📄 মাতাপিতার সেবায় বয়স বৃদ্ধি পায়
১৯. সাহল ইবনু মুআয (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ بَرَّ وَالِدَهُ طُولِي لَهُ، زَادَ اللَّهُ فِي عُمْرِهِ
"তার জন্য সুসংবাদ! যে মাতাপিতার সেবা করল। আল্লাহ তাআলা তার হায়াত বাড়িয়ে দিবেন।” [২৬]
২০. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
يَا ابْنَ آدَمَ، أَبْرِرْ وَالِدَيْكَ، وَصِلْ رَحِمَكَ، يُيَسَّرْ لَكَ يُسْرُكَ، وَيُمَدَّ لَكَ فِي عُمْرِكَ، وَأَطِعْ رَبَّكَ تُسَمًّى عَاقِلًا، وَلَا تَعْصِهِ فَتُسَمًّى جَاهِلًا
“হে আদম সন্তান! মাতাপিতার সেবা করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো; তাহলে তোমার জন্য (সবকিছু) সহজ করে দেওয়া হবে এবং তোমার বয়স বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তুমি তোমার রবের আনুগত্য করো; তাহলে বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিতি পাবে। তুমি আল্লাহর অবাধ্যতা করো না; তাহলে মূর্খ হিসেবে আখ্যায়িত হবে।”[২৭]
২১. সালমান (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ "মাতাপিতার সেবা করলেই কেবল বয়স বৃদ্ধি পায়।”[২৮]
২২. আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَحَبُّ أَنْ يُمِدَّ اللهُ فِي عُمْرِهِ، وَيَزِيدَ فِي رِزْقِهِ، فَلْيَبَرَّ وَالِدَيْهِ، وَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
“যে-ব্যক্তি চায় আল্লাহ তাআলা তার বয়স ও রিযক বাড়িয়ে দিক, সে যেন তার মাতাপিতার সেবা করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।”[২৯]
২৩. মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'একবার খলীফা মানসূর আমার কাছে সংবাদ পাঠিয়ে আমাকে দ্রুত তলব করলেন। আমি সওয়ারিতে চড়ে বসলাম। সে সময় ক্ষুরের শব্দ শুনতে পেয়ে আমি গোলামকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এ কে?' সে বলল, 'আপনার ভাই আবদুল ওয়াহহাব।' এরপর আমরা তাড়াতাড়ি করে সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। রবী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আর মাহদি বারান্দায় বসে ছিল। সেখানে আবদুস সামাদ ইবনু আলি, ইসমাঈল ইবনু আলি, সুলাইমান ইবনু আলি, জা'ফর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আলি, আবদুল্লাহ ইবনু হাসান এবং আব্বাস ইবনু
মুহাম্মাদও উপস্থিত ছিলেন।
রবী বললেন, 'এখানে তোমাদের চাচাতো ভাইদের সাথে বসো।' আমরা তখন বসলাম। তারপর রবী ভেতরে ঢুকে আবার বেরিয়ে এল এবং মাহদিকে বলল, 'ভেতরে যাও। আল্লাহ তোমাকে সংশোধিত করুন।' তারপর বললেন, 'তোমরা সবাই ভেতরে যাও।' আমরা সবাই ভেতরে গেলাম এবং সালাম দিয়ে যার যার আসন গ্রহণ করলাম। খলীফা মানসূর বললেন, 'কালি ও কাগজ নিয়ে আসো।' তখন আমাদের প্রত্যেকের সামনে একটা করে দোয়াত ও কাগজ রাখা হলো। তারপর তিনি আবদুস সামাদ ইবনু আলির দিকে ফিরে বললেন, 'চাচা! আপনার সন্তানদের ও ভাইদেরকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং মাতাপিতার খেদমত সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করুন।' তখন আবদুস সামাদ (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'আমার পিতা আমার দাদা আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْبِرَّ وَالصَّلَةَ لَيُطِيْلَانِ الأَعْمَارَ، وَيُعَمِّرَانِ الدِّيَارَ، وَيُكْثِرَانِ الْأَمْوَالَ، وَلَوْ كَانَ الْقَوْمُ فجارًا
"নিশ্চয়ই মাতাপিতার সেবা করা এবং আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা-বয়স দীর্ঘায়িত করে। (বারাকাহ ও কল্যাণের মাধ্যমে) সমাজ টিকিয়ে রাখে এবং অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধি করে। যদিও তারা পাপাচারী হয়।"
