📄 মহামতি মুরাদ
[পিতা : প্রথম মুহাম্মাদ, মাতা : দিলকাদির উন্নু আমিনা খাতুন, জন্ম : ১৪০৩, শাসনকাল : ১৪২১-১৪৫১, মৃত্যু : ১৪৫১]
সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ চার পুত্র রেখে মারা যান। পিতার মৃত্যুর সময় জ্যেষ্ঠপুত্র মুরাদের (জন্ম : আমাসিয়া, ১৪০৩ বা ১৪০৪) বয়স ছিল আঠারো, দ্বিতীয় পুত্র মুস্তাফার তেরো, বাকি দুজন শিশু। স্বাভাবিকভাবে মুরাদই হবেন পরবর্তী সুলতান। মৃত্যুর প্রাক্কালে দুই শিশুপুত্রকে বাইজেন্টাইন সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অসিয়ত করেন সুলতান। দুই মন্ত্রী বায়েজিদ পাশা ও ইবরাহিম তা-ই করেন। মুরাদ ছিলেন এশিয়ায়। পিতা অসুস্থ বলে তাঁকে সংবাদ দেওয়া হয়। ক্ষমতারোহণ নির্ঝঞ্জাট করার জন্য ৪০ দিন পর্যন্ত সুলতানের মৃত্যুর খবর গোপন রাখেন মন্ত্রীরা। এরই মাঝে মুরাদ এসে অভিষিক্ত হন।
প্রত্যেক তুর্কি সুলতানের ন্যায় মুরাদকেও এশিয়া-ইউরোপে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়। মুরাদ প্রথমে কারমান-রাজ ও হাঙ্গেরির রাজার সাথে ইতঃপূর্বে সম্পাদিত পাঁচ বছরের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সালতানাতের এশীয় অংশের বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমনে একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হওয়া।
মুস্তাফার বিদ্রোহ দমন
কিন্তু বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেন না। আঠারো বছরের কিশোরের ক্ষমতাসীন হওয়াকে সম্রাট সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। সুলতান মুহাম্মাদের সাথে কৃত চুক্তিবলে তার ভাই (বর্তমান সুলতান মুরাদের চাচা) মুস্তাফা সম্রাটের কাছে নজরবন্দি ছিল। ম্যানুয়েল তাকে শুধু মুক্তই করেননি; বরং তরুণ সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন। সেনাপতি দিমিত্রি লাসকারিসের নেতৃত্বে ২০টি সামরিক নৌযান দিয়ে মুস্তাফাকে সমৃদ্ধ করেন সম্রাট। নিজেকে সুলতান দাবি করে মুস্তাফা এ বলে প্রচারকাজ শুরু করেন, পিতৃব্য বেঁচে থাকতে ভ্রাতুষ্পুত্রের সুলতান হওয়ার কোনো অধিকার নেই। সালতানাতের ইউরোপীয় প্রদেশগুলো একে একে মুস্তাফার হস্তগত হয়। এক পর্যায়ে সুলতানের সেনাপতি বায়েজিদ পাশা এগিয়ে এলেন সালতানাত রক্ষায়। কিন্তু মুস্তাফা নিজেকে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রকৃত সুলতান দাবি করে বায়েজিদের বহু সৈনিককে বাগিয়ে নেন। যুদ্ধে মুরাদের সেনাপতি পরাজিত ও নিহত হন। আত্মবিশ্বাসী মুস্তাফা সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এশিয়ায় প্রবেশ করেন। ব্রুসার কাছে উলুবাদ নদীর তীরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। কিন্তু এবার লড়াই হয় না, কেবল ভ্রাতুষ্পুত্রের কৌশলের কাছে হেরে যান মুস্তাফা। তিনি পালিয়ে গ্যালিপোলি দুর্গে আশ্রয় নিলেন। সুলতান সহসা তা জয় করেন এবং ম্যানুয়েলের হাতের পুতুল মুস্তাফা ধৃত ও নিহত হয়। ৬৬
কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ
সুলতান মুরাদ বিপদমুক্ত হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বাইজেন্টাইন সম্রাটকে শিক্ষা দিতে মনস্থ করেন। ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট (৩ রমজান, ৮২৫ হি.) তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করে আক্রমণ শানান। কিন্তু ৬৪ দিন স্থায়ী এ অবরোধে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য অর্জিত হয় না। সম্রাট ম্যানুয়েলের ধূর্ততা কনস্ট্যান্টিনোপলকে রক্ষা করে। তিনি সুলতানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৩ বছর বয়সি মুস্তাফাকে বিদ্রোহে উৎসাহ দেন। জামিয়ান ও কারামানের রাজারা সৈন্য দিয়ে শাহজাদাকে সাহায্য করেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থান দখল করে মুস্তাফা ব্রুসা অবরোধ করেন। কিন্তু মুরাদ এত দ্রুত সেখানে উপস্থিত হন যে, বাধা প্রদান অর্থহীন দেখে মুস্তাফা পালিয়ে যান। সুলতানের কিছু সৈনিক দ্রুতই বিদ্রোহী ভ্রাতা ও তার বহু অনুচরকে ধরে হত্যা করে। ৬৭
বিদ্রোহ দমনে সুলতানের সাফল্য দেখে সম্রাট ম্যানুয়েল ভয় পেলেন। তিনি বার্ষিক ৩০ হাজার (কোনো কোনো সূত্রে ৩ লাখ) ডুকাট কর দানের অঙ্গীকার করে এবং ডার্কোস ও সেলিম্বিয়া ব্যতীত স্টাইমন নদী ও কৃষ্ণসাগর তীরের সমস্ত গ্রিক নগর ছেড়ে দিয়ে সুলতানের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন (১৪২৪ খ্রি)। ১৪২৩ সালে ক্যাস্টামোনু-এর শাসক তার অর্ধেক রাজ্য সুলতানকে দিয়ে দেন এবং বিশ্বস্ততার নিদর্শনস্বরূপ তার মেয়ের সাথে মুরাদের বিয়ে দেন। তুর্কি সৈন্যরা গ্রিসে অভিযান চালিয়ে করিন্থের ইস্থমাস প্রাচীর ভেঙে ফেলে। সম্রাট ম্যানুয়েল এটি নির্মাণ করেছিলেন। মোরিয়াও তুর্কিদের পদানত হয়। ৬৮
বিদ্রোহ দমন পরের বছর পুরোনো বিশ্বাসঘাতক কারা জুনাইদ আয়দিন দখল করে। অচিরেই সেনাপতি বায়েজিদ পাশার ভাই হামজা বেগ তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। এ লোকটি সুলতান প্রথম মুহাম্মাদের কাছ থেকেও দুবার ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এবার তার মৃত্যুর মাধ্যমে সালতানাত একজন জাত শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পায়।
আয়দিন, সারুখান ও মিনতশাসহ কয়েকটি ক্ষুদ্ররাজ্য আবারও সালতানাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। তাইমুর লং এগুলোকে স্বাধীন করে দিয়েছিলেন। সুলতানের বাহিনীর হাতে কামরান শাসক মুহাম্মাদ বেক নিহত হলে তার রাজ্যও মুরাদের হাতে আসে। সুলতান অবশ্য সাবেক শাসকের পুত্র ইবরাহিমকে আনুগত্যের শর্তে পিতৃরাজ্য শাসন করতে দেন।
১৪২৮ সালে জামিয়ানের বয়োবৃদ্ধ রাজা ইয়াকুব বেগ মারা যান। তার কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায় তিনি নিজেই রাজ্যটি (কুতাহিয়া) সুলতানকে দিয়ে যান। তাইমুর যে রাজ্যগুলোকে তুর্কি সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন করেছিল, এভাবে সেগুলো পুনরায় সালতানাতভুক্ত হয়। ৬৯
ইউরোপে সুলতানের কার্যাবলি এশিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর মুরাদ ইউরোপে মনোযোগী হন। প্রথমেই হাঙ্গেরির সাথে যুদ্ধ বাধে। দানিয়ুব নদীর উত্তর তীরের শহর কলম্বাস ৭০ দখল করার পর হাঙ্গেরির রাজা সুলতানের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। চুক্তির ফলে দানিয়ুবের ডান তীরে তুর্কি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হাঙ্গেরির পরিণতি দেখে সার্বিয়ার রাজা জর্জ ব্রাঙ্কোভিচ বার্ষিক ৫০০০০ ডুকাট স্বর্ণমুদ্রা কর প্রদান ও যুদ্ধের সময় সুলতানের সাহায্যে একদল উৎকৃষ্ট সৈনিক প্রেরণের শর্তে চুক্তি করেন। তিনি হাঙ্গেরির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও সম্মত হন। তা ছাড়া বিশ্বস্ততার প্রমাণস্বরূপ সুলতানের সাথে আপন কন্যা মারা ব্রাঙ্কোভিচের বিবাহ দেন।
১৪৩০ সালে ১৫ দিন অবরোধের পর তিনি Thessalonica পুনর্দখল করেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট অষ্টম জনের এক ভাই ডেসপট উপাধি ধারণ করে এই শহর শাসন করতেন। তার একার পক্ষে তুর্কিদের প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় দেখে কিছু অর্থের বিনিময়ে শহরটি ভেনিসের কাছে বিক্রি করে দেন। ভেনিসিয়ানরা বাণিজ্যের উন্নতির মাধ্যমে এটিকে দ্বিতীয় ভেনিস বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তুর্কিরা এটা মেনে নেয়নি। সুলতান নিজে অভিযানে বের হয়ে Thessalonica জয় করেন।
এবার তিনি কনস্টান্টিনোপল জয়ে মনস্থ করেন। কিন্তু এর পূর্বে তিনি বাইজেন্টাইন রাজধানীর সাথে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সম্পর্কচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ লক্ষ্যে প্রথমেই আলবেনিয়া অভিযান পরিচালনা করেন। জেনিনাসহ কয়েকটি শহরের বাসিন্দারা স্বশাসনের সুযোগ বহাল রাখার শর্তে আনুগত্য স্বীকার করে। আলবেনিয়ার উত্তরাংশের শাসক জন কাস্ট্রিয়ট তার চার পুত্রকে সুলতানের কাছে বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। ১৪৩১ সালে তার মৃত্যু হলে রাজ্যটি সালতানাতভুক্ত হয়।
১৪৩১ সালে ওয়ালেচিয়ার রাজা ড্রাকুল তুর্কিদের বশ্যতা স্বীকার করে। তবে একাকী যুদ্ধ করা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই সে এমনটা করেছিল। কিছুদিনের মধ্যে হাঙ্গেরির উসকানিতে ড্রাকুল ও সার্বিয়ার রাজা বিদ্রোহ করে বসে। ফলে সুলতান তাদের দমন করতে বাধ্য হন। বহু জনপদ ধ্বংস করে ১৪৩৮ সালে ৭০ হাজার বন্দিসহ তিনি ফিরে যান। পরের বছর সার্বিয়ার রাজা ব্রাঙ্কোভিচের বিদ্রোহ প্রকাশ পায়। ফলস্বরূপ সুলতান আন্দরিয়া দখল করে বেলগ্রেড অবরোধ করেন। ৭১
অচিরেই জন হুনিয়াডি নামে এক মারাত্মক চতুর শত্রুর আবির্ভাব হয়। হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমান্ড ও এলিজাবেথ মর্সিনি নামে এক সুন্দরী বালিকার অবৈধ সংশ্রবের ফল জন হুনিয়াডি। তিনি সাদা কাপড় পরতেন বলে খ্রিষ্টানরা তাকে 'শ্বেত নাইট' বলত। ইতালির যুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে ট্রান্স সিলভানিয়ার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। ইতোমধ্যে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার রাজা লেডিসলাস হাঙ্গেরির সিংহাসনে বসেন।
১৪৪২ সালে মুরাদের বেলগ্রেড অভিযান ব্যর্থ হয়। ওদিকে তুর্কি সেনাপতি মজিদ বে ট্রানসিলভানিয়ার অন্তর্গত হার্মনস্টাড অবরোধ করেন। লেডিসলাস তখনও নাবালক, তাই হাঙ্গেরির প্রকৃত শাসক ছিলেন হুনিয়াডি। ১০ হাজার সৈনিক নিয়ে নগর উদ্ধারে এগিয়ে এলেন তিনি। যুদ্ধে তুর্কিরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয়। ২০ হাজার মুসলিম নিহত হয়। মজিদ বে পুত্রসহ ধরা পড়েন। হুনিয়াডি সবার সামনে তাদের খণ্ড-বিখণ্ড করে নৃশংসতার স্বাক্ষর রাখলেন।
এবার সুলতান আরেক সেনাপতি শিহাবুদ্দিন পাশাকে ৮০ হাজার সৈনিকসহ প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনিও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ১৪৪৩ সালে হুনিয়াডি আরও বড়ো বাহিনী প্রস্তুত করেন। তার সাথে যোগ দিলো পোল্যান্ড, সার্বিয়া ও ওয়ালেচিয়ার বাছাবাছা সৈনিকেরা। ইতালি হতে পোপও একদল সৈনিক পাঠালেন কার্ডিনাল জুলিয়ানের নেতৃত্বে। ফ্রান্স ও জার্মানিও বাদ গেল না। রাজা লেডিসলাস নিজে সৈন্যদের সাথে ময়দানে অবতীর্ণ হন। ওদিকে কারামানরাজও পূর্বপরিকল্পনামতো বিদ্রোহ করেন। সুলতানকে বাধ্য হয়ে এশিয়া মাইনরে গমন করতে হয়। মুরাদের অনুপস্থিতিতে তাঁর সৈন্যরা হুনিয়াডির বাহিনীর সাথে পেরে উঠল না। মোরাভা নদীর তীরে দুই দলের মাঝে লড়াই হয়। পরাজিত তুর্কি বাহিনী পালিয়ে যায় বলকানের দক্ষিণে। মাঝে মারা যায় ১ হাজার তুর্কি আর বন্দি হয় ৪ হাজার।
তখন ছিল শীতের মৌসুম। প্রাকৃতিক বাধা মাড়িয়ে হুনিয়াডি বলকান অতিক্রম করে ইসলাদি গিরি সংকটের পথে দক্ষিণের সমতল ভূমিতে অবতরণ করেন। বারংবার পরাজয়ে এমনিতেই তুর্কিদের মনোবল ছিল না। ফলে ইউরোপীয় তুরস্ক সহজেই হুনিয়াডির পদানত হয়।
সুলতান মুরাদ এশিয়ায় সফল হলেও ইউরোপে তাঁর সেনাপতিরা বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন। তা ছাড়া হুনিয়াডির মতো সেনাপতির নেতৃত্বে খ্রিষ্টান সংঘের বাহিনীও হয়ে উঠেছিল অদম্য। তাই তিনি দূরবর্তী প্রদেশগুলো ছেড়ে সালতানাতের অবশিষ্টাংশে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মনস্থ হন। ওদিকে তাঁর ভগ্নিপতি মাহমুদ চেলেবি হুনিয়াডির হাতে বন্দি হন। তাকে উদ্ধার করার জন্য বোনের বিশেষ অনুরোধও সুলতানকে শান্তি-আলোচনায় উৎসাহ দিলো। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ১০ বছরের জন্য শান্তিরক্ষা করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে দুই পক্ষ সেজেদিনে এক সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন (জুলাই ১৩, ১৪৪৪/২৬ রবিউল আউয়াল, ৮৪৮ হিজরি)। এর ফলে সার্বিয়া স্বাধীনতা পায় এবং ওয়ালেচিয়া হাঙ্গেরির অন্তর্ভুক্ত হয়। সুলতানের ভগ্নিপতি মাহমুদ মুক্তি পান; বিনিময়ে হুনিয়াডি ৬০,০০০ ডুকাট মুক্তিপণ লাভ করেন। ৭২
মুরাদের সিংহাসন ত্যাগ
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কিছুদিন পর মুরাদের বড়ো পুত্র আলাউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। পুত্রশোকে কাতর সুলতান দুনিয়াদারি বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। মেজো পুত্র ১৪ বছর বয়সি মুহাম্মাদের অনুকূলে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি আয়দিনে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। সেখানে মুত্তাকি-পরহেজগার ব্যক্তিদের সাথে ইবাদত- বন্দেগিতে মশগুল হন।
চুক্তি ভঙ্গ করেন হুনিয়াডি
সুলতানের পদত্যাগের খবর পৌঁছামাত্র সক্রিয় হয়ে উঠলেন কার্ডিনাল জুলিয়ান সিজারেনি (১৩৯৮-১৪৪৪)। তিনি লেডিসলাসকে সন্ধিভঙ্গে প্ররোচিত করতে লাগলেন এই বলে, মুসলমানদের সাথে সম্পাদিত সন্ধি ভঙ্গ করলে কোনো পাপ হবে না। বুলগেরিয়ার সিংহাসন লাভের প্রতিশ্রুতি পেয়ে হুনিয়াডির মন গলল। তিনি সন্ধি ভঙ্গ করতে সম্মত হন। এমন ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা হুনিয়াডির মতো শ্রেষ্ঠ সেনাপতির জীবনে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করে। ৭৩
বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম
সরাসরি যুদ্ধে হুনিয়াডি বহুবার তুর্কি বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু সুলতানের অবসরের সুযোগে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের প্ররোচনায় মুসলিম দমনের যে কূটকৌশল গ্রহণ করেন, তা সফল হয়নি। চুক্তির বছরের ১ সেপ্টেম্বর লেডিসলাস ও জুলিয়ানের সহযোগিতায় ২০ হাজার সৈনিক নিয়ে তুর্কি দলনে অগ্রসর হন হুনিয়াডি। মাঝপথে ওয়ালেচিয়ার রাজা ড্রাকুলও যোগ দেন তাদের সাথে।
ক্যাথলিক বাহিনী বুলগেরিয়ার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়ার পথে দেশীয় অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের গ্রাম ও গির্জা পুড়িয়ে দেয়। এটি ছিল অপ্রয়োজনীয় নৃশংসতা। দানিয়ুব পার হয়ে তারা কৃষ্ণসাগরের তীরে পৌঁছায়। সেখানে তারা একটি ক্ষুদ্র তুর্কি নৌবহর ধ্বংস করে। সুন্নিয়াম, পেজেসসহ বহু দুর্গ তাদের দখলে আসে; তুর্কি রক্ষীদের হত্যা বা উচ্চ স্থানে নিক্ষেপ করা হয়। কাভার্না জয় করে খ্রিষ্টান সৈন্যরা কৃষ্ণতীরের শহর ভার্না অবরোধ ও দখল করে। লেডিসলাসের স্বপ্ন ছিল তিনি দ্রুত কনস্ট্যান্টিনোপলে পৌঁছে বাইজেন্টাইন সম্রাটের জামাতা হিসেবে অভিষিক্ত হবেন।
তুর্কি সালতানাতের কল্যাণকামীরা ভয়াবহ বিপদ আঁচ করতে পেরে মুরাদকে নির্জনবাস থেকে ফিরিয়ে আনেন। মুরাদ আবার রাজদণ্ড হাতে নেন। ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে অক্লান্ত সুলতান বসফরাস পাড়ি দিয়ে দ্রুত সামনে অগ্রসর হন। ১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর (২৮ রজব, ৮৪৮ হিজরি) দুই পক্ষ পরস্পরের মুখোমুখি হয়। ভগ্ন সন্ধির একখানা প্রতিলিপি হয় তুর্কিদের পতাকা। উদ্দেশ্য : দুনিয়াবাসী যেন দেখে, বিশ্বাসঘাতকের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ লড়াই একটি ন্যায্য সংগ্রাম। আর আসমান-জমিনের মালিক যেন ন্যায়ের পক্ষে বিজয় দান করেন।
যুদ্ধের প্রাক্কালে অকস্মাৎ এক ঝড় এসে খ্রিষ্টানদের সমস্ত পতাকা ভূমিস্যাৎ করে দেয়। কেবল রাজার পতাকা উড্ডীন থাকে। প্রাণপণ লড়াই করে খ্রিষ্টানরা দুর্লক্ষণ মিথ্যা প্রমাণে সচেষ্ট হয়। হুনিয়াডি তুর্কি বাহিনীর এশীয় সৈনিকদের হটিয়ে দেন। অপর পাশে ওয়ালেচিয়ার সৈনিকরা সফল হয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল-খ্রিষ্টানদেরই জয় হবে। এমন সময় আনাতোলিয়ার বেগলার বেগ কারাজা তার বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রভাগে চলে আসেন। অবস্থা বেগতিক দেখে মুরাদ পশ্চাদপসরণ করার জন্য অশ্ব ফেরালেন। তুর্কিদের সৌভাগ্যই বলতে হবে, কারাজা নিকটেই ছিলেন। তিনি সুলতানের অশ্বের লাগাম ধরে তাঁকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। এক লহমায় সুলতানের হুঁশ ফিরে আসে। তিনি জেনিসেরিদের প্রাণপণে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। ফলে অল্পকালের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। হাঙ্গেরির রাজা লেডিসলাসের অশ্ব মারা পড়ে। তুর্কি সৈন্যরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। খাদার আগা নামের এক বৃদ্ধ জেনিসেরি এক আঘাতে তার মাথা কেটে ভগ্ন সন্ধিপত্রের সাথে বর্শাগ্রে বিদ্ধ করে।
এই একটি ঘটনা যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে পালটে দেয়। হাঙ্গেরির অভিজাতরা তাদের রাজার পরিণতি দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাতে থাকে। রাজার মৃতদেহ উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা শেষে হুনিয়াডি অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যান। খ্রিষ্টান বাহিনীর নেতৃহীন পশ্চাৎ সৈন্যরা পরদিন প্রতুষ্যে তুর্কিদের হাতে বেঘোরে কাটা পড়ে। এই ঘৃণিত সন্ধি ভঙ্গের প্রধান উসকানিদাতা ও যুক্তিদাতা জুলিয়ান নিজেও নিহত হন। ভার্নার বিজয় সার্বিয়া ও বসনিয়াকে আবারও তুর্কি সালতানাতভুক্ত করে। এভাবে তুর্কিদের হাত থেকে বলকান অঞ্চলকে বাঁচানোর সর্বশেষ কেন্দ্রীভূত প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।৭৪
নিকোপলিসের পর আবারও সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তুর্কিরা জয়লাভ করে। এ বিজয়ে মুসলিম দুনিয়ায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ভার্নার বিজয়ের খবর কায়রোতে পৌঁছলে (১/০৪/১৪৪৪) মামলুক সুলতান জাকমাক পরবর্তী জুমার খুতবায় আব্বাসি খলিফার পাশাপাশি সুলতান মুরাদের নাম উচ্চারণের নির্দেশ দেন। শহিদদের জন্য দুআ করা এবং কায়রোর সড়কে বিজয় শোভাযাত্রা বের হয়। ৭৫
ইস্কান্দার বেগ সৃষ্ট গোলমাল
ভার্নার বিজয়ের পর মুরাদ আবারও ম্যাগনেসিয়ায় নির্জনবাস গ্রহণ করেন। অচিরেই জেনিসেরিরা অবাধ্য হয়ে রাজধানী এদিন লুট করে। সালতানাতের শুভাকাঙ্ক্ষীরা অশনি সংকেত দেখেন। তাদের অনুরোধে ১৪৪৪ সালের প্রারম্ভে মুরাদ আবারও রাজদণ্ড হাতে নেন। বিদ্রোহের হোতাদের শাস্তি দিয়ে অন্যদের ক্ষমা করেন। এবার তিনি ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন। জেনিসেরি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখার লক্ষ্যে তিনি বাইজেন্টাইন ভূমিতে অভিযান পরিচালনা করেন। সম্রাট ম্যানুয়েলের সাম্রাজ্য বণ্টনের সিদ্ধান্ত মুরাদের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল ও তার উপকণ্ঠ জনকে এবং মোরিয়া ও থেসালিয়ার অংশবিশেষ কনস্ট্যান্টাইনকে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সুলতানের অভিপ্রায় জানতে পেরে কনস্ট্যান্টাইন করিন্থ যোজক বরাবর ছয় মাইল দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেন। সুলতানের সৈন্যরা কামান দাগিয়ে প্রাচীর ছিদ্র করে করিন্থ শহর দখল করে নেয়।
তবে মোরিয়া অধিকারের প্রচেষ্টা সফল হয়নি সুলতানের। কারণ, আলবেনিয়ায় ইস্কান্দর বেগের বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ বেড়ে গিয়েছিল। উত্তর আলবেনিয়ার শাসক জন ক্যাস্ট্রিয়টের চার পুত্র মুরাদের কাছে বন্ধক ছিল। এদেরই একজন ইস্কান্দার বেগ। সে বাহ্যিকভাবে মুসলিম হয়েছিল। ১৪৪৩ সালে সুলতান যখন হুনিয়াডির সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত, তখন সে সালতানাতের প্রথম সচিবের কাছ থেকে এই মর্মে একটি আদেশ জারি করান যে, তাকে আলবেনিয়ার আক হিসারের শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণ করার সাথে সাথে আরনাউদ গোত্রসমূহের সর্দারদের সে তার গোপন অভিসন্ধি প্রকাশ করে এই বলে, সে পিতৃভূমিকে তুর্কিদের হাত হতে মুক্ত করতে চায়। তাদের আর্থিক ও জনবলের সাহায্যে সে একটি বাহিনী গঠন করে ১৪৪৩ সালে তুর্কি সেনাপতি আলি পাশাকে পরাজিত করে। সুলতানের নির্জনবাস ও হাঙ্গেরির সাথে যুদ্ধব্যস্ততাকে সে প্রভাব বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। ভার্না যুদ্ধের সমাপ্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে ইস্কান্দার বেগের প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পেলেন মুরাদ। ১ লাখ সৈনিক সমভিব্যহারে এগিয়ে গিয়ে ১৪৪৭ সালেই তিনি তার হাত হতে দুটি নগরী ছিনিয়ে নেন।
দ্বিতীয় কসোভো যুদ্ধ
ইতোমধ্যে আবারও হুনিয়াডির প্রাদুর্ভাব ঘটে। এবার তিনি সার্বিয়া মাড়াচ্ছিলেন, সাথে ছিল ২৪ হাজার সৈন্য; যাদের মধ্যে ১০ হাজার ওয়ালেচিয়ান। ১৪৪৮ সালে সুলতান নিজে পুনরায় হুনিয়াডির মুখোমুখি হন কসোভো প্রান্তরে। এটিকে দ্বিতীয় কসোভো যুদ্ধ বলে। ১৩৮৮ সালে ইউরোপীয়রা কসোভোর ময়দানে সুলতান প্রথম মুরাদের হাতে পরাজিত হয়েছিল। ৬০ বছর পর ১৪৪৮ সালে একই ময়দানে তারা দ্বিতীয় মুরাদের হাতেও পরাজিত হয়।
এখানে হুনিয়াডিকে পরাজিত করে সুলতান আবার ছোটেন ইস্কান্দার বেগকে দমন করতে। কিন্তু কিছুদিন আক হিসার শহর অবরোধ করেও তাকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হন। এমনকী কর প্রদানের বিনিময়ে সে চুক্তি করতেও রাজি হয়নি। দীর্ঘ যুদ্ধে বহু সৈন্যের প্রাণহানি ও অবশিষ্টদের ক্লান্তির কারণে সুলতান রাজধানীতে ফিরে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে ইস্কান্দারকে শিক্ষা দিতে মনস্থ হন। কিন্তু তার আগেই ১৪৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি (৫ মুহাররম ৮৫৫ হি.) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৩০ বছর ধরে রাজ্য শাসনকারী সুলতানের বয়স হয়েছিল ৪৯। তাঁর মরদেহ ব্রুসায় স্থানান্তরিত করা হয়।
বহুবিধ গুণাবলি ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ। তিনি কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। শান্তির সময়ে তিনি সপ্তাহে দুই দিন কবিদের মজলিসে উপবেশন করতেন। তাদের ভাতা দিতেন-যাতে তারা জীবিকার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত না হয়ে কাব্যসাধনায় নিমগ্ন হতে পারেন। সুলতান নিজেও কাব্যচর্চা করতেন। কবিরা সুলতানকে এতই ভালোবাসতেন, তারা তাঁর সাথে যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করতেন।
তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, ধর্মপরায়ণ, সৎ, সাহসী, সহিষ্ণু, সদয়, মুক্তহস্ত ও মহামান্য সুলতান। শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁর চেয়ে বেশি উৎসাহ আর কেউ দেয়নি। তাঁর আমলে জনগণ সুখী ও নিরাপদ ছিল। যখনই তিনি কোনো জনপদ জয় করতেন, সেখানে তিনি মসজিদ, মাদরাসা, সরাইখানা, ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতেন। আরকানা নদীর ওপর তিনি ৩৯২ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করেন। সেতুটি নির্মাণ করতে ১৬ বছর সময় লেগেছিল। প্রতিবছর তিনি মক্কা-মদিনা ও জেরুজালেমের ধার্মিক বাসিন্দাদের ৩৫০০ স্বর্ণমুদ্রা দান করতেন। যুদ্ধ ও সন্ধিতে তাঁর সততা ছিল অতুলনীয়। তিনি কখনো সন্ধি ভঙ্গ করেননি। সে যুগের খ্রিষ্টান রাজারা সততায় তাঁর ধারে কাছেও ছিল না। তাঁর উদারতাও প্রশংসনীয়। হাঙ্গেরির রাজা লেডিসলাস যেখানে নিহত হন, সেখানে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করে তার সাহসের প্রশংসা ও দুর্ভাগ্যের জন্য শোক প্রকাশ করে শিলালিপি খোদাই করেন।
সেই যুগে তাঁর ন্যায় স্নেহপরায়ণ ও দয়াদ্র শাসকের দেখা মেলা ভার। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অনেক সময় শাসকরা নির্দয় আচরণ করেন। সুলতান মুরাদ কখনো তা করেননি। ভ্রাতৃহত্যা তো দূরের কথা; তিনি তাদের সসম্মানে ও সস্নেহে পালন করেছেন। জামিয়ানের এক রাজার সাথে সুলতানের এক বোনের বিয়ে হয়। বিদ্রোহী তৎপরতার কারণে সুলতান তাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন, কিন্তু বোনের খাতিরে ভগ্নীপতিকে ক্ষমা করে দেন। তাঁর আরেক ভগ্নিপতি মাহমুদ চেলেবি হুনিয়াডির কাছে বন্দি ছিলেন। মুখ্যত তাঁকে উদ্ধারের জন্যই তিনি সেজেদিনের সন্ধি করেন।
সুলতান পুত্রস্নেহে এত কাতর ছিলেন, ১৪ বছর বয়সি পুত্রের হাতে সালতানাতের দায়িত্ব দিয়ে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। আবার পুত্র বিপদে পড়লে নির্জনতা ছেড়ে রাজদণ্ড গ্রহণ করেন। রাজার পক্ষে এমন স্নেহপরায়ণতা জগতে দুর্লভ। সত্যিই তিনি মহামতি। ৭৮
সুলতানের সম্পর্কে সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ কানকুনডাইলাস বলেন— 'তিনি ছিলেন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ।'
ইতিহাসবিদ ভন হ্যামার বলেন—
'সুলতান মুরাদ ন্যায়পরায়ণতা ও গৌরবের সাথে ৩০ বছর রাজ্য শাসন করেছেন। তিনি ধর্মভেদ বিবেচনায় না এনে সকল নাগরিকের সাথে ন্যায়ানুগ আচরণ করতেন। যুদ্ধে ও শান্তিতে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেন। তিনি সন্ধিকে প্রাধান্য দিতেন। তবে প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে কুণ্ঠিত হতেন না। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের থেকে তিনি কঠিন প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর বিচক্ষণতা এক মুহূর্তের জন্যও লোপ পায়নি।'৭৯
টিকাঃ
৬৬. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩; আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০; Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৭. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩-৫৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০; Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৮. Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৯. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ ১৫৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১২১
৭০. এটি কোসেভু শহর, যা বেলগ্রেডের পূর্ব দিকে অবস্থিত।
৭১. Vasiliev, op.cit. p. 641; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৫
৭২. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬-৫৭
৭৩. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫
৭৪. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭-৫৮; Marsh, op.cit. p. 548
৭৫. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭
৭৬. আক মানে সাদা আর কারা এর অর্থ কালো; অনেক উসমানি শহরের নামে আক ও কারা শব্দ দেখা যায়। আক হিসার মানে সাদা দুর্গ বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-৫৯
৭৮. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩০; হারব, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৬
৭৯. qt. in উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩০।
📄 মুহাম্মদ ফাতিহ : প্রাথমিক জীবন
[পিতা: দ্বিতীয় মুরাদ, মাতা: হুমা খাতুন, জন্ম: ১৪২৮, শাসনকাল : ১৪৫১-১৪৮১, মৃত্যু : ১৪৮১]
সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ও হুমা খাতুনের পুত্র মুহাম্মাদ ১৪২৮ (কারও মতে ২০ এপ্রিল, ১৪২৯) সালে (৮৩৩ হিজরি) ইদিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উসমান বংশের সপ্তম সুলতান। ইতঃপূর্বে মুহাম্মাদ নামে আরও একজন সুলতান ছিলেন বলে তিনি 'দ্বিতীয় মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত। কনস্ট্যান্টিনোপল বিজেতা এই সুলতানের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উপাধি হলো 'ফাতিহ'। আরবি বিশেষণ 'ফাতিহ'-এর অর্থ হলো বিজেতা। তাঁর আরেকটি উপাধি হলো 'আবুল খায়রাত' (নেক আমলের জনক)।
বাল্যকাল থেকেই মুহাম্মাদ বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি যেমনি ছিলেন শক্তিশালী ও সাহসী, তেমনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচলিত শাখায়ও তাঁর বুৎপত্তি ছিল। প্রিন্স কলেজে অধ্যয়নকালে জ্ঞানচর্চায় তাঁর প্রতিভার বিকাশ লক্ষ করা যায়। সেকালের সেরা বিদ্বানদের তাঁর শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তিনি ছিলেন বহুভাষী। মাতৃভাষা তুর্কি ছাড়াও আরও ছয়টি ভাষা জানতেন। যেমন-আরবি, ফারসি, হিব্রু, ল্যাটিন, গ্রিক ও স্লাভ। খ্রিষ্টান শিক্ষক ইউরগিওস আমিরুটজেস (Yorgios Amirutzes)-এর কাছে তিনি ক্লাসিক্যাল গ্রিক শেখেন। সিরিআকো অ্যানকোনিট্যাটো [Ciriaco Anconitato (1391-1455)] নামে এক ইতালীয় শিক্ষকের থেকে তিনি লাতিন ভাষা, প্রাচীন ইতিহাস ও ভূগোল অধ্যয়ন করেন। গিওভানি মারিও অ্যানজিয়েলেলো (Giovanni Mario Angiolello) নামে এক ভেনিসিয়ান পরিব্রাজক ও ইতিহাসবিদদের কাছে তিনি ইউরোপ ও ইতালির ইতিহাস অধ্যয়ন করেন।
ডলফিন লিখেছেন, শাহজাদা মুহাম্মাদ তাঁর শিক্ষকদের কাছে গ্রিক ইতিহাসবিদ Laertius ও Herodotus এবং রোমান ইতিহাসবিদ Livy ও Quintus Curtius-এর গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করেন। এভাবে তিনি আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, জুলিয়াস সিজারসহ অন্যান্য সম্রাটদের জীবনী এবং ফ্রান্স, লম্বার্ডির রাজা ও পোপদের কাহিনি গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করেন। ৮০
জনৈক বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদের বর্ণনায় দেখা যায়-সুলতান মুহাম্মাদ সমকালীন বিজ্ঞানের নানা শাখা, বিশেষত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলের জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন। ইউরোপের রাজ্যেগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করে তিনি একটি বড়ো মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। গণিতশাস্ত্রেও তাঁর মোটামুটি জ্ঞান ছিল। পিতার মতো সুলতান ফাতিহও মৌলভি ছিলেন। ইসলামি শাস্ত্র শিক্ষাদানের জন্য পিতা সুলতান মুরাদ অনেক শিক্ষক নিয়োগ দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমির আদিল চেলেবি, শাইখ আহমদ কুরানি, শাইখ আক শামসুদ্দিন, শাইখুল ইসলাম মওলা খসরু, নিশানজি মোল্লা সিরাজুদ্দিন পাশা প্রমুখ। এই শিক্ষকদের মধ্যে শাইখ আক শামসুদ্দিন ও শাইখ আহমদ কুরানির বিপুল প্রভাব ছিল সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের ওপর। বিজয়াভিযানের আলোচনায় এ বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
শিল্পকলার প্রতি তাঁর আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায় ইতালীয় চিত্রকরদের আমন্ত্রণ জানানো ও তাদের পুরস্কৃত করার ঘটনায়। ফাতিহ কর্তৃক নিমন্ত্রিত চিত্রকরদের মাঝে ছিলেন বিখ্যাত ভেনিসিয়ান চিত্রকর ম্যাথু পাসি ও জেন্টাইল বেলিনি। ৮১ প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চা সুলতানের জীবনে ব্যর্থ হয়নি। পরবর্তী জীবনে শাসনকাজে ও বিজয়াভিযানে এ অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল।
তুর্কি প্রাসাদের রেওয়াজ অনুসারে কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মাঝে বেড়ে উঠেন মুহাম্মাদ। ভবিষ্যতের তুর্কি সুলতানের জন্য শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস ও ভাষাজ্ঞান যথেষ্ট ছিল না; সামরিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন ছিল। তাই সেকালের দক্ষ সমরবিদ ও কৌশলবিদগণকে তাঁর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। সমরবিদ্যায় তাঁর প্রশিক্ষক ছিলেন উজির সারিজা কাসিম পাশা (১৪৬০), দামাদ জাগানুশ মুহাম্মাদ পাশা (১৪৬২), খাদার চেলেবি (১৪৫৯) ও খাদিম সুলায়মান পাশা (১৪৯৩)। এভাবে কঠোর সামরিক, বৈষয়িক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেড়ে উঠেন ভবিষ্যতের উসমানি সুলতান শাহজাদা মুহাম্মাদ।
প্রথমবার সিংহাসন লাভ: ১৪৪৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে শাহজাদা মুহাম্মাদ প্রথমবারের মতো সিংহাসনে আসীন হন, যখন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ সিংহাসন ত্যাগ করে আয়দিনে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। ওই বছর সুলতান মুরাদ হুনিয়াডির সাথে শান্তিচুক্তি করেন। এর কিছুদিনের মধ্যে সুলতানের বড়ো পুত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আলাউদ্দিন মারা যান। এ শোকে সুলতানের কাছে দুনিয়াদারি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। মেজোপুত্র মুহাম্মাদের হাতে ক্ষমতা ত্যাগ করে তিনি মুত্তাকি পরহেজগার লোকদের সাথে সময় কাটাতে থাকেন। তবে শাহজাদা মুহাম্মাদের এই ক্ষমতারোহণ মোটেও স্থায়ী হয়নি।
ওই বছরই হুনিয়াডি বিদ্রোহ করলে সালতানাতের কল্যাণকামীরা মহা দুর্যোগের পূর্বাভাস দেখে সুলতানকে ক্ষমতায় ফিরে আসার অনুরোধ জানান। মুরাদ রাজদণ্ড গ্রহণ করে হুনিয়াডিকে উপযুক্ত শাস্তি দেন। ১৪৪৫ সালে সুলতান আবারও ক্ষমতা ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এবার জেনিসেরি বিদ্রোহের কারণে তাঁর অবসর নেওয়া হয় না।
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের ক্ষমতারোহণ : অবশেষে ১৪৫১ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের মৃত্যু হলে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মাদ ক্ষমতারোহণ।
আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কার: ক্ষমতারোহণের সাথে সাথে সুলতান মুহাম্মাদ প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো সংস্কারে মনোযোগী হন। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয় এমনভাবে নির্ধারণ করেন-যাতে অপচয়, অপব্যয় ও বিলাসিতার পথ রুদ্ধ হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের উন্নয়ন ও সংস্কার সাধন, তাদের বেতন বাড়ানো এবং সমকালীন সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হয়।
তারপর তিনি প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার প্রতি মনোযোগী হন। কয়েকজন সাবেক শাসককে স্বপদে বহাল রাখেন। দায়িত্ব পালনে যাদের ব্যাপারে ত্রুটির অভিযোগ এসেছিল, তাদের অপসারণ করেন। এভাবে অভ্যন্তরীণ সংস্কার সাধন শেষে তিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতি মনোযোগী হন; বহু বছর ধরে তাঁর পূর্বপুরুষরা যে শহর জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন।
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের জীবনে সর্বাধিক কৃতিত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল জয়। এ বিষয়টি এ বইয়ের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সর্বাধিক বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ শহর কনস্ট্যান্টিনোপলের ওপর প্রথমে কিছুটা আলোচনা করা দরকার।
টিকাঃ
৮০. Zorzi Dolfin, "Coronaca" (ff. 313-322), in J. R. Melville Jones, The Siege of Constantinopole: Seven Contemporary Accounts, p. 126.
