📄 সুলতানের অন্যান্য কার্যাবলি
কথায় বলে—'বিজয় অর্জন করার চেয়ে বিজয় ধরে রাখা অনেক কঠিন।' কনস্ট্যান্টিনোপল জয়েই সুলতানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সমাপ্তি ছিল না; এটি ছিল নতুন কর্তব্যের পথে যাত্রা। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারের চেতনা ধারণ করতেন। বিশাল এক মুসলিম সাম্রাজ্যে সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের দায়িত্বও তাঁর স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল। এই মিশন বহনে তাঁর জাতিও তাঁকে সাহায্য করেছে।
তুর্কি রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি কখনো উপেক্ষিত ছিল না। সুলতান নিজেও উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর নির্ঝঞ্জাট শাসন, জাতির নেতৃত্বের আসনে তাঁর উপনীত হওয়া আর শত্রুর চ্যালেঞ্জের মুখে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা—এসবই সম্ভব হয়েছে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, যুদ্ধকৌশলের উন্নয়ন এবং এক্ষেত্রে নতুন নতুন আবিষ্কারের বদৌলতে। ফাতিহের নেতৃত্বে উসমানি সালতানাত পঞ্চদশ শতকের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। এশিয়া মাইনর ও পূর্ব ইউরোপের সকল ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাজ্যের অবসান ঘটান তিনি। বিজয়ের পর কনস্ট্যান্টিনোপলকে রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এশিয়া ও ইউরোপে বিস্তৃত তুর্কি ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল নয়া রাজধানী। গৌরবময় ইতিহাসের ধারক এ শহরটি সত্যিকার অর্থে উসমানীয়দের মর্যাদার সাথে মানানসই ছিল।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ ছিলেন একজন বড়ো সংস্কারক ও উঁচু স্তরের ব্যবস্থাপক। অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও শাসন-শৃঙ্খলা স্থাপনে তাঁর সক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। তেমনিভাবে তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ সমরনায়ক। ইতিহাসে তাঁর ন্যায় প্রতিভা বিরল। তিনি উচ্চশিক্ষিতও ছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যে ছিল তাঁর ব্যাপক জানাশোনা। তিনি কবিতার স্বাদ আস্বাদন করতেন। তাঁর জীবনী অধ্যয়নে আমরা দেখেছি—তিনি আশৈশব কেমন প্রতিভা ও শ্রেষ্ঠত্বে বেড়ে উঠেছেন!
শৈশব থেকেই তাঁর পিতা সন্তানের সুশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং রাষ্ট্রপরিচালনা ও ভবিষ্যতে বড়ো বড়ো দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার যোগ্য করে তোলেন।
রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে আবির্ভূত হতে না হতেই আমরা তাঁকে দুবার সিংহাসনে আরোহণ করতে দেখি। প্রথমবার অতি তরুণ বয়সে তাঁর পিতা পুত্রের অনুকূলে ক্ষমতা ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু সেবার ক্ষমতারোহণ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমরা যেমনটা ইতঃপূর্বে দেখেছি, ইউরোপীয় বিশ্বাসঘাতকদের দমনে তাঁর পিতাকে এগিয়ে আসতে হয়। দ্বিতীয়বার পিতার মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতাসীন হন। তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে জাতির নেতৃত্ব দেন। কারও অধিকার প্রদানে বা জুলুমের প্রতিবিধানে তিনি কখনো নাগরিকদের মাঝে ভেদাভেদ করেননি। অথচ তারা ছিল বহু ধর্ম ও জাতিভুক্ত। এমন এক যুগে বিশাল-বিস্তৃত উসমানি সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল নিরাপত্তা ও ন্যায়পরায়ণ-যখন চোর ও ডাকাতের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। সেলজুক সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির পর এশিয়া মাইনরে সৃষ্ট সকল ক্ষুদ্র রাজ্যকে এক পতাকার অধীনে আনতে সক্ষম হন তিনি। ফলে সুদৃঢ় বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
রাজ্যশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিল। অনুরূপ সাফল্য লাভ করেছিলেন যুদ্ধের ময়দানে ও শত্রুনাশে। বিজিত অঞ্চলে তিনি এমন ব্যবস্থাপনা চালু করেছিলেন-যাতে ওই যুগে প্রচলিত সকল সুবিধা জনগণের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছিল। তবে তা ইসলামি শরিয়াহ-এর বিধিব্যবস্থার আওতাধীন ছিল। সন্দেহ নেই, সেই ব্যবস্থাপনা ছিল যুগের বিচারে উৎকৃষ্টতা ও নৈপুণ্যের উন্নত দৃষ্টান্ত।
এখানে সুলতান ফাতিহের সকল কার্য ও কৃতিত্বের বিবরণ উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। যে জীবন পুরোটা উৎসর্গিত ছিল ইসলামের পতাকা উড্ডীন ও মুসলিম জাতির কল্যাণ সাধনের জন্য, তার ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে অর্ন্তভুক্ত করতে চাইলে আমাদের বৃহদাকার কয়েক খণ্ডের গ্রন্থ প্রণয়ন করতে হবে। তিনি ছিলেন একজন সেরা সমরবিদ। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট প্রমাণ হয়-তিনি মাত্র তেইশ বছর বয়সে সবচেয়ে বড়ো স্থল ও নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং যুদ্ধবিদ্যায় অজ্ঞাত ও অভিনব অনেক পদ্ধতি ও কৌশল আবিষ্কার করেন। তাই বন্ধুর আগে তিনি শত্রুর মূল্যায়ন লাভে ধন্য হয়েছেন। আর তাঁর কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীকে বিমোহিত করেছে এবং তিনি ইসলামের শত্রুদের মনে ভীতি জাগাতে পেরেছেন। আর তাদের রেখেছিলেন অব্যাহত দুশ্চিন্তা, নিরন্তর অস্থিরতা, অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতে। এখানে অতি সংক্ষেপে ফাতিহ-এর শাসনব্যবস্থার মৌলিক কিছু দিক উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ফাতিহ শাসনামলে প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থাপনা
সুলতান ফাতিহ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা অনুকরণীয় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি হতে উপকৃত হয়ে তিনি নতুন সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে অগ্রসর হয়েছিলেন। উসমানীয়রা যে সংস্কৃতিগুলোর সংশ্লেষে এসেছিল, সেগুলোর প্রত্যেকটি থেকে তিনি অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন।
একদিকে সুলতান ছিলেন এমন মুসলিম শাসক—যিনি ইসলামি রাষ্ট্র শাসন করতেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত; স্বজাতির আশা পূরণের দায়িত্বও ছিল তাঁর। তাই তুর্কিদের মৌলিকতা, আচার ও অভ্যাস সংরক্ষণের গুরুত্বও কম ছিল না। একইসঙ্গে তাঁর হাতে পতন হয়েছিল অত্যন্ত প্রাচীন, ঐতিহ্যমণ্ডিত ও অভিজাত একটি সাম্রাজ্যের—যা তাঁকে বাইজেন্টাইন সম্রাটদের সিংহাসনে উপবেশন করার সুযোগ এনে দিয়েছিল। ফলে বাইজেন্টাইন সিংহাসনে বসে সম্রাটের হ্যাটের বদলে তুর্কি পাগড়ি মাথায় বেঁধে তিনি অভিজাত বাইজেন্টাইনবাসীকে শাসন করার সুযোগ লাভ করেছিলেন। এজন্য তাদের কিছু আচার-সংস্কৃতিও সুলতানকে ধারণ করতে হয়েছিল।
বৈচিত্রময় প্রজাসমষ্টির মিশ্র সংস্কৃতির বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বলকান এলাকা ও এশিয়া মাইনরের ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে আত্মস্থ করেছিল তুর্কিরা। তাঁর আমলে নানা বর্ণ, গোত্র ও ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুলতানের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের সেবায় প্রাণপাত করেছে। এই যে বিপুল সংস্কার সাধিত হয় সুলতানের ত্রিশ বছর শাসনামলে, এর পেছনে খুব বেশিসংখ্যক রাষ্ট্রীয় কর্মচারীকে সম্পৃক্ত হতে হয়নি, খুব একটা খরচও হয়নি।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ ছিল ‘দিওয়ান’ ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন (সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত) পূর্বাহ্নে সালতানাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ বৈঠকে মিলিত হতেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন—উজিরে আজম বা প্রধানমন্ত্রী, গম্বুজমন্ত্রীবৃন্দ২০৯, সেনাবাহিনীর কাজি (কাজি আসকার), ইস্তাম্বুলের কাজি, জেনিসেরিপ্রধান এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।
সুলতানের অনুপস্থিতিতে উজিরে আজম দেওয়ানসভায় সভাপতিত্ব করতেন। প্রয়োজন হলে উজিরে আজম নিজ প্রাসাদেও দরবার আহ্বান করতে পারতেন। তাঁর আমলে প্রধানত বে, বেগলার বা বেকলারগণ প্রদেশ শাসন করতেন। তারা ছিলেন জায়গিরদারদের সর্দার। জায়গিরদারা যুদ্ধের সময় সুলতানকে সৈন্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকত। তারা জেলাপ্রধানের সানজাক বা পতাকার নিচে সমবেত হতো।
তুর্কি দিওয়ান ইনসাফের প্রাণশক্তি ধারণ করত এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিল। ইসলামের পরামর্শনীতি মেনেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো এবং বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো ঘোষণা করতেন সামরিক কাজি বা ইস্তাম্বুলের কাজি। কাজিগণ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন। তাই কোনো না কোনো বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সামরিক কাজি বা ইস্তাম্বুলের কাজির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতো। ফলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জনমনে আস্থা সৃষ্টি হতো।
প্রদেশসমূহের শাসকদের উদ্দেশ্যে সুলতান মুহাম্মাদ যে নির্দেশনা জারি করতেন, সেগুলোতে জ্ঞান বিস্তার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। জ্ঞানই হল উন্নতির সোপান আর ইনসাফের মাধ্যমে প্রজাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। ইনসাফের বিষয়টি সর্বদা জাগরুক রাখার জন্য সুলতান তাঁর জৌলুসময় সিংহাসনের পেছনে এই বাণীটি উৎকীর্ণ করে রেখেছিলেন- 'ইনসাফ হলো সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ।'
সাম্রাজ্যের প্রতিটি রন্ধ্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন সুলতান। এ ব্যাপারে তিনি উমার ইবনুল খাত্তাব-কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রায়শ দ্বিতীয় খলিফার অমর বাণী আওড়াতেন- 'আল্লাহর কসম! ইরাকেও যদি একটি ছাগী পতিত হয়, সেজন্য উমর জিজ্ঞাসিত হবে।' তাঁর পদক্ষেপ অনুসরণ করার জন্য তিনি সরকারি কর্মচারীদের বাধ্য করতেন। আর প্রজাদের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার তাগিদ দিতেন। ২১০
সেকালে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান অত্যন্ত কষ্টসাধ্য বিষয় ছিল। কারণ, চোর ও ডাকাতের উৎপাত-উপদ্রব ছিল অত্যধিক। সুলতানের সাম্রাজ্যে নানা জাতি-গোত্রের মানুষের বসবাস ছিল বলে জনগণের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারটি ছিল আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।
সালতানাতের জনমিতির বিন্যাস ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। একদিকে ছিল সালতানাতের বুনিয়াদ তুর্কিরা, আরও ছিল গ্রিক, স্লাভ, বুলগার ও আলবেনিয়ান জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। মুসলিম, অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক খ্রিষ্টানের সমন্বয়ে গঠিত জাতিগুলোর ধর্মীয় বণ্টনও ছিল বৈচিত্র্যময়। সুবিশাল অটোম্যান সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে এ লোকগুলো চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার মাঝে জীবনযাপন করত। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার বাইরে বসবাস করায় অস্থিরতা ও মৃত্যুশঙ্কা তাদের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়েছিল।
বিভিন্ন জাতিধর্মের প্রজাদের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য এবং আন্তঃধর্ম শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে সুলতান কিছু নিয়মনীতি প্রবর্তন করেন। এভাবে ইনসাফ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। চোর-ডাকাত দমনে সুলতান কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের ওপর ইসলামের বিধান আরোপ করেন। ধীরে ধীরে সুবিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র নিশ্চিন্ততা ও নিরাপত্তা ছড়িয়ে পড়ে।
শরিয়াহর বিধানের প্রাতিষ্ঠানীকরণ সুলতানের মুহাম্মাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিবেচনার পর তিনি সেরা আলিমগণের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন উজিরে আজম কারামানলি মুহাম্মাদ পাশা ও তার সচিব লায়সজাদা মুহাম্মাদ চেলেবি। তারপর তাদের সম্পাদনায় 'ফাতিহ কানুন নামা সি' বা ফাতিহের সংবিধান প্রবর্তন করেন-যা ছিল তাঁর রাজ্যশাসনের মূলভিত্তি।
কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত 'কানুন নামা'য় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব-কর্তব্য, কতিপয় প্রথা, সুলতানি অনুষ্ঠান সম্পাদন পদ্ধতি, দণ্ড ও জরিমানাবিধি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ বিবরণে ইসলামি আইনের প্রাধান্য সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত ছিল এবং জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলিম উপাদানের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা ছিল। উসমানি রাজ্যশাসন প্রণালি লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করায় ফাতিহ 'কানুনি মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত। এই আইননামার মূল ধারাগুলো ১৮৩৯ খিষ্টাব্দ পর্যন্ত তুর্কি সালতানাতে কার্যকর ছিল। ২১১
প্রশাসনের দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন সাদরে আজম-চারজন মন্ত্রী তাঁর সহায়তার জন্য নিয়োজিত ছিলেন। সাদরে আজম পদাধিকার বলে সৈন্যবাহিনীর প্রধান ও দিওয়ানপ্রধান ছিলেন। পূর্ববর্তী সুলতানদের আমলে প্রচলিত ব্যবস্থাকে তিনি বাতিল করেননি। তবে সমকালীন চাহিদার আলোকে কিছু পরিবর্তন আনেন।
সালতানাতের অধীনে কিছু বড়ো প্রদেশ ছিল-যা আমিরুল উমারা বা 'বাকলার বেক' দ্বারা শাসিত হতো। আর কিছু ছিল ছোটো প্রদেশ-যেগুলোর শাসনকর্তাকে আমিরুল লিওয়া বা 'সানজাক বেক' বলা হতো। এরা যুগপৎভাবে প্রদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান ছিলেন। স্লাভ জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত কয়েকটি প্রদেশকে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। তারা ছিল স্থানীয় রাজা। তবে সম্রাটের আদেশ-নিষেধকে তাদের নিপুণভাবে মেনে চলতে হতো। অবাধ্য হলে বা বিদ্রোহাত্মক কর্মকাণ্ড চালালে সুলতান তাদের অপসারণ করতেন, কখনো-বা শাস্তি দিতেন। ছোটো ও বড়ো প্রদেশের শাসনকর্তারা যুদ্ধের সময় সুলতানকে সৈনিক জোগান দিতেন। প্রদেশের আয়তন ও জনসংখ্যার ওপর সৈন্যসংখ্যা নির্ধারিত হতো। প্রতিটি প্রদেশ থেকে অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী সরবরাহ করা হতো। এরা পাশা ও বেকদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। ২১২
সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেন। তাঁর দৃষ্টিতে সেনাবাহিনী হলো সাম্রাজ্যের ভিত্তি। তাই তিনি সেনাসংগঠন পুনর্নির্ধারণ করেন। প্রতিটি সেনা ইউনিটকে একজন আগা-এর নেতৃত্বে অর্পণ করা হয়। তবে 'সাধারণ আগা'-এর চেয়ে 'জেনিসেরি আগা'কে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধান সেনাপতি তথা সাদরে আজমের কাছ থেকে 'আগা'রা সরাসরি নির্দেশনা লাভ করতেন।
