📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 মাতাপিতার কতটুকু পরিমাণ খেদমত করা জরুরি?

📄 মাতাপিতার কতটুকু পরিমাণ খেদমত করা জরুরি?


মাতাপিতা কোনও হারাম কাজের নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আদেশের আনুগত্য করা জরুরি। নফল সালাতের ওপর তাদের আদেশ পালনকে প্রাধান্য দেওয়া। তারা যে-কাজ থেকে নিষেধ করেন তা থেকে দূরে থাকা। তাদের ব্যয়ভার বহন করা। তাদের ইচ্ছেগুলো পূরণ করা। তাদের বেশি বেশি সেবা করতে থাকা। তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণে মনোযোগী হওয়া ইত্যাদি। এগুলো হলো পিতামাতার প্রতি সন্তানের আচরণ-পদ্ধতি। এমনিভাবে সে মাতাপিতার আওয়াজের ওপর নিজের আওয়াজকে উঁচু করবে না। তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে না। তাদের নাম ধরে ডাকবে না। তাদের পেছন পেছন চলবে, আগ বাড়িয়ে তাদের সামনে চলতে থাকবে না এবং তাদের থেকে অপছন্দনীয় কিছু প্রকাশ পেলে সে বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করবে।
২৪. তলক ইবনু আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَوْ أَدْرَكْتُ وَالِدَيَّ أَوْ أَحَدَهُمَا وَقَدِ افْتَتَحْتُ صَلَاةَ الْعِشَاءِ فَقَرَأْتُ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ فَدَعَتْنِي أَتَيْ تَقُوْلُ : يَا مُحَمَّدُ لَقُلْتُ لَبَيْكِ
"আমি আমার মাতাপিতার উভয়কে বা তাদের একজনকে যদি জীবিত পেতাম আর ইশার সালাত আরম্ভ করে সূরা ফাতিহা শুরু করার পর আমার মা আমাকে 'মুহাম্মাদ' বলে ডাক দিতেন তবুও আমি 'লাব্বাইক' বলে তাঁর ডাকে সাড়া দিতাম।"[৩১]
২৫. আবূ গাসসান দব্বী একবার 'হাররা' নামক স্থানে হাঁটতে বের হলো। তখন তার বাবা তার পেছনে ছিল। পথিমধ্যে আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার পেছনে হাঁটছেন ইনি কে?'
সে উত্তর দিল, 'তিনি আমার বাবা।'
আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) তখন তাকে বললেন, 'তুমি সঠিক পন্থা অবলম্বন করোনি এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমলও করোনি। পিতার আগে আগে কখনও হাঁটবে না। বরং তাঁর ডানে বা বামে হাঁটবে। তোমার এবং তাঁর মাঝে অন্য কাউকে বিছিন্নতা তৈরি করার সুযোগ দিবে না। যেই (গোশতযুক্ত) হাড্ডির দিকে তিনি তাকিয়েছেন তুমি তা ধরবে না। হতে পারে তা খেতে তাঁর মন চেয়েছে। তুমি তোমার পিতার দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে না। তিনি বসার আগে তুমি বসবে না। এবং তিনি ঘুমিয়ে পড়ার আগে তুমি ঘুমাবে না।'
২৬. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) একবার দুইজন লোককে দেখে তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি তোমার কে?' সে বলল, 'ইনি আমার বাবা।' তিনি বললেন, 'তুমি তাঁকে নাম ধরে ডাকবে না, তাঁর সামনে সামনে হাঁটবে না এবং তাঁর আগে বসবে না। [৩৩]
২৭. তয়সালা ইবনু মাইয়্যাস (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে বললাম, 'আমার মা আমার সঙ্গে থাকেন।' তিনি বললেন,
'আল্লাহর শপথ! যদি তুমি তাঁর সাথে নরমভাষায় কথা বলো এবং তাঁকে ভালোভাবে খাবার খাওয়াও, তবে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে; যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো।'[৩৪]
২৮. উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'কুরআনে এসেছে,
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ
"তুমি তোমার বিনয়ের ডানা তাদের দু'জনের জন্য নত করে দাও।"[৩৫] এর মানে হলো-তারা দু'জন যা পছন্দ করেন সাধ্যমতো তা তাদের নিকট পৌঁছান থেকে বিরত থেকো না।[৩৬]
২৯. তয়সালা ইবনু আলি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, 'মাতাপিতার কান্নার কারণ হওয়া-অবাধ্যতা ও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।'[৩৭]
৩০. হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)-কে মাতাপিতার সাথে সদাচার করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'তুমি নিজের সম্পদ থেকে তাদের জন্য খরচ করবে এবং পাপকাজ ছাড়া যাবতীয় বিষয়ে তাদের আনুগত্য করবে।[৩৮]
৩১. সাল্লাম ইবনু মিসকীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি একবার হাসান (রহিমাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করলাম, 'একজন ব্যক্তি কি তার মা-বাবাকে ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে পারবে?' উত্তরে তিনি বললেন, 'যদি তারা তা গ্রহণ করে, তাহলে পারবে। আর যদি তারা তা অপছন্দ করে, তাহলে তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিবে।[৩৯]
৩২. আবদুস সামাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি ওয়াহাব (রহিমাহুল্লাহ)-কে বলতে শুনেছি-'ইনজীল কিতাবে আছে, মাতাপিতার সেবার মূল হলো-তাদের জন্য
যথাযথ খরচ করা ও নিজ সম্পদ থেকে তাদেরকে খাবার খাওয়ানো।'
৩৩. আওয়াম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'মুআযযিন সালাতের জন্য আযান দিচ্ছে এমন সময় যদি আমার পিতা ডাক দেয় তাহলে কী করব?'
জবাবে তিনি বললেন, 'আগে তোমার পিতার আহ্বানে সাড়া দিবে।'[৪০]
৩৪. আবদুল্লাহ ইবনু আওন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মাতাপিতার দিকে তাকিয়ে থাকাও ইবাদাত।[৪১]