৮১. Edward Gibbon, The History of the Decline and fall of the Roman Empire, v. 12, p. 8; George Phrantzes, 93-95 qt in উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮১, ১৮৪
📄 বিশ্রুত নগরী কন্সট্যান্টিনোপল
বিশ্রুত নগরী কনস্ট্যান্টিনোপল! কনস্ট্যান্টিনোপলের পূর্বনাম বাইজেন্টিয়াম এবং বর্তমান নাম ইস্তাম্বুল। এই শহরের ঐতিহ্য, ঐশ্বর্য ও গৌরব রূপকথাকেও হার মানায়। আড়াই হাজার বছর ধরে এটি নানা ধর্ম, সংস্কৃতি ও শাসকগোষ্ঠীর দ্বন্দ্বমুখর কল্লোল অবলোকন ও সহ্য করে সগৌরবে টিকে আছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় এটিকে পৃথিবীর সর্বাধিক আকাঙ্ক্ষিত শহর বলে গণ্য করা হতো। এ শহরের প্রতিষ্ঠার আদি বৃত্তান্ত-কিছুটা ঐতিহাসিক বিবরণ আর কিছুটা কিংবদন্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রাচীনকালে বসফোরাস প্রণালির তীরে বাইজেন্টিয়াম (Byzantium) নামে একটি শহর ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৬৫৭ সালে একদল গ্রিক অভিবাসী মেগারা শহর থেকে এসে এখানকার থ্রাসিয়ান মেষচালক জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে বসতি স্থাপন করে। তাদের নেতার নাম ছিল বাইজাস (Byzas)। অভিবাসীদের সর্দারের নামানুসারে শহরটির নাম রাখা হয় বাইজেন্টিয়াম। অতি অল্প সময়ের মধ্যে নগরটি উন্নতি ও সমৃদ্ধির চূড়ায় উপনীত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত হয়।
আয়তনে শহরটি খুব একটা বড়ো ছিল না। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রতিরক্ষার গুণে এটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর পোতাশ্রয়ে বিপুলসংখ্যক জাহাজ নোঙর করার সুযোগ থাকায় অল্পদিনের মধ্যে বাইজেন্টিয়াম বর্ধিষ্ণু বন্দরে পরিণত হয়। কৃষ্ণসাগরের প্রবেশপথে অবস্থানের সুযোগে বন্দরটি প্রাচীনকালে ওই অঞ্চলের নৌবাণিজ্যের বিরাট অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। শহরের উত্তরে প্রলম্বিত উপসাগর 'গোল্ডেন হর্ন' নামে পরিচিতি লাভ করে। কারণ, এখানে উৎকৃষ্ট মানের প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এবং নানা দেশের পণ্যবাহী জাহাজ এখানকার পোতাশ্রয়ে আশ্রয় গ্রহণ করত। ৮২
মূল শহরটি ছিল ত্রিভুজাকৃতির। দক্ষিণ কোনায় আছে শৈলান্তরীপ, যা থ্রাসিয়ান মূলভূমি হতে বেরিয়ে এশিয়ান অংশের দিকে ঢুকে পড়েছে। শহরটির দক্ষিণে মর্মর সাগর, উত্তরে গোল্ডেন হর্নের সংকীর্ণ খাঁড়ির জলরাশি (৬ মাইল বা ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ); ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রণালি তথা বসফোরাসের তীরে এর অবস্থান। এই জলখণ্ড এশিয়া ও ইউরোপকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং কৃষ্ণসাগরের জলরাশিকে মর্মর সাগরে ফেলছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাইজেন্টিয়াম ছিল আক্ষরিক অর্থেই দুর্লঙ্ঘ ও দুর্ভেদ্য। ৮৩
প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত বন্দরনগরীটি স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ববর্তী জাতিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ফলে এটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এশীয় ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর লড়াই লেগেই থাকত। তাই শহরটির হাতবদলের বিবরণ অনেক দীর্ঘ। এখানে অতি সংক্ষেপে তা উল্লেখ করা হচ্ছে।
পারস্যসম্রাট প্রথম দারিউস (শাসনকাল ৫২২-৪৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) ৫১২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বাইজেন্টিয়াম দখল করে নেন। আইওনিয়ান বিদ্রোহের ফলে ৪৯৬ সালে নগরটি পারস্যরাজের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। তবে অচিরেই আবারও প্রাচ্যশক্তিটি বাইজেন্টিয়ামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কয়েক বছর পর (৪৭৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এথেন্সের সামরিক নৌ-বহর সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধের সময় এথেন্সের প্রভাব খর্ব হলে বাইজেন্টিয়াম চলে যায় আরেক নগররাষ্ট্র স্পার্টার নিয়ন্ত্রণে। এথেন্সের জেনারেল আলসিবিয়াডেস শহরটি পুনর্দখল করেন। তবে এথেন্সের এবারের কর্তৃত্ব স্বল্পস্থায়ী হয়েছিল। কারণ, ৪০৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে শহরটি আবারও স্পার্টার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের প্রারম্ভে মেসিডোনিয়ান বীর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট বাইজেন্টিয়াম দখল করেন। মহাবীরের মৃত্যুর পর মেসিডোনিয়ান সাম্রাজ্য খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার সুযোগে বাইজেন্টিয়াম স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হয়।
তারপর নগররাষ্ট্রটি রোমের সাথে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হয়; কিন্তু অচিরেই রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ান (শাসনকাল: ৬৯-৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) চুক্তি ভঙ্গ করে বাইজেন্টিয়াম দখলে নেন। ১৯৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট সেপটিমিয়াস সেভেরাস (Septimius Severus, 193-211) শহরটি দখল করে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালান। তখন বাইজেন্টিয়ামের বহু নাগরিক হত্যা, নগরপ্রাচীর ও দালানকোঠা ধ্বংস করা হয় এবং এর বাণিজ্যিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অভিযোগ করা হয়- সেপটিমিয়াস সেভেরাস ও সিরিয়ার শাসক পেসেনিয়াস নাইজারের (Pescennius Niger) মধ্যকার গৃহযুদ্ধে বাইজেন্টিয়াম সম্রাটের প্রতিপক্ষকে সাহায্য করেছিল।
রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস (২৬৮-২৭০)-এর আমলে বাইজেন্টিয়ামের বাসিন্দারা গথিক আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। সম্রাট ডিউক্ল্যাসিয়ানের (২৮৪-৩০৫) মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নির্ধারণ করতে গিয়ে কনস্ট্যান্টাইন ও তার প্রতিপক্ষরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় প্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট লিসিনিয়াস বাইজেন্টিয়ামে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাই শহরটি কনস্ট্যান্টাইনের রোষের শিকার হয়। ৩২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তার হাতে নগরটি পদানত হয়। ফলে কনস্ট্যান্টাইন দ্যা গ্রেট রোমান সাম্রাজ্যের উভয় অংশ—তথা পূর্ব ও পশ্চিম অংশের নিরঙ্কুশ শাসকে পরিণত হন। ৮৪ সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন দ্যা গ্রেট (শাসনকাল : ৩০৬-৩৩৭) কর্তৃক জয়ের পর বাইজেন্টিয়ামের উপর্যপুরি হাতবদলের ধারা সমাপ্ত হয়। এরপর শহরটি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করে।
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের গোড়া হতেই রোমান সম্রাটগণ রাজধানী পরিবর্তনের কথা চিন্তা করছিলেন। তখন বহিঃশত্রুর আক্রমণে রোমান সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্বর জাতিগুলো বিভিন্ন সীমান্তে হামলা করে গল, রাইন ও দানিয়ুবসহ বহু প্রদেশে নৈরাজ্য ছড়িয়ে দিয়েছিল। অপরদিকে পূর্ব সীমান্তে সাসানিরা অগ্রসর হচ্ছিল। উত্তর ও পূর্ব সীমান্তে বর্বর জাতিগুলোর উৎপাতও চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। সম্রাট ক্লডিয়াস (২৬৮-২৭০) তো কপটিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে মারা যান। আর সম্রাট ভ্যালেরিয়ান (২৫৩-২৬০) জীবনের শেষ অধ্যায় অতিবাহিত করেন পারস্যের বন্দিশালায় (ফাহমি, ৪৫-৪৬)। সুদূর রোম হতে দানিয়ুব ও ফোরাত তীরের দূরবর্তী সীমানা সুরক্ষা করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
তাই এটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল যে, রোমান সম্রাটরা রাজধানী পরিবর্তনের চিন্তা করেছিলেন। এ ব্যাপারে প্রথম ভাবনা আসে সম্রাট ডিউক্ল্যাসিয়ানের (২৮৪-৩০৫) মাথায়। তিনি রাজধানী স্থাপন করেন নিকোমিডিয়ায়—যা মর্মর সাগরের এশীয় তীরে অবস্থিত ছিল। পরবর্তী সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনও এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, রাজধানী হিসেবে রোম অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। তবে নিকোমিডিয়া তার পছন্দ হলো না। তিনি বাইজেন্টিয়ামকে রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেন। বিরাট বন্দর ও নিরাপদ পোতাশ্রয়ে সমৃদ্ধ শহরটি এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তা ছাড়া এটি কৃষ্ণসাগরের নৌ-বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করে। অতএব, দুই মহাদেশে বিস্তৃত সাম্রাজ্যের রাজধানী বানানোর জন্য এর চেয়ে বেশি উপযুক্ত স্থান আর হতে পারে না।
৩২৪ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টিয়ামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে নগর পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন। রোম শহরের নকশা ও পরিকল্পনার সচেতন অনুকরণে বাইজেন্টিয়ামের সংস্কার কাজ শুরু হয়। পুরোনো শহরটি ছিল চারটি টিলার ওপর, সংস্কারের সময় তিনটি নতুন টিলার ওপর নগর সম্প্রসারণ করা হয়। টিলাগুলো ছিল পূর্ব হতে পশ্চিমে ক্রমশ উঁচু এবং উপত্যকা দ্বারা বিচ্ছিন্ন। সপ্ত টিলায় অবস্থিত বাইজেন্টিয়ামকে রোমের ন্যায় ১৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্ত করা হয়।
সম্রাট নতুন রাজধানীর সৌন্দর্যকরণে বিন্দুমাত্র কসুর করেননি। রোম, এথেন্স, এন্টিয়ক ও সিসিলি হতে বহু নিদর্শন এনে এখানে স্থাপন করা হয়। প্রতিটি টিলার শীর্ষে কোনো না কোনো ভাস্কর্য বা শানদার প্রাসাদ ছিল—যা দ্বারা সেটি চিহ্নিত হতো। সংস্কারের পর বাইজেন্টিয়াম শহরের আকার তিনগুণ বেড়ে যায়। সম্রাট সেভেরাস যে হিপোক্রমের (বর্তমানে আত ময়দানি) নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন, সেটি আজ পূর্ণতা পায়।
নবনির্মিত স্থাপনার মধ্যে ছিল একটি বিশাল প্রাসাদ, আইনসভার অধিবেশনকক্ষ ও কয়েকটি চার্চ। প্রতিদ্বন্দ্বী শহরগুলো হতে ভাস্কর্য এনে তা বাইজেন্টিয়ামের রাস্তায় স্থাপন করে নগরের শোভা বর্ধন করা হয়। এভাবে পৌত্তলিক রোমান শহরের আদলে নির্মাণ ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার পর ঈপ্সিত রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জনের লক্ষ্যে নতুন রাজধানীর নাম রাখা হয় ‘নয়া রোম’।
কনস্ট্যান্টাইন যেন ইতালির রোমকে বাইজেন্টিয়ামে নিয়ে এলেন। তবে স্থপতির নাম চিরস্থায়ী করার জন্য ‘কনস্ট্যান্টিনোপল’ নামটিও চালু হয়। কালের আবর্তে ‘নয়া রোম’ নামটি বিলুপ্ত হয়ে ‘কনস্ট্যান্টিনোপল’ই স্থায়ী হয়। নতুন রোমান রাজধানীর অভিষেক হয় ১১ মে, ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে। আর সম্রাটের অভিষেক সম্পন্ন হয় হিপদ্রুম স্কয়ারে—যা ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে এখনও টিকে আছে। ৮৫
সম্রাটের অভিষেক অনুষ্ঠানাদি ৪০ দিন ধরে চলে। এই প্রথমবারের মতো রোমান সম্রাটের অভিষেক অনুষ্ঠানে খ্রিষ্টধর্মের আচার পালন করা হয়। কনস্ট্যান্টাইন প্রথম রোমান সম্রাট-যিনি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন (৩১২ খ্রিষ্টাব্দ)।
রাজধানী স্থানান্তরের পর রোমের প্রশাসনযন্ত্র সম্পূর্ণরূপে কনস্ট্যান্টিনোপলে স্থানান্তরিত হয়। তাদের অনুকরণে সাম্রাজ্যের নানা অংশের বণিকশ্রেণি, সৈনিকদল ও সম্পদশালী ব্যক্তিরা নতুন রাজধানীতে বসতি স্থাপন করেন। অচিরেই নতুন রাজধানীতে ৪০০ সুরম্য প্রাসাদ ও প্রায় দেড় শতাধিক স্নানাগার তৈরি হয়। ক্রমে ক্রমে শহরের বাসিন্দা বেড়ে যায় এবং কনস্ট্যান্টিনোপলের কাছে রোম বিবর্ণ হয়ে যায়।
কনস্ট্যান্টাইনের আমলের স্থাপনা বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অবশিষ্টাংশের মধ্যে রয়েছে-সাগরের নিকটে সেন্ট আইরিনের গির্জা এবং হেপদ্রুম স্কোয়ারে স্থাপিত সর্পস্তম্ভ; এটি কনস্ট্যান্টাইন রোমের প্রাচীন নিদর্শনের অবশিষ্টাংশ হতে এনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে টিলাশীর্ষের কিছু রোমান স্থাপনা সংস্কার করা হয় এবং তুর্কি আমলে কিছু নতুন স্থাপনাও নির্মিত হয়। সপ্ত টিলার শীর্ষে রোমান ও তুর্কি আমলে স্থাপিত উল্লেখযোগ্য স্থাপনার বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো (গোল্ডেন হর্ন সংলগ্ন শৈলান্তরীপের চূড়াটিকে প্রথম টিলা ধরে পশ্চিমাভিমুখী বিবরণ)-
প্রথম পাহাড় এক্রোপলিস, আয়া সোফিয়া, চার্চ অব সেন্ট ইরেনি, কিচুক আয়াসোয়া মসজিদ, সোকুল্লু মেহমেত পাশা মসজিদ, প্রথম আহমদ মসজিদ (ব্লু মস্ক), তৃতীয় আহমদ ফোয়ারা, জাদুঘর, চিনিলি কিওস্ক (প্যাভিলিয়ন অব টাইলস), ব্যাসিলিকান চৌবাচ্চা (ইয়েরেবাটান সরাই), হিপদ্রুম (সুলতান আহমেত ময়দানি), তোপকাপি প্রাসাদ (সেরাগ্লিও), মর্মর সাগর প্রাচীর।
দ্বিতীয় পাহাড় নুর উসমানিয়ে মসজিদ, কলাম অব কনস্ট্যান্টাইন, বড়োবাজার।
তৃতীয় পাহাড় ভেফা কিলিস মসজিদ, দ্বিতীয় বায়েজিদ মসজিদ, লালেই মসজিদ, শেহজাদ মসজিদ, সুলাইমান মসজিদ ও সমাধি, বোদরুম মসজিদ, কালেন্দারহানে মসজিদ (আকাটালেপটস মঠ), অ্যাকুউডাক্ট অব ভ্যালেন্স।
চতুর্থ পাহাড় ফাতিহ মসজিদ, মোল্লা জাইরেক সমজিদ, এস্কি ইমারত মসজিদ।
পঞ্চম পাহাড় আহমদ পাশা মসজিদ, গুল মসজিদ, ফেতহিয়ে মসজিদ, চার্চ অব সেন্ট মেরি অব দ্যা মোঙ্গলস, গ্রিক প্যাট্রিয়ার্খাল চার্চ অব সেন্ট জন।
ষষ্ঠ পাহাড় কারি মসজিদ, মিহরিমাহ মসজিদ, আড্রিয়ানোপল গেট, তেকফুর সরাই (প্যালেস অব কনস্ট্যান্টাইন)।
সপ্তম পাহাড় হেকিমউগ্ন আলি পাশা মসজিদ, রমজান এফেন্দি মসজিদ, সেভেন টাওয়ার ক্যাস্টল, কোচা মোস্তফা পাশা মসজিদ, ইমরাহর মসজিদ। ৮৬
নগরপ্রাচীর নগরপ্রাচীরের বর্ণনা ব্যতীত কনস্ট্যান্টিনোপলের বিবরণ অপূর্ণ রয়ে যাবে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল সুরক্ষিত শহর। তবুও বাইজেন্টাইন সম্রাটগণ প্রাচীর নির্মাণ করে রাজধানীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও নগরপ্রাচীর মিলে কনস্ট্যান্টিনোপলকে আক্ষরিক অর্থেই দুর্ভেদ্য করে তুলেছিল। রোমান আমলে নির্মিত প্রাচীরের নিদর্শন এখনও ইস্তাম্বুলে দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীর মাত্র একবার লঙ্ঘন করা সম্ভব হয়েছিল। আর তা করেছেন তুর্কি সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ। তাঁর প্রাচীর ভাঙার কাহিনিই বর্তমান গ্রন্থের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। কনস্ট্যান্টিনোপলের নিরাপত্তায় দুটি প্রাচীর ও একটি পরিখা খনন করা হয়। অন্তঃপ্রাচীর নির্মাণ করা হয় ৪১৩ খ্রিষ্টাব্দে আর বহিঃপ্রাচীর ৪৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। ভেতরের প্রাচীরটি ৩০ ফুট (৯ মিটার) উঁচু ও ১৬ ফুট চওড়া; প্রতি ১৮০ ফুট অন্তর রয়েছে ৬০ ফুট উঁচু টাওয়ার। বহিঃপ্রাচীরে ৯২টি দুর্গকূট নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে ৫৬টি এখনও অক্ষত রয়েছে। ৮৭
সমুদ্রপ্রাচীর নির্মিত হয়েছিল ৪৩৯ খ্রিষ্টাব্দে। এটির উচ্চতা ছিল ৩০ ফুট। গোল্ডেন হর্নের সংলগ্ন প্রাচীরের কিছু অংশ ছাড়া বাকি অংশের অস্তিত্ব এখন আর নেই। এ প্রাচীরে ১১০টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং ১৪টি গেট ছিল।
মর্মর সাগরের দিকে রয়েছে আরেকটি সমুদ্রপ্রাচীর-যেটি সেরাগ্লিও পয়েন্ট হতে পাঁচ মাইল এগিয়ে গিয়ে উপদ্বীপের গোড়ার কাছাকাছি স্থানে বাঁক নিয়ে স্থলপ্রাচীরের সাথে মিলেছে। এটিতে ১৮৮টি টাওয়ার ছিল। অবশ্য ওগুলো মাত্র ২০ ফুট উঁচু ছিল। কারণ, মর্মর সাগরের ঢেউ শত্রুর অবতরণের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরক্ষা দিত।৮৮ এই দিকের প্রাচীরের বৃহদাংশ এখনও টিকে আছে।
কনস্ট্যান্টিনোপল যে সাতটি পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, তার সবগুলো ছিল নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে। নগরপ্রাচীর ও সমুদ্রপ্রাচীর কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে শত শত বছর ধরে বাইজেন্টাইন রাজধানী বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও অবরোধ উপেক্ষা করে টিকে ছিল।
মিশ্র সংস্কৃতির সংশ্লেষ রোমান স্থাপত্যশিল্প ও নগর পরিকল্পনার আলোকে নির্মিত হলেও কনস্ট্যান্টিনোপলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নিরঙ্কুশ প্রাধান্য ছিল না; বরং এটির ব্যক্তিত্ব, প্রথা, শিল্প ও স্থাপত্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। হেলেনিক সংস্কৃতির প্রাধান্যও ছিল লক্ষ্যণীয়। কারণ, এর বেশিরভাগ অধিবাসী ছিল গ্রিক বংশ্য; রোমান নয়।
এখানে এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাজধানী স্থানান্তরের পশ্চাতে আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল। আর তা হলো-সম্রাট কনস্টান্টাইন এমন একটি নগর প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেটিতে খ্রিষ্টীয় ছাপ থাকবে। দৃষ্টিনন্দন গির্জা ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর বসবাসের ফলে সম্রাটের সেই অভিপ্সা পূর্ণ হয়েছিল। তবে ইউরোপের বিভিন্ন পৌত্তলিক শহর হতে আমদানিকৃত ভাস্কর্য দ্বারা অলংকৃত রাজধানী শহরটির পক্ষে পরিপূর্ণরূপে পৌত্তলিক প্রভাব বর্জন করা সম্ভব হয়নি। কনস্ট্যান্টিনোপলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্ম খ্রিষ্টবাদ, শাসনব্যবস্থা রোমান এবং ভাষা গ্রিক; আরও ছিল পৌত্তলিক ধর্মমতের প্রতি সহনশীলতা এবং ইহুদিদের জন্য শুভ কামনা। মিশ্র সংস্কৃতির সংশ্লেষের এরচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে! ৮৯
অর্থোডক্স খ্রিষ্টবাদের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল খ্রিষ্টবাদের ইতিহাসে প্রথম তিনশো বছর ছিল নির্যাতন, নিষ্পেষণ ও দেশান্তরের ইতিহাস। ইউরোপ ও এশিয়ার কোনো দেশেই খ্রিষ্টবাদ স্বীকৃত ধর্ম ছিল না। ফলে এ ধর্মের অনুসারীরা জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতো। কনস্ট্যান্টাইন শুধু খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণই করেননি; বরং তিনি এটিকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনশো বছরের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা ও পালিয়ে বেড়ানোর পর খ্রিষ্টানরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সময় পেলেন। পৌত্তলিক শহর ছেড়ে দলে দলে খ্রিষ্টানরা কনস্ট্যান্টিনোপলে আসতে থাকে। সম্রাটগণও নিঃসংশয়ে তাদের রাজধানীকে খ্রিষ্টবাদের রাজধানী বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজধানীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানানসই গির্জা নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। চতুর্দিক হতে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর আগমনে কনস্ট্যান্টিনোপল খ্রিষ্টানপ্রধান শহরে পরিণত হয়। সম্রাটগণের আগ্রহ ও উদ্যোগের বদৌলতে 'নয়া রোম' অচিরেই খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্য রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে; যদিও প্রাচ্যেরই অপর দুটি শহর তথা এন্টিয়ক ও আলেকজান্দ্রিয়া খ্রিষ্টবাদের আদি শহর হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল।
খ্রিষ্টবাদের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে কনস্ট্যান্টিনোপল। ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন খ্রিষ্টান-গির্জার ঐক্যের লক্ষ্যে প্রথম কাউন্সিল আহ্বান করেন। নাইসিয়া (বর্তমান ইজনিক, তুরস্ক) শহরে অনুষ্ঠিত এ কাউন্সিলে অ্যারিয়ানিজমের সমালোচনা করা হয়। ৩৮১ সালে কনস্ট্যান্টিনোপলেই অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি কাউন্সিল। এর মাধ্যমে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্থ বা প্রধান ধর্মযাজক পুরোহিততন্ত্রে পোপের অব্যবহিত পরের স্থান লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে আরও চারটি চার্চ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় কনস্ট্যান্টিনোপল শহরে।
১০৫৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমান ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স চার্চের বিভাজন চূড়ান্তরূপে সম্পন্ন হলে কনস্ট্যান্টিনোপল অর্থোডক্স চার্চের অবিসংবাদিত রাজধানীতে পরিণত হয়। ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিরা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে নেয়। তারপরও ইস্তাম্বুল খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্য-রাজধানীর মর্যাদা হারায়নি। এখনও কনস্ট্যান্টিনোপল তথা ইস্তাম্বুলের প্যাট্রিয়ার্থ হন অর্থোডক্স চার্চের প্রধান।
কনস্ট্যান্টিনোপল-কেন্দ্রিক রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাংশ ধীরে ধীরে পশ্চিমাংশ হতে পৃথক বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে থাকে। সেইসঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যের নানা প্রান্ত হতে খ্রিষ্টানরা এখানে এসে বসবাস করতে থাকে। এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের বৈশিষ্ট্য এতটা স্বতন্ত্র হয়ে পড়ে যে, সম্রাট থিওডোসিয়াস দ্যা গ্রেট (৩৮৯-৩৯৫) তার মৃত্যুর পূর্বে সাম্রাজ্যকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দুই পুত্রের মাঝে বণ্টন করে দেন। একটি অংশ হয় পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য; এর রাজধানী রোম। আর অপর অংশটি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য; এর রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল।
এই বিভাজনের পর পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্বর জাতিগুলোর আক্রমণে ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রধানত এর প্রাকৃতিক সুরক্ষার কারণে এটি আরও প্রায় এক হাজার বছর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। ৯১
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের কারণ প্রায় এগারো শত বছর ধরে কনস্ট্যান্টিনোপল শহর, পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে টিকে ছিল। খ্রিষ্টান জাতির প্রতিরক্ষার শেষ রেখাও ছিল এই শহর। এই একাদশ শতবর্ষে এগারোটি রাজবংশ সাম্রাজ্য শাসন করেছে। সম্রাটগণের মাঝে কেউ ছিলেন প্রাজ্ঞ ও সুশাসক, কেউ-বা অত্যাচারী ও দুরাচারী। যে সাম্রাজ্যে অবিচার ও অনাচারের প্রাদুর্ভাব ঘটে, সেটির পতন অবশ্যম্ভাবী। তার ওপর বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চে মুসলিমদের উত্থান ক্ষয়িষ্ণু বনেদি সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করে। প্রতাপশালী সাম্রাজ্যটি একদিনে দুর্বল হয়নি। কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে এক পর্যায়ে পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়-এখন তা নিয়ে আলোচনা করব।
সম্রাট জাস্টিনিয়ানের (কার্যকাল : ৫২৭-৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) আমলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য গৌরবের চূড়ায় উপনীত হয়েছিল। তিনি বিশ্বনেতার আসনে সমাসীন হওয়ার উচ্চাভিলাষ পোষণ করতেন। তাই তিনি এশিয়ায় পারস্য সাম্রাজ্য ও ইউরোপে বর্বর জাতিগুলোর সাথে অব্যাহত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিজয়াভিযানে উত্তর আফ্রিকা সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। তিনি জাঁকঝমকপূর্ণ বহু প্রাসাদ ও কয়েকটি অনুপম গির্জা নির্মাণ করেন। ইস্তাম্বুলের অনন্য স্থাপনা 'আয়া সোফিয়া (Hagia Sofia)' এখনও তাঁর সময়ের নির্মাণ সৌকর্যের সাক্ষ্য বহন করে চলছে। এটির গম্বুজ ভূপৃষ্ঠ হতে ১৮০ ফুট উঁচু। আর মেঝে ছিল অলংকৃত চৌখুপি দ্বারা সজ্জিত; সিলিং ও দেয়ালে ছিল খ্রিষ্টধর্মের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির চিত্রকর্ম, শ্বেত মার্বেলের পিলারের ওপর ছিল খিলান। গির্জার বেদিতে স্বর্ণ ও রৌপ্যরেণুর প্রলেপ থাকায় তা চকচক করত।৯২
জাস্টিনিয়ানের শাসনামলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসে। সাংস্কৃতিক ধারায় রোমের প্রভাব হ্রাস করার জন্য গ্রিক ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়; পরিত্যক্ত হয় ল্যাটিন ভাষা। মোদ্দাকথা-শিল্প, স্থাপত্য, জীবনাচারসহ সকল বিষয়ে বাইজেন্টাইন রাজধানীর একটি স্বতন্ত্র ছাপ এ সময় ফুটে ওঠে-যা বাইজেন্টাইন শৈলী নামে পরিচিতি লাভ করে। এ নামকরণ যথার্থই ছিল; এতে প্রাচীন গ্রিক বা রোমান-কোনো সভ্যতারই অনুসরণ ছিল না। এ ছিল খাঁটি বাইজেন্টাইন।
ষষ্ঠ শতকে জাস্টিনিয়ানের নেতৃত্বে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সমৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠা, খ্যাতি ও দাপটের চূড়ায় পৌঁছে যায়। বড়ো বড়ো প্রদেশে কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হয়; বিশেষত এশিয়া মাইনর, সিরিয়া ও মিশরে। প্রদেশগুলোর রাজধানীর অর্থাৎ অ্যান্টিয়খ ও আলেকজান্দ্রিয়ার খ্যাতি কনস্ট্যান্টিনোপলের চেয়ে কম ছিল না। এগুলো শিল্প ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখান থেকে সারা বিশ্বে বস্ত্র, প্যাপিরাস, কাচ ও ধাতু-ঘট রপ্তানি করা হতো। আবার আফ্রিকা উপকূল, ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও চীনের মতো দূরবর্তী দেশ হতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানি করা হতো। নীলনদের বাণিজ্যপথের শেষপ্রান্ত ছিল মিশর। এশিয়ার স্থলপথের শেষ প্রান্ত ছিল সিরিয়া। তেমনিভাবে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল আর্মেনিয়া ও কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যপথের শেষ সীমান্ত।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে সমুদ্রকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য বলা যায়। ভূমধ্যসাগরের উত্তর ও দক্ষিণ কূলব্যাপী বিস্তৃত ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই সম্রাটগণ নৌবাহিনীর গঠনের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষত ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গোল্ডেন হর্ন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নৌবাহিনী গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। তাদের শাসনব্যবস্থাটাই ছিল সাগরকেন্দ্রিক।
জাস্টিনিয়ান (৫৬৫), হিরাক্লিয়াস (৬৪১)-সহ মহান সম্রাটগণ সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা ও দ্বীপাঞ্চল জয়ে মনোযোগী ছিলেন। তারা মহাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না। ভূমধ্যসাগরে রোমানদের একচ্ছত্র আধিপত্যের আরেকটি কারণ ছিল-সাগরে তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অনেকটা আধুনিক যুগের প্রারম্ভে ব্রিটিশদের ন্যায়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল স্পেনের দক্ষিণ উপকূল, আফ্রিকার উত্তর উপকূল, সার্দিনা, কর্স, সিসিলি, ক্রিট, সাইপ্রাস, আলেকজান্দ্রিয়া, জেনোয়া, নাপোলি, দার্দানেলিস ও ক্রিমিয়া। সাম্রাজ্যের প্রভাব শুধু ভূমধ্যসাগরে সীমাবদ্ধ ছিল না; অন্যান্য সাগর ও তদ্সন্নিহিত অঞ্চলেও এর প্রভাব ছিল। বিষয়টা যেন এমন যে, সেই যুগে জলের পরাশক্তি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আর স্থলের পরাশক্তি পারস্য সাম্রাজ্য। আর এই দুই বড়ো সাম্রাজ্যের মাঝে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগেই থাকত। ৯৩
কাল-পরিক্রমায় কনস্ট্যান্টিনোপল সেই কালের বিশ্বসেরা রাজধানীতে পরিণত হয়। এই শহরের প্রাচুর্য, সমৃদ্ধি, গির্জা, রাজপ্রাসাদ-সবই ছিল অতুলনীয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এর লাইব্রেরিতে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য পুনর্জীবন লাভ করেছিল। সেই ত্রিভুজ পর্বতে-যাকে সাগরের জল আঘাত করত, আর সমুদ্রবায়ু পরশ বোলাত -এমন একটি মানবপ্রজন্ম গড়ে উঠল, নগরসভ্যতা বেঁচে রইল তাদের সাথে। তবে অধিকাংশ সম্রাট ছিলেন অনাচারী। এমনকী শ্রেষ্ঠজনরাও ছিলেন নিষ্ঠুর ও নির্মম। কিন্তু নাগরিকরা ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়। কৌশলগত অবস্থানে এটি ছিল অনন্য। প্রতিটি দিকের শত্রুদের ঠেকিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিল এই নগরী। একের পর এক আক্রমণ হয়েছে শহরটির ওপর: তাতার, বুলগার, হুন, গথিক ও স্লাভদের পক্ষ থেকে। কিন্তু চর্তুমুখী আক্রমণ ঠেকিয়ে ঠিকই টিকে ছিল কনস্ট্যান্টাইনের শহর।
কনস্ট্যান্টিনোপল যখন মর্যাদার শীর্ষে আরোহণ করছিল, তখন বর্বর জাতিগুলো ইউরোপ দখল করে নিয়েছে। রোমকেন্দ্রিক পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য তখন ডুবে গেছে বিশৃঙ্খলা, অজ্ঞতা ও বর্বরতায়। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অনুরূপ অবস্থার সৃষ্টি হতে বেশি সময় লাগেনি। সম্রাট জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য জবেহকৃত পাখির মতো হয়ে যায়-যে কিনা শেষবারের মতো লুটিয়ে পড়ার জন্যই কেবল উঠে দাঁড়ায়।
তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের চারদিকে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সম্রাট হিরাক্লিয়াসের (৬১০-৬৪১) আবির্ভাবে তারা দ্বিতীয়বারের মতো উঠে দাঁড়াতে সক্ষম। পারস্যের কবল হতে তিনি মিশর, সিরিয়া ও এশিয়া মাইনর পুনর্দখল করেন। রোমানদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, এ সময় দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে প্রবলভাবে আবির্ভূত হয় মুসলিম জাতি। তারা সামনে যা কিছু পায়, সবকিছুকে ঝড়ের বেগে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিলো। সমতল ও অসমতল সবকিছু ছিল তাদের কাছে সমান। একই সঙ্গে তারা মনোযোগ দিলো পারস্য ও রোমান এলাকায়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যভুক্ত মিশর, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকা অধিকার করে অতি অল্প সময়ের মাঝে। ফলে প্রাচীন সাম্রাজ্যটি বিশাল এক ভূখণ্ড হতে বঞ্চিত হয়-যা তাদের অব্যাহতভাবে জনবল, অর্থ ও বিভিন্ন উৎপাদন জোগান দিয়ে আসছিল।
শুধু আরব মুসলিমদের কারণেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়েছে-এমন নয়; উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে স্লাভ ও বুলগাররা বলকান দখল করে নিয়েছিল। তারা অব্যাহতভাবে বাইজেন্টাইন এলাকায় হামলা করত, এমনকী মাঝে মাঝে তাদের হামলা কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌঁছে যেত।
মুসলিম অভিযান শুরুর পূর্বে পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে লাগাতার লড়াইয়েও রোমানরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে তাদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের জয় সহজ হয়ে পড়েছিল। ইসলামের সৌন্দর্যের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ; বিজয়ালোচনায় যা সাধারণত উপেক্ষিত থাকে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বহু অঞ্চল ইতোমধ্যে মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ায় ওইসব এলাকার লোকজন ইসলামের সাম্যনীতি ও আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। ইসলামের নৈতিক প্রভাব ভগ্নাবশিষ্ট সাম্রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাম্রাজ্যটি ভেতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে টিকে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছিল। তা ছাড়া উপদলীয় সংঘাত, ধর্মীয় লড়াই মানুষকে দাস বানিয়ে রাখার মতো বিষয়গুলো তো ছিলই। ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া সাম্রাজ্য তাই তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। এর প্রমাণ হলো-একটি যুদ্ধ তথা ইয়ারমুকের যুদ্ধই (১৫ হিজরি/৬৩৬ সাল) যেভাবে সিরিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল, তেমনিভাবে ব্যাবিলন দুর্গের (২০ হিজরি/৬৪১সাল) বিজয়ের মাধ্যমে মিশর পদানত হয়। ৯৪
বিজিত এলাকার অধিবাসীদের তাদের ভূমিতে বহাল রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে সাবেক সাম্রাজ্যের পক্ষে কোনো বিদ্রোহ দেখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, তারা ইসলামের সৌন্দর্যে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন এবং পুরোনো সাম্রাজ্য এতটাই ভঙ্গুর ছিল যে, সেটির প্রতি জনগণের কোনো নৈতিক সমর্থন ছিল না। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন এবং ইসলামের অভাবনীয় প্রসারের আলোচনায় এই দিকটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
পরপর অনেকগুলো পরাজয়ের পর সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো ছিল না; গ্রাস করেছিল ব্যাপক দারিদ্র্য। ফলে সম্রাটকে যুদ্ধজাহাজ বিক্রি এবং খরচ কমানোর জন্য সৈন্য কমাতে হয়। শুধু তাই নয়; অনেকগুলো শহর ও বন্দর জেনোয়া ও ভেনিসের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। যার একটি উদাহরণ হলো, ১৪২৩ সালে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান শহর স্যালেনিকা ভেনিসিয়ান ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ৯৫
রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অবস্থা
পতনের প্রাক্কালে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল ষড়যন্ত্রের লীলাভূমি। রাজপ্রাসাদ ছিল লোভী ও ক্ষমতালিপ্পু অভিজাতদের দ্বারা পূর্ণ; জনগণের প্রতি যাদের কোনো দৃষ্টি ছিল না। ফলে অপশাসন ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। আর সাম্রাজ্যের কর্মচারীদের মাঝে বিশৃঙ্খলা ও অবহেলা বিস্তার লাভ করে। তবে আর্থিক দুরবস্থা সত্ত্বেও রাজপ্রাসাদের বিলাসিতায় কোনো ঘাটতি ছিল না।
রাজপরিবার ও অভিজাতদের বিলাসিতা ও সৌখিনতার আহ্লাদ পূরণের জন্য প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় কমানো হয়। ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে অত্যন্ত খোঁড়া যুক্তিতে নৌবাহিনী একপ্রকার পরিত্যক্ত হয়। এর ব্যবস্থাপনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়; তা ছাড়া এটি অপ্রয়োজনীয়ও বটে। আর্থিক সংকটের কারণে স্থলবাহিনীর বাজেট ও সৈন্যসংখ্যাও কমে যায়। ক্রমে ক্রমে সাম্রাজ্যের দেউলিয়াপনা সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়। ফলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ভাব-গাম্ভীর্য বিলুপ্ত হয়।
সাম্রাজ্যের করুণ অবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যায় সম্রাট পঞ্চম জন পেলিওলোগাসের অভিষেক অনুষ্ঠানের বিবরণে।
১৩৪৭ সালে সম্রাট পঞ্চম জন পেলিওলোগাসের অভিষেক অনুষ্ঠানে স্বর্ণ ও রৌপ্যের কোনো প্লেট ব্যবহার করা হয়নি; বরং মাটি ও টিনের প্লেট ব্যবহার করা হয়। সম্রাটের পোশাকে মণি-মুক্তার দানা ছিল না; বরং কিছু সাধারণ পাথরের দানা ছিল। আর্থিক দৈন্যদশায় পেলিওলোগাস বংশের শেষ সম্রাটগণ তাদের হিরা-জহরতসহ মূল্যবান ধাতু বিক্রয় করার পর কয়েক হাজার ডুকাটের জন্য সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড বিক্রি করতে থাকেন। তারপর তাদের অবস্থা এতটাই সঙ্গিন হয়ে পড়ে যে, ব্যবসায়ীদের কাছে বড়ো বড়ো শহর বিক্রি করতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে ইতঃপূর্বে সেলোনিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক দৈন্যদশা, অপশাসন, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার পাশাপাশি সাম্রাজ্যে প্লেগ এবং অন্যান্য ভয়ংকর রোগবালাই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে-যার প্রভাবে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। মহামারির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল ১৩৪৭ সালে; যখন 'কালো মৃত্যু' নামে পরিচিত মহামারি সমগ্র পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
১৪৩১ সালে বাইজেন্টাইন রাজধানী আরেকটি ভয়াবহ মহামারিতে আক্রান্ত হয়। ওই সময় এত বেশিসংখ্যক মানুষ মারা যায়, বহু পরিবারে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার মতো লোকও ছিল না।
সাম্প্রদায়িক বিভাজন কনস্ট্যান্টিনোপলের পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। ওই সময়ের খ্রিষ্টান বিশ্ব রোমান ক্যাথলিক ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স-এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অর্থোডক্স মতের অনুসারী ছিল, অপরদিকে রোম ছিল ক্যাথলিক ধর্মমতের রাজধানী। মতভেদের বিষয় গুরুতর না হলেও তা গভীরে প্রোথিত ছিল।
রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে কনস্ট্যান্টিনোপলের যাত্রা শুরুর আগে থেকেই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। তাই ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বের বিভাজন সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান ধর্মগুরু ছিলেন পোপ। অপরদিকে কনস্টান্টিনোপল কেন্দ্রিক অর্থোডক্স অংশের মুখ্য ধর্মবেত্তা ছিলেন প্যাট্রিয়ার্থ। রোমের পোপ কনস্টান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্থকে তার অধীন মনে করতেন। পক্ষান্তরে পোপকে নিজের সমানই মনে করতেন প্যাট্রিয়ার্থ। দুই ধর্মগুরুর রেষারেষির একটি নমুনা হলো, নবম শতকে পোপ প্রথম নিকোলাস কনস্ট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্খকে ধর্ম হতে বহিষ্কার করেন। প্রত্যুত্তরে প্যাট্রিয়ার্থও পোপকে বহিষ্কার করেন।
ধর্মীয় গোঁড়ামির পাশাপাশি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের ব্যাপক ছড়াছড়ি ছিল। সকল স্তরের মানুষ ধর্মীয় বিষয়ে তর্কবিতর্কে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়ে থাকত-তা তাদের অবিচ্ছেদ্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বিতর্কসভায় তার্কিক হিসেবে ধর্মবেত্তারা উপস্থিত থাকত, তবে দর্শক ও শ্রোতা হিসেবে সাধারণ মানুষ হাজির হতো। রোমান নাগরিকদের বড়ো একটি অংশ ধর্মতাত্ত্বিক গূঢ় আলোচনা এত বেশি উপভোগ করত যে, অনেক সময় তারা পার্থিব কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে থাকত। ধীরে ধীরে বৈষয়িক বিষয়াদিতে সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
পশ্চিমের লাতিন ধর্মমতের অনুসারী তথা ক্যাথলিকরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে দুই দৃষ্টিকোণে বিচার করত। একদিকে তারা মনে করত, এটি একটি খ্রিষ্টান সাম্রাজ্য-যা বিধর্মীদের হুমকির মুখে পতনোন্মুখ। অতএব, তাদের সাহায্য করা দরকার। অন্যদিকে তারা এটাও মনে করত, বাইজেন্টাইন ধর্মমত বৈধর্মে দুষ্ট এবং রোমের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী-যে কিনা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে যেকোনো মিশনারি তৎপরতার বিরোধী। অতএব, তাদের সাহায্য করা কোনো জরুরি ধর্মীয় কর্তব্যের আওতায় পড়ে না।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও ক্রুসেড যুদ্ধ
আনাতোলিয়ায় তুর্কি সালতানাত প্রতিষ্ঠার বহু আগেই ক্রুসেডের যুদ্ধ শুরু হয়। এখানে তা আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে তুর্কিদেরও কয়েকটি ক্রুসেডের লড়াই মোকাবিলা করতে হয়েছে। ক্রুসেডের যুদ্ধে মুসলিমদের সম্মিলিত খ্রিষ্টান বাহিনীর মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাই এমন ধারণা আসা অস্বাভাবিক নয়, ক্রুসেডের লড়াইগুলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে সাহায্য করেছে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা ছিল ভিন্ন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় বাইজেন্টাইনের খ্রিষ্টধর্মকে বৈধর্মের দোষে দুষ্ট বলে মনে করত। আর তাই ইউরোপকেন্দ্রিক ক্যাথলিক জোট পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কোনো উপকারে আসেনি; বরং ক্ষতিই করেছে। পশ্চিমের ক্যাথলিকরা সব সময় পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য কবজা করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করত। রবার্ট গুইসকার্ড (Robert Guiscard), তদীয় পুত্র বোহেমন্ড (Bohemond) এবং তাদের আত্মীয় সিসিলির রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড ও দ্বিতীয় উইলিয়াম অকপটে অনুরূপ অভিমত প্রকাশ করেছেন। উত্তরের অভিবাসীদের মত এই ছিল, তারা বাইজেন্টানিয়ানদের দক্ষিণ ইতালি হতে বিতাড়িত করেছিল। বাইজেন্টাইনদের প্রতিশোধ গ্রহণের পূর্বেই তারা তাদের নির্মূল করার বাসনা পোষণ করত। ব্যাবসা সম্প্রসারণের লোভে ভেনিসিয়ান বণিকরাও অনুরূপ অভিপ্সা পোষণ করত। আগুনে ঘৃতাহুতি মতো ব্যাপার ছিল এই যে, অনেকবার পোপতন্ত্রও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংসের প্রস্তুতি নিয়েছিল।
খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের দুই অংশের মাঝে বৈরিতার ফলাফল এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজনও নেই, প্রসঙ্গও নেই। ইসলামি প্রাচ্যকে পুনর্দখলের ক্রুসেডীয় প্রচেষ্টা বারংবার ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণও ছিল খ্রিষ্টানদের দুই সম্প্রদায়ের শত্রুতা ও ধর্মীয় বিভেদ। আর এর অন্তরালে যে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও পার্থিব স্বার্থ সক্রিয় ছিল, তার ভূমিকাও কম ছিল না। শুধু তাই নয়; চতুর্থ ক্রুসেডের তো লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করা হয়। ইউরোপের সম্মিলিত বাহিনীর যোদ্ধারা ১২০৪ সালে জেরুজালেমের পরিবর্তে কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে নেয়। কুসেডারদের লুটপাট অব্যাহত ছিল বছরের পর বছর। এরপর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে কায়েম করা হয় ল্যাটিন রাজত্ব। ৯৭ অনেক ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ স্বীকার করেছেন, ক্রুসেডাররা তাদের স্বধর্মী ভাইদের রাজধানী তথা কনস্ট্যান্টিনোপলে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার অনুরূপ বিনষ্টি আড়াই শত বছর পর মুসলিম অধিকারের সময়ও সংঘটিত হয়নি। রাজধানী পুনরুদ্ধারে বাইজেন্টানিয়ানদের অর্ধশতাব্দী লেগে যায়। যদি এটি ধরেও নেওয়া হয়, এ ঘটনার পূর্বে খ্রিষ্টান বিশ্বের দুই অংশের অবস্থা ছিল এমন, তাদের মাঝে পারস্পরিক ভালবাসা অন্তর্হিত হয়েছিল, এ ঘটনার পরের অবস্থা তাহলে চিন্তা করুন। অচিরেই বাইজেন্টাইনবাসীর ভালোবাসাহীনতা প্রবল ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। যারা তাদের রাজধানী ধ্বংস করেছে এবং পাঁচ দশক ধরে জবরদখল করে রেখেছে, স্বধর্মী হলেও কি তাদের ক্ষমা করা যায়?