তারপর তিনি বললেন, 'হে আমার চাচা! আরেকটি হাদীস বলুন।' তখন তিনি বললেন, 'আমার পিতা আমার দাদা আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْبِرَّ وَالصَّلَةَ لَيُخَفِّفَانِ سُوءَ الْحِسَابِ يَوْمَ القِيَامَةِ
"নিশ্চয়ই মাতাপিতার সেবা করা এবং আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা-আখিরাতের দিনের কঠিন হিসাবকে সহজ করে।"
তারপর তিনি বললেন, 'হে আমার চাচা! আরেকটি হাদীস বলুন।' তখন তিনি বললেন, 'আমার পিতা আমার দাদা আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'বানী ইসরাঈলের দুই ভাই দুই শহরের বাদশাহ ছিল। তাদের একজন আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষাকারী এবং প্রজাদের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ছিল। আর অপরজন
আত্মীয়দের সাথে মন্দাচারী এবং প্রজাদের ওপর জুলুমকারী ছিল। তাদের যুগে একজন নবি ছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা সেই নবির নিকট এই মর্মে ওহি পাঠালেন যে, সদাচারী ব্যক্তির তিন বছর হায়াত বাকি আছে। আর ওই মন্দাচারী ব্যক্তির ত্রিশ বছর হায়াত বাকি আছে। তখন সেই নবি (আলাইহিস সালাম) দু'জনের প্রজাদের তা জানিয়ে দিলেন। ফলে তারা খুব ব্যথিত হলো, এরপর সন্তানদেরকে তাদের মায়েদের থেকে পৃথক করে দিল, পানাহার ছেড়ে দিল এবং মরুভূমিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করতে লাগল; যাতে তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর দ্বারা আরও বেশি দিন তাদের উপকৃত করেন। আর জুলুমকারীর জুলুম থেকে তাদের রক্ষা করেন।
এভাবে তারা তিনদিন সেখানে অবস্থান করে। তখন আল্লাহ তাআলা সেই নবির কাছে ওহি পাঠালেন যে, 'আমার বান্দাদের সুসংবাদ দাও—তাদের ওপর আমার দয়া হয়েছে। আমি তাদের দুআ কবুল করে নিলাম। ওই জালিম বাদশাহর বাকি ত্রিশ বছরের হায়াত এই ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর জন্য নির্ধারণ করলাম। আর এই ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর বাকি তিন বছরের হায়াত নির্ধারণ করলাম ওই জালিম বাদশাহর জন্য।'
অতঃপর তিন বছর পূর্ণ হতেই সেই দুরাচারী বাদশাহ মারা গেল। আর ন্যায়পরায়ণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী বাদশাহ বেঁচে থাকল আরও ত্রিশ বছর।[৩০]
টিকাঃ
২৬. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ২২, দঈফ; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫৪। আল্লাহ তাআলা মানুষের মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَلَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
"যখন তাদের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় তখন তা একমুহূর্তও আগপিছ করা হয় না।" [সূরা ইউনুস, ১০: ৪৯।] এমনিভাবে অনেক হাদীসের মাধ্যমেও প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের মৃত্যু নির্দিষ্ট সময়ে হয়। তাহলে যেসব হাদীসে বলা হয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার মাধ্যমে কিংবা মাতাপিতার খেদমত করলে বয়স বৃদ্ধি ঘটে—এর দ্বারা উদ্দেশ্য কী? মুহাদ্দিসগণ এর বেশ কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১. এই বৃদ্ধি পাওয়া প্রকৃত অর্থে নয়। অর্থাৎ বয়স বৃদ্ধি পাবে মানে হলো, তার শারীরিক সুস্থতা, রিস্ক ও কাজ- কর্মে অনেক বরকত দেওয়া হবে। ফলে তার জীবন অনেক সুখময় হবে। এটাও একপ্রকারের বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি পরিমাণের দিক দিয়ে নয়, গুণাগুণের দিক দিয়ে। ২. তার মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজন