📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করার পুরস্কার

📄 মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করার পুরস্কার


৫৯. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'একদা তিন ব্যক্তি হেঁটে
চলছিল। এমন সময় প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে তারা এক পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করল।
হঠাৎ ওপর থেকে একটি পাথর গড়িয়ে এসে তাদের গুহার মুখ বন্ধ করে দিল। তাদের একজন আরেকজনকে বলল, 'তোমরা যেসব আমল করেছ, তার মধ্যে উত্তম আমলের ওসীলা দিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করো; হয়তো তিনি পথ বের করে দিবেন।'
তখন তাদের একজন বলল, 'হে আল্লাহ! আমার পিতামাতা অতিশয় বৃদ্ধ ছিলেন, আমি (রোজ সকালে) মেষ চরাতে বের হতাম। তারপর ফিরে এসে দুধ দোহন করতাম এবং এ দুধ নিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হতাম আর তারা তা পান করতেন। তারপর আমি আমার ছোটো ছোটো সন্তানদের ও স্ত্রীকে পান করতে দিতাম। একরাত্রে আমি আটকা পড়ে যাই। পরে যখন আমি ফিরে এলাম তখন দেখি তারা দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। ফলে আমি তাদেরকে জাগানো পছন্দ করলাম না। তখন বাচ্চারা আমার পায়ের কাছে (ক্ষুধায়) চিৎকার করছিল। এ অবস্থায়ই ফজর হয়ে গেল। হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে, আমি তা শুধুমাত্র তোমার সন্তুষ্টি লাভের আশায় করেছিলাম, তাহলে তুমি আমাদের জন্য গুহার মুখ এতটুকু ফাঁকা করে দাও, যাতে আমরা আকাশ দেখতে পারি।'
আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করলেন। ফলে তাদের জন্য এতটুকু ফাঁকা করে দিলেন যে, তারা আকাশ দেখতে পেল।'
ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রহিমাহুমাল্লাহ) স্ব স্ব হাদীসগ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন।[৬৮]
৬০. আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'একবার আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। (স্বপ্নে) দেখলাম আমি জান্নাতে আছি। সেখানে একজন ক্বারীকে তিলাওয়াত করতে শুনলাম। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে আমাকে জানানো হলো, সে হারিসা ইবনুন নু'মান। তারপর আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
كَذَاكَ الْبِرُّ كَذَاكَ الْبِرُّ، وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِأُمِّهِ
"সেবার প্রতিদান এমন-ই। সেবার প্রতিদান এমন-ই। সে তাঁর মায়ের সবচেয়ে বেশি সেবাকারী ছিল।”[৬৯]
৬১. আবুদ দারদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْبَابُ الْأَوْسَطُ مِنَ الْجَنَّةِ مَفْتُوْحُ لِبِرِّ الْوَالِدَيْنِ، فَمَنْ بَرَّهُمَا، فُتِحَ لَهُ، وَمَنْ عَقَّهُمَا، غُلِقَ دُوْنَهُ
"জান্নাতের মধ্য-দরজাটি মাতাপিতার সেবা করার বিনিময়স্বরূপ উন্মুক্ত থাকবে। যে-ব্যক্তি মাতাপিতার সেবা করবে, তার জন্য এটি খুলে দেওয়া হবে। আর যে তাদের অবাধ্যতা করবে, তার জন্য এটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।" [৭০]
৬২. আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ الْمُطِيعَ لِوَالِدَيْهِ، وَالْمُطِيعَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ، مَعِي فِي أَعْلَى عِلِّيِّينَ
"পিতামাতার আনুগত্যকারী এবং আল্লাহ তাআলার আদেশমান্যকারী আমার সাথে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকবে।”[৭১]
৬৩. কা'ব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'লোকমান (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, 'প্রিয় ছেলে! পিতামাতা হলো জান্নাতের দরজাসমূহের একটি দরজা। যদি তারা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন তবে তুমি জান্নাতে যাবে। আর তারা যদি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন তবে তোমাকে (জান্নাতে যেতে) বাধাপ্রদান করা হবে।[৭২]
৬৪. হিশাম বর্ণনা করেন হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'আমি হাজ্জ করেছি। আমার মা-ই আমাকে হাজ্জ করার জন্য অনুমতি দিয়েছেন।' তখন তিনি বললেন, 'খাবার খাওয়ার জন্য মায়ের সাথে একবার দস্তরখানে বসা-আমার নিকট তোমার হাজ্জ করার চেয়েও বেশি প্রিয়।[৭৩]
৬৫. মারূফ ইবনুল ফাইরুযান (রহিমাহুল্লাহ) বলতেন, 'মাতাপিতার দিকে তাকানো-ও ইবাদাত।[৭৪]
৬৬. বিলাল খাওওয়াস (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি বানী ইসরাঈলের ময়দানে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো আমার সাথে সাথে কেউ একজন হাঁটছে। আমি বেশ অবাক হলাম। ইলহামের মাধ্যমে আমি জানতে পারলাম যে, তিনি হলেন খাযির (আলাইহিস সালাম)। তাকে আমি বললাম, 'মহাসত্য আল্লাহর কসম করে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কে?'