১২৬১ সালে সম্রাট অষ্টম মিখাইল (১২৬১-১২৮২) ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের দখল হতে কনস্ট্যান্টিনোপল পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। কিন্তু শহরটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। এত কিছুর পরও সম্রাট পশ্চিমাদের শত্রুতার মুখে পড়েন। ক্যাথলিক পোপ ইউরোপীয় রাজাদের কনস্ট্যান্টিনোপল পুনর্দখলে উসকানি দেওয়া শুরু করে। সম্রাটের কার্যকলাপকে তিনি গির্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে গণ্য করেন।
ওইদিকে এশিয়ায় তুর্কিদের উৎপাত। ফলে পশ্চিমের শত্রুতা বহন করার মতো ক্ষমতা সম্রাটের ছিল না। তাই তিনি পোপের সাথে সদ্ভাব প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হন। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দুই চার্চ তথা অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক চার্চকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে কনস্ট্যান্টিনোপলের যাজকগোষ্ঠী ও সাধারণ নাগরিক এ সম্মিলন মেনে নিতে রাজি ছিল না। অনিচ্ছুক জাতির ওপর সম্রাট এ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন এবং এর বিরোধীদের উৎপাটন করেন। ফলে অনেকে পালিয়ে যায়। ধর্মনেতাদের চাপে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্ক এক কাউন্সিল আহ্বান করেন-যেখানে ঐক্য প্রচেষ্টার অগ্রদূত সম্রাট মিখাইলকে ইস্টার্ন চার্চ হতে বহিষ্কার করা হয়।
অপরদিকে রোমে আগের পোপ মারা যায়। নতুন পোপ ফ্রেখম্যান মার্টিন (১২৮১-১২৮৫) রোমান ধর্মমতের (অর্থোডক্স মতের) কট্টর বিরোধী ছিলেন। বাইজেন্টাইন সম্রাটের বিরুদ্ধে কপটতা ও স্তাবকতার অভিযোগ এনে তিনিও তাকে বহিষ্কার করেন। এ অবস্থায় সম্রাট অষ্টম মিখাইল মারা যান (১২৮২ খ্রিষ্টাব্দ)। অর্থাৎ দুই চার্চের মিলন প্রচেষ্টার পুরস্কার হিসেবে দুই পক্ষের বহিষ্কারাদেশ লাভে ধন্য হয়ে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। ১৮
এভাবে দুই চার্চের মিলন প্রচেষ্টা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু উদ্যোগ লক্ষণীয়। ১২৭৪ সালে লিও শহরে অনুষ্ঠিত চার্চ কাউন্সিল এবং ১৪৩৭ সালে তারার শহরে অনুষ্ঠিত চার্চ কাউন্সিলে দুই গির্জার মিলন নিয়ে আলোচনা করা হয়, কিন্তু কনস্ট্যান্টিনোপলের যাজকদের বিরোধিতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯ পশ্চিমা চাপ এড়ানোর জন্য বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রয়োজন ছিল তুর্কিদের বিরুদ্ধে বড়ো ধরনের বিজয় অর্জন। কিন্তু সাম্রাজ্যের সেই সক্ষমতা ছিল না। ফলে পোপ ও প্যাট্রিয়ার্কের প্রতিযোগিতাজনিত কারণে সৃষ্ট ফাটল রয়েই যায়; বরং তা আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের বিভাজন ও অনৈক্য অটোম্যানদের সামনে ইউরোপে অনুপ্রবেশের সুযোগ এনে দেয়। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, কীভাবে উসমানি সাম্রাজ্য দানিয়ুব নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এত কিছুর পরও দুই মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত কনস্ট্যান্টিনোপল উসমানীয়দের কাছে অধরাই থেকে যায়। ১৪৫৩ সালে তারা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে সমর্থ হয়। সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী তথা কনস্ট্যান্টিনোপল শহর জয় করে রাসূল-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
অনেক উন্নাসিক মানুষ ইতিহাসকে মরা মানুষের কাহিনি বলে মনে করে। সেই মরা মানুষের কাহিনি অধ্যয়নের একটি বড়ো উপযোগিতা হলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির পূর্বাভাস দেওয়া-যাতে মৃতদের বৃত্তান্ত থেকে জীবিতরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তা ছাড়া মানবেতিহাসের কাল-কালান্তরে সাদৃশ্যপূর্ণ বহু ঘটনা পাওয়া যায়। এর কারণ হলো, দুনিয়া পরিচালনায় আল্লাহর নিয়মের অপরিবর্তনশীলতা:
سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا -
'এটিই আল্লাহর বিধান-যা পূর্বের যুগ হতে চলে আসছে, আর তুমি আল্লাহর বিধানে কখনো কোনো পরিবর্তন পাবে না।' সূরা আল-ফাতহ: ২৩
আল্লাহর বিধানের অপরিবর্তনশীলতার কারণে দুনিয়ার ইতিহাসে কার্যকারণের পুনরাবৃত্তিতে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাই ইতিহাসের বিশ্লেষণী অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা জাতিসমূহের উত্থান ও পতনের কারণ জেনে নিজেদের চলার পথের দিশা গ্রহণ করতে পারি। এ প্রসঙ্গে বলতে পারি, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস আলোচনায় মুসলিম জাতির জন্য শিক্ষণীয় বিষয় আছে। এ বিষয়ে আমরা সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই।
আমরা দেখেছি, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ ধর্মীয় বিভক্তি এবং জনসাধারণের উল্লেখযোগ্য অংশের ধর্মীয় বিতর্কে নিমজ্জিত হওয়া। অনুরূপ মনোবৃত্তি আমরা মুসলিম সমাজের একাংশে দেখতে পাই। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিতর্কমূলক ধর্মালোচনায় ভরপুর। সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শোভন/অশোভন বিতর্কগুলোতে অংশগ্রহণ করছে। আলিম-ওলামা তো বটেই; চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদসহ সকল পেশার মানুষ ধর্মীয় বিতর্কে নিমজ্জিত। এটি একটি অশনি সংকেত। সমাজের অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় বিতর্কে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করলে দুনিয়ার আবাদ বা সভ্যতা নির্মাণকারী কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। ফলে পার্থিব অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। তুমুল প্রতিযোগিতার এই যুগে ধর্মীয় বিভেদ ও বিতর্কের প্রসার মুসলিম জাতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
মনে রাখা দরকার, ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ও কূটতর্কে নিমজ্জিত হওয়া এক বিষয় নয়। ইবাদত পালন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে যেটুকু ধর্মীয় জ্ঞান প্রয়োজন, তা অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কর্তব্য। কিন্তু প্রতিটি মাসয়ালার দলিল জানা এবং খুঁটিনাটি মতভেদের বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেকে মুসলিমের কর্তব্য নয়। এটি বিশেষজ্ঞদের আওতায় পড়ে। আর কুতর্ক ও বাড়াবাড়ি সর্বদা পরিত্যাজ্য।
সেইসঙ্গে আরও মনে রাখা দরকার, উন্নতিমূলক পার্থিব কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে থেকে কেবল ধর্মজ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়া তো বটেই; নিজেদের পরিচালনা করাও অসম্ভব। আল্লাহ তায়ালা সকল মুমিনকে ধর্মীয় জ্ঞানে পণ্ডিত হতে বলেননি; বরং মুমিনদের একটি ক্ষুদ্র অংশের ওপর এই দায়িত্ব দিয়েছেন-
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْ لَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لْيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
'মুমিনদের একসঙ্গে বের হওয়া সংগত নয়। তাদের প্রত্যেক দলের একাংশ কেন বের হয় না-যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে, তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে-যাতে তারা সতর্ক হয়।' সূরা আত-তাওবা : ১২২
তিনি সাধারণ মুসলমানদের বলেছেন, অজানা বিষয় জ্ঞানীদের কাছ থেকে জেনে নিতে-
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ -
'তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।' সূরা নাহল: ৪৩
আসমানি কিতাবগুলোতে বর্ণিত আল্লাহর সুন্নাহ ও সভ্যতাসমূহের উত্থান-পতনের ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয়, পৃথিবীতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পার্থিব যোগ্যতা ও নৈতিকতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নিরন্তর গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে পার্থিব শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়। আর ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ও অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত হয় নৈতিকতা। বিষয়টি প্রত্যেক মুসলিমের উপলব্ধি করা কর্তব্য। মুসলমানদের পতনরোধ করতে হলে ধর্মীয় তর্কে সময়ের নাশ বন্ধ করতে হবে। মৌলিক বিষয়ে জ্ঞানার্জনের পর ধর্মানুলীশনের মাধ্যমে নৈতিকতা অর্জন করে দুনিয়া আবাদে মনোযোগী হতে হবে। তাহলে আশা করা যায়, পতন রোধ করে মুসলমানরা পুনরায় মর্যাদা এবং দুনিয়ার নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে।
কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা মহানবি হজরত মুহাম্মাদ -কে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। গৌরবময় এই শহর মুসলিমদের পদানত হওয়ার সুসংবাদ দিয়ে তিনি বলেছেন-
'অচিরেই কনস্ট্যান্টিনোপল বিজিত হবে। সেই বিজেতা আমির কতই না উত্তম! আর ওই বিজয়ী বাহিনী কতই না মহৎ!'১০০
রাসূলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় মদিনা হতে বহু দূরে অবস্থিত কনস্ট্যান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা অসম্ভব ছিল। তারপরও সুসংবাদ বাস্তবায়নের পন্থার প্রতি ইঙ্গিতবাহী কর্মকাণ্ড তিনি পরিচালনা করেছেন।
ষষ্ঠ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর যুদ্ধাবস্থার অবসান হলে তিনি আরবের চারপাশে অনেক শাসকের প্রতি দাওয়াতি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। এই মিশনের অংশ হিসেবে তিনি বিশিষ্ট সাহাবি দাহইয়া কালবি -এর মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছেও পত্র প্রেরণ করেন। বুখারির বর্ণনায় দেখা যায়, ওই সময় কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বাণিজ্যের কাজে সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াসও তখন পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে জেরুজালেমের পবিত্র উপাসনালয়ে কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য এসেছিলেন। কুরাইশ নেতার কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে পত্রপ্রেরকের ব্যাপারে সম্রাট ইতিবাচক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সভাসদদের বিরোধিতায় তিনি সে মনোভাব পরিবর্তন করেন। ১০১
মদিনা মুনাওয়ারা হতে উত্তরমুখী অভিযান পরিচালনাকেও ভবিষ্যতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য জয়ের ইঙ্গিত হিসেবে গণ্য করা যায়। মহানবি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যভুক্ত বুসরা অঞ্চলের শাসকের নিকট দাওয়াতি পত্রসহ হারিস ইবন উমাইর আল আজদিকে প্রেরণ করেছিলেন। পথিমধ্যে বালকা-এর শাসক শুরাহবিল ইবন আমর আল গাসসানি রাসূল-এর দূতকে হত্যা করে (ফাহমি, ৬১)। এ ঘটনার সমাধান ও প্রতিশোধের লক্ষ্যে মহানবি রোমান এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য অষ্টম হিজরিতে/৬২৯ সালে জায়িদ ইবন হারিসা-এর নেতৃত্বে ৩ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। বালকা-এর পূর্ব সীমান্তে মুতা প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী রোমানদের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে পরপর তিন মুসলিম সেনাপতি যথাক্রমে জায়িদ ইবন হারিসা, জাফর ইবন আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা শহিদ হন। এ যুদ্ধে মুসলিমরা খুব একটা গৌবরজনক বিজয় লাভ করতে পারেনি। অপরদিকে রোমানরা সীমান্ত রক্ষা করতে সমর্থ হয়। ১০২ তবে তারা এ অভিযান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। তারা মনে করেছিল, এটি হয়তো বেদুইনদের নিয়মিত লুটপাটের অভিযান। অথচ তা নয়; এটি ছিল আদর্শিক লড়াই। এ যুদ্ধে তিন মুসলিম সেনাপতির শাহাদাত পরবর্তী অভিযানের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। দ্বিতীয় খলিফা উমর-এর শাসনামলেই রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চল সিরিয়া ও মিশর বিজিত হয়। তারপর মুসলিমরা ভূমধ্যসাগরে দৃষ্টিপাত করে-শতশত বছর ধরে যা রোমান সম্পদ বলেই গণ্য হয়ে আসছিল।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, আরবরা নৌবিদ্যায় পারদর্শী ছিল না। দক্ষিণ আরব তথা ইয়ামেনের অধিবাসীরা বাণিজ্য কাজে সমুদ্র গমন করত। কিন্তু নজদ ও হেজাজের মানুষের সমুদ্রারোহণের খুব একটা অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক রাজধানীগুলো সমুদ্র হতে দূরে স্থাপন করা হয়। যেমন: মদিনা, দামেস্ক, ফুসতাত ইত্যাদি।
অন্যদিকে রোমানরা নৌবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। শত শত বছর ধরে ভূমধ্যসাগরে তাদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের রাজধানীগুলোও ছিল সাগর-তীরবর্তী। যেমন: কনস্ট্যান্টিনোপল, আলেকজান্দ্রিয়া, অ্যান্টিয়ক ইত্যাদি। তাই নৌ-যুদ্ধে বা সমুদ্র অভিযানে রোমানদের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। তবে সমুদ্র-সন্নিহিত অঞ্চল জয়ের পর নৌবিদ্যায় গুরুত্ব দেওয়া মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। মুসলিমরা আলেকজান্দ্রিয়া দখলের কিছুদিন পর ২৫ হিজরিতে/৬৪৫ সালে রোমানরা নৌবাহিনী প্রেরণ করে আলেকজান্দ্রিয়া পুনর্দখল করে। তখন মুসলিমদের কোনো নৌবাহিনী ছিল না। ১০৩ এ ঘটনার পর মুসলিমরা নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে পারে। তা ছাড়া ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
উমর ইবনুল খাত্তাব -এর খিলাফতকালে সিরিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান । সিরিয়ার সাথে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমান্ত ছিল। ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য নৌবাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা তিনি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন। তাই তিনি খলিফার কাছে নৌবহর প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রার্থনা করেন। উমর খোঁজখবর নিয়ে সমুদ্রারোহণের সংকুলতা দেখে মুয়াবিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
তৃতীয় খলিফা উসমান -এর সময়ে মুয়াবিয়া আবারও নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি প্রার্থনা করেন। খলিফা তাঁকে এ শর্তে অনুমতি দেন, কোনো মুসলিমকে যেন জোর করে সমুদ্রাভিযানে যেতে বাধ্য করা না হয়। অনুমতি পেয়ে মুয়াবিয়া নৌবহর গড়ে তোলেন। এভাবে তিনি মুসলিম নৌবহরের প্রথম প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা লাভ করেন।
মুয়াবিয়ার প্রথম নৌ-অভিযান ছিল সাইপ্রাসে-যেখানে তিনি বিজয়ী হন। ফলে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এটি ছিল ২৮ হিজরির ঘটনা। তিন বছর পর (৩১ হিজরি/৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলিমরা ভূমধ্যসাগরে আবারও রোমানদের সাথে নৌ-যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এটিকে জাতুস সাওয়ারি (Battle of the Masts) যুদ্ধ বলা হয়। এ যুদ্ধে মুসলিমরা গৌরবোজ্জ্বল বিজয় লাভ করে।
মিশর ও সিরিয়ার যৌথ মুসলিম নৌবহরে নৌযান ছিল ২০০টি। আর রোমানদের নৌযান ছিল প্রায় এক হাজার। এমন অসম প্রতিযোগিতায় নবীন ও অনভিজ্ঞ মুসলিম নৌবহরই জয়লাভ করে। ফলে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। ভূমধ্যসাগরের বহু দ্বীপ যেমন: সাইপ্রাস, ক্রিট, সার্দিনিয়া ও সিসিলিতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। রোমান (বাইজেন্টাইন) সম্রাট কনস্ট্যান্স সিসিলি দ্বীপে পালিয়ে যান। ১০৪
জাতুস সাওয়ারি যুদ্ধের পর মুসলিমদের ব্যাপারে রোমানদের নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়। তারা বুঝতে পারল, এ আক্রমণগুলো বেদুইনদের লুটপাটের আক্রমণ নয়; বরং একটি লক্ষ্যাভিসারী দলের অভিযান। তারা আরও উপলব্ধি করে, সিরিয়া ও আলেকজান্দ্রিয়া পুনরুদ্ধারের আশা দুরাশা মাত্র। এখন কর্তব্য হল, সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ হেফাজতের চেষ্টা করা। মুসলিমদের রোমান এলাকায় অভিযান চালানোর উদ্দেশ্য ছিল কনস্ট্যান্টিনোপল জয়। তবে দূরবর্তী ওই শহর দখলের পূর্বে রোমানদের অন্যান্য এলাকায় অভিযান চালানো অপরিহার্য ছিল। আর এজন্যই তারা নৌবাহিনী গঠন করে। কারণ, কেবল স্থলবাহিনী দ্বারা কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করা একেবারে অসম্ভব।
অস্ট্রিয়ান ইতিহাসবিদ জোসেফ ভন হ্যামার (১৭৭৪-১৮৫৬)-এর মতে- কনস্ট্যান্টিনোপল শহরটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২৯ বার অবরুদ্ধ হয়েছে। ১০৫ 'বাইজেন্টাইন রাজধানী মুসলিমদের পদানত হবে'-এ মর্মে রাসূল-এর সুসংবাদ বর্ণিত হওয়ায় নৌবহর প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলিমরা ওই শহর অবরোধের চেষ্টা চালায়।
মুয়াবিয়া গভর্নর হিসেবে যেমন রোমান এলাকায় অভিযান চালিয়েছেন, খলিফা হওয়ার পরও এ লক্ষ্যে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন। ৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লাগাতার সাত বছর মুসলিম নৌবহর কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের লক্ষ্যে তৎপরতা চালিয়েছে। তবে এগুলো অব্যাহত অভিযান ছিল না। মুসলিম বাহিনী শীতের মৌসুম কাটাত Cyzicus দ্বীপে। বসন্তে তারা স্থল ও জলপথে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করত-যা খারিফ (হেমন্ত) পর্যন্ত অব্যাহত থাকত। শীত মৌসুমে তাঁরা আবার সাইজিকাস দ্বীপে ফিরে যেত।
কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের গৌরবে শরিক হওয়ার প্রেষণায় বহু সাহাবি ওই অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণ করতেন। ৫৩ হিজরিতে (৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) বিশিষ্ট সাহাবি আবু আইউব আনসারি, ইবনে উমর, ইবন আব্বাস ও ইবনে জুবাইর কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বৃদ্ধ সাহাবি আবু আইউব আনসারি অসুস্থ হন। সেনাপতি তাঁকে দেখতে গেলে তিনি বলেন—'আমাকে নিয়ে শত্রুভূমিতে প্রবেশ করে যেখানে সুযোগ পাবে, সেখানে দাফন করবে।'
আবু আইউব আনসারি মারা গেলে তাঁকে কনস্ট্যান্টিনোপলের তোরণের সন্নিকটে দাফন করা হয়। সেনাপতির নির্দেশে তাঁর কবর মাটির সাথে সমান করে দেওয়া হয়—যাতে খ্রিষ্টানরা তাঁর কবরের অমর্যাদা করতে না পারে। অবশ্য খ্রিষ্টানরা মহান সাহাবির কবরকে সম্মান করত, অনাবৃষ্টিতে তাঁর সান্নিধ্যে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করত!
সাত বছরব্যাপী খণ্ড অভিযান চালালেও মুসলিমরা কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করতে ব্যর্থ হয়। ৬৮০ সালে খলিফা মুয়াবিয়া -এর মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খলিফা হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। ১০৬
এরপর উমাইয়া খিলাফত দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্রোহ ও অভ্যন্তরীণ গোলযোগের শিকার হয়। ফলে বিজয়াভিযান একপ্রকার স্তিমিত হয়। তারপরও কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবে এগুলো স্বীকৃত হয়ে থাকবে।
বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার অবসানে অষ্টম শতকের প্রারম্ভে খলিফা ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিকের (৮৬-৯৬ হি./৭০৫-৭১৫) আমলে আবারও বিজয়াভিযান শুরু হয়। কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেন খলিফা, কিন্তু অভিযান শুরুর পূর্বেই তিনি মারা যান। তখন তাঁর ভাই এবং পরবর্তী খলিফা সুলায়মান ইবন আবদুল মালিক (৯৬-৯৯/৭১৫-৭১৭) এই মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যান। অভিযানের জন্য অনেক বড়ো ও অস্ত্রশস্ত্রে সমৃদ্ধ একটি বাহিনী ও নৌবহর প্রস্তুত করে খলিফার ভাই মাসলামাকে সেনাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। ১০৭
৭১৭ সালের (৯৮ হি.) ১৫ আগস্ট মুসলিম স্থলবাহিনী কনস্ট্যান্টিনোপলের নগর প্রাচীরের কাছে পৌঁছে। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে মুসলিম নৌবহরও বসফোরাসে পৌছে যায়। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে মুসলিম বাহিনী ভালোভাবে শহর অবরোধ করতে পারল না। হঠাৎ বিপরীত দিক হতে বাতাস ছুটলে মুসলিম নৌবহরের সারি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে পড়ে একটির ওপর আরেকটি আছড়ে পড়ে। এ সময় রোমান নৌবহর গ্রিক ফায়ার নিয়ে আক্রমণ শানায়। ফলে মুসলিমদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং তারা পরাজিত হয়। ওদিকে শীত এগিয়ে আসায় স্থলবাহিনীও বেশিদিন অবরোধ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তী বসন্তে মুসলিমরা আবারও নতুন করে আশায় বুক বাঁধে। নৌবাহিনীতে নতুন নৌযান ও রসদ যুক্ত হয়। কিন্তু এবারেও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। বিগত অভিযানের ফলাফল পুনরাবৃত্ত হওয়ার আশঙ্কায় নতুন খলিফা উমর ইবন আবদুল আজিজ ৭১৮ সনে (৯৯ হি.) ১২ মাস স্থায়ী অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরবর্তী সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিষ্ঠিত কিছু মুসলিম ক্ষুদ্ররাজ্য বাইজেন্টাইন সীমান্তে অভিযান চালায়। এসব অভিযানের মাধ্যমে রোমানদের অনেক ভূমি দখল করা সম্ভব হয়, কিন্তু কনস্টান্টিনোপল জয়ের আশা সুদূর পরাহতই থেকে যায়।
ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে সেলজুকদের আবির্ভাবের পর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারিত হয়। সেলজুক সুলতান আলপ আরসালান (৫৫৫-৫৬৫হি./১০৬৩-১০৭২) ১০৭১ সালে সম্রাট রোমানোস ডিওজেনাসকে (Romanos Diogenes) মানজিকার্টের (Manzikert) যুদ্ধে পরাজিত করেন। ১০৮ শুধু তাই নয়; তিনি তাকে বন্দি করে বেত্রাঘাতও করেন। তারপর বহু শর্তের নিগড়ে বন্দি করে তাকে ছেড়ে দেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট এক ক্ষুদ্র শাসককে বার্ষিক কর প্রদান করতে বাধ্য হন।
কনস্ট্যান্টিনোপলে এই ঘটনার অনুরণন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। এক পর্যায়ে সমগ্র এশিয়া মাইনর সেলজুকদের পদানত হয়। ওদিকে রোমান এলাকা কুনিয়ায় সেলজুকদের নতুন একটি শাখা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ইতিহাসে এরা 'রোমান সেলজুক' নামে পরিচিতি লাভ করে। ১০৯ রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণুতায় তাদের বিরাট অবদান রয়েছে। পশ্চিমে তারা ইজিয়ান সাগরের তীর পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়।
ত্রয়োদশ শতকের শেষার্ধে এশিয়া মাইনরে উসমানি তুর্কিরা রোমান সেলজুকদের স্থলাভিষিক্ত হয়। উসমানি সালতানাত প্রতিষ্ঠার শুরু হতে কনস্ট্যান্টিনোপল জয় তাদের অন্যতম লক্ষ্যে পরিণত হয়। সেই যুগে তুর্কি জাতিই ছিল ইসলামের জন্য সর্বাধিক উদ্যমী জনগোষ্ঠী। জিহাদের ব্যাপারেও তাঁরা ছিলেন একনিষ্ঠ।
তুর্কি-বিপদ আঁচ করতে পেরে বাইজেন্টাইন সম্রাটগণ স্বধর্মী ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সাহায্য চান। সম্রাট পঞ্চম জন (১৩৪১-১৩৭৬) রোমে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম বাইজেন্টাইন সম্রাট, যিনি ইউরোপ সফর করেন। শুধু তাই নয়; সেন্ট পিটার্স বেদিতে পোপের সামনে সিজদাবনত হয়ে লাতিন ধর্মমত তথা ক্যাথলিক ধর্মমত গ্রহণের ঘোষণাও দেন। এতে পোপ খুশি হন বটে, কিন্তু সম্রাটের খুব একটা লাভ হয় না। তিনি রোমের ধর্মগুরুর কাছ থেকে মাত্র দুটি জাহাজ, তিনশো সৈন্য এবং কিছু ডুকাট লাভ করেন।
পরবর্তী সম্রাট ম্যানুয়েলও (শাসনকাল ১৩৯১-১৪২৫) সাহায্যের আশায় যথারীতি ইউরোপ সফর করেন। কয়েক বছর ইউরোপীয় রাজাদের দ্বারে দ্বারে ঘোরার পরও শূন্য হাতে কনস্ট্যান্টিনোপলে ফিরে আসেন।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, উসমানি সুলতান প্রথম বায়েজিদ ১৩৯৪ খ্রিষ্টাব্দে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাইমুর লং উসমানি সালতানাতে আক্রমণ করলে বায়েজিদকে বাইজেন্টাইন রাজধানীর অবরোধ তুলে নিয়ে মোঙ্গল-বিপদ প্রতিরোধে ছুটে যেতে হয়। তাইমুরের হাতে বায়েজিদের পতনের পর তাঁর চার পুত্র সিংহাসন লাভের প্রতিযোগিতায় ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ দৃশ্য দেখে বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল খুশি হন, কিন্তু সুযোগের খুব একটা সদ্ব্যবহার করতে পারেননি; বরং কয়েক বছর অতিবাহিত হতে না হতেই দেখলেন, তুর্কিরা আবার জেগে উঠেছে। সুলতান মুহাম্মাদের নেতৃত্বে সালতানাতের ভিত আবার মজবুত হয়েছে।
দ্বিতীয় মুরাদের সময় তুর্কি সালতানাতের গৌরব এশিয়া-ইউরোপে আবার ছড়িয়ে পড়ে। এই সুলতানও কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন (১৪২২)। কিন্তু সম্রাট ম্যানুয়েলের ধূর্ততার কারণে সফল হতে পারেননি। বাইজেন্টাইন সম্রাটের উসকানি ও প্ররোচনায় তুর্কি শাহজাদা মুস্তাফা তাঁর বড়ো ভাই সুলতান মুরাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ফলে মুরাদ কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হন। আবারও বেঁচে যায় বাইজেন্টাইন রাজধানী। তবে তিন দশক অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই পরবর্তী সুলতান মুহাম্মাদের হাতে কনস্ট্যান্টিনোপলের বিজয় সুসম্পন্ন হয়। ১১০
টিকাঃ
৮২. Ehrlich, "Istanbul" in The New Encyclopedia Britanica, v. 22, p. 148; ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪
৮৩. Walsh, op.cit., p. 543.
৮৪. Ehrlich, op.cit p. 152.
৮৫. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬; (Ehrlich, op.cit, p. 152)
৮৬. Ehrlich, op.cit, p. 150.
৮৭. Ehrlich, op.cit, p. 152.
৮৮. Ehrlich, op.cit, p. 148.
৮৯. Ehrlich, op.cit, p. 152; Walsh, op.cit, p. 544.
৯০. Ehrlich, op.cit, p. 152; Dean Peterson, A Concise History of Christianity, p. 165-66.
৯১. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬।
৯২. G. Ostrogrosky, History of Byzantine Empire, p. 67.
৯৩. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১-৫২
৯৪. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪
৯৫. Vasiliev, op.cit., p. 641.
৯৬. Vasiliev, op.cit., pp. 626, 637, 641.
৯৭. Ehrlich, op.cit., p. 153; ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮
৯৮. Vasiliev, op.cit., p. 657-58.
৯৯. Peterson, op.cit., p. 166.
১০০. বুখারি, আত-তারিখুস সাগির, পৃ. ৩৪১
১০১. বুখারি, সাহিহুল বুখারি, খ. ১, পৃ. ৫-৭
১০২. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, খ. ৩, পৃ. ১১২-১৫
১০৩. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক, আমীরুল মু'মিনীন উসমান ইবনু আফফান, পৃ. ২০৩
১০৪. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১১
১০৫. উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অবরোধ: পারস্য অবরোধ (৬২৬); আরবদের অবরোধ (৬৭৪ হতে ৬৭৮, আবার ৭১৭-৭১৮); বুলগার অবরোধ (৮১৩ ও ৯১৩); রাশিয়ান অবরোধ (৯৪১ ও ১০৪৩), তুর্কি বেদুইনদের অবরোধ (১০৯০-৯১)। কোনোটি সফল হয়নি। (Ehrlich, 153)
১০৬. Walsh, op.cit., p. 546; ইবনুল আসির, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৩৪৪; ইবন কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ১১, পৃ. ২৭০।
১০৭. ইবন কাসির, প্রাগুক্ত, খ. ১২, পৃ. ৬২১; Walsh, op.cit., p. 546.
১০৮. Vasiliev, op.cit., p. 356-57; ইবনুল আসির, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৩১৫
১০৯. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৮
১১০. Vasiliev, op.cit., p. 633, 671.
📄 কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়
১৪৫১ সালে সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরেই কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ। সংবাদ পেয়ে বাইজেন্টাইন সম্রাটও প্রতিরোধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। আমরা ধারাবাহিকভাবে দুই নৃপতির প্রস্তুতির বিবরণ ও যুদ্ধের বৃত্তান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করব।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রস্তুতি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাট ছিলেন একাদশ কনস্ট্যান্টাইন ড্রাগাসেস (Constantine XI Dragases)। তিনি ১৪৪৮ সালে মসনদে আরোহণ করেন। উসমানি সালতানাতের অব্যাহত সম্প্রসারণের মুখে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে। তরুণ সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন-এমন সংবাদ পেয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন নিশ্চিত হন, তার রাজধানী হুমকির সম্মুখীন। তা ছাড়া মিত্রদের সাহায্যের আশা দুরাশা মাত্র। তাই সাম্রাজ্যের সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু করেন। ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রাচীন সাম্রাজ্যটি রক্ষায় তিনি চেষ্টার ত্রুটি করেননি।
খাদ্য ও রসদ সংগ্রহ তুর্কি সালতানাতের সম্ভাব্য অবরোধ প্রতিরোধে বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথমেই খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় রসদপত্র সংগ্রহে মনোযোগী হন। এ লক্ষ্যে ১৪৫২ সালের শীতের মৌসুমে খ্রিষ্টান নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ও দ্বীপসমূহে অফিসার প্রেরণ করেন।
Chios দ্বীপে চারটি বড়ো বাণিজ্যতরি মদ, তেল, ডুমুর, বার্লি, carob ও অন্যান্য খাদ্যশস্যসহ অপেক্ষা করছিল। পেলোপোলেস হতে আরেকটি বড়ো জাহাজ এসে যুক্ত হলে সবগুলো একসঙ্গে কনস্ট্যান্টিনোপলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে। জাহাজগুলোতে খাদ্যশস্য ছাড়াও কয়েক শত সৈনিক ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ছিল। ১১১
সাহায্য লাভের আশায় বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা ইউরোপীয় স্বধর্মী রাজন্যবর্গের সাহায্য লাভের আশায় কনস্ট্যান্টাইন অভিনব এক পথ গ্রহণ করেন-যা ইতঃপূর্বে অন্য কোনো সম্রাট প্রয়োগ করেননি। এটি ছিল বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের সাথে সার্ব রাজকন্যা 'মারা ব্রাঙ্কোভিচ'-এর বিবাহ হয়েছিল। সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি সার্বিয়ায় ফিরে গেলে কনস্ট্যান্টাইন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
তরুণ সম্রাট পঞ্চাশোর্ধ্ব বিধবাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হন কেবল সার্বিয়ার রাজার সাহায্য লাভের আশায়। সৎ মায়ের প্রতি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের আচরণও তাকে এই প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করে। সুলতান মুরাদের মৃত্যুর পর মারা ব্রাঙ্কোভিচ তার পিতার কাছে ফিরে যেতে চাইলে দ্বিতীয় মুহাম্মাদ বিপুল পরিমাণ উপহার দিয়ে অতি সম্মানের সাথে তাকে সার্বিয়ায় ফেরত পাঠান। তা ছাড়া খরচ নির্বাহের জন্য সার্বিয়ার বাইরে কিছু ভূ-সম্পত্তি তার অনুকূলে বরাদ্দ করেন। তাই বাইজেন্টাইন সম্রাটের আশা ছিল, মারা ব্রাঙ্কোভিচের সাথে তার বিয়ে হলে তরুণ সুলতান হয়তো তাঁর সৎ মায়ের স্বামীর বিরুদ্ধে লড়াই করবেন না। সে যাই হোক, কনস্ট্যান্টাইনের এ আশা পূরণ হয়নি; মারা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
তারপরও সম্রাট বন্ধুভাবাপন্ন রাজপরিবারগুলোর সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যান। এবার তার সভাসদরা পরামর্শ দেন Trebizond-এর সম্রাট David Megas Komnenos-এর কন্যার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের। তবে নতুন আরেকটি প্রস্তাবে এই পরিকল্পনা বাতিল হয়।
সম্রাট তার বন্ধু ইতিহাসবিদ George Phrantza (1401-1478)-এর প্রস্তাবে জর্জিয়ার এক রাজকন্যাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেন। তার আশা ছিল, বর্বর জাতিটির শক্তিশালী বাহিনীর সাহায্যে তুর্কিদের হটানো সম্ভব হবে। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই রাজধানী অবরুদ্ধ হয়ে যায়।
কোনো কোনো ইতিহাসবিদ ভেনিস প্রজাতন্ত্রের শাসকের কন্যার সাথে বিয়ের প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে লাতিনপ্রীতির অভিযোগ উঠার ভয়ে তিনি তা বাদ দেন। ১১২ ফলে এর পরিণাম হয় উলটো। একবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আবার পিছিয়ে যাওয়াকে ভেনিসিয়ানরা অপমানজনক বলেই মনে করে। আর তাই অবরোধের সময় সম্রাটের সাহায্যে এগিয়ে আসতে তারা গড়িমসি করে।
সাহায্য চেয়ে ইউরোপে প্রতিনিধি প্রেরণ ইউরোপের সাহায্যপ্রাপ্তির ব্যাপারে সম্রাট সম্পূর্ণ নিরাশ হননি। তিনি আশা করেন, খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী মুসলিমদের হাতে অবরুদ্ধ হতে দেখে নিশ্চয় ইউরোপিয়ানরা স্বধর্মী ভাইদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। প্রথমেই পোপ পঞ্চম নিকোলাসের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। সম্রাট তাকে এই বলে সতর্ক করেন, তুর্কিরা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করার পর ইতালি দখল করে নেবে। তা ছাড়া ফ্লোরেন্স চার্চ কাউন্সিলে (১৪৩১-১৪৩৯) ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স গির্জার ঐক্যের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাও মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ইতঃপূর্বে রোমানরা যে গড়িমসি করেছে, তার জন্য ওজরখাখি করেন। দুই গির্জার ঐক্যের ব্যাপারে কনস্ট্যান্টাইনের ভূমিকা তার পূর্বসূরি সম্রাটদের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিল না-যারা কেবল বিপদে পড়লে ঐক্য প্রস্তাব বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতেন। বিপদ সরে গেলে আবার পূর্ববৎ লাতিন-ঘৃণার চর্চা অব্যাহত রাখতেন। ১১৩
তারপর তিনি ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের নিকট সাহায্য চেয়ে দূত পাঠান। ১৪৫২ সালে পুরো শীতের মৌসুমে সম্রাটের প্রতিনিধিরা ইউরোপ চষে বেড়ান। অবশ্য নগরবাসী কোনো প্রকার সাহায্যপ্রাপ্তির আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে কোনো কোনো ইউরোপীয় খ্রিষ্টান এমন ক্ষীণ আশা পোষণ করত, অলৌকিক কিছু ঘটে শেষ পর্যন্ত অর্থোডক্স খ্রিষ্টবাদের দুর্গ রক্ষা হবে।
যৎসামান্য সাহায্যপ্রাপ্তি সম্রাটের কূটনৈতিক তৎপরতা কিছুটা সাফল্য নিয়ে আসে। ভেনিসের দুটি যুদ্ধজাহাজ বসফরাস অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ক্যাথলিক পোপ পঞ্চম নিকোলাসের প্রতিনিধি কার্ডিনাল ইজিদুর [Isidore of Kiev (১৩৮৫-১৪৬৩)] হাজির হন দুশো যোদ্ধা নিয়ে। ইনি ছিলেন মস্কোর সাবেক আর্চবিশপ। তা ছাড়া দুই চার্চের (ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স) ঐক্যের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত ফ্লোরেন্স কাউন্সিলেও তিনি অংশ নেন। উক্ত কাউন্সিলের ঐক্যপ্রচেষ্টার স্মরণে কার্ডিনাল ইজিদুর ১২ ডিসেম্বর, ১৪৫২ তারিখে আয়া সোফিয়ায় দুই ধর্মমতের যৌথ প্রার্থনার আয়োজন করে। সেই দুর্যোগের দিনে খ্রিষ্টান জনগণের মাঝে সংহতি বৃদ্ধির আশায় হয়তো ওই প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল, তবে তা ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ বাড়িয়ে দেয়! এর ফলে রাজধানীবাসীর মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বাইজেন্টিয়ামের অন্যতম বিশিষ্ট নাগরিক লুকাস নোটারাসের সুবিখ্যাত বক্তব্যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে-
'আমাদের শহরে তুর্কি পাগড়ির উপস্থিতি লাতিন টায়রা (পোপের মাথার ত্রিতল মুকুট) দেখার চেয়ে ভালো।'১১৪
এরপর ভেনিস হতে থেকে আসেন বিখ্যাত গিউস্টিনিয়ানি পরিবারের সদস্য গিওভান্নি লঙ্গো [Giovanni Giustiniani (১৪১৮-১৪৫৩)] নামক এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রী। তার সাথে ছিল দুটি বড়ো জাহাজ; একটি অস্ত্রশস্ত্র ও রসদবাহী, আরেকটিতে ছিল সাতশো যোদ্ধা-যাদের সবাই বয়সে তরুণ, অস্ত্রসজ্জিত এবং যুদ্ধ করতে আগ্রহী।
গিওভান্নিও ছিলেন খুবই যোগ্য ও যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ। এই স্বেচ্ছাসেবক ও অন্তঃপ্রাণ যোদ্ধাকে সম্রাট উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং তাকে প্রতিরোধ বাহিনীর জেনারেল কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। আর তিনি এই ফরমান দিয়ে স্বর্ণশাসন জারি করেন, তুর্কি বিপদ কেটে গেলে তাকে ইজিয়ান সাগরের Lemons দ্বীপ দেওয়া হবে। ১১৫
দায়িত্ব পাওয়ার পরে গিওভান্নি সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব আপন স্কন্ধে নিয়ে নেন। প্রাচীরের ওপর তিনি ছোটো ছোটো কামান স্থাপন করেন। তারপর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের জাতিগতভাবে গ্রুপে গ্রুপে বিভক্ত করা হয়। সেইসঙ্গে প্রত্যেকের দায়িত্বও বণ্টন করা হয়। গিওভান্নি নিজে প্রাসাদ সংলগ্ন প্রাচীরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। ১১৬ কনস্ট্যান্টিনোপলের যাজকরাও যৎসামান্য সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দেন। মুসলিমদের হাত থেকে খ্রিষ্টবাদের রাজধানীকে রক্ষা করার প্রেরণাই তাদের উৎসাহ জোগায়, তা না হলে যুদ্ধবিদ্যার কিছুই তারা জানত না।
বাইজেন্টাইন রাজধানী রক্ষায় সব জাতির লোকেরা ঐক্যবদ্ধ হলো: ক্যাথলিক, অর্থোডক্স, লাতিন, গ্রিক, ভেনিসিয়ান, জেনোয়ান-সবাই শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার জন্য শপথ নেন। এমনকী সম্রাটের বেতনভুক্ত তুর্কি সৈনিকরাও বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। কমান্ডার ডোরগানোর নেতৃত্বে তারা শহর রক্ষার দায়িত্ব পালন করে; পরবর্তী সময়ে লড়াইয়ে অনেকে প্রাণও হারায়।
কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীর সংস্কার এবং গোল্ডেন হর্নের নিরাপত্তা বৃদ্ধি কনস্ট্যান্টিনোপলের সৈন্যসংখ্যা ছিল সাকুল্যে আট হাজার। এত অল্প যোদ্ধা নিয়ে তুর্কিদের প্রতিরোধ করা অসম্ভব ছিল। বস্তুত কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতিরক্ষার মূল বিষয় ছিল অবস্থানগত সুবিধা-যার বদৌলতে শহরটি শত শত বছর ধরে বহু অবরোধের ধকল সামলে টিকে ছিল। তা ছাড়া নগরপ্রাচীরও শহরের প্রতিরক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করত। ইতঃপূর্বে সম্রাট অষ্টম জন ও একাদশ কনস্ট্যান্টাইন নগরপ্রাচীর সংস্কার করেছিলেন। এবারও দৃষ্টি দেওয়া হয় হাজার বছরের পুরোনো নগরপ্রাচীর মেরামতের ওপর। কিন্তু বাহিরের সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করতেও অসুবিধা দেখা দেয়। তারা কবরের ওপর স্থাপিত পাথর এবং পুরোনো স্থাপনা ভেঙে সেগুলো কেটে কোনোভাবে প্রাচীর মেরামত করে।
সমুদ্রপথে তুর্কি নৌযানের আগমন প্রতিরোধের জন্য গোল্ডেন হর্নের প্রতিরক্ষা মজবুত করার নির্দেশ দেন সম্রাট। শহরের উত্তরাংশ হতে গ্যালাটা পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে শিকল স্থাপন করা হয়। এই শিকলগুলো উত্তর দিক থেকে আসা তুর্কি জাহাজগুলো আটকে দিয়েছিল। অবরুদ্ধ শহর রক্ষায় এগুলোর ভূমিকা কম ছিল না। ১১৭
প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করিয়ে সুলতান মুহাম্মাদকে বিব্রত করার চেষ্টা উসমান পরিবারের জনৈক সদস্য ওরহান কনস্টান্টিনোপলে বন্দি ছিলেন। সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তাকে মুক্ত করে সিংহাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দ্বিতীয় মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। ইতঃপূর্বে অন্য সম্রাটরদেরও আমরা অনুরূপ কৌশল প্রয়োগ করতে দেখেছি। সম্রাট ম্যানুয়েল শাহজাদা মুস্তাফাকে দুই বার ব্যবহার করে সুলতান বায়েজিদ ও দ্বিতীয় মুরাদকে উত্যক্ত করেছেন। বর্তমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনও অনুরূপ ষড়যন্ত্র আটঘাট বাঁধেন। তিনি ওরহানকে সৈনিক ও রসদ সরবরাহ করে সাহায্য করার হুমকিও দেন।
সুলতান দেখলেন, এসব খুচরো হুমকির টোটকা জবাব দেওয়া যাবে না। তাই তিনি বাইজেন্টাইন রাজধানী অধিকারে কৃতসংকল্প হন।
কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা
সুলতানের প্রস্তুতির বিবরণ দেওয়ার পূর্বে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও সম্রাটের সৈন্যবিন্যাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল দুর্ভেদ্য ও দুর্গম্য। ত্রিভুজাকৃতির এ শহরের একদিক ছিল মর্মর সাগরের দিকে, আরেক দিক ছিল গোল্ডেন হর্নের বন্দর সংলগ্ন-একটি প্রাচীর এই দুই দিক ঘিরে রেখেছিল। আরেকদিক তথা পশ্চিম দিক ইউরোপীয় স্থলভাগের সাথে যুক্ত ছিল। এদিকে চার মাইল দীর্ঘ দুটি প্রাচীর ছিল। অন্তঃপ্রাচীরের উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০ ফুট। ১৮০ ফুট পরপর ৬০ ফুট উঁচু গম্বুজ ছিল। আর বহিঃপ্রাচীরের উচ্চতা ছিল প্রায় ২৫ ফুট। এটিতেও কিছু বুর্জ ছিল। দুই প্রাচীরের মাঝখানে ৫০ থেকে ৬০ ফুট ছিল খোলাভূমি। বহিঃপ্রাচীরের বাইরেও একটি প্রাচীর ছিল। তবে এটি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; বরং এটিকে ব্যারিকেড বলাই ভালো। ব্যারিকেড ও বহিঃপ্রাচীরের মাঝেও কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। তারপর ছিল প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ পরিখা। এটিই ছিল কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রথম প্রতিরক্ষা। ১১৮
কনস্ট্যান্টাইনের প্রতিরোধ পরিকল্পনা
প্রাকৃতিক সুরক্ষার ওপর নির্ভর করে স্বল্পসংখ্যক সৈনিক নিয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার প্রতিরোধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। নগরীর দুই দিক তথা মর্মর সাগর ও গোল্ডেন হর্নের অংশের নিরাপত্তার জন্য প্রাচীরই যথেষ্ট ছিল। অর্থাৎ ওদিকে কোনো সৈন্য মোতায়েনের প্রয়োজন ছিল না। শত্রুসৈন্যের পক্ষে নৌযানে চড়ে এসে প্রাচীর টপকে শহরে প্রবেশ ছিল অসম্ভব। আর তাই এক দিক তথা স্থলপ্রাচীরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাজধানী সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হতো।
পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে কনস্ট্যান্টিনোপলের জনসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজারের মতো। তন্মধ্যে প্রায় ছয়-সাত হাজারের মতো সৈনিক ছিল। সম্রাটের আবেদনে সাড়া দিয়ে ভেনিস, জেনোয়া, ক্রিট, রোম ও স্পেন হতে অল্পসংখ্যক যোদ্ধা কনস্ট্যান্টিনোপলে এসেছিলেন। সব মিলিয়ে আট-দশ হাজারের বেশি সৈন্য নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ছিল না। কনস্ট্যান্টিনোপলের সাধারণ নাগরিক ও যাজকরাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা মূলত প্রাচীর মেরামতে অংশ নিত।
শহরের প্রাচীরে কয়েকটি গেট ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আক্রম্য গেট সেন্ট রোমানাস গেট। গিওভান্নি গিউস্টিনিয়ানি তার সৈনিকদের এদিকে মোতায়েন করেন। অবশিষ্ট সৈনিকদের নগরপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তা ও তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত করা হয়। স্বয়ং সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন ও তার প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি নোটারাসও সশরীরে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন।
কনস্ট্যান্টিনোপলে পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। কিছু কামান ছিল, কিন্তু দুর্বল দেয়ালের ওপর ওগুলো স্থাপন করা সম্ভব ছিল না। অর্থ সংকটের কারণে সৈনিকদের বেতন দেওয়া সম্ভব ছিল না। সঙ্গিন অবস্থা। তাই মন্ত্রীদের পরামর্শে সম্রাট জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে গির্জা ও রাজপ্রাসাদের মূল্যবান তৈজসপত্র গলিয়ে মুদ্রা বানিয়ে সৈনিকদের মাঝে বিতরণ করেন। পরিবারের দেখভালের অজুহাতে কেউ যেন যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে পালিয়ে না যেতে পারে, সেজন্য সবার মাঝে সমানহারে রুটি বণ্টনের নির্দেশ দেন। এভাবে সীমিত সামর্থ্য ও জনবল নিয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন রাজধানী রক্ষার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। ১১৯
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের প্রস্তুতি
বাইজেন্টাইন সম্রাট যখন প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ অবরোধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। অভিযানের পূর্বে তাঁর প্রস্তুতির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কামান ও দুর্গ নির্মাণ।
রোমেলি হিসার নির্মাণ
কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সুলতান প্রথমেই বসফোরাসের ইউরোপীয় তটে একটি দুর্গ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সংবাদ পেয়ে বাইজেন্টাইন সম্রাট অত্যন্ত জোরালো আপত্তি জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন। সুলতানের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেন-
'আপনার পূর্বপুরুষ ওরহানপুত্র মুরাদের আদ্রিয়ানোপল জয়ের একশত বছর হতে চলল, অথচ কোনো সুলতান বসফোরাসের ইউরোপীয় তটে দুর্গ বানাতে চাননি। প্রণালীর আনাতোলিয়া অংশে একটি দুর্গ নির্মাণের পূর্বে আপনার পূর্বপুরুষ সুলতান মুহাম্মাদ বহুদিন অপেক্ষা করেন বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েলের অনুমতির জন্য। অথচ আনাতোলিয়ায় বহুদিন ধরে তুর্কিরাই শাসন করে আসছিল। এখন আপনার সাথে আমাদের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। তবুও আপনি পন্টিক সাগরে (কৃষ্ণসাগর) ফ্রাঙ্কদের প্রবেশাধিকার অস্বীকার করতে মনস্থ হয়েছেন, আমাদের ক্ষুধায় মারতে চান এবং বাণিজ্যসূত্রে আমরা যে রাজস্ব পাই, তা হতে আমাদের বঞ্চিত করতে চাইছেন! আপনার পরিকল্পনা পরিবর্তন করুন, আমরা মিনতি করছি। আমরা আপনার ভালো বন্ধু হিসেবে থাকব, যেমন ছিলাম আপনার পিতা মহান শাসক মুরাদের। এমনকী আপনি কর চাইলে আমরা তাও আদায় করতে রাজি। '১২০
বাইজেন্টাইন সম্রাটের আপত্তির জবাবে সুলতান বললেন-
'আমার শাসনাধীন এলাকায় দুর্গ নির্মাণের অধিকার আমার আছে। আপনি কি ভুলে গেছেন আমার পিতার অসুবিধার কথা, যখন আপনার সম্রাট হাঙ্গেরিয়ানদের সাথে জোট বেঁধে স্থলভাগে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল? আর ফ্রাঙ্ক রণতরিগুলো হেলেসপন্টে (দার্দানেলিস) ঢুকে গ্যালিপোলির মুখ বন্ধ করে আমার পিতার প্রণালি অতিক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছিল।...সেই সঙ্গিন মুহূর্তে আমার পিতা বহু কষ্টে বসফোরাস অতিক্রম করেছিলেন। তখন তিনি শপথ করেছিলেন, প্রণালির আনাতোলিয়া অংশে যে দুর্গ আছে, সেটির ঠিক বিপরীতে পশ্চিম তটে একটি দুর্গ নির্মাণ করবেন; তবে তিনি সফল হতে পারেননি। আল্লাহর সাহায্যে আমি তা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। আমি কি আমার আমার অধিরাজ্যে যা ইচ্ছা তা নির্মাণ করতে পারি না? (দূতগণ!) যান! আপনাদের সম্রাটকে বলুন, এই শাসক তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো নন। তাঁরা যা সম্পন্ন করতে পারেননি, সেটির বাস্তবায়ন এখন তার হাতের মুঠোয়। তাঁরা যা করার উদ্যোগ পর্যন্ত নেননি, তা সম্পাদনে ইনি শুধু ইচ্ছুকই নন; বরং অতি তৎপর। এই বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য যদি আবারও কোনো দূত পাঠানো হয়, তাহলে এমন হতে পারে, তিনি মাথা নিয়ে ফিরে যেতে পারবেন না।' ১২১
দুর্গ নির্মাণের জন্য সমগ্র সালতানাত হতে শ্রমিক সংগ্রহ করা হয়। বহু অজ্ঞাত স্থানে চুল্লি নির্মাণ করে Lime প্রস্তুত করে দুর্গ নির্মাণের স্থানে আনা হয়। নিকোমিডিয়া (ইজমিত) ও পন্টিক হেরাক্লিয়া (কারাদেনিজ এরেলি) হতে আনা হয় কাঠ এবং আনাতোলিয়া হতে আনা হয় পাথর। এভাবে উপকরণ ও শ্রমিক জোগাড় সম্পন্ন হলে দুর্গ নির্মাণ তদারকির জন্য ১৪৫২ সালের মার্চে সুলতান মুহাম্মাদ নিজে বের হন রাজধানী আদ্রিয়ানোপল হতে।
বসফরাসের এশীয় তীরে যেখানে সুলতান বায়েজিদ আনাতোলি হিসার বা কুজাল হিসার নামে দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, সেটির ঠিক বিপরীতে ইউরোপীয় তটে নতুন দুর্গ নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করেন। ত্রিভুজ আকৃতির দুর্গের প্রতিটি কোনায় একটি করে টাওয়ার নির্মাণ করা হয়; দুটি টাওয়ার ছিল সাগরের দিকে, আরেকটি স্থলভাগের দিকে। শিশার প্রলেপযুক্ত টাওয়ারগুলোর বেধ ছিল ৩২ ফুট, আর দেয়ালের বেধ ছিল ২২ ফুট।
সুলতান নিজে উপস্থিত থেকে দুর্গ নির্মাণের কাজ তদারকি এবং তাঁর মন্ত্রীদেরও সম্পৃক্ত করেন। তিনটি টাওয়ার নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় তিন মন্ত্রী যথা- খলিল পাশা, জাগনুশ পাশা ও সারিজা বেগের ওপর। আর দেয়াল নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ তত্ত্বাবধান করেন সুলতান মুহাম্মাদ। এভাবে নিবিড় তত্ত্বাবধানে তিন বা চার মাসের মধ্যেই নির্মিত হয় নতুন দুর্গ। সুলতান এটির নাম রেখেছিলেন বুগাজকেসেন, বসফোরাসের ইউরোপীয় তটে অবস্থিত বলে তুর্কিদের কাছে যা রোমেলি হিসার নামে পরিচিত। বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদগণের বিবরণে এটির নাম দেওয়া হয়েছে Laemocopia বা Pas-Chesen; দুটোরই অর্থ Cut-Throat। বসফোরাসের সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে (৬৬০ মিটার) দুই পাশে দুটি দুর্গ দাঁড়িয়ে যাওয়ায় প্রণালীর ওপর সুলতানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তুর্কিদের অনুমতি ব্যতীত কোনো জাহাজের পক্ষে প্রণালি অতিক্রম অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১২২
দুর্গ নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার পর খলিল পাশা কর্তৃক নির্মিত টাওয়ারের ওপর একটি কামান স্থাপন করা হয়। অতঃপর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ফিরোজ আগাকে দুর্গাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নিম্নরূপ নির্দেশ দেন সুলতান মুহাম্মাদ-
'হেলেসপন্ট হতে পন্টিক সাগরে যাওয়ার সময় কিংবা পন্টিক সাগর হতে হেলেসপন্টে যাওয়ার সময় যেকোনো রাজ্যের যেকোনো ধরনের/আকারের নৌযান (এমনকী সুলতানের নৌযানও) যেন পাল না নামিয়ে এবং টোল আদায় না করে বসফোরাস অতিক্রম করতে না পারে। কোনো জাহাজ এ নির্দেশ মানতে না চাইলে সেটিকে যেন কামানের গোলায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়।'১২৩
আরও কিছু প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করে দুর্গরক্ষায় চারশো সৈনিক নিয়োগ দিয়ে আদ্রিয়ানোপলে ফিরে যান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ।
বসফোরাসের থ্রাসিয়ান প্রান্তে নির্মিত দুর্গটির অবস্থান কনস্ট্যান্টিনোপল হতে খুব একটা দূরে ছিল না। তাই নগরবাসীর মনে রোমেলি হিসার চরম ভীতির সঞ্চার করেছিল-যার বিবরণ পাওয়া যায় সমকালীন ইতিহাসবিদ ডুকাসের বিবরণে। তিনি লিখেছেন-
'Now the end of the city is near. Now the signal is sounding for the end of our nation, now is the time of Antichrist. What shall we do, and what will be our fate? O Lord! Let our lives be taken from us, before the eyes of Thy servants can see the destruction of the city; let not Thy enemies say, O Lord! 'Where are the Saints who keep watch over it?'124
'শহরের পতন অত্যাসন্ন। আমাদের জাতির ধ্বংসের ইঙ্গিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এখন তো খ্রিষ্টবিরোধীদের সময়। আমরা কী করব, আমাদের ভাগ্যে কী আছে? প্রভু! আপনার বান্দারা শহরের ধ্বংস দেখার আগে আমাদের জীবন নিয়ে নিন! আপনার শত্রুরা যেন বলতে না পারে, প্রভু! সাধু পুরুষরা কোথায়, যারা একে রক্ষা করবে?'