তার কথা আলোচনা করবে, তাকে স্মরণ করবে। ফলে যেন সে মৃত্যুর পরেও বহু বছর তাদের মাঝে বেঁচে রইল। কারণ আত্মীয়-স্বজন মৃত্যুর পর ওই ব্যক্তির কথাই মনে রাখে, যে তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ৩. বিষয়টি প্রকৃত অর্থেই হবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর ফেরেশতাকে জানিয়ে দেন, অমুক ব্যক্তি যদি মা-বাবার সেবা করে বা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে তাহলে তার হায়াত এত বছর আর যদি না করে তাহলে এত বছর। এভাবে ফেরেশতার জ্ঞানানুসারে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা বা মা-বাবার সেবা করার মাধ্যমে তার হায়াতে কম-বেশি ঘটে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই জানেন যে, শেষ পর্যন্ত বান্দা কোনটা করবে এবং তার মৃত্যু কখন হবে। ফলে আল্লাহর ইলমে কোনও পরিবর্তন ঘটে না। বিস্তারিত জানতে দেখুন-আবদুর রহমান মুবারাকপুরি, তুহফাতুল আহওয়াযি, ৬/৯৭; মুনাবি, ফায়যুল কাদীর, ৩৪১৬; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ১০/৪২৯; তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, ৮/৮১। (অনুবাদক)
২৭. ইবনু হাজার, আল-মাতালিবুল আলিয়া, ১৩/৭২০; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৫/২১৭。
২৮. তিরমিযি, ২১৩৯, সহীহ; তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, ৪/১৬৯。
২৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/২২৯; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৬/১৮৫; ইবনু আবিদ দুনইয়া, মাকারিমুল আখলাক, ৮২。
৩০. সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর ওয়া যিয়াদাতুহু, ৩৩৪৭, দঈফ; খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ১/৩৮৫; সুযুতি, আদ-দুররুল মানসূর, ২/৭৬; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ৩৬/২৪৩。
📄 মাতাপিতার কতটুকু পরিমাণ খেদমত করা জরুরি?
মাতাপিতা কোনও হারাম কাজের নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আদেশের আনুগত্য করা জরুরি। নফল সালাতের ওপর তাদের আদেশ পালনকে প্রাধান্য দেওয়া। তারা যে-কাজ থেকে নিষেধ করেন তা থেকে দূরে থাকা। তাদের ব্যয়ভার বহন করা। তাদের ইচ্ছেগুলো পূরণ করা। তাদের বেশি বেশি সেবা করতে থাকা। তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণে মনোযোগী হওয়া ইত্যাদি। এগুলো হলো পিতামাতার প্রতি সন্তানের আচরণ-পদ্ধতি। এমনিভাবে সে মাতাপিতার আওয়াজের ওপর নিজের আওয়াজকে উঁচু করবে না। তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে না। তাদের নাম ধরে ডাকবে না। তাদের পেছন পেছন চলবে, আগ বাড়িয়ে তাদের সামনে চলতে থাকবে না এবং তাদের থেকে অপছন্দনীয় কিছু প্রকাশ পেলে সে বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করবে।
২৪. তলক ইবনু আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَوْ أَدْرَكْتُ وَالِدَيَّ أَوْ أَحَدَهُمَا وَقَدِ افْتَتَحْتُ صَلَاةَ الْعِشَاءِ فَقَرَأْتُ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ فَدَعَتْنِي أَتَيْ تَقُوْلُ : يَا مُحَمَّدُ لَقُلْتُ لَبَيْكِ
"আমি আমার মাতাপিতার উভয়কে বা তাদের একজনকে যদি জীবিত পেতাম আর ইশার সালাত আরম্ভ করে সূরা ফাতিহা শুরু করার পর আমার মা আমাকে 'মুহাম্মাদ' বলে ডাক দিতেন তবুও আমি 'লাব্বাইক' বলে তাঁর ডাকে সাড়া দিতাম।"[৩১]
২৫. আবূ গাসসান দব্বী একবার 'হাররা' নামক স্থানে হাঁটতে বের হলো। তখন তার বাবা তার পেছনে ছিল। পথিমধ্যে আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার পেছনে হাঁটছেন ইনি কে?'
