📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 বাবার অবাধ্য হওয়ার শাস্তি

📄 বাবার অবাধ্য হওয়ার শাস্তি


১১৪. আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رِضَى اللهِ فِي رِضَى الْوَالِدِ، وَسَخَطُ اللَّهِ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
"বাবার খুশিতে আল্লাহ খুশি হোন এবং বাবার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হোন।"[১২৫]
১১৫. ইবনু কুতাইবা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি 'সিয়ারুল আজাম' নামক গ্রন্থে পড়েছি, 'যখন আরদাশীর [১২৬]-এর প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং আশপাশের রাজারা তার আনুগত্য স্বীকার করে নিচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে সে সুরায়ানিয়্যাহ রাজ্য দখলের পাঁয়তারা শুরু করে। সে ওই রাজ্যটি অবরোধ করলেও পুরোপুরি বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছিল না। হঠাৎ একদিন রাজকন্যা দুর্গের ছাদে এসে আরদাশীরকে দেখে তার প্রেমে পড়ে যায় এবং একটি তীর নিয়ে ফলকে লেখে-'যদি তুমি আমাকে বিয়ে করার শর্তে রাজি থাকো, তাহলে এই দুর্গ বিজয়ের সর্বাধিক সহজ এবং দ্রুততম পন্থাটি আমি তোমায় বলে দেবো।' শর্তখচিত তীরটি সে আরদাশীরকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করে। আরদাশীর তার শর্ত মেনে নেয় এবং দুর্গে প্রবেশের পথ বাতলে দিতে বলে। রাজকন্যা দুর্গে ঢোকার সহজ পথটি বাতলে দিল। দুর্গবাসী এই চালবাজির ছিটেফোঁটাও অনুভব করতে পারেনি। ফলে সে দুর্গে ঢুকে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দিল। রাজাকে হত্যা করে দুর্গটাকে কুরুক্ষেত্রে পরিণত করল।
তারপর শর্ত অনুযায়ী সে রাজকন্যাকে বিয়ে করল। একরাতে রাজকন্যা খুব চেষ্টা করার পরও ঘুমাতে পারল না। গভীর রাত অবধি সেভাবেই কেটে গেল। আরদাশীর জানতে চাইল, 'কী হয়েছে তোমার? ঘুমাচ্ছ না কেন?' উত্তরে রাজকুমারী বলল, 'বিছানাটা উপযুক্ত মনে হচ্ছে না।' পরে লক্ষ করে দেখা গেল, বিছানায় ব্যবহার করা সুগন্ধ-পাতার রেখাগুলোর কারণে তার শরীরে দাগ পড়েছে। সে রাজকন্যার এত মসৃণ ত্বক দেখে মুগ্ধ হয়ে বলল, 'তোমার বাবা তোমাকে কী খাওয়াতেন?' সে উত্তর দিল, 'সবসময় তিনি আমাকে মধু, মাখন এবং চর্বিযুক্ত খাবার খেতে দিতেন।'
আরদাশীর বলল, 'তোমার প্রতি তোমার বাবার মতো এত বেশি স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসা অন্য কেউ প্রদর্শন করবে না। তোমার তুলতুলে বিছানা এবং তোমার প্রতি তার এই অগাধ ভালোবাসা আর স্নেহ-মমতার প্রতিফল হিসেবে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। আমি তোমার প্রতি তোমার বাবার মতো বিশ্বাস স্থাপন করে ভুল করতে চাই না।' এরপর আরদাশীর আদেশ করল যেন দ্রুতগামী ঘোড়ার লেজে রাজকন্যার চুলের গোছা বেঁধে ঘোড়া ছুটিয়ে দেওয়া হয়। ঠিক সেভাবেই আদেশ পালন করা হলো এবং অবশেষে রাজকন্যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।[১২৭]
১১৬. মুহাম্মাদ ইবনু হারব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাকাশ নামে ইয়াদ ইবনু নাযার গোত্রের এক মহিলা ছিল। তার বাবা তাকে অনেক ভালোবাসত। একদিন স্বগোত্রীয় এক যুবক তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। মেয়েটিরও তাকে দেখে খুব পছন্দ হলো। কিন্তু তার বাবা এই প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। বিয়ে আর হলো না। একদিন সে তার বাবাকে বিষমেশানো পানি পান করালো। যখন তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছলেন তখন মেয়েকে লক্ষ করে বললেন, 'তুমি এমন এক ব্যক্তিকে পাওয়ার আশায় আমাকে হত্যা করলে, যার সাথে তোমার যোজন যোজন দূরত্বের সম্পর্ক। তোমার কৃতকর্মের ফল অচিরেই তুমি টের পাবে।' বাবার মৃত্যুর পর সে ঐ যুবককে বিয়ে করল। কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বামী তাকে ইচ্ছেমতো প্রহার করল। কেউ তাকে বলল, 'রাকাশ! তোমার স্বামী তোমাকে এত নির্মমভাবে মারতে পারল?' সে বলল, 'যার কোনও সাহায্যকারী থাকে না, তার অপমান অনিবার্য।' এরপর অল্প ক'দিনের মধ্যেই তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করল। এক মহিলা তাকে বলল, 'তোমার স্বামী আরেকটি বিয়ে করল আর তুমি তার কাছে তালাক চাচ্ছ না?' সে বলল, 'আমি মন্দের বদলা আরেকটি মন্দ দিয়ে নিতে চাই না।[১২৮]