টিকাঃ
৩১. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৮১, দঈফ।
৩২. হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮/১৫১।
৩৩. আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ১১/১৩৮; হান্নাদ, আয-যুহদ, ২/৪৭৮。
৩৪. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১/৪৪১।
৩৫. সূরা ইসরা, ১৭:২৪।
৩৬. তাবারি, তাফসীর, ১৪/৫৫০; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ২৫৪১২; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৯।
৩৭. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩১।
৩৮. আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ৫/১৭৬; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/২৬১।
৩৯. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ২০১。
৪০. হায়াদ, আয-যুহদ, ৯৭০, ৯৭১।
৪১. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৫৯, ৭৮৬০।

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 খেদমত পাওয়ার ক্ষেত্রে মা সবার আগে

📄 খেদমত পাওয়ার ক্ষেত্রে মা সবার আগে


৩৫. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল,
يَا رَسُولَ اللهِ : أَيُّ النَّاسِ أَحَقُّ مِنِّي بِحُسْنِ الصُّحْبَةِ؟
'হে আল্লাহর রাসূল! কোন মানুষটি আমার থেকে সদাচার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখে?'
আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন, أُمُّكَ 'তোমার মা।'
সে জিজ্ঞেস করল, ثُمَّ مَن؟ 'এরপর কে?'
তিনি বললেন, أُمُّكَ 'এরপর তোমার মা।'
সে আবার জিজ্ঞেস করল, ثُمَّ مَن؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, أُمُّكَ 'তারপর তোমার মা।'
সে আবার জিজ্ঞেস করল, ثُمَّ مَن؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أبوك 'তারপর তোমার বাবা।[৪২]
৩৬. বাহ্য ইবনু হাকীম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'আমি বললাম, يَا رَسُوْلَ اللَّهِ : مَنْ أَبَرُّ؟ 'হে আল্লাহর রাসূল! কে সবচেয়ে বেশি খেদমত পাওয়ার অধিকার রাখে?'
তিনি বললেন, أُمَّكَ 'তোমার মা।'
আমি বললাম, ثُمَّ مَنْ؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أُمَّكَ 'তারপর তোমার মা।'
আমি বললাম, ثُمَّ مَنْ؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أُمَّكَ 'তারপর তোমার মা।'
আমি বললাম, ثُمَّ مَنْ؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أَبَاكَ ثُمَّ الْأَقْرَبَ فَالْأَقْرَبَ 'তারপর তোমার বাবা। তারপর একের পর এক নিকটাত্মীয়। [৪৩]
৩৭. মিকদাম ইবনু মা'দীকারিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ اللهَ يُوْصِيْكُمْ بِأُمَّهَاتِكُمْ، إِنَّ اللَّهَ يُوْصِيْكُمْ بِأُمَّهَاتِكُمْ، إِنَّ اللَّهَ يُوْصِيْكُمْ بِآبَائِكُمْ، إِنَّ اللَّهَ يُؤْصِيْكُمْ بِالْأَقْرَبِ فَالْأَقْرَبِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বাবাদের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে পর্যায়ক্রমে নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন।"[৪৪]
৩৮. মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِذَا دَعَاكَ أَبَوَاكَ وَأَنْتَ تُصَلِّي، فَأَجِبْ أُمَّكَ، وَلَا تُجِبْ أَبَاكَ
"যদি সালাতরত অবস্থায় তোমার বাবা-মা তোমাকে ডাকে; তাহলে মায়ের ডাকে সাড়া দিবে আর বাবার ডাকে সাড়া দিবে না।"[৪৫]
৩৯. মাকহুল (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'তুমি সালাতে থাকাবস্থায় যদি তোমার মা তোমাকে ডাকে তাহলে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ো। আর যদি বাবা ডাকে তাহলে সাড়া দিয়ো না; যতক্ষণ না তোমার সালাত শেষ হচ্ছে।'[৪৬]
৪০. আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامِ الْأُمَّهَاتِ
"জান্নাত-মায়ের পায়ের নিচে।"[৪৭]
৪১. আবূ আবদির রহমান সুলামি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক ব্যক্তি আবুদ দারদা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এসে বলল, 'আমার স্ত্রী আমার চাচাতো বোন হয়। তাকে আমি খুব ভালোবাসি। আমার মা তাকে তালাক দেওয়ার জন্য আমাকে আদেশ দিচ্ছেন।'