তিনি জবাব দিলেন, 'তোমার ভাই খাযির।'
আমি বললাম, 'ইমাম শাফিয়ির ব্যাপারে আপনার মতামত কী?'
তিনি বললেন, 'তিনি হলেন আওতাদ।'
আমি জানতে চাইলাম, 'আর ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল?'
তিনি বললেন, 'তিনি সিদ্দীক বা সত্যবাদী।'
আমি ফের জানতে চাইলাম, 'আর বিশর হাফী?'
তিনি জানালেন, 'তিনি তাঁর অনুরূপ কাউকে রেখে যাননি।'
আমি বললাম, 'কোন আমলের বদৌলতে আমি আপনার সাক্ষাত লাভ করলাম?'
তিনি জানালেন, 'তোমার মায়ের খেদমত করার কারণে। [৭৫]

টিকাঃ
৬৮. হাদীসের বাকি অংশ হলো—আরেকজন বলল, 'হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, আমার এক চাচাতো বোনকে আমি এত ভালোবাসতাম, একজন পুরুষ একজন নারীকে যত ভালোবাসতে পারে। ফলে আমি তাকে পেতে চাইলাম। তখন সে বলল, 'যতক্ষণ না আমাকে একশ দীনার দেবে, তুমি আমার থেকে তোমার সে চাওয়া পূরণ করতে পারবে না।' আমি চেষ্টা করে খুব দ্রুতই তা সংগ্রহ করি। তারপর তার সাথে সাক্ষাত করে যখন আমি আমার উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য অগ্রসর হলাম, তখন সে বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় করো। বৈধ অধিকার ছাড়া মাহরকৃত বস্তুর সীল ভেঙো না।'
এতে আমি তাকে ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে যাই। হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে, আমি তা তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই করেছি, তবে আরও একটু ফাঁকা করে দাও। তখন তাদের (গুহার মুখের) দুই-তৃতীয়াংশ খুলে গেল।
এরপর অপরজন বলল, হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, এক ফারাক (পরিমাণ) শস্যদানার বিনিময়ে আমি একজন মজুর রেখেছিলাম। যখন সে কাজ থেকে ফারেগ হয় তখন আমি তাকে পারিশ্রমিক হিসেবে তা দিতে গেলে সে গ্রহণ না করেই চলে যায়। এরপর আমি সেই শস্যদানা দিয়ে চাষাবাদ করে ফসল উৎপন্ন করি, তা দিয়ে গরু ক্রয় করি এবং রাখাল নিযুক্ত করি। কিছুকাল পরে সেই মজুর এসে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! আমার ওপর জুলুম করো না, আমাকে আমার পাওনা দিয়ে দাও।' আমি বললাম, 'তুমি এই গরুগুলো ও রাখালকে নিয়ে যাও।' সে বলল, 'তুমি কি আমার সাথে উপহাস করছো?' আমি বললাম, 'আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না বরং এসবগুলো তোমার।' অতঃপর সে সবগুলো নিয়ে চলে গেল। 'হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে, আমি তোমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই এটি করেছি, তবে আমাদের জন্য অবশিষ্টটুকু উন্মুক্ত করে দাও।' তখন তাদের গুহার মুখ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে গেল।'-বুখারি, ৫৯৭৪; মুসলিম, ২৮৪৩। (অনুবাদক)
৬৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২০১১৯; আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ২০১১৯।
৭০. সুয়ূতি, আল-জামিউল কাবীর, ১০২৭১।
৭১. সুয়ূতি, আয-যিয়াদাত আলাল মাওযুআত, ১৮০, মুনাবি, ফায়যুল কাদীর, ৫৬৭১, এই হাদীসের সনদে ইবরাহীম ইবনু হুদবাহ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। ইমাম নাসাঈ বলেছেন, 'তার হাদীস পরিত্যাজ্য। আবু হাতিম বলেছেন, 'সে মিথ্যাবাদী।'
৭২. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৩২।
৭৩. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৬৩। এখানে নফল হাজ্জের কথা বলা হচ্ছে। (অনুবাদক)
৭৪. খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ৮/৩৬১。