সুলতানি কামান
যুদ্ধ প্রস্তুতির সময় কনস্ট্যান্টিনোপল হতে পালিয়ে সুলতানের কাছে হাজির হন হাঙ্গেরিয়ান কামান প্রকৌশলী উর্বান। তিনি প্রথমে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের কাছেই গিয়েছিলেন। কিন্তু তার দাবিমতো বেতন এবং কামান বানানোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা সম্রাটের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই উর্বানকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর তিনি সম্রাটকে ছেড়ে সুলতানের কাছে চলে আসেন।
সুলতান হাঙ্গেরিয়ান প্রকৌশলীকে সাদরে বরণ করে তাকে বৃহদাকারের কামান নির্মাণের আদেশ দেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্থান হতে ব্রোঞ্জ, সালফার, সোরা ও তামাসহ কামান নির্মাণ ও ব্যবহারের অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করা হয়। প্রকৌশলী উর্বানের জন্য সুলতান সম্মাজনক ভাতা নির্ধারণ করেন। ডুকাসের মতে-এর এক-চতুর্থাংশ পারিশ্রমিক দেওয়া হলেও উর্বান কনস্ট্যান্টিনোপলে থেকে যেতেন। ১২৫
তারপর উর্বান তিন মাসের মধ্যে অনেকগুলো কামান নির্মাণ করেন। এগুলোর মাঝে একটি ছিল বিরাট আকারের। এত বড়ো কামান এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। এটির নকশা করেছিলেন সুলতান নিজে, ওজন ছিল ৭০০ টন, উৎক্ষিপ্ত গোলার ওজন ছিল ১২ হাজার রতল১২৬। এদিনে কামানটির পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সময় তীব্র নিনাদ সৃষ্টির ব্যাপারে নগরবাসীকে সতর্ক করা হয়েছিল। এক মাইল দূরে কামানের যে গোলা পড়েছিল, তা ছয় ফুট (এক কোলাজ) গভীর গর্ত সৃষ্টি করেছিল, আর আওয়াজ শোনা গিয়েছিল তেরো মাইল দূর হতে (১০০ Stade)। তুর্কিরা এর নাম দিলো 'সুলতানি কামান'। ১২৭
১৪৫৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে কামানটি এদিন থেকে বের করা হয়। ৩০ ওয়াগন সংযুক্ত করে ষাটটি ষাঁড়ের মাধ্যমে কামানগুলো টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। ডানে-বামে বিচ্যুতি হতে রক্ষার জন্য দুই পাশে ছিল দুইশো শ্রমিক। সামনে ছিল পঞ্চাশজন কাঠমিস্ত্রী ও দুইশো শ্রমিক। এদের কাজ ছিল এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা সংস্কার এবং প্রয়োজনে কাঠসেতু নির্মাণ করা। এভাবে দুই মাসের সফর শেষে ৫ এপ্রিল কামানগুলো কনস্ট্যান্টিনোপলের কাছে পৌঁছে যায়। বড়ো কামানটি প্রথমে স্থাপন করা হয় ক্যালিগ্যারিয়া নামক জায়গায়, যেখানে নগরপ্রাচীরের সামনে পরিখা ছিল না। পরে অধিক কার্যকারিতার সাথে ব্যবহারের জন্য সেটিকে সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। রসদভান্ডারে নতুন অস্ত্রের জোগানে সুলতান খুশি হন। উর্বানও অন্য প্রকৌশলীদের তিনি দুই হাত ভরে দেন। ১২৮
সম্রাটের দুই ভ্রাতাকে নিষ্ক্রিয়
সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের দুই ভাই টমাস ও দিমিত্রিস মোরিয়া উপদ্বীপ শাসন করতেন। যুদ্ধারম্ভের পূর্বে সুলতান তাদের নিষ্ক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ লক্ষ্যে সেনাপতি তুরখানকে শক্তিশালী বাহিনীসহ তাদের নিষ্ক্রিয় করার অভিপ্রায়ে প্রেরণ করা হয়।
সেনাপতি তুরখান সমগ্র গ্রিস উপদ্বীপ এমনভাবে অবরোধ করেন, অবরুদ্ধ রাজধানীতে বাহির হতে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়। এ সময় কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ই সুলতানের একমাত্র ধ্যানজ্ঞানে পরিণত হয়। নিদ্রাহরণকারী এ ভাবনা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তিনি ঘনিষ্ঠ সভাসদদের সাথেও আলোচনা বন্ধ করে দেন। ১২৯
প্রাকযুদ্ধ
১৪৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষণ পরিদৃষ্ট হয়। সূচনাটা অবশ্য গ্রিকরাই করে। তারা তুর্কি তটে হামলা করে বহু মানুষ হত্যা, ব্যাপক ধ্বংসলীলার স্বাক্ষর রাখে। গনিমতের মাল বাজারে বেচে দেয়। গির্জা-মসজিদ নির্বিশেষে ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা চালিয়ে গুপ্তধন ও উপঢৌকনাদি লুট করে। ইজমির শহর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এ হামলা সুলতানকে প্রতিজ্ঞা থেকে নিবৃত করার পরিবর্তে বরং তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
বাইজেন্টাইন সম্রাটের পত্র
সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন যখন দেখলেন পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে, যুদ্ধের সংকল্প হতে সুলতানকে ফেরানোর কোনো উপায় নেই, তখন তিনি সীমিত সামর্থ্যের ওপর যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। কনস্ট্যান্টিনোপলের ফটক বন্ধ করে তিনি সুলতানের প্রতি একখানা পত্র প্রেরণ করেন।
'এখন এটি পরিষ্কার, আপনি শান্তি অপেক্ষা যুদ্ধ অধিক কামনা করছেন। আর আমার বিশ্বস্ততা দ্বারা যখন আপনাকে তুষ্ট করা সম্ভব নয়, তখন ঈশ্বরের হাতে সবকিছু ছেড়ে দিলাম এবং তাঁরই প্রতি অভিমুখী হলাম। যদি ঈশ্বরের অভিপ্রায় এটি হয়, তাহলে এই শহর আপনার হবে। তাঁর সিদ্ধান্ত কেউ ফেরাতে পারবে না। আর আপনি যদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হন, তাহলে আজীবন নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করব। এতসত্ত্বেও আমি আপনাকে সকল চুক্তি হতে মুক্ত করে দিলাম। শহরের তোরণ বন্ধ, আমি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে স্বজাতিকে রক্ষার চেষ্টা করব।'১৩০
সুলতানের সৈন্য-বিন্যাস এবং আনুষ্ঠানিক অবরোধ
১৪৫৩ সালের প্রারম্ভে সালতানাতের প্রতিটি প্রদেশের গভর্নরদের উদ্দেশ্যে সৈন্য সরবরাহের নির্দেশ দিয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়। এশিয়া ও ইউরোপে বিস্তৃত বিশাল সালতানাতের প্রতিটি প্রদেশের সৈনিকদের সমন্বয়ে গঠিত সুলতানের বাহিনী আক্ষরিক অর্থে বহুজাতিক বাহিনীতে পরিণত হয়। সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদগণ তুর্কি বাহিনীর সদস্যসংখ্যা নিরূপণে হিমশিম খেয়েছেন। টেডালডি ২ লাখের কথা বললেও চালকোকোনডাইলাস বলেছেন ৪ লাখ। ১৩১
তবে নিয়মিত সৈন্যের সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি ছিল বলে মনে হয় না। এদের মাঝে জেনিসেরি বাহিনীর সদস্য ছিল ১৫ হাজার। প্রায় ৪০ হাজার সৈন্যের বর্ম বা চামড়ার জ্যাকেট ছিল। নিয়মিত সৈন্যরা তির, ধনুক ও বর্শাসহ অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। বাহিনীর অপরাপর সদস্যরা ছিল হকার, শ্রমিক ও রসদ জোগানদাতা। আধ্যাত্মিক প্রেরণা প্রদানের জন্য তুর্কি বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন অনেক আলিম ও শাইখ। সুলতান মুহাম্মাদ উদ্ভাবনী চিন্তা ও কর্মে সর্বাধিক সক্রিয় ও তৎপর ছিলেন। অন্য সবার মতো তিনিও ছিলেন কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের স্বপ্নে বিভোর। রাসূল ﷺ-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হওয়ার গৌরব কে না অর্জন করতে চায়!
১৪৫৩ সালের ৫ এপ্রিল কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীরের কাছে তুর্কি বাহিনীর দেখা মেলে। মুসলিমরা যে প্রাণপণ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে, তা বোঝা যায় তাদের সাথে আলে বায়ত ও ওলামা-মাশায়েখদের উপস্থিতি দেখে। সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে লাইকাস (Lycus) নদীর বাম তীরে খননকৃত পরিখাকে কেন্দ্র করে সুলতান তাঁর ক্যানোপি স্থাপন করেন। এখানেই দূরপাল্লার কামানগুলো স্থাপন করা হয়। তারপর সুলতান দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনায় সৈনিকরা সুলতানের অনুগামী হয়।
সুলতান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বাহিনী বিন্যাস করেন। পদাতিক ও আর্টিলারির সাথে অশ্বারোহী বাহিনী এবং নিয়মিত বাহিনীর সাথে অনিয়মিত বাহিনীর সমন্বয় করেন। সুলতানের সৈন্য-বিন্যাস ছিল নিম্নরূপ : ক. তুর্কি বাহিনীর সবচেয়ে বড়ো অংশ ছিল আনাতোলিয়া বা এশীয় বাহিনী। এটিকে সুলতানের ডানপাশে গোল্ডেন গেট-এর সামনে মোতায়েন করা হয়। এই দলটি মর্মর সাগর পর্যন্ত বিস্তুত ছিল। আনাতোলিয়ার শাসক ইসহাক বেগ ছিলেন এই বাহিনীর নেতৃত্বে। তাঁর সহযোগী ছিলেন মাহমুদ বেক। আর্টিলারি বাহিনীকেও এই কমান্ডের অধীনে রাখা হয়।
খ. সুলতানের বাম পাশে কাষ্ঠতোরণ (Wooden Gate) বা এদিন গেটের সামনে মোতায়িত হয় ইউরোপীয় কমান্ড। এই অংশ গোল্ডেন হর্ন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্ব অর্পিত হয় কারাজা পাশার ওপর।
গ. কেন্দ্রভূমিতে সুলতানকে ঘিরে রোমানাস গেটের সামনে অবস্থান নিয়েছিল ১৫ হাজার শ্রেষ্ঠ জেনিসেরি সৈন্য। প্রথম উজির খলিল পাশাকেও সাথে রাখেন সুলতান। নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল এ বাহিনীর পেছনে।
ঘ. আলবেনিয়ান জাগনুস পাশাকে (বা জাগান পাশা) অনিয়মিত বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। তাকে গ্যালাটার জেনোয়ানদের ওপর এমনভাবে নজর রাখতে বলেন, যেন ওদিক থেকে শহরে কোনো সহায়তা না পৌঁছে।
ঙ. রোমেলি হিসারের দুর্গাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সারিখা পাশাকে। তার দায়িত্ব ছিল গোল্ডেন হর্নের দিক হতে শহরের ওপর আক্রমণ করা।
চ. গ্যালিপোলির নৌ-সদরে প্রস্তুত ছিল ৩০০টি ছোটো-বড়ো যুদ্ধজাহাজ। এগুলোর মাঝে ছিল ২০টি trireme (তিন সারি দাঁড়বিশিষ্ট রণতরি), বাকিগুলো bireme (দুই সারি দাঁড়বিশিষ্ট রণতরি) ও ছোটো আকারের নৌযান। এগুলোকে মর্মর সাগর অতিক্রম করে বসফোরাসের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কৃষ্ণসাগরের অট্যোমান নেভাল ক্যাম্প হতে কিছু নৌযান এদের সাথে যোগ দেওয়ায় অবরোধকারী বিশাল এক বাহিনীর রূপ দেখা যায়। ১৩২
নৌবহরের দায়িত্ব ছিল ব্যাপক। যেমন: সাগরপথে কনস্ট্যান্টিনোপলে রসদ সরবরাহ বন্ধ, গোল্ডেন হর্নের প্রবেশপথ রুদ্ধকারী শিকল পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত জাহাজের ওপর হামলা চালানো, হর্নে নোঙর করা নৌযান ধ্বংস, সাগর পাড়ে স্থাপিত দুর্গের ওপর গোলা নিক্ষেপ, সর্বোপরি নগর অবরোধে স্থলবাহিনীকে সহায়তা করা। সুলতানের নির্দেশে অটোম্যান নৌপ্রধান মর্মর সাগরের দ্বীপে অবস্থিত রোমান সামরিক পকেটগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বন্দিদের মুক্ত করে দেন। আর ওই দ্বীপগুলো তুর্কি প্রতিরক্ষার আওতায় আসে। ১৩৩
'রোমেলি হিসার' নির্মাণকালে শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ এবং পরে দুর্গ ধ্বংসের পাঁয়তারা করায় ৬ এপ্রিল, ১৪৫৩ তারিখে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী অবরোধ করেন। তবে শান্তির সর্বশেষ সুযোগ গ্রহণ করতে চাইলে তুর্কিদের হাতে রাজধানী সমর্পণের জন্য সম্রাটের প্রতি আহ্বান জানান সুলতান। পাশাপাশি তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন, শহরবাসী আত্মসমর্পণ করলে তাদের জান-মাল ও দ্বীন-ধর্মের নিরাপত্তা বিধান করা হবে।
'তোমাদের সম্রাট যেন আমার কাছে কনস্ট্যান্টিনোপল শহর সমর্পণ করেন। আমি শপথ করছি! আমার বাহিনী কারও জীবন, সম্পদ ও সম্মান হরণ করবে না। যার ইচ্ছা শহরে নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। আর কেউ চাইলে যেখানে ইচ্ছা সেখানে সম্মানে ও নিরাপদে চলে যেতে পারবে।'১৩৪
কিন্তু সম্রাট এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীর এবং খ্রিষ্টান বিশ্বের সমর্থন পুরোনো সাম্রাজ্যটিকে রক্ষা করবে। অতএব, যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
প্রথমে বাইজেন্টাইন সম্রাট রোমেলি হিসার ধ্বংসের চেষ্টা চালান। কিন্তু তুর্কিরা রোমান আক্রমণের এমন প্রত্যুত্তর দেয়, তাদের চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কার্যত এরপরই যুদ্ধ শুরু হয়। ইতঃপূর্বে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়েছিল। তুর্কিরা কামান দাগিয়ে হামলা শুরু করে। গোলা উৎক্ষেপণের সময় এমন প্রচণ্ড নিনাদ সৃষ্টি হতো, ভয়ে শহরবাসীর প্রাণবায়ু বের হওয়ার জোগাড়।
দুই দলই বীরত্বের সাথে লড়াই করে। কনস্ট্যান্টিনোপলের কমান্ডার ইন চিফ গিওভান্নি ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল মেরামতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তুর্কি বাহিনীর গোলার আঘাতে যখনই প্রাচীরে কোনো ফাটল সৃষ্টি হতো, তখনই তার অনুগত সৈনিকরা লাঠির আঁটি ও মাটিভর্তি পিপা দিয়ে তা মেরামত করে নিত।১৩৫ তুর্কিদের গোলার আঘাতও অব্যাহত রইল। মাঝে মাঝে জানবাজ জেনিসেরিরা প্রাচীর অতিক্রমের চেষ্টা চালায়। কিন্তু বাইজেন্টাইন সৈনিকদের প্রতিরোধের কারণে প্রথমদিকে তারা পূর্ণ সফলতা লাভে ব্যর্থ হয়। ছোটো-বড়ো কামান দিয়ে প্রতিদিন ১০০ হতে ১২০ বার গোলা নিক্ষেপ করা হতো। এক পর্যায়ে অটোমান কামান লিকুস উপত্যকার কাছে নগরপ্রাচীরের একাংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। প্রাচীর সংলগ্ন পরিখা নানা আবর্জনায় পূর্ণ হয়েছিল। কয়েকজন তুর্কি সৈনিক দ্রুত এগিয়ে মই লাগিয়ে প্রাচীর টপকানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু গিওভান্নি গিউস্টিয়ানি প্রশিক্ষিত ও বর্মধারী যোদ্ধাদের নিয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তুর্কি সৈন্যদের ওপর চারদিক থেকে বাণবৃষ্টি বর্ষিত হয়। দুই পক্ষে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাণপণ লড়াই চলে। তারপর সুলতান সৈনিকদের তাঁবুতে ফেরার নির্দেশ দেন। এ প্রচেষ্টার ঈপ্সিত ফল না এলেও সুলতান খ্রিষ্টানদের প্রতিরোধ শক্তি ও স্পৃহা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পান।
ওদিকে প্রায় একই সময়ে গোল্ডেন হর্নেও লড়াই চলছিল। পোতাশ্রয়ের নিরাপত্তার জন্য গ্রিকরা হুরাইয়া গেট হতে গ্যালাটা তীর পর্যন্ত একটি শিকল স্থাপন করেছিল। ১৩৬ তুর্কি নৌবহর গোল্ডেন হর্নে গমন রুদ্ধকারী শিকল ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু পাহারারত বাইজেন্টাইন ও ইতালীয় জাহাজের প্রতিরোধে তুর্কিরা ব্যর্থ হয়।
শত্রুপক্ষের জাহাজগুলোর অবস্থান ছিল কিছুটা উঁচুতে, তাই তারা সহজেই আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে তুর্কিদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। সমকালীন বিচারে তুর্কি নৌবহর যথেষ্ট রসদসমৃদ্ধ ছিল। তবে জলযুদ্ধে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল না। দলে অভিজ্ঞ নৌযোদ্ধারও অভাব ছিল। তা ছাড়া নৌযানের সংখ্যাধিক্য তাদের মনে কিছুটা অহংকার ও শৈথিল্য সৃষ্টি করেছিল। অপরদিকে নৌবিদ্যা ও সাগরসমরে রোমানদের অভিজ্ঞতা ছিল সহস্র বছরের। ফলে অনভিজ্ঞ তুর্কি নৌবাহিনীকে তারা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।
জলে ও স্থলে তুর্কিদের ঠেকিয়ে দিয়ে রোমানরা উল্লসিত এবং নগর রক্ষায় আশাবাদী হয়। প্যাট্রিয়ার্থকে সাথে নিয়ে কনস্ট্যান্টাইন আয়া সোফিয়ায় গিয়ে সকৃতজ্ঞ প্রার্থনা নিবেদন করেন। অপরদিকে প্রাথমিক ধাক্কায় মোটেও হতোদ্যম হন না সুলতান মুহাম্মাদ; বরং তাঁর বিজয়তৃষ্ণা আরও বেড়ে যায়।
গ্যালাটার ভূমিকা এই যুদ্ধে কনস্ট্যান্টিনোপলের উত্তর সীমানাঘেঁষা জেনোয়ান গ্যালাটার (অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত গ্যালাটা পরিচিত ছিল Sykai নামে) ভূমিকা সম্পর্কে এখানে একটু ইঙ্গিত দেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসবিদদের বিবরণে দেখা যায়, কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের যুদ্ধে গ্যালাটার জেনোয়ানরা দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে তারা স্বধর্মী খ্রিষ্টানদের সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত, আবার সুলতানের বিজয় হতে পারে-এমন আশঙ্কাও তাদের ছিল।
যুদ্ধের উদ্দেশ্যে আদ্রিয়ানোপল হতে বের হওয়ার আগেই তারা সুলতানের কাছে দূত প্রেরণ করে পূর্বের চুক্তি নবায়ন করে এবং যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের ঘোষণা দেয়।
কিন্তু যুদ্ধের সময় জেনোয়ানদের আচরণে তাদের দোদুল্যমানতাই প্রকাশ পায়। একদিকে সুলতানের শিবিরে তাদের যাতায়াত ছিল, তাঁর কামানের জন্য তেলসহ অন্যান্য রসদ তারা সরবরাহ করত। আবার তাদেরই একদল রাতের আঁধারে গোল্ডেন হর্ন পাড়ি দিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিত এবং পরদিন তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। যুদ্ধের দিনগুলোতে তারা দোদুল্যমান মনোভাব হতে বের হতে পারেনি। তাদের মনে হয়তো ক্ষীণ আশা ছিল, বিরাট সেনাবাহিনী নিয়েও সুলতান সফল হতে পারবেন না। কনস্ট্যান্টিনোপলের সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা তাঁকে তেমনিভাবে প্রতিরোধ করবে, যেমনভিাবে ঠেকিয়ে দিয়েছিল তাঁর পূর্ববর্তী সুলতানদের। ১৩৭
গ্যালাটার নৌযুদ্ধ
২০ এপ্রিল, ১৪৫৩ সাল। মর্মর সাগরে আচানক পশ্চিম দিক থেকে আগত পাঁচটি জাহাজ দেখা যায়। এগুলোর মাঝে চারটি জাহাজ কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীর সাহায্যে পোপের তরফে প্রেরিত। আরেকটি ছিল স্বয়ং সম্রাটের-যা সৈনিক, অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্র বহন করছিল। তুর্কিরা দেখল, জাহাজগুলো অবরুদ্ধ শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাথে সাথে নৌ কমান্ডার বালতা উল্লুকে আক্রমণের নির্দেশ দেন সুলতান। জাহাজগুলো ধ্বংস করতে না পারলেও অন্তত সেগুলো যেন শহরে পৌঁছতে না পারে। সে ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন সুলতান। তাঁর নির্দেশের শেষ বাক্য ছিল-
'আদেশ পালনে অসমর্থ হলে আমার কাছে জীবিত প্রত্যাবর্তন করবে না।'১৩৮
এরপর এক ভয়াবহ ও চমকপ্রদ নৌযুদ্ধ দেখল তীরবাসী খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা। ওই পাঁচটি জাহাজ ছুটছিল গোল্ডেন হর্নের দিকে। তুর্কি নৌপতি বালতা উন্মু জাহাজগুলোকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা ছুটল বাইজেন্টাইন জলসীমার দিকে। ফলে ভয়ানক এক জলযুদ্ধ বেধে যায়। তুর্কিদের নৌযান সংখ্যায় বেশি হলেও আকারে ছিল ছোটো। তা ছাড়া তাদের যোদ্ধারা ছিল অনভিজ্ঞ।
অপরদিকে বাইজেন্টিয়াম যোদ্ধারা ছিল পোড় খাওয়া। প্রথমদিকে সাগরের বাতাসও তাদের সাহায্য করছিল। ফলে তুর্কিরা তেমন সুবিধা করতে পারে না; বরং কয়েকজন তুর্কি সৈনিক মারা যায়। নৌপতি উগ্র সশরীরে জলরাশিতে নেমে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তিনি এতটা মরিয়া হয়ে শত্রুপানে এগিয়ে যান, তিরের আঘাত তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তারপরও লড়াই অব্যাহত থাকে।
দুই তীরের বাসিন্দারা হর্ষধ্বনির মাধ্যমে নিজ নিজ পক্ষকে উৎসাহ দিচ্ছিল। হঠাৎ হাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে পাঁচটি জাহাজের প্রবাহ থেমে পাল গুটিয়ে যায়। অথচ জাহাজগুলো প্রায় গোল্ডেন হর্নের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। উগ্র এ মুহূর্তটির সুযোগ গ্রহণ করতে চাইলেন। তুর্কিরা ঢেউ তুলে জাহাজগুলো ডুবিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আগুন লাগানোর চেষ্টাও সফল হলো না। রোমানরা দ্রুত পানি ছিটিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে। চরম উৎসাহে লড়াই চালিয়ে গেলেও অভিজ্ঞ রোমানদের বিরুদ্ধে উল্লেখ করার মতো সাফল্য পায় না তুর্কিরা।
সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে এ যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছিলেন তুর্কি সুলতান। উত্তেজনার অতিশয্যে তিনি একবার অশ্বসমেত সাগরে নেমে পড়েন। তীর হতে তিনি অনবরত 'কাপ্তান' 'কাপ্তান' বলে চিৎকার দিয়ে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে রাত নেমে আসে। হঠাৎ দক্ষিণ থেকে আবার বাতাস বইতে শুরু করে। রোমান জাহাজগুলোর পাল আবার খুলে যায়। সেগুলো তুর্কি জাহাজগুলোর মাঝ দিয়ে প্রবল ঢেউ তুলে গোল্ডেন হর্নে পাড়ি জমায়। নিজেদের জাহাজ প্রবেশের সুবিধার্থে রোমানরা সাগরতলে স্থাপিত শিকল ফেলে দিয়েছিল। জাহাজগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তারা আবার শিকল তুলে দেয়। এভাবে বাইজেন্টাইন জাহাজের নিরাপদ গমনের সাফল্যে শেষ হয় 'গ্যালাটার নৌযুদ্ধ'।
ক্ষুব্ধ সুলতান সাগর হতে উঠে এলেন। তিনি বিষণ্ণ, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। বালতা উম্মুর স্থলে তিনি আহমদ বেগকে নৌ-উপদেষ্টা (কাপ্তান দরিয়া) নিয়োগ দেন। ১৩৯ নৌযুদ্ধের সাফল্যে কনস্ট্যান্টিনোপলে খুশির বন্যা বয়ে যায়। এ বিজয় তাদের মনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। বাইজেন্টাইনরা বিশ্বাস করতে শুরু করে, তারা স্থলযুদ্ধেও জয়ী হয়ে তুর্কি বাহিনীকে হটিয়ে রাজধানী নিরাপদ করতে সক্ষম হবে। শহরে আনন্দের শোভাযাত্রা বের হয়। গির্জায় বেজে উঠে ঘণ্টা। সারারাত ধরে খ্রিষ্টানরা ধর্মীয় সংগীত গাইতে থাকে। প্রাচীরের বাইরে তুর্কিরা যখন এ ধ্বনি শোনে, তখন তাদের প্রতিজ্ঞা আরও দৃঢ় হয়।
তুর্কি কামানগুলো তীব্র নিনাদ সৃষ্টি করে রাত-দিন কনস্ট্যান্টিনোপলের দেয়ালে গোলা নিক্ষেপ করে যাচ্ছিল। ওদিকে নগরবাসীও প্রাণান্ত পরিশ্রমে প্রাচীর সংস্কার করে ফেলত। ফলে যুদ্ধ-পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছিল না। ওদিকে সুলতান নতুন পন্থা উদ্ভাবনের চিন্তায় বিভোর ছিলেন। তিনি দেখলেন, শত্রুদের যুদ্ধে ব্যস্ত করতে না পারলে সাফল্য আসবে না।
পানির জাহাজ পাহাড় দিলো পাড়ি
গোল্ডেন হর্নে নৌশক্তির প্রবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। ভৌগোলিক দিক দিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল এতটা সুরক্ষিত, স্থল ও জলপথের যৌথ আক্রমণ ছাড়া এই শহর অধিকার করা অসম্ভব ছিল। আর জলপথের সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট গোল্ডেন হর্ন এলাকা। অথচ এ দিকটায় তুর্কিদের উপস্থিতি ছিল না। তা ছাড়া গ্যালাটার জেনোয়ানদের ওপর নজর রাখা এবং রোমেলি হিসারের সাথে যোগাযোগের সহজ পথ সৃষ্টির জন্যও গোল্ডেন হর্নের ওপর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য ছিল।
ইতঃপূর্বে তুর্কি নৌবাহিনী বহুবার চেষ্টা করেও বন্দরের প্রবেশমুখে স্থাপিত প্রকাণ্ড শিকল ছিন্ন করতে পারেনি। এই শিকলের একদিক ছিল জেনোয়ান শহর গ্যালাটায়। তারা মনে মনে স্বধর্মী কনস্ট্যান্টিনোপলের জয় কামনা করত, কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় প্রকাশ্যে তুর্কিদের বিরোধিতা করত না। তাই তাদের শত্রুর কাতারে রাখতে হয়। সুলতান এমন একটি উপায় বের করার চিন্তায় ব্যাপৃত ছিলেন—যাতে জলপথ এড়িয়ে গোল্ডেন হর্নে নৌযান নামানো যায়। তাহলে স্থল ও জলপথের যৌথ আক্রমণে কনস্ট্যান্টিনোপলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।
অভিনব একটি ভাবনা সুলতানের মনে বিদ্যুতের ন্যায় খেলে যায়। আর তা হলো, বাশাকতাশের অ্যাঙ্করেজ হতে জলপথ এড়িয়ে দূরবর্তী স্থলপথ দিয়ে গোল্ডেন হর্নে নৌযান স্থানান্তর। দুই বন্দরের মাঝে স্থল দূরত্ব ছিল তিন মাইল আর রাস্তাও মসৃণ ছিল না; বরং ছোটোখাটো টিলা দ্বারা পূর্ণ ছিল।
কয়েক ঘণ্টা চিন্তা-ভাবনা করার পর সুলতান স্থির সিদ্ধান্ত নেন। তারপর তিনি সামরিক উপদেষ্টাদের ডাকলেন। সবাই তাঁর চিন্তার অভিনবত্বের প্রশংসা করে। অনতিবিলম্বে সুলতানের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কর্মীরা রাত-দিন পরিশ্রম করে রাস্তা সমান করে। তারপর গাছের তক্তা ফেলে তার ওপর তৈল ও ঘি মর্দন করে পিচ্ছিল করা হয়। টিলাগুলোর ওপর দিয়ে নৌকা পার কম হওয়ায় নৌকা পারাপারে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু তুর্কি নৌযানের আকার ও ওজন কম হওয়ায় সেটাও সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়নি।
কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই তুর্কিরা বফরাস থেকে ৭০টি নৌযান (bireme) গোল্ডেন হর্নে নিয়ে যায় (২২ এপ্রিল ১৪৫৩)। এই কাজ সহজ করার জন্য তুর্কি নৌযান থেকে ২১ এপ্রিল সারাদিন গোল্ডেন হর্নে গোলা নিক্ষেপ করা হয়। ফলে একটি শত্রুজাহাজ ডুবে যায়। বাকিগুলো গ্যালাটা প্রাচীরের দিকে ঘেঁষে। তুর্কিরা শিকল ছিন্নের চেষ্টাও করে, কিন্তু বরাবরের মতো এবারও ব্যর্থ হয়। তবে নগরপ্রাচীরের ওপর গোলার আক্রমণ অব্যাহত ছিল- যাতে নাগরিকদের মনে ভীতির সঞ্চার হয়। ১৪০
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের প্রত্যক্ষদর্শী খ্রিষ্টান ধর্মযাজক লিওনার্ড-এর মতে- 'ভেনিসিয়ানরা লেক গার্ডায় যে কৌশল অবলম্বন করেছিল, তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তুর্কিরা এমন উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পেরেছিল।'১৪১
আর্চবিশপের অনুমান সত্য হলেও স্থলপথে জলযান স্থানান্তরের এ পরিকল্পনা সেই যুগের বিবেচনায় অত্যন্ত প্রাগ্রসর একটি চিন্তা বলে গণ্য করা যায়। এটির বাস্তবায়নের দ্রুততা এবং সুক্ষ্মতাও ছিল অভাবনীয়। স্থলপথে জলযান স্থানান্তরের চেয়ে বেশি বিস্ময়ের বিষয় ছিল-এতগুলো রণতরি রাস্তা ও পাহাড় পাড়ি দিয়ে গোল্ডেন হর্নে নিয়ে যাওয়া হলো অথচ বাইজেন্টিয়ান ও জেনোয়ানরা কিছুই ঘূর্ণাক্ষরে আঁচ করতে পারল না!
পরদিন ২২ এপ্রিল, ১৪৫৩ সালের প্রত্যুষে তাদের চক্ষু তড়াক। গোল্ডেন হর্নে উপস্থিত ৭০টি তুর্কি নৌযান! তুর্কি সৈনিকদের রণসংগীতে চারদিক মুখরিত। একটি পুরোনো ভবিষ্যদ্বাণী মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে; কান থেকে কানে- 'যখন দেখা যাবে নৌযান ডাঙা পাড়ি দিচ্ছে, তখনই কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন হবে।'১৪২
সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিক ডুকাস সবিস্ময়ে লিখেছেন-
"Who has ever seen such a thing before, or even heard of it? Xerxes indeed made a bridge over the sea, and his army passed over it as if on dry land. But this new Alexander, surely, it is to be hoped, the last of his kind, made the land into an ocean, and drew his ships over the peaks of the mountains as if they were the crests of the waves. And in this he surpassed Xerxes, who crossed the Hellespont but had to return back after being defeated by the Athenians: Mehmet crossed the land as if it were the sea and then overhelmed the Greeks, the ornament of the world, and captured the Queen of the Cities. 143
ইতঃপূর্বে কেউ কি এমন ঘটনা দেখেছে না শুনেছে? হ্যাঁ, [পারস্য সম্রাট] জেরজেস সাগরের ওপর সেতু নির্মাণ করেছিলেন এবং তাঁর বাহিনী ওটার ওপর দিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল, যেন তারা শুকনো মাটির ওপর দিয়েই পার হয়েছিল। কিন্তু এই নতুন আলেকজান্ডার- আশা করা যায় এমন আরেকজন হবেন না-তো স্থলভাগকে সাগর বানিয়ে ফেললেন এবং পর্বতের শৃঙ্গের ওপর দিয়ে নৌকাগুলো টেনে নিয়ে যান, ওগুলো যেন ঢেউয়ের চূড়া। এক্ষেত্রে তিনি- জেরজেসকে ছাড়িয়ে যান, যিনি হেলেসপন্ট অতিক্রম করেছিলেন বটে, তবে আথেনীয়দের কাছে পরাজিত হয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিল। মুহাম্মাদ স্থলকে সাগর বানিয়ে অতিক্রম করেন। তারপর বিধ্বস্ত করেন গ্রিকদের, যারা ছিল বিশ্বের শোভা এবং জয় করেন নগরসমূহের রানি।'
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের প্রত্যক্ষদর্শী আর্চবিশপ লিওনার্ড এটিকে সুলতানের Brilliant Stroke বলে অভিহিত করেছেন।
ভাসমান পিপাসেতু
গোল্ডেন হর্নে স্থলপথে রণতরি নামিয়েও সন্তুষ্ট হননি সুলতান মুহাম্মাদ। তিনি গ্যালাটার ক্যাম্প হতে সৈনিকদের গমনাগমনের জন্য সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর নির্দেশে ১ হাজার পিপা সংগ্রহ করা হয়। তারপর দুটি করে পিপা বেঁধে একটি সারি তৈরি করা হয়। পাশে আরও দুটি করে পিপা বেঁধে আরেকটি সারি তৈরি করা হয়। এভাবে দুই তীর সংযুক্ত হওয়ার পর তক্তা ফেলে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। পাশাপাশি পাঁচজন সৈনিক এই সেতুর ওপর দিলে চলাচল করতে পারত। এটি গ্যালাটার Ceramaria-কে নগরপ্রাচীর সংলগ্ন Phanari (বর্তমান নাম Fener)-এর সাথে যুক্ত করে। ফলে গ্যালাটায় অবস্থিত জাগনুস পাশার ক্যাম্প হতে সৈনিকরা সহজে এই পাড়ে যাতায়াতের সুযোগ পায় (Chalcocondylas 46; Ducas 91)। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের এহেন কীর্তিকে খ্রিষ্টান ধর্মযাজক লিওনার্ড তুলনা করেছেন পারস্য সম্রাট প্রথম জেরজেস-এর কীর্তির সাথে, যিনি ৪৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তার বাহিনী নিয়ে এশিয়া হতে থ্রেসে যাওয়ার সময় নৌকাসেতু তৈরি করে বসফোরাস পাড়ি দিয়েছিলেন। ১৪৪
পিপাসেতুর নির্মাণ ও গোল্ডেন হর্নে তুর্কি যুদ্ধ জাহাজের উপস্থিতিতে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার পরিকল্পনা পালটাতে বাধ্য হন। ইতঃপূর্বে তিনি প্রধানত রোমানাস গেটে সর্বাধিক নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। সাগরের দিকে নিরাপত্তার জন্য প্রাচীরই যথেষ্ট ছিল। এখন গোল্ডেন হর্নের দিকেও নিরাপত্তার জন্য সৈনিক মোতায়েন করতে হয়। তারপর চিফ কমান্ডার গিওভান্নিসহ অন্যান্য সমরনায়কদের সাথে পরামর্শ করেন। সবাই একমত হয়, নগর বাঁচাতে হলে গোল্ডেন হর্ন থেকে তুর্কিদের তাড়াতে হবে এবং তা করতে হবে রাতের আঁধারে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
তুর্কি জাহাজের ওপর হামলা দায়িত্ব অর্পিত হয় জ্যাকোমো কোকোর ওপর। কিন্তু তার প্রস্তুতির খবর গ্যালাটার জেনোয়ানদের কাছে পৌঁছে যায়। তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় দুই দিকে সম্পর্ক রাখত। তাদের মারফত সুলতান যথাসময়ে বাইজেন্টাইন অভিযানের সংবাদ পেয়ে যান। জেনোয়ানরা সম্রাটকে অনুরোধ করে অভিযান একদিন পিছিয়ে দিতে-যেন তারাও অংশগ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে সময় পেয়ে সুলতানও তাঁর নৌবাহিনীকে সতর্ক ও প্রস্তুত করতে পারলেন। ২৪ এপ্রিল ভোরে সুলতান আবারও জেনোয়ানদের বার্তা পান। তারপর তিনিও গোল্ডেন হর্নে প্রয়োজনীয় যোদ্ধা ও রসদ পাঠান।
২৮ এপ্রিল অত্যন্ত সঙ্গোপনে বাইজেন্টাইন জাহাজ গ্যালাটা বন্দর ত্যাগ করে। উদ্দেশ্য, গোল্ডেন হর্নে নোঙররত তুর্কি নৌযান ধ্বংস। তাদের রওয়ানার সাথে সাথে গ্যালাটার টাওয়ার শীর্ষে আগুন জ্বলে ওঠে, যেন তুর্কিদের বিপদের খবর দেওয়া হয়। ১৪৫ বাইজেন্টাইন নৌপতি তীব্রগতিতে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
অনেকটা এমন, তিনি তুর্কি জাহাজ ধ্বংস করে বিরাট সাফল্যের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। কিন্তু আচানক দুটো গোলা পরপর তার জাহাজকে আঘাত করে দুই টুকরো করে দেয়। বাইজেন্টাইন বাহিনীর অন্য জাহাজগুলো মনে করে তাদের কমান্ডার এখনও অগ্রসরমান। আরেকটি জাহাজ এগিয়ে যেতেই তুর্কি গোলার মুখে পড়ে। কমান্ডার ও তার সঙ্গীর পরিণতি দেখে বাকি নৌসেনারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়। অনেকে আধ-ডুবা অবস্থায় তুর্কিদের হাতে ধরা পড়ে প্রাণ হারায়।
সম্রাট এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলেন এভাবে, কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের ওপর ২৬০ জন তুর্কি বন্দিকে তুলে তাদের ভাইদের চোখের সামনে তাদের শিরচ্ছেদ করেন। ১৪৬ তারপরও সম্রাট তুর্কি নৌযান ধ্বংসের পরিকল্পনা থেকে সরে এলেন না। এবার দায়িত্ব পড়ে গিওভান্নি গিউস্টিনিয়ানির ওপর। দ্বিতীয় প্রচেষ্টার পরিণতি প্রথমবারের চেয়ে ভিন্ন হয়নি। বিরাটাকার রোমান জাহাজের ওপর তুর্কি নৌযানের শ্রেষ্ঠত্ব বহাল থাকে। গিওভান্নি মৃত্যুর মুখ থেকে কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচেন।
সাগরে নৌবাহিনীর উপর্যুপরি পরাজয়ে অবরুদ্ধ বাইজেন্টাইনবাসীর মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। নিজেদের নৌবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে তাদের দর্প চূর্ণ হয়। হতাশার ছাপ ছড়িয়ে পড়ে সম্রাট, সেনাপতিসহ সকল নাগরিকের মাঝে। অন্যদিক কনস্ট্যান্টিনোপলে অবস্থানরত জেনোয়ান ও ভেনিসিয়ানদের মাঝে শুরু হয় তীব্র বিবাদ। দুই দলকে সমর্থন করতে গিয়ে শহরবাসীও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিতণ্ডার মূল বিষয় ছিল গ্যালাটার নৌযুদ্ধে পরাজয়ের কারণ নির্ণয়। দুই পক্ষই পরস্পরকে দুষছিল। খ্রিষ্টবাদের দোহাই দিয়ে সম্রাট দুই পক্ষকে বিবাদ থামিয়ে আশু বিপদ মোকাবিলায় ভূমিকা পালনের জন্য অনুরোধ করেন।
অপরদিকে পরিকল্পনা মোতাবেক তুর্কিরা নগরপ্রাচীরে আঘাত হানা অব্যাহত রাখে। বাইজেন্টিয়ানরাও দিবানিশি অক্লান্ত শ্রমে ভঙ্গুর দেয়াল মেরামত ও পরিখা পরিষ্করণে ব্যস্ত থাকে। প্রাচীর ছিল দীর্ঘ ও দুর্বল। ওদিকে তুর্কিদের নির্দয় আঘাতও অব্যাহত ছিল। ফলে অবরুদ্ধ শহরের অনেক মানুষ মারা যায়। বাইরের কোনো জনশক্তি আসার সুযোগ না থাকায় তাদের সৈনিক ও স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যাও কমে আসে। এভাবে তারা এপ্রিলের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। একসময় রাজধানীতে খাদ্যপণ্যের, বিশেষত রুটি ও মদের সংকট দেখা দেয়।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সম্রাট দুটি জাহাজ পাঠান ইতালির পানে, উদ্দেশ্য ভেনিসিয়ান নৌবহরের সাহায্য কামনা। বিশেষত মর্মর সাগরের দ্বীপপুঞ্জে অবস্থানরত ভেনিসিয়ান নৌকমান্ডারকে যেন দ্রুত প্রেরণের অনুরোধ করা হয়। কনস্টান্টিনোপলের অস্তিত্বের শেষ আশা ছিল এ পদক্ষেপের সাফল্যের ওপর। কিন্তু সমুদ্র ডেলিগেট জানতে পারে, দ্বীপপুঞ্জের ভেনিসিয়ান নৌবহর ইতোমধ্যে বন্দর ত্যাগ করেছে। ফলে তাদের শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়।
নিবিড় আক্রমণ যুদ্ধের এই পর্যায়ে সুলতান নগর-প্রাচীরে হামলা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। আদেশ মোতাবেক উসমানি বাহিনী নগরপ্রাচীরে হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অনেক জানবাজ সৈনিক প্রাচীর অতিক্রমের ঝুঁকি নিতে গিয়ে প্রাণও হারান। তুর্কি সৈনিকদের তাকবির ধ্বনি-যা তাদের কাছে বজ্রধ্বনি বলে প্রতিভাত হতো- সবচেয়ে বেশি ত্রাস সৃষ্টি করত শহরবাসীর মনে।
প্যাট্রিয়ার্থ ও কমান্ডারগণ মনে করেন, সম্রাটের উচিত হবে শহর ত্যাগ করে ভিন্ন স্থান হতে যুদ্ধ পরিচালনা করা-যাতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে খ্রিষ্টান বিশ্বের সাহায্য প্রার্থনা করতে পারেন। তাদের আশা ছিল, এর মাধ্যমে তুর্কি অবরোধের অবসান ঘটানো যাবে। গিউস্টিনিয়ানি নিজের একটি জাহাজও এ কাজের জন্য প্রস্তুত করেন। কিন্তু সম্রাট প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে, এই বিপদে জনগণের সাথে অবস্থান করাকে তিনি নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন। অতএব, তিনি কিছুতেই শহর ও জনগণ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গমন করবেন না। এ কথা বলার সময় তার গণ্ড বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষিত হয়। অশ্রুসিক্ত সম্রাটকে দেখে উপদেষ্টাদের কেউ-ই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ১৪৭
তবে সম্রাট খ্রিষ্টান রাজাদের নিকট দূত প্রেরণ করেন। প্রতিনিধি দল পাঠানো হলো ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও সকল পশ্চিমা রাজ্যে। বার্তার বিষয়বস্তু পরিষ্কার: 'সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগে তারা যেন খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্যকেন্দ্র রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।' ওদিকে গোল্ডেন হর্নে তুর্কি জাহাজের উপস্থিতির সুযোগে এদিক হতেও অবরোধে কড়াকড়ির সুযোগ আসে। তুর্কিরা গ্যালাটার পশ্চাতে অবস্থিত টিলার ওপরে কামান স্থাপন করে। শুরু হয় গ্যালাটা বন্দরে গোলা নিক্ষেপ। একবার একটি গোলা পড়ে জেনোয়ান বাণিজ্যতরির ওপর। ফলে অন্য জাহাজগুলো দ্রুত পালিয়ে গিয়ে গ্যালাটা প্রাচীরের কাছে আশ্রয় নেয়।
বাহ্যত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনকারী গ্যালাটানরা সুলতানের কাছে অভিযোগ করলে তিনি ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
উসমানি নৌবাহিনীর জাহাজগুলো গোল্ডেন হর্নে একের পর এক হামলা চালাচ্ছিল, কিন্তু শিকল ছিন্ন করার ঈপ্সিত সাফল্য অর্জিত হচ্ছিল না। অন্যদিকে স্থলবাহিনীর আক্রমণও অব্যাহত ছিল। চূড়ান্ত হামলার আগে সুলতান শত্রুদের ক্লান্ত, দুর্বল ও হীনবল করতে চেয়েছিলেন। কনস্ট্যান্টিনোপলবাসী ধীরে ধীরে এই পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল। ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে তারা এমন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তুর্কিদের দ্বারা শহর দখল হওয়ার পর তাদের সাথে কী আচরণ করা হবে, সে চিন্তা ব্যতীত তারা আর কোনো কিছু ভাবতে পারছিল না।
এমন পরিস্থিতিতে সম্রাট দ্বিতীয় সম্মেলন আহ্বান করেন। একজন প্রস্তাব করেন, তুর্কিদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়ে একটি প্যাসেজ তৈরি করা হোক-যাতে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করা যায়। আলোচনার মাঝে একজন সৈনিক ছুটে এসে খবর দেয়, তুর্কিরা লিকুস উপত্যকার ওপর প্রবল আক্রমণ চালাচ্ছে। এ সংবাদে পেয়ে সম্রাট তৎক্ষণাৎ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করে সসৈন্যে নগর-প্রাচীরের দিকে ছোটেন। তার সাথে রিজার্ভ ফোর্সও যোগ দেয়। লড়াই চলে শেষরাত্রি পর্যন্ত। অবশেষে তুর্কিরা অপসারিত হয়।
১৪ মে ১৪৫৩, সুলতান গ্যালাটার টিলাশীর্ষের কামানগুলোকে সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে আনার নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্টে হামলা জোরদার করা। আক্রমণ ও প্রতিরোধ চলে সমান তালে। শহরের রোমান ও ল্যাটিন নাগরিকরা প্রাণপণ লড়াই করে এবারও তুর্কিদের ঠেকিয়ে দেয়। তরুণ সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ অত্যন্ত উদ্ভাবনী বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রায়শ নতুন নতুন যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করে শত্রুদের চমকে দিতেন। তেমনই এক লড়াই ছিল সুড়ঙ্গ যুদ্ধ।
সুড়ঙ্গ যুদ্ধ: যুদ্ধের কৌশল হিসেবে সুড়ঙ্গ খননের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে সুলতানের বাহিনীতে একদল খনিকর্মী সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিল নভো ব্রড হতে আগত এক দক্ষ খনিশ্রমিক। সুলতানের নির্দেশে তারা ১৪টি স্থানে সুড়ঙ্গ খনন করে; উদ্দেশ্য ছিল কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের ক্ষতিসাধন ও শহরে প্রবেশের পথ বের করা। ১৬ মে কয়েকজন অবরুদ্ধ কনস্ট্যান্টিনোপলবাসী ভূতলে তীব্র আওয়াজ শুনতে পায়। সাথে সাথে এ খবর সম্রাট ও তার যুদ্ধপরিষদকে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে।