সে উত্তর দিল, 'তিনি আমার বাবা।'
আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) তখন তাকে বললেন, 'তুমি সঠিক পন্থা অবলম্বন করোনি এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমলও করোনি। পিতার আগে আগে কখনও হাঁটবে না। বরং তাঁর ডানে বা বামে হাঁটবে। তোমার এবং তাঁর মাঝে অন্য কাউকে বিছিন্নতা তৈরি করার সুযোগ দিবে না। যেই (গোশতযুক্ত) হাড্ডির দিকে তিনি তাকিয়েছেন তুমি তা ধরবে না। হতে পারে তা খেতে তাঁর মন চেয়েছে। তুমি তোমার পিতার দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে না। তিনি বসার আগে তুমি বসবে না। এবং তিনি ঘুমিয়ে পড়ার আগে তুমি ঘুমাবে না।'
২৬. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) একবার দুইজন লোককে দেখে তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি তোমার কে?' সে বলল, 'ইনি আমার বাবা।' তিনি বললেন, 'তুমি তাঁকে নাম ধরে ডাকবে না, তাঁর সামনে সামনে হাঁটবে না এবং তাঁর আগে বসবে না। [৩৩]
২৭. তয়সালা ইবনু মাইয়্যাস (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে বললাম, 'আমার মা আমার সঙ্গে থাকেন।' তিনি বললেন,
'আল্লাহর শপথ! যদি তুমি তাঁর সাথে নরমভাষায় কথা বলো এবং তাঁকে ভালোভাবে খাবার খাওয়াও, তবে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে; যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো।'[৩৪]
২৮. উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'কুরআনে এসেছে,
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ
"তুমি তোমার বিনয়ের ডানা তাদের দু'জনের জন্য নত করে দাও।"[৩৫] এর মানে হলো-তারা দু'জন যা পছন্দ করেন সাধ্যমতো তা তাদের নিকট পৌঁছান থেকে বিরত থেকো না।[৩৬]
২৯. তয়সালা ইবনু আলি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, 'মাতাপিতার কান্নার কারণ হওয়া-অবাধ্যতা ও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।'[৩৭]
৩০. হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)-কে মাতাপিতার সাথে সদাচার করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'তুমি নিজের সম্পদ থেকে তাদের জন্য খরচ করবে এবং পাপকাজ ছাড়া যাবতীয় বিষয়ে তাদের আনুগত্য করবে।[৩৮]
৩১. সাল্লাম ইবনু মিসকীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি একবার হাসান (রহিমাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করলাম, 'একজন ব্যক্তি কি তার মা-বাবাকে ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে পারবে?' উত্তরে তিনি বললেন, 'যদি তারা তা গ্রহণ করে, তাহলে পারবে। আর যদি তারা তা অপছন্দ করে, তাহলে তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিবে।[৩৯]
৩২. আবদুস সামাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি ওয়াহাব (রহিমাহুল্লাহ)-কে বলতে শুনেছি-'ইনজীল কিতাবে আছে, মাতাপিতার সেবার মূল হলো-তাদের জন্য
যথাযথ খরচ করা ও নিজ সম্পদ থেকে তাদেরকে খাবার খাওয়ানো।'
৩৩. আওয়াম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'মুআযযিন সালাতের জন্য আযান দিচ্ছে এমন সময় যদি আমার পিতা ডাক দেয় তাহলে কী করব?'
জবাবে তিনি বললেন, 'আগে তোমার পিতার আহ্বানে সাড়া দিবে।'[৪০]
৩৪. আবদুল্লাহ ইবনু আওন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মাতাপিতার দিকে তাকিয়ে থাকাও ইবাদাত।[৪১]
টিকাঃ
৩১. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৮১, দঈফ।
৩২. হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮/১৫১।
৩৩. আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ১১/১৩৮; হান্নাদ, আয-যুহদ, ২/৪৭৮。
৩৪. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১/৪৪১।
৩৫. সূরা ইসরা, ১৭:২৪।
৩৬. তাবারি, তাফসীর, ১৪/৫৫০; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ২৫৪১২; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৯।
৩৭. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩১।
৩৮. আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ৫/১৭৬; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৩/২৬১।
৩৯. ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ২০১。
৪০. হায়াদ, আয-যুহদ, ৯৭০, ৯৭১।
৪১. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৫৯, ৭৮৬০।
📄 খেদমত পাওয়ার ক্ষেত্রে মা সবার আগে
৩৫. আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল,
يَا رَسُولَ اللهِ : أَيُّ النَّاسِ أَحَقُّ مِنِّي بِحُسْنِ الصُّحْبَةِ؟
'হে আল্লাহর রাসূল! কোন মানুষটি আমার থেকে সদাচার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখে?'
আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন, أُمُّكَ 'তোমার মা।'
সে জিজ্ঞেস করল, ثُمَّ مَن؟ 'এরপর কে?'
তিনি বললেন, أُمُّكَ 'এরপর তোমার মা।'
সে আবার জিজ্ঞেস করল, ثُمَّ مَن؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, أُمُّكَ 'তারপর তোমার মা।'
সে আবার জিজ্ঞেস করল, ثُمَّ مَن؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أبوك 'তারপর তোমার বাবা।[৪২]
৩৬. বাহ্য ইবনু হাকীম (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'আমি বললাম, يَا رَسُوْلَ اللَّهِ : مَنْ أَبَرُّ؟ 'হে আল্লাহর রাসূল! কে সবচেয়ে বেশি খেদমত পাওয়ার অধিকার রাখে?'
তিনি বললেন, أُمَّكَ 'তোমার মা।'
আমি বললাম, ثُمَّ مَنْ؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أُمَّكَ 'তারপর তোমার মা।'
আমি বললাম, ثُمَّ مَنْ؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أُمَّكَ 'তারপর তোমার মা।'
আমি বললাম, ثُمَّ مَنْ؟ 'তারপর কে?'
তিনি বললেন, ثُمَّ أَبَاكَ ثُمَّ الْأَقْرَبَ فَالْأَقْرَبَ 'তারপর তোমার বাবা। তারপর একের পর এক নিকটাত্মীয়। [৪৩]
৩৭. মিকদাম ইবনু মা'দীকারিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ اللهَ يُوْصِيْكُمْ بِأُمَّهَاتِكُمْ، إِنَّ اللَّهَ يُوْصِيْكُمْ بِأُمَّهَاتِكُمْ، إِنَّ اللَّهَ يُوْصِيْكُمْ بِآبَائِكُمْ، إِنَّ اللَّهَ يُؤْصِيْكُمْ بِالْأَقْرَبِ فَالْأَقْرَبِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের বাবাদের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে পর্যায়ক্রমে নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে (সদাচারের) উপদেশ দিচ্ছেন।"[৪৪]
৩৮. মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِذَا دَعَاكَ أَبَوَاكَ وَأَنْتَ تُصَلِّي، فَأَجِبْ أُمَّكَ، وَلَا تُجِبْ أَبَاكَ
"যদি সালাতরত অবস্থায় তোমার বাবা-মা তোমাকে ডাকে; তাহলে মায়ের ডাকে সাড়া দিবে আর বাবার ডাকে সাড়া দিবে না।"[৪৫]
৩৯. মাকহুল (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'তুমি সালাতে থাকাবস্থায় যদি তোমার মা তোমাকে ডাকে তাহলে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ো। আর যদি বাবা ডাকে তাহলে সাড়া দিয়ো না; যতক্ষণ না তোমার সালাত শেষ হচ্ছে।'[৪৬]
৪০. আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامِ الْأُمَّهَاتِ
"জান্নাত-মায়ের পায়ের নিচে।"[৪৭]
৪১. আবূ আবদির রহমান সুলামি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক ব্যক্তি আবুদ দারদা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এসে বলল, 'আমার স্ত্রী আমার চাচাতো বোন হয়। তাকে আমি খুব ভালোবাসি। আমার মা তাকে তালাক দেওয়ার জন্য আমাকে আদেশ দিচ্ছেন।'
তখন আবুদ দারদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'আমি তোমাকে তালাক দিতেও বলব না, আবার তোমার মায়ের অবাধ্যতা করার নির্দেশও দেবো না। বরং আমি তোমাকে একটা হাদীস শোনাব, যা আমি আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন,
إِنَّ الْوَالِدَةَ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ فَإِنْ شِئْتَ فَأَمْسِكْ وَإِنْ شِئْتَ فَدَعْ
"নিশ্চয়ই মা হলেন জান্নাতের মধ্য-দরজা। সুতরাং যদি তুমি চাও তাঁকে ধরে রাখো। আর যদি চাও তাঁকে ছেড়ে দাও।"[৪৮]
৪২. মুহাম্মাদ ইবনু তালহা তার পিতা থেকে তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, 'জাহিমা সুলামি (রদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে জিহাদের অনুমতি চাইতে আসলেন। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তোমার মা বেঁচে আছেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' নবিজি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
فَالْزَمْهَا فَإِنَّ عِنْدَ رِجْلَيْهَا الْجَنَّةَ