৭৫. আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৯/১৮৭। 'খাযির' শব্দের অর্থ হলো সবুজ। খাযির (আলাইহিস সালাম)-কে খাযির নামে ডাকার কারণ বর্ণনা করে রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 'খাযিরের নাম এ জন্যই খাযির রাখা হয়েছে যে, একবার তিনি শুকনা সাদা মাটির ওপর বসলে তাঁর নিচে মাটিতে সবুজ-শ্যামলিমার জন্ম হয়।' (বুখারি, ৩৪০২; তিরমিযি, আস-সুনান, ৩১৫১।)
তিনি জীবিত নাকি মৃত — এই বিষয়ে অনেক আগে থেকেই উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য চলে আসছে। ইমাম নববি (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর 'তাহযীবুল আসমা (১/১৭৭)' গ্রন্থে খাযির (আলাইহিস সালাম)-এর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, 'তাঁর জীবিত ও মৃত হওয়া নিয়ে মতপার্থক্য আছে। অধিকাংশ আলিম বলেছেন, তিনি জীবিত। আমাদের মাঝেই বিদ্যমান। সৃফি ও আধ্যাত্মিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট এটি একটি সর্বসম্মত বিষয়। তাকে দেখা, তাঁর সাথে মিলিত হওয়া, তাঁর থেকে ইলম নেওয়া, তাঁর সাথে প্রশ্নোত্তর করা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর উপস্থিত হওয়ার ঘটনা অগণিত এবং এতই প্রসিদ্ধ যে, সেগুলো উল্লেখ করে দেখানোরও প্রয়োজন হয় না।' শাইখ আবু উমর ইবনুস সালাহ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ফতোয়াতে উল্লেখ করেছেন, 'অধিকাংশ আলিম ও নেককার বান্দাদের মতে তিনি জীবিত। অন্যরাও তাদের সাথে একই মত পোষণ করেন। অবশ্য কিছু মুহাদ্দিস বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।'
যারা তাঁর জীবিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন, তাদের মধ্যে রয়েছে হাসান, ইমাম বুখারি, আবু বকর ইবনুল আরাবি (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ।
এটি একটি মতানৈক্যপূর্ণ বিষয় হওয়ায় সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই। কেউ বিশ্বাস করতে পারে, আবার নাও করতে পারে। এর ওপর ঈমান-আমল কোনোটাই নির্ভরশীল নয়। কবরেও এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে না। আর তিনি যদি জীবিত থেকেও থাকেন তাহলে তাঁরও শারীআতে মুহাম্মাদিয়ার অনুগত হওয়া বাধ্যতামূলক। সুতরাং যদি কেউ খাযির (আলাইহিস সালাম)-এর দোহাই দিয়ে শারীআতের কোনও কিছুতে পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করে বা তাঁকে দলীল বানিয়ে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কিছু করার কথা বলে, তবে তা নিঃসন্দেহে প্রত্যাখ্যাত হবে। (অনুবাদক)

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 মা-বাবার জন্য ব্যয় করার সাওয়াব

📄 মা-বাবার জন্য ব্যয় করার সাওয়াব


৬৭. আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَمْسَةِ دَنَانِيرًا أَفْضَلُهَا دِيْنَارُ أَنْفَقْتَهُ عَلَى وَالِدَتِكَ، وَدِيْنَارُ أَنْفَقْتَهُ عَلَى وَالِدِكَ، وَدِيْنَارُ أَنْفَقْتَهُ عَلَى نَفْسِكَ وَعِيَالِكَ، وَدِيْنَارُ أَنْفَقْتَهُ عَلَى ذِي قَرَابَتِكَ، وَأَخَسُّهَا وَأَقَلُّهَا أَجْرًا، دِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“আমি কি তোমাদেরকে পাঁচটি দীনার সম্পর্কে বলব না? এর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট দীনার হলো, তোমার মায়ের প্রয়োজনে ব্যয় করা দীনার, এরপর তোমার বাবার জন্য ব্যয় করা দীনার। এরপর যে দীনার তুমি নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনে ব্যয় করেছ। এরপর যে দীনার তোমার আত্মীয়-স্বজনদের জন্য
তাদের দায়িত্ব কতব্য খরচ করেছ। আর এগুলোর চেয়ে কম মানের ও কম নেকির দীনার হলো, যা তুমি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেছ।”[৭৬]
