📄 মা-বাবার অধিকার নষ্ট করার গুনাহ
৯০. আবদুর রহমান ইবনু আবী বাকরা (রহিমাহুল্লাহ) তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মজলিসে কবীরা গুনাহ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। যার মধ্যে ছিল আল্লাহ তাআলার সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা, মা-বাবার অধিকার ক্ষুণ্ণ করা ইত্যাদি। (এগুলো বলতে বলতে) হঠাৎ নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হেলান ছেড়ে উঠে বসলেন, তারপর বললেন,
وَشَهَادَةُ الزُّوْرِ، وَشَهَادَةُ الزُّوْرِ، أَوْ قَوْلُ الزُّوْرِ
'এগুলোর সাথে আরও হলো, কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া। কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া। কিংবা তিনি বলেছেন, 'মিথ্যা কথা বলা।১০২]
৯১. আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবীরা গুনাহের আলোচনা করলেন। কিংবা এক ব্যক্তি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তখন তিনি বললেন,
الشَّرْكُ بِاللهِ، وَقَتْلُ النَّفْسِ، وَعُقُوْقُ الْوَالِدَيْنِ
"আল্লাহর সাথে শিরক করা, কাউকে (অন্যায়ভাবে) হত্যা করা, মা-বাবার অবাধ্য হওয়া।”[১০৩]
৯২. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْكَبَائِرُ : الْإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوْقُ الْوَالِدَيْنِ، وَقَتْلُ النَّفْسِ، وَالْيَمِينُ الْغَمُوسُ
"কবীরা গুনাহ হচ্ছে—আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা, মা-বাবার অবাধ্য হওয়া, (অন্যায়ভাবে) মানুষ হত্যা করা, মিথ্যা শপথ করা।”[১০৪]
৯৩. আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ : الشَّرْكَ بِاللهِ تَعَالَى، وَعُقُوْقَ الْوَالِدَيْنِ، وَالْيَمِينَ الْغَمُوْسَ
“কবীরা গুনাহসমূহের মধ্য থেকে সবচেয়ে বড়ো বড়োগুলো হচ্ছে— আল্লাহ তাআলার সাথে শিরক করা, মা-বাবার অবাধ্য হওয়া ও মিথ্যা শপথ করা।”[১০৫]
৯৪. আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণনা করেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَاقٌ، وَلَا مُدْمِنُ خَمْرٍ
"মা-বাবার অবাধ্য সন্তান এবং মদপানে আসক্ত ব্যক্তি—জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"[১০৬]
১৫. আবুদ দারদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَاقٌ، وَلَا مُدْمِنُ خَمْرٍ، وَلَا مُكَذِّبُ بِالْقَدَرِ
“মা-বাবার অবাধ্য, মদপানে আসক্ত এবং তাকদীর অস্বীকারকারী— জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”[১০৭]
৯৬. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لَّا يَنْظُرُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : الْعَاقُ لِوَالِدَيْهِ، وَمُدْمِنُ الْخَمْرِ، وَالْمَنَّانُ بِمَا أَعْطَى
"বিচার দিবসে আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণির মানুষের দিকে তাকাবেন না; ১. বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান, ২. মাদকাসক্ত এবং ৩. অনুগ্রহ করে খোঁটা দানকারী।”[১০৮]
৯৭. আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَاقُ
"মা-বাবার অবাধ্য সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না।"[১০৯]
৯৮. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَرْبَعَةُ حَقٌّ عَلَى اللَّهِ أَنْ لَا يُدْخِلَهُمُ الْجَنَّةَ وَلَا يُذِيقَهُمْ نَعِيْمَهَا : مُدْمِنُ خَمْرٍ، وَآكِلُ الرِّبَاء وَاكِلُ مَالِ الْيَتِيمِ بِغَيْرِ حَقٌّ، وَالْعَاقُ لِوَالِدَيْهِ
"চার শ্রেণির মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না এবং এর নিয়ামাতের স্বাদও আস্বাদন করাবেন না। তারা হলো—
১. মাদকাসক্ত ব্যক্তি,
২. সুদখোর,
৩. অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণকারী এবং
৪. মা-বাবার অবাধ্যচারী।”[১১০]
৯৯. যাইদ ইবনু আরকাম (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর কাছ থেকে শুনেছি, তিনি বলতেন,
مَنْ أَصْبَحَ وَالِدَاهُ رَاضِيَيْنِ عَنْهُ، أَصْبَحَ لَهُ بَابَانِ مَفْتُوْحَانِ مِنَ الْجَنَّةِ، وَمَنْ أَمْسَى وَالِدَاهُ رَاضِيَيْنِ عَنْهُ، أَمْسَى لَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ الْجَنَّةِ، وَمَنْ أَصْبَحَا سَاخِطَيْنِ عَلَيْهِ، أَصْبَحَ لَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ النَّارِ، وَإِنْ كَانَ وَاحِدٌ فَوَاحِدًا
"সকালবেলা যার প্রতি তার বাবা-মা সন্তুষ্ট থাকেন, তার জন্য সকালবেলা জান্নাতের দু'টি দরজা খুলে দেওয়া হয়। সন্ধ্যাবেলা যার প্রতি তার বাবা-মা সন্তুষ্ট থাকেন, তার জন্য সন্ধ্যাবেলা-জান্নাতের দু'টি দরজা খুলে দেওয়া হয়। আর সকালবেলা যার প্রতি তার বাবা-মা অসন্তুষ্ট হোন, তার জন্য সকালবেলা জাহান্নামের দু'টি দরজা খুলে দেওয়া হয়। যদি একজন অসন্তুষ্ট হোন, তাহলে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।"
এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, 'বাবা-মা যদি সন্তানের প্রতি অনাচার করে তাহলেও কি খুলে -দেওয়া হয়?' তিনি উত্তরে বললেন, وَإِنْ ظَلَمَاءُ، وَإِنْ ظَلَمَاءُ "যদিও তাঁরা অবিচার করে, যদিও তাঁরা অনাচার করে।"[১১১]
১০০. ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَمْسَى مُرْضِيًّا لِوَالِدَيْهِ وَأَصْبَحَ، أَصْبَحَ وَلَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ الْجَنَّةِ، وَمَنْ أَصْبَحَ وَأَمْسَى مُسْخِطًا لِوَالِدَيْهِ، أَصْبَحَ وَأَمْسَى وَلَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ إِلَى النَّارِ، وَإِنْ وَاحِدًا فَوَاحِدًا
“যে-ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তার বাবা-মাকে খুশি রাখে, তার জন্য সকাল-সন্ধ্যা জান্নাতের দু'টি দরজা খুলে দেওয়া হয়। আর যে-ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তার বাবা-মাকে কষ্ট দেয়, তার জন্য সকাল-সন্ধ্যা জাহান্নামের দু'টি দরজা খুলে দেওয়া হয়। যদি একজনকে কষ্ট দেয় তাহলে একটি দরজা খোলা হয়।
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, 'যদি তাঁরা অবিচার করেন তাহলেও কি জাহান্নামের দরজা খোলা হবে?'
