📄 মাতাপিতার সাথে ভালো আচরণ করার যৌক্তিকতা
সামান্য জ্ঞান আছে এমন প্রতিটি মানুষই জানেন যে, অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহ স্বীকার করা আবশ্যক। একজন মানুষের ওপর আল্লাহ তাআলার পরে তার মা-বাবার মতো অন্য কোনও অনুগ্রহকারী নেই। কারণ তার মা তাকে দীর্ঘ সময় গর্ভে ধারণ করেছেন, প্রসবের সময় অসহ্য যন্ত্রণা সয়েছেন। দুধ পান করানোর সময়টাতে অনেক কষ্ট বরদাশত করেছেন। তাকে লালনপালন করার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। সন্তানকে আরামে রাখার জন্য বহু নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। সন্তানের মঙ্গলের জন্য তিনি নিজের বহু আশা-আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করেছেন। সবসময় নিজের ওপর তাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পাশাপাশি পিতাও সন্তানের জন্ম নেওয়ার পেছনে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। জন্মের পর সবসময় তাকে স্নেহ-মায়ার ডোরে আবদ্ধ রেখেছেন। সন্তানের প্রতিপালনের দিকে তাকিয়ে অর্থ উপার্জনে উদ্যমী হয়েছেন এবং তার জন্য অকাতরে অসংখ্য টাকা-পয়সা খরচ করেছেন।
জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই সর্বদা অনুগ্রহ স্বীকার করে এবং তার বদলা দেবার চেষ্টায় থাকে। কারও অনুগ্রহের কথা ভুলে যাওয়া-মানুষের একটি অতি মন্দস্বভাব। এর সাথে যদি অনুগ্রহকে অস্বীকার করে এবং অনুগ্রহকারীর সাথে দুর্ব্যবহারও করে, তাহলে তা হবে
ওই ব্যক্তির নিকৃষ্টরুচি ও বিকৃত স্বভাবের বহিঃপ্রকাশ।
আর মাতাপিতার প্রতি সদাচারী ব্যক্তিরও জেনে রাখা উচিত যে, তাদের সাথে সে যতই ভালো ব্যবহার করুক, তা কখনোই তাদের পরিপূর্ণ কৃতজ্ঞতা আদায়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে না এবং এর সমপর্যায়েও পৌঁছুবে না।
০৮. যুরআ ইবনু ইবরাহীম (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে এসে বলল, 'আমার মা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। এমনকি আমার পিঠে না চড়ে তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পর্যন্ত সারতে পারেন না। আমাকে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকে পরিচ্ছন্ন করতে হয়। আমি কি তাঁর হক আদায় করতে পেরেছি?' তিনি বললেন, 'না। পারোনি।' সে বলল, 'আমি কি তাকে নিজের পিঠে বহন করিনি এবং তার প্রয়োজনে নিজেকে উৎসর্গ করিনি?' তিনি জবাব দিলেন, 'তোমার মা-ও তোমার জন্য অনুরূপ করেছেন। তবে তিনি তখন তোমার জন্য দীর্ঘ হায়াত কামনা করতেন। আর এখন তুমিও তোমার মায়ের সেবা করছো, কিন্তু অপেক্ষার প্রহর গুনছ, কখন তিনি বিদায় নিবেন!' [১৬]
০৯. মুহাম্মাদ ইবনু আইয়ূব আযদি (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) একবার এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার মাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আর বলছে, 'এখন আমি আমার মাকে বহন করছি। একদিন তিনিও আমাকে বহন করেছিলেন এবং দুধ পান করিয়েছিলেন।' তখন উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাকে বললেন, 'না, এতে তুমি তোমার মায়ের এক বিন্দু ঋণও শোধ করতে পারোনি।'
১০. ঈসা ইবনু মা'মার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) এক ব্যক্তিকে দেখলেন সে তার মাকে নিজের পিঠে পাখির মতো বহন করে কা'বা ঘর তাওয়াফ করছে এবং বলছে, 'আমি আমার মাকে বহন করে চলছি। একদিন তিনিও আমাকে বহন করেছিলেন এবং দুধ পান করিয়েছিলেন।' উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) এটা শুনে বললেন, 'আমি যদি আমার মাকে পেতাম এবং তুমি যেমন তার সেবা করছো, সেরকম সেবা করতে পারতাম, তবে তা আমার কাছে
টিকাঃ
১৪. আবু নুআইম, হিলইয়া, ৫/৩৩; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫৪, হাসান।
১৫. ইবনু কুতাইবা দীনাওয়ারি, উয়ূনুল আখবার, ৩/১০৫।
১৬. যামাখশারি, রবীউল আবরার ওয়া নুসুসুল আখইয়ার, ৪/২৯৭।
📄 মা-বাবার সেবা করার ফযীলত
১৩. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, 'এক ব্যক্তি এসে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে জিহাদের অনুমতি প্রার্থনা করল। তিনি তাকে বললেন,
أَحَيُّ وَالِدَاكَ؟ "তোমার মাতাপিতা কি জীবিত আছেন?”