৬৮. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একবার আমরা আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ঘিরে বসে ছিলাম। এমন সময় দূরে এক যুবকের আগমন লক্ষ করলাম। তাকে দেখে আমরা নিচু আওয়াজে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললাম, 'আহ! এই যুবক যদি তার যৌবন, কর্ম-তৎপরতা এবং ক্ষিপ্রতা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করত!' আমাদের ফিসফিসে কণ্ঠস্বর রাসূলের কান পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ফলে তিনি বললেন,
وَمَا سَبِيلُ اللَّهِ إِلَّا سَبِيلٌ مِّنَ السُّبُلِ، وَسُبُلُ اللهِ كَثِيرَةٌ : مَنْ سَعَى عَلَى وَالِدَيْهِ فَفِي سَبِيلِ اللهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى عَائِلَتِهِ فَفِي سَبِيلِ اللهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيَعِفَّهَا فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَنْ سَعَى لِيُكَاثِرَ وَيُفَاخِرَ فَفِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ
"সাবীলুল্লাহ বা আল্লাহর পথ—কেবল নির্দিষ্ট একটি পথের নাম নয়। আসলে আল্লাহর পথ অনেকগুলো। যে তার বাবা-মায়ের (ভরণপোষণ দেওয়ার) জন্য পরিশ্রম করে, সেও আল্লাহর পথে আছে। যে তার পরিবার- পরিজনের জন্য পরিশ্রম করে, সেও আল্লাহর পথে আছে। যে অন্যের দ্বারস্থ না হয়ে নিজে পবিত্র থাকার জন্য কাজ করে, সেও আল্লাহর পথে আছে। আর যে-ব্যক্তি খাটাখাটুনি করে ঐশ্বর্য ও গৌরব অর্জনের জন্য, নির্ঘাত সে শয়তানের পথে আছে।”[৭৭]
৬৯. উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে একটি পাহাড়ের উপত্যকা অতিক্রম করছিলাম। সেখানে এক যুবককে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে বিস্ময়ের সাথে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! ছেলেটা যদি তার যৌবনকে আল্লাহর রাস্তায় কাটিয়ে দিত!' তখন নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'হে উমর! সে হয়তো আল্লাহর পথেই আছে। যা তোমার জানা নেই।' তারপর তিনি ওই যুবকের কাছে এসে জানতে চাইলেন, 'তোমার ওপর পরিবারের কারও দায়িত্ব আছে?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কে সে?' সে জানাল, 'আমার মা।' তখন নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
الْزَمْهَا، فَإِنَّ عِنْدَ رِجْلَيْهَا الْجَنَّةَ، وَقَالَ : مَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيُغْنِيَهَا عَنِ النَّاسِ، فَهُوَ شَهِيدٌ
“সর্বদাই তাঁর খেদমতে নিয়োজিত থেকো। তাঁর পায়ের কাছেই জান্নাত রয়েছে।” তিনি আরও বললেন, “যে-ব্যক্তি কারও দ্বারস্থ না হয়ে নিজে বাঁচার জন্য পরিশ্রম করে-সে শহীদের মর্যাদা পাবে।”[৭৮]
৭০. মুওয়াররিক ইজলি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একবার রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'আল্লাহর পথে খরচ করা অর্থের চেয়েও মূল্যবান অর্থের কথা কি তোমাদের জানা আছে?' উপস্থিত সবাই বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।' তখন তিনি বললেন, نَفَقَةُ الْوَلَدِ عَلَى الْوَالِدَيْنِ أَفْضَلُ "বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের খরচ করা অর্থই হলো-সর্বোত্তম অর্থ।”[৭৯]

টিকাঃ
৭৬. সুযুতি, আল-জামিউল কাবীর, ৮৯৫৩, দঈফ।
৭৭. বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ৯/২৫; আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৬/১৯৬-১৯৭。
৭৮. আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ১১৭৬০।
৭৯. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, ৪১; আবু নুআইম, হিলইয়া, ২/২৩৬।

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 পিতামাতার বেশি বেশি খেদমত করার দৃষ্টান্ত