তিনি বললেন, وَإِنْ ظَلَمَاءُ، وَإِنْ ظَلَمَاءُ "যদিও তাঁরা অবিচার করে, যদিও তাঁরা অনাচার করে।" [১১২]
১০১. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'যে-ব্যক্তি তার মা-বাবার সাথে সদাচরণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতের দু'টি দরজা খুলে দিবেন। যদি (মা-বাবার) একজন থাকেন, তাহলে (জান্নাতের) একটি দরজা খুলে দিবেন। আর যদি সে তাঁদের দু'জনের একজনকে কষ্ট দেয় তাহলে তিনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন না।' কেউ প্রশ্ন করল, 'যদি তাঁরা অবিচার করেন তাহলেও?' তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাঁরা অবিচার করলেও।"[১১৩]
১০২. উবাই ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন,
مَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ أَوْ أَحَدَهُمَا، ثُمَّ دَخَلَ النَّارَ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ، فَأَبْعَدَهُ اللَّهُ وَأَسْحَقَهُ
“যে-সন্তান তার মা-বাবা উভয়কে অথবা একজনকে জীবিত পেয়েও মৃত্যুর পর জাহান্নামে যায়, সে নিপাত যাক। তার ধ্বংস হোক।" [১১৪]
১০৩. মালিক ইবনু আমর কুশাইরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি-
مَنْ أَدْرَكَ أَحَدَ وَالِدَيْهِ، ثُمَّ لَمْ يُغْفَرْ لَهُ، فَأَبْعَدَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ
“যে-সন্তান তার মা-বাবার একজনকেও জীবিত অবস্থায় পেল, কিন্তু তার
গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না, আল্লাহ তাআলা (তাঁর রহমত থেকে) তাকে বঞ্চিত রাখুন।”[১১৫]
১০৪. আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বারের তিনটি সিঁড়িতে উঠতে তিনবার আমীন বললেন। সেখান থেকে নামার পর এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, 'আল্লাহর রাসূল! আপনি যখন মিম্বারে উঠলেন তখন তিনবার আমীন বললেন, এর কারণ কী?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এসে আমাকে বললেন, 'যে-ব্যক্তি রমাদান মাস পাওয়া সত্ত্বেও নিজের গুনাহ ক্ষমা করাতে পারল না, ফলে মৃত্যুর পরে জাহান্নামি হলো, সে ধ্বংস হোক। আপনি বলুন, আমীন!' আমি বললাম, 'আমীন।' তিনি বললেন, 'যে-সন্তান পিতামাতা উভয়কে অথবা তাঁদের একজনকে জীবিত পেয়েও তাঁদের সেবা-যত্ন করল না, ফলে মৃত্যুর পরে জাহান্নামে প্রবেশ করল, সে ধ্বংস হোক। আপনি বলুন, আমীন!' আমি বললাম, 'আমীন।' এরপর তিনি বললেন, 'যে-ব্যক্তির সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হওয়ার পরেও আপনার ওপর দরুদ পাঠ করল না, ফলে মৃত্যুর পরে জাহান্নামে গেল, সেও ধ্বংস হোক। আপনি বলুন, আমীন!' আমি বললাম, 'আমীন।''[১১৬]
১০৫. আবূ তুফাইল (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, 'আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, 'পৃথিবীর সকল মানুষের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনাকে কি বিশেষ কিছু দিয়েছেন, যা অন্যদেরকে দেননি?' তিনি বললেন, 'আমার এই তরবারির খাপের মধ্যে যা আছে তা ছাড়া তিনি আমাকে আর বিশেষ কিছুই দেননি। তারপর তিনি সেখান থেকে একটি কাগজ বের করলেন। সেখানে লেখা ছিল,
لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ، لَعَنَ اللهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الْأَرْضِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ لَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا
“যে-ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নামে পশু জবাই করে তার প্রতি আল্লাহর লানত। যে-ব্যক্তি জমির নির্দেশক চিহ্ন চুরি করে (জমির সীমানা মিটিয়ে দেয়) তার প্রতি আল্লাহর লানত। সেই ব্যক্তির ওপর আল্লাহর
লানত, যে তার বাবা-মাকে অভিশাপ দেয়। আর যে-ব্যক্তি কোনও বিদআতিকে প্রশ্রয় দেয়, তার ওপরও আল্লাহর লানত।"[১১৭]
১০৬. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "অপদস্ত হোক! অপদস্ত হোক! অপদস্ত হোক!” উপস্থিত জনতা জানতে চাইল, 'হে আল্লাহর রাসূল! কে?' তিনি বললেন, مَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ، أَوْ أَحَدَهُمَا، فَدَخَلَ النَّارَ
"সেই ব্যক্তি—যে তার মাতাপিতা উভয়কে অথবা একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় কাছে পেয়েও জাহান্নামে প্রবেশ করল।" [১১৮]
১০৭. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَلْعُوْنُ مَنْ سَبَّ أَبَاهُ، مَلْعُوْنُ مَنْ سَبَّ أُمَّهُ
“যে-ব্যক্তি তার বাবাকে গালি দিল সে অভিশপ্ত। যে-ব্যক্তি তার মাকে গালি দিল সে-ও অভিশপ্ত।" [১১৯]
১০৮. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَعَنَ اللهُ سَبْعَةٌ مِّنْ خَلْقِهِ فَوْقَ سَبْعِ سَمَوَاتِهِ، فَقَالَ : مَلْعُوْنُ مَنْ عَقَّ وَالِدَيْهِ ...