১১৭. আলি ইবনু ইয়াহইয়া মুনজিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'খলীফা মুনতাসির দরবারে বসার আগে সেখানে গালিচা বিছানোর নির্দেশ দিলেন। কয়েকটি গালিচায় মুকুট পরিহিত একজন অশ্বারোহীর ছবি আঁকা ছিল। পাশে ফার্সি ভাষায় কিছু লেখা। সভাসদবর্গদের নিয়ে খলীফা দরবারে বসলেন। তার সামনে গোলাম-বাঁদি এবং সভাসদরা এসে দাঁড়াল। তিনি বৃত্ত-আঁকা সেই অশ্বারোহী এবং তার পাশের লেখাগুলোকে দেখে সভাসদদের উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এগুলো কী?' তাঁদের একজন উত্তর দিল, 'আমীরুল মুমিনীন এ-সম্পর্কে আমার কোনও জ্ঞান নেই। পরে এক ব্যক্তিকে দরবারে উপস্থিত করা হলো। সেই ব্যক্তি এগুলো পড়ে ভ্রু কুঁচকালো। খলীফা বললেন, 'কী এগুলো?' সে বলল, 'আমীরুল মুমিনীন! কাণ্ডজ্ঞানহীন কিছু মূর্খ ঘোড়সওয়ারির ছবি আঁকা।' তিনি বললেন, 'লেখাগুলো সম্পর্কে আমায় জানাও।' সে বলল, 'আমীরুল মুমিনীন, এগুলোর কোনও অর্থ হয় না।' খলীফা ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। তখন সেই লোকটি বলল, 'এখানে লেখা আছে, 'আমি শীরওয়াই ইবনু কিসরা ইবনি হুরমুয। আমার বাবাকে হত্যা করে আমি ছয় মাসের বেশি রাজ্য ভোগ করতে পারিনি।' একথা শুনে খলীফা মুনতাসিরের চেহারা মলিন হয়ে গেল। তিনি দরবার থেকে সোজা অন্দরমহলে ঢুকে পড়লেন। পরবর্তীতে তিনিও ছয় মাসের বেশি রাজ্য পরিচালনা করতে পারেননি।[১২৯]

টিকাঃ
১২৫. তিরমিযি, ১৮৯৯১; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫১; আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৮/২১৫。
১২৬. তিনি ছিলেন পারস্যের সাসানী সাম্রাজ্যের প্রথম বাদশাহ। -অনুবাদক
১২৭. ইবনু কুতাইবা, উয়নুল আখবার, ৪/১১৭; আবু বকর দীনাওয়ারি, আল-মুজালাসাহ ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৫/১৭১。
১২৮. ইবনুল জাওযি, যাম্মুল হাওয়া, ৪৬৩。
১২৯. শামসুদ্দীন যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১২/৪৫; খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ১২/১২০-১২১。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 মায়ের অবাধ্য হওয়ার শাস্তি

📄 মায়ের অবাধ্য হওয়ার শাস্তি


১১৮. আবদুল্লাহ ইবনু আবী আওফা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! সাম্প্রতিক সময়ে এক যুবক মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। তাকে কালিমা (لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللهُ) উচ্চারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিন্তু সে তা বলতে পারছে না।'
রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'সে কি জীবদ্দশায় কখনও তা বলেনি?'
উপস্থিতদের একজন বললেন, 'হ্যাঁ, সে তো বলেছে।'
তিনি জানতে চাইলেন, 'তাহলে মৃত্যুর সময় কীসে তাকে বাধা দিচ্ছে?'
তারপর নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে আমরাও সেই যুবকের বাড়ি গেলাম। তিনি সেই যুবককে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'যুবক! তুমি কালিমা পড়ো।'
সে বলল, 'আমি পারছি না।'
রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানতে চাইলেন, 'কেন পারছ না?' সে উত্তর দিল, 'মায়ের অবাধ্যতার কারণে।'
রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, 'তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?'
সে বলল, 'হ্যাঁ, তিনি জীবিত।'
রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার মাকে লক্ষ করে বললেন, 'তুমি কি রাজি আছ যে, আমরা তোমার ছেলেকে তোমার চোখের সামনে আগুনের গর্তে নিক্ষেপ করি?'