📄 পিতামাতার বেশি বেশি খেদমত করার দৃষ্টান্ত


৭১. আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এই উম্মাতের মধ্যে আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দু'জন সাহাবি তাঁদের মায়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি সদাচারী ছিলেন। তারা হলেন উসমান ইবনু আফফান এবং হারিসা ইবনুন নু'মান (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)। অথচ সেই উসমান ইবনু আফফান (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন, 'আমি মুসলিম হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার মায়ের যথাযথ সেবা করতে পারিনি।' আর হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর মায়ের মাথায় সিঁথি করে দিতেন। নিজ হাতে তাঁকে খাবার খাওয়াতেন। তিনি কোনোকিছুর নির্দেশ দিলে পালটা কোনও কথা বলতেন না। যদি কোনও কথা না বুঝতেন, তাহলে মায়ের পাশে বসে থাকা কেউ যখন বাইরে বের হয় তখন তাকে জিজ্ঞেস করে নিতেন-মা কী বলেছেন? (বা কী বোঝাতে চেয়েছেন?) [৮০]
৭২. আবূ মুররাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) সকালে ঘর থেকে বেরুনোর সময় মায়ের কাছে হাজির হয়ে বলতেন, 'আমার প্রিয় মা! আপনার ওপর আল্লাহ শান্তি এবং রহমত বর্ষণ করুন!' জবাবে তাঁর মা বলতেন, 'প্রিয় ছেলে আমার! আল্লাহ তোমাকেও শান্তি আর রহমতে বেষ্টন করে রাখুন!' তিনি বলতেন, 'মা! আল্লাহ আপনাকে সর্বোত্তম রক্ষণাবেক্ষণ করুন, যেভাবে আপনি ছোটোবেলায় আমাকে করেছিলেন।' এর উত্তরে তিনি বলতেন, 'বেটা! তোমার সাথেও আল্লাহ তাআলা সর্বোত্তম আচরণ করুন, যেভাবে তুমি আমার বার্ধক্যের সময় করছো।' বেলা শেষে সন্ধায় বাড়ি ফিরার সময়ও তিনি এরকম করতেন।[৮১]
৭৩. ইবনু সীরীন (রহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাপারে জানা যায় যে, একবার খেজুরগাছের দাম এক হাজার দিরহাম পর্যন্ত উঠল। কিন্তু তখন তিনি তার একটি খেজুরগাছ মজ্জাসহ কেটে ফেললেন। কেউ বলল, 'এত দামি গাছটা কেটে ফেললেন?' তিনি বললেন, 'এটি আমার মায়ের চাওয়া। তিনি যদি এর চেয়েও বেশি কিছু চাইতেন, আমি সেটি করতেও দ্বিধা করতাম না। ৮২
৭৪. মুনযির সাওরি বলেন, 'ইবনুল হানাফিয়্যা (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মায়ের মাথা ধুয়ে দিতেন এবং চুলে চিরুনি করে দিতেন। অনেক সময় তিনি তাঁকে চুমু খেতেন এবং খেযাব লাগিয়ে দিতেন। [৮৩]
৭৫. যুহরি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আলি ইবনুল হুসাইন (রহিমাহুল্লাহ) তার মায়ের সাথে আহার করতেন না। তিনি (তখনকার) লোকদের মধ্যে মায়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি সদাচারী ছিলেন। মায়ের সাথে আহার না করার ব্যাপারে কেউ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, 'আমার আশঙ্কা হয় যে, খাবারের কোনও অংশের ওপর আমার মায়ের চোখ পড়ার পর নিজের অজান্তেই আমি সেটি খেয়ে ফেলব। ফলে আমি মায়ের প্রতি অবিচারকারী [৮৪] বলে গণ্য হবো।[৮৫]
৭৬. হাফসা বিনতু সীরীন (রহিমাহাল্লাহ) বলেন, 'মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (রহিমাহুল্লাহ) তার মায়ের সম্মানার্থে তাঁর সামনে একদম নিশ্চুপ থাকতেন। একবার মায়ের কাছে থাকাকালে এক ব্যক্তি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এল। মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনের অবস্থা দেখে সে জানতে চাইল, 'তিনি কোনও বিষয়ের অভিযোগ করছেন নাকি?' উপস্থিত লোকদের কেউ একজন জানাল, 'না। মায়ের সামনে তিনি এমনই থাকেন।' [৮৬]