জার্মানি হতে আগত চৌকস যোদ্ধা জন গ্রান্ট বুঝতে পারেন, তুর্কিরা ভূগর্ভে সুড়ঙ্গ খনন করে মাটির নিচ দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে চাইছে। বাইজেন্টাইন নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয় তুর্কি সুড়ঙ্গের বিপরীতে শহরের অভ্যন্তরে সুড়ঙ্গ খননের। ফলে সুড়ঙ্গপথে শহরে ঢোকামাত্র তুর্কিদের ওপর আক্রমণ করে পরাস্ত করা যাবে। ওদিকে তুর্কিরা এসব পরিকল্পনার কিছুই জানতে পারেনি। তারা সুড়ঙ্গ খনন করতে করতে এক পর্যায়ে গ্রিকদের খননকৃত সুড়ঙ্গে পৌঁছে যায়। শহরে প্রবেশের রাস্তা পেয়ে গেছে মনে করে তারা খুশি হয়। কিন্তু অচিরেই তাদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। শত্রুরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তুর্কিদের দেখামাত্র তারা সুড়ঙ্গের ভেতর বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস, তেল ও দাহ্য পদার্থ ঢেলে দেয়। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও আগুনে পুড়ে মারা যায় অনেক তুর্কি, বাকিরা পালিয়ে বাঁচে। ১৪৮
সুড়ঙ্গ যুদ্ধে বাইজেন্টাইনবাসী জয়ী হলেও তুর্কিদের এ পরিকল্পনা তাদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। পায়ের নিচে আওয়াজ হলে তারা মনে করত, সুড়ঙ্গপথে তুর্কিরা এগিয়ে আসছে। অনেক সময় তাদের মনে হতো, মাটি ফুঁড়ে বুঝি তুর্কি সৈনিকের উদয় হবে! তারা সদা-সতর্ক থাকত এবং ডানে-বামে তাকিয়ে মাঝে মাঝেই চিৎকার দিয়ে উঠত—'এই যে তুর্কি... এটা তুর্কি।' সন্ধ্যায় আবছা ছায়াকে তুর্কি সৈনিক মনে করে তারা পালিয়ে যেত। এভাবে সমস্ত কনস্ট্যান্টিনোপলে ভয়ের রাজত্ব কায়েম হয়। মনে হচ্ছে তারা মাতাল, অথচ মাতাল নয়। কেউ পালাচ্ছে, কেউ আকাশ পানে তাকিয়ে আছে, আরেক দল ভূমি নিরীক্ষা করছে।
ওদিকে প্রথমবারের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও সুলতান সুড়ঙ্গ খননের পরিকল্পনা বাদ দেননি; বরং ‘আকরি কাপি’ হতে গোল্ডেন হর্ন পর্যন্ত প্রলম্বিত সীমানায় আরও সুড়ঙ্গ খননের নির্দেশ দেন। কাজটি সত্যিকার অর্থে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সুড়ঙ্গে অনেক তুর্কি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। কেউ-বা রোমানদের হাতে ধৃত হয়—যাদের একমাত্র পরিণতি ছিল, তাদের কর্তিত মস্তক মুহূর্তের মধ্যেই প্রাচীরের বাইরে নিক্ষিপ্ত হতো। এই কৌশলের তাৎক্ষণিক ফল ছিল না, তবে এটি খ্রিষ্টানদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। তুর্কিদের সাহসিকতা ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা দেখে তারা বিস্মিত হয়।
ত্রিতল কাষ্ঠকেল্লা
ওদিকে সাময়িক ব্যর্থতা সুলতানকে মোটেও হতোদ্যম করতে পারেনি; বরং তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তার গতি বাড়িয়ে দেয়। এবার তিনি এমন এক কৌশল উদ্ভাবন করেন-যা সেই যুগের বিবেচনায় অত্যন্ত অভিনব ও বিরল বলে বিবেচিত হয়েছিল। এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর অবরোধ কৌশল ছিল। একদিন কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীর তো চোখ ছানাবড়া-বিশাল এক কাষ্ঠকেল্লা তাদের সামনে দৈত্যের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে! ত্রিতল কেল্লাটির উচ্চতা শহরের বহিঃপ্রাচীরের চেয়ে বেশি। কেল্লাটির বহিরাবরণ ভেজা মৎস্যচর্মে আচ্ছাদিত-যা আগুন ও তিরের আক্রমণ নস্যাৎ করার জন্য যথেষ্ট। এর প্রতি তলায় ছিল গোলা ও অস্ত্রসজ্জিত সৈনিক। কেল্লার নিচে ছিল মাটি-বালু ও কাঠের টুকরো-এগুলো পরিখা ভরাটের কাজে লাগত। আর কেল্লার ওপরে ছিল আঁটাযুক্ত কতগুলো মোটা দড়ির সিঁড়ি। প্রাচীরের ওপর ফেলে ঝুলন্ত ব্রিজ তৈরি করে সৈন্য পারাপারের জন্য এগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। আর প্রতিটি তলার সৈনিকরা তির-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত ছিল-প্রাচীরের ওপর যখনই কোনো প্রতিরোধকারীর মাথা দেখা যেত, তখনই তারা তির ও বর্শা ছুঁড়ত। ১৪৯
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের কৌশলগুলো বাইজেন্টানিয়ানদের মনে যুগপৎ ভয় ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। এটি দেখে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান। এ সময় তাঁর পরিষদবর্গও সাথে ছিলেন। সম্রাটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভেনিসিয়ান ইতিহাসবিদ নিকোলা বারবারোর প্রতিক্রিয়া-
'কনস্ট্যান্টিনোপলের সকল খ্রিষ্টান একযোগে চেষ্টা করলেও একমাসে এমন একটি কেল্লা নির্মাণ করতে পারবে না, অথচ তুর্কি মুসলিমরা এটি বানিয়েছে এক রাতে; না, বরং চার ঘণ্টারও কম সময়ে। '১৫০
অভিনব ও বিস্ময়কর এ কেল্লাটি স্থাপন করা হয়েছিল সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে-যেটির সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন জেনোয়ান সেনাপতি গিওভান্নি। নতুন কেল্লাটি রোমানদের প্রাচীর সংস্কারে বড়ো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তুর্কিদের গোলা নিক্ষেপের বিরতিতে ইতঃপূর্বে রোমানরা প্রাচীর মেরামত করত। এখন প্রহরীর ন্যায় উঁচু মাথায় দাঁড়িয়ে যায় কাঠকেল্লাটি। ফলে যখনই কোনো খ্রিষ্টান সৈনিক প্রাচীর মেরামতে এগিয়ে আসত, তখনই কেল্লা থেকে তির নিক্ষেপ করে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। একদিন কিছুসংখ্যক তুর্কি সৈনিক দড়ির সিঁড়ি দিয়ে বানানো ঝুলন্ত ব্রিজ দিয়ে প্রাচীর পার হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের অভ্যন্তরে পা রাখে। সাম্রাজ্যের প্রতিরোধ যোদ্ধারা খোদ সম্রাটের নেতৃত্বে প্রাণপণ প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেল্লার ওপর তারা আগুনে গোলা নিক্ষেপ করে। ফলে কাঠকেল্লার বহিরাবরণ আগুনে পুড়ে খসে পড়ে। ধীরে ধীরে আগুন ছড়ায় পুরো কেল্লায়। বুর্জসমতে কেল্লাটি পড়ে যায়। আরেকবার তুর্কিদের অপসারণ করতে সমর্থ হয় বাইজেন্টিয়ামের প্রতিরোধ যোদ্ধারা।১৫১ তুর্কি ইতিহাসবিদ দিয়া শাকির লিখেছেন-
'কাঠকেল্লাটিকে ছাই হতে দেখে মৃদু হাসলেন সুলতান, আর তাঁর প্রকৌশলী মুসলিহুদ্দিনকে বললেন-'আগামীকাল আমরা আরও চারটা বানাব। '১৫২
তুর্কিদের ঠেকিয়ে দিতে পারলেও বাইজেন্টাইনবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর হয় না। এটা খুব স্বাভাবিক। কারণ, প্রবল প্রতাপান্বিত শত্রু চারদিকে শহর ঘিরে রেখেছে। কোনো দিক থেকে কোনো সরবরাহ নেই। পুরোনো ও দুর্বল নগরপ্রাচীর কতদিন ঠেকিয়ে রাখা যায়? অনিবার্য বিপদের মুখে অসহায় মানুষ অলৌকিকতায় বিশ্বাস স্থাপন করে। কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীর হলো একই অবস্থা। নির্মম বাস্তবতা হতে মুক্তি লাভে অনেকে কল্পনাবিলাস ও দিবাস্বপ্নের শরণ নেয়। কেউ কল্পনা করে, হুনিয়াডির নেতৃত্বে হাঙ্গেরির এক বিরাট বাহিনী তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছে। অনেকে ভাবে, সাগরপথে বিরাট এক নৌবহর এসে তাদের মুক্ত করবে। কেউ-বা ধর্মাশ্রয়ী হয়ে এই ভেবে স্বস্তি পায়, শেষ মুহূর্তে দেবদূতরা এসে শত্রুনাশ করবে। তবে এসব কল্পনা হাওয়া হয়ে সময় লাগত না-যখন তারা দেখত যে, বিরাটাকারের তুর্কি কামানগুলো তীব্র নিনাদ সৃষ্টি করে অনবরত আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে যাচ্ছে।
যুদ্ধের এ পর্যায়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার প্রাসাদে একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশটা ছিল খুবই গুরুগম্ভীর। সম্রাটের মুখাবয়বে বেদনা ও ক্লান্তির ছাপ। অর্থোডক্স ধর্মযাজক প্যাট্রিয়ার্খের প্রতিনিধি সম্রাটকে শহর ত্যাগের উপদেশ দেন। ইতঃপূর্বেও সম্রাট নিরাপদ আশ্রয়ে গমনের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। পূর্বের মতো এবারও তিনি জনগণকে বিপদে ফেলে শহর ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে গমনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে শহরে অবস্থানের ঘোষণা দেন। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এমন করুণ পরিস্থিতি ও আবেগঘন পরিবেশে অশ্রু সংবরণ করা কঠিন। সভাসদরাও কাঁদলেন অঝোরে। শোক ও কান্নার এই অধিবেশন যখন চলছিল, তখনও বিকট আওয়াজে নগরপ্রাচীরে গোলা বর্ষিত হচ্ছিল। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় কান্নামগ্ন সম্রাট মূর্ছা যান।
২৬ মে, ১৪৫৩ সাল। কনস্ট্যান্টিনোপলের আকাশে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা। শহরবাসী প্রাকৃতিক এ দৃশ্য কুলক্ষণ বলেই গণ্য করে। হঠাৎ আকাশ হতে প্রচণ্ড আওয়াজে একটি বজ্রের পতন হয় আয়া সোফিয়ার গম্বুজের ওপর। এতে নগরবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। দিবসটির অলক্ষুণতা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো সন্দেহ থাকে না। তাদের প্রাণ হয় ওষ্ঠাগত। এমতাবস্থায় ধর্মযাজকরা আবারও সম্রাটের কাছে গিয়ে তাকে গোপনে দেশত্যাগের আকুল আবেদন জানান। কারণ, ঈশ্বর তাঁর সুরক্ষা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় নগর পতনের সব চিহ্ন সুস্পষ্ট হয়েছে। সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন এ কথা শুনে মূর্ছা গিয়ে ভূপতিত হন। হুঁশ ফিরে এলে সম্রাট বলেন- 'এটি যদি হয় ঈশ্বরের ইচ্ছা, তাঁর ক্রোধ হতে পালাব কোথায়?' সম্রাটেরই যদি হয় এ অবস্থা, সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হয়েছিল-তা সহজেই অনুমেয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শেষ দিনগুলোতে এই ছিল রাজধানীর অবস্থা; ভয়াবহ পেরেশানি, খুনে অস্থিরতা এবং বাস্তবতা হতে বহু দূরের স্বপ্ন।
আবু আইউব আনসারির কবর আবিষ্কার অভিযানের এক পর্যায়ে বিশিষ্ট সাহাবি আবু আইউব আনসারির কবর আবিষ্কৃত হয়। এই মহান সাহাবি ৫৩ হিজরিতে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বিজয়ের পর এখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। পরবর্তীকালে একটি প্রচলিত প্রথা ছিল এই, উসমানি সুলতানগণ অভিষেকের সময় এই মসজিদে উসমান গাজির তরবারি গলায় বেঁধে নিতেন। ১৫৩
সাত সপ্তাহ পার হলো-অবরোধও বহাল এবং যুদ্ধও চলমান। প্রাচীরের বড়ো অংশ খসে পড়েছে, বর্জ্য-আবর্জনায় পরিখাও ভরাট হয়ে গেছে। এতদিনের অবরোধ ও গোলাবর্ষণের পর সুলতানের বুঝতে পারেন, সর্বাত্মক আক্রমণ করতে হলে তিনটি পয়েন্টের কোনো একটি বেছে নিতে হবে। একটি হলো তাকফুর সরাই ও এদিন গেটের মধ্যবর্তী পয়েন্ট। দ্বিতীয়টি হলো রোমানাস গেটের কাছে লিকুস উপত্যকা-এটি ছিল সর্বাধিক আক্রম্য। আরেকটি পয়েন্ট হলো তৃতীয় সামরিক তোরণের কাছে।
শেষবারের মতো দূত প্রেরণ চূড়ান্ত আক্রমণের পূর্বে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইনকে শেষবারের মতো সুযোগ দিতে চাইলেন। বার্তাবাহক হিসেবে তিনি বাছাই করেন দামাদ কাসিম বে ইসফান্দিয়ারকে। এ ব্যক্তির সাথে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। বার্তায় সুলতান জানান-
'যুদ্ধের জন্য আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন। যে কাজ সম্পাদনের জন্য আমরা বহু দিন ধরে উদ্গ্রীব হয়ে আছি, সেটি বাস্তবায়নের সময় এসেছে। আমরা লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব কি না আল্লাহই ভালো জানেন। হয় আমি শহর জয় করব অথবা শহরটি আমাকে জয় করবে; জীবিত বা মৃত। আপনি কি শহর ত্যাগ করবেন? তাহলে আপনাকে আমি নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেবো। আপনার ভাইদের অন্য প্রদেশগুলোতে শাসক হিসেবে বহাল রাখব এবং আমরা মিত্র হিসেবে থাকব। আপনার মন্ত্রীরাও নিজেদের সহায়-সম্পদসহ নগর ত্যাগ করতে পারবে। আপনার প্রজারাও কোনো শাস্তির মুখোমুখি হবে না। আর যদি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখেন, তাহলে আপনি ও আপনার অমাত্যবর্গ জীবন ও সম্পদ হারাবেন। বন্দিত্ব বরণের জন্য আপনার প্রজাদের আমার সৈনিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে, শহরটিই কেবল আমার জন্য থাকবে। '১৫৪
যুদ্ধের এ পর্যায়ে দূত প্রেরণে বিস্মিত হন সম্রাট। তবে তত্ত্বানুন্ধান করে জানতে পারেন, এটি মুসলিমদের ধর্মীয় রীতি। তারা শান্তিপূর্ণভাবে নগর-জয়ের কোনো সুযোগ বাদ দিতে চায় না এবং শত্রুদের জন্য কোনো অজুহাত অবশিষ্ট রাখতে চায় না। ১৫৫ পুরোনো বন্ধুর সাথে সম্রাট মন খুলে কথা বলেন। এস্ফেন্দিয়ারও তাকে বোঝানোর সুযোগ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন-'সুলতানকে প্রতিরোধের কোনো ক্ষমতা গ্রিকদের নেই। গ্রিক-মুসলিম দ্বন্দ্ব নিরসনের এরচেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর আসবে না। সুপ্রতিবেশীসুলভ সদাচরণ চর্চার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বসবাস করার এটাই সুযোগ।' পাশাপাশি সম্রাটকে আরও জানানো হয়, আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হলে অনতিবিলম্বে অভিযান চালানো হবে। ফলে সম্রাট ও নগরবাসী যে নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হবেন, তা ঠেকানোর কেউ থাকবে না।
সম্রাট তার পারিষদের সাথে বসেন। অনেকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব করেন। কারণ, ইতোমধ্যে যুদ্ধের ফলাফল সুস্পষ্ট হয়েছে। তবে গিওভান্নিসহ কয়েকজন সামরিক কমান্ডার জোরালো বক্তব্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ফলে বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণের সকল সম্ভাবনা তিরোহিত হয়। পুরোনো বন্ধুকে সম্রাট এই বলে বিদায় করেন— 'আমরা সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আত্মসমর্পণ নয়; মৃত্যুকে বরণ করব। শহর রক্ষায় প্রাণ বিসর্জন দিতে আমরা কুণ্ঠিত হব না।' সম্রাটের জবাব যখন সুলতানের কাছে পৌঁছল, তখন তিনি বললেন—
'ভালো! হয় কনস্ট্যান্টিনোপলে আমাদের সিংহাসন হবে, নতুবা আমার কবর।' ১৫৬
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ কামানের গোলা নিক্ষেপের তীব্রতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। তাঁর প্রকৌশলীরা নতুন ধরনের কামান আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়—যা থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা অনেক উঁচুতে ওঠে। এটি ছিল অনেকটা আধুনিক যুগের মর্টারের মতো। নব-আবিষ্কৃত কামান হতে অব্যাহতভাবে শহরের কেন্দ্রস্থলে গোলা নিক্ষেপ করা হয়। অনবরত গোলা নিক্ষেপে কিছু কিছু এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নাগরিকদের মনে ব্যাপক ভয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
সুলতানের সর্বশেষ পরামর্শসভা
শেষ মুহূর্তের করণীয় নির্ধারণে সুলতান তাঁর ক্যানোপিতে বৈঠক ডাকেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রীবর্গ, সিনিয়র কমান্ডারবৃন্দ, আলিম ও শাইখবৃন্দ। সবাইকে অকপটে মতামত জ্ঞাপনের জন্য অনুরোধ করা হয়। কেউ কেউ অনতিবিলম্বে চূড়ান্ত হামলা হানার পরামর্শ দেন। অন্যথায় ফলাফলহীন দীর্ঘ অবরোধে সৈনিকদের মাঝে হতাশা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ-বা ভিন্ন পরামর্শ রাখেন। পরামর্শসভার আলোচনার সারমর্ম দুটি পয়েন্টে উপস্থাপন করা যায়—
এক: সুলতানের উজির খলিল আগার পরামর্শ
খলিল আগা ছিলেন সুলতানের পিতার উজির। জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার কল্যাণে তিনি তরুণ সুলতানের মন্ত্রণা পরিষদে জায়গা পান। অনেকে তার বিরুদ্ধে বাইজেন্টাইনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছিল। সুলতান তার সাথে খুব একটা সম্পৃক্ত হতেন না, তবে অভিজ্ঞতার কারণে তাকে স্বপদে বহাল রেখেছিলেন। খলিল আগার প্রস্তাবের সারমর্ম হলো—প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অব্যাহত সরবরাহ এবং গ্রিক ও লাতিনোদের ঐক্যের কারণে এ মুহূর্তে কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করা সম্ভব নয়। সুলতানের পিতা, দাদা ও পূর্বপুরুষ অনেক চেষ্টা করেও এই শহর জয় করতে পারেননি। তা ছাড়া কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন হতে দেখলে খ্রিষ্টানজগৎ নীরব থাকবে না। অতএব, প্রজাদের শান্তিতে থাকতে দিন। জেনোয়ান ও তাদের প্রতিবেশী ভেনিসিয়ানরা তো আপনার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। সুতরাং তাদের শত্রু বানাবেন না। অন্য খ্রিষ্টান জাতিগুলোর মাঝে ক্রোধের সঞ্চার করবেন না। শক্তিতে আপনি মহীয়ান। যুদ্ধ নয়; শান্তির সময়ে আপনি তা আরও বাড়িয়ে নিতে পারবেন। যুদ্ধের সমাপ্তি সব সময় অনিশ্চিত, বিপর্যয় প্রায়শই সমরের সঙ্গী হয়ে থাকে। তাই উত্তম হবে কিছুদিনের অভিযান স্থগিত রাখা-যাতে তুর্কিদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। বিনিময়ে সম্রাটের কাছ থেকে বার্ষিক ৭০,০০০ স্বর্ণমুদ্রা কর দাবি করা যেতে পারে। হয়তো ভবিষ্যতে সহজেই নগর জয় করা সম্ভব হবে। ১৫৭
ফ্লোরেন্সের বণিক টেডালডি (যিনি অবরোধের সময় কনস্ট্যান্টিনোপলে অবস্থান করছিলেন) উল্লেখ করেছেন, খলিল পাশার পরামর্শে প্রভাবিত হয়ে সুলতান অবরোধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন। বিকল্প হিসেবে তাঁর অর্জনের স্মারক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। ১৫৮ তবে জাগনুস পাশার পরামর্শে সুলতানের মনোভাব পরিবর্তিত হয়।
দুই: জাগনুস পাশা আলবানির পরামর্শ আলবেনীয় বংশোদ্ভূত জাগনুস (বা জাগান) পাশা আলবানি একজন নওমুসলিম হলেও জিহাদের ময়দানে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তাই সুলতানের বিশ্বস্ততা অর্জন করে তিনি অনিয়মিত বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছিলেন। খলিল আগা ও তার মাঝে সুপ্ত ঈর্ষা ও তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। তিনি বলেন- 'কেউ সুলতানের বিরাট শক্তির সামনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই গ্রিকদের ওপর হামলা জোরদার করতে হবে। তাদের রসদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে এসেছে। কামান হামলায় প্রাচীর অতিক্রম করা সম্ভব। অতএব, খলিলের উচিত হবে না কুপরামর্শ দিয়ে সুলতানকে বিভ্রান্ত করা। জেনোয়ানরা বিভক্ত, ভেনিস ইতোমধ্যে মিলানের ডিউকের আক্রমণের শিকার। অতএব, কেউ তাদের সাহায্য করতে আসবে না।'১৫৯
তুর্কি বাহিনীর থ্রাসিয়ান কমান্ডের প্রধান তুরাহান জাগনুস পাশাকে সমর্থন করে সুলতানকে অভিযান অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। সেনা কমান্ডারগণও জাগনুস পাশা ও তুরাহানকে সমর্থন করেন। এ প্রস্তাব আলিমদের সমর্থন লাভেও ধন্য হয়। বিশেষত শাইখ আক শামসুদ্দিন ও শাইখ আহমদ আল-কুরানি সোৎসাহে অভিযানের প্রস্তাব সমর্থন করেন। সকলের মতামত অবহিত হয়ে সুলতান মন্ত্রণাসভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। অপেক্ষমাণ উৎসুক জনতা জানল-চূড়ান্ত অভিযান অত্যাসন্ন। ১৬০
২৯ মে চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত হয়। তার পূর্বে সৈনিকদের পরপর তিনদিন সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন সুলতান। ১৬১ উদ্দেশ্য ছিল, তাদের মন পবিত্র করা ও সংকল্প দৃঢ় করা। তিনি নিজে যান গোল্ডেন হর্নের নিকটবর্তী মর্মর সাগরের তীরে নগর-প্রাচীর নিরীক্ষা করতে। কামানের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রাচীরের সর্বাধিক নাজুক পয়েন্টগুলো তিনি পরখ করে দেখেন। তারপর কামান বাহিনীর আর্টিলারি কমান্ডারকে লিকুস উপত্যকার সন্নিকটে নিবিড়ভাবে গোলা নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। অতঃপর ব্যাপক অভিযানের জন্য (হুজুম আম) সৈন্যবিন্যাস সম্পন্ন করেন।
সৈনিকদের মনোবল চাঙা ও অটুট রাখার জন্য সুলতান আকস্মিক দেখা দিয়ে তাদের উৎসাহ দেন। তাদের মাঝে আত্মোৎসর্গের প্রেরণা ও বিজয়ের আশা জাগিয়ে তোলেন। তিনি বলেন- 'যুদ্ধে সাফল্যের পূর্বশর্ত তিনটি; বিজয়াকাঙ্ক্ষা, অপমানের লজ্জা এবং সেনাপতির আনুগত্য। '১৬২
জেনোয়াবাসী যুদ্ধে সম্পৃক্ত না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে অবরুদ্ধ শহরে কোনোরূপ সাহায্য প্রেরণ করা থেকে তাদের বিরত থাকতে বলেন সুলতান। তবে যুদ্ধে জেনোয়ার কোনো ক্ষতি হলে তার ক্ষতিপূরণ প্রদানের ওয়াদা করেন। তারপর সৈনিকদের মাঝে ঘোষণা দেন, শহরটি তিন দিনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে; তবে শহরের স্থাপনা ও প্রাচীর ধ্বংস করা যাবে না।
গনিমতের প্রতিশ্রুতি সৈনিকদের আগ্রহ ও প্রতিজ্ঞা আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারেও সুলতান তাদের সতর্ক করেন। যুদ্ধের ময়দানে কমান্ডারের পূর্ণ আনুগত্য যেন বজায় রাখে। কেউ যেন অনুমতি ব্যতীত স্বস্থান ত্যাগ না করে। শৃঙ্খলাভঙ্গের শাস্তি সম্পর্কেও তিনি সৈনিকদের হুঁশিয়ার করে দেন।
২৭ মে রাতের বেলায় সুলতানের নির্দেশে পুরো ক্যাম্পজুড়ে বাতি জ্বালানো হয়। বর্শাগ্রেও জ্বালানো হয় শত শত মশাল। বিরাট অগ্নিশিখা প্রজ্জলিত হয়, আর কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠে আকাশে। সাথে সাথে ব্যাপক শোরগোল, তবলা ও দামামা বেজে ওঠে। ফলে সৃষ্টি হয় এক অসাধারণ দৃশ্য। বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ ডুকাস এ দৃশ্যের বিবরণ দিয়ে বলেন—
'জলে ও স্থলে বিস্তৃত সেই আগুনের আলো যেন কনস্ট্যান্টিনোপল, জেনোয়া, তথাকার নৌযান ও স্কুটারির (বর্তমান উদ্বুদার) পশ্চাতে নোঙরকৃত জলযানের ওপর সূর্যের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে প্রতিভাত হয়। জলের পৃষ্ঠতল এমনভাবে ঝলমল করে, তা যেন বজ্রের ঝলকানিতে চমকিত।'
তুর্কি শিবিরে আগুন লেগেছে মনে করে প্রথমে খুশি হয়েছিল কনস্ট্যান্টিনোপলবাসী; কিন্তু প্রকৃত বিষয় বুঝতে পেরে অচিরেই তাদের আনন্দ পরিণত হয় বিষাদে।১৬৩ সার্বিক প্রস্তুতির তত্ত্বাবধানে কেটে যায় সুলতানের পরের দিন। এক ফাঁকে তিনিও প্রাচীর নিরীক্ষা করে আসেন। বাশাকতাসে তুর্কি নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন আমিরুল বাহর হামজা পাশা সমভিব্যহারে। সর্বাত্মক আক্রমণে (হুজুম আম) নৌবহরের সকল জাহাজ যেন অংশ নেয়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। সুলতান আরও নির্দেশ দেন ওয়ার ফ্রিগেটের একাংশ যেন মর্মর সাগর সংলগ্ন নগরপ্রাচীরের কাছে মোতায়েন করা হয়-যাতে যোদ্ধারা প্রয়োজনে নৌযান ব্যবহার করে প্রাচীর পাড়ি দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে পারে।
সর্বাত্মক অভিযানের নৈকট্য বুঝতে পেরে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন (২৮ মে) মহা প্রার্থনাসভার আয়োজন করেন। শহরে বিরাট এক শোভাযাত্রা বের হয়-যাতে অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক ধর্মগুরু, শিশু, নারী ও পুরুষরা অংশ নেয়। নগর প্রদক্ষিণকালে ঈশ্বরের করুণা লাভের আশায় তারা কুমারী মাতা মেরির পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন বহন করে। সকরুণ রোদনে বিষাদময় ধর্মগীতই (হে ঈশ্বর! আমাদের ওপর দয়া করো!) ছিল তাদের স্লোগান। ঈশ্বরের কাছে তাদের একমাত্র প্রার্থনা ছিল, তিনি যেন ধ্বংসের হাত থেকে তাদের রক্ষা করেন এবং বিপদ হতে উদ্ধার করেন। ১৬৪
নগর প্রদক্ষিণ শেষে শোভাযাত্রা যায় প্রাচীরের দিকে। যাজক ও পুরোহিতরা কুমারী মাতা মেরির প্রতিকৃতি নিয়ে রোমানাস গেটের কাছে প্রাচীরের ওপর আরোহণ করেন। এ সময় পুরো সমাবেশে বিরাজ করছিল পিনপতন নীরবতা।
পারিষদবেষ্টিত হয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন উপস্থিতিকে সম্বোধন করে ভাষণ দেন। জনগণকে তিনি ধৈর্যধারণ ও মাতৃভূমির জন্য আত্মোৎসর্গ করার আহ্বান জানান। তারপর জেনোয়ান ও ভেনিসিয়ানদের দিকে ফিরে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তাদেরও মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও খ্রিষ্টধর্ম রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সিংহাসনের মর্যাদা রক্ষায় আমৃত্যু লড়াই করার প্রত্যয়ও ঘোষণা করেন সম্রাট। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষণ শেষ করে সম্রাট কান্নায় ভেঙে পড়েন। উপস্থিতির মধ্যে এমন কেউ ছিল না-যার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়নি। সর্বসাধারণের কাছে মনে হয়, পৃথিবীর আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। করুণ রোদনে তারা তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঈশ্বরের সাহায্য কামনা করে। কারণ, তারা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে।
ওই দিন সন্ধ্যায় আয়া সোফিয়ায় মহা প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। প্রসিদ্ধ গির্জায় এটিই ছিল সর্বশেষ প্রার্থনা। প্রার্থনার সময় কেমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছি, তা সহজেই অনুমেয়। ফ্রান্টেজ লিখেছেন-
'কান্না ও রোনাজারির বিবরণ কে দেবে? সেই পরিবেশে, এমনকী কাষ্ঠ ও প্রস্তরনির্মিত মানুষও কান্না সংবরণ করতে পারত না।'১৬৫
২৯ মে, মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে সর্বব্যাপী আক্রমণ (হুজুম আম) শুরু হয়। বেজে উঠল যুদ্ধ ঘোষণাকারী নাগারা। তুর্কি ডঙ্কার আওয়াজ শুনে কনস্ট্যান্টিনোপলের গির্জায়ও বেজে উঠে ঘণ্টাধ্বনি। কিন্তু তা কেবল শহরবাসীর ভয়-ই বাড়িয়ে দেয়। অনেকে ত্রস্তপদে আশ্রয় নেয় গির্জায়। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে অটোমান বাহিনী জলে ও স্থলে যুগপৎ হামলা চালায়।
সুলতান তাঁর বাহিনীকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করেন। প্রথম অংশে ছিলেন রোমেলি যোদ্ধারা; যাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন জার্মান, হাঙ্গেরি, গ্রিক ও ইতালির খ্রিষ্টান যোদ্ধারা। এই গ্রুপের একবারে সামনের কাতারে ছিল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধারা। অগ্রসরমান দলটি প্রাচীর হতে এক তিরের দূরত্বে পৌঁছে থামে। তারপর শুরু হয় বৃষ্টির ন্যায় তির নিক্ষেপ। ওদিকে আর্টিলারি বাহিনী কামান থেকে অনবরত গোলা নিক্ষেপ করছিল প্রাচীরে। প্রতিরোধকারীরাও প্রতিরোধ করছিল সমানতালে।
এরপর আসে তুর্কি বাহিনীর দ্বিতীয় দল। অব্যাহত তিরবৃষ্টির নিচেই তারা প্রাচীরে অনেকগুলো সিঁড়ি স্থাপন করে। কিন্তু বাইজেন্টাইন যোদ্ধারা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রস্তর নিক্ষেপ করতে থাকায় সিঁড়ি উলটে বহু তুর্কি সৈন্য ভূপতিত হয়। অনেকে মারা পড়ে। কিন্তু এতেও তারা দমে না। সিডি দিয়ে প্রাচীর পার হওয়ার জন্য তারা অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। এভাবে দুই ঘণ্টা লড়াই চলার পর সুলতান যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেন।
তুর্কি সৈন্যদের পশ্চাদপসরণ দেখে বাইজেন্টাইন সৈন্যদের মাঝে একটু শৈথিল্য আসে। আর তখনই সুলতান তাঁর বাহিনীর দ্বিতীয় দল তথা আনাতোলিয়ান কমান্ডকে একই পয়েন্টে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার প্রতিরক্ষা রেখার নড়বড়ে অবস্থা উপলব্ধি করতে পারেন। তারপরও গিওভান্নি ও তার বর্মধারী সৈনিকরা গোলা ও তিরের সাহায্যে প্রাণপণ প্রতিরোধ চালিয়ে যান। তুর্কিদের বেশ কিছু সিঁড়ি রোমানরা এমনভাবে উলটিয়ে দেয় যে, বহু তুর্কি সৈনিক তার নিচে চাপা পড়ে।
তারপর সুলতান আবারও পদাতিক বাহিনী সরিয়ে আর্টিলারিকে কামান দাগাতে বলেন। এবার প্রাচীরের আরও কাছ থেকে গিওভান্নি বাহিনীর ওপর গোলা ফেলা হয়। ঘন ধোঁয়ার নিচে তুর্কি সৈন্যরাও ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু প্রতিরোধ যোদ্ধারা অটল পাহাড়ের ন্যায় অনড় হয়ে থাকেন।
ওদিকে সাগরেও চলছিল লড়াই। অ্যাডমিরাল হামজা পাশার নেতৃত্বে তুর্কি নৌবাহিনীর প্রধান অংশ অবস্থান করছিল মর্মর সাগরে। গোল্ডেন হর্নেও ছিল কিছু তুর্কি যুদ্ধযান। তুর্কি জাহাজের পাটাতন থেকে মই লাগিয়ে এবং প্রাচীরে আন্টাযুক্ত দড়ি লাগিয়ে প্রাচীর অতিক্রমের চেষ্টা করছিল নৌ-সেনারা। ওদিকে বাইজেন্টাইন সৈনিকরা আগুয়ান তুর্কি সৈনিকদের ওপর তির, বর্শা ও গরম তেল নিক্ষেপ করছিল। সত্যিকার অর্থে এটি ছিল একটি প্রাণান্তকর লড়াই। একদিকে রোমানরা মাতৃভূমি রক্ষার্থে জানবাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, অপরদিকে বহুবার ব্যর্থ হওয়ার পর তুর্কিরা এবার সফল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। শহরের উত্তর দিক দখলের চেষ্টা করছিলেন কারাজা বেগের বাহিনী। তার সৈনিকদের প্রবল আক্রমণে বাইজেন্টাইন সৈন্যরা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। কিছু সৈনিক নগরপ্রাচীর পার হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। হাতাহাতি লড়াইয়ে বহিঃপ্রাচীরের এই অংশের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত বাইজেন্টাইন কমান্ডার নিহত হলে তার অধীনস্থ সৈন্যরা পালিয়ে যায়। তারপর ভাঙা প্রাচীরের ছিদ্রপথে তুর্কি যোদ্ধারা প্রবল স্রোতের বেগে শহরে ঢুকতে শুরু করে।
তুর্কি বাহিনীর জেনিসেরি সৈন্যরা এতক্ষণ অব্যবহৃত ছিল। শহরে প্রবেশের একটি পথ উন্মুক্ত হওয়ায় সুলতান তাদের এদিক দিয়ে শহরে অভিমুখে মার্চ করার নির্দেশ দেন। স্রোতের বেগে জেনিসেরি সৈন্যরা লিকুস উপত্যকার দিকে ধেয়ে যায়।
তাকবির ধ্বনি দিয়ে তারা অন্তঃপ্রাচীরের দিকে এগিয়ে যায়। জেনিসেরিদের একটি দল শহরে পৌঁছে রোমান সাম্রাজ্য ও ভেনিসিয়ান পতাকা নামিয়ে অটোম্যান পতাকা লাগিয়ে দেয়। এই দিন প্রত্যুষে বাইজেন্টাইন বাহিনীর চিফ কমান্ডার গিওভান্নি গিওস্টিনিয়ানি গোলার আঘাতে গুরুতর আহত হন। কাউকে স্থলাভিষিক্ত না করে এবং সম্রাটের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি শল্যচিকিৎসকের সেবা নেওয়ার জন্য জাহাজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। তার জন্য নগরের একটি তোরণ খুলে দেওয়া হলে সেপথে যেমনিভাবে তুর্কিরা শহরে প্রবেশের সুযোগ পায়, তেমনি হতোদ্যম গ্রিক সৈন্যরাও পালিয়ে যায়।
গোল্ডেন হর্নের শেকলের পেছনে নোঙর করা নিজস্ব জাহাজে গিয়ে যখন গিওভান্নি শুনতে পান, কনস্ট্যান্টিনোপল তুর্কি সৈন্যে সয়লাব হয়ে গেছে, তখন তার অনুসারী সৈনিক ও নাবিকদের ফিরে আসার আদেশ দিয়ে ঢাক পেটানোর আদেশ দেন। তারপর Chios দ্বীপে পালিয়ে যান। সেখানে হয় আঘাতের প্রভাবে অথবা মনস্তাপে তার মৃত্যু হয়; যদিও কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের অভ্যন্তরে তলোয়ার হাতে লড়াই করে গৌরবের মৃত্যু বরণ করার সুযোগ এসেছিল তার সামনে। কারও মতে-যাত্রাপথেই তার মৃত্যু হয়। তবে হাসলাক লিখেছেন-ওই দ্বীপে এখনও তার সমাধি বিদ্যমান রয়েছে। ১৬৬
কমান্ডার-ইন-চিফ গিওভান্নি গিউস্টিনিয়ানি যখন আহত অবস্থায় পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সম্রাট উজ্জীবনী ভাষণে তাকে ফেরাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত না করে জেনোয়ান অভিযাত্রী পালিয়ে যান। এতে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তারা বিশৃঙ্খল অবস্থায় পালাতে থাকে। এমতাবস্থায় রাজধানীর পতনের ব্যাপারে সম্রাট নিশ্চিত হন। গ্রেফতার হওয়ার লজ্জা এড়ানোর জন্য তিনি চিৎকার দিয়ে বলেন-'ঈশ্বরের দোহাই! আমার জোয়ান সৈনিকদের মাঝে এমন কেউ কি নেই, যে আমার তরবারি দিয়ে আমার জীবনের সমাপ্তি টানবে?' কিন্তু তাকে ফেলে সবাই পালিয়ে যায়। এক পর্যায়ে দুজন তুর্কি যোদ্ধার আঘাতে সাধারণ সৈন্যের মতো মৃত্যু হয় সর্বশেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন ড্রাগাসেসের। ১৬৭
সম্রাট নিহত হওয়ার পর তুর্কি অগ্রযাত্রায় আর কেউ বাধা হতে পারল না। ঢেউয়ের ন্যায় তুর্কিরা আছড়ে পড়তে থাকে কনস্ট্যান্টিনোপলে। ওদিকে সমানতালে চলছিল নৌযুদ্ধ। কনস্ট্যান্টিনোপল যখন তুর্কি সৈন্যে সয়লাব, তখনও পোতাশ্রয় রক্ষাকারী শিকলের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইতালীয় যুদ্ধতরির হাতে। কিন্তু নগরের পতন দেখে প্রতিরোধ নিরর্থক জেনে তারা পিছু হটে। ওই সময় সমুদ্রতীরে সহস্র পলায়নপর মানুষের ভিড়। সেই তুলনায় নৌযানদের সংখ্যা অনেক কম। তাই ভেনিসিয়ান জাহাজগুলো যতটা সম্ভব স্বদেশি শরণার্থী বহন করে পালিয়ে যায়। হুড়োহুড়ি করে ছোটো নৌকায় আরোহণ করতে গিয়ে নৌযান উলটে অনেকে ডুবে মারা যায়। এমন বিহ্বল পরিস্থিতিতে যেমনটি হয়, প্রতিটি মানুষ কোনোরূপ শৃঙ্খলা ছাড়াই যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়। এমনকী সুলতানের বারংবার প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা না রেখে অনেক জেনোয়ান মূল্যবান সম্পদ নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যায়।১৬৮
এভাবে যুদ্ধ ও লড়াইয়ে পূর্ণ ৫৪ দিন পার হওয়ার পর সুরক্ষিত বাইজেন্টাইন রাজধানীর পতন হয়, এমন এক বীর সুলতানের হাতে-যার বয়স মাত্র ২৩। এই তরুণ উসমানি সুলতান মুসলমানদের বহুদিনের আরাধ্য এক স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। কনস্টান্টিনোপল জয়ের ব্যাপারে রাসূল ﷺ সুসংবাদ দিয়েছিলেন আটশো বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ে বহু মুসলিম শাসক রাসূলের সেই সুসংবাদ বাস্তবায়নের গৌরব অর্জনের লক্ষ্যে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা সবাই ব্যর্থ হন। অবশেষে আটশো বছর পর এক তরুণ সুলতানের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সেই সুসংবাদ বাস্তবায়িত করেন। কনস্ট্যান্টাইন দ্যা গ্রেট বাইজেন্টিয়ামে যে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন, সেই রাজধানী ও সাম্রাজ্যের পতন হয় সর্বশেষ কনস্ট্যান্টাইনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।
তুর্কি সৈন্যে সয়লাব
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশ্ববিশ্রুত রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপলের বহিঃপ্রাচীর ও অন্তঃপ্রাচীরের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে পড়ার পর তুর্কি সৈন্যরা বানের স্রোতের বেগে চারদিক থেকে প্রবেশ করতে থাকে। নগরবাসী প্রথমে ভয়ই পেয়েছিল। সম্রাট ও তার দেহরক্ষীরা নিহত হয়েছেন। অভিজাত ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকে মারা পড়েছেন। কেউ কেউ নিজের গায়ের চামড়া নিয়ে পালিয়েছেন। দুঃখ, বেদনা ও হতাশায় অনেকে মারা যায়। কেউ-বা আত্মহত্যা করে। হুড়োহুড়ি করে বন্দরের দিকে পালাতে গিয়ে বহু মানুষ-বিশেষত নারী ও শিশু পদদলিত হয়েও মারা যায়। অনেকে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে অজানা ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায় পড়ে থাকেন। বহু নারী-পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নেয় আয়া সোফিয়ায়। তাদের আশা ছিল, সাধুসন্তরা তাদের বাঁচাবেন।
দেবদূতরা এগিয়ে আসবেন বিধর্মী দলনে। গির্জায় প্রবেশের পর তার এর দরজা বন্ধ করে দিয়ে যীশু ও মাতা মেরির কাছে প্রার্থনা করতে থাকে। তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, উসমানি তুর্কিরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর জাতি; পরাজিতদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।১৬৯
তাদের এমন ধারণা ও বিশ্বাসের যুক্তিসংগত কারণ ছিল। বিজয়ী বাহিনী বিজিতদের সাথে কেমন আচরণ করে, তা তাদের অজানা নয়। আড়াই শতাব্দী আগে স্বজাতির ক্রুসেডাররা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে যে ধ্বংসলীলা ও লুটপাট চালিয়েছিল, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তারা শুনে এসেছে। তুর্কিরা তো বিধর্মী, অতএব, তাদের পক্ষ থেকে আরও নিষ্ঠুর ও নির্মম ব্যবহারের আশঙ্কা অযৌক্তিক ও অবান্তর নয়।
তুর্কি সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করে। ইতোমধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, দুই পক্ষেই বহু মানুষ নিহত হয়েছে। শহরে প্রবেশে পর তারা অবশিষ্ট প্রতিরোধ পকেটগুলো ধ্বংস করে। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। কারণ, অনেক যোদ্ধা ও সাধারণ নাগরিক প্রাচীর থেকে পালিয়ে এসে ঘরের ছাদে বা গলির মুখে লুকিয়ে তুর্কি সৈন্যদের ওপর তির, বর্শা, কাষ্ঠখণ্ড, পাথর ও আগুনে গোলা নিক্ষেপ করছিল। তাই শহরে প্রবেশের পরও মুসলিমদের শত্রুনিধন অব্যাহত রাখতে হয়।
পূর্বঘোষণা অনুসারে-শহরটি তিনদিন হালাল ছিল। এ সময় তুর্কিরা বহু গনিমত লাভ করে এবং অনেক নারী-পুরুষকে বন্দি করে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের পর বিজিত নগরে কমবেশি ধ্বংসলীলার চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। অনেক ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ (যেমন-Fyodor Ivanovich Uspensky ১৮৪৫-১৯২৮) মনে করেন, ১২০৪ সালে ক্রুসেডাররা স্বজাতীয় শহর কনস্ট্যান্টিনোপল দখলের সময় যে নিষ্ঠুর ধ্বংসলীলার স্বাক্ষর রেখেছিল, সেই তুলনায় ১৪৫৩ সালের কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়াভিযানে তুর্কিরা যথেষ্ট নম্র ও মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছে। ১৭০
এ সময় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ শহরের বাইরে অবস্থান করে তৃপ্ত নয়নে বিজয়দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। সুরক্ষিত নগরী-যা বহু বিজেতাকে প্রতিরোধ করেছে-তা আজ তাঁর পদানত। কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরে উড়ছে তুর্কি নিশান। সৈন্যরা ঘোড়া হাঁকিয়ে তুর্কি পতাকা উড়িয়ে ছুটোছুটি করছে-নয়ন ভরে এ দৃশ্য উপভোগ করেন সুলতান। ঘনিষ্ঠ সভাসদের অভিনন্দনে সিক্ত হন তিনি। বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ সুলতানের সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল-'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর! আল্লাহ শহিদগণকে রহমত করুন, মুজাহিদদের মর্যাদা দান করুন এবং আমার জাতিকে গৌরবান্বিত করুন।'
কনস্ট্যান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন
বিজয়ের পর কনস্ট্যান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন করে ইসলামবুল (ইসলামের নগরী) রাখা হয়। কালক্রমে তুর্কি ভাষার প্রভাবে নামটি ইস্তাম্বুলে পরিণত হয়। Ehrlich অবশ্য ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন-'ত্রয়োদশ শতকে কনস্ট্যান্টিনোপলের নাম হিসেবে আরবরা eis ten polin ব্যবহার করতে শুরু করে। এটি মূলত একটি গ্রিক বাক্যাংশ- যার অর্থ হয় in the city। কয়েক শতাব্দীর প্রচলনের ফলে ধ্বনিগত পরিবর্তন সাধিত হয়ে eis ten polin রূপান্তরিত হয়ে Istanbul-এ পরিণত হয়।'১৭১
বিজয়ী সুলতানের নগর প্রবেশ
দ্বিপ্রহরের পর বিজয়ী সুলতান মুহাম্মাদ জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রাসহ ঘোড়ায় চড়ে রোমানাস গেট দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন। তাঁর সাথে ছিল মন্ত্রীবর্গ এবং জ্যেষ্ঠ সেনাপতিবৃন্দ। শহরের জাঁকজমকপূর্ণ দালান ও প্রাচীন নিদর্শনাদি তাঁকে বিস্মিতই করে। শোভাযাত্রার চারপাশে দাঁড়ানো তুর্কিদের ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হচ্ছিল-'মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, আমাদের সুলতান দীর্ঘজীবী হোন, আমাদের সুলতান দীর্ঘজীবী হোন!'