তখন আবুদ দারদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'আমি তোমাকে তালাক দিতেও বলব না, আবার তোমার মায়ের অবাধ্যতা করার নির্দেশও দেবো না। বরং আমি তোমাকে একটা হাদীস শোনাব, যা আমি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন,
إِنَّ الْوَالِدَةَ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ فَإِنْ شِئْتَ فَأَمْسِكْ وَإِنْ شِئْتَ فَدَعْ
"নিশ্চয়ই মা হলেন জান্নাতের মধ্য-দরজা। সুতরাং যদি তুমি চাও তাঁকে ধরে রাখো। আর যদি চাও তাঁকে ছেড়ে দাও।"[৪৮]
৪২. মুহাম্মাদ ইবনু তালহা তার পিতা থেকে তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, 'জাহিমা সুলামি (রদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে জিহাদের অনুমতি চাইতে আসলেন। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তোমার মা বেঁচে আছেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' নবিজি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
فَالْزَمْهَا فَإِنَّ عِنْدَ رِجْلَيْهَا الْجَنَّةَ
'তাঁর সাথেই নিজেকে জড়িয়ে রাখো। কারণ তাঁর দু'পায়ের কাছেই জান্নাত রয়েছে।'[৪৯]
৪৩. আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'আয়িশা (রদিয়াল্লাহ আনহা)-এর নিকট এক মহিলা কিছু চাইতে এলে তিনি তাকে তিনটি খেজুর দান করেন। সেই মহিলা দুইটি খেজুর তাঁর দুই সন্তানকে দিয়ে বাকিটা নিজের জন্য রেখে দিল। কিন্তু যখন সন্তানেরা খেজুর দুটি খাওয়া শেষ করে মায়ের দিকে তাকাল, মা তখন ওই একটি খেজুরকে দুইভাগ করে দুই সন্তানকে অর্ধেক করে দিলেন। রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসার পর আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বিষয়টি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জানালেন। তিনি তখন বললেন,
لَقَدْ رَحِمَهَا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ بِرَحْمَتِهَا صَبِيَّيْهَا
"নিজের সন্তানের প্রতি দয়া করার কারণে আল্লাহ তাআলাও তাকে দয়া করেছেন।"[৫০]
৪৪. আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাছে এসে বলল, 'আমি এক মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সে আমাকে বিবাহ করতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু আরেক ব্যক্তি প্রস্তাব দিলে ঠিকই সে তাকে বিবাহ করে নেয়। এতে আমার আত্মমর্যাদাবোধে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। তাই আমি তাকে হত্যা করে ফেলি। আমার কি তাওবা করার কোনও সুযোগ আছে?'
ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার মা কি বেঁচে আছেন?' সে বলল, 'না, বেঁচে নেই।' তখন তিনি তাকে বললেন, 'হ্যাঁ। তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা করো এবং সাধ্যানুযায়ী তাঁর নৈকট্য হাসিল করার আপ্রাণ
চেষ্টা করো।'
আতা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'পরে আমি ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর নিকট জানতে চাইলাম, 'আপনি কেন তার মায়ের বেঁচে থাকার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন?'
তিনি বললেন, 'কারণ হলো, মায়ের খেদমত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনও আমলের কথা আমার জানা নাই।'[৫১]
৪৫. আবূ নাওফাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক ব্যক্তি উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এসে বলল, 'আমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি।' তিনি জানতে চাইলেন, 'ইচ্ছা করে নাকি ভুলে? তোমার পিতামাতার কেউ কি বেঁচে আছেন?' সে বলল, 'হ্যাঁ। আছেন।' উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'মা বেঁচে আছেন?' সে জানাল, 'যিনি বেঁচে আছেন তিনি আমার বাবা।' তিনি বললেন, 'যাও, গিয়ে তাঁর সেবা করো এবং তাঁর প্রতি সদাচার করো।' সে চলে যাবার পর উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'সেই সত্তার শপথ! যার হাতে উমরের প্রাণ, যদি তার মা বেঁচে থাকত আর সে তাঁর সেবা করত এবং তাঁর প্রতি ভালো আচরণ করত তাহলে আমি অনেক আশাবাদী হতাম যে, তাকে জাহান্নামের আগুন কখনও স্পর্শ করতে পারত না।[৫২]