"সাত আসমানের ওপর থেকে সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাআলা অভিশাপ দেন। যে-ব্যক্তি তার মা-বাবার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয় সে অভিশপ্ত।......"[১২০]
১০৯. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا تُقْبَلُ صَلَاةُ السَّاخِطِ عَلَيْهِ أَبَوَاهُ غَيْرُ ظَالِمَيْنِ لَهُ "যে-সন্তানের ওপর তার মা-বাবা অসন্তুষ্ট, তার সালাত আল্লাহর কাছে কবুল হয় না। তবে যদি তাঁরা তার প্রতি জুলুম করে থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা।”[১২১]
১১০. আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَرْضَى وَالِدَيْهِ، فَقَدْ أَرْضَى الله، وَمَنْ أَسْخَطَ وَالِدَيْهِ، فَقَدْ أَسْخَطَ اللَّهَ “যে-সন্তান তার মা-বাবাকে সন্তুষ্ট রাখল, সে যেন আল্লাহকেও সন্তুষ্ট রাখল। আর যে-সন্তান তার মা-বাবাকে অসন্তুষ্ট করল, সে যেন আল্লাহকেও অসন্তুষ্ট করল।"[১২২]
১১১. আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
يُقَالُ لِلْعَاقَ : اعْمَلْ مَا شِئْتَ، فَإِنِّي لَا أَغْفِرُ لَكَ، وَيُقَالُ لِلْبَارُ : اعْمَلْ مَا شِئْتَ، فَإِنِّي سَأَغْفِرُ لَكَ "মা-বাবার অবাধ্য সন্তানকে বলা হয়, তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো, আমি তোমায় ক্ষমা করব না। আর মা-বাবার প্রতি সদাচারী ব্যক্তিকে বলা হয়, তুমি যা খুশি তা করতে পারো, আমি তোমায় ক্ষমা করে দেবো। "[১২৩]
১১২. আবূ বাকরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
كُلُّ الذُّنُوبِ يُؤَخِّرُ اللهُ تَعَالَى مِنْهَا مَا شَاءَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، إِلَّا عُقُوْقَ الْوَالِدَيْنِ، فَإِنَّهُ يُعَجِّلُهُ لِصَاحِبِهِ فِي الْحَيَاةِ قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ
"সব অপরাধের শাস্তি আল্লাহ তাআলা তাঁর ইচ্ছানুযায়ী কিয়ামাত পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু মা-বাবার অবাধ্যচারী ব্যক্তির শাস্তি আল্লাহ কিয়ামাতের পূর্বে দুনিয়াতেই দিয়ে দেন।”[১২৪]
১১৩. একজন মনীষী বলেছেন, 'মা-বাবার অবাধ্য সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব করবে না। সে তোমার সাথে কখনও সদাচারী হবে না। কারণ তার ওপর যাদের সবচেয়ে বেশি অধিকার ছিল, সে তাদের সাথেই ভালো আচরণ করছে না।'
টিকাঃ
১০২ বুখারি, ২৬৫৪; মুসলিম, ৮৭。
১০৩. বুখারি, ২৬৫৩; মুসলিম, ৮৮。
১০৪. বুখারি, ৬৬৭৫。
১০৫. তিরমিযি, ৫/২২০; সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসূর, ২/১৪৭。
১০৬. আবু দাউদ তয়ালিসি, আল-মুসনাদ, ২২৯৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/২০১-২০৩; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৬/২৫৭。
১০৭. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬/৪৪১; আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৪৩৯৯৬, ৪৩৯৯৯。
১০৮. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬১৮০; ইবনু ওয়াহব, আল-জামি', ৬৫, হাসান。
১০৯. খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ৫০৮৪; আবূ ইয়ালা, আল-মুসনাদ, ১১৬৮; বাইহাকি, কুবরা, ৮/২৮৮; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫/৭৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/১৩৪, সহীহ。
১১০. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ২/৩৭, দঈফ。
১১১. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৪৫৫৩৯。
১১২. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৯১৬, সনদ ত্রুটিযুক্ত。
১১৩. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৭; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৯১৫。
১১৪. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/৩৪৪; তাবারানি, কাবীর, ১৯/২৯২; আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৪৫৫৩৮。
১১৫. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১/৩৪৪; তাবারানি, কাবীর, ১৯/৩০০; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮/১৪২-১৪৩。
১১৬. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৩৩৫০; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮/১৪২; মুনযিরি, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৪/৯৭; তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ৮১৩১。
১১৭. মুসলিম, ১৯৭৮; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১৭; ইবনু হিব্বান, ৬৬০৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/৩২৭。
১১৮. মুসলিম, ১৯৭৮; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ২১。
১১৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১/২১৭; ইবনু হিব্বান, ৪৪১৭。
১২০. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/৩৫৬; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৫৪৭২; আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৪৪০৪৩。
১২১. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৪৫৫২৫。
১২২, আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৪৫৫৯৭; সুযুতি, আল-জামিউস সগীর, ৮৩৯৫。
১২৩. আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১০/২১৫-২১৬; আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৪৫৫২৭。
১২৪. হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫৬; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৫০৫。
📄 বাবার অবাধ্য হওয়ার শাস্তি
১১৪. আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رِضَى اللهِ فِي رِضَى الْوَالِدِ، وَسَخَطُ اللَّهِ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
"বাবার খুশিতে আল্লাহ খুশি হোন এবং বাবার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হোন।"[১২৫]