মধ্যশহরে পৌঁছে সুলতান থামেন এবং উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি পরিষ্কার আরবিতে রাসূল ﷺ-এর সুসংবাদবাহী হাদিসটি উল্লেখ করেন। আর এই গৌরবের অংশ হওয়ায় সবাইকে অভিনন্দিত করেন। তিনি উপদেশ দেন দৃঢ়তা, আমানতদারি, উন্নত চরিত্র ও সদাচরণ এবং শহরবাসীর সাথে নম্র আচরণের। হত্যা ও লুটতরাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশও দেন সুলতান। ঐতিহাসিক এই দিন থেকে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ 'ফাতিহ' উপাধিতে ভূষিত হন। আরবি শব্দ ফাতিহ-এর অর্থ বিজয়ী।
বিজয়ী শোভাযাত্রা এগিয়ে যায় কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রধান গির্জা আয়া সোফিয়ার দিকে। কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রধান গির্জার অভ্যন্তরে বহু শিশু ও নারী-পুরুষ আশ্রয় নিয়েছিল। স্পেনীয় শহরগুলোর পতনের সময় মসজিদে আশ্রয় নেওয়া মুসলমানরা যে আচরণের শিকার হয়েছিলেন, এই শহরের খ্রিষ্টানদের তেমন অভিজ্ঞতা হয়নি। আশ্রয় গ্রহণকারীদের সাথে কোনোরূপ দুব্যবহার না করে সুলতানের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে বিজয়ী সৈনিকরা। গির্জাফটকের কিছুটা দূরে সুলতান ফাতিহ ঘোড়া থেকে নামেন। তারপর একটু ঝুঁকে মাটি নিয়ে মাথায় লাগান। ফটকের কাছে গেলে তিনি সকরুণ রোদন ও প্রার্থনার আওয়াজ শুনতে পান। সুলতান সুরক্ষিত প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যান। তাঁর আগমনের খবর পেয়ে ফটকের দুই পাল্লাই খুলে দেওয়া হয়। বিরাট পাগড়ি মাথায় সুলতানকে দেখতে পেয়ে লোকজন ভয়ে কুঁকড়ে যায়। তাদের প্রার্থনাধ্বনি বন্ধ হয়ে যায়। ১৭১ সবাই অনিবার্য পরিণতির ভয়ে কম্পমান। সুলতান এগিয়ে যান গির্জাবেদির দিকে। সেখানে অর্থোডক্স পুরোহিতরা তাঁর মুখোমুখি হন। ভীত পুরোহিতদের কেউ-বা টেবিল ও পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। সুলতান তাদের শুধু অভয়ই দেন না; বরং সুরক্ষার ওয়াদাও দেন। প্রধান যাজককে নির্ভয়ে পূর্ববৎ প্রার্থনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আল্লাহর প্রশংসায় সুলতান আবারও সিজদাবনত হন। তারপর প্রার্থনারত ব্যক্তিদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তাসহ নিজ নিজ ঘরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৭৩
অতঃপর সুলতানের নির্দেশে এক মুয়াজ্জিন আয়া সোফিয়ার বেদিতে উঠে আজান দেন। প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত গির্জার বেদিতেই সর্বপ্রথম আজানের আওয়াজ বুলন্দ হয়। সেদিন থেকেই এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান মসজিদে পরিণত হয়। তুরস্ক সরকার কর্তৃক ১৯৩৪ সালে জাদুঘরে রূপান্তরের পূর্ব পর্যন্ত এটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৭৪ তারপর সুলতান ঘোষণা দেন, এই প্রাচীন স্থাপনার মসজিদে রূপান্তরের অভিষেক হবে পরবর্তী জুমার সালাত আদায়ের মাধ্যমে। সাথে সাথে কাজে লেগে যায় নির্মাণ শ্রমিকরা। ক্রুশ নামিয়ে, সেন্ট ও নানদের ছবি অপসারণ করে এবং দেয়ালে চুনকাম করে গির্জাটির অংশীবাদী চিহ্ন দূর করা হয়। এভাবে গির্জাটি মসজিদের উপযুক্ত হয়। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে কনস্ট্যান্টিনোপলের খ্রিষ্টান জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় এবং মুসলিমদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শহরের অর্ধেক গির্জা মসজিদে রূপান্তর করা হয়। বাকিগুলো গির্জা হিসেবে বহাল থাকে। ১৭৫
এবার সুলতানের গন্তব্য হয় সম্রাটের প্রাসাদ। এখানে তিনি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পান। সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন, প্রধান সেনাপতি গিওভান্নি ও গ্রান্ড ডিউক লুকাস নোটারাস-এর পরিণতি সম্পর্কে জানতে চান সুলতান। তাদের মাঝে কেবল নোটারাসকে পাওয়া যায়। তিনি অবরোধের সময় শহরের বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান ছিলেন। সুলতান তার সাথে ভালো আচরণ করেন। সুলতানের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সম্রাটের পরিণতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। আর গিওভান্নি আহত হয়ে গোল্ডেন হর্নে নোঙর করা এক জাহাজে উঠে পালিয়েছেন-এতটুকুই জানেন।
নোটারাস, তার পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করেন সুলতান। একই সঙ্গে তিনি সম্রাটের সন্ধানে একদল লোককে রোমানাস গেটে এবং আরেক দলকে গিওভান্নির খোঁজে গোল্ডেন হর্নে প্রেরণ করেন।
ইতোমধ্যে এক সার্ব সৈনিক ধূলি ও রক্তমাখা একটি মস্তক নিয়ে এসে দাবি করে-এটি নিহত সম্রাটের মুণ্ড। নোটারাসের সত্যায়নে ফাতিহ নিশ্চিত হন, এটি সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের কর্তিত মস্তক। মৃত সম্রাটের লাশের সাথে এমন আচরণ দেখে সুলতান ব্যথিত হন। যথাযোগ্য মর্যাদায় সম্রাটের দেহ সমাহনের নির্দেশ দেন সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ। ১৭৬
সর্বশেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন পরাজিত হয়েছেন বটে, তবে তিনি কাপুরুষ ছিলেন না। সাম্রাজ্য, স্বজাতি ও স্বধর্মের জন্য তিনি জানবাজ সৈনিকের মতো সম্মুখসমরে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক সম্রাট ও রাজা-বাদশাহর নাম পাওয়া যায়-যারা সম্পদের বিনিময়ে কিংবা শুধু নিজ প্রাণের বিনিময়ে সাম্রাজ্য বিক্রি করেছে কিংবা জনগণকে বিপদে ফেলে পালিয়ে গেছে। কিন্তু বারংবার অনুরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন প্রজাদের ছেড়ে পালিয়ে যাননি।
নোটারাসের কাছ থেকে বাইজেন্টাইন প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করেন। তারপর সম্রাটের আত্মসমর্পণ না করার কারণ জানতে চান। উত্তরে নোটারাস জানান, ভেনিস ও জেনোয়া সর্বদা সম্রাটকে আত্মসমর্পণ না করতে উৎসাহিত করেছে। তা ছাড়া সুলতানের প্রথম উজির খলিল পাশাও পত্র মারফত সম্রাটকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সমকালীন রোমান ধর্মযাজক ও গ্রিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে যারা কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের ইতিহাস লিখেছেন, তাদের প্রায় সকলে সুলতানের প্রথম উজির খলিল পাশাকে খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাদের বিবরণে দেখা যায়—খলিল পাশার মাধ্যমেই সুলতানের শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বাইজেন্টাইন সম্রাট জানতে পারতেন। তিনিই সম্রাটকে প্রতিরোধযুদ্ধে সুদৃঢ় থাকার পরামর্শ দিয়ে বলতেন, পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলোর মতো এবারও কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। চূড়ান্ত অভিযানের পূর্বে আয়োজিত পরামর্শ সভায়ও খলিল পাশা অবরোধ তুলে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সম্ভবত এসব কারণে সুলতান ফাতিহের মনে খলিল পাশার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়। বিজয়ের দুদিন পর ১ জুন খলিল পাশাকে পদচ্যুত ও গ্রেফতার করে এদিনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১০ জুলাই তা কার্যকর করা হয়। ১৭৭
কনস্ট্যান্টিনোপলের বাসিন্দাদের সাথে সুলতান কোমল আচরণই করেন। বন্দিদের সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেন তিনি। অনেক বন্দিকে সুলতান মুহাম্মাদ নিজ অর্থে মুক্ত করেছেন—বিশেষত গ্রিক প্রিন্স ও ধর্মযাজকদের। তারপর সুলতান বিশপদের সাথে বৈঠকে বসেন। তাদের ভয় দূর করা হয়। খ্রিষ্টানদের উপাসনালয়ের সুরক্ষা ও স্বাধীনভাবে ধর্মপালনের নিশ্চয়তা দেন তিনি। পরদিন অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু তথা প্যাট্রিয়ার্থকে বরখাস্ত করেন। গির্জাপরিষদকে নতুন প্যাট্রিয়ার্থ নির্বাচনের নির্দেশ দেন। তারা গেন্নাদিয়াসকে (Gennadius II) নতুন প্যাট্রিয়ার্থ হিসেবে নির্বাচন করেন। নয়া যাজকপ্রধান বিশপদের নিয়ে শোভাযাত্রাসহ সুলতানের প্রাসাদে যান। ইতোমধ্যে সুলতান সম্পর্কে তাঁর ধারণাই পালটে গেছে। তিনি অনুভব করেন, তিনি একজন শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, মার্জিত সুলতানের সামনে বসে আছেন—যিনি সুদৃঢ় ধর্ম, উচ্চতর মানবিকতা এবং পরিপূর্ণ পৌরুষের অধিকারী।
সুলতান মুহাম্মাদ অর্থোডক্স প্যাট্রিয়ার্থের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি পুনর্নির্ধারণ করেন—তাকে রোমান নাগরিকদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারের অধিকার দেওয়া হয়। এজন্য গির্জার যাজকদের নিয়ে একটি পরিষদ গঠন করা হয়। প্রদেশসমূহের খ্রিষ্টান নাগরিকদের জন্যও অনুরূপ বিধান জারি করা হয়। বিপরীতে তাদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ করা হয়। তবে যাজক ও উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের এ কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১৭৮
প্যাট্রিয়ার্থকে বিদায় জানাতে গিয়ে সুলতান উঠে দাঁড়ান। তারপর তাঁকে সুদর্শন ঘোড়ায় আরোহণে সাহায্য করেন। হৃষ্টপুষ্ট অশ্বটি সুলতানই তাকে উপহার দিয়েছিলেন। মন্ত্রী ও সভাসদগণকে ফাতিহ নির্দেশ দেন, তাঁরা যেন প্যাট্রিয়ার্থকে বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসেন।১৭৯ শুধু তাই নয়; অর্থোডক্স ধর্মগুরুকে তিনি মন্ত্রীর মর্যাদা দেন। সুলতানের হৃদ্যতাপূর্ণ মেলামেশা ও আন্তরিক ব্যবহারে প্যাট্রিয়াসহ সকল যাজক প্রভাবিত হন।
রোমান নাগরিকদের সাথে সুলতানের আচরণ ভিন্ন ছিল না। মুসলিমদের দিক থেকে তারা কল্পনাতীত সদাচরণ পায়। অথচ নিশ্চিত মৃত্যুকে নিজেদের ভবিতব্য ধরে নিয়েছিল তারা। এটা সত্য যে, এত বড়ো যুদ্ধের পর বিজিত জনগোষ্ঠীর অনেকে পালিয়ে গিয়েছিলে। কিন্তু সুলতানের পক্ষ থেকে জীবনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং মুক্তভাবে ধর্মচর্চার অধিকার পেয়ে তারা দলে দলে ফিরে আসে। আর তাই কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের কিছুদিনের মধ্যেই শহরে স্বস্তি ফিরে আসে। নতুনভাবে শান্তি ও নিরাপত্তায় তারা জীবন শুরু করে। ১৪৫৩ সালের ১ জুন প্রথমবারের মতো জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় আয়া সোফিয়ায়। শাইখ আক শামসুদ্দিন তাঁর শিষ্য সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের নামে খুতবা পাঠ করেন।১৮০
কনস্ট্যান্টিনোপলের নগর প্রাচীরের অভ্যন্তরে ৫০,০০০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস ছিল না। কারণ, ১২০৪ সালের লাতিন আগ্রাসনের সময় বাইজেন্টাইন রাজধানী ১০ লাখের বেশি লোক হারায়। পরবর্তী সময়ে নগরের জনসংখ্যা আরও হ্রাস পায়। তাই কনস্ট্যান্টিনোপলের জনমিতির ভারসাম্য রক্ষার্থে সেপ্টেম্বর মাস অতিবাহিত হওয়ার আগেই আনাতোলিয়া ও রোমেলি হতে ৫০০০ পরিবার নতুন রাজধানীতে আনা হয়। সুলায়মান পাশাকে শহরের গভর্নর নিয়োগ দিয়ে প্রাচীর সংস্কার ও প্রাসাদ পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন সুলতান। রোমান বন্দিদের অনেকে নগরের পুনর্মাণে কায়িক শ্রম ব্যয় করে। কর্ম শেষে সুলতানের নির্দেশে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। কারণ, শ্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তাদের মুক্তিপণ আদায় হয়ে গেছে। ১৮১
গ্যালাটার সাথে চুক্তি
কনস্ট্যান্টিনোপলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর সুলতান গ্যালাটা প্রজাতন্ত্রের প্রতি মনোযোগী হন। যুদ্ধের সময় গ্যালাটার জেনোয়ানরা নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছিলেন। জাগনুস পাশাকে সেখানে প্রেরণ করেন সুলতান। তিনি দেখেন, বহু মানুষ পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ নিয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেছে। পাশা বুঝতে পারেন, পলাতকরা গোপনে বাইজেন্টাইন সম্রাটকে সহায়তা করেছিল, অপরাধবোধ ও শাস্তির ভয়ে তারা পালিয়ে গেছে। তবুও তিনি সুলতানের পক্ষ থেকে তাদের অভয়দান করেন। পূর্বে তাদের সাথে সম্রাটের যে চুক্তি ছিল, তার চেয়ে ভালো চুক্তি সম্পাদনের প্রতিশ্রুতি দেন।
গ্যালাটার নাগরিকরা নিজেদের মাঝে আলাপ-আলোচনার পর নগরীর চাবিসহ তাদের চিফ ম্যাজিস্ট্রেট (Podesta)-এর নেতৃত্বে সুলতানের কাছে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। তারা নগরীর চাবি হস্তান্তরপূর্বক চুক্তিভঙ্গের জন্য ক্ষমা চাইলে সুলতান তাদের মহানুভবতার সাথে গ্রহণ করেন এবং সদয় আচরণ ও সুন্দর আলাপচারিতায় তাদের বিদায় জানান। ১৮২ জাগনুস পাশা সুলতানের নামে জেনোয়ানদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত অধিকারসংবলিত ফরমান জারি করেন—
'গ্যালাটার নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। তাদের গির্জাগুলো পূর্ববৎ বহাল রাখা হবে। নিজেদের শাসক নির্বাচনের অধিকারও তাদের থাকবে। উসমানি সালতানাতের সর্বত্র জলে-স্থলে তারা অবাধে বাণিজ্য করতে পারবে। তবে তাদের বার্ষিক জিজিয়া কর দিতে হবে এবং নগরপ্রাচীর ভেঙে ফেলতে হবে।'
জেনোয়ার শৃঙ্খল হতে মুক্তি পায় গ্যালাটা।
এ ফরমান জারির পাঁচ দিন পর সুলতান ফাতিহ জেনোয়ান গ্যালাটা সফর করেন। প্রথমেই একটি জনগণনার মাধ্যমে পলাতক ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করেন। তারপর তাদের ঘরের তালা ভেঙে সম্পদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
ঘোষণা দেওয়া হয় : ‘পলাতকরা তিন মাসের মধ্যে ফিরে এলে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া হবে, অন্যথায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাবসা-বাণিজ্য রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে যাবে।’ তারপর সুলতান ওই শহরের অবাধ্যতার সকল উপকরণ অপসারণ করেন। তুর্কি বাহিনীর অবাধ গমনাগমনের সুবিধার্থে গ্যালাটা নগরের স্থলপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। তবে জলসীমানার প্রাচীর অক্ষত এবং শহরটিকে অস্ত্রমুক্ত করা হয়। ১৮৩
এদিনে প্রত্যাবর্তন
বিজয়পরবর্তী কার্যাদি সম্পন্ন করে কনস্ট্যান্টিনোপলকে সালতানাতের নতুন রাজধানী ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে কনস্ট্যান্টিনোপলের নতুন নামকরণ ইসলামবুল বা ইস্তাম্বুল সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানী স্থানান্তরের কার্যক্রম শেষ করতে কিছুদিন লেগে যাবে। তাই ২১ জুন সুলতান এদিনে ফিরে যান। ১৮৪
বিজয়ের আধ্যাত্মিক প্রেরণা-আক শামসুদ্দিন
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধকালে অনেক আলিম সুলতানের সহযাত্রী হয়েছিলেন। তাঁদের মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুলতানের শিক্ষক আক শামসুদ্দিন। তাঁর প্রেরণা ও উৎসাহে সুলতান অভিযানের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। আলোচনার ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে অবরোধের আলোচনায় এই মহান আলিমের অবদান সম্পর্কে সবিস্তারে আলোকপাত করা সম্ভব হয়নি। মূলত তিনি ছিলেন সুলতানের আধ্যাত্মিক প্রেরণাদাতা। কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ে নৈতিক ও মানসিক শক্তির জোগানদাতা হিসেবে আক শামসুদ্দিনের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
তাঁর পুরো নাম মুহাম্মাদ হামজা আদ-দিমাশকি আর-রুমি। জন্ম ৭৯২ হিজরি/১৩৮৯ সালে দামেস্কে। তাঁর নসবনামা প্রথম খলিফা আবু বকর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। সাত বছর বয়সে তিনি কুরআন হিফজ করেন। তারপর আমাসিয়া, আলেপ্পো ও আঙ্কারায় পড়ালেখা করেন। ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি বুৎপন্ন হন।
সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ আক শামসুদ্দিনকে শাহজাদা মুহাম্মাদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। শাহজাদা তাঁর শিক্ষকের নিকট সেই সময়ের মৌলিক জ্ঞান অর্থাৎ কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি, ফারসি ও তুর্কি ভাষা শিক্ষালাভ করেন। পাশাপাশি প্রায়োগিক জ্ঞান তথা গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস ও যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান অর্জন করেন। শাহজাদা মুহাম্মাদ যখন ম্যাগনেসিয়ার শাসক নিযুক্ত হন, তখন যেসব আলিম তাঁকে শাসনব্যবস্থার মূলনীতি ও প্রশাসন প্রণালি শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত হন, আক শামসুদ্দিন ছিলেন তাঁদের একজন।
শাহজাদা মুহাম্মাদ সুলতানের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাঁর শাইখ তাঁকে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ে উপর্যুপরি উৎসাহ দিতে থাকেন যে, রাসূলে সুসংবাদ বাস্তবায়নের যোগ্যতা তাঁরই আছে। তাই এ গৌরব অর্জনে তাঁকে দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে।
বিজয়াভিযানের আলোচনায় আমরা দেখেছি, অবরোধকালে মাঝেমধ্যে রোমানরা সাফল্য লাভ করেছিল। এতে অনেক তুর্কি সেনাপতি হীনবল হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য চূড়ান্ত অভিযানের আগে সুলতান বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্তাদের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন। অভিজ্ঞ সেনাপতি খলিল পাশা অবরোধ তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। অনেকে এটাও বলতে কুণ্ঠিত হননি, একজন শাইখের প্ররোচনায় কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করে সুলতান বড়ো ভুল করেছেন। এ কথা শুনে সুলতান তাঁর উজির অলিউদ্দিন আহমদ পাশাকে শাইখ আক শামসুদ্দিনের কাছে প্রেরণ করেন। তখন তিনি এই বলে জবাব দেন, 'আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই বিজয় দান করবেন।' (আল-খতিব, ১৪৬; হারব, ৩৪৩)
শাইখের কাছ থেকে প্রেরণামূলক উৎসাহ পেয়ে সুলতান সর্বাত্মক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তারপরও সুলতান শাইখের সাথে সাক্ষাৎ করে আত্মিক তৃপ্তি লাভ করতে চান। ওদিকে আক শামসুদ্দিন তাঁবুরক্ষীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেউ যেন তাঁর ক্যানোপিতে প্রবেশ করতে না পারে। সুলতান উপস্থিত হলে তাঁবুরক্ষী শাইখের নির্দেশের কথা শুনিয়ে তাঁকে বাধা দেন। সামান্য কর্মচারীর আচরণে বিরক্ত হয়ে সুলতান তলোয়ারের আঘাতে তাঁবু ছিন্ন করে ভেতরে উঁকি দেন। যা দেখলেন, তাতে তিনি অবাক-বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। শাইখ দীর্ঘ সিজদায় মগ্ন; তাঁর পাগড়ি, মাথার লম্বা শ্বেত চুল মাটিতে গড়াচ্ছে, সাদা দাড়ি ও চুল মিলে যেন আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। যখন তিনি মাথা তুললেন- দেখা যায়, তাঁর দুই গণ্ড বেয়ে অশ্রু পড়ছে। বিজয় প্রার্থনায় তিনি সিজদাবনত হয়েছিলেন। ১৮৫
তারপর সুলতান ফিরে যান কমান্ডিং পজিশনে। দেখেন, তুর্কি গোলায় কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরে ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে। তুর্কি সৈন্যরা লাফিয়ে লাফিয়ে ঢুকছে শহরে। এই দৃশ্য দেখে তৃপ্ত হয়ে সুলতান বলেন-
'কনস্ট্যান্টিনোপল জয় হবে, তাই আমি খুশি নই; বরং আমার আনন্দ এই যে, আমার যুগেও এমন মানুষ আছেন।'১৮৬
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের গির্জা আয়া সোফিয়া মসজিদে রূপান্তরিত হয়। সুলতানের ঘোষণানুযায়ী পরবর্তী শুক্রবারে জুমার সালাতের মাধ্যমে মসজিদ হিসেবে আয়া সোফিয়ার অভিষেক সম্পন্ন হয়। সেই নামাজে ইমামতি করেছিলেন আক শামসুদ্দিন। কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রেরণাদাতা হিসেবে ইমামতি করার জন্য তাঁর চেয়ে বেশি উপযুক্ত আর কেউ ছিলেন না।
আক শামসুদ্দিন কেবল বিজয়াভিযানে উৎসাহই দেননি; বরং বিজয়ী সৈনিকদের সংযত রাখতেও ভূমিকা পালন করেছেন। বিজয়ের পর গনিমতের সম্পদ বণ্টন শেষে সুলতান মুহাম্মাদ সৈনিক ও সাধারণ মানুষের জন্য ভোজের আয়োজন করেন-যা তিন দিন ধরে অব্যাহত ছিল। ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আক শামসুদ্দিন সুলতান, সেনাপতি ও সাধারণ সৈনিকদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন-
'ওহে সৈনিক সমাবেশ! জেনে রেখ, তোমরা হলে সেই সৌভাগ্যবান দল, যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- “অবশ্যই কনস্ট্যান্টিনোপল বিজিত হবে। কতই-না উত্তম সেই আমির! আর কতই-না উত্তম সেই সেনাদল!” আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সাফল্য দান করেন এবং ক্ষমা করেন। সাবধান! অর্জিত গনিমতের সম্পদে বাড়াবাড়ি করো না, অপব্যয় করো না; বরং এ শহরের বাসিন্দাদের কল্যাণে তা ব্যয় করো। তোমাদের সুলতানের আনুগত্য করবে, তাঁকে ভালোবাসবে।'
তারপর আক শামসুদ্দিন সুলতানের দিকে ফিরে বললেন-
'হে আমার সুলতান! আপনি আলে উসমানের চোখের মণিতে পরিণত হয়েছেন। আল্লাহর পথে সংগ্রামের এই ধারা অব্যাহত রাখুন।'
তারপর তিনি বুলন্দ আওয়াজে তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করেন। ১৮৭
আক শামসুদ্দিনের আরেকটি অবদান হয়, বিশিষ্ট সাহাবি আবু আইউব আল-আনসারি -এর কবর চিহ্নিতকরণ। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ৫৩ হিজরিতে কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানের সময় তিনি মারা গেলে তাকে শহরের অদূরে কবর দেওয়া হয়। আক শামসুদ্দিনের সহায়তায় তাঁর কবর চিহ্নিত হলে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। তুর্কিদের নিকট এটি 'মসজিদ আইউব সুলতান' নামে পরিচিত।
আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী আক শামসুদ্দিনকে মানসিক রোগের চিকিৎসকও বলা হতো। তবে তিনি শারীরিক চিকিৎসকও ছিলেন। সেকালে তাঁকে সংক্রামক রোগের একজন বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য করা হতো। তিনি জীবনধাতু (মাদ্দাতুল হায়াত) নামে সংক্রামক রোগসংক্রান্ত একটি (তুর্কি ভাষায়) গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে তিনি বলেছেন-
'অনেকে মনে করে, ব্যক্তির শরীরে রোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়; আসলে এটি ভুল ধারণা। সংক্রমণের মাধ্যমেও রোগবালাই একজনের শরীর থেকে অন্যের শরীরে ছড়ায়। সংক্রমণের জীবাণু এত ছোটো ও সূক্ষ্ম যে, খালি চোখে তা দেখা যায় না। তবে দৃষ্টি-উত্তর হলেও এটি প্রাণবান বীজ।'
এভাবে দেখা যাচ্ছে, পঞ্চদশ শতকেই জীবাণু সম্পর্কে আক শামসুদ্দিন ধারণা পেশ করেছেন; যদিও জীবাণু সনাক্তকারী মাইক্রোসকোপ আবিষ্কৃত হয়েছে আরও চার শত বছর পরে-যখন ফরাসি রসায়নবিদ ও জীববিজ্ঞানী লুই পাস্তর যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন।
আক শামসুদ্দিন ক্যানসার সম্পর্কেও লিখেছেন। তাঁর রচিত এ সংক্রান্ত গ্রন্থ হল কিতাবুত তিব্ব। এটি তুর্কি ভাষায় রচিত। এ ছাড়াও আরবিতে তাঁর সাতটি গ্রন্থ রয়েছে। যেমন: আর-রিসালাহ আন-নুরিয়্যা, মাকালাতুল আউলিয়া, রিসালাহ ফি যিকরিল্লাহ, তালখিসুল মাতাইন, দাফউল মাতাইন, রিসারালাহ ফি শারহ হাজি বায়রাম ওয়ালি।
৮৬৩ হিজরিতে/১৪৫৯ সালে আক শামসুদ্দিন কুনিউকে মারা যান। তৎপূর্বে সুলতানের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি ইস্তাম্বুল ত্যাগ করেছিলেন। ১৮৮
ইসলামের ইতিহাসে অনুরূপ দৃষ্টান্ত আরও অনেক রয়েছে; বহু আলিম-ওলামা, সুফি-দরবেশ আত্মিক ও নৈতিক প্রেরণা দিয়ে ন্যায়পরায়ণ শাসকগণকে সাহায্য করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মরক্কোর মুরাবিত রাজ্যে শাইখ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন কর্তৃক ইয়াহয়া ইবন ইবরাহিমকে, কাজি ফাদিল কর্তৃক সালাহউদ্দিন আইয়ুবিকে প্রেরণা দানের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
ফাতিহের সাফল্যের কারণ
ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা করেও মুসলিমরা সফল হতে পারেনি। মুয়াবিয়া থেকে শুরু করে অনেক খলিফা ও সুলতান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী জয়ের চেষ্টা করেছেন। সুলতান ফাতিহ-এর পূর্বে কমপক্ষে দুজন তুর্কি সুলতান কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন।
১৪০০ সালে সুলতান প্রথম বায়েজিদ ও ১৪২২ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ কনস্ট্যান্টিনোপল অধিকারের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা সফল হতে পারেননি। অবশেষে তুর্কি সালতানাত প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৬০ বছর পর সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করে রাসূলুল্লাহ-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হওয়ার অবিস্মরণীয় গৌরব অর্জন করেন। এ বিজয়ের কারণে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ 'ফাতিহ' উপাধি লাভ করেন। আরবি শব্দ ফাতিহ-এর অর্থ বিজয়ী। এখানে আমরা সুলতান ফাতিহ-এর বিজয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।
প্রথমত : বাইজেন্টিয়াম বা কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক অবস্থান অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল। ত্রিভুজাকৃতির শহরটির দুই দিকের জলভাগ প্রাকৃতিক নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করত। তাই স্থলপ্রাচীরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে শহরের প্রতিরক্ষা নিয়ে দুর্ভাবনা থাকত না। অন্যদিকে, শক্তিশালী স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনীর সমন্বিত অভিযান ব্যতীত কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করা ছিল একপ্রকার অসম্ভব। রোমানরা শত শত বছর ধরে ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রক ছিল। তাদের নৌবাহিনীর ছিল কয়েক শতকের অভিজ্ঞতা। অপরদিকে সাগরে তুর্কিদের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে বাইজেন্টিয়াম দখলের পূর্ববর্তী তুর্কি প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। পঞ্চদশ শতকে আর্থিক দ্বীনতার কারণে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের নৌবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। ওদিকে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনীর ওপর সমান গুরুত্বারোপ করেন। গোল্ডেন হর্নে তিনি স্থলপথ ব্যবহার করে নৌযান নামানোর ব্যবস্থা করেন। ফলে পূর্ববর্তী সুলতানদের চেষ্টায় যে অপূর্ণতা ছিল, তা দূর হয় এবং সমন্বিত ও নিবিড় অভিযানে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজিত হয়।
দ্বিতীয়ত: ওই সময়ের আঞ্চলিক রাজনীতির পরিস্থিতি থেকে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন কোনো ফায়দা হাসিল করতে পারেননি। ইতঃপূর্বে ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান বায়েজিদ কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু তখন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সুলতানকে অবরোধ তুলে নিয়ে তাইমুরের মোকাবিলায় ছুটতে হয়। তাইমুরের এশিয়া মাইনর আগমনের ক্ষেত্রে সম্রাটের কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু অকস্মাৎ সম্রাটের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং কনস্ট্যান্টিনোপল বেঁচে যায়। সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোনো সুবিধা পাননি-যা পূর্ববর্তী সম্রাট ম্যানুয়েল পেয়েছিলেন।
তৃতীয়ত : পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তুর্কি সালতানাতে স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ ছিল। কোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বা বহিঃশত্রুর চাপ ছিল না। ফলে সুলতান মুহাম্মাদ একাগ্রভাবে কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানে মনোযোগী হতে পেরেছিলেন।
ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদও কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু ধূর্ত সম্রাট ম্যানুয়েল অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজাদের সহযোগিতায় সুলতানের ভাই মুস্তাফাকে বিদ্রোহে উসকানি দেন। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এতটা সঙ্গিন হয়ে পড়ে যে, সুলতানকে অবরোধ প্রত্যাহার করে ভ্রাতৃবিদ্রোহ দমনে মনোযোগী হতে হয়। ফলে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের ওই প্রচেষ্টা ও ব্যর্থ হয়। সুলতান ফাতিহের অভিযানের সময় তুর্কি রাজত্বে কোনো ধরনের বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা ছিল না। তা ছাড়া কনস্ট্যান্টাইন কৌশল নির্ধারণে তার পিতা ম্যানুয়েলের ন্যায় ধূর্তও ছিলেন না। তার পক্ষে সুলতানকে অন্য কোনো ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখাও সম্ভব হয়নি।
চতুর্থত: বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের অন্যতম কারণ। পঞ্চদশ শতকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ে। কনস্ট্যান্টিনোপলের বাইরে মাত্র দুই-একটি দ্বীপ ছিল পুরোনো এই সাম্রাজ্যের অধিকারে। চারদিকে ছিল তুর্কি সালতানাতের ভূমি। ফলে বাইরের সাহায্য ছাড়া কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন ঠেকানো অসম্ভব ছিল। জেনোয়ান দুঃসাহসিক অভিযাত্রী গিওভান্নির ৭০০ সৈন্য ব্যতীত আক্ষরিক অর্থেই সম্রাট অন্য কোনো বিদেশি সহায়তা পাননি।
১৪০০ সালের দিকে সম্রাট ম্যানুয়েল প্রায় দুই বছর ইউরোপের রাজন্যবর্গের দ্বারে দ্বারে ঘুরে খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্য-রাজধানীকে রক্ষার আবেদন করেছিলেন। ম্যানুয়েল যথোচিত আতিথেয়তা লাভ করেছিলেন, কিন্তু সাহায্য বলতে যা বোঝায় তার ছিটেফোঁটাও পাননি।
মূলত পঞ্চদশ শতকে ক্ষয়িষ্ণু বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এতটা সংকুচিত হয়েছিল যে, তুর্কিদের হাতে পতন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ১৪০০ সালেই কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন হতে পারত। কিন্তু এশিয়া মাইনরে খোদার গজবের উপস্থিতির কারণে সে যাত্রায় শহরটি রক্ষা পায়। ১৪২২ সালেও কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। কিন্তু সম্রাট ম্যানুয়েলের ধূর্ততার ফলে বেঁচে যায়। ১৪৫৩ সালে এসে আর কোনোভাবেই স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারল না। প্রাকৃতিক বা বস্তুগত কোনো পরিস্থিতি সম্রাটের অনূকুলে ছিল না। নিভু নিভু বাতিটি একেবারেই নিভে যায়।
ইতিহাসবিদদের আলোচনায় সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের পরাজয়ের নৈতিক কারণ উপেক্ষিত থেকে যায়। মানবগোষ্ঠীর শাসক নির্ধারণে আল্লাহ তায়ালা যে নিয়ম নির্ধারণ করেছেন, সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করে তা জানা যায়।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়-সাম্রাজ্যগুলোর স্থিতি ও জাতিসমূহের প্রতাপ মৌলিকভাবে দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমটি হলো-দেশ ও দশের জন্য কল্যাণকর, উন্নতিমূলক ও গঠনমূলক কাজ অর্থাৎ দুনিয়ার আবাদি সংক্রান্ত কাজ। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, শাসকগোষ্ঠী ও জনগণের নৈতিক মান। নৈতিক মান নির্ধারিত হতে পারে দুটো দৃষ্টিকোণে। একটি সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের বিচারে, অপরটি হলো সৃষ্টির সাথে সৃষ্টির সম্পর্কের বিচারে। অর্থাৎ জনগণের সাথে শাসকগোষ্ঠীর আচরণের নিরিখে। তবে গঠনমূলক পার্থিব কর্মকাণ্ডের পর সাম্রাজ্যের স্থিতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক মান বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ যে সাম্রাজ্যে গঠনমূলক কাজ যত বেশি, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের পরিব্যাপ্তি যত ব্যাপক-সেই সাম্রাজ্যের স্থিতি তত বেশি। এক্ষেত্রে জনগণ ও শাসকের ধর্মবিশ্বাস ধর্তব্য নয়।
কতিপয় আলিম এমন মত পোষণ করেন, 'ন্যায়পরায়ণ অমুসলিম শাসক জুলুমবাজ মুসলিম শাসকের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।' আরও বর্ণিত হয়েছে-'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকে সহায়তা করেন; যদিও সেটি অমুসলিম হয়। পক্ষান্তরে যে দেশ অবিচারে পূর্ণ, সেটিকে আল্লাহ সাহায্য করেন না; যদিও সেটি মুসলমানের দেশ হয়।' অর্থাৎ রাষ্ট্রের স্থিতি ও প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য শাসকের ধর্ম নয়; বরং ইনসাফ গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসের নানা ঘটনার সংশ্লেষণ থেকে সাম্রাজ্যের স্থিতিসংক্রান্ত যে মূলনীতি আমরা পাই, তার আলোকে বলা যায়, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে সংকুচিত হতে হতে সাম্রাজ্যটি একটি ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। গঠনমূলক কাজ অর্থাৎ পার্থিব উন্নয়নমূলক কাজ স্থবির হয়ে পড়েছিল। নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ নিজ পেশা ও কাজে মনোযোগী না হয়ে ধর্মীয় বিতর্কে নিমজ্জিত হয়েছিল। ফলে ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ পার্থিব কর্মকাণ্ডে নেমে এসেছিল স্থবিরতা।
সাম্রাজ্যের আয় কমে যাওয়ায় সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা হ্রাস করা হয়েছিল। এমতাবস্থায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যটির একমাত্র আশা ছিল, ইউরোপের স্বধর্মীয় ভাইদের সহায়তায় টিকে থাকা। কিন্তু ইতিহাসই বলে—নিজের শক্তিতে টিকে থাকার ক্ষমতা যার নেই, অপরের সাহায্য তাকে বাঁচাতে পারে না। ইউরোপীয়দের সাহায্য নিয়ে কনস্টান্টিনোপল টিকতে পারেনি, যেমনিভাবে মরক্কোর মুরাবিত শক্তির সাহায্য নিয়ে স্পেনীয় মুসলিমরাও টিকতে পারেনি।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে খ্রিষ্টীয় পশ্চিম ক্রমাগতভাবে উন্নত হচ্ছে, পক্ষান্তরে ইসলামি প্রাচ্যে পশ্চাৎপসারণতা দূর করা যাচ্ছে না। অথচ গত শতাব্দীর মধ্যভাগে মুসলিম দেশগুলো ঔপনিবেশিকতার জাল ছিন্ন করে স্বাধীন হলে সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, মুসলমানদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। তারা আবার বিশ্বনেতৃত্বে সমাসীন হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ও ভৌগোলিক অবস্থানসহ বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার অনেক উপাদান থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা আগের মতোই নিগৃহীত, উপেক্ষিত ও পরনির্ভর। এখনও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে গঠনমূলক কাজের তুলনায় ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড অনেক বেশি, পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবর্তে উপদলীয় কোন্দল বিরাজমান। মুসলিম মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধের সাথে তুলনা করা যায়। পতনযুগের মুসলিম স্পেনের কথাও স্মরণ করা যায়, যখন ওই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম শাসকরা একে অপরকে শায়েস্তা করার জন্য খ্রিষ্টান শক্তির সাহায্য গ্রহণ করত।
এখনও মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো মুসলিম শাসক জ্ঞাতি ভাইদের শায়েস্তা করার জন্য খ্রিষ্টান শক্তির সাহায্য গ্রহণ করছে। অর্থাৎ আন্তঃধর্মীয় সুসম্পর্কের বিচারে মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের চেয়ে দুই থেকে আড়াই শত বছর পিছিয়ে আছে।
ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শাসকদের নৈতিক মানও সন্তোষজনক নয়। পৃথিবীর নিপীড়ক ও স্বৈরশাসকদের তালিকা করলে মুসলিম শাসকগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন। মুসলমানদের বসতগুলোতে ইনসাফের পরিবর্তে জুলুমের বিস্তার। অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষরা যেসব গুণাবলির কারণে পৃথিবীব্যাপী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেগুলোর বিপরীতধর্মী গুণগুলো আমাদের মাঝে বিদ্যমান। পক্ষান্তরে মধ্যযুগে বাইজেন্টান সাম্রাজ্যসহ বড়ো বড়ো শক্তিগুলো যেসব ত্রুটির কারণে ধ্বংস হয়েছিল, সেগুলোও পূর্ণমাত্রায় মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান। এমতাবস্থায় বিরাট জনশক্তি ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী হওয়ার পরও মুসলমানদের পক্ষে বিশ্বনেতার আসনে আসীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সুদূর পরাহত। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনসহ বিশ্বসভ্যতার উত্থান-পতনের বৃত্তান্ত আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে।
বিশ্বপ্রতিক্রিয়া
তুর্কি মুসলিমদের হাতে বিশ্রুত রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানীর পতনে বিশ্বময় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রতিক্রিয়া অভিন্ন ছিল না। ৮০০ বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ যে সুসংবাদ দিয়েছিলেন, সেটির বাস্তবায়ন দেখে ইসলামি প্রাচ্যে খুশির বন্যা বয়ে যায়।
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন-সংবাদ খ্রিষ্টীয় ইউরোপে বজ্রের ন্যায় আঘাত হানে। ভীতি ও বেদনার অনুভূতি তাদের আচ্ছন্ন করে। লোকেরা একে অপরকে কবিতা, গল্প, নাটকের মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণে উৎসাহ দিতে থাকে। রাজা-প্রিন্সদের মাঝে বহু সম্মেলন-বৈঠক হয়। পুরোনো ক্রুসেডের চেতনা আবার জেগে ওঠে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সব মতভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান আসে। কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের খবরে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন পোপ পঞ্চম নিকোলাস (কার্যকাল: ১৪৪৭-৫৫)। হলি রোমান সাম্রাজ্যের রাজা তৃতীয় ফ্রেডারিখের (শাসনকাল ১৪৫২-১৪৯৩) উদ্দেশ্যে প্রেরিত এক পত্রে তিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনকে 'খ্রিষ্টান বিশ্বাসের মহা বিপর্যয়' বলে আখ্যায়িত করেন। তার মতে- 'কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল সাহিত্য ও মানববিদ্যার প্রকৃত বাসস্থান।'
হৃত নগরের জন্য শোক প্রকাশ করে কার্ডিনাল বেসারিউ এটিকে 'সর্বোত্তম শিল্পের বিদ্যাপীঠ' বলে অভিহিত করেন। ইনিয়া সিলভিও পিকোলোমিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের অসংখ্য গ্রন্থের কথা উল্লেখ করে ওই শহরের পতনকে হোমার ও প্লেটোর দ্বিতীয় মৃত্যু বলে অভিহিত করেন। ১৮৯ স্বধর্মী রাজাদের উৎসাহিত করে তিনি বলেন-
'ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, অ্যারাগন, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া, জেনোয়া ও জার্মানি- প্রতিটি দেশ থেকে স্বল্পসংখ্যক যোদ্ধাও যদি পবিত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নাম লেখায়, তাহলে বিধর্মী (তুর্কিদের) হটানো সম্ভব হবে।'
মজার ব্যাপার হলো, গিবন লিখেছেন-
'পরবর্তী সময়ে এই ইনিয়া যখন দ্বিতীয় পিউস নামে পোপের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন (কার্যকাল ১৪৫৮-১৪৬৪), তখন মন্টোয়া কাউন্সিলেও (১৪৫৯ সালে) তিনি কিছু কৃত্রিম উদ্দীপনা ছড়িয়েছিলেন। তিনি যখন ব্যক্তিগতভাবে তুর্কিবিরোধী ক্রুসেড বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মধ্য ইতালির মার্শেই অঞ্চলের অ্যানকোনা শহরে উপস্থিত হন, তখন নানা অজুহাতে অভিযান উধাও হয়ে যায়। একদিনের যাত্রাবিলম্ব অনির্দিষ্টকালের স্থগিতকরণে রূপ নেয়। পোপ তার বাহিনীকে (যাদের অধিকাংশ ছিল জার্মান তীর্থযাত্রী) পাপক্ষেপণ ও দানদক্ষিণার বিনিময়ে ভেঙে দিতে বাধ্য হন।'১৯০
কনস্ট্যান্টিনোপল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পোপ পঞ্চম নিকোলাস (কার্যকাল ১৪৪৭-১৪৫৫) ইতালীয় রাজ্যগুলোর একত্রীকরণে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালান। অটোমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাদের লেলিয়ে দেন। রোমে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের এক সম্মেলনে পোপ সভাপতিত্বও করেন-যেখানে সাধারণ শত্রু অর্থাৎ তুর্কিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে অংশগ্রহণকারী রাজ্যগুলো সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয়। এই ক্রুসেড কনফেডারেসি প্রায় পূর্ণ রূপ পেতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পঞ্চম নিকোলাস মারা যান। কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের খবরে তার মনে যে আঘাত ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, সে আঘাতেই তিনি মারা যান (২৫ মার্চ ১৪৫৫)।১৯১
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনে খ্রিষ্টান রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন-বুগুন্ডির ডিউক ফিলিপ দ্যা গুড। ১৪৫৩ সালে কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের খবর নিয়ে পোপের দূত তার কাছে এলে তিনি উত্তেজনায় জ্বলে ওঠেন। সকল খ্রিষ্টানকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানান। তিনি নিজে জার্মানির সম্রাট তৃতীয় ফেডারিকের কাছে যান। ফ্রেডারিকও দূত পাঠান ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের কাছে। চার্লস (কার্যকাল ১৪২২-১৪৬১) ছিলেন আগে থেকেই উদ্দীপ্ত। তবে এ মুহূর্তে তুর্কিবিরোধী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার মতো অবস্থা তার ছিল না। তার নাকের ডগায় নিশ্বাস ফেলছিল ইংরেজরা। কাছের শত্রুকে পরাজিত না করে বহু দূরে তুর্কি দলনে ব্যস্ত হওয়া সমীচীন মনে করেন না সপ্তম চার্লস। তবুও তিনি রোডস দ্বীপের প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় করতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।
ডিউক ফিলিপ দ্যা গুড শুধু রাজাদের উদ্দীপ্ত করে ক্ষান্ত হলেন না; তুর্কিদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান জনগণকে লেলিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি লিলে শহরে এক নাটক মঞ্চায়নের আয়োজন করেন। দর্শক সারিতে অনেক অভিজাত ও গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। নাটকে কনস্ট্যান্টিনোপল শহরের পতন ও স্বধর্মী খ্রিষ্টান ভাইদের সকরুণ রোনাজারির দৃশ্য মঞ্চায়িত হয়। অনুষ্ঠান শেষে ডিউক ঘোষণা দেন-তিনি সশরীরে তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন। উপস্থিত ব্যারেন, নাইট, ও গোঁড়া খ্রিষ্টানরাও ডিউকের সহযাত্রী হওয়ার ঘোষণা দেন। এভাবেই ধীরে ধীরে তুর্কিবিরোধী লড়াই মুসলিম বিরোধিতায় রূপ নেয়। ১৯২
তুর্কি সালতানাতের সন্নিহিত খ্রিষ্টানরাও তাদের ধর্মীয় রাজধানীর পতনে ব্যথিত হন। কিন্তু সালতানাতের নৈকট্যের কারণে বেদনা চেপে রেখে তারা খুশির ভাবই প্রকাশ করে। এদিনে সুলতানকে অভিনন্দন জানাতে তারা প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। তাদের মাঝে নিহত সম্রাটের দুই ভাইও ছিলেন-যারা মোরিয়া শাসন করছিলেন।
ইসলামি প্রাচ্যে মহাবিজয়ের প্রতিক্রিয়া
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের খবর প্রচারিত হতে না হতেই এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে খুশি ও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ৮০০ বছর আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ যে সুসংবাদ দিয়েছেন, তা আজ বাস্তবায়িত হলো! শত শত বছর ধরে সারা বিশ্বের মুসলিম এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছে। মুসলিমদের আনন্দিত হওয়ারই কথা। সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ বিজয় সংবাদ দিয়ে দূত পাঠান মিশর, হিজাজ, পারস্য ও ভারতে। ইসলামি বিশ্বের নানা প্রান্তে এ বিজয় উদ্যাপন করা হয়। উদ্যাপন পদ্ধতিও ছিল মার্জিত ও রুচিসম্মত। যেমন : মসজিদের মিনারে বিজয়ের ঘোষণা, সালাতুশ-শুকর আদায়, বাড়িঘর ও দোকানপাট অলংকরণ এবং দেয়ালে চিত্রবিচিত্র পতাকা স্থাপন ইত্যাদি।
মিশরীয় ইতিহাসবিদ ইবন তুগ্রা বার্দি হাওয়াদিস আল-দুহর গ্রন্থে লিখেছেন, ৮৫৭ হিজরির ২৩ শাওয়াল (২৭ অক্টোবর, ১৪৫৩) সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ এর দূত কায়রোয় উপস্থিত হন। তাঁর সাথে ছিল সুলতান কর্তৃক প্রেরিত দুজন অভিজাত রোমান বন্দি ও বিভিন্ন উপঢৌকন। তাঁরা মিশরের সুলতান সায়ফুদ্দিন ইনালের (কার্যকাল ১৪৫৩-১৪৬১) কাছে যান। এই মহান বিজয়ের খবরে সুলতান ও সাধারণ মানুষ অত্যন্ত খুশি হন। খোশখবর ঘোষণায় বেজে উঠে ডঙ্কা। এ উপলক্ষ্যে কায়রোর রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও দোকানপাট সুসজ্জিত করা হয়। শাওয়ালের ২৫ তারিখ সুলতানের কাসেদ ও দুই রোমান বন্দি কায়রোর রাস্তা প্রদক্ষিণের পর কেল্লার ওপর আরোহণ করেন।
সুলতান ফাতিহ মুসলিম শাসকদের কাছে যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন, তার নমুনা হিসেবে শরিফে মক্কার প্রতি প্রেরিত পত্রের অনুবাদ উপস্থাপন করছি-
'(হামদ ও সানা-এর পর) আমরা একটি খোশখবরসহ এ পত্র প্রেরণ করছি। আর তা হলো, এ বছর আল্লাহ তায়ালা আমাদের এমন এক বিজয় দান করেছেন-যা কোনো চোখ দেখেনি, আর না কোনো কান শুনেছে। সেটি হলো-কনস্ট্যান্টিনোপল জয়। মহোদয়ের কাছে আশা হলো, এই বিরাট দান ও মহান বিজয়ের খবর সবাইকে জানাবেন-পবিত্র হারামাইনের বাসিন্দা, আলিম, নেতৃবৃন্দ, ধ্যানী তাপস, সৎ আবেদ, ওলামা-মাশায়েখ, ইমাম, ছোটো-বড়ো, বায়তুল্লাহর চাঁদোয়া ধরে যারা অবস্থান করে, (এটি তো এমন সুশক্ত রজ্জু, যা কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না), রাসূলের সান্নিধ্যে এতেকাফকারী, আর যারা আমাদের দৌলতের কল্যাণ ও স্থায়িত্বের জন্য আরাফাতের ময়দানে কাতর প্রার্থনারত, তাঁদের সবাইকে সুসংবাদ জানাবেন। কাসেদের সাথে আপনার জন্য কিছু হাদিয়াও প্রেরণ করোম। আর তা হলো-আপনার জন্য ২ হাজার খাঁটি সোনার ফ্লুরি-যা গনিমতের সম্পদ থেকে পাওয়া। সাথে আরও ৭ হাজার ফ্লুরি প্রেরণ করলাম, তন্মধ্যে ২ হাজার ফুরি সর্দার ও নকিবদের জন্য, ১ হাজার ফুরি হারামাইনের খাদেমদের জন্য, বাকিটা মক্কা ও মদিনার (আল্লাহ তায়ালা দুই পবিত্র স্থানের মর্যাদা বৃদ্ধি করুন) মুহতাজ ও মিসকিনের জন্য। আশা করি আপনি প্রয়োজনানুসারে বণ্টন করে দেবেন। আপনাদের দুআ প্রত্যাশা করি। আল্লাহ আপনাদের হেফাজত করুন, চিরস্থায়ী সৌভাগ্য ও শাশ্বত নেতৃত্ব দান করুন। '১৯৩
সুলতানের পত্রের জবাবে শরিফ লিখেন- 'আপনার পত্রটি আমরা পরিপূর্ণ শিষ্টাচারের সাথে খুলেছি, তারপর হিজাজবাসী ও আরব সন্তানদের সামনে তা পাঠ করেছি। আমরা ওই পত্রে কুরআনের আয়াত দেখতে পেয়েছি-যাতে আছে মুমিনদের জন্য শেফা ও রহমত। সেখানে আমরা রাসূলের মুজিজার প্রকাশও দেখতে পেয়েছি, আর তা হলো-কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের সংবাদ। এটি তো বিশ্ববিশ্রুত শহর-যার প্রতিরক্ষার দৃঢ়তা সাধারণ-বিশেষ সবার কাছে পরিচিত। আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি, তিনি এত কঠিন কাজ সহজ করে দিয়েছেন। এ সংবাদে আমরা অত্যন্ত খুশি হয়েছি...'১৯৪
দক্ষিণ ভারতের বাহমনি শাসক আলাউদ্দিন আহমদ শাহ বাহমনির কাছ থেকেও সুলতান অভিনন্দনবার্তা লাভ করেন।১৯৫
অন্যান্য বিজয়
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ-এর অক্ষয় ও অনন্য কীর্তি হয় কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখন অন্যান্য বিজয় সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয় সুসম্পন্ন হওয়ার পর সুলতান মুহাম্মাদ অন্যান্য অঞ্চলের প্রতি মনোযোগী হন। প্রথমেই তিনি মোরিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন। সর্বশেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের দুই ভাই দিমিত্রিস ও টমাস এ অঞ্চল শাসন করতেন। সুলতানের আগমনের খবর পেয়ে তারা স্ব-উদ্যোগে দূত পাঠিয়ে বার্ষিক ১২ হাজার ডুকাট কর দেওয়ার শর্তে সন্ধি প্রার্থনা করেন। ফাতিহ তাদের আবেদন মঞ্জুর করে সার্বিয়া অভিমুখে রওয়ানা করেন।
তুর্কিরা প্রথমেই হুনিয়াডির বাহিনী দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়। হাঙ্গেরির রাজা সার্বদের সহায়তা চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। ক্যাথলিক হাঙ্গেরিয়ানদের সাহায্য করতে স্বীকৃত হয়নি অর্থোডক্স সার্বরা। তাদের রাজা এগিয়ে এসে সুলতানের কাছে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব পেশ করেন। বার্ষিক ৮০ হাজার ডুকাট কর প্রদানের অঙ্গীকার করলে ফাতিহ সার্বদের প্রস্তাব মেনে নেন। পরের বছর সুলতান মুহাম্মাদ ৫০ হাজার সৈনিক এবং ৩০০ কামানসহ সার্বিয়া অতিক্রম করে বেলগ্রেড অবরোধ করেন।
সুলতানের আগমনের পূর্বেই হাঙ্গেরির রাজা হুনিয়াডি শহরে প্রবেশ করেছিলেন। তার বাহিনী বীরত্বব্যঞ্জক প্রতিরোধে তুর্কিদের ঠেকিয়ে দেয়। ফলে ১৪৫৫ সালে সুলতান অবরোধ উঠিয়ে নিতে বাধ্য হন।
বেলগ্রেড অভিযানের ব্যর্থতার মধ্যে তুর্কি বাহিনী এই খবরে স্বস্তি পায় যে, প্রতিরোধ লড়াইয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়ে ২০ দিন পর হুনিয়াডি মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে তুর্কিরা ভীষণ এক শত্রুর হাত থেকে রেহাই পায়।
১৪৫৮ সালে সুলতান তাঁর প্রধান উজির মাহমুদ পাশাকে সার্বিয়া জয় সম্পন্ন করার জন্য প্রেরণ করেন। দুই বছর প্রতিরোধের পর রাজ্যটি চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। ফলে ১৪৬০ সালে সার্বিয়া তুর্কি সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এখানে একটি তুর্কি সানজাক প্রতিষ্ঠা করা হয়-যার সদর দপ্তর ছিল সার্বিয়ার তৎকালীন রাজধানী Smederevo। বেলগ্রেড বিজয়ের আগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল ছিল। ১৯৬
১৪৫৮ সালে সুলতান করিন্থ ও নিকটবর্তী গ্রিক জনপদগুলো জয় করেন। কিছুদিন পর পেলোপানেসাস ও গ্রিসের অন্যান্য এলাকা সুলতানের কাছে আত্মসমর্পণ করে। প্রাচীনকালের পার্থেনন বা মধ্যযুগের চার্চ অব হলি ভার্জিন সুলতানের নির্দেশে মসজিদে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, টমাস পেলিওলোগাসকে (সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের ভ্রাতা) রাজ্যশূন্য করা হয়েছিল। তার অপর ভাই দিমিত্রিস কর প্রদানের শর্তে মোরিয়ার শাসক হিসেবে বহাল ছিলেন। তবে সুলতান ফিরে যেতে না যেতেই টমাস বিদ্রোহ করে তুর্কি ও দিমিত্রিসের বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে। ফলে সুলতান আবারও মোরিয়ায় অভিযান চালান। মোরিয়ায় ৩০০টি দুর্গ ছিল, তন্মধ্যে ২৯২টি ধ্বংস করে তুর্কি বাহিনী। ১৪৬০ সালে এ অভিযান সমাপ্ত হয়। টমাস পালিয়ে ইতালিতে আশ্রয় নেন, আর দিমিত্রিস নির্বাসিত হয়। একই সময়ে Thasus ও Imbrus-সহ ভূমধ্যসাগরের আরও কিছু দ্বীপ বিজিত হয়। ১৯৮
গ্রিস থেকে ফিরে সুলতান ইস্কান্দার পাশার সাথে সাময়িক সন্ধি করেন। চুক্তি বলে পাশা লাভ করেন আলবেনিয়া ও ইপিরুস (Epirus) শাসনের অধিকার। এই সময়ে এসে একনিষ্ঠভাবে এশিয়া মাইনরে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পান ফাতিহ।
১৪৬১ সালে তিনি আচানক আমাসট্রিস (Amastris) বন্দরে উপস্থিত হন। এটি ছিল জেনোয়ান বণিকদের বাণিজ্যকেন্দ্র। পৃথিবীর সবখানে সব সময় ব্যবসায়ীরা অবাধে ব্যাবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পেলে শাসকের ধর্ম বা জাতীয়তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। এখানেও একই অবস্থা হলো।
জেনোয়ান বণিকরা বিনাযুদ্ধে নগরদোর খুলে দিলেন। তারপর সুলতান অগ্রসর হন সিনোভের দিকে। সুলতানের বাহিনীতে বিপুল নৌযানের উপস্থিতি দেখে নগরপাল এস্ফেন্দিয়ার আত্মসমর্পণ করেন। বিনাশর্তে আনুগত্য প্রকাশ করায় সুলতান বিথিনিয়া (Bithynia) অঞ্চলের বিরাট ভূখণ্ড জায়গির প্রদান করে তাকে পুরস্কৃত করেন। ১৯৯
তারপর সুলতান ট্রাবজোনের (Trabzon) দিকে এগিয়ে যান এবং একপ্রকার বিনা বাধায় নগরটি জয় করেন। শহরের শাসক ও তার পরিবারবর্গ বন্দি হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলে প্রেরিত হয়। ২৫৭ সাল থেকে কমনেনাস নামে যে রাজবংশ ট্রাবজোন শাসন করে আসছিল, সেটির বিলুপ্তির মাধ্যমে সর্বশেষ গ্রিক টেরিটোরি সুলতানের করগত হয়। আর কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ উপকূলের সকল রাজ্য সালতানাতভুক্ত হয়। ২০০
এশিয়া মাইনরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর সুলতান আবারও ইউরোপে পা রাখেন। এবার তিনি ওয়ালেচিয়ার নিষ্ঠুর শাসক ড্রাকুলকে দমন করতে মনস্থ হন। এ রাজা তাঁর অঞ্চলে বাণিজ্যের কাজে আগত বহু তুর্কি বণিককে হত্যা করেছিল। সুলতান এগিয়ে এলে ড্রাকুল ইতঃপূর্বে সুলতান বায়েজিদের সাথে ওয়ালেচিয়ার তৎকালীন রাজার সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক বার্ষিক ১০ হাজার ডুকাট কর প্রদানের শর্তে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেন। ফাতিহ প্রস্তাব মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে ফিরে যান। সন্ধির দোহাই দিয়ে বিপদ ঠেকানোর পরপরই ড্রাকুল হাঙ্গেরির রাজার সাথে জোট বেঁধে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেন। খবর পেয়ে সুলতান দুজন দূত প্রেরণ করেন। ড্রাকুল নিষ্ঠুরভাবে দুজনকেই হত্যা করে। তারপর বুলগেরিয়া তছনছ করে ২৫ হাজার মানুষকে বন্দি করে নিয়ে যায়। এবারও সুলতান প্রতিনিধি পাঠিয়ে প্রতিবিধানের চেষ্টা করেন, কিন্তু উদ্ধত ড্রাকুল ফাতিহের দূতদের সাথে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করে।
এরপর আর দেরি না করে সুলতান মুহাম্মাদ দেড় লাখ সৈন্য নিয়ে ওয়ালেচিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। ড্রাকুলের বাহিনীকে তছনছ করে তিনি রাজধানী বুখারেস্ট জয় করেন। তবে নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী শাসক ড্রাকুলকে বন্দি করতে পারলেন না। সে পালিয়ে গিয়ে হাঙ্গেরিরাজের কাছে আশ্রয় নেয়। ওয়ালেচিয়াকে সালতানাতে অন্তর্ভুক্ত করে সুলতান ড্রাকুলের অনুজ রাউলকে শাসক নিয়োগ দেন।
১৪৬২ সালে সুলতানকে আবার ইউরোপ-যাত্রা করতে হয়। এ অভিযানের লক্ষ্য ছিল বসনিয়া। ওই দেশের শাসক ছিল ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী, কিন্তু প্রজারা ছিল বোগোমিল খ্রিষ্টান। দুরাচারী রাজার নির্যাতন-নিষ্পেষণে জনসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। সুলতান বসনিয়ার বিদ্রোহ দমন করে ওই অঞ্চলের শাসককে সপুত্রক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
১৪৬৪ সালে সুলতানকে আবারও বসনিয়া অভিযানে বের হতে হয়। হাঙ্গেরির রাজা ম্যাথিয়াস কার্ভিনাস (হুনিয়াডির পুত্র) বসনিয়া দখলের চেষ্টা করলে ফাতিহ তাকে পরাজিত করেন। এবার বসনিয়ার বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ণ করে সরাসরি সালতানাতের শাসনাধীনে আনয়ন করা হয়। এ রাজ্য থেকে ৩০ হাজার যুবক জেনিসেরি বাহিনীতে যোগদান করে এবং বসনিয়ার বেশিরভাগ অভিজাত (যারা পূর্বে বোগোমিল খ্রিষ্টান ছিলেন) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হাঙ্গেরির রাজা আরও তিনবার (১৪৬৫, ১৪৭১, ১৪৭৯) বসনিয়া দখলের চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিবার তার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
১৪৬৩ সালে ভেনিসের বণিকদের সাথে উসমানীয়দের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তুর্কি বাহিনী প্রথমেই আর্গুসসহ (Argos) কয়েকটি অঞ্চল দখল করে। ভেনিসিয়ানরা পালটা ব্যবস্থা হিসেবে সাগরে নৌবহর নামিয়ে মোরিয়া হতে তুর্কিদের তাড়িয়ে দেয়। তারা করিন্থ যোজকের সীমানাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে-যা ইতঃপূর্বে তুর্কিরা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। তা ছাড়া তারা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণ হতে আর্গুসও কেড়ে নেয়। ভেনিসিয়ানদের এ কর্তৃত্ব অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
৮০,০০০ সৈন্য সমভিব্যহারে সুলতান মুহাম্মাদ এগিয়ে আসছেন জেনে ভেনিসিয়ানরা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। তুর্কিরা তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই মোরিয়া (Morea) পুনর্দখল করে। তা ছাড়া হাতছাড়া হয়ে যাওয়া অন্যান্য এলাকাও তাদের আয়ত্তে আসে।২০১
ওদিকে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে পোপতন্ত্র আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবার পোপ দ্বিতীয় পিউস ক্রুসেডের ডাক দেন, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা পূরণের আগেই তিনি মারা যান। অপরদিকে সক্রিয় হয়ে উঠেন পুরোনো দুশমন ইস্কান্দার বেক আলবানি। অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরও তুর্কিরা তাকে পরাস্ত করতে পারে না। পঁচিশ বছর একাদিক্রমে লড়াই করার পর ১৪৬৭ সালে ইস্কাদারের মৃত্যু হয়, আর তুর্কিরা ভীষণ এক শত্রুর উৎপাত হতে বেঁচে যায়।
এক বছর বিরতির পর ১৪৭০ সালে সুলতান আবারও ভেনিস আক্রমণ করেন। এবার তিনি Euboia দ্বীপ জয় করেন। ওদিকে এশিয়া মাইনরের কারামানিয়া রাজ্যে তখন অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এ সুযোগে সুলতান কারামনের শাসক ইসহাক বেগকে তাড়িয়ে দিয়ে পদচ্যুত রাজার জ্যেষ্ঠ ভাইকে ক্ষমতায় বসান। এরপর ইউরোপ অভিমুখী হতে না হতেই ইসহাক বেগ আবারও রাজধানী কুনিয়া দখল করে নেন। বাধ্য হয়ে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ আবারও কারামানিয়ায় ফিরে আসেন। এবার ইসহাক বেগকে উৎখাত করেই ক্ষান্ত হন না; বরং কারামান রাজ্যকে তুর্কি সালানতানাভুক্ত করে নেন।২০২
কিছুদিন যেতে না যেতেই নতুন উৎপাত এসে হাজির। পূর্বদিক থেকে এগিয়ে আসে আরেক বিপদ; তাইমুরের অন্যতম উত্তরসূরি 'আক্কুয়ুনলু তুর্কমেন' শাসক উজুন হাসান উসমানি সালতানাতভুক্ত সিবাস ও তোকাত দখল করে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সুলতান উপলব্ধি করতে পারেন, এটি একটি বড়ো ষড়যন্ত্রের অংশ-যাতে ইউরোপের সকল বৃহৎ শক্তি জড়িত। উদ্দেশ্য হলো-পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে যুগপৎ আক্রমণ চালিয়ে উসমানি সালতানাতকে ধ্বংস করা, তা সম্ভব না হলে অন্তত সংকুচিত করা। তাই সুলতান ফাতিহকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হয়। রোমেলি অর্থাৎ সালতানাতের ইউরোপীয় অংশে পর্যাপ্ত সৈন্য মোতায়েন করেন সুলতান। তারপর দুই শাহজাদাকে যুদ্ধপ্রস্তুতির নির্দেশ দেন।
আনাতোলিয়ার শাসক শাহজাদা দাউদ ও কারামানিয়ার শাসক বাকলারবেগ মুস্তাফা পাশার বাহিনী বাকশহরি হ্রদের পূর্বদিকে কিরেলি ময়দানে সংঘটিত যুদ্ধে উজুন হাসানকে নিকৃষ্টভাবে পরাজিত করেন (১৪৭১)। আকুয়ুনলু বাহিনী প্রায় সমূলে ধ্বংস হয়। কিছুদিন পর সুলতান নিজেই ১ লাখ সৈনিক নিয়ে বহির্গত হয়ে উতলুকবেলি ময়দানে উজুন হাসানকে আবারও পরাজিত করেন। তারপর তিনি আজারবাইজান পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর অভিযানের ফল হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী। পরবর্তী সময়ে আর কখনো উজুন হাসান সালতানাতের ধারে কাছে ঘেঁষেনি। ২০৩
ওদিকে এই বছরগুলোতে তুর্কিদের সাথে ভেনিসের যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। ভেনিসিয়ানরা পোপ ও নাপোলির রাজার থেকে সহায়তা নেয়। এসব যুদ্ধে বিজয়ের পাল্লা সব সময় তুর্কিদের দিকেই ছিল। ভেনিসিয়ানরা কোনো এলাকা পুনর্দখল করতে পারেনি।
১৪৭৫ সালে সুলতান বাগদান (বর্তমান মোলদাভিয়া) অভিযানে মনস্থ করেন। প্রথমেই ওই শহরের শাসক স্টিফেনকে কর প্রদানের বিনিময়ে বশ্যতা স্বীকারের প্রস্তাব দেন। বাগদানের শাসক কেবল কর প্রদানে অস্বীকারই করেননি; বরং প্রচণ্ড প্রতিরোধের পর তুর্কি বাহিনীকে ঠেকিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে ক্রুদ্ধ সুলতান ক্রিমিয়া (القرم) দখলের পরিকল্পনা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, ওই অঞ্চলের অশ্বারোহীদের সমন্বয়ে বাগদানে অভিযান পরিচালনা করা।
ক্রিমিয়া উপদ্বীপের কাফা শহরটি (Feodosia) ছিল জেনোয়া প্রজাতন্ত্রের একটি উপনিবেশ। সুলতান মুহাম্মাদ একটি নৌবহর পাঠান। তাঁর যোদ্ধারা শুধু কাফা শহরই দখল করেন না; বরং ক্রিমিয়া উপকূলের সকল জেনোয়ান এলাকাও অধিকার করেন। সুলতান অধিকৃত এলাকায় সরাসরি শাসন প্রবর্তন না করে করারোপ করেই সন্তুষ্ট থাকেন।
কিছুদিন পর উসমানি নৌবহর আক কারমান (Akkerman/Bilhorod-Dnistrovskyi) বন্দর দখল করে। সেখান থেকে দানিয়ুব মোহনা অতিক্রম করে তুর্কি বাহিনী বাগদানের ওপর আবার আক্রমণ শানায়। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ব্যাপক সাফল্য লাভ করলেও স্থলে অবতরণের পর পার্বত্য এলাকা অতিক্রমের সময় বাগদান বাহিনী আচানক হামলা চালিয়ে মুসলিমদের পর্যদুস্থ করে দেয় (১৪৭৬)। এই সাফল্যের ফলে সারা ইউরোপে তুর্কি প্রতিরোধকারী হিসেবে চতুর্থ স্টিফেনের নাম ছড়িয়ে পড়ে। ইতঃপূর্বে অনুরূপ কৃতিত্ব প্রদর্শন করে হাঙ্গেরিয়ান হুনিয়াডি ও আলবেনিয়ান ইস্কান্দার বেক খ্যাতি লাভ করেছিলেন। পোপের তরফ থেকে 'খ্রিষ্টান বীর' ও 'খ্রিষ্টান ধর্মের সংরক্ষক' উপাধিতে ভূষিত হন স্টিফেন। ২০৪
১৪৭৭ সালে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ পুনরায় ইউরোপ অভিযানে বের হন। এবারে প্রথমেই অতিক্রম করেন ক্রোয়েশিয়া (كرواسيا) ও দালমাসিয়া (Dalmatia) নামক দুটো অঞ্চল। তারপর Friuli অভিযান পরিচালনা করেন। নিজেদের রাজ্যের কেন্দ্রস্থলের পতনের ভয়ে ভেনিসিয়ানরা কারোয়া (Kruja) ছেড়ে দিয়ে সুলতানের সাথে চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব দেন। তবে সুলতান এস্কোদারা (Shkodra)-এর ওপর অধিকার দাবি করে বসলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। স্থানীয়রা তুর্কিদের দাবি অগ্রাহ্য করলে সুলতানের বাহিনী শহরটি অবরোধ করে ছয় সপ্তাহ ধরে কামানের গোলাবর্ষণ করেন। কিন্তু প্রতিরোধের দৃঢ়তায় ফাতিহের প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখল না। তখন সুলতান এস্কোদারার আশপাশের এলাকা ও দুর্গগুলো দখল করে নেন। ফলে নগরটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ভেনিসিয়ানরা শহরটি সুলতানের হাতে সমর্পণ করেন। বিনিময়ে তারা কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করে।
১৪৭৯ সালে ২৮ জানুয়ারি (৩ জিলকদ, ৮৮৩ হি.) এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর উল্লেখযোগ্য শর্তাবলি ছিল নিম্নরূপ:
১. যুদ্ধের সময় মোরিয়া ও দিলমাসিয়ার যে অঞ্চলগুলো অধিকৃত হয়েছে, উভয় পক্ষ সেগুলো পূর্ববর্তী কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যার্পণ করবে।
২. কুরিয়া, আকসা হিসার ও আগরিবুজ দ্বীপ তুর্কিদের অধিকারে থাকবে।
৩. অবরুদ্ধ এস্কোদারা এবং এর কাছাকাছি অঞ্চল উসমানীয়দের হাতে সমর্পণ করা হবে।
৪. সামরিক গ্যারান্টি হিসেবে প্রতি দুই বছর সালতানাতকে দুই লাখ ডুকাট করে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করবে ভেনিস।
৫. তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দ্বীপগুলোতে ভেনিস অবাধে ব্যাবসা-বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগ পাবে। বিনিময়ে প্রতিবছর তারা তুর্কিদের ১২ হাজার ডুকাট স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করবে।
৬. লিমনি ও বুযজাসহ অন্যান্য দ্বীপগুলো উসমানীয়দের কাছে প্রত্যার্পণ করা হবে।
৭. দুই পক্ষের যুদ্ধবন্দি বিনিময় করা হবে।
৮. ভেনিসিয়ানরা ইস্তাম্বুলে একজন কনসাল নিয়োগ দেবেন, যিনি তাদের ব্যাবসায়িক স্বার্থ দেখাশোনা করবে।
ইউরোপীয় বিষয়ে উসমানীয়দের হস্তক্ষেপের এটি প্রথম নমুনা। সেকালে ভেনিসের মতো শক্তিশালী কোনো রাজ্য ইউরোপ মহাদেশে ছিল না। ব্যাবসা-বাণিজ্যে সে দেশের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জেনোয়া প্রজাতন্ত্র। ২০৫
১৪৭৬ সালের ১৩ অক্টোবর তুর্কি বাহিনীর হাতে ট্রানসিলভানিয়ার পতন হয়। তবে এ যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মুসলিম যোদ্ধা নিহত হন। হাঙ্গেরির সৈনিকরা চরম নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষর রাখে। তারা সকল বন্দিকে হত্যা করে এবং মৃতদেহের ওপর ভোজের আয়োজন করে। ১৪৮০ সালে গ্রিস ও ইতালির মধ্যবর্তী গ্রিক দ্বীপগুলো বিজিত হয়। তারপর নৌ-অধিপতি কাদাক আহমদ পাশা ইতালির উরান্ট (Otranto) শহর অভিমুখে বাহিনী প্রেরণ করেন। সুলতান তো পুরো ইতালি জয়ে কৃতসংকল্প ছিলেন। তিনি প্রপিতামহ বায়েজিদের সংকল্প বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন- যিনি বলেছিলেন, 'আমি সেন্ট পিটার্সের বেদিতে আমার ঘোড়াকে খাবার দেবো।' ১৪৮০ সালের ১১ আগস্ট (৪ জমাদিউস সানি, ৮৮৫ হি) উরান্ট বিজিত হয়। ২০৬
রোডস দ্বীপ অবরোধ
রোডস দ্বীপ ছিল সেন্ট জন নামক এক খ্রিষ্টান যাজকের আস্তানা। এ দ্বীপের অশ্বারোহীরা উসমানিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বহু ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেছিল। সালতানাতের সীমানা কণ্টকমুক্ত করার লক্ষ্যে সুলতান গোড়া খ্রিষ্টানদের আস্তানাটিতে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। ওদিকে রোডসের শাসক ছিলেন পিয়েরে দুবোসোন। তার সাথে মিশরের সুলতান ও তিউনিসিয়ার বাই-এর দ্বন্দ্ব ছিল। তুর্কি বিপদ প্রতিরোধের সুবিধার্থে তিনি তাদের সাথে শান্তিচুক্তি করেন।
১৪৮০ সালের মে মাসে মসিহ পাশার নেতৃত্বে তুর্কি বাহিনী প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত রোডস দ্বীপ অবরোধ করে। তিন মাস ধরে কামান থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু ফলাফল ছিল শূন্য। দিনে তুর্কিরা নগরপ্রাচীরের যে ক্ষতি করত, স্থানীয়রা রাতে তা মেরামত করে ফেলত।
রোডসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেল্লা সেন্ট নিকোলাই দুর্গ দখলের লক্ষ্যে ১৪৮০ সালের ২৮ জুলাই তুর্কিরা ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। তবে রোডসের নাইটরা প্রাণপণ প্রতিরোধে তুর্কিদের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। বহু সৈনিক নিহত হলে উসমানি সৈন্যরা রোডসের অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ব্যর্থতার দায়ে সেনাপতি মসিহ পাশা অপসারিত হন। ২০৭ প্রপিতামহ সুলতান বায়েজিদের স্বপ্ন পূরণে ইতালি অধিকারের পরিকল্পনাও ছিল ফাতিহের, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পূর্বেই তিনি মারা যান।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের অভিষেকের সময় উসমানি সালতানাতের আয়তন ছিল ৯ লাখ ৬৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। আবার আনাতোলিয়া ও বলকান অঞ্চলে সালতানাতের আয়তন ছিল প্রায় সমান। অর্থাৎ প্রতি অংশে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার করে। নিম্নোক্ত সাম্রাজ্য, রাজ্য ও ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো তিনি সালতানাতভুক্ত করেন: ক. দুটি সাম্রাজ্য; পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও ট্রাবজোন সাম্রাজ্য; খ. চারটি রাজ্য; ক্রিমিয়া, কারামানিয়া, বসনিয়া ও সার্বিয়া; গ. ১১টি ক্ষুদ্র রাজ্য। ফাতিহের মৃত্যুর সময় তুর্কি সালতানাতের আয়তন দাঁড়ায় ২২ লাখ ১৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। তম্মধ্যে ১৭ লাখ ৩ হাজার বর্গকিলোমিটার রোমেলি বা ইউরোপে এবং ৫ লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার আনাতোলিয়ায় (এশিয়ায়)। ২০৮
টিকাঃ
১১১. Ducas, op.cit., p. 77.
১১২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০-৭১; Ducas, op.cit., p. 61.
১১৩. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২
১১৪. Ducas, op.cit., p. 81; Vasiliev, op.cit., p. 647; Ostrogorsky, op.cit., p. 505.
১১৫. Vasiliev, op.cit., p. 647; Ostrogorsky, op.cit., p. 506.
১১৬. Ducas, op.cit., p. 82.
১১৭. Vasiliev, op.cit., p. 647; Ostrogorsky, op.cit., p. 506.
১১৮. Ehrlich, op.cit., p. 152.
১১৯. Leonard of Chios, The History of the Loss and Captivity of the City of Constantinopole, pp. 26, 29.
১২০. Ducas, op.cit., p. 65-6.
১২১. Ducas, op.cit., p. 66.
১২২. Laonicus Chalcocondylas, Turkish History (Book VIII), p. 42; Ducas, op.cit., p. 66; বেক, প্রাগুক্ত, ১৬১; উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৩১; Gibbon, op.cit., p. 11; Vasiliev, op.cit., p. 646- 47; Walsh, op.cit., p. 548.
১২৩. Ducas, op.cit., p. 70.
১২৪. Ducas, op.cit., p. 65; Vasiliev, op.cit., p. 646.
১২৫. Ducas, op.cit., p. 71; Dolfin, op.cit., p. 127.
১২৬. এক রতল = ৪০ তোলা
১২৭. Jones, op.cit., p. 53; 70-71.
১২৮. Leonard, op.cit., pp. 16, 18; বেক, প্রাগুক্ত পৃ., ১৬১; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২; Vasiliev, op.cit., p. 650; Ostrogorsky, op.cit., p. 506; Gibbon, op.cit., p. 13; Ducas, op.cit., p. 77-78.
১২৯. Vasiliev, op.cit., p. 647; Gibbon, op.cit., p. 11.
১৩০. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৭-৭৮
১৩১. Tedaldi, op.cit., p. 9; Chalcocondylas, op.cit., p. 43-4; Ducas, op.cit., p. 84.
১৩২. Tedaldi, op.cit., p. 9; Leonard, op.cit., p. 20; Chalcocondylas, op.cit., p. 43-4; Ducas, op.cit., p. 84.
১৩৩. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১-৮৫
১৩৪. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯২
১৩৫. Leonard, op.cit., p. 17.
১৩৬. Ducas, op.cit., p. 84.
১৩৭. Ducas, op.cit., p. 83, 88-9.
১৩৮. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১
১৩৯. উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৩৪; Leonard, op.cit., p. 22; Chalcocondylas, op.cit., p. 47; Ducas, op.cit., p. 84.
১৪০. Chalcocondylas, op.cit., p. 46; Ducas, op.cit., p. 85-6; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৪-৩৫; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩; Vasiliev, op.cit., p. 650; Walsh, op.cit., p. 548.
১৪১. Leonard, op.cit., p. 20.
১৪২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, ১০২
১৪৩. Ducas, op.cit., p. 86.
১৪৪. Leonard, op.cit., p. 21.
১৪৫. Vasiliev, op.cit., p. 651.
১৪৬. Leonard, op.cit., p. 24; Chalcocondylas, op.cit., p. 46; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৫
১৪৭. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬
১৪৮. Tedaldi, op.cit., p. 5; Leonard, op.cit., p. 17-8; Chalcocondylas, op.cit., p. 45.
১৪৯. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪
১৫০. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১
১৫১. Tedaldi, op.cit., p. 5; Leonard, op.cit., p. 18; Chalcocondylas, op.cit., p. 45.
১৫২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, ১১২
১৫৩. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬১-৬২। গিবনের মতে, কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পর তৃতীয় দিনে আবু আইউব আনসারি-এর কবর আবিষ্কৃত হয় (Gibbon, op.cit., p. 29).
১৫৪. Ducas, op.cit., p. 89; 91; বেক, প্রাগুক্ত ১৬৩-৬৪; Akgunduz & Ozturk, Otoman History: Misperceptions and Truths, p. 133)
১৫৫. Leonard, op.cit., p. 25.
১৫৬. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৬; উমারি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৬; Ducas, op.cit., p. 92.
১৫৭. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৪, ১৩৬; মুহাম্মদ সাফওয়াত, ফাতহুল কুসতানতিনিয়্যাহ ওয়া সিরাতুস সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ, পৃ. ১০৩; Leonard, op.cit., p. 31-2.
১৫৮. Tedaldi, op.cit., p. 6.
১৫৯. Leonard, op.cit., p. 32.
১৬০. উজতুনা, প্রাগুক্ত ১৩৭; রাশিদি, প্রাগুক্ত ১২২; Leonard, op.cit., p. 32.
১৬১. Leonard, op.cit., p. 33.
১৬২. Vasiliev, op.cit., p. 651.
১৬৩. Ducas, op.cit., p. 92.
১৬৪. Leonard, op.cit., p. 33; Vasiliev, op.cit., p. 651.
১৬৫. Vasiliev, op.cit., p. 651-52; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৭
১৬৬. Tedaldi, op.cit., p. 8; Leonard, op.cit., p. 36-7; Chalcocondylas, op.cit., p. 50; Ducas, op.cit., p. 101; Riccherio, op.cit., p. 122-23; Vasiliev, op.cit., p. 652; Ostrogorsky. op.cit., p. 507.
১৬৭. Leonard, op.cit., p. 37; Chalcocondylas, op.cit., p. 50, 52; Ducas, op.cit., p. 95-6.
১৬৮. Chalcocondylas, op.cit., p. 50-1; Gibbon, op.cit.. p. 26.
১৬৯. কতিপয় ইউরোপীয় ইতিহাসবিদের মতে-আয়া সোফিয়ায় আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষ তুর্কিদের হাতে নিহত হয়েছিল। (Vasiliev, op.cit., p. 653)
১৭০. Vasiliev, op.cit., p. 653; Ostrogorsky, op.cit., p. 507.
১৭১. Ehrlich, op.cit., p. 148; Vasiliev, op.cit., p. 654.
১৭১. একদল খ্রিষ্টান এখনও বিশ্বাস করে, প্যাট্রিয়ার্থ ও পবিত্র মূর্তি প্রার্থনা শেষ না করেই গির্জার দেয়াল কেটে অন্তর্হিত হয়েছেন। যেদিন তুর্কিরা কনস্ট্যান্টিনোপল ত্যাগ করবে, সেদিন প্যাট্রিয়ার্থ আবার বের হবেন এবং অবশিষ্ট প্রার্থনা শেষ করবেন। (বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪; Vasiliev, op.cit., p. 653.
১৭৩. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪০
১৭৪. ১০ জুলাই, ২০২০ তারিখের তুরস্কের আদালত আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে ঘোষণা করে। ওই দিনই তুর্কি প্রেসিডেন্ট আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন। ২৪ জুলাই, ২০২০ তারিখে জুমার সালাত আদায়ের মাধ্যমে মসজিদ হিসেবে আয়া সোফিয়ার নতুন যাত্রা শুরু হয়। এ বিষয়ে নানামুখী প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এই বইয়ের শেষে সংযুক্ত পরিশিষ্টে আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
১৭৫. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৫
১৭৬. Mahomet bestowed on his rival the honours of a decent funeral (Gibbon, op.cit., p. 27).
১৭৭. Leonard, op.cit., pp. 16, 31-2, 39-40; Chalcocondylas, op.cit., p. 51; Ducas, op.cit., p. 104.
১৭৮. বেক, প্রাগুক্ত, ১৬৫; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১-৪২; Chalcocondylas, op.cit., pp. 53-4.
১৭৯. Gibbon, op.cit., p. 29.
১৮০. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১; Gibbon, op.cit., p. 29.
১৮১. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১
১৮২. Ducas, op.cit., p. 102.
১৮৩. Ducas, op.cit., p. 112; Lomellino 133.
১৮৪. উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৪১
১৮৫. মুহাম্মাদ হারব, আল-উসমানিয়ান ফিত তারিখ ওয়াল হাদারাহ, পৃ. ৩৪৩, ৩৪৭.
১৮৬. আশ-শাওকানি, আল-বাদর আল-তালি' পৃ. ১৬৬-৬৭
১৮৭. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৯।
১৮৮. হারব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৬
১৮৯. Vasiliev, op.cit., p. 655.
১৯০. Gibbon, op.cit., p. 32.
১৯১. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৭
১৯২. ফাহমি, ১৩৭-৮; Gibbon, op.cit., p. 31-2.
১৯৩. জামাল আবদুল হাদি, আদ-দাওলাহ উসমানিয়্যাহ, পৃ. ৪৭
১৯৪. প্রাগুক্ত, ৪৮
১৯৫. উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৪২
১৯৬. সায়্যিদ মুহাম্মাদ আস-সায়্যিদ মাহমুদ, তারিখুদ দাওলা আল-উসমানিয়্যাহ, পৃ. ১৯৫; বেক, প্রাগুক্ত, ১৬৮।
১৯৭. Vasiliev, op.cit., p. 654; Ostrogorsky, op.cit., p. 508.
১৯৮. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬১; উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৫০; Ostrogorsky, op.cit., p. 508.
১৯৯. এক্ষেন্দিয়ার ও তার বংশধর দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চল শাসন করেছে। ১৪৭৯ সালে ৬১ বছর বয়সে এস্ফেন্দিয়ার মারা যান। তার সাথে ফাতিহের বোনের বিয়ে হয়েছিল। ফিকহ বিষয়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও রয়েছে। (উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।)
২০০. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৯; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১; Vasiliev, op.cit., p. 654; Ostrogorsky, op.cit., p. 508.