৪৬. হাসান বাসরি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তিন ভাগের দুই ভাগ সেবা পাওয়ার হকদার হলেন মা আর বাবা তিন ভাগের এক ভাগ।[৫৩]
৪৭. ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তিন ভাগের দুই ভাগ সেবা পাওয়ার হকদার হলেন মা।'[৫৪]
৪৮. ইয়াকূব ইজলি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আতা (রহিমাহুল্লাহ)-কে বললাম, 'বৃষ্টির রাতে জামাআতে সালাত আদায় করতে যেতে আমার মা আমাকে বাধা দেন।' তিনি বললেন, 'তাঁর আনুগত্য করো।'[৫৫]
৪৯. আতা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'এক ব্যক্তির মা কসম করল—যেন তার ছেলে ফরজ সালাত ছাড়া অন্য কোনও সালাত আদায় না করে এবং রমাদান মাস ছাড়া অন্য কোনও সময় সিয়াম না রাখে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আতা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সে যেন তার মায়ের কথা মেনে চলে।' [৫৬]
৫০. হাসান বাসরি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যদি কোনও ব্যক্তির বাবা তার সম্পর্কে এক রকম কসম করে আর তার মা পেশ করে এর বিপরীত বিষয়ে, তাহলে সন্তান মায়ের কথাই মান্য করবে।' [৫৭]
৫১. রিফাআ ইবনু ইয়াস (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হারিস উকালি (রহিমাহুল্লাহ)-কে তার মায়ের জানাযায় কাঁদতে দেখেছি। তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'আপনি কান্না করছেন?' তিনি বললেন, 'আমি কেন কাঁদব না? আমার যে জান্নাতের একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেল!'[৫৮]
৫২. হুমাইদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইয়াস ইবনু মুআবিয়া (রহিমাহুল্লাহ)-এর মা মারা গেলে তিনি কান্না করছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি কান্না করছেন কেন?' তিনি বললেন, 'আমার জান্নাতের দুটি দরজা খোলা ছিল। আজকে তার একটি বন্ধ হয়ে গেল।' [৫৯]
৫৩. কা'ব ইবনু আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'একবার মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, 'হে আমার রব! আমাকে উপদেশ দিন।' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'আমি তোমাকে তোমার মায়ের ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছি। কারণ তিনি তোমাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন।' মূসা (আলাইহিস সালাম) আবার বললেন, 'তারপর?' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'তারপর তোমার বাবার ব্যাপারে তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি।' [৬০]
৫৪. আতা (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) জানতে চেয়েছিলেন, 'হে প্রভু! তুমি আমাকে কী উপদেশ দিবে?' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'আমি তোমাকে আমার ব্যাপারে, তারপর তোমার মায়ের ব্যাপারে, তারপর তোমার বাবার ব্যাপারে উপদেশ দেবো।'[৬১]
৫৫. হিশাম ইবনু হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)- কে বললাম, 'যখন আমি কুরআন শিক্ষা করি তখন আমার মা আমার জন্য রাতের খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।' তিনি বললেন, 'তুমি তোমার মায়ের সাথে রাতের খাবার খাবে। কারণ এর মাধ্যমে তাঁর চোখ জুড়াবে। আর এ কাজ আমার কাছে নফল হাজ্জ করার চেয়েও বেশি প্রিয়।'[৬২]
৫৬. বিশর হাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কোনও সন্তান যদি তার মায়ের এতটা কাছে অবস্থান করে যে, মা তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পান—তাহলে এটি (আমার নিকট) আল্লাহর রাস্তায় তলোয়ার দিয়ে লড়াই করার চেয়েও অধিক উত্তম। আর মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকা সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।'[৬৩]
৫৭. উমারা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, 'তুমি কি জানো না যে, মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকাও ইবাদাত? তাহলে ভাবো, তাঁর সেবা করার মর্যাদা কেমন হতে পারে! '[৬৪]