ফাতিহ-এর আমলে কেবল ইউরোপেই ৩৬টি সানজাক ছিল, যুদ্ধের সময় প্রতিটি থেকে ১০০ অশ্বারোহী সৈন্য পাওয়া যেত। সমগ্র সালতানাতে অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ। আজব ও আকিঞ্জিদের সংখ্যা এর বাইরে। এ সময় জেনিসেরির সংখ্যা ছিল ১২ হাজার।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ স্বনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতের জন্য কারখানা স্থাপন করেন-যেখানে সামরিক পোশাক, বর্ম, শিরস্ত্রাণ ও অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হতো। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পয়েন্টে কেল্লা ও দুর্গ স্থাপন করা হয়। যুদ্ধরত সৈনিকদের সব ধরনের রসদ অর্থাৎ জ্বালানি, খাবার, পশুখাদ্য ও অ্যামুনিশন বাক্সসহ অন্যান্য সামগ্রীর জোগান দেওয়া হতো। এজন্য একদল ভারবাহী পশু নিয়তই তুর্কি বাহিনীর অনুগমন করত। একশ্রেণির সৈনিকের নাম ছিল 'লাগমাজিয়া'-এরা মাইন পুঁতে রাখত আর বিজয়েচ্ছু কেল্লার প্রাচীরতলে সুড়ঙ্গ খনন করত। আরেক দলের দায়িত্ব ছিল সৈনিকদের পানি পান করানো। সত্যিকার অর্থে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে খ্রিষ্টান জগতের কোনো রাজ্যই এরূপ দৃশ্যত উদার, অথচ মিতব্যয়ী সামরিক নীতি অবলম্বন করেনি।
উসমানি প্রাসাদের অভ্যন্তরে 'আন্দরুন হুমায়ুন' নামে এক প্রকারের বিশেষায়িত সামরিক প্রতিষ্ঠান ছিল। এখান হতে দক্ষ প্রকৌশলী, চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক, প্রকৃতি ও মহাকাশবিজ্ঞানী বের হতেন-যারা উসমানি সেনাবাহিনীকে সর্বতোভাবে সহায়তা করতেন। এসব প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারীরা তখন বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন।
নৌবাহিনীর প্রতি সুলতানের গুরুত্ব স্থলবাহিনীর চেয়ে কম ছিল না। কনস্টান্টিনোপল জয়ের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল তুর্কি নৌবাহিনীর দুর্বলতা। এ সত্য উপলব্ধি করে সুলতান নৌবাহিনীকে শক্তিশালী এবং বিজয়ের পর এ ব্যাপারে আরও বেশি মনোযোগ প্রদান করেন। ১৪৫৫ হিজরিতে সুলায়মান পাশা বালতা উল্লুকে নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। ইতঃপূর্বে তুর্কি বাহিনীতে এই পদই ছিল না। কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর সুলতান নৌবাহিনীর ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন, ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরে তুর্কিদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফাতিহের ক্ষমতারোহণের সময় তুর্কি নৌবহরে মাত্র ৩০টি যুদ্ধজাহাজ ছিল। ভেনিসের নৌবাহিনীতে ছিল কয়েকগুণ বেশি যুদ্ধযান। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ নৌবাহিনীর উন্নয়নে এতটা মনোযোগী হন, ১৪৮০ সালে তুর্কি নৌবাহিনীতে জাহাজসংখ্যা বেড়ে হয় ২৫০টি। প্রতিটি জাহাজে কামান সংযোজিত ছিল। আর পরিবহণের নৌকা ছিল ৫০০টি। ফলে তুর্কি নৌবাহিনীর আকার ভেনিসের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
তুর্কি নৌবহর পরিচালনার দায়িত্বে ছিল 'তারসানা' বা 'আজব' নামে পরিচিত এক বিশেষ বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার-যাদের মধ্যে ক্যাপ্টেন, নৌকাধিপতি ও নাবিকসহ বিভিন্ন স্তরের সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। নৌবাহিনীর ব্যাপারে যথাযথ গুরুত্ব প্রদানের কারণে সুলতানকে 'তুর্কি নৌবহরের প্রতিষ্ঠাতা' হিসেবে গণ্য করা হয়। ২১৩
ভূমি ব্যবস্থাপনা
উসমানি সালতানাতে বিজিত জনপদ তিন ভাগে বিভক্ত করা হতো। এক ভাগ ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়াক্ফ করা হতো। এর আয় মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করা হতো। দ্বিতীয় ভাগ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে গণ্য হতো। মালিক মুসলিম হলে উৎপন্ন ফসলের এক-দশমাংশ (ক্ষেত্রবিশেষে তার অর্ধেক) উশর হিসেবে আদায় করত। মালিক খ্রিষ্টান হলে অষ্টমাংশ হতে অর্ধেক কর দিত। তা ছাড়া মুসলমানরা জাকাত ও অমুসলিমরা জিজিয়া দিত। বিজিত ভূমির অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ সরকারি ভূমি বলে গণ্য হতো। এর বড়ো অংশই বণ্টন করা হতো খ্যাতনামা সৈনিকদের মাঝে।
তিন হতে পাঁচশত একর আয়তনের ছোটো জায়গিরকে ‘তিমার’ বলা হতো। আর পাঁচ শতাধিক একর জমির জায়গিরকে বলা হতো ‘জিমায়েত’। সামরিক জায়গিরদারদের সিপাহি বলা হতো। প্রতি ৩০০০ মুদ্রা আয়ের জন্য তাদের যুদ্ধের সময় একজন অশ্বারোহীর জোগান দিতে হতো। পুরুষ উত্তরাধিকারীরা বংশসূত্রে ‘তিমার’ ও ‘জিমায়েত’-এর জায়গির লাভ করত। কোনো জায়গিরদার লা-ওয়ারিশ মারা গেলে বা জায়গির বাজেয়াপ্ত হলে জেলার শাসক বা বেগলার সুলতানের অনুমোদনক্রমে নতুন জায়গিরদার নিয়োগ দিতেন।
ইউরোপীয় সামন্তপ্রথা ও তুর্কি জায়গিরপ্রথার মাঝে যথেষ্ট মিল থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের ন্যায় উসমানি সালতানাতে অভিজাতশ্রেণি গড়ে ওঠেনি। তুরস্কের প্রাথমিক সুলতানদের অসাধারণ উদ্যম ও প্রতাপ, জেনিসেরি বাহিনী, তুর্কিদের ধর্ম ও জাতীয় চরিত্রই এর প্রধান কারণ। খ্রিষ্টীয় ইউরোপের মতো ইসলামি তুরস্কে যাজকতন্ত্র ছিল না। সুলতানরা নিজেরাই মুফতি, কাজি ও ধর্ম বিভাগের কর্মচারী নিয়োগ দিতেন। ফলে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের মতো সুলতানদের পোপতন্ত্রের বিরোধিতা মোকাবিলা করতে হয়নি। জেনিসেরির মতো দৃঢ় ও স্থায়ী বাহিনী থাকায় তাঁরা জায়গিরদারদের যেকোনো অবাধ্যতা কঠোর হাতে দমন করতে পারতেন। ইউরোপের সামন্তদের ন্যায় তুর্কি জায়গিরদারদের যুদ্ধ, বিচার ও জমি পত্তনের ক্ষমতা ছিল না। ফলে তারা সৈন্য পুষে এবং দুর্গাদি নির্মাণ করে ‘রাজ্যের ভেতর রাজ্য’ গড়ে তুলতে পারেনি। ২১৪
সভ্যতার নির্মাণকারী কর্মকাণ্ড
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ ছিলেন একজন উঁচু স্তরের প্রশাসক ও ব্যবস্থাপক। তাঁর আমলের সামরিক ও বেসামরিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আমরা সুলতানের সভ্যতা নির্মাণকারী কিছু কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
উসমানি সুলতানগণ শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে মনোযোগী ছিলেন। সুলতান ওরহান সাম্রাজ্যে প্রথম আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সুলতানগণ তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছিলেন। সুলতান ফাতিহও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা স্থাপনের পাশাপাশি তিনি শিক্ষা সম্প্রসারণে উদ্যোগী হন। আলিম, ধর্মনেতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি সম্মানসূচক মনোভাব পোষণ করতেন। কারণ তিনি জানতেন, কেবল বৈষয়িক ও সামরিক শক্তি জাতির সৌভাগ্য ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে না। সামরিক ও রাজনৈতিক অর্জন ধরে রাখতে হলেও শিক্ষিত জাতির প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্ঞান, ঈমান ও ইনসাফের শক্তিতে বলীয়ান হওয়া উচিত। তাই তাঁর সাম্রাজ্যকে জ্ঞানকেন্দ্র, জ্ঞানীদের বিচরণভূমি ও ইনসাফের কেন্দ্রে পরিণত করতে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল নিরন্তর।
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সূচনা হতেই উসমানি শাসকরা দক্ষ বিচারক ও যোগ্য জুরি বা ফকিহ-এর ওপর নির্ভর করতেন। বিচার ও জনপ্রশাসনের যোগ্যতাসম্পন্ন আলিমগণের স্কন্ধে এ দায়িত্ব অর্পণ করা হতো। এদের বেশিরভাগ আনাতোলিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করতেন। অনেকে ছিলেন মিশর, সিরিয়া ও ইরানসহ বহির্দেশীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রাপ্ত। কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পর সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির পাশাপাশি সরকারের কার্যপরিধিও বেড়ে যায়। ফলে বিচার ও জনপ্রশাসনে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য শিক্ষা-দীক্ষার ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ৮৭৫ হিজরিতে/১৪৭০ সালে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ নতুন রাজধানীতে একটি বৃহদাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষ শিক্ষকের অভাব পূরণের জন্য তিনি সালতানাত বহির্ভূত বিভিন্ন ইসলামি রাজ্য হতে শীর্ষস্থানীয় আলিম ও শিক্ষকগণকে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসেন। এজন্য তাঁদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি প্রদান করেন।২১৫
অল্পদিনের ব্যবধানেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুফল পাওয়া যেতে শুরু করে। বহু আলিম-ফকিহ ও কবি-সাহিত্যিক ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেন-যাদের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। সুলতান আয়া সোফিয়ার কাছেও একটি মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন, মওলা খসরুকে যেটি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। অল্পদিনের মধ্যে এই মাদরাসাটিও সমকালীন অন্য মাদরাসাগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে সমর্থ হয়। এটির সুনাম এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, মুসলিম দুনিয়ার নানা প্রান্তের জ্ঞানার্থীরা এর পানে ছুটে আসতে থাকে।
ফাতিহের শাসনামলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার স্তর
ফাতিহের আমলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার স্তর ছিল চারটি : প্রথম স্তরের নাম ছিল আল-খারিজ দ্বিতীয় স্তরের নাম আল-দাখিল তৃতীয় স্তর মুসিলা আস-সাহন এবং চতুর্থ স্তরের নাম আস-সাহন।
প্রথম স্তর তথা আল-খারিজের পাঠ্যসূচির মধ্যে ছিল হিফজুল কুরআন, প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা, প্রাথমিক গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। দ্বিতীয় স্তরে মাকাসিদুল উলুম, ফিকহ, ইসলামের ইতিহাস ও আরবি ভাষা পাঠদান করা হতো। এটি বিশেষায়িত স্তর ছিল না, এ স্তর পাশ করার পর ছাত্ররা সাধারণ মানের চাকরি পেত। তবে বিশেষায়িত শিক্ষালাভের জন্য শিক্ষার্থীকে তৃতীয় স্তরে ভর্তি হতে হতো। এটিকে পুরোপুরি বিশেষায়িত শিক্ষা না বলে তার প্রস্তুতি বলাই ভালো। তৃতীয় স্তর সাফল্যজনকভাবে সমাপ্ত করার পর একজন শিক্ষার্থী বিশেষায়িত শিক্ষালাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতো।
চতুর্থ স্তর আস-সাহনকে বর্তমান যুগের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সাথে তুলনা করা যায়। জামে ফাতিহ-এর চতুর্দিক স্থাপিত আটটি মাদরাসায় এ স্তরের পাঠদান করা হতো। এগুলোর পেছনে চতুর্দিকে ছিল আরও আটটি মাদরাসা, যেগুলোতে তৃতীয় স্তর বা প্রাক-বিশেষজ্ঞ স্তরের পাঠদান করা হতো। ভূমধ্যসাগরের সাগরের দিকে চারটি সাহন ও চারটি প্রি-সাহন মাদরাসা এবং কৃষ্ণসাগরের দিকেও চারটি সাহন ও চারটি প্রি-সাহন মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সুলতানের ওয়াকফনামায় সাহন মাদরাসাগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল 'মাদারিস আলিয়া' এবং প্রি-সাহন মাদরাসাগুলোর নাম ছিল 'মাদারিস সুগরা'।
স্তরগত বিদ্যার্জন মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। মূল্যায়ন ব্যতিরেকে কেউ এক স্তর হতে অন্য স্তরে উন্নীত হতে পারত না। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বিষয়াদি সুলতান নিজে তত্ত্বাবধান করতেন। মাঝে মাঝে তিনি পরীক্ষা হলে উপস্থিত হতেন; এমনকী পাঠদান কক্ষে উপবেশন করতেও তিনি কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কৃতি ছাত্র ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষকগণকে পুরস্কার প্রদানেও তিনি কৃপণতা করতেন না। উল্লেখ্য যে, সকল স্তরের শিক্ষা ছিল অবৈতনিক।
সুলতান মুহাম্মাদ পূর্ণাঙ্গ আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। এ লক্ষ্যে মাদরাসাগুলোর পাশে খাবার ঘর ও হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছিল। এ হাসপাতালগুলোতে শুধু রোগীর চিকিৎসা প্রদান করা হতো না; বরং ছাত্রদের পাঠদানও করা হতো। অর্থাৎ এগুলো ছিল মেডিকেল কলেজ কাম হাসপাতাল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল। অনেকটা আধুনিক পদ্ধতিতে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। দক্ষ লাইব্রেরিয়ান একটি রেজিস্টারে রেকর্ডভুক্ত করে ছাত্রদের বই ধার দিতেন। নির্দিষ্ট সময় পর বইগুলো ফেরত দেওয়া হতো।
মাদরাসাগুলো হতে বিচারক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, বণিক ও শিক্ষক বের হতো। সাহন-এর স্নাতকরা সাধারণত উচ্চ পর্যায়ের বৈষয়িক যোগ্যতার পাশাপাশি উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হতেন। কারণ, সর্বপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ও পরিপালনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হতো। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্নাতকরা বিভিন্ন পর্যায়ে দেশের সেবা করে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। ২১৬
গুণীর কদর
জ্ঞানার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের ন্যায়। আর শিক্ষাগুরু হন সেই প্রকৌশলী-যিনি কচি শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের মানুষে পরিণত করেন। আর তাই শিক্ষকের মুল্যায়ন ব্যতীত জ্ঞানের প্রসারণ সম্ভব নয়। এ সত্যটি সুলতান মুহাম্মাদ শুধু উপলব্ধিই করেননি; বরং আলিম-ওলামা ও জ্ঞানী-গুণীর কদর ও সম্মানের প্রকৃষ্ট নমুনা স্থাপন করেছিলেন। তাঁর জীবনের বহু ঘটনা এর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
কারামান জয়ের পর সুলতান ওই শহরের শ্রমিক ও কারিগরদের কনস্ট্যান্টিনোপলে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। কিন্তু সুলতানের প্রতিনিধি রুম মুহাম্মাদ পাশা স্থানীয়দের ওপর জুলুম শুরু করে। মজলুমদের মাঝে কয়েকজন আলিম ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ছিলেন। এদের একজন ছিলেন আহমদ চেলেবি বিন সুলতান আমির আলি।
এ ঘটনা জানতে পেরে সুলতান মুহাম্মাদ মজলুম শাইখের কাছে দুঃখ প্রকাশ এবং সঙ্গী-সাথিসহ তাঁকে মাতৃভূমিতে সসম্মানে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করেন।
উজুন হাসান নামে এক তুর্কমেন সর্দার ছিলেন। তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিল উসমানি সালতানাতের বিরোধিতা করা। সে প্রায়শ চুক্তি ভঙ্গ আর সালতানাতের শত্রুদের সহায়তা করত। তার পরাজয়ের পর অনেকে ধৃত হন। সুলতান এদের মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে হাসানের অনুগত আলিম-ওলামাদের ছেড়ে দেন। তাঁদের একজন ছিলেন কাজি মুহাম্মাদ আল-শুরাইহি-যাকে যুগশ্রেষ্ঠ আলিম বলে গণ্য করা হতো। সুলতান তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করেন।
আরেকটি ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় : শাইখ আহমদ কুরানি সামরিক কাজির পদে কর্মরত ছিলেন। সুলতান তাঁর কাছে এক ফরমান প্রেরণ করেন। শাইখ দেখলেন ওই হুকুমনামায় শরিয়াহ বিরোধী আদেশ ছিল। শাইখ শুধু আদেশটি অগ্রাহ্যই করেন না; বরং তিনি তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দেন এবং পত্রবাহককে শাস্তি দেন। এ খবর পেয়ে সুলতান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং কুরানিকে পদচ্যুত করেন। এ ঘটনায় দুজনের সম্পর্ক এত তিক্ত হয়ে পড়ে যে, কুরানি সালতানাত ত্যাগ করে মিশরে চলে যান। তথায় মিশরীয় শাসক কাতবাই শাইখকে সাদরে গ্রহণ করেন। কুরানি কিছুদিন মিশরে কাটালেন।
এতদিনে সুলতানের মন প্রসন্ন ও বোধোদয় হয়। তিনি সুলতান কাতবাইকে অনুরোধ করেন শাইখকে ফেরত পাঠানোর জন্য। মিশরের সুলতান শাইখকে নিজের কাছে রেখে দিতে চাইলেন, কিন্তু আহমদ কুরানি বললেন-'আপনার বক্তব্য যথার্থ, তবে আমার ও সুলতান মুহাম্মাদের সম্পর্ক অনেকটা পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ন্যায়। যা ঘটেছে, তাঁর ভিন্ন প্রেক্ষাপট ছিল। তিনি জানেন, আমি প্রকৃতিগতভাবে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট এবং তাঁর এ আহ্বান উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এখন আমি যদি তাঁর ডাকে সাড়া না দিই, তাহলে তিনি মনে করবেন যে, আপনি আমাকে বাধা দিয়েছেন। এর ফলে আপনার ও তাঁর মাঝে সম্পর্ক বিনষ্ট হতে পারে।' শাইখের অপারগতাপূর্ণ বক্তব্য সুলতানের পছন্দ হয়। তিনি তাঁকে বিপুল হাদিয়া ও পথ খরচের ব্যবস্থাসহ ইস্তাম্বুল পাঠিয়ে দেন। আর সুলতান মুহাম্মাদের জন্য যথোপযুক্ত উপঢৌকন পাঠান। সুলতান ফাতিহ তাঁর পুরোনো শিক্ষককে পুনরায় সাদরে বরণ করে নিয়ে তাঁকে প্রথমে কাজি এবং পরে মুফতি পদে নিয়োগ দেন। ২১৭