১১৫. ইবনু কুতাইবা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি 'সিয়ারুল আজাম' নামক গ্রন্থে পড়েছি, 'যখন আরদাশীর [১২৬]-এর প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং আশপাশের রাজারা তার আনুগত্য স্বীকার করে নিচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে সে সুরায়ানিয়্যাহ রাজ্য দখলের পাঁয়তারা শুরু করে। সে ওই রাজ্যটি অবরোধ করলেও পুরোপুরি বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছিল না। হঠাৎ একদিন রাজকন্যা দুর্গের ছাদে এসে আরদাশীরকে দেখে তার প্রেমে পড়ে যায় এবং একটি তীর নিয়ে ফলকে লেখে-'যদি তুমি আমাকে বিয়ে করার শর্তে রাজি থাকো, তাহলে এই দুর্গ বিজয়ের সর্বাধিক সহজ এবং দ্রুততম পন্থাটি আমি তোমায় বলে দেবো।' শর্তখচিত তীরটি সে আরদাশীরকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করে। আরদাশীর তার শর্ত মেনে নেয় এবং দুর্গে প্রবেশের পথ বাতলে দিতে বলে। রাজকন্যা দুর্গে ঢোকার সহজ পথটি বাতলে দিল। দুর্গবাসী এই চালবাজির ছিটেফোঁটাও অনুভব করতে পারেনি। ফলে সে দুর্গে ঢুকে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দিল। রাজাকে হত্যা করে দুর্গটাকে কুরুক্ষেত্রে পরিণত করল।
তারপর শর্ত অনুযায়ী সে রাজকন্যাকে বিয়ে করল। একরাতে রাজকন্যা খুব চেষ্টা করার পরও ঘুমাতে পারল না। গভীর রাত অবধি সেভাবেই কেটে গেল। আরদাশীর জানতে চাইল, 'কী হয়েছে তোমার? ঘুমাচ্ছ না কেন?' উত্তরে রাজকুমারী বলল, 'বিছানাটা উপযুক্ত মনে হচ্ছে না।' পরে লক্ষ করে দেখা গেল, বিছানায় ব্যবহার করা সুগন্ধ-পাতার রেখাগুলোর কারণে তার শরীরে দাগ পড়েছে। সে রাজকন্যার এত মসৃণ ত্বক দেখে মুগ্ধ হয়ে বলল, 'তোমার বাবা তোমাকে কী খাওয়াতেন?' সে উত্তর দিল, 'সবসময় তিনি আমাকে মধু, মাখন এবং চর্বিযুক্ত খাবার খেতে দিতেন।'
আরদাশীর বলল, 'তোমার প্রতি তোমার বাবার মতো এত বেশি স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসা অন্য কেউ প্রদর্শন করবে না। তোমার তুলতুলে বিছানা এবং তোমার প্রতি তার এই অগাধ ভালোবাসা আর স্নেহ-মমতার প্রতিফল হিসেবে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। আমি তোমার প্রতি তোমার বাবার মতো বিশ্বাস স্থাপন করে ভুল করতে চাই না।' এরপর আরদাশীর আদেশ করল যেন দ্রুতগামী ঘোড়ার লেজে রাজকন্যার চুলের গোছা বেঁধে ঘোড়া ছুটিয়ে দেওয়া হয়। ঠিক সেভাবেই আদেশ পালন করা হলো এবং অবশেষে রাজকন্যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।[১২৭]
১১৬. মুহাম্মাদ ইবনু হারব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাকাশ নামে ইয়াদ ইবনু নাযার গোত্রের এক মহিলা ছিল। তার বাবা তাকে অনেক ভালোবাসত। একদিন স্বগোত্রীয় এক যুবক তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। মেয়েটিরও তাকে দেখে খুব পছন্দ হলো। কিন্তু তার বাবা এই প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। বিয়ে আর হলো না। একদিন সে তার বাবাকে বিষমেশানো পানি পান করালো। যখন তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছলেন তখন মেয়েকে লক্ষ করে বললেন, 'তুমি এমন এক ব্যক্তিকে পাওয়ার আশায় আমাকে হত্যা করলে, যার সাথে তোমার যোজন যোজন দূরত্বের সম্পর্ক। তোমার কৃতকর্মের ফল অচিরেই তুমি টের পাবে।' বাবার মৃত্যুর পর সে ঐ যুবককে বিয়ে করল। কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বামী তাকে ইচ্ছেমতো প্রহার করল। কেউ তাকে বলল, 'রাকাশ! তোমার স্বামী তোমাকে এত নির্মমভাবে মারতে পারল?' সে বলল, 'যার কোনও সাহায্যকারী থাকে না, তার অপমান অনিবার্য।' এরপর অল্প ক'দিনের মধ্যেই তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করল। এক মহিলা তাকে বলল, 'তোমার স্বামী আরেকটি বিয়ে করল আর তুমি তার কাছে তালাক চাচ্ছ না?' সে বলল, 'আমি মন্দের বদলা আরেকটি মন্দ দিয়ে নিতে চাই না।[১২৮]
১১৭. আলি ইবনু ইয়াহইয়া মুনজিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'খলীফা মুনতাসির দরবারে বসার আগে সেখানে গালিচা বিছানোর নির্দেশ দিলেন। কয়েকটি গালিচায় মুকুট পরিহিত একজন অশ্বারোহীর ছবি আঁকা ছিল। পাশে ফার্সি ভাষায় কিছু লেখা। সভাসদবর্গদের নিয়ে খলীফা দরবারে বসলেন। তার সামনে গোলাম-বাঁদি এবং সভাসদরা এসে দাঁড়াল। তিনি বৃত্ত-আঁকা সেই অশ্বারোহী এবং তার পাশের লেখাগুলোকে দেখে সভাসদদের উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এগুলো কী?' তাঁদের একজন উত্তর দিল, 'আমীরুল মুমিনীন এ-সম্পর্কে আমার কোনও জ্ঞান নেই। পরে এক ব্যক্তিকে দরবারে উপস্থিত করা হলো। সেই ব্যক্তি এগুলো পড়ে ভ্রু কুঁচকালো। খলীফা বললেন, 'কী এগুলো?' সে বলল, 'আমীরুল মুমিনীন! কাণ্ডজ্ঞানহীন কিছু মূর্খ ঘোড়সওয়ারির ছবি আঁকা।' তিনি বললেন, 'লেখাগুলো সম্পর্কে আমায় জানাও।' সে বলল, 'আমীরুল মুমিনীন, এগুলোর কোনও অর্থ হয় না।' খলীফা ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। তখন সেই লোকটি বলল, 'এখানে লেখা আছে, 'আমি শীরওয়াই ইবনু কিসরা ইবনি হুরমুয। আমার বাবাকে হত্যা করে আমি ছয় মাসের বেশি রাজ্য ভোগ করতে পারিনি।' একথা শুনে খলীফা মুনতাসিরের চেহারা মলিন হয়ে গেল। তিনি দরবার থেকে সোজা অন্দরমহলে ঢুকে পড়লেন। পরবর্তীতে তিনিও ছয় মাসের বেশি রাজ্য পরিচালনা করতে পারেননি।[১২৯]
টিকাঃ
১২৫. তিরমিযি, ১৮৯৯১; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫১; আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৮/২১৫。
১২৬. তিনি ছিলেন পারস্যের সাসানী সাম্রাজ্যের প্রথম বাদশাহ। -অনুবাদক
১২৭. ইবনু কুতাইবা, উয়নুল আখবার, ৪/১১৭; আবু বকর দীনাওয়ারি, আল-মুজালাসাহ ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৫/১৭১。
১২৮. ইবনুল জাওযি, যাম্মুল হাওয়া, ৪৬৩。
১২৯. শামসুদ্দীন যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১২/৪৫; খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ১২/১২০-১২১。
📄 মায়ের অবাধ্য হওয়ার শাস্তি
১১৮. আবদুল্লাহ ইবনু আবী আওফা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! সাম্প্রতিক সময়ে এক যুবক মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। তাকে কালিমা (لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللهُ) উচ্চারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিন্তু সে তা বলতে পারছে না।'
রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'সে কি জীবদ্দশায় কখনও তা বলেনি?'