মহিলা বলল, 'এমন হলে তো আমি অবশ্যই বারণ করব।'
রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'তাহলে তুমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আমাদের সামনে বলো যে, আমি আমার ছেলের প্রতি সন্তুষ্ট।'
সে বলল, 'হে আল্লাহ! আমি আপনাকে এবং আপনার রাসূলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার ছেলের প্রতি সন্তুষ্ট।'
এরপর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুবককে বললেন, 'হে যুবক! বলো لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ' তখন সে বলল, لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। যিনি আমার মাধ্যমে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন। [১৩০]
১১৯. আবূ হাযিম (রহিমাহুল্লাহ) এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'এক জায়গায় আমার সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেখানে আমি দু'টি কুটির দেখতে পেলাম। কুটিরের কাছে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে সালাম দিলাম। একজন যুবতী এবং একজন বৃদ্ধা সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
আমি বললাম, 'আপনাদের কাছে রাতের খাবারের কিছু আছে? আপনাদের নিকট রাতে থাকার কোনও ব্যবস্থা হবে?'
তারা বলল, 'না। আমাদের কাছে কিছু নেই। আর এই উপত্যকায় আমাদের কোনও ধন-সম্পদ, ছাগল-বকরি, উট কিংবা গাধা কিছুই নেই।'
আমি প্রশ্ন করলাম, 'তাহলে আপনারা এখানে বসবাস করেন কেন?'
তারা জানাল, 'আল্লাহর ইচ্ছায় এবং কিছু নেকবান্দা ও পাশে থাকা রাস্তাটির কারণেই আমরা এখানে থাকি।
চারদিকে শুনসান নীরবতা। কোনও পথচারীর পায়চারি নেই। হঠাৎ আমি গাধার বিকট চিৎকার শুনতে পেলাম। চিৎকার এত বেশি তীব্র ছিল যে, আল্লাহর কসম! আমি সকাল পর্যন্ত সেই বিকট আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। যার কারণে আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। সকালে যেখান থেকে শব্দ আসছিল সেদিকে রওনা হলাম। গিয়ে একটি কবর দেখতে পেলাম, যার ভেতরে রয়েছে মৃতগাধার এক বীভৎস কঙ্কাল। যা দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে দ্রুত ফিরে এলাম। তারপর মহিলা দু'জনকে কবরে দেখা সেই গাধার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম।
তারা বলল, 'আপনার এ সম্পর্কে না জানলেও চলবে।'
আমি জোর গলায় বললাম, 'আমি জিজ্ঞাসা করছি, সুতরাং বলতে আপত্তি কোথায়?'
যুবতী মুখ খুলল। সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! এই যে গাধার আওয়াজ শুনেছেন এটি আমার স্বামীর আওয়াজ। তিনি এই বৃদ্ধা মহিলার ছেলে। সবসময় মায়ের অবাধ্যতা করতেন। মা কোনও কাজ করতে নিষেধ করলেই তিনি বলতেন, 'আমার সামনে থেকে সরে গিয়ে গাধার মতো চিল্লাচিল্লি করো।' একদিন মা মনের কষ্টে বলেই ফেললেন, 'আল্লাহ তোকে গাধায় পরিণত করুন।' পরে একদিন আমার স্বামী মারা যান। আমরা তাকে এই নির্জন প্রান্তে দাফন করে দিই। (তার কবর থেকেই এমন গাধার চিৎকার ভেসে আসে।) আল্লাহর শপথ! তিনিই আমাদেরকে এই উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দা বানিয়েছেন। এখানে বসবাস করতে আমাদেরকে বাধ্য করেছেন।'
১২০. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একবার আমি একটা কাজের উদ্দেশ্যে বের হলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ একটি গাধাকে দেখলাম-একটি গর্ত থেকে দু'চোখ বের করল। তারপর আমার সামনেই বিকট আওয়াজে তিনবার চিৎকার দিয়ে আবার গর্তে ঢুকে গেল। এরপর আমি যাদের কাছে যাচ্ছিলাম সেখানে যখন পৌঁছলাম তখন তারা জানতে চাইল, 'কী হয়েছে আপনার? চেহারা এমন বিবর্ণ কেন?'