শাওকানি বলেন- 'তিনি সামরিক কাজির পদ ছেড়ে ফতোয়ার পদ অলংকৃত করেন। এক পর্যায়ে তিনি শীর্ষ আলিমগণের মধ্যমণিতে পরিণত হন। তিনি ব্যাপকহারে মুফাসসির জালালুদ্দিন মাহাল্লির অনুকরণ করতে থাকেন- যা তাঁকে 'তাফসির' রচনা ও 'সাহিহুল বুখারির ভাষ্য' প্রণয়নে উৎসাহ জোগায়। ছয় শত পঙ্ক্তিবিশিষ্ট ছন্দশাস্ত্রের ওপর একখানা গ্রন্থও তিনি রচনা করেন। শাইখ কুরানি ইস্তাম্বুলে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে এর নাম দেন দারুল হাদিস। এখানকার ছাত্রদের মাধ্যমে তাঁর ইলম ছড়িয়ে পড়ে। শাইখ আহমদ কুরানি ৭৬১ হিজরীতে হজব্রত সম্পাদন করেন। সফল ও কর্মময় জীবনের অন্তে ৭৯৩ হিজরিতে তিনি মারা যান। সুলতান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। সুলতান সম্পর্কে শাইখ কুরানি কাসিদা রচনা করেছিলেন যার প্রথম লাইন ছিল নিম্নরূপ: তিনি সূর্য, তবে তিনি বীরত্বে ব্যাঘ্র, তিনি সমুদ্র, তবে স্থলপতি।'২১৮
সুলতান সম্পর্কে রচিত তুর্কি কাসিদাটি আরবিতে অনুবাদ করেছেন শাকাইক নুমানের গ্রন্থকার। বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী শাইখ কুরানি মাথা নুইয়ে সুলতানকে কুর্নিশ করতেন না এবং তাঁর হাতে চুমুও খেতেন না। তিনি কেবল মুসাফাহা করতেন। তা ছাড়া সুলতান ডেকে না পাঠালে তিনি সাধারণত রাজদরবারে ঘেঁষতেন না।'
কাব্যরসিক সুলতানের সাহিত্যে পৃষ্ঠপোষকতা তুর্কি সাহিত্যের ইতিহাস লেখকদের মতে সুলতান ছিলেন একজন সাহিত্যরসিক ব্যক্তি। সাহিত্য সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন, তবে কবিতার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন সবিশেষ। তাঁর মন্ত্রীদের মাঝে অনেকে কবি ছিলেন। যেমন: আহমদ পাশা মাহমুদ, মাহমুদ পাশা, কাসিম আল-জাজারি পাশা। তাঁর প্রাসাদের সব সময় কবিতার আসর বসত। প্রায় ৩০ জন কবির প্রত্যেককে সুলতান ১ হাজার দিরহাম করে মাসোহারা দিতেন। ফলে সেই আমলের তুর্কি কাব্যে আমরা সুলতান প্রশস্তির সমাহার দেখতে পাই। সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কবি- সাহিত্যিকদের কেবল উৎসাহই দিতেন এমন নয়; বরং তাদের ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। যেসব কবি অশ্লীলতা ও বিকৃত রুচির চর্চা করতেন, সুলতান তাদের দরবার থেকে বের করে দিতেন, কখনো-বা কারাগারে নিক্ষেপ করতেন। ২১৯
অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ বহুভাষী ছিলেন। মাতৃভাষা তুর্কি ছাড়াও তিনি আরবি, ফারসি, রোমান, গ্রিক ও স্লাভ ভাষা জানতেন। নিজ জাতির মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আরবি, ফারসি, লাতিন, রোমান ও গ্রিক ভাষায় রচিত নির্বাচিত গ্রন্থাবলি তুর্কি ভাষায় অনুবাদের নির্দেশ দেন। তাঁর আমলে অনূদিত গ্রন্থগুলোর মাঝে রয়েছে-প্লুতার্ক রচিত মাশাহিরুর রিজাল এবং আন্দালুসিয়ান চিকিৎসাবিজ্ঞানী আবুল কাসিম আজ-জাহরাভি রচিত কিতাবুত-তাসরিফ ফিত তিব। এটি ছিল শল্যচিকিৎসা বিষয়ক একটি গ্রন্থ। অনুবাদের সময় শল্যচিকিৎসার কিছু ছবি এবং অপারেশনকালে সৃষ্ট কিছু রোগের বিবরণ সংযোজন করা হয়।
টলেমির ভূগোলের প্রতি সুলতানের বিশেষ আগ্রহ ছিল। রোমান পণ্ডিত জর্জ অ্যামিরোটিজের সহায়তায় সুলতান সেটি অধ্যয়ন করেন। তারপর জর্জ ও তাঁর পুত্রকে বইটি আরবিতে অনুবাদের দায়িত্ব অর্পণ করেন। পণ্ডিত পিতা-পুত্র আরবি ও রোমান উভয় ভাষায় বুৎপন্ন ছিলেন। সুলতানের পৃষ্টপোষকতায় তাঁরা টলেমির ভূগোল গ্রন্থের আরবি অনুবাদ সম্পন্ন করেন। আরবি সংস্করণে নতুনভাবে মানচিত্র অঙ্কন এবং স্থাননাম আরবি ও রোমান ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়। উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন যে, মুহাম্মাদ ফাতিহ দুই অনুবাদককে সুলতানি প্রতিদানে ভূষিত করেছিলেন। সেকালে আল্লামা কুশজি (মৃ. ৭৮৯ হি.) নামে একজন বড়ো জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ ছিলেন। তিনি যখনই ফরসি ভাষায় কোনো গ্রন্থ রচনা করতেন, তখনই তা আরবিতে অনুবাদ করে সুলতানকে উপহার দিতেন।
আল কুরআনের ভাষা আরবি। স্বাভাবিকভাবেই সেকালের ইসলামি জ্ঞানভান্ডার এ ভাষাতেই রক্ষিত হয়েছিল। তাই সুলতান মুহাম্মাদ আরবি ভাষার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দিতেন। উসমানি শিক্ষালয়গুলোতে আরবি ভাষায় রচিত ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি অভিধানগ্রন্থ (যেমন: সিহাহ, তাকমিলা, কামুস, ইত্যাদি) সংগ্রহ করা হতো। সালতানাতের নানা স্থানে গণগ্রন্থাগার স্থাপনের মাধ্যমে তিনি শিক্ষিত জাতি গঠনে সচেষ্ট হন। গ্রন্থাগারগুলো সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি জ্ঞানের নানা শাখার বই আরবি ও তুর্কি ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। সুলতানের প্রাসাদে একটি লাইব্রেরি ছিলেন, বিভিন্ন ভাষায় রচিত নানা বিষয়ের গ্রন্থে সেটি ছিল পূর্ণ। শাইখ লুৎফিকে এ ভান্ডারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। ১৪৬৫ সালে এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ১২০০০ গ্রন্থসমৃদ্ধ সুলতানি গ্রন্থভান্ডার ভস্মীভূত হয়। প্রফেসর ডিজমান এটিকে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জ্ঞানভান্ডারের সীমানাপ্রাচীর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ২২০
নির্মাণ ও স্থাপত্যশিল্পে মনোযোগ
সুলতানের শিল্পবোধ কেবল কাব্য আস্বাদনে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি স্থাপত্যশিল্পের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের অপূর্ব গির্জা ও প্রাসাদ সুলতানের শিল্পবোধ বাড়িয়ে দিলো। স্থাপত্যশিল্প-সংক্রান্ত সুলতানের মনোযোগের বড়ো কেন্দ্রে ছিল খোদ রাজধানী শহর। বাইজেন্টাইন রাজধানী জয়ের অব্যবহিত পরেই সুলতান এই শহরে একজন গভর্নর নিয়োগ দেন। অতঃপর তাকে নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করে শহরে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের নির্দেশ দেন। তুর্কি সালতানাতের রাজধানী হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে শহরের আয়তন বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাই পার্শ্ববর্তী কিছু এলাকা রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। আনাতোলিয়া ও রোমেলির শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয় কিছু অধিবাসীকে কনস্টান্টিনোপলে প্রেরণ করার জন্য। ফলে ওইসব অঞ্চলের বহু পরিবার রোজগার বৃদ্ধি ও উচ্চপদ লাভের আশায় রাজধানীতে পাড়ি জমায়। এভাবে ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রাচীন শহর কনস্টান্টিনোপল আয়তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে নবযৌবন লাভ করে।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কনস্টান্টিনোপলে বহু মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রাসাদ, হাসপাতাল, সরাইখানা, গণগোসলখানা, বাজার ও প্রশস্ত বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। খাল ও নালা খনন করে শহরে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর নির্দেশে সালতানাতের পদস্থ ব্যক্তি ও ধনী নাগরিকবর্গ সুরম্য বাড়ি ও দোকানপাট স্থাপন করেন। এভাবে জনসংখ্যা ও স্থাপনা বেড়ে গিয়ে সুলতানের শাসনকালেই কনস্টান্টিনোপলের আয়তন পূর্ববর্তী শাসক কনস্টান্টাইনের সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেড়ে যায়।
সুলতানের স্থাপত্য নিদর্শনের মাঝে রয়েছে, 'দার আল-সায়াদাহ আল-কাদিমা'- যা সুলতান প্রথম বায়েজিদ কর্তৃক নির্মিত মসজিদের কাছে স্থাপন করা হয়েছিল।
এই শহর জয়ের পর উসমান বংশীয় কোনো শাসক কর্তৃক নির্মিত প্রথম সরকারি অফিস ছিল এটি। আরেকটি বিশ্রুত স্থাপত্য হল সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ মসজিদ। কনস্টান্টিনোপলের চতুর্থ টিলার ওপর বাইজেন্টাইন চার্চ অব হলি অ্যাপস্টল-এর স্থলে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। চার্চটি চতুর্থ ক্রুসেডের সময় হতে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। মসজিদটির স্থপতি ছিলেন গ্রিক স্থপতি আতিক সিনান, (খারাসতু দুলুস)। অনুপম এই মসজিদে দুটি সুউচ্চ মিনার ছিল। এমন পরিকল্পনায় মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল, যেন এটি দেখে দূর হতে সমুদ্রচারীরা কনস্টান্টিনোপলের ইসলামি প্রাণশক্তি অনুভব করতে পারে।
কনস্টান্টিনোপলের প্রবেশমুখে নির্মিত আবু আইউব মসজিদ এবং এদিন গেটের কাছে স্থাপিত শাইখ বুখারি মসজিদ ও জেনিসেরি মসজিদ বা উরতা জামিই ছিল ফাতিহের অনন্য স্থাপত্যকীর্তি। ইস্তাম্বুল শহরে প্রথম লাইব্রেরিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ। এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ভাষায় রচিত বহুসংখ্যক গ্রন্থ সংরক্ষণ করেছেন। পরবর্তী সুলতানরাও এক্ষেত্রে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। মর্মর সাগরের তীরে 'কুতশাক আয়া সোফিয়া' বা 'ছোটো আয়া সোফিয়া' নামে একটি মসজিদও স্থাপন করা হয়। মূলত সেন্ট সার্জিস গির্জাকে সংস্কার করে এটিকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। গোল্ডেন হর্নে একটি মসজিদ নির্মাণ করে নবম শতাব্দীর বিখ্যাত সুফি জিরক-এর নামানুসারে সেটির নামকরণ করা হয়। ২২১
হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা
সুলতান মুহাম্মাদ রাজধানী কনস্টান্টিনোপল ও অন্যান্য শহরে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু অবকাঠামোগত নির্মাণেই স্বাস্থ্যসেবা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি প্রতিটি হাসপাতালে একজন করে চিকিৎসক নিয়োগ দেন। পরবর্তী সময়ে আরও একজন নিয়োগ দেওয়া হয়। চিকিৎসককে সহায়তার জন্য থাকতেন চক্ষু-চিকিৎসক, শল্যবিদ, ফার্মাসিস্ট, প্রয়োজনীয় কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী। হাসপাতালে দয়াদ্র ও মানবিক গুণসম্পন্ন প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হতো। চিকিৎসকগণ দৈনিক কমপক্ষে দুই বার রোগীদের দেখতেন। অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সাথে ওষুধ বানানো হতো। হাসপাতালের পাচককে রোগীর পথ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতে হতো। বলাবাহুল্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য হাসপাতাল উন্মুক্ত ছিল। ওষুধ ও চিকিৎসাও ছিল বিনামূল্যে।২২২
ব্যাবসা-বাণিজ্য ও শিল্প সুলতান ফাতিহ ব্যাবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সকল রকমের উপায়-উপকরণের প্রয়োগে এর উন্নতির জন্য কাজ করেন। এ কাজে তিনি তাঁর পূর্বসূরি সুলতানদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেন; যারা প্রজাদের ব্যাবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য সর্বদা উদ্যোগী ছিলেন। বাইজেন্টাইন দুঃশাসনে পিষ্ট বহু শহর তুর্কি বিজয়ের পর ব্যাবসা-বাণিজ্যে বিপুল উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়। উসমানীয়রা ব্যাবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন এবং স্থল ও সমুদ্রপথে ব্যাবসা পরিচালনায় তাদের পরিপক্বতাও ছিল সুবিদিত। সুলতান ফাতিহ পুরোনো বাণিজ্যপথ সংস্কার সাধনের মাধ্যমে উন্নত এবং বড়ো বড়ো সেতু নির্মাণ করেন। ফলে সালতানাতের সর্বত্র ব্যাবসা-বাণিজ্যের পথ সুগম হয়। বাণিজ্যিক বিনিময় লাভের সুবিধার্থে অন্যান্য রাজ্যগুলোও তুর্কি ব্যবসায়ীদের জন্য তাদের বন্দরসমূহে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান করে। ব্যাবসা-বাণিজ্যের উন্নতির ফলে সালতানাতের সর্বত্র সুখ-শান্তি ও প্রাচুর্য ছড়িয়ে পড়ে। তুর্কি স্বর্ণমুদ্রাও আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে বিশেষ অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়।২২৩
ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শাসকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। অন্যান্য উসমানি সুলতানের ন্যায় মুহাম্মাদ ফাতিহও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্যগ্র ছিলেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরেজমিন তদন্তের জন্য তিনি কখনো কখনো খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের রাজ্যময় প্রেরণ করতেন। অনুসন্ধান ও তত্ত্ব তালাশের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করে তাদের লিখিত ফরমান প্রদান করা হতো। প্রদত্ত কর্তব্য বিষয়ে পর্যাপ্ত তত্ত্বানুসন্ধানের পর তারা সুলতানের কাছে প্রতিবেদন পেশ এবং তদানুযায়ী তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।
অবশ্য নিরপেক্ষ খ্রিষ্টান পর্যবেক্ষকগণের প্রতিবেদন সর্বদা রাজ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বিবরণে সমৃদ্ধ থাকত। যুদ্ধযাত্রার সময় মাঝেমধ্যে সুলতান নিজেও বিভিন্ন রাজ্যে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান করতেন। এ সময় জনসাধারণ সরাসরি সুলতানের কাছে অভিযোগ পেশ করতে পারত এবং তিনিও জুলুমের প্রতিবিধান করতেন।
সুলতান এ বিষয়ে সম্যক অবগত ছিলেন যে, ফকিহ ও আলিমগণই ইনসাফ সম্পর্কে সর্বাধিক পরিজ্ঞাত। তিনিও এটিও জানতেন, মানব শরীরে হৃদপিণ্ডের যে স্থান, রাজ্যে আলিমগণের অবস্থানও অনুরূপ। তাই তাঁর রাজ্যে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানীদের কদর ছিল সর্বাধিক। জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা-দীক্ষার প্রসারের সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেন সুলতান। এক্ষেত্রে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শিক্ষাব্যবস্থা অবৈতনিক এবং শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন প্রদান করা হয়, যেন তাঁরা রোজগারের ব্যস্ততা মুক্ত হয়ে নিবিষ্ট চিত্তে পাঠদানে মনোযোগ দিতে পারেন। আলিমগণের মাঝে যারা বিচারব্যবস্থার সাথে যুক্ত হতেন, তাঁদের প্রতি যথোথপযুক্ত গুরুত্ব প্রদান করা হতো। তাঁদের আকর্ষণীয় বেতন দেওয়া হতো-যাতে তাঁরা স্বাধীনভাবে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে পারেন। এ ব্যবস্থা বিচার প্রশাসনকে ভাব-গাম্ভীর্য বজায় রাখার পাশাপাশি একে দুর্নীতিমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করত। ২ ২৪
বিচারক ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সুলতান ফাতিহ কেমন গুরুত্ব দিতেন, তার প্রমাণ হিসেবে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়-
'সুলতানের প্রাসাদের জনৈক কর্মচারীর অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ পেলে এদিনের কাজি তাকে সংশোধনের নির্দেশ দেন। সুলতানের কর্মচারী অবজ্ঞাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে। আদেশ অমান্য করার খবর পেয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে কাজি নিজে ওই অবাধ্য কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এগিয়ে যান। এতে উলটো ফল হয়, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে রাজকর্মচারী কাজিকে প্রহার করে। এ সংবাদ যখন সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের কাছে পৌঁছল, তখন তিনি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হন। বিচারককে অবমাননা করায় তিনি ওই কর্মচারীকে প্রাণদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন।