সে বলল, 'হ্যাঁ। তারা জীবিত আছেন।'
তখন তিনি তাকে বললেন, فَفِيهِمَا فَجَاهِدُ "তাহলে তাদের খেদমতেই খুব আন্তরিকতার সাথে নিজেকে নিয়োজিত রাখো।”[২০]
১৪. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে বাইআত হতে এসে বলল, 'আমার বাবা-মাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় রেখে আপনার কাছে হিজরতের ওপর বাইআত হতে এসেছি।'
তখন তিনি তাকে বললেন,
فَارْجِعْ إِلَيْهِمَا فَأَضْحِكْهُمَا كَمَا أَبْكَيْتَهُمَا "তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও। আর যেভাবে তাদেরকে কাঁদিয়েছ সেভাবে তাদের মুখে হাসি ফুটাও।"[২১]
১৫. আবূ সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইয়ামান থেকে রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট হিজরত করে এল। তখন রাসূল )সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, هَلْ بِالْيَمَنِ أَبْوَاك “ইয়ামানে কি তোমার মাতাপিতা আছেন?"
সে বলল, 'জ্বী, আছেন।'
তিনি জানতে চাইলেন, أَيْنا ؟ "তারা উভয়ে কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছেন?"
সে বলল, 'না, দেননি।' তখন রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন,
ارْجِعْ إِلَى أَبَوَيْكَ فَاسْتَأْذِنُهُمَا، فَإِنْ فَعَلَا، وَإِلَّا فَبِرَّهُمَا “তোমার পিতামাতার কাছে ফিরে গিয়ে তাদের অনুমতি চাও। তারা যদি অনুমতি প্রদান করেন তাহলে ঠিক আছে। অন্যথায় তুমি তাদের সেবায় নিজেকে নিমগ্ন রাখবে।”[২২]
টিকাঃ
১৭. হান্নাদ ইবনুস সারি, আয-যুহদ, ২/৪৫৪।
১৮. হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮/১৩৭।
১৯. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১১; আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, আল-বিররু ওয়াস সিলাহ, ৩৮; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৭৯২৬।
২০. বুখারি, ৩০০৪, ৫৯৭২; মুসলিম, ২৫৪৯।
২১. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ১৯; আবূ দাউদ, আস-সুনান, ২৫২৮, সহীহ।
২২ আবূ দাউদ, আস-সুনান, ২৫৩০, সহীহ।
📄 আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল—পিতামাতার সেবা করা
১৮. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, 'আমি রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'কোন আমল আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয়?'
তিনি বললেন, الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا "যথা সময়ে সালাত আদায় করা।”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'তারপর কোনটি?'
তিনি বললেন, ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ "পিতামাতার সেবা করা।”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'তারপর কোনটি?'
তিনি বললেন, الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ "আল্লাহর পথে জিহাদ করা।”[২৫]
টিকাঃ
২৩. আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, ৮/৪৬৩; হাইসানি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৪/১৯২; এই সনদে 'রিশদীন ইবনু কুরাইব' নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন, যার সম্পর্কে ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'মুনকারুল হাদীস।'
২৪. তিরমিযি, আস-সুনান, ১৮৯৯, সহীহ; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৭২৪৯; ইবনু হিব্বান, ৪২৯。
২৫. বুখারি, ৫২৭; মুসলিম, ৮৫।
📄 মাতাপিতার সেবায় বয়স বৃদ্ধি পায়
১৯. সাহল ইবনু মুআয (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ بَرَّ وَالِدَهُ طُولِي لَهُ، زَادَ اللَّهُ فِي عُمْرِهِ
"তার জন্য সুসংবাদ! যে মাতাপিতার সেবা করল। আল্লাহ তাআলা তার হায়াত বাড়িয়ে দিবেন।” [২৬]
২০. আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
يَا ابْنَ آدَمَ، أَبْرِرْ وَالِدَيْكَ، وَصِلْ رَحِمَكَ، يُيَسَّرْ لَكَ يُسْرُكَ، وَيُمَدَّ لَكَ فِي عُمْرِكَ، وَأَطِعْ رَبَّكَ تُسَمًّى عَاقِلًا، وَلَا تَعْصِهِ فَتُسَمًّى جَاهِلًا