আমি তাদেরকে ব্যাপারটি খুলে বললাম। তারা বলল, 'মনে হয় আপনি এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।'
আমি বললাম, হ্যাঁ। আমি আসলেই কিছু জানি না।'
তারা আমাকে জানাল, 'সেই কবরটি এই মহল্লার এক যুবকের। তার মা ঐ ঝুপড়িতে থাকে। তিনি যখনই তাকে কোনও কাজের আদেশ দিতেন, তখনই ছেলেটি তার সামনে গাধার মতো হা হা হাহ... শব্দে চিৎকার করত এবং তাচ্ছিল্যের সাথে বলত, তুমি আসলেই একটা গাধা। একদিন সে হঠাৎ করেই মারা যায়। আমরা তাকে সেই গর্তে দাফন করি। তারপর থেকে প্রতিদিন সে মাথা বের করে তিনবার চিৎকার দিয়ে আবার সেখানে ঢুকে পড়ে।[১৩১]
১২১. আবূ কাযআ (রহিমাহুল্লাহ) বসরার এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমরা একটি জলাশয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সেখানে গাধার চিৎকার শুনতে পেলাম। জনপদবাসীর কাছে এই চিৎকারের রহস্য জানতে চাইলাম। তারা জানাল, 'সে আমাদের গোত্রের এক ব্যক্তি। তার মা যখনই তার সাথে কোনও বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, তখনই-সে বলত, তুমি খালি গাধার মতো চিৎকার করো!' ইসহাক ছাড়া অন্যান্য বর্ণনাকারীরা বলেন, 'একদিন তার মা বেফাঁস বলে ফেললেন, 'আল্লাহ তোকেই গাধায় পরিণত করুক।' সে মারা যাওয়ার পর প্রতি রাতে তার কবর থেকে গাধার চিৎকার শোনা যায়। [১৩২]
১২২. প্রখ্যাত মুজতাহিদ সাঈদ উমানি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি একবার হাজ্জের সফরে বের হলাম। হাজ্জ শেষে রাতের প্রথম ভাগে আমি স্বপ্নে দেখি, মিনায় এক ব্যক্তি ঘোষণা করছেন, 'শোনো! এবার যারা হাজ্জ করেছে তাদের মাঝে আবূ সালিহ বালখি ব্যতীত আল্লাহ তাআলা সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাতভর একই স্বপ্ন তিনবার দেখলাম। পরদিন সকালে মিনায় বালখি ব্যবসায়ীদের অবস্থানস্থল সম্পর্কে মানুষকে জিজ্ঞাসা করে করে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। পরে জানতে পারলাম তিনি রাজ দরবারের লোক। তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলাম। কিন্তু তার গোলাম-বাঁদি আর অনুসারীদের কারণে বেজায় সংকটে পড়তে হলো।
তবুও মন চাচ্ছে একটু সাক্ষাৎ করে যাই। চত্বর অতিক্রম করে আমি তার কাছাকাছি
আসলাম। কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাহিনী আমাকে যেতে দিচ্ছিল না। তিনি আমার আওয়াজ শুনতে পেয়ে বললেন, 'তাকে আসতে দাও।' আমি তার কাছে গেলাম। তিনি চুল-দাড়িতে খেযাব ব্যবহার করেছেন। তাকে বললাম, 'আপনার সাথে একটু একান্তে কথা বলতে চাই।' তিনি লোকজনদের সরে যেতে বললেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনিই কি আবূ সালিহ বালখি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমিই আবূ সালিহ বালখি। তবে তুমি আমাকে চিনতে না পারায় আমি খুবই মর্মাহত হলাম।'
আমি বললাম, 'গতরাতে আমি আপনাকে নিয়ে একটি স্বপ্ন দেখেছি।' স্বপ্নের পুরোটা শুনে তিনি বললেন, 'আমি ছিলাম মদখোর যুবক। একরাতে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরলাম। দরজায় নক করার পরও খুলতে বেশ দেরি হতে লাগল। অনেকক্ষণ বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি বিরক্ত হয়ে গেলাম। বেশ কিছু সময় পর দরজা খুললেন আমার মা। নেশার ঘোরে আমি তার বুকে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করি। ফলে তিনি মারা যান।'
আমি বললাম, 'তাহলে তো আপনার ধ্বংস অনিবার্য!'