ওদিকে মন্ত্রীরা রাজকর্মচারীকে ক্ষমা করার জন্য সুলতানকে অনুরোধ করতে থাকেন। বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও সুলতান নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তখন বিষয়টি ফায়সালা করার জন্য রাজকর্মচারীরা মওলা মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদের শরণাপন্ন হন। তিনি সুলতানকে এই বলে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন, ক্রোধান্বিত হওয়ার কারণে ওই বিচারক তাঁর পদে বহাল থাকার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন। তাই তাঁকে প্রহারের মাধ্যমে কর্মচারীটি বিচারকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেনি। সুতরাং তাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া সমীচীন হতে পারে না। এ কথা শুনে সুলতান মুহাম্মাদ চুপ হয়ে যান।
তারপর ওই কর্মচারী কনস্ট্যান্টিনোপলে এলে মন্ত্রীরা তাকে সুলতানের কাছে নিয়ে যায়। ক্ষমা প্রার্থনার বশে লোকটি ফাতিহ-এর হাতে চুমু দিতে গেলে সুলতান তাকে এত জোরে প্রহার করেন যে, সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চার মাস চিকিৎসার পর সে সুস্থতা লাভ করে। এই কর্মচারীটির নাম দাউদ। বহু বছর পর পাশা উপাধি ধারণ করে তিনি সুলতান বায়েজিদ খানের মন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি প্রায়শ সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ-এর জন্য দুআ করতেন এবং বলতেন- 'তাঁর প্রহারই আমাকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছিল।'২২৫
বিজয়াভিযানের ব্যস্ততা সত্ত্বেও সুলতান মুহাম্মাদ প্রজাদের খবরাখবর নিতেন। সুযোগ পেলেই তিনি জনগণের হাল-হকিকত অবগত হওয়ার জন্য রাতের বেলায় ঘুরে বেড়াতেন। তা ছাড়া নিরাপত্তা বিভাগের কর্মচারীদের মাধ্যমেও তিনি জনগণের খোঁজখবর পেতেন। এক্ষেত্রে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবকে তিনি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যিনি বলেছিলেন- 'ফোরাত নদীর তীরের একটি মেষ শাবককেও যদি কোনো নেকড়ে খেয়ে ফেলে, সেজন্য উমর জিজ্ঞাসিত হবে।'২২৬
সুলতানের মৃত্যু ৮৮৬ হিজরির (১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দ) রবিউল আউয়াল মাসে সুলতান এশিয়া মাইনরের উদ্দেশ্যে ইস্তাম্বুল ত্যাগ করেন। এস্কোদারায় অপেক্ষমাণ একটি বড়ো বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি বের হয়েছিলেন। যাত্রার পূর্বে সুলতান ফাতিহ কিছুটা অসুস্থতা অনুভব করছিলেন। কিন্তু জিহাদে অংশগ্রহণের প্রেষণায় শারীরিক বাধাকে উপেক্ষা করেন। গেবজে নামক স্থানে পৌঁছার পর তাঁর পদক্ষেপ ভারী হয়ে আসে। চিকিৎসককে তলব করা হয়, কিন্তু ওষুধ-পথ্য কোনো কাজে আসে না। ৪ রবিউল আউয়াল ৮৮৬ হিজরি, মোতাবেক ১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মে রোজ বৃহস্পতিবার মহান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫২ বছর (ভিন্নমতে ৪৯ বা ৫১), আর রাজ্যশাসনের মেয়াদ হয়েছিল তিরিশ বছরেরও বেশি। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন, অর্থাৎ কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করেছেন। তাঁর হাতে বিজিত অন্য এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল রোমান রাজ্য কার্যাবলী ট্রাবজোন, সার্বিয়া, বসনিয়া ও সমগ্র এশিয়া মাইনর। বলকান অঞ্চলে তুর্কি কর্তৃত্বের বাইরে ছিল একমাত্র বেলগ্রেড শহর, আর ভেনিসের অনুগত কিছু দ্বীপ। ইস্তাম্বুলের এক বিশেষ কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। (বেক, ১৭৭; তারিকি, ১৯৯৫ : ৬০-৬১)
সুলতানের মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া
মধ্যযুগের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয় তুর্কিদের হাতে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়। এর মাধ্যমে মধ্যযুগের সমাপ্তি এবং ইউরোপে রেনেসাঁর সূচনা হয়। এহেন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার যিনি উপলক্ষ্য, সেই মহান ব্যক্তিত্ব সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের মৃত্যুতে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে বিপুল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। খ্রিষ্টীয় পশ্চিমারা সুলতানকে ঘৃণা করত। কারণ, তিনি তাদের প্রাচ্য রাজধানীর পতন ঘটিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে ইসলামি প্রাচ্যে রাসূলুল্লাহ -এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হিসেবে সুলতান ফাতিহ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও মান্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুকে দুনিয়ার এই অংশ যেন শোকসাগরে নিমজ্জিত হয়। নিম্নে উভয় অংশের প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়-
সুলতানের মৃত্যুর সময় অটোমান বাহিনীর একটি অংশ দক্ষিণ ইতালিতে অবস্থান করছিল। ফাতিহ-এর মৃত্যুর খবর তাদের কাছে পৌঁছলে তারা বেদনায় মুষড়ে পড়ে। অভিযান অব্যাহত রাখার পরিবর্তে তাদের নিকট নিরাপদে পশ্চাৎপরসণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তাই তারা নাপোলির রাজার সাথে চুক্তি করেন। তবে খ্রিষ্টানরা চুক্তি ভঙ্গ করে তুর্কি বাহিনীর পেছনের অংশের কয়েকজন সৈনিককে বন্দি করে তাদের লোহার শিকলে বেঁধে ফেলে।
সুলতানের মৃত্যুর খবর রোমে পৌঁছলে খ্রিষ্টান যাজকরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। পোপ চতুর্থ সিক্সটাস (১৪৭১-১৪৮৪) তুর্কিদের হাতে রোমের পতনের আশঙ্কায় দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সুলতানের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তিনি গির্জার দুয়ার খুলে দেন এবং সেখানে প্রার্থনা ও উৎসব আয়োজনের নির্দেশ দেন। বিজয় ও আনন্দের সংগীত গেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় আনন্দবাহন। তিন দিন ধরে অবিরাম আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকে রোম। অবশ্য এতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না। সুলতানের মৃত্যুতে খ্রিষ্টবাদ সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি হতে মুক্তি লাভ করেছিল। অন্যদিকে ভেনিসে সুলতানের মৃত্যুসংবাদ ঘোষিত হয় এই বার্তায়: 'মহান ঈগল মৃত্যুবরণ করেছেন।' ২२৭
মহান সুলতানের মৃত্যুতে তুর্কি জাতি শোকাচ্ছন্ন হয়ে পগে। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বেও শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়ে। এমন একজন সুলতান-যিনি পুণ্যবান পূর্বসূরিদের জিহাদের চেতনা ফিরিয়ে এনে মুসলিম জাতির শত শত বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁর মৃত্যুকে গোটা মুসলিম বিশ্ব শোকাচ্ছন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
ইতিহাসবিদগণের অভিমত
সমকালীন ইতিহাসবিদগণ সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃতিত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে কয়েকজন ইতিহাসবিদদের মূল্যায়ন এখানে উল্লেখ করা হয়-
'রোমান পতাকা অবনমিত হয় গৌরবময় সানজাক নিশানের সামনে, পরবর্তী দুশো বছর মুসলিম সম্রাটদের সামনে পশ্চিমা শাসকরা কম্পমান ছিল।' (Marshall Von Moltke, ১৫১)
'ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ, খুব সম্ভবত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হলো-তুর্কিদের হাতে ইস্তাম্বুলের পতন।' (Franz Bobinger, Mehmed der Eroberer, p. 7)
'এ ব্যাপারে কারও মনে সন্দেহ থাকবে না যে, সুলতান মুহাম্মাদই হলেন রোমান সম্রাট। সাম্রাজ্যের সিংহাসন যে শহরে অবস্থিত, সেটি যিনি জয় করেন-তিনিই তো বৈধ সম্রাট। আর রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসনের শহর হলো ইস্তাম্বুল।' (Yorgios Trapezutios, 146)
'সুলতান মুহাম্মাদ আমাদের যুগের সেই দার্শনিকদের একজন- যারা সূক্ষ্ম প্রতিভার অধিকারী।' (Critobulus, 177)
'সুলতান মুহাম্মাদের হাসি দেখতে পাওয়া ছিল বিরল ব্যাপার। তিনি এক লহমার জন্যও বিচক্ষণতা বিসর্জন দিতেন না। তিনি ছিলেন অতিশয় উদার, দুর্দান্ত সাহসী, আর প্রজ্বলিত বিচক্ষণতার অধিকারী। তিনি ছিলেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের মতো; সুখ্যাতি আর উচ্চতায় যারা সন্তুষ্ট থাকেন না। তিনি ঠান্ডা-গরম, ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করতে পারতেন। তাঁর কথা ছিল অকাট্য। ডরাতেন না কাউকে, খেল-তামাশা ও স্থূল বিনোদন থেকে থাকতেন দূরে। তিনি তুর্কি, গ্রিক ও সার্বিয়ান ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। আরও কয়েকটি ভাষা পড়তে ও বুঝতে পারতেন। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় তিনি অধ্যয়ন করতেন। তাঁর অধীত ইতিহাসের মধ্যে ছিল- রোমান ইতিহাস, হিরোডোটাস, Laerce, Tite-Live, Quinte-Qurse পোপদের ইতিহাস, জার্মানি, ফ্রান্স ও ল্যাম্বার্ড রাজাদের ইতিহাস, ইতালির ভূগোল সম্পর্কেও তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান রাখতেন। অনুরূপ জ্ঞান রাখতেন সেই সময়ের সকল ইউরোপীয় রাজ্য সম্পর্কে। প্রবল আগ্রহে তিনি ভূগোল ও যুদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করতেন। তাঁর রাজ্যে বসবাসকারী নানা জাতিগোষ্ঠীর আচার-অভ্যাসের সাথে খাপ খাওয়ানোর কাজে তিনি দক্ষ ছিলেন।' (সমকালীন ইতালীয় ইতিহাসবিদ Zorzo Dolfin)
'সুলতান মুহাম্মাদ আমাদের কালের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি কিরুস, আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ও সিজারের চেয়ে মহান। এককথায় পূর্ববর্তী সকল শাসকের চেয়ে সেরা।' (Babinger, from Yorgios Trapezuntios, 298)
'ফাতিহ কেবল প্রথম শ্রেণির ভাষাবিশেষজ্ঞ, ইতিহাসবেত্তা ও দার্শনিকই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন সেরা প্রশাসক ও ব্যবস্থাপক এবং অলৌকিক উপায়ে সমরাস্ত্র প্রয়োগে দক্ষ।' (N. M. Panzer, The Harem, লন্ডন, 1936, 237)
'১৪৫৩ সালে ফাতিহ-এর হাতে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের সাথে জ্ঞানের রেনেসাঁসের যুগ শুরু হয়। ফাতিহ আধুনিক রেনেসাঁসের অন্যতম সংরক্ষক। ফাতিহ ও তাঁর দুই উত্তরাধিকারীর নিকট আধুনিক রেনেসাঁস অনেকাংশে ঋণী। ইউরোপে প্রাচীন গ্রিক ভাষার প্রসারের পথ সুগম করে দিয়েছিলেন ফাতিহ। বায়েজিদ ও ইয়াওয়াজ যথাক্রমে ১৫০৬ ও ১৫১৯ সালে মিকেলেঞ্জেলো ও লিওনার্ডো দ্যা ভিঞ্চিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমন্ত্রণ জানান, অথচ পোপ তাদের আমন্ত্রণ করেননি।' (P. Faure, La Renaissance, ৭, ৪৬, ১০২, ১০৪, ১১৪)
'আমরা যদি অটোমান ইতিহাস অনুধাবন করতে চাই, তাহলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উসমান বংশের শাসকদের অধিকার মেনে নিতে হবে। ফাতিহের সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ ক্রিটোভুলাস, ডুকাস ও কালকনডাইলাস স্বীকার করেছেন, অটোমান সুলতানরাই রোমান সম্রাটদের বৈধ উত্তরসূরি।' (Grenard, ১০১-১০২)
'ইস্তাম্বুল বিজয় দ্বিতীয় মুহাম্মাদের ব্যক্তিগত সাফল্য। এটিকে উসমানি রাজ্যের স্বাভাবিক বিকাশের পরিণতি বলে মেনে নেওয়া যায় না।' (N. Lorge, Voyageurs Francais dans l'orient, ২১)২২৮
সমকালীন ইতিহাসবিদদের স্বীকৃতি থেকে জানা যাচ্ছে—সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ গ্রিক, ইতালীয় ও সার্বিয়ান ভাষায় সুদক্ষ ছিলেন। আরও কিছু ভাষা তিনি বুঝতে পারতেন। তা ছাড়া তিনি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রভুত উন্নতি সাধন করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় জ্ঞানও ছিল অগাধ। তদুপরি আরবি-ফারসি ভাষায় তাঁর দক্ষতাও ছিল সুবিদিত। তাই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তিনি তাঁর যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ও সর্বশ্রেষ্ঠ সমরবিদ। অধিকাংশ ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি হলেন তুর্কিদের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।
টিকাঃ
২০৯. এদের সংখ্যা ছিল চারজন। তারা যে ঘরে বসে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন, তার শীর্ষে একটি গম্বুজ ছিল, তাই তাদের গম্বুজমন্ত্রী বলা হতো। সেই মন্ত্রণাগৃহ এখনও বিদ্যমান ইস্তাম্বুলের সরাই তোপকাপিতে।
২১০. ফাহমি, প্রাগুক্ত ১৫২-১৫৩।
২১১. ফাহমি, প্রাগুক্ত ১৫২-১৫৩।
২১২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৪
২১৩. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮০; ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৪; আবদুল কাদের, পৃ. ৫৩; রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১১
২১৪. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩-৫৪
২১৪. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬
২১৬. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭-৫৮
২১৭. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৯
২১৮. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৯
২১৯. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯৩। হারব, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৭
২২০. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯৫-৯৬
২২১. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-৫৯
২২২. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১৩
২২৩. প্রাগুক্ত পৃ. ৪১৪
২২৪. প্রাগুক্ত, ৪০৯।
২২৫. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০৯
২২৬. আল-কুরতুবি, আল-জামি' লি আহকামিল কুরআন, ১৩/১৩১
২২৭. তারিকি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৪
২২৮. ওপরে উল্লেখিত ইতিহাসবিদদের মন্তব্যগুলোর সূত্র-উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪-১৪৫
কথায় বলে—'বিজয় অর্জন করার চেয়ে বিজয় ধরে রাখা অনেক কঠিন।' কনস্ট্যান্টিনোপল জয়েই সুলতানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সমাপ্তি ছিল না; এটি ছিল নতুন কর্তব্যের পথে যাত্রা। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারের চেতনা ধারণ করতেন। বিশাল এক মুসলিম সাম্রাজ্যে সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের দায়িত্বও তাঁর স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল। এই মিশন বহনে তাঁর জাতিও তাঁকে সাহায্য করেছে।
তুর্কি রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি কখনো উপেক্ষিত ছিল না। সুলতান নিজেও উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর নির্ঝঞ্জাট শাসন, জাতির নেতৃত্বের আসনে তাঁর উপনীত হওয়া আর শত্রুর চ্যালেঞ্জের মুখে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা—এসবই সম্ভব হয়েছে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, যুদ্ধকৌশলের উন্নয়ন এবং এক্ষেত্রে নতুন নতুন আবিষ্কারের বদৌলতে। ফাতিহের নেতৃত্বে উসমানি সালতানাত পঞ্চদশ শতকের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। এশিয়া মাইনর ও পূর্ব ইউরোপের সকল ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাজ্যের অবসান ঘটান তিনি। বিজয়ের পর কনস্ট্যান্টিনোপলকে রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এশিয়া ও ইউরোপে বিস্তৃত তুর্কি ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল নয়া রাজধানী। গৌরবময় ইতিহাসের ধারক এ শহরটি সত্যিকার অর্থে উসমানীয়দের মর্যাদার সাথে মানানসই ছিল।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ ছিলেন একজন বড়ো সংস্কারক ও উঁচু স্তরের ব্যবস্থাপক। অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও শাসন-শৃঙ্খলা স্থাপনে তাঁর সক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। তেমনিভাবে তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ সমরনায়ক। ইতিহাসে তাঁর ন্যায় প্রতিভা বিরল। তিনি উচ্চশিক্ষিতও ছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যে ছিল তাঁর ব্যাপক জানাশোনা। তিনি কবিতার স্বাদ আস্বাদন করতেন। তাঁর জীবনী অধ্যয়নে আমরা দেখেছি—তিনি আশৈশব কেমন প্রতিভা ও শ্রেষ্ঠত্বে বেড়ে উঠেছেন!