'তাঁর সাথেই নিজেকে জড়িয়ে রাখো। কারণ তাঁর দু'পায়ের কাছেই জান্নাত রয়েছে।'[৪৯]
৪৩. আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'আয়িশা (রদিয়াল্লাহ আনহা)-এর নিকট এক মহিলা কিছু চাইতে এলে তিনি তাকে তিনটি খেজুর দান করেন। সেই মহিলা দুইটি খেজুর তাঁর দুই সন্তানকে দিয়ে বাকিটা নিজের জন্য রেখে দিল। কিন্তু যখন সন্তানেরা খেজুর দুটি খাওয়া শেষ করে মায়ের দিকে তাকাল, মা তখন ওই একটি খেজুরকে দুইভাগ করে দুই সন্তানকে অর্ধেক করে দিলেন। রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসার পর আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বিষয়টি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জানালেন। তিনি তখন বললেন,
لَقَدْ رَحِمَهَا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ بِرَحْمَتِهَا صَبِيَّيْهَا
"নিজের সন্তানের প্রতি দয়া করার কারণে আল্লাহ তাআলাও তাকে দয়া করেছেন।"[৫০]
৪৪. আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাছে এসে বলল, 'আমি এক মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সে আমাকে বিবাহ করতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু আরেক ব্যক্তি প্রস্তাব দিলে ঠিকই সে তাকে বিবাহ করে নেয়। এতে আমার আত্মমর্যাদাবোধে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। তাই আমি তাকে হত্যা করে ফেলি। আমার কি তাওবা করার কোনও সুযোগ আছে?'
ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার মা কি বেঁচে আছেন?' সে বলল, 'না, বেঁচে নেই।' তখন তিনি তাকে বললেন, 'হ্যাঁ। তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা করো এবং সাধ্যানুযায়ী তাঁর নৈকট্য হাসিল করার আপ্রাণ
চেষ্টা করো।'
আতা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'পরে আমি ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর নিকট জানতে চাইলাম, 'আপনি কেন তার মায়ের বেঁচে থাকার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন?'
তিনি বললেন, 'কারণ হলো, মায়ের খেদমত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনও আমলের কথা আমার জানা নাই।'[৫১]
৪৫. আবূ নাওফাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'এক ব্যক্তি উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এসে বলল, 'আমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি।' তিনি জানতে চাইলেন, 'ইচ্ছা করে নাকি ভুলে? তোমার পিতামাতার কেউ কি বেঁচে আছেন?' সে বলল, 'হ্যাঁ। আছেন।' উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'মা বেঁচে আছেন?' সে জানাল, 'যিনি বেঁচে আছেন তিনি আমার বাবা।' তিনি বললেন, 'যাও, গিয়ে তাঁর সেবা করো এবং তাঁর প্রতি সদাচার করো।' সে চলে যাবার পর উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'সেই সত্তার শপথ! যার হাতে উমরের প্রাণ, যদি তার মা বেঁচে থাকত আর সে তাঁর সেবা করত এবং তাঁর প্রতি ভালো আচরণ করত তাহলে আমি অনেক আশাবাদী হতাম যে, তাকে জাহান্নামের আগুন কখনও স্পর্শ করতে পারত না।[৫২]
৪৬. হাসান বাসরি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তিন ভাগের দুই ভাগ সেবা পাওয়ার হকদার হলেন মা আর বাবা তিন ভাগের এক ভাগ।[৫৩]
৪৭. ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তিন ভাগের দুই ভাগ সেবা পাওয়ার হকদার হলেন মা।'[৫৪]
৪৮. ইয়াকূব ইজলি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আতা (রহিমাহুল্লাহ)-কে বললাম, 'বৃষ্টির রাতে জামাআতে সালাত আদায় করতে যেতে আমার মা আমাকে বাধা দেন।' তিনি বললেন, 'তাঁর আনুগত্য করো।'[৫৫]
৪৯. আতা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'এক ব্যক্তির মা কসম করল—যেন তার ছেলে ফরজ সালাত ছাড়া অন্য কোনও সালাত আদায় না করে এবং রমাদান মাস ছাড়া অন্য কোনও সময় সিয়াম না রাখে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আতা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সে যেন তার মায়ের কথা মেনে চলে।' [৫৬]