১২৩. মালিক ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একবার হাজ্জের মৌসুমে মাতাফে অনেক হাজী এবং উমরাকারীদের দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। আবেগাপ্লুত হয়ে মনে মনে বললাম, যাদের হাজ্জ কবুল হয়েছে তাদের সম্পর্কে যদি জানতে পারতাম, তাহলে তাদেরকে সংবর্ধনা জানাতাম। আর যাদেরটা কবুল হয়নি তাদেরকে জানাতাম সমবেদনা। সে-রাতেই আমি স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে বলতে দেখলাম, 'মালিক ইবনু দীনার হাজীদের এবং উমরাকারীদের নিয়ে চিন্তায় মগ্ন। (শোনো!) এবার যারা এসেছে, ছোটো-বড়ো, পুরুষ-মহিলা, সাদা-কালো, আরবী-অনারবী সবাইকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু এক ব্যক্তিকে তিনি ক্ষমা করেননি। তার ওপর তিনি অসন্তুষ্ট। আল্লাহ তার হাজ্জ প্রত্যাখ্যান করে তার মুখে নিক্ষেপ করেছেন।'
বাকি রাতটুকু আমি কীভাবে কাটিয়েছি তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। আমার আশঙ্কা হচ্ছে-সেই লোকটি আমিই হবো। পরবর্তী রাতে আমি হুবহু একইরকম স্বপ্ন দেখলাম। কিন্তু ওই রাতে আমাকে বলা হলো, 'সেই লোকটি তুমি নও। সে হচ্ছে খোরাসানের বলখ রাজ্যের বাসিন্দা। তার নাম মুহাম্মাদ ইবনু হারূন বালখি। আল্লাহ তাআলা তার ওপর অসন্তুষ্ট। তার হাজ্জ প্রত্যাখ্যান করে তিনি তার মুখে নিক্ষেপ করেছেন।'
পরের দিন ভোরেই আমি খোরাসানবাসীর কাছে এলাম। তাদের মাঝে বালখি লোকজন
আছে কি না জানতে চাইলাম। তারা আমাকে ঠিকানা বলে দিল। তাদের কাছে এসে সালাম বিনিময়ের পর মুহাম্মাদ ইবনু হারুন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম।
তারা বলল, 'মালিক! আপনি আমাদের মাঝে সর্বাধিক ইবাদাতগুজার এবং সবচেয়ে বেশি তিলাওয়াতকারী ব্যক্তিটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন।'
আমার দেখা স্বপ্ন আর মানুষের বক্তব্য শুনে ব্যাপারটি আমার কাছে তালগোল পাকিয়ে গেল। আমি বললাম, 'আপনারা আমাকে তার কাছে যাওয়ার পথ বাতলে দিন।'
তারা বলল, 'তিনি চল্লিশ বছর ধরে দিনে সিয়াম পালন করেন আর রাতে ইবাদাত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকেন এবং জনমানবশূন্য নির্জন স্থানে বাস করেন।'
আমি ভাবলাম, মক্কার ধ্বংসস্তূপগুলোতেই হয়তো তাকে পাওয়া যাবে। আমি আস্তে আস্তে সব ধ্বংসস্তূপগুলো খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, এক ব্যক্তি দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার ডান হাত কেটে গলায় ঝুলানো। কণ্ঠাস্থি ছিদ্র করে পা পর্যন্ত লম্বা মোটা শেকলে বাঁধা। তিনি রুকূ-সাজদায় মত্ত। আমার পদধ্বনি শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, 'কে তুমি?'
আমি বললাম, 'আমি মালিক ইবনু দীনার।'
হে মালিক! কীসে আপনাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে? আমায় নিয়ে কোনও স্বপ্ন দেখেছেন? যা দেখেছেন বলুন।
সেটি বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে।
লজ্জা না করে বলে ফেলুন।
তিনি দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। তারপরে বললেন, 'মালিক! এই একই স্বপ্ন আমি চল্লিশ বছর ধরে শুনে আসছি। প্রতি বছর আপনার মতো কোনও-না-কোনও নেকবান্দা এটি দেখে—আমি জাহান্নামি।
আপনার আর আল্লাহর মাঝে বিশাল কোনও পাপের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে?
হ্যাঁ, আমার অপরাধ আসমান-জমিন, পাহাড়-পর্বত, আরশ-কুরসি, সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে।
আমাকে সেটি শোনান। যারা তার পরিণাম সম্পর্কে জানে না আমি তাদেরকে সতর্ক করে দেবো।
মালিক! আমি ছিলাম একটা মদখোর। একবার আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মদপান করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরি। তখন আমি নেশায় মত্ত। আমার হুঁশ-জ্ঞান-বুদ্ধি সব উড়ে গেছে। মা তখন পাথর দিয়ে জ্বলন্ত চুলা ঢাকছিলেন। মদের নেশায় টলতে টলতে বাড়িতে পা রাখতেই তিনি আমাকে উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন।
'আজ শা'বান মাসের শেষরাত এবং রমাদানের শুরুর সময়। আগামীকাল থেকে মানুষজন সিয়াম পালন করবে আর তুমি মাতাল হয়ে থাকবে? তোমার কি আল্লাহর ব্যাপারে কোনও লজ্জা-শরম নেই?'
আমি হাত উঠিয়ে একটা ঘুসি মারলাম। তিনি বললেন, 'তুমি ধ্বংস হও।' আমার রাগ আগুনের মতো জ্বলে উঠল। নেশার ঘোরে তাকে জ্বলন্ত চুলায় নিক্ষেপ করলাম। আমার স্ত্রী আমাকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। শেষরাতে নেশার ঘোর চলে গেলে আমার স্ত্রীকে ডেকে বললাম, 'দরজা খুলে দাও।'
সে আমার সাথে রাগান্বিত কণ্ঠে কথা বলল। আমি বললাম, 'তোমার কণ্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেন? কী হয়েছে?'
সে বলল, 'তুমি ক্ষমার অযোগ্য।'
আমি জানতে চাইলাম, 'কেন? কী হয়েছে? তুমি এমন কথা বলছো কেন?'