শৈশব থেকেই তাঁর পিতা সন্তানের সুশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং রাষ্ট্রপরিচালনা ও ভবিষ্যতে বড়ো বড়ো দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার যোগ্য করে তোলেন।
রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে আবির্ভূত হতে না হতেই আমরা তাঁকে দুবার সিংহাসনে আরোহণ করতে দেখি। প্রথমবার অতি তরুণ বয়সে তাঁর পিতা পুত্রের অনুকূলে ক্ষমতা ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু সেবার ক্ষমতারোহণ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমরা যেমনটা ইতঃপূর্বে দেখেছি, ইউরোপীয় বিশ্বাসঘাতকদের দমনে তাঁর পিতাকে এগিয়ে আসতে হয়। দ্বিতীয়বার পিতার মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতাসীন হন। তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে জাতির নেতৃত্ব দেন। কারও অধিকার প্রদানে বা জুলুমের প্রতিবিধানে তিনি কখনো নাগরিকদের মাঝে ভেদাভেদ করেননি। অথচ তারা ছিল বহু ধর্ম ও জাতিভুক্ত। এমন এক যুগে বিশাল-বিস্তৃত উসমানি সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল নিরাপত্তা ও ন্যায়পরায়ণ-যখন চোর ও ডাকাতের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। সেলজুক সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির পর এশিয়া মাইনরে সৃষ্ট সকল ক্ষুদ্র রাজ্যকে এক পতাকার অধীনে আনতে সক্ষম হন তিনি। ফলে সুদৃঢ় বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
রাজ্যশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিল। অনুরূপ সাফল্য লাভ করেছিলেন যুদ্ধের ময়দানে ও শত্রুনাশে। বিজিত অঞ্চলে তিনি এমন ব্যবস্থাপনা চালু করেছিলেন-যাতে ওই যুগে প্রচলিত সকল সুবিধা জনগণের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছিল। তবে তা ইসলামি শরিয়াহ-এর বিধিব্যবস্থার আওতাধীন ছিল। সন্দেহ নেই, সেই ব্যবস্থাপনা ছিল যুগের বিচারে উৎকৃষ্টতা ও নৈপুণ্যের উন্নত দৃষ্টান্ত।
এখানে সুলতান ফাতিহের সকল কার্য ও কৃতিত্বের বিবরণ উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। যে জীবন পুরোটা উৎসর্গিত ছিল ইসলামের পতাকা উড্ডীন ও মুসলিম জাতির কল্যাণ সাধনের জন্য, তার ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে অর্ন্তভুক্ত করতে চাইলে আমাদের বৃহদাকার কয়েক খণ্ডের গ্রন্থ প্রণয়ন করতে হবে। তিনি ছিলেন একজন সেরা সমরবিদ। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট প্রমাণ হয়-তিনি মাত্র তেইশ বছর বয়সে সবচেয়ে বড়ো স্থল ও নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং যুদ্ধবিদ্যায় অজ্ঞাত ও অভিনব অনেক পদ্ধতি ও কৌশল আবিষ্কার করেন। তাই বন্ধুর আগে তিনি শত্রুর মূল্যায়ন লাভে ধন্য হয়েছেন। আর তাঁর কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীকে বিমোহিত করেছে এবং তিনি ইসলামের শত্রুদের মনে ভীতি জাগাতে পেরেছেন। আর তাদের রেখেছিলেন অব্যাহত দুশ্চিন্তা, নিরন্তর অস্থিরতা, অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতে। এখানে অতি সংক্ষেপে ফাতিহ-এর শাসনব্যবস্থার মৌলিক কিছু দিক উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ফাতিহ শাসনামলে প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থাপনা
সুলতান ফাতিহ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা অনুকরণীয় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি হতে উপকৃত হয়ে তিনি নতুন সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে অগ্রসর হয়েছিলেন। উসমানীয়রা যে সংস্কৃতিগুলোর সংশ্লেষে এসেছিল, সেগুলোর প্রত্যেকটি থেকে তিনি অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন।
একদিকে সুলতান ছিলেন এমন মুসলিম শাসক—যিনি ইসলামি রাষ্ট্র শাসন করতেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত; স্বজাতির আশা পূরণের দায়িত্বও ছিল তাঁর। তাই তুর্কিদের মৌলিকতা, আচার ও অভ্যাস সংরক্ষণের গুরুত্বও কম ছিল না। একইসঙ্গে তাঁর হাতে পতন হয়েছিল অত্যন্ত প্রাচীন, ঐতিহ্যমণ্ডিত ও অভিজাত একটি সাম্রাজ্যের—যা তাঁকে বাইজেন্টাইন সম্রাটদের সিংহাসনে উপবেশন করার সুযোগ এনে দিয়েছিল। ফলে বাইজেন্টাইন সিংহাসনে বসে সম্রাটের হ্যাটের বদলে তুর্কি পাগড়ি মাথায় বেঁধে তিনি অভিজাত বাইজেন্টাইনবাসীকে শাসন করার সুযোগ লাভ করেছিলেন। এজন্য তাদের কিছু আচার-সংস্কৃতিও সুলতানকে ধারণ করতে হয়েছিল।
বৈচিত্রময় প্রজাসমষ্টির মিশ্র সংস্কৃতির বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বলকান এলাকা ও এশিয়া মাইনরের ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে আত্মস্থ করেছিল তুর্কিরা। তাঁর আমলে নানা বর্ণ, গোত্র ও ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুলতানের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের সেবায় প্রাণপাত করেছে। এই যে বিপুল সংস্কার সাধিত হয় সুলতানের ত্রিশ বছর শাসনামলে, এর পেছনে খুব বেশিসংখ্যক রাষ্ট্রীয় কর্মচারীকে সম্পৃক্ত হতে হয়নি, খুব একটা খরচও হয়নি।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ ছিল ‘দিওয়ান’ ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন (সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত) পূর্বাহ্নে সালতানাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ বৈঠকে মিলিত হতেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন—উজিরে আজম বা প্রধানমন্ত্রী, গম্বুজমন্ত্রীবৃন্দ২০৯, সেনাবাহিনীর কাজি (কাজি আসকার), ইস্তাম্বুলের কাজি, জেনিসেরিপ্রধান এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।
সুলতানের অনুপস্থিতিতে উজিরে আজম দেওয়ানসভায় সভাপতিত্ব করতেন। প্রয়োজন হলে উজিরে আজম নিজ প্রাসাদেও দরবার আহ্বান করতে পারতেন। তাঁর আমলে প্রধানত বে, বেগলার বা বেকলারগণ প্রদেশ শাসন করতেন। তারা ছিলেন জায়গিরদারদের সর্দার। জায়গিরদারা যুদ্ধের সময় সুলতানকে সৈন্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকত। তারা জেলাপ্রধানের সানজাক বা পতাকার নিচে সমবেত হতো।
তুর্কি দিওয়ান ইনসাফের প্রাণশক্তি ধারণ করত এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিল। ইসলামের পরামর্শনীতি মেনেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো এবং বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো ঘোষণা করতেন সামরিক কাজি বা ইস্তাম্বুলের কাজি। কাজিগণ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন। তাই কোনো না কোনো বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সামরিক কাজি বা ইস্তাম্বুলের কাজির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতো। ফলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জনমনে আস্থা সৃষ্টি হতো।
প্রদেশসমূহের শাসকদের উদ্দেশ্যে সুলতান মুহাম্মাদ যে নির্দেশনা জারি করতেন, সেগুলোতে জ্ঞান বিস্তার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। জ্ঞানই হল উন্নতির সোপান আর ইনসাফের মাধ্যমে প্রজাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। ইনসাফের বিষয়টি সর্বদা জাগরুক রাখার জন্য সুলতান তাঁর জৌলুসময় সিংহাসনের পেছনে এই বাণীটি উৎকীর্ণ করে রেখেছিলেন- 'ইনসাফ হলো সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ।'
সাম্রাজ্যের প্রতিটি রন্ধ্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন সুলতান। এ ব্যাপারে তিনি উমার ইবনুল খাত্তাব-কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রায়শ দ্বিতীয় খলিফার অমর বাণী আওড়াতেন- 'আল্লাহর কসম! ইরাকেও যদি একটি ছাগী পতিত হয়, সেজন্য উমর জিজ্ঞাসিত হবে।' তাঁর পদক্ষেপ অনুসরণ করার জন্য তিনি সরকারি কর্মচারীদের বাধ্য করতেন। আর প্রজাদের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার তাগিদ দিতেন। ২১০
সেকালে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান অত্যন্ত কষ্টসাধ্য বিষয় ছিল। কারণ, চোর ও ডাকাতের উৎপাত-উপদ্রব ছিল অত্যধিক। সুলতানের সাম্রাজ্যে নানা জাতি-গোত্রের মানুষের বসবাস ছিল বলে জনগণের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারটি ছিল আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।
সালতানাতের জনমিতির বিন্যাস ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। একদিকে ছিল সালতানাতের বুনিয়াদ তুর্কিরা, আরও ছিল গ্রিক, স্লাভ, বুলগার ও আলবেনিয়ান জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। মুসলিম, অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক খ্রিষ্টানের সমন্বয়ে গঠিত জাতিগুলোর ধর্মীয় বণ্টনও ছিল বৈচিত্র্যময়। সুবিশাল অটোম্যান সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে এ লোকগুলো চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার মাঝে জীবনযাপন করত। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার বাইরে বসবাস করায় অস্থিরতা ও মৃত্যুশঙ্কা তাদের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়েছিল।
বিভিন্ন জাতিধর্মের প্রজাদের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য এবং আন্তঃধর্ম শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে সুলতান কিছু নিয়মনীতি প্রবর্তন করেন। এভাবে ইনসাফ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। চোর-ডাকাত দমনে সুলতান কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের ওপর ইসলামের বিধান আরোপ করেন। ধীরে ধীরে সুবিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র নিশ্চিন্ততা ও নিরাপত্তা ছড়িয়ে পড়ে।
শরিয়াহর বিধানের প্রাতিষ্ঠানীকরণ সুলতানের মুহাম্মাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিবেচনার পর তিনি সেরা আলিমগণের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন উজিরে আজম কারামানলি মুহাম্মাদ পাশা ও তার সচিব লায়সজাদা মুহাম্মাদ চেলেবি। তারপর তাদের সম্পাদনায় 'ফাতিহ কানুন নামা সি' বা ফাতিহের সংবিধান প্রবর্তন করেন-যা ছিল তাঁর রাজ্যশাসনের মূলভিত্তি।
কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত 'কানুন নামা'য় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব-কর্তব্য, কতিপয় প্রথা, সুলতানি অনুষ্ঠান সম্পাদন পদ্ধতি, দণ্ড ও জরিমানাবিধি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ বিবরণে ইসলামি আইনের প্রাধান্য সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত ছিল এবং জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলিম উপাদানের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা ছিল। উসমানি রাজ্যশাসন প্রণালি লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করায় ফাতিহ 'কানুনি মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত। এই আইননামার মূল ধারাগুলো ১৮৩৯ খিষ্টাব্দ পর্যন্ত তুর্কি সালতানাতে কার্যকর ছিল। ২১১
প্রশাসনের দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন সাদরে আজম-চারজন মন্ত্রী তাঁর সহায়তার জন্য নিয়োজিত ছিলেন। সাদরে আজম পদাধিকার বলে সৈন্যবাহিনীর প্রধান ও দিওয়ানপ্রধান ছিলেন। পূর্ববর্তী সুলতানদের আমলে প্রচলিত ব্যবস্থাকে তিনি বাতিল করেননি। তবে সমকালীন চাহিদার আলোকে কিছু পরিবর্তন আনেন।
সালতানাতের অধীনে কিছু বড়ো প্রদেশ ছিল-যা আমিরুল উমারা বা 'বাকলার বেক' দ্বারা শাসিত হতো। আর কিছু ছিল ছোটো প্রদেশ-যেগুলোর শাসনকর্তাকে আমিরুল লিওয়া বা 'সানজাক বেক' বলা হতো। এরা যুগপৎভাবে প্রদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান ছিলেন। স্লাভ জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত কয়েকটি প্রদেশকে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। তারা ছিল স্থানীয় রাজা। তবে সম্রাটের আদেশ-নিষেধকে তাদের নিপুণভাবে মেনে চলতে হতো। অবাধ্য হলে বা বিদ্রোহাত্মক কর্মকাণ্ড চালালে সুলতান তাদের অপসারণ করতেন, কখনো-বা শাস্তি দিতেন। ছোটো ও বড়ো প্রদেশের শাসনকর্তারা যুদ্ধের সময় সুলতানকে সৈনিক জোগান দিতেন। প্রদেশের আয়তন ও জনসংখ্যার ওপর সৈন্যসংখ্যা নির্ধারিত হতো। প্রতিটি প্রদেশ থেকে অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী সরবরাহ করা হতো। এরা পাশা ও বেকদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। ২১২
সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেন। তাঁর দৃষ্টিতে সেনাবাহিনী হলো সাম্রাজ্যের ভিত্তি। তাই তিনি সেনাসংগঠন পুনর্নির্ধারণ করেন। প্রতিটি সেনা ইউনিটকে একজন আগা-এর নেতৃত্বে অর্পণ করা হয়। তবে 'সাধারণ আগা'-এর চেয়ে 'জেনিসেরি আগা'কে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধান সেনাপতি তথা সাদরে আজমের কাছ থেকে 'আগা'রা সরাসরি নির্দেশনা লাভ করতেন।
ফাতিহ-এর আমলে কেবল ইউরোপেই ৩৬টি সানজাক ছিল, যুদ্ধের সময় প্রতিটি থেকে ১০০ অশ্বারোহী সৈন্য পাওয়া যেত। সমগ্র সালতানাতে অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ। আজব ও আকিঞ্জিদের সংখ্যা এর বাইরে। এ সময় জেনিসেরির সংখ্যা ছিল ১২ হাজার।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ স্বনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতের জন্য কারখানা স্থাপন করেন-যেখানে সামরিক পোশাক, বর্ম, শিরস্ত্রাণ ও অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হতো। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পয়েন্টে কেল্লা ও দুর্গ স্থাপন করা হয়। যুদ্ধরত সৈনিকদের সব ধরনের রসদ অর্থাৎ জ্বালানি, খাবার, পশুখাদ্য ও অ্যামুনিশন বাক্সসহ অন্যান্য সামগ্রীর জোগান দেওয়া হতো। এজন্য একদল ভারবাহী পশু নিয়তই তুর্কি বাহিনীর অনুগমন করত। একশ্রেণির সৈনিকের নাম ছিল 'লাগমাজিয়া'-এরা মাইন পুঁতে রাখত আর বিজয়েচ্ছু কেল্লার প্রাচীরতলে সুড়ঙ্গ খনন করত। আরেক দলের দায়িত্ব ছিল সৈনিকদের পানি পান করানো। সত্যিকার অর্থে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে খ্রিষ্টান জগতের কোনো রাজ্যই এরূপ দৃশ্যত উদার, অথচ মিতব্যয়ী সামরিক নীতি অবলম্বন করেনি।
উসমানি প্রাসাদের অভ্যন্তরে 'আন্দরুন হুমায়ুন' নামে এক প্রকারের বিশেষায়িত সামরিক প্রতিষ্ঠান ছিল। এখান হতে দক্ষ প্রকৌশলী, চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক, প্রকৃতি ও মহাকাশবিজ্ঞানী বের হতেন-যারা উসমানি সেনাবাহিনীকে সর্বতোভাবে সহায়তা করতেন। এসব প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারীরা তখন বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন।
নৌবাহিনীর প্রতি সুলতানের গুরুত্ব স্থলবাহিনীর চেয়ে কম ছিল না। কনস্টান্টিনোপল জয়ের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল তুর্কি নৌবাহিনীর দুর্বলতা। এ সত্য উপলব্ধি করে সুলতান নৌবাহিনীকে শক্তিশালী এবং বিজয়ের পর এ ব্যাপারে আরও বেশি মনোযোগ প্রদান করেন। ১৪৫৫ হিজরিতে সুলায়মান পাশা বালতা উল্লুকে নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। ইতঃপূর্বে তুর্কি বাহিনীতে এই পদই ছিল না। কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর সুলতান নৌবাহিনীর ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন, ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরে তুর্কিদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফাতিহের ক্ষমতারোহণের সময় তুর্কি নৌবহরে মাত্র ৩০টি যুদ্ধজাহাজ ছিল। ভেনিসের নৌবাহিনীতে ছিল কয়েকগুণ বেশি যুদ্ধযান। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ নৌবাহিনীর উন্নয়নে এতটা মনোযোগী হন, ১৪৮০ সালে তুর্কি নৌবাহিনীতে জাহাজসংখ্যা বেড়ে হয় ২৫০টি। প্রতিটি জাহাজে কামান সংযোজিত ছিল। আর পরিবহণের নৌকা ছিল ৫০০টি। ফলে তুর্কি নৌবাহিনীর আকার ভেনিসের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