৭৭. মুসআব ইবনু উসমান বলেন, 'যুবাইর ইবনু হিশাম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর বাবার অনেক সেবা করতেন। গরমকালে তিনি ছাদে ওঠার পর তাঁর সামনে পানি পরিবেশন করা হতো। তিনি পানি ঠাণ্ডা দেখলে নিজে পান না করে বাবার জন্য তা পাঠিয়ে দিতেন। [৮৭]
৭৮. হাফসা বিনতু সীরীন (রহিমাহাল্লাহ) বলেন, 'আমার সেবায় ছেলে হুযাইল এত বেশি যত্নশীল ছিল যে, গ্রীষ্মকালেই সে বাঁশ সংগ্রহ করে রাখত, যাতে শীতকালে আমার আগুন পোহানোর ব্যবস্থা করতে পারে। এত আগে বাঁশ সংগ্রহ করার রহস্য হলো, যাতে (আগে থেকে রৌদ্রে শুকিয়ে নেওয়ার ফলে) আগুন জ্বালানোর সময় বাঁশে ধোঁয়া তৈরি না হয়। প্রতিদিন ভোরবেলা দুধ দোহন করে সে আমার সামনে পেশ করত। তারপর মমতামাখা স্বরে বলত, 'মা! এ-টুকু পান করে নিন। গরম দুধ অনেক পুষ্টিকর খাবার।' তিনি বলেন, 'হঠাৎ করেই একদিন আমার ছেলে হুযাইলের ইন্তিকাল হয়ে যায়। যার কারণে আমি প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়ি। পুত্রহারার শোক আমার অন্তরকে এমনভাবে পোড়াচ্ছিল যা সহ্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। একরাতে তিলাওয়াত করতে করতে আমি এই আয়াতে এসে থামলাম,
مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللهِ بَاقٍ وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿٩٦﴾
"তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা কখনও শেষ হবে না। যারা ধৈর্যশীল হবে আমি তাঁদের কৃতকর্মের উত্তম প্রতিদান দেবো।” [৮৮]
ফলে তখন থেকে আমার সব দুঃখ-যাতনার অবসান ঘটল।[৮৯]
৭৯. হিশাম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'হাফসা বিনতু সীরীন তাঁর ছেলে হুযাইলকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি গর্ব করে বলতেন, 'হুযাইল গ্রীষ্মকালে বাঁশ ফেঁড়ে শুকিয়ে রাখত। শীতকালে আমি সালাতে দাঁড়ানোর পর সে আমার পেছনের দিকটায় আগুনের ব্যবস্থা করত। যার তাপে আমার আরামবোধ হতো। তবে ধোঁয়া আমার কোনও ব্যাঘাত ঘটাত না। আমি সালাত শেষে তাকে বলতাম, 'ছেলে আমার! রাত অনেক হয়েছে এবার পরিবারের কাছে যাও।' সে বলত, 'মা! এসব কথা থাকুক!' আমি তার মনের আকুতি অনুভব করতাম। গভীর রাত পর্যন্ত এভাবেই কেটে যেত।
আমি তাঁকে বলতাম, 'বেটা! স্ত্রীর কাছে যাও।' সে বলত, 'থাক না এই ব্যাপারটা, মা!' আমি তার ব্যাকুলতা অনুভব করে আর কিছু বলতাম না। সকাল পর্যন্ত এভাবেই কেটে যেত। রোজ সকালে আমার জন্য সে গরম দুধ পাঠিয়ে দিত। আমি বলতাম, 'বেটা! তুমি জানো আমি দিনের বেলা দুধ পান করি না।' সে বলত, 'গরম দুধ হচ্ছে পুষ্টিকর খাবার। আমি আপনার ওপর কাউকে প্রাধান্য দিতে চাই না। এখন আপনি না পান করলে যাকে ইচ্ছা দিয়ে দিতে পারেন; আমার কোনও আপত্তি নেই।'
একদিন সে হাজ্জের ইহরাম বেঁধে আমার সামনে হাজির হলো। আমি বললাম, 'যেহেতু তুমি হাজ্জ করার ইচ্ছা তাই আমি তোমাকে বারণ করব না।' সে বলল, 'আমি জানি। কিন্তু আমি নিজেই যাব না।'
পরে হঠাৎ একদিন তার ইন্তিকাল হয়ে গেল। আমি অসম্ভব চোট পেলাম। একদিন রাতে সালাতে সূরা নাহল পড়ছিলাম। একটি আয়াত সামনে চলে এল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন,
مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللهِ بَاقٍ وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿٦٩)
"তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা কখনও শেষ হবে না। যারা ধৈর্যশীল হবে আমি তাঁদের কৃতকর্মের উত্তম প্রতিদান দেবো।"[৯০]
তখন আমার হুযাইলের কথা মনে পড়ল এবং সেদিন থেকে আমার সকল শোক ও ব্যথার উপশম ঘটল।[৯১]
৮০. আশজাঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একবার মাঝরাতে মিসআর (রহিমাহুল্লাহ)- এর মা পানি চাইলেন। তিনি পানি নিয়ে উপস্থিত হয়ে দেখেন তার মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাই তিনি পানি নিয়ে মায়ের মাথার পাশে সকাল পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন।[৯২]