সে বলে উঠল, 'গতরাতে তুমি তোমার মাকে জ্বলন্ত চুলায় নিক্ষেপ করেছ। তিনি জ্বলে অঙ্গার হয়ে গেছেন।'
এটি শোনার পর আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। দরজা খুলে দৌড়ে চুলার পাড়ে গিয়ে দেখি, মা জ্বলন্ত রুটির মতো ঝলসে গেছেন। আমি সেখান থেকে ফিরে দরজার পাশে একটা কুঠার দেখতে পেলাম। দেরি না করে বাম হাতে সেটি নিয়ে আমার ডান হাত দরজার চৌকাঠে রেখে কেটে ফেললাম। আমার কণ্ঠাস্থি ছিদ্র করে এই শেকল ঢুকিয়ে দিলাম। পা দু'টো এই শেকলে আবদ্ধ করে নিলাম। আমার আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা সূর্য ডোবার আগেই সদাকা করে দিলাম। ছাব্বিশজন দাসী আর পঁয়ত্রিশজন গোলাম আযাদ করলাম। আমার সহায়-সম্পত্তি সবকিছু দান করে দিলাম। আমি চল্লিশ বছর ধরে দিনের বেলা সিয়াম রাখি আর রাতের বেলা ইবাদাত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দিই। দৈনিক শুধুমাত্র একমুষ্টি ছোলা দিয়ে ইফতার করি। আর প্রতিবছর হাজ্জ করি। প্রত্যেক বছর-ই আপনার মতো কোনও-না-কোনও নেক বান্দা এই স্বপ্নটি দেখেন- আমি একজন জাহান্নামি।'
মালিক ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি অশ্রুসিক্ত চোখ দু'টো মুছে নিয়ে তাকে বললাম, 'হে হতভাগা! আপনি দুনিয়া এবং এর অধিবাসীদেরকে আপনার আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছেন।'
এরপর আমি সেখান থেকে সরে গেলাম। শুনতে পেলাম তিনি হাত দু'টো আসমানের দিকে উঠিয়ে বলছেন, 'হে দুঃশ্চিন্তার অবসানকারী! দুঃখ-বেদনা দূরকারী! দুঃখীদের দুআ কবুলকারী! আপনার পরিতুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ থেকে মুক্তি চাই। আপনার দয়ার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে পানাহ চাই। আমার ক্ষমা পাওয়ার আশাকে নিরাশায় পরিণত করবেন না। আমার দুআ প্রত্যাখ্যান করবেন না।'
মালিক ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সেখান থেকে আমি বাড়ি ফিরলাম। একদিন রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি বলছেন, 'হে মালিক! মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ কোরো না। তাদেরকে আল্লাহর ক্ষমা থেকে হতাশ কোরো না। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ইবনু হারুনের ওপর বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন। তার দুআ কবুল করেছেন এবং তার পদস্খলন ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাকে গিয়ে বোলো, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন পূর্বাপর সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। সবার মাঝে ন্যায় বিচার করবেন। শিংওয়ালা বকরি থেকে শিংহীন বকরির প্রতিশোধ নেবার ব্যবস্থা করবেন। সুতরাং তোমাকে এবং তোমার মাকেও আল্লাহ একত্রিত করবেন। তিনি তাঁর পক্ষে তোমার বিরুদ্ধে ফায়সালা করবেন। ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন, তারা যেন তোমাকে মোটা শেকলে বেঁধে জাহান্নামে নিয়ে যায়। এরপরে দুনিয়ার সময়ের তিন দিন পার হলে যখন তুমি জাহান্নামের শাস্তি আস্বাদন করবে, তখন সেখান থেকে মুক্তি পাবে। কারণ, আল্লাহ বলেছেন, 'আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমার যেকোনও বান্দা মদপান করলে বা মানুষকে হত্যা করলে আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি আস্বাদন করাব।' তারপর আমি তোমার মায়ের অন্তরে দয়ার উদ্রেক করব এবং এই তাকে উদ্বুদ্ধ করব তোমার ব্যাপারে আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। ফলে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব। অতঃপর তোমরা উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
সকালে আমি তাকে স্বপ্নের কথাগুলো শোনালাম। তখন তিনি কিছুটা দুঃশ্চিন্তামুক্ত হন। এর কিছুদিন পর তিনি মারা যান। আমি তার জানাযায় শরীক হয়েছিলাম।'

টিকাঃ
১৩০. মুনযিরি, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৪/১১০; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৯২。
১৩১. আসবাহানি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আবুল আব্বাস আসাম নিশাপুরে একাধিক হাদীস বিশারদদের সামনে এটি লিখিয়েছেন। তাঁদের কেউ এই ঘটনাকে অস্বীকার করেননি।'- মুনযিরি, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/২২৬。