তুর্কি নৌবহর পরিচালনার দায়িত্বে ছিল 'তারসানা' বা 'আজব' নামে পরিচিত এক বিশেষ বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার-যাদের মধ্যে ক্যাপ্টেন, নৌকাধিপতি ও নাবিকসহ বিভিন্ন স্তরের সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। নৌবাহিনীর ব্যাপারে যথাযথ গুরুত্ব প্রদানের কারণে সুলতানকে 'তুর্কি নৌবহরের প্রতিষ্ঠাতা' হিসেবে গণ্য করা হয়। ২১৩
ভূমি ব্যবস্থাপনা
উসমানি সালতানাতে বিজিত জনপদ তিন ভাগে বিভক্ত করা হতো। এক ভাগ ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়াক্ফ করা হতো। এর আয় মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করা হতো। দ্বিতীয় ভাগ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে গণ্য হতো। মালিক মুসলিম হলে উৎপন্ন ফসলের এক-দশমাংশ (ক্ষেত্রবিশেষে তার অর্ধেক) উশর হিসেবে আদায় করত। মালিক খ্রিষ্টান হলে অষ্টমাংশ হতে অর্ধেক কর দিত। তা ছাড়া মুসলমানরা জাকাত ও অমুসলিমরা জিজিয়া দিত। বিজিত ভূমির অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ সরকারি ভূমি বলে গণ্য হতো। এর বড়ো অংশই বণ্টন করা হতো খ্যাতনামা সৈনিকদের মাঝে।
তিন হতে পাঁচশত একর আয়তনের ছোটো জায়গিরকে ‘তিমার’ বলা হতো। আর পাঁচ শতাধিক একর জমির জায়গিরকে বলা হতো ‘জিমায়েত’। সামরিক জায়গিরদারদের সিপাহি বলা হতো। প্রতি ৩০০০ মুদ্রা আয়ের জন্য তাদের যুদ্ধের সময় একজন অশ্বারোহীর জোগান দিতে হতো। পুরুষ উত্তরাধিকারীরা বংশসূত্রে ‘তিমার’ ও ‘জিমায়েত’-এর জায়গির লাভ করত। কোনো জায়গিরদার লা-ওয়ারিশ মারা গেলে বা জায়গির বাজেয়াপ্ত হলে জেলার শাসক বা বেগলার সুলতানের অনুমোদনক্রমে নতুন জায়গিরদার নিয়োগ দিতেন।
ইউরোপীয় সামন্তপ্রথা ও তুর্কি জায়গিরপ্রথার মাঝে যথেষ্ট মিল থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের ন্যায় উসমানি সালতানাতে অভিজাতশ্রেণি গড়ে ওঠেনি। তুরস্কের প্রাথমিক সুলতানদের অসাধারণ উদ্যম ও প্রতাপ, জেনিসেরি বাহিনী, তুর্কিদের ধর্ম ও জাতীয় চরিত্রই এর প্রধান কারণ। খ্রিষ্টীয় ইউরোপের মতো ইসলামি তুরস্কে যাজকতন্ত্র ছিল না। সুলতানরা নিজেরাই মুফতি, কাজি ও ধর্ম বিভাগের কর্মচারী নিয়োগ দিতেন। ফলে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের মতো সুলতানদের পোপতন্ত্রের বিরোধিতা মোকাবিলা করতে হয়নি। জেনিসেরির মতো দৃঢ় ও স্থায়ী বাহিনী থাকায় তাঁরা জায়গিরদারদের যেকোনো অবাধ্যতা কঠোর হাতে দমন করতে পারতেন। ইউরোপের সামন্তদের ন্যায় তুর্কি জায়গিরদারদের যুদ্ধ, বিচার ও জমি পত্তনের ক্ষমতা ছিল না। ফলে তারা সৈন্য পুষে এবং দুর্গাদি নির্মাণ করে ‘রাজ্যের ভেতর রাজ্য’ গড়ে তুলতে পারেনি। ২১৪
সভ্যতার নির্মাণকারী কর্মকাণ্ড
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ ছিলেন একজন উঁচু স্তরের প্রশাসক ও ব্যবস্থাপক। তাঁর আমলের সামরিক ও বেসামরিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আমরা সুলতানের সভ্যতা নির্মাণকারী কিছু কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
উসমানি সুলতানগণ শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে মনোযোগী ছিলেন। সুলতান ওরহান সাম্রাজ্যে প্রথম আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সুলতানগণ তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছিলেন। সুলতান ফাতিহও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা স্থাপনের পাশাপাশি তিনি শিক্ষা সম্প্রসারণে উদ্যোগী হন। আলিম, ধর্মনেতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি সম্মানসূচক মনোভাব পোষণ করতেন। কারণ তিনি জানতেন, কেবল বৈষয়িক ও সামরিক শক্তি জাতির সৌভাগ্য ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে না। সামরিক ও রাজনৈতিক অর্জন ধরে রাখতে হলেও শিক্ষিত জাতির প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্ঞান, ঈমান ও ইনসাফের শক্তিতে বলীয়ান হওয়া উচিত। তাই তাঁর সাম্রাজ্যকে জ্ঞানকেন্দ্র, জ্ঞানীদের বিচরণভূমি ও ইনসাফের কেন্দ্রে পরিণত করতে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল নিরন্তর।
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সূচনা হতেই উসমানি শাসকরা দক্ষ বিচারক ও যোগ্য জুরি বা ফকিহ-এর ওপর নির্ভর করতেন। বিচার ও জনপ্রশাসনের যোগ্যতাসম্পন্ন আলিমগণের স্কন্ধে এ দায়িত্ব অর্পণ করা হতো। এদের বেশিরভাগ আনাতোলিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করতেন। অনেকে ছিলেন মিশর, সিরিয়া ও ইরানসহ বহির্দেশীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রাপ্ত। কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পর সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির পাশাপাশি সরকারের কার্যপরিধিও বেড়ে যায়। ফলে বিচার ও জনপ্রশাসনে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য শিক্ষা-দীক্ষার ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ৮৭৫ হিজরিতে/১৪৭০ সালে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ নতুন রাজধানীতে একটি বৃহদাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষ শিক্ষকের অভাব পূরণের জন্য তিনি সালতানাত বহির্ভূত বিভিন্ন ইসলামি রাজ্য হতে শীর্ষস্থানীয় আলিম ও শিক্ষকগণকে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসেন। এজন্য তাঁদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি প্রদান করেন।২১৫
অল্পদিনের ব্যবধানেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুফল পাওয়া যেতে শুরু করে। বহু আলিম-ফকিহ ও কবি-সাহিত্যিক ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেন-যাদের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। সুলতান আয়া সোফিয়ার কাছেও একটি মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন, মওলা খসরুকে যেটি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। অল্পদিনের মধ্যে এই মাদরাসাটিও সমকালীন অন্য মাদরাসাগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে সমর্থ হয়। এটির সুনাম এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, মুসলিম দুনিয়ার নানা প্রান্তের জ্ঞানার্থীরা এর পানে ছুটে আসতে থাকে।
ফাতিহের শাসনামলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার স্তর
ফাতিহের আমলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার স্তর ছিল চারটি : প্রথম স্তরের নাম ছিল আল-খারিজ দ্বিতীয় স্তরের নাম আল-দাখিল তৃতীয় স্তর মুসিলা আস-সাহন এবং চতুর্থ স্তরের নাম আস-সাহন।
প্রথম স্তর তথা আল-খারিজের পাঠ্যসূচির মধ্যে ছিল হিফজুল কুরআন, প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা, প্রাথমিক গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। দ্বিতীয় স্তরে মাকাসিদুল উলুম, ফিকহ, ইসলামের ইতিহাস ও আরবি ভাষা পাঠদান করা হতো। এটি বিশেষায়িত স্তর ছিল না, এ স্তর পাশ করার পর ছাত্ররা সাধারণ মানের চাকরি পেত। তবে বিশেষায়িত শিক্ষালাভের জন্য শিক্ষার্থীকে তৃতীয় স্তরে ভর্তি হতে হতো। এটিকে পুরোপুরি বিশেষায়িত শিক্ষা না বলে তার প্রস্তুতি বলাই ভালো। তৃতীয় স্তর সাফল্যজনকভাবে সমাপ্ত করার পর একজন শিক্ষার্থী বিশেষায়িত শিক্ষালাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতো।
চতুর্থ স্তর আস-সাহনকে বর্তমান যুগের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সাথে তুলনা করা যায়। জামে ফাতিহ-এর চতুর্দিক স্থাপিত আটটি মাদরাসায় এ স্তরের পাঠদান করা হতো। এগুলোর পেছনে চতুর্দিকে ছিল আরও আটটি মাদরাসা, যেগুলোতে তৃতীয় স্তর বা প্রাক-বিশেষজ্ঞ স্তরের পাঠদান করা হতো। ভূমধ্যসাগরের সাগরের দিকে চারটি সাহন ও চারটি প্রি-সাহন মাদরাসা এবং কৃষ্ণসাগরের দিকেও চারটি সাহন ও চারটি প্রি-সাহন মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সুলতানের ওয়াকফনামায় সাহন মাদরাসাগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল 'মাদারিস আলিয়া' এবং প্রি-সাহন মাদরাসাগুলোর নাম ছিল 'মাদারিস সুগরা'।
স্তরগত বিদ্যার্জন মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। মূল্যায়ন ব্যতিরেকে কেউ এক স্তর হতে অন্য স্তরে উন্নীত হতে পারত না। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বিষয়াদি সুলতান নিজে তত্ত্বাবধান করতেন। মাঝে মাঝে তিনি পরীক্ষা হলে উপস্থিত হতেন; এমনকী পাঠদান কক্ষে উপবেশন করতেও তিনি কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কৃতি ছাত্র ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষকগণকে পুরস্কার প্রদানেও তিনি কৃপণতা করতেন না। উল্লেখ্য যে, সকল স্তরের শিক্ষা ছিল অবৈতনিক।
সুলতান মুহাম্মাদ পূর্ণাঙ্গ আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। এ লক্ষ্যে মাদরাসাগুলোর পাশে খাবার ঘর ও হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছিল। এ হাসপাতালগুলোতে শুধু রোগীর চিকিৎসা প্রদান করা হতো না; বরং ছাত্রদের পাঠদানও করা হতো। অর্থাৎ এগুলো ছিল মেডিকেল কলেজ কাম হাসপাতাল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল। অনেকটা আধুনিক পদ্ধতিতে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। দক্ষ লাইব্রেরিয়ান একটি রেজিস্টারে রেকর্ডভুক্ত করে ছাত্রদের বই ধার দিতেন। নির্দিষ্ট সময় পর বইগুলো ফেরত দেওয়া হতো।
মাদরাসাগুলো হতে বিচারক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, বণিক ও শিক্ষক বের হতো। সাহন-এর স্নাতকরা সাধারণত উচ্চ পর্যায়ের বৈষয়িক যোগ্যতার পাশাপাশি উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হতেন। কারণ, সর্বপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ও পরিপালনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হতো। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্নাতকরা বিভিন্ন পর্যায়ে দেশের সেবা করে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। ২১৬
গুণীর কদর
জ্ঞানার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের ন্যায়। আর শিক্ষাগুরু হন সেই প্রকৌশলী-যিনি কচি শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের মানুষে পরিণত করেন। আর তাই শিক্ষকের মুল্যায়ন ব্যতীত জ্ঞানের প্রসারণ সম্ভব নয়। এ সত্যটি সুলতান মুহাম্মাদ শুধু উপলব্ধিই করেননি; বরং আলিম-ওলামা ও জ্ঞানী-গুণীর কদর ও সম্মানের প্রকৃষ্ট নমুনা স্থাপন করেছিলেন। তাঁর জীবনের বহু ঘটনা এর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
কারামান জয়ের পর সুলতান ওই শহরের শ্রমিক ও কারিগরদের কনস্ট্যান্টিনোপলে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। কিন্তু সুলতানের প্রতিনিধি রুম মুহাম্মাদ পাশা স্থানীয়দের ওপর জুলুম শুরু করে। মজলুমদের মাঝে কয়েকজন আলিম ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ছিলেন। এদের একজন ছিলেন আহমদ চেলেবি বিন সুলতান আমির আলি।
এ ঘটনা জানতে পেরে সুলতান মুহাম্মাদ মজলুম শাইখের কাছে দুঃখ প্রকাশ এবং সঙ্গী-সাথিসহ তাঁকে মাতৃভূমিতে সসম্মানে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করেন।
উজুন হাসান নামে এক তুর্কমেন সর্দার ছিলেন। তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিল উসমানি সালতানাতের বিরোধিতা করা। সে প্রায়শ চুক্তি ভঙ্গ আর সালতানাতের শত্রুদের সহায়তা করত। তার পরাজয়ের পর অনেকে ধৃত হন। সুলতান এদের মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে হাসানের অনুগত আলিম-ওলামাদের ছেড়ে দেন। তাঁদের একজন ছিলেন কাজি মুহাম্মাদ আল-শুরাইহি-যাকে যুগশ্রেষ্ঠ আলিম বলে গণ্য করা হতো। সুলতান তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করেন।
আরেকটি ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় : শাইখ আহমদ কুরানি সামরিক কাজির পদে কর্মরত ছিলেন। সুলতান তাঁর কাছে এক ফরমান প্রেরণ করেন। শাইখ দেখলেন ওই হুকুমনামায় শরিয়াহ বিরোধী আদেশ ছিল। শাইখ শুধু আদেশটি অগ্রাহ্যই করেন না; বরং তিনি তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দেন এবং পত্রবাহককে শাস্তি দেন। এ খবর পেয়ে সুলতান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং কুরানিকে পদচ্যুত করেন। এ ঘটনায় দুজনের সম্পর্ক এত তিক্ত হয়ে পড়ে যে, কুরানি সালতানাত ত্যাগ করে মিশরে চলে যান। তথায় মিশরীয় শাসক কাতবাই শাইখকে সাদরে গ্রহণ করেন। কুরানি কিছুদিন মিশরে কাটালেন।
এতদিনে সুলতানের মন প্রসন্ন ও বোধোদয় হয়। তিনি সুলতান কাতবাইকে অনুরোধ করেন শাইখকে ফেরত পাঠানোর জন্য। মিশরের সুলতান শাইখকে নিজের কাছে রেখে দিতে চাইলেন, কিন্তু আহমদ কুরানি বললেন-'আপনার বক্তব্য যথার্থ, তবে আমার ও সুলতান মুহাম্মাদের সম্পর্ক অনেকটা পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ন্যায়। যা ঘটেছে, তাঁর ভিন্ন প্রেক্ষাপট ছিল। তিনি জানেন, আমি প্রকৃতিগতভাবে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট এবং তাঁর এ আহ্বান উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এখন আমি যদি তাঁর ডাকে সাড়া না দিই, তাহলে তিনি মনে করবেন যে, আপনি আমাকে বাধা দিয়েছেন। এর ফলে আপনার ও তাঁর মাঝে সম্পর্ক বিনষ্ট হতে পারে।' শাইখের অপারগতাপূর্ণ বক্তব্য সুলতানের পছন্দ হয়। তিনি তাঁকে বিপুল হাদিয়া ও পথ খরচের ব্যবস্থাসহ ইস্তাম্বুল পাঠিয়ে দেন। আর সুলতান মুহাম্মাদের জন্য যথোপযুক্ত উপঢৌকন পাঠান। সুলতান ফাতিহ তাঁর পুরোনো শিক্ষককে পুনরায় সাদরে বরণ করে নিয়ে তাঁকে প্রথমে কাজি এবং পরে মুফতি পদে নিয়োগ দেন। ২১৭
শাওকানি বলেন- 'তিনি সামরিক কাজির পদ ছেড়ে ফতোয়ার পদ অলংকৃত করেন। এক পর্যায়ে তিনি শীর্ষ আলিমগণের মধ্যমণিতে পরিণত হন। তিনি ব্যাপকহারে মুফাসসির জালালুদ্দিন মাহাল্লির অনুকরণ করতে থাকেন- যা তাঁকে 'তাফসির' রচনা ও 'সাহিহুল বুখারির ভাষ্য' প্রণয়নে উৎসাহ জোগায়। ছয় শত পঙ্ক্তিবিশিষ্ট ছন্দশাস্ত্রের ওপর একখানা গ্রন্থও তিনি রচনা করেন। শাইখ কুরানি ইস্তাম্বুলে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে এর নাম দেন দারুল হাদিস। এখানকার ছাত্রদের মাধ্যমে তাঁর ইলম ছড়িয়ে পড়ে। শাইখ আহমদ কুরানি ৭৬১ হিজরীতে হজব্রত সম্পাদন করেন। সফল ও কর্মময় জীবনের অন্তে ৭৯৩ হিজরিতে তিনি মারা যান। সুলতান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। সুলতান সম্পর্কে শাইখ কুরানি কাসিদা রচনা করেছিলেন যার প্রথম লাইন ছিল নিম্নরূপ: তিনি সূর্য, তবে তিনি বীরত্বে ব্যাঘ্র, তিনি সমুদ্র, তবে স্থলপতি।'২১৮
সুলতান সম্পর্কে রচিত তুর্কি কাসিদাটি আরবিতে অনুবাদ করেছেন শাকাইক নুমানের গ্রন্থকার। বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী শাইখ কুরানি মাথা নুইয়ে সুলতানকে কুর্নিশ করতেন না এবং তাঁর হাতে চুমুও খেতেন না। তিনি কেবল মুসাফাহা করতেন। তা ছাড়া সুলতান ডেকে না পাঠালে তিনি সাধারণত রাজদরবারে ঘেঁষতেন না।'
কাব্যরসিক সুলতানের সাহিত্যে পৃষ্ঠপোষকতা তুর্কি সাহিত্যের ইতিহাস লেখকদের মতে সুলতান ছিলেন একজন সাহিত্যরসিক ব্যক্তি। সাহিত্য সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন, তবে কবিতার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন সবিশেষ। তাঁর মন্ত্রীদের মাঝে অনেকে কবি ছিলেন। যেমন: আহমদ পাশা মাহমুদ, মাহমুদ পাশা, কাসিম আল-জাজারি পাশা। তাঁর প্রাসাদের সব সময় কবিতার আসর বসত। প্রায় ৩০ জন কবির প্রত্যেককে সুলতান ১ হাজার দিরহাম করে মাসোহারা দিতেন। ফলে সেই আমলের তুর্কি কাব্যে আমরা সুলতান প্রশস্তির সমাহার দেখতে পাই। সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কবি- সাহিত্যিকদের কেবল উৎসাহই দিতেন এমন নয়; বরং তাদের ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। যেসব কবি অশ্লীলতা ও বিকৃত রুচির চর্চা করতেন, সুলতান তাদের দরবার থেকে বের করে দিতেন, কখনো-বা কারাগারে নিক্ষেপ করতেন। ২১৯
অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ বহুভাষী ছিলেন। মাতৃভাষা তুর্কি ছাড়াও তিনি আরবি, ফারসি, রোমান, গ্রিক ও স্লাভ ভাষা জানতেন। নিজ জাতির মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আরবি, ফারসি, লাতিন, রোমান ও গ্রিক ভাষায় রচিত নির্বাচিত গ্রন্থাবলি তুর্কি ভাষায় অনুবাদের নির্দেশ দেন। তাঁর আমলে অনূদিত গ্রন্থগুলোর মাঝে রয়েছে-প্লুতার্ক রচিত মাশাহিরুর রিজাল এবং আন্দালুসিয়ান চিকিৎসাবিজ্ঞানী আবুল কাসিম আজ-জাহরাভি রচিত কিতাবুত-তাসরিফ ফিত তিব। এটি ছিল শল্যচিকিৎসা বিষয়ক একটি গ্রন্থ। অনুবাদের সময় শল্যচিকিৎসার কিছু ছবি এবং অপারেশনকালে সৃষ্ট কিছু রোগের বিবরণ সংযোজন করা হয়।
টলেমির ভূগোলের প্রতি সুলতানের বিশেষ আগ্রহ ছিল। রোমান পণ্ডিত জর্জ অ্যামিরোটিজের সহায়তায় সুলতান সেটি অধ্যয়ন করেন। তারপর জর্জ ও তাঁর পুত্রকে বইটি আরবিতে অনুবাদের দায়িত্ব অর্পণ করেন। পণ্ডিত পিতা-পুত্র আরবি ও রোমান উভয় ভাষায় বুৎপন্ন ছিলেন। সুলতানের পৃষ্টপোষকতায় তাঁরা টলেমির ভূগোল গ্রন্থের আরবি অনুবাদ সম্পন্ন করেন। আরবি সংস্করণে নতুনভাবে মানচিত্র অঙ্কন এবং স্থাননাম আরবি ও রোমান ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়। উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন যে, মুহাম্মাদ ফাতিহ দুই অনুবাদককে সুলতানি প্রতিদানে ভূষিত করেছিলেন। সেকালে আল্লামা কুশজি (মৃ. ৭৮৯ হি.) নামে একজন বড়ো জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ ছিলেন। তিনি যখনই ফরসি ভাষায় কোনো গ্রন্থ রচনা করতেন, তখনই তা আরবিতে অনুবাদ করে সুলতানকে উপহার দিতেন।
আল কুরআনের ভাষা আরবি। স্বাভাবিকভাবেই সেকালের ইসলামি জ্ঞানভান্ডার এ ভাষাতেই রক্ষিত হয়েছিল। তাই সুলতান মুহাম্মাদ আরবি ভাষার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দিতেন। উসমানি শিক্ষালয়গুলোতে আরবি ভাষায় রচিত ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি অভিধানগ্রন্থ (যেমন: সিহাহ, তাকমিলা, কামুস, ইত্যাদি) সংগ্রহ করা হতো। সালতানাতের নানা স্থানে গণগ্রন্থাগার স্থাপনের মাধ্যমে তিনি শিক্ষিত জাতি গঠনে সচেষ্ট হন। গ্রন্থাগারগুলো সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি জ্ঞানের নানা শাখার বই আরবি ও তুর্কি ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। সুলতানের প্রাসাদে একটি লাইব্রেরি ছিলেন, বিভিন্ন ভাষায় রচিত নানা বিষয়ের গ্রন্থে সেটি ছিল পূর্ণ। শাইখ লুৎফিকে এ ভান্ডারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। ১৪৬৫ সালে এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ১২০০০ গ্রন্থসমৃদ্ধ সুলতানি গ্রন্থভান্ডার ভস্মীভূত হয়। প্রফেসর ডিজমান এটিকে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জ্ঞানভান্ডারের সীমানাপ্রাচীর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ২২০
নির্মাণ ও স্থাপত্যশিল্পে মনোযোগ
সুলতানের শিল্পবোধ কেবল কাব্য আস্বাদনে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি স্থাপত্যশিল্পের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের অপূর্ব গির্জা ও প্রাসাদ সুলতানের শিল্পবোধ বাড়িয়ে দিলো। স্থাপত্যশিল্প-সংক্রান্ত সুলতানের মনোযোগের বড়ো কেন্দ্রে ছিল খোদ রাজধানী শহর। বাইজেন্টাইন রাজধানী জয়ের অব্যবহিত পরেই সুলতান এই শহরে একজন গভর্নর নিয়োগ দেন। অতঃপর তাকে নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করে শহরে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের নির্দেশ দেন। তুর্কি সালতানাতের রাজধানী হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে শহরের আয়তন বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাই পার্শ্ববর্তী কিছু এলাকা রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। আনাতোলিয়া ও রোমেলির শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয় কিছু অধিবাসীকে কনস্টান্টিনোপলে প্রেরণ করার জন্য। ফলে ওইসব অঞ্চলের বহু পরিবার রোজগার বৃদ্ধি ও উচ্চপদ লাভের আশায় রাজধানীতে পাড়ি জমায়। এভাবে ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রাচীন শহর কনস্টান্টিনোপল আয়তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে নবযৌবন লাভ করে।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কনস্টান্টিনোপলে বহু মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রাসাদ, হাসপাতাল, সরাইখানা, গণগোসলখানা, বাজার ও প্রশস্ত বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। খাল ও নালা খনন করে শহরে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর নির্দেশে সালতানাতের পদস্থ ব্যক্তি ও ধনী নাগরিকবর্গ সুরম্য বাড়ি ও দোকানপাট স্থাপন করেন। এভাবে জনসংখ্যা ও স্থাপনা বেড়ে গিয়ে সুলতানের শাসনকালেই কনস্টান্টিনোপলের আয়তন পূর্ববর্তী শাসক কনস্টান্টাইনের সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেড়ে যায়।
সুলতানের স্থাপত্য নিদর্শনের মাঝে রয়েছে, 'দার আল-সায়াদাহ আল-কাদিমা'- যা সুলতান প্রথম বায়েজিদ কর্তৃক নির্মিত মসজিদের কাছে স্থাপন করা হয়েছিল।
এই শহর জয়ের পর উসমান বংশীয় কোনো শাসক কর্তৃক নির্মিত প্রথম সরকারি অফিস ছিল এটি। আরেকটি বিশ্রুত স্থাপত্য হল সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ মসজিদ। কনস্টান্টিনোপলের চতুর্থ টিলার ওপর বাইজেন্টাইন চার্চ অব হলি অ্যাপস্টল-এর স্থলে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। চার্চটি চতুর্থ ক্রুসেডের সময় হতে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। মসজিদটির স্থপতি ছিলেন গ্রিক স্থপতি আতিক সিনান, (খারাসতু দুলুস)। অনুপম এই মসজিদে দুটি সুউচ্চ মিনার ছিল। এমন পরিকল্পনায় মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল, যেন এটি দেখে দূর হতে সমুদ্রচারীরা কনস্টান্টিনোপলের ইসলামি প্রাণশক্তি অনুভব করতে পারে।
কনস্টান্টিনোপলের প্রবেশমুখে নির্মিত আবু আইউব মসজিদ এবং এদিন গেটের কাছে স্থাপিত শাইখ বুখারি মসজিদ ও জেনিসেরি মসজিদ বা উরতা জামিই ছিল ফাতিহের অনন্য স্থাপত্যকীর্তি। ইস্তাম্বুল শহরে প্রথম লাইব্রেরিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ। এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ভাষায় রচিত বহুসংখ্যক গ্রন্থ সংরক্ষণ করেছেন। পরবর্তী সুলতানরাও এক্ষেত্রে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। মর্মর সাগরের তীরে 'কুতশাক আয়া সোফিয়া' বা 'ছোটো আয়া সোফিয়া' নামে একটি মসজিদও স্থাপন করা হয়। মূলত সেন্ট সার্জিস গির্জাকে সংস্কার করে এটিকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। গোল্ডেন হর্নে একটি মসজিদ নির্মাণ করে নবম শতাব্দীর বিখ্যাত সুফি জিরক-এর নামানুসারে সেটির নামকরণ করা হয়। ২২১
হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা
সুলতান মুহাম্মাদ রাজধানী কনস্টান্টিনোপল ও অন্যান্য শহরে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু অবকাঠামোগত নির্মাণেই স্বাস্থ্যসেবা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি প্রতিটি হাসপাতালে একজন করে চিকিৎসক নিয়োগ দেন। পরবর্তী সময়ে আরও একজন নিয়োগ দেওয়া হয়। চিকিৎসককে সহায়তার জন্য থাকতেন চক্ষু-চিকিৎসক, শল্যবিদ, ফার্মাসিস্ট, প্রয়োজনীয় কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী। হাসপাতালে দয়াদ্র ও মানবিক গুণসম্পন্ন প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হতো। চিকিৎসকগণ দৈনিক কমপক্ষে দুই বার রোগীদের দেখতেন। অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সাথে ওষুধ বানানো হতো। হাসপাতালের পাচককে রোগীর পথ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতে হতো। বলাবাহুল্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য হাসপাতাল উন্মুক্ত ছিল। ওষুধ ও চিকিৎসাও ছিল বিনামূল্যে।২২২
ব্যাবসা-বাণিজ্য ও শিল্প সুলতান ফাতিহ ব্যাবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সকল রকমের উপায়-উপকরণের প্রয়োগে এর উন্নতির জন্য কাজ করেন। এ কাজে তিনি তাঁর পূর্বসূরি সুলতানদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেন; যারা প্রজাদের ব্যাবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য সর্বদা উদ্যোগী ছিলেন। বাইজেন্টাইন দুঃশাসনে পিষ্ট বহু শহর তুর্কি বিজয়ের পর ব্যাবসা-বাণিজ্যে বিপুল উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়। উসমানীয়রা ব্যাবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন এবং স্থল ও সমুদ্রপথে ব্যাবসা পরিচালনায় তাদের পরিপক্বতাও ছিল সুবিদিত। সুলতান ফাতিহ পুরোনো বাণিজ্যপথ সংস্কার সাধনের মাধ্যমে উন্নত এবং বড়ো বড়ো সেতু নির্মাণ করেন। ফলে সালতানাতের সর্বত্র ব্যাবসা-বাণিজ্যের পথ সুগম হয়। বাণিজ্যিক বিনিময় লাভের সুবিধার্থে অন্যান্য রাজ্যগুলোও তুর্কি ব্যবসায়ীদের জন্য তাদের বন্দরসমূহে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান করে। ব্যাবসা-বাণিজ্যের উন্নতির ফলে সালতানাতের সর্বত্র সুখ-শান্তি ও প্রাচুর্য ছড়িয়ে পড়ে। তুর্কি স্বর্ণমুদ্রাও আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে বিশেষ অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়।২২৩
ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শাসকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। অন্যান্য উসমানি সুলতানের ন্যায় মুহাম্মাদ ফাতিহও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্যগ্র ছিলেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরেজমিন তদন্তের জন্য তিনি কখনো কখনো খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের রাজ্যময় প্রেরণ করতেন। অনুসন্ধান ও তত্ত্ব তালাশের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করে তাদের লিখিত ফরমান প্রদান করা হতো। প্রদত্ত কর্তব্য বিষয়ে পর্যাপ্ত তত্ত্বানুসন্ধানের পর তারা সুলতানের কাছে প্রতিবেদন পেশ এবং তদানুযায়ী তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।
অবশ্য নিরপেক্ষ খ্রিষ্টান পর্যবেক্ষকগণের প্রতিবেদন সর্বদা রাজ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বিবরণে সমৃদ্ধ থাকত। যুদ্ধযাত্রার সময় মাঝেমধ্যে সুলতান নিজেও বিভিন্ন রাজ্যে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান করতেন। এ সময় জনসাধারণ সরাসরি সুলতানের কাছে অভিযোগ পেশ করতে পারত এবং তিনিও জুলুমের প্রতিবিধান করতেন।
সুলতান এ বিষয়ে সম্যক অবগত ছিলেন যে, ফকিহ ও আলিমগণই ইনসাফ সম্পর্কে সর্বাধিক পরিজ্ঞাত। তিনিও এটিও জানতেন, মানব শরীরে হৃদপিণ্ডের যে স্থান, রাজ্যে আলিমগণের অবস্থানও অনুরূপ। তাই তাঁর রাজ্যে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানীদের কদর ছিল সর্বাধিক। জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা-দীক্ষার প্রসারের সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেন সুলতান। এক্ষেত্রে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শিক্ষাব্যবস্থা অবৈতনিক এবং শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন প্রদান করা হয়, যেন তাঁরা রোজগারের ব্যস্ততা মুক্ত হয়ে নিবিষ্ট চিত্তে পাঠদানে মনোযোগ দিতে পারেন। আলিমগণের মাঝে যারা বিচারব্যবস্থার সাথে যুক্ত হতেন, তাঁদের প্রতি যথোথপযুক্ত গুরুত্ব প্রদান করা হতো। তাঁদের আকর্ষণীয় বেতন দেওয়া হতো-যাতে তাঁরা স্বাধীনভাবে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে পারেন। এ ব্যবস্থা বিচার প্রশাসনকে ভাব-গাম্ভীর্য বজায় রাখার পাশাপাশি একে দুর্নীতিমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করত। ২ ২৪
বিচারক ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সুলতান ফাতিহ কেমন গুরুত্ব দিতেন, তার প্রমাণ হিসেবে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়-
'সুলতানের প্রাসাদের জনৈক কর্মচারীর অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ পেলে এদিনের কাজি তাকে সংশোধনের নির্দেশ দেন। সুলতানের কর্মচারী অবজ্ঞাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে। আদেশ অমান্য করার খবর পেয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে কাজি নিজে ওই অবাধ্য কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এগিয়ে যান। এতে উলটো ফল হয়, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে রাজকর্মচারী কাজিকে প্রহার করে। এ সংবাদ যখন সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের কাছে পৌঁছল, তখন তিনি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হন। বিচারককে অবমাননা করায় তিনি ওই কর্মচারীকে প্রাণদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন।
ওদিকে মন্ত্রীরা রাজকর্মচারীকে ক্ষমা করার জন্য সুলতানকে অনুরোধ করতে থাকেন। বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও সুলতান নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তখন বিষয়টি ফায়সালা করার জন্য রাজকর্মচারীরা মওলা মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদের শরণাপন্ন হন। তিনি সুলতানকে এই বলে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন, ক্রোধান্বিত হওয়ার কারণে ওই বিচারক তাঁর পদে বহাল থাকার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন। তাই তাঁকে প্রহারের মাধ্যমে কর্মচারীটি বিচারকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেনি। সুতরাং তাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া সমীচীন হতে পারে না। এ কথা শুনে সুলতান মুহাম্মাদ চুপ হয়ে যান।
তারপর ওই কর্মচারী কনস্ট্যান্টিনোপলে এলে মন্ত্রীরা তাকে সুলতানের কাছে নিয়ে যায়। ক্ষমা প্রার্থনার বশে লোকটি ফাতিহ-এর হাতে চুমু দিতে গেলে সুলতান তাকে এত জোরে প্রহার করেন যে, সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চার মাস চিকিৎসার পর সে সুস্থতা লাভ করে। এই কর্মচারীটির নাম দাউদ। বহু বছর পর পাশা উপাধি ধারণ করে তিনি সুলতান বায়েজিদ খানের মন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি প্রায়শ সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ-এর জন্য দুআ করতেন এবং বলতেন- 'তাঁর প্রহারই আমাকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছিল।'২২৫
বিজয়াভিযানের ব্যস্ততা সত্ত্বেও সুলতান মুহাম্মাদ প্রজাদের খবরাখবর নিতেন। সুযোগ পেলেই তিনি জনগণের হাল-হকিকত অবগত হওয়ার জন্য রাতের বেলায় ঘুরে বেড়াতেন। তা ছাড়া নিরাপত্তা বিভাগের কর্মচারীদের মাধ্যমেও তিনি জনগণের খোঁজখবর পেতেন। এক্ষেত্রে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবকে তিনি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যিনি বলেছিলেন- 'ফোরাত নদীর তীরের একটি মেষ শাবককেও যদি কোনো নেকড়ে খেয়ে ফেলে, সেজন্য উমর জিজ্ঞাসিত হবে।'২২৬
সুলতানের মৃত্যু ৮৮৬ হিজরির (১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দ) রবিউল আউয়াল মাসে সুলতান এশিয়া মাইনরের উদ্দেশ্যে ইস্তাম্বুল ত্যাগ করেন। এস্কোদারায় অপেক্ষমাণ একটি বড়ো বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি বের হয়েছিলেন। যাত্রার পূর্বে সুলতান ফাতিহ কিছুটা অসুস্থতা অনুভব করছিলেন। কিন্তু জিহাদে অংশগ্রহণের প্রেষণায় শারীরিক বাধাকে উপেক্ষা করেন। গেবজে নামক স্থানে পৌঁছার পর তাঁর পদক্ষেপ ভারী হয়ে আসে। চিকিৎসককে তলব করা হয়, কিন্তু ওষুধ-পথ্য কোনো কাজে আসে না। ৪ রবিউল আউয়াল ৮৮৬ হিজরি, মোতাবেক ১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মে রোজ বৃহস্পতিবার মহান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫২ বছর (ভিন্নমতে ৪৯ বা ৫১), আর রাজ্যশাসনের মেয়াদ হয়েছিল তিরিশ বছরেরও বেশি। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন, অর্থাৎ কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করেছেন। তাঁর হাতে বিজিত অন্য এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল রোমান রাজ্য কার্যাবলী ট্রাবজোন, সার্বিয়া, বসনিয়া ও সমগ্র এশিয়া মাইনর। বলকান অঞ্চলে তুর্কি কর্তৃত্বের বাইরে ছিল একমাত্র বেলগ্রেড শহর, আর ভেনিসের অনুগত কিছু দ্বীপ। ইস্তাম্বুলের এক বিশেষ কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। (বেক, ১৭৭; তারিকি, ১৯৯৫ : ৬০-৬১)