৫০. হাসান বাসরি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যদি কোনও ব্যক্তির বাবা তার সম্পর্কে এক রকম কসম করে আর তার মা পেশ করে এর বিপরীত বিষয়ে, তাহলে সন্তান মায়ের কথাই মান্য করবে।' [৫৭]
৫১. রিফাআ ইবনু ইয়াস (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হারিস উকালি (রহিমাহুল্লাহ)-কে তার মায়ের জানাযায় কাঁদতে দেখেছি। তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'আপনি কান্না করছেন?' তিনি বললেন, 'আমি কেন কাঁদব না? আমার যে জান্নাতের একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেল!'[৫৮]
৫২. হুমাইদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইয়াস ইবনু মুআবিয়া (রহিমাহুল্লাহ)-এর মা মারা গেলে তিনি কান্না করছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি কান্না করছেন কেন?' তিনি বললেন, 'আমার জান্নাতের দুটি দরজা খোলা ছিল। আজকে তার একটি বন্ধ হয়ে গেল।' [৫৯]
৫৩. কা'ব ইবনু আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'একবার মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, 'হে আমার রব! আমাকে উপদেশ দিন।' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'আমি তোমাকে তোমার মায়ের ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছি। কারণ তিনি তোমাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন।' মূসা (আলাইহিস সালাম) আবার বললেন, 'তারপর?' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'তারপর তোমার বাবার ব্যাপারে তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি।' [৬০]
৫৪. আতা (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) জানতে চেয়েছিলেন, 'হে প্রভু! তুমি আমাকে কী উপদেশ দিবে?' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'আমি তোমাকে আমার ব্যাপারে, তারপর তোমার মায়ের ব্যাপারে, তারপর তোমার বাবার ব্যাপারে উপদেশ দেবো।'[৬১]
৫৫. হিশাম ইবনু হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ)- কে বললাম, 'যখন আমি কুরআন শিক্ষা করি তখন আমার মা আমার জন্য রাতের খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।' তিনি বললেন, 'তুমি তোমার মায়ের সাথে রাতের খাবার খাবে। কারণ এর মাধ্যমে তাঁর চোখ জুড়াবে। আর এ কাজ আমার কাছে নফল হাজ্জ করার চেয়েও বেশি প্রিয়।'[৬২]
৫৬. বিশর হাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কোনও সন্তান যদি তার মায়ের এতটা কাছে অবস্থান করে যে, মা তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পান—তাহলে এটি (আমার নিকট) আল্লাহর রাস্তায় তলোয়ার দিয়ে লড়াই করার চেয়েও অধিক উত্তম। আর মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকা সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।'[৬৩]
৫৭. উমারা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, 'তুমি কি জানো না যে, মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকাও ইবাদাত? তাহলে ভাবো, তাঁর সেবা করার মর্যাদা কেমন হতে পারে! '[৬৪]
টিকাঃ
৪২. বুখারি, ৫৯৭১; মুসলিম, ২৫৪৮。
৪৩. আবু দাউদ, ৫১৩৯; তিরমিযি, ১৮৯৭, হাসান。
৪৪. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৬০; ইবনু মাজাহ, ৩৬৬১, সহীহ。
৪৫. হান্নাদ, আয-যুহদ, ৯৭১।
৪৬. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৮৩।
৪৭. খতীব বাগদাদি, আল-জামি' লি আখলাকির রাবী, ১৭০২; দাওলাবি, আল-কুনা ওয়াল আসমা, ১৯১১; সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর, ৬৪১২; তরভূশি, বিররুল ওয়ালিদাইন, ৭০।
৪৮. তিরমিযি, ২০৬৯; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫২; আহমাদ, ৫/১৯৬, সহীহ। মা-বাবা যদি শারঈ কোনও কারণ ছাড়া অনৈতিকভাবে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলে, তবে সেই কথা মান্য করা সন্তানের জন্য জরুরি নয়। বিস্তারিত বিবরণ আগে গিয়েছে। (অনুবাদক)