৮১. যবয়ান ইবনু আলি সাওরি (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মায়ের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। একরাতে তার মা তার ওপর কোনও একটি বিষয়ে মনে কষ্ট রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন তিনি দুই পায়ে ভর করেই দাঁড়িয়ে রইলেন। মাকে জাগ্রত করতে চাচ্ছিলেন না। আবার শুয়ে পড়তেও তার মন সায় দিচ্ছিল না। এভাবে তিনি দুর্বল হয়ে পড়লেন। ফলে তাঁর গোলামদের দু'জন ছুটে এল। তিনি তাঁদের ওপর ভর করে মা জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলেন।
মাঝে মাঝে তিনি সবজি কিনে আনতেন। তারপর এক এক করে সেগুলো ধুয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে মায়ের সামনে রেখে দিতেন। তিনি তাঁর মাকে নিয়ে হাজ্জের সফরেও যেতেন। প্রচণ্ড গরমের সময় গর্ত খুঁড়ে সেখানে চামড়া বিছিয়ে পানি ঢালতেন। তারপর মাকে বলতেন, 'এখানে নেমে একটু শীতল হয়ে নিন।[৯৩]
৮২. মুহাম্মাদ ইবনু উমর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান তার বাবার প্রতি অত্যন্ত সদাচারী ছিলেন। তার বাবা তাকে 'মুহাম্মাদ!' বলে ডাক দিলেই তিনি লাফ দিয়ে সাথে সাথে তাঁর মাথার পাশে উপস্থিত হয়ে যেতেন। তার বাবা নিজ প্রয়োজন বলার সময় তিনি বাবার সম্মানার্থে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কোনোকিছু না বুঝলে পরবর্তীতে উপস্থিত কারও থেকে তা বুঝে নিতেন।[৯৪]
৮৩. একবার ইবনু আওন (রহিমাহুল্লাহ)-এর মা তাকে ডাক দেওয়ার সাথে সাথে তিনি জবাব দিলেন। কিন্তু তার মায়ের আওয়াজের চেয়ে তার গলার স্বর কিছুটা উঁচু হয়ে গেল। এর ফলে ক্ষতিপূরণস্বরূপ তিনি দু'টি গোলাম মুক্ত করে দিলেন।[৯৫]
৮৪. আবু বকর ইবনু আইয়্যাশ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কোনও একদিন আমি মানসূর (রহিমাহুল্লাহ)-এর সাথে তার বাসভবনে উপস্থিত ছিলাম। তার মা একটু কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, 'মানসূর! ইবনু হুবাইরা তোমাকে বিচারপতি নিয়োগ দিতে চাচ্ছে আর তুমি অসম্মতি প্রকাশ করছো?' সে
সময় তিনি বুকের সাথে থুতনি লাগিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মায়ের দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছিলেন না।[৯৬]
৮৫. মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমার ভাই উমর সালাতে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। আর আমি আমার মায়ের পা টিপে দিতে দিতে রাত কাটাই। আমি আমার রাতের সময়গুলো তার মতো কাটাতে চাই না।[৯৭]
৮৬. হাজ্জাজ ইবনুল আদবার (রহিমাহুল্লাহ) তার মায়ের বিছানা বিছিয়ে দিতেন। তার খসখসে হাতের কারণে নিজেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যেতেন। বিছানায় কিছু আছে ভেবে বারবার ঝাড়তেন, নিজে শুয়ে পড়তেন। এভাবে যখন সেখানে কোনোকিছু না থাকার বিষয়ে পূর্ণ আশ্বস্ত হতেন, তখন তিনি তার মাকে শোয়াতেন।[৯৮]
৮৭. সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি সফর থেকে ফিরে তার মাকে সালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেল। মা সালাতে দাঁড়িয়ে আছেন আর সে তাঁর সাথে দেখা না করেই অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন—এতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। এদিকে তার মা-ও ছেলের অবস্থা টের পেয়ে সাওয়াবের আশায় সালাত দীর্ঘ করতে থাকেন।[৯৯]