সুলতানের মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া
মধ্যযুগের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয় তুর্কিদের হাতে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়। এর মাধ্যমে মধ্যযুগের সমাপ্তি এবং ইউরোপে রেনেসাঁর সূচনা হয়। এহেন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার যিনি উপলক্ষ্য, সেই মহান ব্যক্তিত্ব সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের মৃত্যুতে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে বিপুল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। খ্রিষ্টীয় পশ্চিমারা সুলতানকে ঘৃণা করত। কারণ, তিনি তাদের প্রাচ্য রাজধানীর পতন ঘটিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে ইসলামি প্রাচ্যে রাসূলুল্লাহ -এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হিসেবে সুলতান ফাতিহ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও মান্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুকে দুনিয়ার এই অংশ যেন শোকসাগরে নিমজ্জিত হয়। নিম্নে উভয় অংশের প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়-
সুলতানের মৃত্যুর সময় অটোমান বাহিনীর একটি অংশ দক্ষিণ ইতালিতে অবস্থান করছিল। ফাতিহ-এর মৃত্যুর খবর তাদের কাছে পৌঁছলে তারা বেদনায় মুষড়ে পড়ে। অভিযান অব্যাহত রাখার পরিবর্তে তাদের নিকট নিরাপদে পশ্চাৎপরসণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তাই তারা নাপোলির রাজার সাথে চুক্তি করেন। তবে খ্রিষ্টানরা চুক্তি ভঙ্গ করে তুর্কি বাহিনীর পেছনের অংশের কয়েকজন সৈনিককে বন্দি করে তাদের লোহার শিকলে বেঁধে ফেলে।
সুলতানের মৃত্যুর খবর রোমে পৌঁছলে খ্রিষ্টান যাজকরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। পোপ চতুর্থ সিক্সটাস (১৪৭১-১৪৮৪) তুর্কিদের হাতে রোমের পতনের আশঙ্কায় দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সুলতানের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তিনি গির্জার দুয়ার খুলে দেন এবং সেখানে প্রার্থনা ও উৎসব আয়োজনের নির্দেশ দেন। বিজয় ও আনন্দের সংগীত গেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় আনন্দবাহন। তিন দিন ধরে অবিরাম আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকে রোম। অবশ্য এতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না। সুলতানের মৃত্যুতে খ্রিষ্টবাদ সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি হতে মুক্তি লাভ করেছিল। অন্যদিকে ভেনিসে সুলতানের মৃত্যুসংবাদ ঘোষিত হয় এই বার্তায়: 'মহান ঈগল মৃত্যুবরণ করেছেন।' ২२৭
মহান সুলতানের মৃত্যুতে তুর্কি জাতি শোকাচ্ছন্ন হয়ে পগে। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বেও শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়ে। এমন একজন সুলতান-যিনি পুণ্যবান পূর্বসূরিদের জিহাদের চেতনা ফিরিয়ে এনে মুসলিম জাতির শত শত বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁর মৃত্যুকে গোটা মুসলিম বিশ্ব শোকাচ্ছন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
ইতিহাসবিদগণের অভিমত
সমকালীন ইতিহাসবিদগণ সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃতিত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে কয়েকজন ইতিহাসবিদদের মূল্যায়ন এখানে উল্লেখ করা হয়-
'রোমান পতাকা অবনমিত হয় গৌরবময় সানজাক নিশানের সামনে, পরবর্তী দুশো বছর মুসলিম সম্রাটদের সামনে পশ্চিমা শাসকরা কম্পমান ছিল।' (Marshall Von Moltke, ১৫১)
'ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ, খুব সম্ভবত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হলো-তুর্কিদের হাতে ইস্তাম্বুলের পতন।' (Franz Bobinger, Mehmed der Eroberer, p. 7)
'এ ব্যাপারে কারও মনে সন্দেহ থাকবে না যে, সুলতান মুহাম্মাদই হলেন রোমান সম্রাট। সাম্রাজ্যের সিংহাসন যে শহরে অবস্থিত, সেটি যিনি জয় করেন-তিনিই তো বৈধ সম্রাট। আর রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসনের শহর হলো ইস্তাম্বুল।' (Yorgios Trapezutios, 146)
'সুলতান মুহাম্মাদ আমাদের যুগের সেই দার্শনিকদের একজন- যারা সূক্ষ্ম প্রতিভার অধিকারী।' (Critobulus, 177)
'সুলতান মুহাম্মাদের হাসি দেখতে পাওয়া ছিল বিরল ব্যাপার। তিনি এক লহমার জন্যও বিচক্ষণতা বিসর্জন দিতেন না। তিনি ছিলেন অতিশয় উদার, দুর্দান্ত সাহসী, আর প্রজ্বলিত বিচক্ষণতার অধিকারী। তিনি ছিলেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের মতো; সুখ্যাতি আর উচ্চতায় যারা সন্তুষ্ট থাকেন না। তিনি ঠান্ডা-গরম, ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করতে পারতেন। তাঁর কথা ছিল অকাট্য। ডরাতেন না কাউকে, খেল-তামাশা ও স্থূল বিনোদন থেকে থাকতেন দূরে। তিনি তুর্কি, গ্রিক ও সার্বিয়ান ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। আরও কয়েকটি ভাষা পড়তে ও বুঝতে পারতেন। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় তিনি অধ্যয়ন করতেন। তাঁর অধীত ইতিহাসের মধ্যে ছিল- রোমান ইতিহাস, হিরোডোটাস, Laerce, Tite-Live, Quinte-Qurse পোপদের ইতিহাস, জার্মানি, ফ্রান্স ও ল্যাম্বার্ড রাজাদের ইতিহাস, ইতালির ভূগোল সম্পর্কেও তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান রাখতেন। অনুরূপ জ্ঞান রাখতেন সেই সময়ের সকল ইউরোপীয় রাজ্য সম্পর্কে। প্রবল আগ্রহে তিনি ভূগোল ও যুদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করতেন। তাঁর রাজ্যে বসবাসকারী নানা জাতিগোষ্ঠীর আচার-অভ্যাসের সাথে খাপ খাওয়ানোর কাজে তিনি দক্ষ ছিলেন।' (সমকালীন ইতালীয় ইতিহাসবিদ Zorzo Dolfin)
'সুলতান মুহাম্মাদ আমাদের কালের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি কিরুস, আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ও সিজারের চেয়ে মহান। এককথায় পূর্ববর্তী সকল শাসকের চেয়ে সেরা।' (Babinger, from Yorgios Trapezuntios, 298)
'ফাতিহ কেবল প্রথম শ্রেণির ভাষাবিশেষজ্ঞ, ইতিহাসবেত্তা ও দার্শনিকই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন সেরা প্রশাসক ও ব্যবস্থাপক এবং অলৌকিক উপায়ে সমরাস্ত্র প্রয়োগে দক্ষ।' (N. M. Panzer, The Harem, লন্ডন, 1936, 237)
'১৪৫৩ সালে ফাতিহ-এর হাতে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের সাথে জ্ঞানের রেনেসাঁসের যুগ শুরু হয়। ফাতিহ আধুনিক রেনেসাঁসের অন্যতম সংরক্ষক। ফাতিহ ও তাঁর দুই উত্তরাধিকারীর নিকট আধুনিক রেনেসাঁস অনেকাংশে ঋণী। ইউরোপে প্রাচীন গ্রিক ভাষার প্রসারের পথ সুগম করে দিয়েছিলেন ফাতিহ। বায়েজিদ ও ইয়াওয়াজ যথাক্রমে ১৫০৬ ও ১৫১৯ সালে মিকেলেঞ্জেলো ও লিওনার্ডো দ্যা ভিঞ্চিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমন্ত্রণ জানান, অথচ পোপ তাদের আমন্ত্রণ করেননি।' (P. Faure, La Renaissance, ৭, ৪৬, ১০২, ১০৪, ১১৪)
'আমরা যদি অটোমান ইতিহাস অনুধাবন করতে চাই, তাহলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উসমান বংশের শাসকদের অধিকার মেনে নিতে হবে। ফাতিহের সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ ক্রিটোভুলাস, ডুকাস ও কালকনডাইলাস স্বীকার করেছেন, অটোমান সুলতানরাই রোমান সম্রাটদের বৈধ উত্তরসূরি।' (Grenard, ১০১-১০২)
'ইস্তাম্বুল বিজয় দ্বিতীয় মুহাম্মাদের ব্যক্তিগত সাফল্য। এটিকে উসমানি রাজ্যের স্বাভাবিক বিকাশের পরিণতি বলে মেনে নেওয়া যায় না।' (N. Lorge, Voyageurs Francais dans l'orient, ২১)২২৮
সমকালীন ইতিহাসবিদদের স্বীকৃতি থেকে জানা যাচ্ছে—সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ গ্রিক, ইতালীয় ও সার্বিয়ান ভাষায় সুদক্ষ ছিলেন। আরও কিছু ভাষা তিনি বুঝতে পারতেন। তা ছাড়া তিনি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রভুত উন্নতি সাধন করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় জ্ঞানও ছিল অগাধ। তদুপরি আরবি-ফারসি ভাষায় তাঁর দক্ষতাও ছিল সুবিদিত। তাই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তিনি তাঁর যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ও সর্বশ্রেষ্ঠ সমরবিদ। অধিকাংশ ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি হলেন তুর্কিদের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।
টিকাঃ
২০৯. এদের সংখ্যা ছিল চারজন। তারা যে ঘরে বসে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন, তার শীর্ষে একটি গম্বুজ ছিল, তাই তাদের গম্বুজমন্ত্রী বলা হতো। সেই মন্ত্রণাগৃহ এখনও বিদ্যমান ইস্তাম্বুলের সরাই তোপকাপিতে।
২১০. ফাহমি, প্রাগুক্ত ১৫২-১৫৩।
২১১. ফাহমি, প্রাগুক্ত ১৫২-১৫৩।
২১২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৪
২১৩. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮০; ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৪; আবদুল কাদের, পৃ. ৫৩; রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১১
২১৪. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩-৫৪
২১৪. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬
২১৬. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭-৫৮
২১৭. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৯
২১৮. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৯
২১৯. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯৩। হারব, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৭
২২০. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯৫-৯৬
২২১. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-৫৯
২২২. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১৩
২২৩. প্রাগুক্ত পৃ. ৪১৪
২২৪. প্রাগুক্ত, ৪০৯।
২২৫. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০৯
২২৬. আল-কুরতুবি, আল-জামি' লি আহকামিল কুরআন, ১৩/১৩১
২২৭. তারিকি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৪
২২৮. ওপরে উল্লেখিত ইতিহাসবিদদের মন্তব্যগুলোর সূত্র-উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪-১৪৫
📄 উপসংহার
ত্রয়োদশ শতকে আব্বাসি খিলাফতের পতনের পর সমগ্র মুসলিম দুনিয়ায় চরম হতাশা নেমে আসে। অপরদিকে স্পেন হতেও মুসলিম শক্তি বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই শতকের শেষ দিকেই ওগুজ তুর্কিদের একটি শাখা আনাতোলিয়ায় ক্ষুদ্র একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ইতিহাসে এটি উসমানি সালতানাত নামে পরিচিত। এই রাজবংশ একাধিক্রমে কয়েকজন যোগ্য সুলতানের নেতৃত্ব লাভে ধন্য হয়। ফলে প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এটি শক্তিশালী বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
ধীরে ধীরে এই সালতানাত মধ্যযুগের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। এই সালতানাতের সম্প্রসারণের ফলে প্রাচীন ও বনেদি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়ে পড়েছিল, যেটির রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল মুসলমানদের অধিকারে আসবে বলে বহু বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এশিয়া মাইনর ও পূর্ব ইউরোপব্যাপী উসমানি সাম্রাজ্য বিস্তৃতি লাভ করলেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল শহর জয় করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। অবশেষে উসমান বংশের সপ্তম সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে বাইজেন্টাইন রাজধানী জয় করে মুসলিমদের বহু দিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেন।
এ গ্রন্থে আমরা অতি সংক্ষেপে সুলতান মুহাম্মাদ কর্তৃক কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের বিবরণ উপস্থাপন করেছি। আলোচনার একরৈখিকতা দূর করার জন্য বিভিন্ন ভাষায় নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত তথ্যসূত্রের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। আলোচনার ধারাবর্তে উসমানি শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়েছে। কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের ইতিহাস উপস্থাপন করতে গিয়ে এ বিষয়টি আমাদের নিকট সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়েছে, সেই যুগে বৈষয়িক ও নৈতিক মানে উসমানি সালতানাতের সমকক্ষ কোনো রাজ্য ছিল না। ফলে এই বংশের সপ্তম সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কেবল কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করেছেন এমন নয়; বরং ইউরোপ ও এশিয়া মুসলিমদের প্রভাব বৃদ্ধি করতেও সক্ষম হয়েছেন।
ত্রয়োদশ শতকে আব্বাসি খিলাফতের পতনের পর সমগ্র মুসলিম দুনিয়ায় চরম হতাশা নেমে আসে। অপরদিকে স্পেন হতেও মুসলিম শক্তি বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই শতকের শেষ দিকেই ওগুজ তুর্কিদের একটি শাখা আনাতোলিয়ায় ক্ষুদ্র একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ইতিহাসে এটি উসমানি সালতানাত নামে পরিচিত। এই রাজবংশ একাধিক্রমে কয়েকজন যোগ্য সুলতানের নেতৃত্ব লাভে ধন্য হয়। ফলে প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এটি শক্তিশালী বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
ধীরে ধীরে এই সালতানাত মধ্যযুগের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। এই সালতানাতের সম্প্রসারণের ফলে প্রাচীন ও বনেদি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়ে পড়েছিল, যেটির রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল মুসলমানদের অধিকারে আসবে বলে বহু বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এশিয়া মাইনর ও পূর্ব ইউরোপব্যাপী উসমানি সাম্রাজ্য বিস্তৃতি লাভ করলেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল শহর জয় করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। অবশেষে উসমান বংশের সপ্তম সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে বাইজেন্টাইন রাজধানী জয় করে মুসলিমদের বহু দিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেন।
এ গ্রন্থে আমরা অতি সংক্ষেপে সুলতান মুহাম্মাদ কর্তৃক কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের বিবরণ উপস্থাপন করেছি। আলোচনার একরৈখিকতা দূর করার জন্য বিভিন্ন ভাষায় নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত তথ্যসূত্রের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। আলোচনার ধারাবর্তে উসমানি শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়েছে। কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের ইতিহাস উপস্থাপন করতে গিয়ে এ বিষয়টি আমাদের নিকট সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়েছে, সেই যুগে বৈষয়িক ও নৈতিক মানে উসমানি সালতানাতের সমকক্ষ কোনো রাজ্য ছিল না। ফলে এই বংশের সপ্তম সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কেবল কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করেছেন এমন নয়; বরং ইউরোপ ও এশিয়া মুসলিমদের প্রভাব বৃদ্ধি করতেও সক্ষম হয়েছেন।