১৩২, ইবনু আবিদ দুনইয়া, মুজাবুদ-দাওয়াহ, ৪৮。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 ‘উকূক’ বা অবাধ্যতার পরিচয়

📄 ‘উকূক’ বা অবাধ্যতার পরিচয়


'উকূক' শব্দের অর্থ-কোনও বৈধ বিষয়ে মা-বাবার নির্দেশ অমান্য করা, তাদের অবাধ্য হওয়া। কথাবার্তায় এবং কাজকর্মে তাঁদের সাথে অশোভনীয় আচরণ করা।
১২৪. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'সন্তানের আচরণে মা-বাবার কান্নাকাটি করা-তাঁদের সাথে দুর্ব্যবহার করার অন্তর্ভুক্ত। [১৩০]
১২৫. উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যে-ব্যক্তি তার মা-বাবাকে রক্তচক্ষু দেখায় সে তাঁদের প্রতি সদাচারী নয়।[১৩৪]
১২৬. ইবনু মুহাইরীয (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যে-ব্যক্তি তার বাবা-মা'র আগে আগে হাঁটে, সে তাদের প্রতি সদাচারী নয়। তবে সে যদি তাদের সামনে থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আগে আগে চলে, তাহলে ভিন্ন কথা। আর কেউ যদি তার বাবাকে নাম ধরে ডাকে কিংবা পদবি দিয়ে আহ্বান করে, তাহলে সেও বাবার প্রতি সদাচারী নয়। তবে সে 'হে বাবা' বলে ডাকতে পারবে।' [১৩৫]
১২৭. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সন্তানকে প্রহার করার সময় বাবার হাতকে প্রতিহত করা সন্তানের জন্য উচিত নয় (বরং বেআদবি)। আর যে-ব্যক্তি তার বাবা-মা'র দিকে রাগান্বিত চোখে তাকায় সে তাদের প্রতি সদাচারী নয়। আর যে তাদেরকে দুঃচিন্তায় ফেলে সে তাদের প্রতি অনাচারী। [১৩৬]
১২৮. হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বাদশাহর সম্মুখে বাবার নামে নালিশ করা, পিতা-পুত্রের সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করার শামিল। [১৩৭]
১২৯. ফারকাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি কোনও কোনও গ্রন্থে পড়েছি, যে-ব্যক্তি তার বাবা-মা'র দিকে চোখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, সে তাদের প্রতি সদাচারী নয়। তাদের দিকে কোমল-চোখে তাকানো ইবাদাত। মা-বাবার আগে হাঁটা সন্তানের জন্য বেমানান। তাদের উপস্থিতিতে কথা বলাও উচিত না। সন্তান তাদের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের ডানে-বামে হাঁটবে না। তবে তারা আহ্বান করলে সেই ডাকে সাড়া
দিবে। কোনও নির্দেশ দিলে তা অমান্য করবে না। তাদের পেছনে কুলি-কামিনের মতো নতশিরে হাঁটবে। [১৩৮]
১৩০. ইয়াযীদ ইবনু আবী হুবাইব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বাবার বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করা—তাঁর অবাধ্যতার শামিল।'
১৩১. উমারা ইবনু মিহরান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)-কে মাতাপিতার প্রতি সদাচার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, 'তা হলো—তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা এবং তাঁদের প্রয়োজন পূর্ণ করা।' আমি বললাম, 'আর উকূক তথা মা-বাবার অবাধ্যতা কী?' তিনি উত্তর দিলেন, 'তাঁদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা এবং তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা।' [১৩৯]
১৩২. কা'ব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি তাকে উকূক তথা পিতামাতার অবাধ্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, 'তুমি পিতামাতার নির্দেশ অমান্য করলে তাদের অবাধ্যতা করা হবে। আর যখন তাঁরা তোমার বিরুদ্ধে কথা বলবে তখন নিশ্চিতভাবে জেনে নিয়ো—তুমি তাঁদের অবাধ্যচারী।' [১৪০]

টিকাঃ
১৩০. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১/৪৪。
১৩৪. আবূ সা'দ আবী, নাসরুদ দুররি ফিল মুহাদারাত, ৩/১২৭。
১৩৫. বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/২৭。
১৩৬. সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ১২১৩২, দঈফ。
১৩৭. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১১১। তবে বাবা যদি জালিম হন এবং তার জুলুম সীমাছাড়া হয় তাহলে ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কোনও অসুবিধা নেই। (অনুবাদক)
১৩৮. আবুল লাইস সামারকান্দি, তাম্বিহুল গাফিলীন, ১৪৬。
১৩৯. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১১৮。
