে তিনি চলে গেলেন। এদিকে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জুরাইজের ইবাদাতের সুনাম বানী ইসরাঈলের লোকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। এক পতিতা নারী লোকদেরকে বলল, 'তোমরা যদি চাও, আমি জুরাইজকে ধোঁকায় ফেলতে পারি।' তারপর সে জুরাইজের কাছে এসে প্ররোচনা দিল কিন্তু জুরাইজ তাকে পাত্তা দিল না। এরপর সেই মেয়ে গির্জায় আশ্রয় নেওয়া ওই রাখালের কাছে কুপ্রস্তাব দিলে রাখাল তা গ্রহণ করে নেয়। এর কিছুদিন পর সেই মেয়েটির গর্ভ থেকে একটি শিশুর জন্ম হয়। এলাকাবাসী জিজ্ঞেস করল, 'এই সন্তান কার?' সে বলল, 'জুরাইজের।' তারপর সবাই মিলে কুঠার-কুড়াল দিয়ে জুরাইজের গির্জা ভেঙে দিল এবং জুরাইজের হাত রশি দিয়ে কাঁধের সঙ্গে বেঁধে নিল। তারপর তাকে পতিতা মেয়েদের পাশ দিয়ে নিয়ে গেল। তখন তাদেরকে দেখে সে মুচকি হাসল।
বাদশাহ তাকে বলল, 'মেয়েটি দাবি করছে, তার কোলের সন্তানটি তোমার।' সে বলল, 'সেই বাচ্চাটি কোথায়?' বাচ্চাটিকে আনা হলে সে বাচ্চাটির দিকে এগিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার বাবা কে?' বাচ্চাটি বলল, 'অমুক রাখাল।' অলৌকিকভাবে আসল ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বাদশাহ মুগ্ধ হয়ে বলল, 'আমরা কি তোমার গির্জাটি স্বর্ণ দিয়ে তৈরি করে দেবো?' সে বলল, 'না, তার কোনও প্রয়োজন নেই। আপনারা আমার গির্জাটি মাটি দিয়েই তৈরি করে দিন।' বাদশাহ জিজ্ঞেস করল, 'তুমি পতিতাদের দেখে মুচকি হাসছিলে কেন?' সে বলল, 'একটি বিষয় মনে পড়ে গেল তাই। আমার ওপর আমার মায়ের বদদুআ কার্যকর হয়েছে।' তারপর সে তাদেরকে পূর্ণ ঘটনা শোনাল। [১৪۶]
১৪۱. হাকাম কাইসি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হাসান বাসরি (রহিমাহুল্লাহ)-এর থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, 'পিতামাতার বদদুআ সন্তানের জান-মাল ধ্বংস করে দেয়। [১৪۷]
অন্য বর্ণনায় আছে, হাসান বাসুরি (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'সন্তানের জন্য পিতামাতার দুআ কী কাজে আসে?' তিনি বললেন, 'মুক্তি।' আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, 'সন্তানের ওপর পিতামাতার বদদুআ কী ক্ষতি করে?' তিনি বললেন, 'ধ্বংস। [১৪۸]
টিকাঃ
১৪۵, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ۲/۲۵۸; আবু দাউদ তয়ালিসি, আল-মুসনাদ, ۳۲۹; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ২৮; আবু দাউদ, ৩৬۴; তিরমিযি, ۱۹۰۵; ইবনু মাজাহ, ৩৮۶۲。
১৪۶. বুখারি, ۳۴۳۶; মুসলিম, ۱۹۷۶-۱۹۷۷; ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ২৫۵۰。
১৪۷. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ۴۵।
📄 নিজ পিতা বা সন্তান থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করার গুনাহ
۱۴۲. সাহল ইবনু মুআয জুহানি (রহিমাহুল্লাহ) তার বাবা মুআয ইবনু আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ لِلَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عِبَادًا، لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ
"আল্লাহ তাআলা তার কিছু বান্দাদের সাথে কিয়ামাতের দিন কথা বলবেন না। তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করবেন না।"
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা?'
তিনি বললেন,
مُتَبَرِّئُ مِّنْ وَالِدَيْهِ رَاغِبُ عَنْهُمَا، وَ مُتَبَرِّئُ مِّنْ وَلَدِهِ، وَرَجُلٌ أَنْعَمَ عَلَيْهِ قَوْمٌ فَكَفَرَ نِعْمَتَهُمْ، وَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ
۱. বাবা-মা'র প্রতি অনাগ্রহী হয়ে তাঁদের থেকে সম্পর্ক-ছিন্নকারী সন্তান ۲. সন্তান থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন-ঘোষণাকারী-পিতা এবং ۳. যে-ব্যক্তির প্রতি কোনও গোত্রের লোকেরা অনুগ্রহ করার পরেও সে তাদের অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞা প্রদর্শন করে এবং তাদের থেকে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে।" [۱۴۹]
۱۴۳. আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন,
টিকাঃ
১৪۸. হুসাইন ইবনু হারব, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ۴۵。
۱۴۹. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ۳/۴۴۰; তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ۴۳۸。
📄 অন্যকে নিজের বাবা বলে পরিচয় দেওয়ার ভয়াবহতা
۱۴۴. আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমার নিকট যে-সহীফাটি রয়েছে ۱۵۱] সেখানে আছে, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيْهِ، أَوْ تَوَلَّى غَيْرَ مَوَالِيْهِ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ، وَالْمَلَائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
"যে-ব্যক্তি নিজ পিতা ব্যতীত অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, কিংবা আপন মনিব ব্যতীত অন্য কারও দিকে নিজেকে সম্বন্ধিত করে, তার ওপর আল্লাহ তাআলা, ফেরেশতাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ।"[১৫২]
۱۴۵. আবূ উসমান নাহদি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি সা'দ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'আমার এ দুটি কান শুনেছে এবং আমার অন্তর খুব ভালোভাবে স্মরণ রেখেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيْهِ، وَهُوَ يَعْلَمُ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ
"যে-ব্যক্তি জেনে-শুনে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।"
টিকাঃ
۱۵۰. আবূ দাউদ, ۲۲۶۳; নাসাঈ, ۶/۱۷۹-۱۸۰; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ۸۴۰۵; সুমৃতি, আদ-দুররুল মানসূর, ۵/۲۴。
۱۵۱. সহীফা মানে ছোটো গ্রন্থ। অনেক সাহাবিই নবিজির হাদীসকে লিখে রাখতেন। ফলে তাদের কাছে এমন নানান ধরনের পুস্তিকা ছিল, যা সহীফা নামে পরিচিত। (অনুবাদক)
۱۵۲, বুখারি, ۱۸۷۰; মুসলিম, ۱۳۷۰; তিরমিযি, ۲۱۲۷; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ۳۰۳۷。