টিকাঃ
৪২. বুখারি, ৫৯৭১; মুসলিম, ২৫৪৮。
৪৩. আবু দাউদ, ৫১৩৯; তিরমিযি, ১৮৯৭, হাসান。
৪৪. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৬০; ইবনু মাজাহ, ৩৬৬১, সহীহ。
৪৫. হান্নাদ, আয-যুহদ, ৯৭১।
৪৬. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৮৩।
৪৭. খতীব বাগদাদি, আল-জামি' লি আখলাকির রাবী, ১৭০২; দাওলাবি, আল-কুনা ওয়াল আসমা, ১৯১১; সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৬৪১২; তরভূশি, বিররুল ওয়ালিদাইন, ৭০।
৪৮. তিরমিযি, ২০৬৯; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫২; আহমাদ, ৫/১৯৬, সহীহ। মা-বাবা যদি শারঈ কোনও কারণ ছাড়া অনৈতিকভাবে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলে, তবে সেই কথা মান্য করা সন্তানের জন্য জরুরি নয়। বিস্তারিত বিবরণ আগে গিয়েছে। (অনুবাদক)
৪৯. নাসাঈ, আস-সুনান, ৩১০৪; ইবনু মাজাহ, ২৭৮১, হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫১, সহীহ。
৫০. বুখারি, ১৪১৮, ৫৯৯৫; মুসলিম, ২৬২৯。
৫১. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৯১৩; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১/৩৭。
৫২. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৪; ইবনু রজব হাম্বালি, জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ২/৫১৯。
৫৩. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৬২; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ২৫৪০১。
৫৪. ইবনু ওয়াহব, আল-জামি', ১৯৭。
৫৫. হুসাইন ইবনু হারব, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৬৭。
৫৬. ইবনু রজব হাম্বালি, ফাতহুল বারি, ৯/৩১৯-৩২০।
৫৭. ইবনু রজব হাম্বালি, ফাতহুল বারি, ৯/৩১৯।
৫৮. আলাউদ্দীন মুগলতাঈ, ইকমালু তাহযীবিল কামাল, ৩/৩২৯।
৫৯. আবু নুআইম, হিলইয়া, ৩/১২৩। অর্থাৎ তার মা জান্নাতের একটি দরজা আর বাবা আরেকটি দরজা। দু'জনেই জীবিত ছিলেন মানে উভয় দরজা খোলা ছিল। যখন একজন ইন্তিকাল করলেন তখন একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেল। (অনুবাদক)
৬০. আহমাদ ইবনু হাম্বাল, আয-যুহদ, ৩৫৮。
৬১. ইবনু ওয়াহব, আল-জামি', ২০৪。
৬২. খতীব বাগদাদি, আল-জামি' লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামি', ২/২৩২。
৬৩. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৪৭৪。
৬৪. হুসাইন ইবনু হারব, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১৫。