উপস্থিতদের একজন বললেন, 'হ্যাঁ, সে তো বলেছে।'
তিনি জানতে চাইলেন, 'তাহলে মৃত্যুর সময় কীসে তাকে বাধা দিচ্ছে?'
তারপর নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে আমরাও সেই যুবকের বাড়ি গেলাম। তিনি সেই যুবককে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'যুবক! তুমি কালিমা পড়ো।'
সে বলল, 'আমি পারছি না।'
রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানতে চাইলেন, 'কেন পারছ না?' সে উত্তর দিল, 'মায়ের অবাধ্যতার কারণে।'
রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, 'তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?'
সে বলল, 'হ্যাঁ, তিনি জীবিত।'
রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার মাকে লক্ষ করে বললেন, 'তুমি কি রাজি আছ যে, আমরা তোমার ছেলেকে তোমার চোখের সামনে আগুনের গর্তে নিক্ষেপ করি?'
মহিলা বলল, 'এমন হলে তো আমি অবশ্যই বারণ করব।'
রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'তাহলে তুমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আমাদের সামনে বলো যে, আমি আমার ছেলের প্রতি সন্তুষ্ট।'
সে বলল, 'হে আল্লাহ! আমি আপনাকে এবং আপনার রাসূলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার ছেলের প্রতি সন্তুষ্ট।'
এরপর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুবককে বললেন, 'হে যুবক! বলো لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ' তখন সে বলল, لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। যিনি আমার মাধ্যমে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন। [১৩০]
১১৯. আবূ হাযিম (রহিমাহুল্লাহ) এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'এক জায়গায় আমার সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেখানে আমি দু'টি কুটির দেখতে পেলাম। কুটিরের কাছে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে সালাম দিলাম। একজন যুবতী এবং একজন বৃদ্ধা সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
আমি বললাম, 'আপনাদের কাছে রাতের খাবারের কিছু আছে? আপনাদের নিকট রাতে থাকার কোনও ব্যবস্থা হবে?'
তারা বলল, 'না। আমাদের কাছে কিছু নেই। আর এই উপত্যকায় আমাদের কোনও ধন-সম্পদ, ছাগল-বকরি, উট কিংবা গাধা কিছুই নেই।'
আমি প্রশ্ন করলাম, 'তাহলে আপনারা এখানে বসবাস করেন কেন?'
তারা জানাল, 'আল্লাহর ইচ্ছায় এবং কিছু নেকবান্দা ও পাশে থাকা রাস্তাটির কারণেই আমরা এখানে থাকি।
চারদিকে শুনসান নীরবতা। কোনও পথচারীর পায়চারি নেই। হঠাৎ আমি গাধার বিকট চিৎকার শুনতে পেলাম। চিৎকার এত বেশি তীব্র ছিল যে, আল্লাহর কসম! আমি সকাল পর্যন্ত সেই বিকট আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। যার কারণে আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। সকালে যেখান থেকে শব্দ আসছিল সেদিকে রওনা হলাম। গিয়ে একটি কবর দেখতে পেলাম, যার ভেতরে রয়েছে মৃতগাধার এক বীভৎস কঙ্কাল। যা দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে দ্রুত ফিরে এলাম। তারপর মহিলা দু'জনকে কবরে দেখা সেই গাধার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম।
তারা বলল, 'আপনার এ সম্পর্কে না জানলেও চলবে।'
আমি জোর গলায় বললাম, 'আমি জিজ্ঞাসা করছি, সুতরাং বলতে আপত্তি কোথায়?'
যুবতী মুখ খুলল। সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! এই যে গাধার আওয়াজ শুনেছেন এটি আমার স্বামীর আওয়াজ। তিনি এই বৃদ্ধা মহিলার ছেলে। সবসময় মায়ের অবাধ্যতা করতেন। মা কোনও কাজ করতে নিষেধ করলেই তিনি বলতেন, 'আমার সামনে থেকে সরে গিয়ে গাধার মতো চিল্লাচিল্লি করো।' একদিন মা মনের কষ্টে বলেই ফেললেন, 'আল্লাহ তোকে গাধায় পরিণত করুন।' পরে একদিন আমার স্বামী মারা যান। আমরা তাকে এই নির্জন প্রান্তে দাফন করে দিই। (তার কবর থেকেই এমন গাধার চিৎকার ভেসে আসে।) আল্লাহর শপথ! তিনিই আমাদেরকে এই উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দা বানিয়েছেন। এখানে বসবাস করতে আমাদেরকে বাধ্য করেছেন।'
১২০. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একবার আমি একটা কাজের উদ্দেশ্যে বের হলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ একটি গাধাকে দেখলাম-একটি গর্ত থেকে দু'চোখ বের করল। তারপর আমার সামনেই বিকট আওয়াজে তিনবার চিৎকার দিয়ে আবার গর্তে ঢুকে গেল। এরপর আমি যাদের কাছে যাচ্ছিলাম সেখানে যখন পৌঁছলাম তখন তারা জানতে চাইল, 'কী হয়েছে আপনার? চেহারা এমন বিবর্ণ কেন?'