“হে আদম সন্তান! মাতাপিতার সেবা করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো; তাহলে তোমার জন্য (সবকিছু) সহজ করে দেওয়া হবে এবং তোমার বয়স বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তুমি তোমার রবের আনুগত্য করো; তাহলে বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিতি পাবে। তুমি আল্লাহর অবাধ্যতা করো না; তাহলে মূর্খ হিসেবে আখ্যায়িত হবে।”[২৭]
২১. সালমান (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ "মাতাপিতার সেবা করলেই কেবল বয়স বৃদ্ধি পায়।”[২৮]
২২. আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَحَبُّ أَنْ يُمِدَّ اللهُ فِي عُمْرِهِ، وَيَزِيدَ فِي رِزْقِهِ، فَلْيَبَرَّ وَالِدَيْهِ، وَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
“যে-ব্যক্তি চায় আল্লাহ তাআলা তার বয়স ও রিযক বাড়িয়ে দিক, সে যেন তার মাতাপিতার সেবা করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।”[২৯]
২৩. মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'একবার খলীফা মানসূর আমার কাছে সংবাদ পাঠিয়ে আমাকে দ্রুত তলব করলেন। আমি সওয়ারিতে চড়ে বসলাম। সে সময় ক্ষুরের শব্দ শুনতে পেয়ে আমি গোলামকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এ কে?' সে বলল, 'আপনার ভাই আবদুল ওয়াহহাব।' এরপর আমরা তাড়াতাড়ি করে সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। রবী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আর মাহদি বারান্দায় বসে ছিল। সেখানে আবদুস সামাদ ইবনু আলি, ইসমাঈল ইবনু আলি, সুলাইমান ইবনু আলি, জা'ফর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আলি, আবদুল্লাহ ইবনু হাসান এবং আব্বাস ইবনু
মুহাম্মাদও উপস্থিত ছিলেন।
রবী বললেন, 'এখানে তোমাদের চাচাতো ভাইদের সাথে বসো।' আমরা তখন বসলাম। তারপর রবী ভেতরে ঢুকে আবার বেরিয়ে এল এবং মাহদিকে বলল, 'ভেতরে যাও। আল্লাহ তোমাকে সংশোধিত করুন।' তারপর বললেন, 'তোমরা সবাই ভেতরে যাও।' আমরা সবাই ভেতরে গেলাম এবং সালাম দিয়ে যার যার আসন গ্রহণ করলাম। খলীফা মানসূর বললেন, 'কালি ও কাগজ নিয়ে আসো।' তখন আমাদের প্রত্যেকের সামনে একটা করে দোয়াত ও কাগজ রাখা হলো। তারপর তিনি আবদুস সামাদ ইবনু আলির দিকে ফিরে বললেন, 'চাচা! আপনার সন্তানদের ও ভাইদেরকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং মাতাপিতার খেদমত সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করুন।' তখন আবদুস সামাদ (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'আমার পিতা আমার দাদা আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْبِرَّ وَالصَّلَةَ لَيُطِيْلَانِ الأَعْمَارَ، وَيُعَمِّرَانِ الدِّيَارَ، وَيُكْثِرَانِ الْأَمْوَالَ، وَلَوْ كَانَ الْقَوْمُ فجارًا
"নিশ্চয়ই মাতাপিতার সেবা করা এবং আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা-বয়স দীর্ঘায়িত করে। (বারাকাহ ও কল্যাণের মাধ্যমে) সমাজ টিকিয়ে রাখে এবং অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধি করে। যদিও তারা পাপাচারী হয়।"
তারপর তিনি বললেন, 'হে আমার চাচা! আরেকটি হাদীস বলুন।' তখন তিনি বললেন, 'আমার পিতা আমার দাদা আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْبِرَّ وَالصَّلَةَ لَيُخَفِّفَانِ سُوءَ الْحِسَابِ يَوْمَ القِيَامَةِ
"নিশ্চয়ই মাতাপিতার সেবা করা এবং আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা-আখিরাতের দিনের কঠিন হিসাবকে সহজ করে।"
তারপর তিনি বললেন, 'হে আমার চাচা! আরেকটি হাদীস বলুন।' তখন তিনি বললেন, 'আমার পিতা আমার দাদা আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'বানী ইসরাঈলের দুই ভাই দুই শহরের বাদশাহ ছিল। তাদের একজন আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষাকারী এবং প্রজাদের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ছিল। আর অপরজন
আত্মীয়দের সাথে মন্দাচারী এবং প্রজাদের ওপর জুলুমকারী ছিল। তাদের যুগে একজন নবি ছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা সেই নবির নিকট এই মর্মে ওহি পাঠালেন যে, সদাচারী ব্যক্তির তিন বছর হায়াত বাকি আছে। আর ওই মন্দাচারী ব্যক্তির ত্রিশ বছর হায়াত বাকি আছে। তখন সেই নবি (আলাইহিস সালাম) দু'জনের প্রজাদের তা জানিয়ে দিলেন। ফলে তারা খুব ব্যথিত হলো, এরপর সন্তানদেরকে তাদের মায়েদের থেকে পৃথক করে দিল, পানাহার ছেড়ে দিল এবং মরুভূমিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করতে লাগল; যাতে তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর দ্বারা আরও বেশি দিন তাদের উপকৃত করেন। আর জুলুমকারীর জুলুম থেকে তাদের রক্ষা করেন।