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 বাবার অবদানের প্রতিদান দিতে সন্তান অপারগ

📄 বাবার অবদানের প্রতিদান দিতে সন্তান অপারগ


৫৮. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا يَجْزِي وَلَدٌ وَالِدَهُ، إِلَّا أَنْ يَجِدَهُ مَمْلُوكًا، فَيَشْتَرِيَهُ، فَيُعْتِقَهُ
"কোনও সন্তান তার বাবার (অবদানের) প্রতিদান দিতে পারবে না। তবে এই বিষয়টি ছাড়া যে, সে তাকে গোলাম অবস্থায় পেয়ে ক্রয় করে স্বাধীন
সন্তান যদি তার দাস-বাবাকে ক্রয় করে তাহলে কেবল ক্রয় করার মাধ্যমেই তিনি স্বাধীন হয়ে যান। আযাদ করার ব্যাপারে সন্তানের মুখে কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। এটি ইমাম দাঊদ যাহিরি ছাড়া বাকি সমস্ত ইমামগণের অভিমত।[৬৬]
সুতরাং উপরোক্ত হাদীসটির দুইটি ব্যাখ্যা হতে পারে:
১. এই হাদীসে বাবার প্রতিদানস্বরূপ বাবাকে আযাদ করতে সন্তানের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; যদিও সন্তান বাবাকে আযাদ করতে পারে না, তার কারণ হলো, এ ক্ষেত্রে সন্তান তার বাবাকে আযাদ করার মাধ্যম হয়। কেননা শারীআতের বিধান অনুযায়ী নিজ পিতাকে ক্রয় করার সাথে সাথেই তিনি আযাদ হয়ে যান।
২. এটি আগেরটির তুলনায় আরেকটু সূক্ষ্ম। এখানে বোঝানো হচ্ছে যে, বাবার প্রতিদান দেওয়া একটি অসম্ভব ব্যাপার। হাদীসে বলা হয়েছে, সন্তান যদি বাবাকে গোলাম অবস্থায় পেয়ে আযাদ করে দেয় তাহলেই কেবল বাবার প্রতিদান আদায় হবে। কিন্তু সন্তান তো বাবাকে কখনও আযাদ করতেই পারে না; কারণ ক্রয় করার সাথে সাথে তিনি আপনা-আপনিই আযাদ হয়ে যান। সুতরাং সন্তানের পক্ষে বাবার প্রতিদান দেওয়া কখনই সম্ভব নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَا يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمَّ الْخَيَّاطِ
"তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে।"[৬৭]
আর এটা জানা কথা যে, সুইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা একটি অসম্ভব বিষয়। ফলে কাফেরদের জান্নাতে প্রবেশ করাও কখনও সম্ভব নয়।