আমি তাদেরকে ব্যাপারটি খুলে বললাম। তারা বলল, 'মনে হয় আপনি এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।'
আমি বললাম, হ্যাঁ। আমি আসলেই কিছু জানি না।'
তারা আমাকে জানাল, 'সেই কবরটি এই মহল্লার এক যুবকের। তার মা ঐ ঝুপড়িতে থাকে। তিনি যখনই তাকে কোনও কাজের আদেশ দিতেন, তখনই ছেলেটি তার সামনে গাধার মতো হা হা হাহ... শব্দে চিৎকার করত এবং তাচ্ছিল্যের সাথে বলত, তুমি আসলেই একটা গাধা। একদিন সে হঠাৎ করেই মারা যায়। আমরা তাকে সেই গর্তে দাফন করি। তারপর থেকে প্রতিদিন সে মাথা বের করে তিনবার চিৎকার দিয়ে আবার সেখানে ঢুকে পড়ে।[১৩১]
১২১. আবূ কাযআ (রহিমাহুল্লাহ) বসরার এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমরা একটি জলাশয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সেখানে গাধার চিৎকার শুনতে পেলাম। জনপদবাসীর কাছে এই চিৎকারের রহস্য জানতে চাইলাম। তারা জানাল, 'সে আমাদের গোত্রের এক ব্যক্তি। তার মা যখনই তার সাথে কোনও বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, তখনই-সে বলত, তুমি খালি গাধার মতো চিৎকার করো!' ইসহাক ছাড়া অন্যান্য বর্ণনাকারীরা বলেন, 'একদিন তার মা বেফাঁস বলে ফেললেন, 'আল্লাহ তোকেই গাধায় পরিণত করুক।' সে মারা যাওয়ার পর প্রতি রাতে তার কবর থেকে গাধার চিৎকার শোনা যায়। [১৩২]
১২২. প্রখ্যাত মুজতাহিদ সাঈদ উমানি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি একবার হাজ্জের সফরে বের হলাম। হাজ্জ শেষে রাতের প্রথম ভাগে আমি স্বপ্নে দেখি, মিনায় এক ব্যক্তি ঘোষণা করছেন, 'শোনো! এবার যারা হাজ্জ করেছে তাদের মাঝে আবূ সালিহ বালখি ব্যতীত আল্লাহ তাআলা সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাতভর একই স্বপ্ন তিনবার দেখলাম। পরদিন সকালে মিনায় বালখি ব্যবসায়ীদের অবস্থানস্থল সম্পর্কে মানুষকে জিজ্ঞাসা করে করে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। পরে জানতে পারলাম তিনি রাজ দরবারের লোক। তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলাম। কিন্তু তার গোলাম-বাঁদি আর অনুসারীদের কারণে বেজায় সংকটে পড়তে হলো।
তবুও মন চাচ্ছে একটু সাক্ষাৎ করে যাই। চত্বর অতিক্রম করে আমি তার কাছাকাছি
আসলাম। কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাহিনী আমাকে যেতে দিচ্ছিল না। তিনি আমার আওয়াজ শুনতে পেয়ে বললেন, 'তাকে আসতে দাও।' আমি তার কাছে গেলাম। তিনি চুল-দাড়িতে খেযাব ব্যবহার করেছেন। তাকে বললাম, 'আপনার সাথে একটু একান্তে কথা বলতে চাই।' তিনি লোকজনদের সরে যেতে বললেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনিই কি আবূ সালিহ বালখি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমিই আবূ সালিহ বালখি। তবে তুমি আমাকে চিনতে না পারায় আমি খুবই মর্মাহত হলাম।'
আমি বললাম, 'গতরাতে আমি আপনাকে নিয়ে একটি স্বপ্ন দেখেছি।' স্বপ্নের পুরোটা শুনে তিনি বললেন, 'আমি ছিলাম মদখোর যুবক। একরাতে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরলাম। দরজায় নক করার পরও খুলতে বেশ দেরি হতে লাগল। অনেকক্ষণ বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি বিরক্ত হয়ে গেলাম। বেশ কিছু সময় পর দরজা খুললেন আমার মা। নেশার ঘোরে আমি তার বুকে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করি। ফলে তিনি মারা যান।'
আমি বললাম, 'তাহলে তো আপনার ধ্বংস অনিবার্য!'
১২৩. মালিক ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একবার হাজ্জের মৌসুমে মাতাফে অনেক হাজী এবং উমরাকারীদের দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। আবেগাপ্লুত হয়ে মনে মনে বললাম, যাদের হাজ্জ কবুল হয়েছে তাদের সম্পর্কে যদি জানতে পারতাম, তাহলে তাদেরকে সংবর্ধনা জানাতাম। আর যাদেরটা কবুল হয়নি তাদেরকে জানাতাম সমবেদনা। সে-রাতেই আমি স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে বলতে দেখলাম, 'মালিক ইবনু দীনার হাজীদের এবং উমরাকারীদের নিয়ে চিন্তায় মগ্ন। (শোনো!) এবার যারা এসেছে, ছোটো-বড়ো, পুরুষ-মহিলা, সাদা-কালো, আরবী-অনারবী সবাইকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু এক ব্যক্তিকে তিনি ক্ষমা করেননি। তার ওপর তিনি অসন্তুষ্ট। আল্লাহ তার হাজ্জ প্রত্যাখ্যান করে তার মুখে নিক্ষেপ করেছেন।'
বাকি রাতটুকু আমি কীভাবে কাটিয়েছি তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। আমার আশঙ্কা হচ্ছে-সেই লোকটি আমিই হবো। পরবর্তী রাতে আমি হুবহু একইরকম স্বপ্ন দেখলাম। কিন্তু ওই রাতে আমাকে বলা হলো, 'সেই লোকটি তুমি নও। সে হচ্ছে খোরাসানের বলখ রাজ্যের বাসিন্দা। তার নাম মুহাম্মাদ ইবনু হারূন বালখি। আল্লাহ তাআলা তার ওপর অসন্তুষ্ট। তার হাজ্জ প্রত্যাখ্যান করে তিনি তার মুখে নিক্ষেপ করেছেন।'
পরের দিন ভোরেই আমি খোরাসানবাসীর কাছে এলাম। তাদের মাঝে বালখি লোকজন
আছে কি না জানতে চাইলাম। তারা আমাকে ঠিকানা বলে দিল। তাদের কাছে এসে সালাম বিনিময়ের পর মুহাম্মাদ ইবনু হারুন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম।
তারা বলল, 'মালিক! আপনি আমাদের মাঝে সর্বাধিক ইবাদাতগুজার এবং সবচেয়ে বেশি তিলাওয়াতকারী ব্যক্তিটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন।'
আমার দেখা স্বপ্ন আর মানুষের বক্তব্য শুনে ব্যাপারটি আমার কাছে তালগোল পাকিয়ে গেল। আমি বললাম, 'আপনারা আমাকে তার কাছে যাওয়ার পথ বাতলে দিন।'
তারা বলল, 'তিনি চল্লিশ বছর ধরে দিনে সিয়াম পালন করেন আর রাতে ইবাদাত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকেন এবং জনমানবশূন্য নির্জন স্থানে বাস করেন।'
আমি ভাবলাম, মক্কার ধ্বংসস্তূপগুলোতেই হয়তো তাকে পাওয়া যাবে। আমি আস্তে আস্তে সব ধ্বংসস্তূপগুলো খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, এক ব্যক্তি দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার ডান হাত কেটে গলায় ঝুলানো। কণ্ঠাস্থি ছিদ্র করে পা পর্যন্ত লম্বা মোটা শেকলে বাঁধা। তিনি রুকূ-সাজদায় মত্ত। আমার পদধ্বনি শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, 'কে তুমি?'