৮৮. উমর ইবনু যার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'তাঁর ছেলের ইন্তিকালের পর এক ব্যক্তি তাঁর প্রতি ছেলের সদাচারের কথা জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেন, 'দিনের বেলা সে কখনও আমার সামনে হাঁটেনি এবং রাতের বেলা কখনও আমার পেছনে থাকেনি। আর আমাকে নিচে রেখে কখনও সে ছাদের ওপর ওঠেনি।[১০০]
৮৯. ফাদল ইবনু ইয়াহইয়া (রহিমাহুল্লাহ) তার বাবার প্রতি অত্যন্ত সদাচারী ছিলেন। তার বাবা ইয়াহইয়া (রহিমাহুল্লাহ) সবসময়ই গরম পানি দিয়ে ওজু করতেন। একবার তিনি কারাগারে থাকাকালে সেখানকার কারা-পর্যবেক্ষক রাতের বেলায় (আগুন জ্বালানোর জন্য) কাঠখড়ি আনতে বারণ করে দিল। তখন তার বাবা ঘুমিয়ে গেলে
তিনি পানির পাত্র বাতির আগুনে তাপ দিতেন। এভাবে সকাল পর্যন্ত পাত্র হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকতেন। একদিন কারা-পর্যবেক্ষক বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পরবর্তী রাতে ঘোষণা করল—‘জেলে রাতের বেলা বাতি জ্বালানো নিষেধ। তখন ফাদল (রহিমাহুল্লাহ) পানির পাত্র লেপের সাথে জড়িয়ে রাখতেন। সকাল পর্যন্ত এভাবে রাখার ফলে পানি কিছুটা গরম হতো।[১০১]

টিকাঃ
৮০. ইবনু আবিদ দুনইয়া, মাকারিমুল আখলাক, ২২৩。
৮১. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, ৩০;, বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১/৫৬。
৮২ ইবনু সা'দ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ৪/৭০。
৮৩. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ, ৩৪।
৮৪. মা-বাবার সাথে পানাহার করা দোষের কিছু নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি আরও ভালো। মা-বাবা এতে খুশি হোন। এই ঘটনাতে আলি ইবনুল হুসাইন (রহিমাহুল্লাহ)-এর অতি উচ্চ মা-সেবার নমুনা আমরা দেখতে পেলাম। এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয় হলো, মা-বাবার যাতে কোনও ধরনের কষ্ট বা অসম্মান না হয় সেদিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। (অনুবাদক)
৮৫. আলি সা'দ, সুলুকুস সালিক লিন নাজাতি মিনাল মাহালিক, ৩৮。
৮৬. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১৪১।
৮৭. যুবাইর ইবনু বাক্কার, জামহারাতু নাসাবি কুরাইশ ওয়া আখবারুহা, ২৯৫।
৮৮. সূরা নাহল, ১৬: ৯৬।
৮৯. ইবনু হাজার, আল-মাতালিবুল আলিয়া, ১১/৩৫০。
৯০. সূরা নাহল, ১৬: ৯৬।
১১. ইয়াহইয়া ইবনু হুসাইন শাজারি, কিতাবুল আমালি, ২/১৯৫。
৯২. বাইহাকি শুআবুল ঈমান, ৭৯২২。
৯৩. ইবনু আবিদ দুনইয়া, মাকারিমুল আখলাক, ২২৭。
৯৪. ইবনু সা'দ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ৫/৪১৮。
৯৫. আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৩/৩৯; ইসমাঈল আসবাহানি, সিয়ারুস সালাফিস সালিহীন, ৮৬৯。
৯৬. আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৫/৪২; ইবনুল জা'দ, আল-মুসনাদ, ৯০৬。
৯৭. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৫৪৫; ইবনু সা'দ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ১/১৯১। অর্থাৎ তিনি সাধারণ নফল সালাতের চেয়ে মায়ের খেদমতকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। কারণ এটিও অনেক বড়ো সাওয়াবের কাজ। (অনুবাদক)
৯৮. ইবনু আবিদ দুনইয়া, মাকারিমুল আখলাক, ২২৬; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ১২/২১২。
৯৯. ইবনু আবিদ দুনইয়া, মাকারিমুল আখলাক, ২৩২; মিযযি, তাহযীবুল কামাল, ৭/৩৭৮। অর্থাৎ তিনি সালাত লম্বা করার কারণে ছেলের প্রতীক্ষার প্রহরও লম্বা হয়। যার ফলে সে অধিক সাওয়াবের অধিকারী হবে। (অনুবাদক)
১০০. মিযযি, তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, ২/৫১১。
১০১. ইবনু কুতাইবা, দীনাওয়ারি, ৩/১১২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00