টিকাঃ
৬৫. মুসলিম, ১৫১০; আবূ দাউদ, ৫১৩৭।
৬৬. ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, ৪/৭৯; খতীব শিরবীনি, মুগনিল মুহতাজ, ৪/৪৯৯।
৬৭. সূরা আ'রাফ, ০৭:৪০।

📘 সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত > 📄 মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করার পুরস্কার

📄 মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করার পুরস্কার


৫৯. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'একদা তিন ব্যক্তি হেঁটে
চলছিল। এমন সময় প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে তারা এক পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করল।
হঠাৎ ওপর থেকে একটি পাথর গড়িয়ে এসে তাদের গুহার মুখ বন্ধ করে দিল। তাদের একজন আরেকজনকে বলল, 'তোমরা যেসব আমল করেছ, তার মধ্যে উত্তম আমলের ওসীলা দিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করো; হয়তো তিনি পথ বের করে দিবেন।'
তখন তাদের একজন বলল, 'হে আল্লাহ! আমার পিতামাতা অতিশয় বৃদ্ধ ছিলেন, আমি (রোজ সকালে) মেষ চরাতে বের হতাম। তারপর ফিরে এসে দুধ দোহন করতাম এবং এ দুধ নিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হতাম আর তারা তা পান করতেন। তারপর আমি আমার ছোটো ছোটো সন্তানদের ও স্ত্রীকে পান করতে দিতাম। একরাত্রে আমি আটকা পড়ে যাই। পরে যখন আমি ফিরে এলাম তখন দেখি তারা দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। ফলে আমি তাদেরকে জাগানো পছন্দ করলাম না। তখন বাচ্চারা আমার পায়ের কাছে (ক্ষুধায়) চিৎকার করছিল। এ অবস্থায়ই ফজর হয়ে গেল। হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে, আমি তা শুধুমাত্র তোমার সন্তুষ্টি লাভের আশায় করেছিলাম, তাহলে তুমি আমাদের জন্য গুহার মুখ এতটুকু ফাঁকা করে দাও, যাতে আমরা আকাশ দেখতে পারি।'
আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করলেন। ফলে তাদের জন্য এতটুকু ফাঁকা করে দিলেন যে, তারা আকাশ দেখতে পেল।'
ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রহিমাহুমাল্লাহ) স্ব স্ব হাদীসগ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন।[৬৮]
৬০. আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'একবার আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। (স্বপ্নে) দেখলাম আমি জান্নাতে আছি। সেখানে একজন ক্বারীকে তিলাওয়াত করতে শুনলাম। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে আমাকে জানানো হলো, সে হারিসা ইবনুন নু'মান। তারপর আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
كَذَاكَ الْبِرُّ كَذَاكَ الْبِرُّ، وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِأُمِّهِ
"সেবার প্রতিদান এমন-ই। সেবার প্রতিদান এমন-ই। সে তাঁর মায়ের সবচেয়ে বেশি সেবাকারী ছিল।”[৬৯]
৬১. আবুদ দারদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْبَابُ الْأَوْسَطُ مِنَ الْجَنَّةِ مَفْتُوْحُ لِبِرِّ الْوَالِدَيْنِ، فَمَنْ بَرَّهُمَا، فُتِحَ لَهُ، وَمَنْ عَقَّهُمَا، غُلِقَ دُوْنَهُ
"জান্নাতের মধ্য-দরজাটি মাতাপিতার সেবা করার বিনিময়স্বরূপ উন্মুক্ত থাকবে। যে-ব্যক্তি মাতাপিতার সেবা করবে, তার জন্য এটি খুলে দেওয়া হবে। আর যে তাদের অবাধ্যতা করবে, তার জন্য এটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।" [৭০]
৬২. আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ الْمُطِيعَ لِوَالِدَيْهِ، وَالْمُطِيعَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ، مَعِي فِي أَعْلَى عِلِّيِّينَ
"পিতামাতার আনুগত্যকারী এবং আল্লাহ তাআলার আদেশমান্যকারী আমার সাথে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকবে।”[৭১]
৬৩. কা'ব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'লোকমান (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন, 'প্রিয় ছেলে! পিতামাতা হলো জান্নাতের দরজাসমূহের একটি দরজা। যদি তারা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন তবে তুমি জান্নাতে যাবে। আর তারা যদি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন তবে তোমাকে (জান্নাতে যেতে) বাধাপ্রদান করা হবে।[৭২]
৬৪. হিশাম বর্ণনা করেন হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'আমি হাজ্জ করেছি। আমার মা-ই আমাকে হাজ্জ করার জন্য অনুমতি দিয়েছেন।' তখন তিনি বললেন, 'খাবার খাওয়ার জন্য মায়ের সাথে একবার দস্তরখানে বসা-আমার নিকট তোমার হাজ্জ করার চেয়েও বেশি প্রিয়।[৭৩]
৬৫. মারূফ ইবনুল ফাইরুযান (রহিমাহুল্লাহ) বলতেন, 'মাতাপিতার দিকে তাকানো-ও ইবাদাত।[৭৪]
৬৬. বিলাল খাওওয়াস (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি বানী ইসরাঈলের ময়দানে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো আমার সাথে সাথে কেউ একজন হাঁটছে। আমি বেশ অবাক হলাম। ইলহামের মাধ্যমে আমি জানতে পারলাম যে, তিনি হলেন খাযির (আলাইহিস সালাম)। তাকে আমি বললাম, 'মহাসত্য আল্লাহর কসম করে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কে?'
তিনি জবাব দিলেন, 'তোমার ভাই খাযির।'
আমি বললাম, 'ইমাম শাফিয়ির ব্যাপারে আপনার মতামত কী?'
তিনি বললেন, 'তিনি হলেন আওতাদ।'
আমি জানতে চাইলাম, 'আর ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল?'
তিনি বললেন, 'তিনি সিদ্দীক বা সত্যবাদী।'
আমি ফের জানতে চাইলাম, 'আর বিশর হাফী?'
তিনি জানালেন, 'তিনি তাঁর অনুরূপ কাউকে রেখে যাননি।'
আমি বললাম, 'কোন আমলের বদৌলতে আমি আপনার সাক্ষাত লাভ করলাম?'
তিনি জানালেন, 'তোমার মায়ের খেদমত করার কারণে। [৭৫]