আমি বললাম, 'আমি মালিক ইবনু দীনার।'
হে মালিক! কীসে আপনাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে? আমায় নিয়ে কোনও স্বপ্ন দেখেছেন? যা দেখেছেন বলুন।
সেটি বলতে আমার লজ্জা হচ্ছে।
লজ্জা না করে বলে ফেলুন।
তিনি দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। তারপরে বললেন, 'মালিক! এই একই স্বপ্ন আমি চল্লিশ বছর ধরে শুনে আসছি। প্রতি বছর আপনার মতো কোনও-না-কোনও নেকবান্দা এটি দেখে—আমি জাহান্নামি।
আপনার আর আল্লাহর মাঝে বিশাল কোনও পাপের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে?
হ্যাঁ, আমার অপরাধ আসমান-জমিন, পাহাড়-পর্বত, আরশ-কুরসি, সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে।
আমাকে সেটি শোনান। যারা তার পরিণাম সম্পর্কে জানে না আমি তাদেরকে সতর্ক করে দেবো।
মালিক! আমি ছিলাম একটা মদখোর। একবার আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মদপান করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরি। তখন আমি নেশায় মত্ত। আমার হুঁশ-জ্ঞান-বুদ্ধি সব উড়ে গেছে। মা তখন পাথর দিয়ে জ্বলন্ত চুলা ঢাকছিলেন। মদের নেশায় টলতে টলতে বাড়িতে পা রাখতেই তিনি আমাকে উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন।
'আজ শা'বান মাসের শেষরাত এবং রমাদানের শুরুর সময়। আগামীকাল থেকে মানুষজন সিয়াম পালন করবে আর তুমি মাতাল হয়ে থাকবে? তোমার কি আল্লাহর ব্যাপারে কোনও লজ্জা-শরম নেই?'
আমি হাত উঠিয়ে একটা ঘুসি মারলাম। তিনি বললেন, 'তুমি ধ্বংস হও।' আমার রাগ আগুনের মতো জ্বলে উঠল। নেশার ঘোরে তাকে জ্বলন্ত চুলায় নিক্ষেপ করলাম। আমার স্ত্রী আমাকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। শেষরাতে নেশার ঘোর চলে গেলে আমার স্ত্রীকে ডেকে বললাম, 'দরজা খুলে দাও।'
সে আমার সাথে রাগান্বিত কণ্ঠে কথা বলল। আমি বললাম, 'তোমার কণ্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেন? কী হয়েছে?'
সে বলল, 'তুমি ক্ষমার অযোগ্য।'
আমি জানতে চাইলাম, 'কেন? কী হয়েছে? তুমি এমন কথা বলছো কেন?'
সে বলে উঠল, 'গতরাতে তুমি তোমার মাকে জ্বলন্ত চুলায় নিক্ষেপ করেছ। তিনি জ্বলে অঙ্গার হয়ে গেছেন।'
এটি শোনার পর আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। দরজা খুলে দৌড়ে চুলার পাড়ে গিয়ে দেখি, মা জ্বলন্ত রুটির মতো ঝলসে গেছেন। আমি সেখান থেকে ফিরে দরজার পাশে একটা কুঠার দেখতে পেলাম। দেরি না করে বাম হাতে সেটি নিয়ে আমার ডান হাত দরজার চৌকাঠে রেখে কেটে ফেললাম। আমার কণ্ঠাস্থি ছিদ্র করে এই শেকল ঢুকিয়ে দিলাম। পা দু'টো এই শেকলে আবদ্ধ করে নিলাম। আমার আট হাজার স্বর্ণমুদ্রা সূর্য ডোবার আগেই সদাকা করে দিলাম। ছাব্বিশজন দাসী আর পঁয়ত্রিশজন গোলাম আযাদ করলাম। আমার সহায়-সম্পত্তি সবকিছু দান করে দিলাম। আমি চল্লিশ বছর ধরে দিনের বেলা সিয়াম রাখি আর রাতের বেলা ইবাদাত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দিই। দৈনিক শুধুমাত্র একমুষ্টি ছোলা দিয়ে ইফতার করি। আর প্রতিবছর হাজ্জ করি। প্রত্যেক বছর-ই আপনার মতো কোনও-না-কোনও নেক বান্দা এই স্বপ্নটি দেখেন- আমি একজন জাহান্নামি।'
মালিক ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি অশ্রুসিক্ত চোখ দু'টো মুছে নিয়ে তাকে বললাম, 'হে হতভাগা! আপনি দুনিয়া এবং এর অধিবাসীদেরকে আপনার আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছেন।'
এরপর আমি সেখান থেকে সরে গেলাম। শুনতে পেলাম তিনি হাত দু'টো আসমানের দিকে উঠিয়ে বলছেন, 'হে দুঃশ্চিন্তার অবসানকারী! দুঃখ-বেদনা দূরকারী! দুঃখীদের দুআ কবুলকারী! আপনার পরিতুষ্টির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ থেকে মুক্তি চাই। আপনার দয়ার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে পানাহ চাই। আমার ক্ষমা পাওয়ার আশাকে নিরাশায় পরিণত করবেন না। আমার দুআ প্রত্যাখ্যান করবেন না।'
মালিক ইবনু দীনার (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সেখান থেকে আমি বাড়ি ফিরলাম। একদিন রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি বলছেন, 'হে মালিক! মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ কোরো না। তাদেরকে আল্লাহর ক্ষমা থেকে হতাশ কোরো না। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ইবনু হারুনের ওপর বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন। তার দুআ কবুল করেছেন এবং তার পদস্খলন ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাকে গিয়ে বোলো, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন পূর্বাপর সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। সবার মাঝে ন্যায় বিচার করবেন। শিংওয়ালা বকরি থেকে শিংহীন বকরির প্রতিশোধ নেবার ব্যবস্থা করবেন। সুতরাং তোমাকে এবং তোমার মাকেও আল্লাহ একত্রিত করবেন। তিনি তাঁর পক্ষে তোমার বিরুদ্ধে ফায়সালা করবেন। ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন, তারা যেন তোমাকে মোটা শেকলে বেঁধে জাহান্নামে নিয়ে যায়। এরপরে দুনিয়ার সময়ের তিন দিন পার হলে যখন তুমি জাহান্নামের শাস্তি আস্বাদন করবে, তখন সেখান থেকে মুক্তি পাবে। কারণ, আল্লাহ বলেছেন, 'আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমার যেকোনও বান্দা মদপান করলে বা মানুষকে হত্যা করলে আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি আস্বাদন করাব।' তারপর আমি তোমার মায়ের অন্তরে দয়ার উদ্রেক করব এবং এই তাকে উদ্বুদ্ধ করব তোমার ব্যাপারে আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। ফলে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব। অতঃপর তোমরা উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