৪৯. নাসাঈ, আস-সুনান, ৩১০৪; ইবনু মাজাহ, ২৭৮১, হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫১, সহীহ。
৫০. বুখারি, ১৪১৮, ৫৯৯৫; মুসলিম, ২৬২৯。
৫১. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৯১৩; বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১/৩৭。
৫২. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ৪; ইবনু রজব হাম্বালি, জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ২/৫১৯。
৫৩. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৮৬২; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ২৫৪০১。
৫৪. ইবনু ওয়াহব, আল-জামি', ১৯৭。
৫৫. হুসাইন ইবনু হারব, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৬৭。
৫৬. ইবনু রজব হাম্বালি, ফাতহুল বারি, ৯/৩১৯-৩২০।
৫৭. ইবনু রজব হাম্বালি, ফাতহুল বারি, ৯/৩১৯।
৫৮. আলাউদ্দীন মুগলতাঈ, ইকমালু তাহযীবিল কামাল, ৩/৩২৯।
৫৯. আবু নুআইম, হিলইয়া, ৩/১২৩। অর্থাৎ তার মা জান্নাতের একটি দরজা আর বাবা আরেকটি দরজা। দু'জনেই জীবিত ছিলেন মানে উভয় দরজা খোলা ছিল। যখন একজন ইন্তিকাল করলেন তখন একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেল। (অনুবাদক)
৬০. আহমাদ ইবনু হাম্বাল, আয-যুহদ, ৩৫৮。
৬১. ইবনু ওয়াহব, আল-জামি', ২০৪。
৬২. খতীব বাগদাদি, আল-জামি' লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামি', ২/২৩২。
৬৩. বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৪৭৪。
৬৪. হুসাইন ইবনু হারব, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ১৫。
📄 বাবার অবদানের প্রতিদান দিতে সন্তান অপারগ
৫৮. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا يَجْزِي وَلَدٌ وَالِدَهُ، إِلَّا أَنْ يَجِدَهُ مَمْلُوكًا، فَيَشْتَرِيَهُ، فَيُعْتِقَهُ
"কোনও সন্তান তার বাবার (অবদানের) প্রতিদান দিতে পারবে না। তবে এই বিষয়টি ছাড়া যে, সে তাকে গোলাম অবস্থায় পেয়ে ক্রয় করে স্বাধীন
সন্তান যদি তার দাস-বাবাকে ক্রয় করে তাহলে কেবল ক্রয় করার মাধ্যমেই তিনি স্বাধীন হয়ে যান। আযাদ করার ব্যাপারে সন্তানের মুখে কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। এটি ইমাম দাঊদ যাহিরি ছাড়া বাকি সমস্ত ইমামগণের অভিমত।[৬৬]
সুতরাং উপরোক্ত হাদীসটির দুইটি ব্যাখ্যা হতে পারে:
১. এই হাদীসে বাবার প্রতিদানস্বরূপ বাবাকে আযাদ করতে সন্তানের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; যদিও সন্তান বাবাকে আযাদ করতে পারে না, তার কারণ হলো, এ ক্ষেত্রে সন্তান তার বাবাকে আযাদ করার মাধ্যম হয়। কেননা শারীআতের বিধান অনুযায়ী নিজ পিতাকে ক্রয় করার সাথে সাথেই তিনি আযাদ হয়ে যান।
২. এটি আগেরটির তুলনায় আরেকটু সূক্ষ্ম। এখানে বোঝানো হচ্ছে যে, বাবার প্রতিদান দেওয়া একটি অসম্ভব ব্যাপার। হাদীসে বলা হয়েছে, সন্তান যদি বাবাকে গোলাম অবস্থায় পেয়ে আযাদ করে দেয় তাহলেই কেবল বাবার প্রতিদান আদায় হবে। কিন্তু সন্তান তো বাবাকে কখনও আযাদ করতেই পারে না; কারণ ক্রয় করার সাথে সাথে তিনি আপনা-আপনিই আযাদ হয়ে যান। সুতরাং সন্তানের পক্ষে বাবার প্রতিদান দেওয়া কখনই সম্ভব নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَا يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمَّ الْخَيَّاطِ
"তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে।"[৬৭]
আর এটা জানা কথা যে, সুইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করা একটি অসম্ভব বিষয়। ফলে কাফেরদের জান্নাতে প্রবেশ করাও কখনও সম্ভব নয়।
টিকাঃ
৬৫. মুসলিম, ১৫১০; আবূ দাউদ, ৫১৩৭।
৬৬. ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, ৪/৭৯; খতীব শিরবীনি, মুগনিল মুহতাজ, ৪/৪৯৯।
৬৭. সূরা আ'রাফ, ০৭:৪০।