টিকাঃ
৬৮. হাদীসের বাকি অংশ হলো—আরেকজন বলল, 'হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, আমার এক চাচাতো বোনকে আমি এত ভালোবাসতাম, একজন পুরুষ একজন নারীকে যত ভালোবাসতে পারে। ফলে আমি তাকে পেতে চাইলাম। তখন সে বলল, 'যতক্ষণ না আমাকে একশ দীনার দেবে, তুমি আমার থেকে তোমার সে চাওয়া পূরণ করতে পারবে না।' আমি চেষ্টা করে খুব দ্রুতই তা সংগ্রহ করি। তারপর তার সাথে সাক্ষাত করে যখন আমি আমার উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য অগ্রসর হলাম, তখন সে বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় করো। বৈধ অধিকার ছাড়া মাহরকৃত বস্তুর সীল ভেঙো না।'
এতে আমি তাকে ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে যাই। হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে, আমি তা তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই করেছি, তবে আরও একটু ফাঁকা করে দাও। তখন তাদের (গুহার মুখের) দুই-তৃতীয়াংশ খুলে গেল।
এরপর অপরজন বলল, হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, এক ফারাক (পরিমাণ) শস্যদানার বিনিময়ে আমি একজন মজুর রেখেছিলাম। যখন সে কাজ থেকে ফারেগ হয় তখন আমি তাকে পারিশ্রমিক হিসেবে তা দিতে গেলে সে গ্রহণ না করেই চলে যায়। এরপর আমি সেই শস্যদানা দিয়ে চাষাবাদ করে ফসল উৎপন্ন করি, তা দিয়ে গরু ক্রয় করি এবং রাখাল নিযুক্ত করি। কিছুকাল পরে সেই মজুর এসে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! আমার ওপর জুলুম করো না, আমাকে আমার পাওনা দিয়ে দাও।' আমি বললাম, 'তুমি এই গরুগুলো ও রাখালকে নিয়ে যাও।' সে বলল, 'তুমি কি আমার সাথে উপহাস করছো?' আমি বললাম, 'আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না বরং এসবগুলো তোমার।' অতঃপর সে সবগুলো নিয়ে চলে গেল। 'হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো যে, আমি তোমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই এটি করেছি, তবে আমাদের জন্য অবশিষ্টটুকু উন্মুক্ত করে দাও।' তখন তাদের গুহার মুখ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে গেল।'-বুখারি, ৫৯৭৪; মুসলিম, ২৮৪৩। (অনুবাদক)
৬৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২০১১৯; আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ২০১১৯।
৭০. সুয়ূতি, আল-জামিউল কাবীর, ১০২৭১।
৭১. সুয়ূতি, আয-যিয়াদাত আলাল মাওযুআত, ১৮০, মুনাবি, ফায়যুল কাদীর, ৫৬৭১, এই হাদীসের সনদে ইবরাহীম ইবনু হুদবাহ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। ইমাম নাসাঈ বলেছেন, 'তার হাদীস পরিত্যাজ্য। আবু হাতিম বলেছেন, 'সে মিথ্যাবাদী।'
৭২. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৩২।
৭৩. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৬৩। এখানে নফল হাজ্জের কথা বলা হচ্ছে। (অনুবাদক)
৭৪. খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ৮/৩৬১。
৭৫. আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৯/১৮৭। 'খাযির' শব্দের অর্থ হলো সবুজ। খাযির (আলাইহিস সালাম)-কে খাযির নামে ডাকার কারণ বর্ণনা করে রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 'খাযিরের নাম এ জন্যই খাযির রাখা হয়েছে যে, একবার তিনি শুকনা সাদা মাটির ওপর বসলে তাঁর নিচে মাটিতে সবুজ-শ্যামলিমার জন্ম হয়।' (বুখারি, ৩৪০২; তিরমিযি, আস-সুনান, ৩১৫১।)
তিনি জীবিত নাকি মৃত — এই বিষয়ে অনেক আগে থেকেই উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য চলে আসছে। ইমাম নববি (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর 'তাহযীবুল আসমা (১/১৭৭)' গ্রন্থে খাযির (আলাইহিস সালাম)-এর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, 'তাঁর জীবিত ও মৃত হওয়া নিয়ে মতপার্থক্য আছে। অধিকাংশ আলিম বলেছেন, তিনি জীবিত। আমাদের মাঝেই বিদ্যমান। সৃফি ও আধ্যাত্মিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট এটি একটি সর্বসম্মত বিষয়। তাকে দেখা, তাঁর সাথে মিলিত হওয়া, তাঁর থেকে ইলম নেওয়া, তাঁর সাথে প্রশ্নোত্তর করা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর উপস্থিত হওয়ার ঘটনা অগণিত এবং এতই প্রসিদ্ধ যে, সেগুলো উল্লেখ করে দেখানোরও প্রয়োজন হয় না।' শাইখ আবু উমর ইবনুস সালাহ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ফতোয়াতে উল্লেখ করেছেন, 'অধিকাংশ আলিম ও নেককার বান্দাদের মতে তিনি জীবিত। অন্যরাও তাদের সাথে একই মত পোষণ করেন। অবশ্য কিছু মুহাদ্দিস বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।'
যারা তাঁর জীবিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন, তাদের মধ্যে রয়েছে হাসান, ইমাম বুখারি, আবু বকর ইবনুল আরাবি (রহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ।
এটি একটি মতানৈক্যপূর্ণ বিষয় হওয়ায় সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই। কেউ বিশ্বাস করতে পারে, আবার নাও করতে পারে। এর ওপর ঈমান-আমল কোনোটাই নির্ভরশীল নয়। কবরেও এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে না। আর তিনি যদি জীবিত থেকেও থাকেন তাহলে তাঁরও শারীআতে মুহাম্মাদিয়ার অনুগত হওয়া বাধ্যতামূলক। সুতরাং যদি কেউ খাযির (আলাইহিস সালাম)-এর দোহাই দিয়ে শারীআতের কোনও কিছুতে পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করে বা তাঁকে দলীল বানিয়ে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কিছু করার কথা বলে, তবে তা নিঃসন্দেহে প্রত্যাখ্যাত হবে। (অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00