সকালে আমি তাকে স্বপ্নের কথাগুলো শোনালাম। তখন তিনি কিছুটা দুঃশ্চিন্তামুক্ত হন। এর কিছুদিন পর তিনি মারা যান। আমি তার জানাযায় শরীক হয়েছিলাম।'
টিকাঃ
১৩০. মুনযিরি, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৪/১১০; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৯২。
১৩১. আসবাহানি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আবুল আব্বাস আসাম নিশাপুরে একাধিক হাদীস বিশারদদের সামনে এটি লিখিয়েছেন। তাঁদের কেউ এই ঘটনাকে অস্বীকার করেননি।'- মুনযিরি, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৩/২২৬。
১৩২, ইবনু আবিদ দুনইয়া, মুজাবুদ-দাওয়াহ, ৪৮。
📄 ‘উকূক’ বা অবাধ্যতার পরিচয়
'উকূক' শব্দের অর্থ-কোনও বৈধ বিষয়ে মা-বাবার নির্দেশ অমান্য করা, তাদের অবাধ্য হওয়া। কথাবার্তায় এবং কাজকর্মে তাঁদের সাথে অশোভনীয় আচরণ করা।
১২৪. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'সন্তানের আচরণে মা-বাবার কান্নাকাটি করা-তাঁদের সাথে দুর্ব্যবহার করার অন্তর্ভুক্ত। [১৩০]
১২৫. উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যে-ব্যক্তি তার মা-বাবাকে রক্তচক্ষু দেখায় সে তাঁদের প্রতি সদাচারী নয়।[১৩৪]
১২৬. ইবনু মুহাইরীয (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যে-ব্যক্তি তার বাবা-মা'র আগে আগে হাঁটে, সে তাদের প্রতি সদাচারী নয়। তবে সে যদি তাদের সামনে থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আগে আগে চলে, তাহলে ভিন্ন কথা। আর কেউ যদি তার বাবাকে নাম ধরে ডাকে কিংবা পদবি দিয়ে আহ্বান করে, তাহলে সেও বাবার প্রতি সদাচারী নয়। তবে সে 'হে বাবা' বলে ডাকতে পারবে।' [১৩৫]
১২৭. মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সন্তানকে প্রহার করার সময় বাবার হাতকে প্রতিহত করা সন্তানের জন্য উচিত নয় (বরং বেআদবি)। আর যে-ব্যক্তি তার বাবা-মা'র দিকে রাগান্বিত চোখে তাকায় সে তাদের প্রতি সদাচারী নয়। আর যে তাদেরকে দুঃচিন্তায় ফেলে সে তাদের প্রতি অনাচারী। [১৩৬]
১২৮. হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বাদশাহর সম্মুখে বাবার নামে নালিশ করা, পিতা-পুত্রের সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করার শামিল। [১৩৭]
১২৯. ফারকাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি কোনও কোনও গ্রন্থে পড়েছি, যে-ব্যক্তি তার বাবা-মা'র দিকে চোখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, সে তাদের প্রতি সদাচারী নয়। তাদের দিকে কোমল-চোখে তাকানো ইবাদাত। মা-বাবার আগে হাঁটা সন্তানের জন্য বেমানান। তাদের উপস্থিতিতে কথা বলাও উচিত না। সন্তান তাদের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের ডানে-বামে হাঁটবে না। তবে তারা আহ্বান করলে সেই ডাকে সাড়া
দিবে। কোনও নির্দেশ দিলে তা অমান্য করবে না। তাদের পেছনে কুলি-কামিনের মতো নতশিরে হাঁটবে। [১৩৮]
১৩০. ইয়াযীদ ইবনু আবী হুবাইব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বাবার বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করা—তাঁর অবাধ্যতার শামিল।'
১৩১. উমারা ইবনু মিহরান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)-কে মাতাপিতার প্রতি সদাচার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, 'তা হলো—তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা এবং তাঁদের প্রয়োজন পূর্ণ করা।' আমি বললাম, 'আর উকূক তথা মা-বাবার অবাধ্যতা কী?' তিনি উত্তর দিলেন, 'তাঁদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা এবং তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা।' [১৩৯]
১৩২. কা'ব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি তাকে উকূক তথা পিতামাতার অবাধ্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, 'তুমি পিতামাতার নির্দেশ অমান্য করলে তাদের অবাধ্যতা করা হবে। আর যখন তাঁরা তোমার বিরুদ্ধে কথা বলবে তখন নিশ্চিতভাবে জেনে নিয়ো—তুমি তাঁদের অবাধ্যচারী।' [১৪০]
টিকাঃ
১৩০. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১/৪৪。
১৩৪. আবূ সা'দ আবী, নাসরুদ দুররি ফিল মুহাদারাত, ৩/১২৭。
১৩৫. বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/২৭。
১৩৬. সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ১২১৩২, দঈফ。
১৩৭. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১১১। তবে বাবা যদি জালিম হন এবং তার জুলুম সীমাছাড়া হয় তাহলে ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কোনও অসুবিধা নেই। (অনুবাদক)
১৩৮. আবুল লাইস সামারকান্দি, তাম্বিহুল গাফিলীন, ১৪৬。
১৩৯. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১১৮。
১৪০. আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৬/৩২。