এভাবে তারা তিনদিন সেখানে অবস্থান করে। তখন আল্লাহ তাআলা সেই নবির কাছে ওহি পাঠালেন যে, 'আমার বান্দাদের সুসংবাদ দাও—তাদের ওপর আমার দয়া হয়েছে। আমি তাদের দুআ কবুল করে নিলাম। ওই জালিম বাদশাহর বাকি ত্রিশ বছরের হায়াত এই ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর জন্য নির্ধারণ করলাম। আর এই ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর বাকি তিন বছরের হায়াত নির্ধারণ করলাম ওই জালিম বাদশাহর জন্য।'
অতঃপর তিন বছর পূর্ণ হতেই সেই দুরাচারী বাদশাহ মারা গেল। আর ন্যায়পরায়ণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী বাদশাহ বেঁচে থাকল আরও ত্রিশ বছর।[৩০]
টিকাঃ
২৬. বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, ২২, দঈফ; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/১৫৪। আল্লাহ তাআলা মানুষের মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَلَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
"যখন তাদের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় তখন তা একমুহূর্তও আগপিছ করা হয় না।" [সূরা ইউনুস, ১০: ৪৯।] এমনিভাবে অনেক হাদীসের মাধ্যমেও প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের মৃত্যু নির্দিষ্ট সময়ে হয়। তাহলে যেসব হাদীসে বলা হয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার মাধ্যমে কিংবা মাতাপিতার খেদমত করলে বয়স বৃদ্ধি ঘটে—এর দ্বারা উদ্দেশ্য কী? মুহাদ্দিসগণ এর বেশ কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১. এই বৃদ্ধি পাওয়া প্রকৃত অর্থে নয়। অর্থাৎ বয়স বৃদ্ধি পাবে মানে হলো, তার শারীরিক সুস্থতা, রিস্ক ও কাজ- কর্মে অনেক বরকত দেওয়া হবে। ফলে তার জীবন অনেক সুখময় হবে। এটাও একপ্রকারের বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি পরিমাণের দিক দিয়ে নয়, গুণাগুণের দিক দিয়ে। ২. তার মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজন তার কথা আলোচনা করবে, তাকে স্মরণ করবে। ফলে যেন সে মৃত্যুর পরেও বহু বছর তাদের মাঝে বেঁচে রইল। কারণ আত্মীয়-স্বজন মৃত্যুর পর ওই ব্যক্তির কথাই মনে রাখে, যে তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ৩. বিষয়টি প্রকৃত অর্থেই হবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর ফেরেশতাকে জানিয়ে দেন, অমুক ব্যক্তি যদি মা-বাবার সেবা করে বা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে তাহলে তার হায়াত এত বছর আর যদি না করে তাহলে এত বছর। এভাবে ফেরেশতার জ্ঞানানুসারে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা বা মা-বাবার সেবা করার মাধ্যমে তার হায়াতে কম-বেশি ঘটে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই জানেন যে, শেষ পর্যন্ত বান্দা কোনটা করবে এবং তার মৃত্যু কখন হবে। ফলে আল্লাহর ইলমে কোনও পরিবর্তন ঘটে না। বিস্তারিত জানতে দেখুন-আবদুর রহমান মুবারাকপুরি, তুহফাতুল আহওয়াযি, ৬/৯৭; মুনাবি, ফায়যুল কাদীর, ৩৪১৬; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ১০/৪২৯; তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, ৮/৮১। (অনুবাদক)
২৭. ইবনু হাজার, আল-মাতালিবুল আলিয়া, ১৩/৭২০; ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৫/২১৭。
২৮. তিরমিযি, ২১৩৯, সহীহ; তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, ৪/১৬৯。
২৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩/২২৯; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৬/১৮৫; ইবনু আবিদ দুনইয়া, মাকারিমুল আখলাক, ৮২。
৩০. সুয়ূতি, আল-জামিউস সগীর ওয়া যিয়াদাতুহু, ৩৩৪৭, দঈফ; খতীব বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ, ১/৩৮৫; সুযুতি, আদ-দুররুল মানসূর, ২/৭৬; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ৩৬/২৪৩。