১৪০. আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৬/৩২。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 সন্তানের জন্য পিতামাতার দুআ দ্রুত কবুল হয়

📄 সন্তানের জন্য পিতামাতার দুআ দ্রুত কবুল হয়


১৩۳. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'তিন ব্যক্তির দুআ কখনও ফিরিয়ে দেওয়া হয় না— ۱. সন্তানের জন্য মা-বাবার দুআ ۲. মাযলুম ব্যক্তির দুআ এবং ۳. মুসাফিরের দুআ। [۱۴۱]
১৩۴. হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সন্তানের জন্য মা-বাবা যখন দুআ করে, তখন সেই দুআ সন্তানের জান ও মালকে সুরক্ষা করে।'
১৩۵. হাফস ইবনু আবী হাফস সিরাজ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক ব্যক্তি হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'সন্তানের জন্য পিতামাতা কী দুআ করবে?' তিনি বললেন, 'তারা তার মুক্তির জন্য দুআ করবে।১৪۲]
১৩۶. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সন্তানের জন্য পিতামাতার দুআ আল্লাহর কাছে পৌঁছতে কোনও বাধাগ্রস্ত হয় না।১৪۳]
১৩۷. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তিনটি জিনিস আল্লাহ তাআলার নিকট পৌঁছতে বাধাপ্রাপ্ত হয় না।
۱. সন্তানের জন্য মা-বাবার দুআ, ۲. নিপীড়িত ব্যক্তির দুআ এবং ۳. لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ -এর সাক্ষ্যদান।'
১৩۸. আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, 'এক মহিলা এসে ইবনু মাখলাদ (রহিমাহুল্লাহ)-কে বললেন, 'আমার ছেলেকে রোমের বাদশাহ বন্দী করে ফেলেছে। ধন-সম্পদ বলতে আমার শুধুমাত্র ছোট্ট একটি ঝুপড়ি আছে। আমি এটি বিক্রি করতেও অক্ষম। আপনি যদি তার মুক্তিপণের ব্যবস্থা করে দিতেন! কারণ, তার রাত-দিন, ঘুম, স্থিরতা সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।' (এরপর তিনি সেখান থেকে চলে যান।)
ইবনু মাখলাদ (রহিমাহুল্লাহ) মাথা উঠালেন। তাঁর দু'ঠোঁট কেঁপে উঠল।
আমরা আরও কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করলাম। দেখি, মহিলা তার ছেলেকে নিয়ে এদিকেই আসছেন। তিনি এসে ইবনু মাখলাদের জন্য দুআ করলেন এবং বললেন, 'আমার ছেলে আপনাকে কিছু বলতে চায়।'
যুবকটি বলল, 'আমি একদল বন্দীর সাথে রোমের বাদশাহর কাছে ছিলাম। সেখানে এক ব্যক্তি প্রতিদিন আমাদেরকে দিয়ে নানাবিধ কাজকর্ম করাতো। সে প্রতিদিন সকালে আমাদেরকে নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয় এবং সেখান থেকে পুনরায় শেকল পরিয়ে কারাগারে ফিরিয়ে আনে। একদিন মাগরিবের পর কাজ থেকে ফিরে দেখলাম, আমার পা থেকে এমনিতেই শেকল খুলে পড়ে গেল...' যুবকটি একে একে সেই দিন এবং সময়ের কথা উল্লেখ করল। দেখা গেল, সেই সময়টি তখন-ই ছিল, যখন তার মা
শাইখ ইবনু মাখলাদের কাছে এসেছেন এবং তিনি তার ছেলের জন্য দুআ করেছেন।
যুবকটি বলে চলল, 'শেকল খোলা দেখে জেলার আমার দিকে চিৎকার দিয়ে তেড়ে এসে বলল, 'তুই শেকল ভেঙে ফেলেছিস?' আমি বললাম, 'না। এটি এমনিতেই আমার পা থেকে খুলে পড়ে গেছে।' এটা শুনে সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। জল্লাদ এসে আমাকে আবার শেকল পরিয়ে দিল। আমি কয়েক কদম এগুতেই সেগুলো আবার খুলে পড়ে গেল। তারা আমার ব্যাপারটি দেখে অবাক হলো। তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতদের ডেকে নিয়ে এল। পণ্ডিতরা বলল, 'তোমার মা কি বেঁচে আছেন?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' তারা বলল, 'তোমার ব্যাপারে তাঁর দুআ আল্লাহ তাআলা কবুল করে নিয়েছেন এবং তোমাকে মুক্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং আমরা তোমাকে আর আটকে রাখতে পারব না।' তারপর তারা আমাকে মুসলিম সেনানিবাসের কাছে ছেড়ে দিয়ে গেল।[১৪৪]

টিকাঃ
১৪১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৭৪৩৬; আবু দাউদ, ১৫৩৬; তিরমিযি, ১৯০৫; ইবনু মাজাহ; ৩৮৬২。
১৪২. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৪৫।
১৪৩. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৫০。
১৪৪. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১৩/২৯০-২৯১; ইবনু মানযূর, মুখতাসারু তারীখি দিমাশক, ৫/২৩৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00