২০১. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০২-২০৩; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২-৫৩; বেক, প্রাগুক্ত পৃ. ১৭০-৭১
২০২. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৭; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭১-১৭২
২০৩. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৮; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০-৬৬
২০৪. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩-১৭৪; মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৯
২০৫. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৯; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৫
২০৬. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৬
২০৭. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১১-১২; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৬
২০৮. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৮
১৪৫১ সালে সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরেই কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ। সংবাদ পেয়ে বাইজেন্টাইন সম্রাটও প্রতিরোধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। আমরা ধারাবাহিকভাবে দুই নৃপতির প্রস্তুতির বিবরণ ও যুদ্ধের বৃত্তান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করব।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রস্তুতি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাট ছিলেন একাদশ কনস্ট্যান্টাইন ড্রাগাসেস (Constantine XI Dragases)। তিনি ১৪৪৮ সালে মসনদে আরোহণ করেন। উসমানি সালতানাতের অব্যাহত সম্প্রসারণের মুখে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে। তরুণ সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন-এমন সংবাদ পেয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন নিশ্চিত হন, তার রাজধানী হুমকির সম্মুখীন। তা ছাড়া মিত্রদের সাহায্যের আশা দুরাশা মাত্র। তাই সাম্রাজ্যের সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু করেন। ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রাচীন সাম্রাজ্যটি রক্ষায় তিনি চেষ্টার ত্রুটি করেননি।
খাদ্য ও রসদ সংগ্রহ তুর্কি সালতানাতের সম্ভাব্য অবরোধ প্রতিরোধে বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথমেই খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় রসদপত্র সংগ্রহে মনোযোগী হন। এ লক্ষ্যে ১৪৫২ সালের শীতের মৌসুমে খ্রিষ্টান নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ও দ্বীপসমূহে অফিসার প্রেরণ করেন।
Chios দ্বীপে চারটি বড়ো বাণিজ্যতরি মদ, তেল, ডুমুর, বার্লি, carob ও অন্যান্য খাদ্যশস্যসহ অপেক্ষা করছিল। পেলোপোলেস হতে আরেকটি বড়ো জাহাজ এসে যুক্ত হলে সবগুলো একসঙ্গে কনস্ট্যান্টিনোপলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে। জাহাজগুলোতে খাদ্যশস্য ছাড়াও কয়েক শত সৈনিক ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ছিল। ১১১
সাহায্য লাভের আশায় বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা ইউরোপীয় স্বধর্মী রাজন্যবর্গের সাহায্য লাভের আশায় কনস্ট্যান্টাইন অভিনব এক পথ গ্রহণ করেন-যা ইতঃপূর্বে অন্য কোনো সম্রাট প্রয়োগ করেননি। এটি ছিল বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের সাথে সার্ব রাজকন্যা 'মারা ব্রাঙ্কোভিচ'-এর বিবাহ হয়েছিল। সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি সার্বিয়ায় ফিরে গেলে কনস্ট্যান্টাইন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
তরুণ সম্রাট পঞ্চাশোর্ধ্ব বিধবাকে বিয়ে করতে আগ্রহী হন কেবল সার্বিয়ার রাজার সাহায্য লাভের আশায়। সৎ মায়ের প্রতি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের আচরণও তাকে এই প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করে। সুলতান মুরাদের মৃত্যুর পর মারা ব্রাঙ্কোভিচ তার পিতার কাছে ফিরে যেতে চাইলে দ্বিতীয় মুহাম্মাদ বিপুল পরিমাণ উপহার দিয়ে অতি সম্মানের সাথে তাকে সার্বিয়ায় ফেরত পাঠান। তা ছাড়া খরচ নির্বাহের জন্য সার্বিয়ার বাইরে কিছু ভূ-সম্পত্তি তার অনুকূলে বরাদ্দ করেন। তাই বাইজেন্টাইন সম্রাটের আশা ছিল, মারা ব্রাঙ্কোভিচের সাথে তার বিয়ে হলে তরুণ সুলতান হয়তো তাঁর সৎ মায়ের স্বামীর বিরুদ্ধে লড়াই করবেন না। সে যাই হোক, কনস্ট্যান্টাইনের এ আশা পূরণ হয়নি; মারা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
তারপরও সম্রাট বন্ধুভাবাপন্ন রাজপরিবারগুলোর সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যান। এবার তার সভাসদরা পরামর্শ দেন Trebizond-এর সম্রাট David Megas Komnenos-এর কন্যার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের। তবে নতুন আরেকটি প্রস্তাবে এই পরিকল্পনা বাতিল হয়।
সম্রাট তার বন্ধু ইতিহাসবিদ George Phrantza (1401-1478)-এর প্রস্তাবে জর্জিয়ার এক রাজকন্যাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেন। তার আশা ছিল, বর্বর জাতিটির শক্তিশালী বাহিনীর সাহায্যে তুর্কিদের হটানো সম্ভব হবে। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই রাজধানী অবরুদ্ধ হয়ে যায়।
কোনো কোনো ইতিহাসবিদ ভেনিস প্রজাতন্ত্রের শাসকের কন্যার সাথে বিয়ের প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে লাতিনপ্রীতির অভিযোগ উঠার ভয়ে তিনি তা বাদ দেন। ১১২ ফলে এর পরিণাম হয় উলটো। একবার বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আবার পিছিয়ে যাওয়াকে ভেনিসিয়ানরা অপমানজনক বলেই মনে করে। আর তাই অবরোধের সময় সম্রাটের সাহায্যে এগিয়ে আসতে তারা গড়িমসি করে।
সাহায্য চেয়ে ইউরোপে প্রতিনিধি প্রেরণ ইউরোপের সাহায্যপ্রাপ্তির ব্যাপারে সম্রাট সম্পূর্ণ নিরাশ হননি। তিনি আশা করেন, খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী মুসলিমদের হাতে অবরুদ্ধ হতে দেখে নিশ্চয় ইউরোপিয়ানরা স্বধর্মী ভাইদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। প্রথমেই পোপ পঞ্চম নিকোলাসের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। সম্রাট তাকে এই বলে সতর্ক করেন, তুর্কিরা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করার পর ইতালি দখল করে নেবে। তা ছাড়া ফ্লোরেন্স চার্চ কাউন্সিলে (১৪৩১-১৪৩৯) ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স গির্জার ঐক্যের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাও মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ইতঃপূর্বে রোমানরা যে গড়িমসি করেছে, তার জন্য ওজরখাখি করেন। দুই গির্জার ঐক্যের ব্যাপারে কনস্ট্যান্টাইনের ভূমিকা তার পূর্বসূরি সম্রাটদের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিল না-যারা কেবল বিপদে পড়লে ঐক্য প্রস্তাব বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতেন। বিপদ সরে গেলে আবার পূর্ববৎ লাতিন-ঘৃণার চর্চা অব্যাহত রাখতেন। ১১৩
তারপর তিনি ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের নিকট সাহায্য চেয়ে দূত পাঠান। ১৪৫২ সালে পুরো শীতের মৌসুমে সম্রাটের প্রতিনিধিরা ইউরোপ চষে বেড়ান। অবশ্য নগরবাসী কোনো প্রকার সাহায্যপ্রাপ্তির আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে কোনো কোনো ইউরোপীয় খ্রিষ্টান এমন ক্ষীণ আশা পোষণ করত, অলৌকিক কিছু ঘটে শেষ পর্যন্ত অর্থোডক্স খ্রিষ্টবাদের দুর্গ রক্ষা হবে।
যৎসামান্য সাহায্যপ্রাপ্তি সম্রাটের কূটনৈতিক তৎপরতা কিছুটা সাফল্য নিয়ে আসে। ভেনিসের দুটি যুদ্ধজাহাজ বসফরাস অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ক্যাথলিক পোপ পঞ্চম নিকোলাসের প্রতিনিধি কার্ডিনাল ইজিদুর [Isidore of Kiev (১৩৮৫-১৪৬৩)] হাজির হন দুশো যোদ্ধা নিয়ে। ইনি ছিলেন মস্কোর সাবেক আর্চবিশপ। তা ছাড়া দুই চার্চের (ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স) ঐক্যের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত ফ্লোরেন্স কাউন্সিলেও তিনি অংশ নেন। উক্ত কাউন্সিলের ঐক্যপ্রচেষ্টার স্মরণে কার্ডিনাল ইজিদুর ১২ ডিসেম্বর, ১৪৫২ তারিখে আয়া সোফিয়ায় দুই ধর্মমতের যৌথ প্রার্থনার আয়োজন করে। সেই দুর্যোগের দিনে খ্রিষ্টান জনগণের মাঝে সংহতি বৃদ্ধির আশায় হয়তো ওই প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল, তবে তা ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ বাড়িয়ে দেয়! এর ফলে রাজধানীবাসীর মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বাইজেন্টিয়ামের অন্যতম বিশিষ্ট নাগরিক লুকাস নোটারাসের সুবিখ্যাত বক্তব্যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে-
'আমাদের শহরে তুর্কি পাগড়ির উপস্থিতি লাতিন টায়রা (পোপের মাথার ত্রিতল মুকুট) দেখার চেয়ে ভালো।'১১৪
এরপর ভেনিস হতে থেকে আসেন বিখ্যাত গিউস্টিনিয়ানি পরিবারের সদস্য গিওভান্নি লঙ্গো [Giovanni Giustiniani (১৪১৮-১৪৫৩)] নামক এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রী। তার সাথে ছিল দুটি বড়ো জাহাজ; একটি অস্ত্রশস্ত্র ও রসদবাহী, আরেকটিতে ছিল সাতশো যোদ্ধা-যাদের সবাই বয়সে তরুণ, অস্ত্রসজ্জিত এবং যুদ্ধ করতে আগ্রহী।
গিওভান্নিও ছিলেন খুবই যোগ্য ও যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ। এই স্বেচ্ছাসেবক ও অন্তঃপ্রাণ যোদ্ধাকে সম্রাট উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং তাকে প্রতিরোধ বাহিনীর জেনারেল কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। আর তিনি এই ফরমান দিয়ে স্বর্ণশাসন জারি করেন, তুর্কি বিপদ কেটে গেলে তাকে ইজিয়ান সাগরের Lemons দ্বীপ দেওয়া হবে। ১১৫
দায়িত্ব পাওয়ার পরে গিওভান্নি সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব আপন স্কন্ধে নিয়ে নেন। প্রাচীরের ওপর তিনি ছোটো ছোটো কামান স্থাপন করেন। তারপর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের জাতিগতভাবে গ্রুপে গ্রুপে বিভক্ত করা হয়। সেইসঙ্গে প্রত্যেকের দায়িত্বও বণ্টন করা হয়। গিওভান্নি নিজে প্রাসাদ সংলগ্ন প্রাচীরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। ১১৬ কনস্ট্যান্টিনোপলের যাজকরাও যৎসামান্য সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দেন। মুসলিমদের হাত থেকে খ্রিষ্টবাদের রাজধানীকে রক্ষা করার প্রেরণাই তাদের উৎসাহ জোগায়, তা না হলে যুদ্ধবিদ্যার কিছুই তারা জানত না।
বাইজেন্টাইন রাজধানী রক্ষায় সব জাতির লোকেরা ঐক্যবদ্ধ হলো: ক্যাথলিক, অর্থোডক্স, লাতিন, গ্রিক, ভেনিসিয়ান, জেনোয়ান-সবাই শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার জন্য শপথ নেন। এমনকী সম্রাটের বেতনভুক্ত তুর্কি সৈনিকরাও বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। কমান্ডার ডোরগানোর নেতৃত্বে তারা শহর রক্ষার দায়িত্ব পালন করে; পরবর্তী সময়ে লড়াইয়ে অনেকে প্রাণও হারায়।
কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীর সংস্কার এবং গোল্ডেন হর্নের নিরাপত্তা বৃদ্ধি কনস্ট্যান্টিনোপলের সৈন্যসংখ্যা ছিল সাকুল্যে আট হাজার। এত অল্প যোদ্ধা নিয়ে তুর্কিদের প্রতিরোধ করা অসম্ভব ছিল। বস্তুত কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতিরক্ষার মূল বিষয় ছিল অবস্থানগত সুবিধা-যার বদৌলতে শহরটি শত শত বছর ধরে বহু অবরোধের ধকল সামলে টিকে ছিল। তা ছাড়া নগরপ্রাচীরও শহরের প্রতিরক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করত। ইতঃপূর্বে সম্রাট অষ্টম জন ও একাদশ কনস্ট্যান্টাইন নগরপ্রাচীর সংস্কার করেছিলেন। এবারও দৃষ্টি দেওয়া হয় হাজার বছরের পুরোনো নগরপ্রাচীর মেরামতের ওপর। কিন্তু বাহিরের সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করতেও অসুবিধা দেখা দেয়। তারা কবরের ওপর স্থাপিত পাথর এবং পুরোনো স্থাপনা ভেঙে সেগুলো কেটে কোনোভাবে প্রাচীর মেরামত করে।
সমুদ্রপথে তুর্কি নৌযানের আগমন প্রতিরোধের জন্য গোল্ডেন হর্নের প্রতিরক্ষা মজবুত করার নির্দেশ দেন সম্রাট। শহরের উত্তরাংশ হতে গ্যালাটা পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে শিকল স্থাপন করা হয়। এই শিকলগুলো উত্তর দিক থেকে আসা তুর্কি জাহাজগুলো আটকে দিয়েছিল। অবরুদ্ধ শহর রক্ষায় এগুলোর ভূমিকা কম ছিল না। ১১৭
প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করিয়ে সুলতান মুহাম্মাদকে বিব্রত করার চেষ্টা উসমান পরিবারের জনৈক সদস্য ওরহান কনস্টান্টিনোপলে বন্দি ছিলেন। সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তাকে মুক্ত করে সিংহাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দ্বিতীয় মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। ইতঃপূর্বে অন্য সম্রাটরদেরও আমরা অনুরূপ কৌশল প্রয়োগ করতে দেখেছি। সম্রাট ম্যানুয়েল শাহজাদা মুস্তাফাকে দুই বার ব্যবহার করে সুলতান বায়েজিদ ও দ্বিতীয় মুরাদকে উত্যক্ত করেছেন। বর্তমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনও অনুরূপ ষড়যন্ত্র আটঘাট বাঁধেন। তিনি ওরহানকে সৈনিক ও রসদ সরবরাহ করে সাহায্য করার হুমকিও দেন।
সুলতান দেখলেন, এসব খুচরো হুমকির টোটকা জবাব দেওয়া যাবে না। তাই তিনি বাইজেন্টাইন রাজধানী অধিকারে কৃতসংকল্প হন।
কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা
সুলতানের প্রস্তুতির বিবরণ দেওয়ার পূর্বে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও সম্রাটের সৈন্যবিন্যাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল দুর্ভেদ্য ও দুর্গম্য। ত্রিভুজাকৃতির এ শহরের একদিক ছিল মর্মর সাগরের দিকে, আরেক দিক ছিল গোল্ডেন হর্নের বন্দর সংলগ্ন-একটি প্রাচীর এই দুই দিক ঘিরে রেখেছিল। আরেকদিক তথা পশ্চিম দিক ইউরোপীয় স্থলভাগের সাথে যুক্ত ছিল। এদিকে চার মাইল দীর্ঘ দুটি প্রাচীর ছিল। অন্তঃপ্রাচীরের উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০ ফুট। ১৮০ ফুট পরপর ৬০ ফুট উঁচু গম্বুজ ছিল। আর বহিঃপ্রাচীরের উচ্চতা ছিল প্রায় ২৫ ফুট। এটিতেও কিছু বুর্জ ছিল। দুই প্রাচীরের মাঝখানে ৫০ থেকে ৬০ ফুট ছিল খোলাভূমি। বহিঃপ্রাচীরের বাইরেও একটি প্রাচীর ছিল। তবে এটি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; বরং এটিকে ব্যারিকেড বলাই ভালো। ব্যারিকেড ও বহিঃপ্রাচীরের মাঝেও কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। তারপর ছিল প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ পরিখা। এটিই ছিল কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রথম প্রতিরক্ষা। ১১৮
কনস্ট্যান্টাইনের প্রতিরোধ পরিকল্পনা
প্রাকৃতিক সুরক্ষার ওপর নির্ভর করে স্বল্পসংখ্যক সৈনিক নিয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার প্রতিরোধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। নগরীর দুই দিক তথা মর্মর সাগর ও গোল্ডেন হর্নের অংশের নিরাপত্তার জন্য প্রাচীরই যথেষ্ট ছিল। অর্থাৎ ওদিকে কোনো সৈন্য মোতায়েনের প্রয়োজন ছিল না। শত্রুসৈন্যের পক্ষে নৌযানে চড়ে এসে প্রাচীর টপকে শহরে প্রবেশ ছিল অসম্ভব। আর তাই এক দিক তথা স্থলপ্রাচীরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাজধানী সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হতো।
পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে কনস্ট্যান্টিনোপলের জনসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজারের মতো। তন্মধ্যে প্রায় ছয়-সাত হাজারের মতো সৈনিক ছিল। সম্রাটের আবেদনে সাড়া দিয়ে ভেনিস, জেনোয়া, ক্রিট, রোম ও স্পেন হতে অল্পসংখ্যক যোদ্ধা কনস্ট্যান্টিনোপলে এসেছিলেন। সব মিলিয়ে আট-দশ হাজারের বেশি সৈন্য নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ছিল না। কনস্ট্যান্টিনোপলের সাধারণ নাগরিক ও যাজকরাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা মূলত প্রাচীর মেরামতে অংশ নিত।
শহরের প্রাচীরে কয়েকটি গেট ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আক্রম্য গেট সেন্ট রোমানাস গেট। গিওভান্নি গিউস্টিনিয়ানি তার সৈনিকদের এদিকে মোতায়েন করেন। অবশিষ্ট সৈনিকদের নগরপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তা ও তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত করা হয়। স্বয়ং সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন ও তার প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি নোটারাসও সশরীরে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন।
কনস্ট্যান্টিনোপলে পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। কিছু কামান ছিল, কিন্তু দুর্বল দেয়ালের ওপর ওগুলো স্থাপন করা সম্ভব ছিল না। অর্থ সংকটের কারণে সৈনিকদের বেতন দেওয়া সম্ভব ছিল না। সঙ্গিন অবস্থা। তাই মন্ত্রীদের পরামর্শে সম্রাট জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে গির্জা ও রাজপ্রাসাদের মূল্যবান তৈজসপত্র গলিয়ে মুদ্রা বানিয়ে সৈনিকদের মাঝে বিতরণ করেন। পরিবারের দেখভালের অজুহাতে কেউ যেন যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে পালিয়ে না যেতে পারে, সেজন্য সবার মাঝে সমানহারে রুটি বণ্টনের নির্দেশ দেন। এভাবে সীমিত সামর্থ্য ও জনবল নিয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন রাজধানী রক্ষার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। ১১৯
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের প্রস্তুতি
বাইজেন্টাইন সম্রাট যখন প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ অবরোধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। অভিযানের পূর্বে তাঁর প্রস্তুতির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কামান ও দুর্গ নির্মাণ।
রোমেলি হিসার নির্মাণ
কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সুলতান প্রথমেই বসফোরাসের ইউরোপীয় তটে একটি দুর্গ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সংবাদ পেয়ে বাইজেন্টাইন সম্রাট অত্যন্ত জোরালো আপত্তি জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন। সুলতানের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেন-
'আপনার পূর্বপুরুষ ওরহানপুত্র মুরাদের আদ্রিয়ানোপল জয়ের একশত বছর হতে চলল, অথচ কোনো সুলতান বসফোরাসের ইউরোপীয় তটে দুর্গ বানাতে চাননি। প্রণালীর আনাতোলিয়া অংশে একটি দুর্গ নির্মাণের পূর্বে আপনার পূর্বপুরুষ সুলতান মুহাম্মাদ বহুদিন অপেক্ষা করেন বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েলের অনুমতির জন্য। অথচ আনাতোলিয়ায় বহুদিন ধরে তুর্কিরাই শাসন করে আসছিল। এখন আপনার সাথে আমাদের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। তবুও আপনি পন্টিক সাগরে (কৃষ্ণসাগর) ফ্রাঙ্কদের প্রবেশাধিকার অস্বীকার করতে মনস্থ হয়েছেন, আমাদের ক্ষুধায় মারতে চান এবং বাণিজ্যসূত্রে আমরা যে রাজস্ব পাই, তা হতে আমাদের বঞ্চিত করতে চাইছেন! আপনার পরিকল্পনা পরিবর্তন করুন, আমরা মিনতি করছি। আমরা আপনার ভালো বন্ধু হিসেবে থাকব, যেমন ছিলাম আপনার পিতা মহান শাসক মুরাদের। এমনকী আপনি কর চাইলে আমরা তাও আদায় করতে রাজি। '১২০
বাইজেন্টাইন সম্রাটের আপত্তির জবাবে সুলতান বললেন-
'আমার শাসনাধীন এলাকায় দুর্গ নির্মাণের অধিকার আমার আছে। আপনি কি ভুলে গেছেন আমার পিতার অসুবিধার কথা, যখন আপনার সম্রাট হাঙ্গেরিয়ানদের সাথে জোট বেঁধে স্থলভাগে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল? আর ফ্রাঙ্ক রণতরিগুলো হেলেসপন্টে (দার্দানেলিস) ঢুকে গ্যালিপোলির মুখ বন্ধ করে আমার পিতার প্রণালি অতিক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছিল।...সেই সঙ্গিন মুহূর্তে আমার পিতা বহু কষ্টে বসফোরাস অতিক্রম করেছিলেন। তখন তিনি শপথ করেছিলেন, প্রণালির আনাতোলিয়া অংশে যে দুর্গ আছে, সেটির ঠিক বিপরীতে পশ্চিম তটে একটি দুর্গ নির্মাণ করবেন; তবে তিনি সফল হতে পারেননি। আল্লাহর সাহায্যে আমি তা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। আমি কি আমার আমার অধিরাজ্যে যা ইচ্ছা তা নির্মাণ করতে পারি না? (দূতগণ!) যান! আপনাদের সম্রাটকে বলুন, এই শাসক তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো নন। তাঁরা যা সম্পন্ন করতে পারেননি, সেটির বাস্তবায়ন এখন তার হাতের মুঠোয়। তাঁরা যা করার উদ্যোগ পর্যন্ত নেননি, তা সম্পাদনে ইনি শুধু ইচ্ছুকই নন; বরং অতি তৎপর। এই বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য যদি আবারও কোনো দূত পাঠানো হয়, তাহলে এমন হতে পারে, তিনি মাথা নিয়ে ফিরে যেতে পারবেন না।' ১২১
দুর্গ নির্মাণের জন্য সমগ্র সালতানাত হতে শ্রমিক সংগ্রহ করা হয়। বহু অজ্ঞাত স্থানে চুল্লি নির্মাণ করে Lime প্রস্তুত করে দুর্গ নির্মাণের স্থানে আনা হয়। নিকোমিডিয়া (ইজমিত) ও পন্টিক হেরাক্লিয়া (কারাদেনিজ এরেলি) হতে আনা হয় কাঠ এবং আনাতোলিয়া হতে আনা হয় পাথর। এভাবে উপকরণ ও শ্রমিক জোগাড় সম্পন্ন হলে দুর্গ নির্মাণ তদারকির জন্য ১৪৫২ সালের মার্চে সুলতান মুহাম্মাদ নিজে বের হন রাজধানী আদ্রিয়ানোপল হতে।
বসফরাসের এশীয় তীরে যেখানে সুলতান বায়েজিদ আনাতোলি হিসার বা কুজাল হিসার নামে দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, সেটির ঠিক বিপরীতে ইউরোপীয় তটে নতুন দুর্গ নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করেন। ত্রিভুজ আকৃতির দুর্গের প্রতিটি কোনায় একটি করে টাওয়ার নির্মাণ করা হয়; দুটি টাওয়ার ছিল সাগরের দিকে, আরেকটি স্থলভাগের দিকে। শিশার প্রলেপযুক্ত টাওয়ারগুলোর বেধ ছিল ৩২ ফুট, আর দেয়ালের বেধ ছিল ২২ ফুট।
সুলতান নিজে উপস্থিত থেকে দুর্গ নির্মাণের কাজ তদারকি এবং তাঁর মন্ত্রীদেরও সম্পৃক্ত করেন। তিনটি টাওয়ার নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় তিন মন্ত্রী যথা- খলিল পাশা, জাগনুশ পাশা ও সারিজা বেগের ওপর। আর দেয়াল নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ তত্ত্বাবধান করেন সুলতান মুহাম্মাদ। এভাবে নিবিড় তত্ত্বাবধানে তিন বা চার মাসের মধ্যেই নির্মিত হয় নতুন দুর্গ। সুলতান এটির নাম রেখেছিলেন বুগাজকেসেন, বসফোরাসের ইউরোপীয় তটে অবস্থিত বলে তুর্কিদের কাছে যা রোমেলি হিসার নামে পরিচিত। বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদগণের বিবরণে এটির নাম দেওয়া হয়েছে Laemocopia বা Pas-Chesen; দুটোরই অর্থ Cut-Throat। বসফোরাসের সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে (৬৬০ মিটার) দুই পাশে দুটি দুর্গ দাঁড়িয়ে যাওয়ায় প্রণালীর ওপর সুলতানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তুর্কিদের অনুমতি ব্যতীত কোনো জাহাজের পক্ষে প্রণালি অতিক্রম অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১২২
দুর্গ নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার পর খলিল পাশা কর্তৃক নির্মিত টাওয়ারের ওপর একটি কামান স্থাপন করা হয়। অতঃপর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ফিরোজ আগাকে দুর্গাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নিম্নরূপ নির্দেশ দেন সুলতান মুহাম্মাদ-
'হেলেসপন্ট হতে পন্টিক সাগরে যাওয়ার সময় কিংবা পন্টিক সাগর হতে হেলেসপন্টে যাওয়ার সময় যেকোনো রাজ্যের যেকোনো ধরনের/আকারের নৌযান (এমনকী সুলতানের নৌযানও) যেন পাল না নামিয়ে এবং টোল আদায় না করে বসফোরাস অতিক্রম করতে না পারে। কোনো জাহাজ এ নির্দেশ মানতে না চাইলে সেটিকে যেন কামানের গোলায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়।'১২৩
আরও কিছু প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করে দুর্গরক্ষায় চারশো সৈনিক নিয়োগ দিয়ে আদ্রিয়ানোপলে ফিরে যান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ।
বসফোরাসের থ্রাসিয়ান প্রান্তে নির্মিত দুর্গটির অবস্থান কনস্ট্যান্টিনোপল হতে খুব একটা দূরে ছিল না। তাই নগরবাসীর মনে রোমেলি হিসার চরম ভীতির সঞ্চার করেছিল-যার বিবরণ পাওয়া যায় সমকালীন ইতিহাসবিদ ডুকাসের বিবরণে। তিনি লিখেছেন-
'Now the end of the city is near. Now the signal is sounding for the end of our nation, now is the time of Antichrist. What shall we do, and what will be our fate? O Lord! Let our lives be taken from us, before the eyes of Thy servants can see the destruction of the city; let not Thy enemies say, O Lord! 'Where are the Saints who keep watch over it?'124
'শহরের পতন অত্যাসন্ন। আমাদের জাতির ধ্বংসের ইঙ্গিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এখন তো খ্রিষ্টবিরোধীদের সময়। আমরা কী করব, আমাদের ভাগ্যে কী আছে? প্রভু! আপনার বান্দারা শহরের ধ্বংস দেখার আগে আমাদের জীবন নিয়ে নিন! আপনার শত্রুরা যেন বলতে না পারে, প্রভু! সাধু পুরুষরা কোথায়, যারা একে রক্ষা করবে?'
সুলতানি কামান
যুদ্ধ প্রস্তুতির সময় কনস্ট্যান্টিনোপল হতে পালিয়ে সুলতানের কাছে হাজির হন হাঙ্গেরিয়ান কামান প্রকৌশলী উর্বান। তিনি প্রথমে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের কাছেই গিয়েছিলেন। কিন্তু তার দাবিমতো বেতন এবং কামান বানানোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা সম্রাটের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই উর্বানকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর তিনি সম্রাটকে ছেড়ে সুলতানের কাছে চলে আসেন।
সুলতান হাঙ্গেরিয়ান প্রকৌশলীকে সাদরে বরণ করে তাকে বৃহদাকারের কামান নির্মাণের আদেশ দেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্থান হতে ব্রোঞ্জ, সালফার, সোরা ও তামাসহ কামান নির্মাণ ও ব্যবহারের অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করা হয়। প্রকৌশলী উর্বানের জন্য সুলতান সম্মাজনক ভাতা নির্ধারণ করেন। ডুকাসের মতে-এর এক-চতুর্থাংশ পারিশ্রমিক দেওয়া হলেও উর্বান কনস্ট্যান্টিনোপলে থেকে যেতেন। ১২৫
তারপর উর্বান তিন মাসের মধ্যে অনেকগুলো কামান নির্মাণ করেন। এগুলোর মাঝে একটি ছিল বিরাট আকারের। এত বড়ো কামান এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। এটির নকশা করেছিলেন সুলতান নিজে, ওজন ছিল ৭০০ টন, উৎক্ষিপ্ত গোলার ওজন ছিল ১২ হাজার রতল১২৬। এদিনে কামানটির পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সময় তীব্র নিনাদ সৃষ্টির ব্যাপারে নগরবাসীকে সতর্ক করা হয়েছিল। এক মাইল দূরে কামানের যে গোলা পড়েছিল, তা ছয় ফুট (এক কোলাজ) গভীর গর্ত সৃষ্টি করেছিল, আর আওয়াজ শোনা গিয়েছিল তেরো মাইল দূর হতে (১০০ Stade)। তুর্কিরা এর নাম দিলো 'সুলতানি কামান'। ১২৭
১৪৫৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে কামানটি এদিন থেকে বের করা হয়। ৩০ ওয়াগন সংযুক্ত করে ষাটটি ষাঁড়ের মাধ্যমে কামানগুলো টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। ডানে-বামে বিচ্যুতি হতে রক্ষার জন্য দুই পাশে ছিল দুইশো শ্রমিক। সামনে ছিল পঞ্চাশজন কাঠমিস্ত্রী ও দুইশো শ্রমিক। এদের কাজ ছিল এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা সংস্কার এবং প্রয়োজনে কাঠসেতু নির্মাণ করা। এভাবে দুই মাসের সফর শেষে ৫ এপ্রিল কামানগুলো কনস্ট্যান্টিনোপলের কাছে পৌঁছে যায়। বড়ো কামানটি প্রথমে স্থাপন করা হয় ক্যালিগ্যারিয়া নামক জায়গায়, যেখানে নগরপ্রাচীরের সামনে পরিখা ছিল না। পরে অধিক কার্যকারিতার সাথে ব্যবহারের জন্য সেটিকে সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। রসদভান্ডারে নতুন অস্ত্রের জোগানে সুলতান খুশি হন। উর্বানও অন্য প্রকৌশলীদের তিনি দুই হাত ভরে দেন। ১২৮
সম্রাটের দুই ভ্রাতাকে নিষ্ক্রিয়
সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের দুই ভাই টমাস ও দিমিত্রিস মোরিয়া উপদ্বীপ শাসন করতেন। যুদ্ধারম্ভের পূর্বে সুলতান তাদের নিষ্ক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ লক্ষ্যে সেনাপতি তুরখানকে শক্তিশালী বাহিনীসহ তাদের নিষ্ক্রিয় করার অভিপ্রায়ে প্রেরণ করা হয়।
সেনাপতি তুরখান সমগ্র গ্রিস উপদ্বীপ এমনভাবে অবরোধ করেন, অবরুদ্ধ রাজধানীতে বাহির হতে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়। এ সময় কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ই সুলতানের একমাত্র ধ্যানজ্ঞানে পরিণত হয়। নিদ্রাহরণকারী এ ভাবনা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তিনি ঘনিষ্ঠ সভাসদদের সাথেও আলোচনা বন্ধ করে দেন। ১২৯
প্রাকযুদ্ধ
১৪৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষণ পরিদৃষ্ট হয়। সূচনাটা অবশ্য গ্রিকরাই করে। তারা তুর্কি তটে হামলা করে বহু মানুষ হত্যা, ব্যাপক ধ্বংসলীলার স্বাক্ষর রাখে। গনিমতের মাল বাজারে বেচে দেয়। গির্জা-মসজিদ নির্বিশেষে ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা চালিয়ে গুপ্তধন ও উপঢৌকনাদি লুট করে। ইজমির শহর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এ হামলা সুলতানকে প্রতিজ্ঞা থেকে নিবৃত করার পরিবর্তে বরং তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
বাইজেন্টাইন সম্রাটের পত্র
সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন যখন দেখলেন পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে, যুদ্ধের সংকল্প হতে সুলতানকে ফেরানোর কোনো উপায় নেই, তখন তিনি সীমিত সামর্থ্যের ওপর যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। কনস্ট্যান্টিনোপলের ফটক বন্ধ করে তিনি সুলতানের প্রতি একখানা পত্র প্রেরণ করেন।
'এখন এটি পরিষ্কার, আপনি শান্তি অপেক্ষা যুদ্ধ অধিক কামনা করছেন। আর আমার বিশ্বস্ততা দ্বারা যখন আপনাকে তুষ্ট করা সম্ভব নয়, তখন ঈশ্বরের হাতে সবকিছু ছেড়ে দিলাম এবং তাঁরই প্রতি অভিমুখী হলাম। যদি ঈশ্বরের অভিপ্রায় এটি হয়, তাহলে এই শহর আপনার হবে। তাঁর সিদ্ধান্ত কেউ ফেরাতে পারবে না। আর আপনি যদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হন, তাহলে আজীবন নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করব। এতসত্ত্বেও আমি আপনাকে সকল চুক্তি হতে মুক্ত করে দিলাম। শহরের তোরণ বন্ধ, আমি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে স্বজাতিকে রক্ষার চেষ্টা করব।'১৩০
সুলতানের সৈন্য-বিন্যাস এবং আনুষ্ঠানিক অবরোধ
১৪৫৩ সালের প্রারম্ভে সালতানাতের প্রতিটি প্রদেশের গভর্নরদের উদ্দেশ্যে সৈন্য সরবরাহের নির্দেশ দিয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়। এশিয়া ও ইউরোপে বিস্তৃত বিশাল সালতানাতের প্রতিটি প্রদেশের সৈনিকদের সমন্বয়ে গঠিত সুলতানের বাহিনী আক্ষরিক অর্থে বহুজাতিক বাহিনীতে পরিণত হয়। সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদগণ তুর্কি বাহিনীর সদস্যসংখ্যা নিরূপণে হিমশিম খেয়েছেন। টেডালডি ২ লাখের কথা বললেও চালকোকোনডাইলাস বলেছেন ৪ লাখ। ১৩১
তবে নিয়মিত সৈন্যের সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি ছিল বলে মনে হয় না। এদের মাঝে জেনিসেরি বাহিনীর সদস্য ছিল ১৫ হাজার। প্রায় ৪০ হাজার সৈন্যের বর্ম বা চামড়ার জ্যাকেট ছিল। নিয়মিত সৈন্যরা তির, ধনুক ও বর্শাসহ অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। বাহিনীর অপরাপর সদস্যরা ছিল হকার, শ্রমিক ও রসদ জোগানদাতা। আধ্যাত্মিক প্রেরণা প্রদানের জন্য তুর্কি বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন অনেক আলিম ও শাইখ। সুলতান মুহাম্মাদ উদ্ভাবনী চিন্তা ও কর্মে সর্বাধিক সক্রিয় ও তৎপর ছিলেন। অন্য সবার মতো তিনিও ছিলেন কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের স্বপ্নে বিভোর। রাসূল ﷺ-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হওয়ার গৌরব কে না অর্জন করতে চায়!
১৪৫৩ সালের ৫ এপ্রিল কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীরের কাছে তুর্কি বাহিনীর দেখা মেলে। মুসলিমরা যে প্রাণপণ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে, তা বোঝা যায় তাদের সাথে আলে বায়ত ও ওলামা-মাশায়েখদের উপস্থিতি দেখে। সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে লাইকাস (Lycus) নদীর বাম তীরে খননকৃত পরিখাকে কেন্দ্র করে সুলতান তাঁর ক্যানোপি স্থাপন করেন। এখানেই দূরপাল্লার কামানগুলো স্থাপন করা হয়। তারপর সুলতান দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনায় সৈনিকরা সুলতানের অনুগামী হয়।
সুলতান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বাহিনী বিন্যাস করেন। পদাতিক ও আর্টিলারির সাথে অশ্বারোহী বাহিনী এবং নিয়মিত বাহিনীর সাথে অনিয়মিত বাহিনীর সমন্বয় করেন। সুলতানের সৈন্য-বিন্যাস ছিল নিম্নরূপ : ক. তুর্কি বাহিনীর সবচেয়ে বড়ো অংশ ছিল আনাতোলিয়া বা এশীয় বাহিনী। এটিকে সুলতানের ডানপাশে গোল্ডেন গেট-এর সামনে মোতায়েন করা হয়। এই দলটি মর্মর সাগর পর্যন্ত বিস্তুত ছিল। আনাতোলিয়ার শাসক ইসহাক বেগ ছিলেন এই বাহিনীর নেতৃত্বে। তাঁর সহযোগী ছিলেন মাহমুদ বেক। আর্টিলারি বাহিনীকেও এই কমান্ডের অধীনে রাখা হয়।
খ. সুলতানের বাম পাশে কাষ্ঠতোরণ (Wooden Gate) বা এদিন গেটের সামনে মোতায়িত হয় ইউরোপীয় কমান্ড। এই অংশ গোল্ডেন হর্ন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্ব অর্পিত হয় কারাজা পাশার ওপর।
গ. কেন্দ্রভূমিতে সুলতানকে ঘিরে রোমানাস গেটের সামনে অবস্থান নিয়েছিল ১৫ হাজার শ্রেষ্ঠ জেনিসেরি সৈন্য। প্রথম উজির খলিল পাশাকেও সাথে রাখেন সুলতান। নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল এ বাহিনীর পেছনে।
ঘ. আলবেনিয়ান জাগনুস পাশাকে (বা জাগান পাশা) অনিয়মিত বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। তাকে গ্যালাটার জেনোয়ানদের ওপর এমনভাবে নজর রাখতে বলেন, যেন ওদিক থেকে শহরে কোনো সহায়তা না পৌঁছে।
ঙ. রোমেলি হিসারের দুর্গাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সারিখা পাশাকে। তার দায়িত্ব ছিল গোল্ডেন হর্নের দিক হতে শহরের ওপর আক্রমণ করা।
চ. গ্যালিপোলির নৌ-সদরে প্রস্তুত ছিল ৩০০টি ছোটো-বড়ো যুদ্ধজাহাজ। এগুলোর মাঝে ছিল ২০টি trireme (তিন সারি দাঁড়বিশিষ্ট রণতরি), বাকিগুলো bireme (দুই সারি দাঁড়বিশিষ্ট রণতরি) ও ছোটো আকারের নৌযান। এগুলোকে মর্মর সাগর অতিক্রম করে বসফোরাসের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কৃষ্ণসাগরের অট্যোমান নেভাল ক্যাম্প হতে কিছু নৌযান এদের সাথে যোগ দেওয়ায় অবরোধকারী বিশাল এক বাহিনীর রূপ দেখা যায়। ১৩২
নৌবহরের দায়িত্ব ছিল ব্যাপক। যেমন: সাগরপথে কনস্ট্যান্টিনোপলে রসদ সরবরাহ বন্ধ, গোল্ডেন হর্নের প্রবেশপথ রুদ্ধকারী শিকল পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত জাহাজের ওপর হামলা চালানো, হর্নে নোঙর করা নৌযান ধ্বংস, সাগর পাড়ে স্থাপিত দুর্গের ওপর গোলা নিক্ষেপ, সর্বোপরি নগর অবরোধে স্থলবাহিনীকে সহায়তা করা। সুলতানের নির্দেশে অটোম্যান নৌপ্রধান মর্মর সাগরের দ্বীপে অবস্থিত রোমান সামরিক পকেটগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বন্দিদের মুক্ত করে দেন। আর ওই দ্বীপগুলো তুর্কি প্রতিরক্ষার আওতায় আসে। ১৩৩
'রোমেলি হিসার' নির্মাণকালে শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ এবং পরে দুর্গ ধ্বংসের পাঁয়তারা করায় ৬ এপ্রিল, ১৪৫৩ তারিখে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী অবরোধ করেন। তবে শান্তির সর্বশেষ সুযোগ গ্রহণ করতে চাইলে তুর্কিদের হাতে রাজধানী সমর্পণের জন্য সম্রাটের প্রতি আহ্বান জানান সুলতান। পাশাপাশি তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন, শহরবাসী আত্মসমর্পণ করলে তাদের জান-মাল ও দ্বীন-ধর্মের নিরাপত্তা বিধান করা হবে।
'তোমাদের সম্রাট যেন আমার কাছে কনস্ট্যান্টিনোপল শহর সমর্পণ করেন। আমি শপথ করছি! আমার বাহিনী কারও জীবন, সম্পদ ও সম্মান হরণ করবে না। যার ইচ্ছা শহরে নিরাপদে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। আর কেউ চাইলে যেখানে ইচ্ছা সেখানে সম্মানে ও নিরাপদে চলে যেতে পারবে।'১৩৪
কিন্তু সম্রাট এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীর এবং খ্রিষ্টান বিশ্বের সমর্থন পুরোনো সাম্রাজ্যটিকে রক্ষা করবে। অতএব, যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
প্রথমে বাইজেন্টাইন সম্রাট রোমেলি হিসার ধ্বংসের চেষ্টা চালান। কিন্তু তুর্কিরা রোমান আক্রমণের এমন প্রত্যুত্তর দেয়, তাদের চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কার্যত এরপরই যুদ্ধ শুরু হয়। ইতঃপূর্বে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়েছিল। তুর্কিরা কামান দাগিয়ে হামলা শুরু করে। গোলা উৎক্ষেপণের সময় এমন প্রচণ্ড নিনাদ সৃষ্টি হতো, ভয়ে শহরবাসীর প্রাণবায়ু বের হওয়ার জোগাড়।
দুই দলই বীরত্বের সাথে লড়াই করে। কনস্ট্যান্টিনোপলের কমান্ডার ইন চিফ গিওভান্নি ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল মেরামতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তুর্কি বাহিনীর গোলার আঘাতে যখনই প্রাচীরে কোনো ফাটল সৃষ্টি হতো, তখনই তার অনুগত সৈনিকরা লাঠির আঁটি ও মাটিভর্তি পিপা দিয়ে তা মেরামত করে নিত।১৩৫ তুর্কিদের গোলার আঘাতও অব্যাহত রইল। মাঝে মাঝে জানবাজ জেনিসেরিরা প্রাচীর অতিক্রমের চেষ্টা চালায়। কিন্তু বাইজেন্টাইন সৈনিকদের প্রতিরোধের কারণে প্রথমদিকে তারা পূর্ণ সফলতা লাভে ব্যর্থ হয়। ছোটো-বড়ো কামান দিয়ে প্রতিদিন ১০০ হতে ১২০ বার গোলা নিক্ষেপ করা হতো। এক পর্যায়ে অটোমান কামান লিকুস উপত্যকার কাছে নগরপ্রাচীরের একাংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। প্রাচীর সংলগ্ন পরিখা নানা আবর্জনায় পূর্ণ হয়েছিল। কয়েকজন তুর্কি সৈনিক দ্রুত এগিয়ে মই লাগিয়ে প্রাচীর টপকানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু গিওভান্নি গিউস্টিয়ানি প্রশিক্ষিত ও বর্মধারী যোদ্ধাদের নিয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তুর্কি সৈন্যদের ওপর চারদিক থেকে বাণবৃষ্টি বর্ষিত হয়। দুই পক্ষে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাণপণ লড়াই চলে। তারপর সুলতান সৈনিকদের তাঁবুতে ফেরার নির্দেশ দেন। এ প্রচেষ্টার ঈপ্সিত ফল না এলেও সুলতান খ্রিষ্টানদের প্রতিরোধ শক্তি ও স্পৃহা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পান।
ওদিকে প্রায় একই সময়ে গোল্ডেন হর্নেও লড়াই চলছিল। পোতাশ্রয়ের নিরাপত্তার জন্য গ্রিকরা হুরাইয়া গেট হতে গ্যালাটা তীর পর্যন্ত একটি শিকল স্থাপন করেছিল। ১৩৬ তুর্কি নৌবহর গোল্ডেন হর্নে গমন রুদ্ধকারী শিকল ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু পাহারারত বাইজেন্টাইন ও ইতালীয় জাহাজের প্রতিরোধে তুর্কিরা ব্যর্থ হয়।
শত্রুপক্ষের জাহাজগুলোর অবস্থান ছিল কিছুটা উঁচুতে, তাই তারা সহজেই আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে তুর্কিদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। সমকালীন বিচারে তুর্কি নৌবহর যথেষ্ট রসদসমৃদ্ধ ছিল। তবে জলযুদ্ধে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল না। দলে অভিজ্ঞ নৌযোদ্ধারও অভাব ছিল। তা ছাড়া নৌযানের সংখ্যাধিক্য তাদের মনে কিছুটা অহংকার ও শৈথিল্য সৃষ্টি করেছিল। অপরদিকে নৌবিদ্যা ও সাগরসমরে রোমানদের অভিজ্ঞতা ছিল সহস্র বছরের। ফলে অনভিজ্ঞ তুর্কি নৌবাহিনীকে তারা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।
জলে ও স্থলে তুর্কিদের ঠেকিয়ে দিয়ে রোমানরা উল্লসিত এবং নগর রক্ষায় আশাবাদী হয়। প্যাট্রিয়ার্থকে সাথে নিয়ে কনস্ট্যান্টাইন আয়া সোফিয়ায় গিয়ে সকৃতজ্ঞ প্রার্থনা নিবেদন করেন। অপরদিকে প্রাথমিক ধাক্কায় মোটেও হতোদ্যম হন না সুলতান মুহাম্মাদ; বরং তাঁর বিজয়তৃষ্ণা আরও বেড়ে যায়।
গ্যালাটার ভূমিকা এই যুদ্ধে কনস্ট্যান্টিনোপলের উত্তর সীমানাঘেঁষা জেনোয়ান গ্যালাটার (অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত গ্যালাটা পরিচিত ছিল Sykai নামে) ভূমিকা সম্পর্কে এখানে একটু ইঙ্গিত দেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসবিদদের বিবরণে দেখা যায়, কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের যুদ্ধে গ্যালাটার জেনোয়ানরা দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে তারা স্বধর্মী খ্রিষ্টানদের সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত, আবার সুলতানের বিজয় হতে পারে-এমন আশঙ্কাও তাদের ছিল।
যুদ্ধের উদ্দেশ্যে আদ্রিয়ানোপল হতে বের হওয়ার আগেই তারা সুলতানের কাছে দূত প্রেরণ করে পূর্বের চুক্তি নবায়ন করে এবং যুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের ঘোষণা দেয়।
কিন্তু যুদ্ধের সময় জেনোয়ানদের আচরণে তাদের দোদুল্যমানতাই প্রকাশ পায়। একদিকে সুলতানের শিবিরে তাদের যাতায়াত ছিল, তাঁর কামানের জন্য তেলসহ অন্যান্য রসদ তারা সরবরাহ করত। আবার তাদেরই একদল রাতের আঁধারে গোল্ডেন হর্ন পাড়ি দিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিত এবং পরদিন তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। যুদ্ধের দিনগুলোতে তারা দোদুল্যমান মনোভাব হতে বের হতে পারেনি। তাদের মনে হয়তো ক্ষীণ আশা ছিল, বিরাট সেনাবাহিনী নিয়েও সুলতান সফল হতে পারবেন না। কনস্ট্যান্টিনোপলের সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা তাঁকে তেমনিভাবে প্রতিরোধ করবে, যেমনভিাবে ঠেকিয়ে দিয়েছিল তাঁর পূর্ববর্তী সুলতানদের। ১৩৭
গ্যালাটার নৌযুদ্ধ
২০ এপ্রিল, ১৪৫৩ সাল। মর্মর সাগরে আচানক পশ্চিম দিক থেকে আগত পাঁচটি জাহাজ দেখা যায়। এগুলোর মাঝে চারটি জাহাজ কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীর সাহায্যে পোপের তরফে প্রেরিত। আরেকটি ছিল স্বয়ং সম্রাটের-যা সৈনিক, অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্র বহন করছিল। তুর্কিরা দেখল, জাহাজগুলো অবরুদ্ধ শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাথে সাথে নৌ কমান্ডার বালতা উল্লুকে আক্রমণের নির্দেশ দেন সুলতান। জাহাজগুলো ধ্বংস করতে না পারলেও অন্তত সেগুলো যেন শহরে পৌঁছতে না পারে। সে ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন সুলতান। তাঁর নির্দেশের শেষ বাক্য ছিল-
'আদেশ পালনে অসমর্থ হলে আমার কাছে জীবিত প্রত্যাবর্তন করবে না।'১৩৮
এরপর এক ভয়াবহ ও চমকপ্রদ নৌযুদ্ধ দেখল তীরবাসী খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা। ওই পাঁচটি জাহাজ ছুটছিল গোল্ডেন হর্নের দিকে। তুর্কি নৌপতি বালতা উন্মু জাহাজগুলোকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা ছুটল বাইজেন্টাইন জলসীমার দিকে। ফলে ভয়ানক এক জলযুদ্ধ বেধে যায়। তুর্কিদের নৌযান সংখ্যায় বেশি হলেও আকারে ছিল ছোটো। তা ছাড়া তাদের যোদ্ধারা ছিল অনভিজ্ঞ।
অপরদিকে বাইজেন্টিয়াম যোদ্ধারা ছিল পোড় খাওয়া। প্রথমদিকে সাগরের বাতাসও তাদের সাহায্য করছিল। ফলে তুর্কিরা তেমন সুবিধা করতে পারে না; বরং কয়েকজন তুর্কি সৈনিক মারা যায়। নৌপতি উগ্র সশরীরে জলরাশিতে নেমে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তিনি এতটা মরিয়া হয়ে শত্রুপানে এগিয়ে যান, তিরের আঘাত তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তারপরও লড়াই অব্যাহত থাকে।
দুই তীরের বাসিন্দারা হর্ষধ্বনির মাধ্যমে নিজ নিজ পক্ষকে উৎসাহ দিচ্ছিল। হঠাৎ হাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে পাঁচটি জাহাজের প্রবাহ থেমে পাল গুটিয়ে যায়। অথচ জাহাজগুলো প্রায় গোল্ডেন হর্নের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। উগ্র এ মুহূর্তটির সুযোগ গ্রহণ করতে চাইলেন। তুর্কিরা ঢেউ তুলে জাহাজগুলো ডুবিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আগুন লাগানোর চেষ্টাও সফল হলো না। রোমানরা দ্রুত পানি ছিটিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে। চরম উৎসাহে লড়াই চালিয়ে গেলেও অভিজ্ঞ রোমানদের বিরুদ্ধে উল্লেখ করার মতো সাফল্য পায় না তুর্কিরা।
সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে এ যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছিলেন তুর্কি সুলতান। উত্তেজনার অতিশয্যে তিনি একবার অশ্বসমেত সাগরে নেমে পড়েন। তীর হতে তিনি অনবরত 'কাপ্তান' 'কাপ্তান' বলে চিৎকার দিয়ে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে রাত নেমে আসে। হঠাৎ দক্ষিণ থেকে আবার বাতাস বইতে শুরু করে। রোমান জাহাজগুলোর পাল আবার খুলে যায়। সেগুলো তুর্কি জাহাজগুলোর মাঝ দিয়ে প্রবল ঢেউ তুলে গোল্ডেন হর্নে পাড়ি জমায়। নিজেদের জাহাজ প্রবেশের সুবিধার্থে রোমানরা সাগরতলে স্থাপিত শিকল ফেলে দিয়েছিল। জাহাজগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তারা আবার শিকল তুলে দেয়। এভাবে বাইজেন্টাইন জাহাজের নিরাপদ গমনের সাফল্যে শেষ হয় 'গ্যালাটার নৌযুদ্ধ'।
ক্ষুব্ধ সুলতান সাগর হতে উঠে এলেন। তিনি বিষণ্ণ, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। বালতা উম্মুর স্থলে তিনি আহমদ বেগকে নৌ-উপদেষ্টা (কাপ্তান দরিয়া) নিয়োগ দেন। ১৩৯ নৌযুদ্ধের সাফল্যে কনস্ট্যান্টিনোপলে খুশির বন্যা বয়ে যায়। এ বিজয় তাদের মনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। বাইজেন্টাইনরা বিশ্বাস করতে শুরু করে, তারা স্থলযুদ্ধেও জয়ী হয়ে তুর্কি বাহিনীকে হটিয়ে রাজধানী নিরাপদ করতে সক্ষম হবে। শহরে আনন্দের শোভাযাত্রা বের হয়। গির্জায় বেজে উঠে ঘণ্টা। সারারাত ধরে খ্রিষ্টানরা ধর্মীয় সংগীত গাইতে থাকে। প্রাচীরের বাইরে তুর্কিরা যখন এ ধ্বনি শোনে, তখন তাদের প্রতিজ্ঞা আরও দৃঢ় হয়।
তুর্কি কামানগুলো তীব্র নিনাদ সৃষ্টি করে রাত-দিন কনস্ট্যান্টিনোপলের দেয়ালে গোলা নিক্ষেপ করে যাচ্ছিল। ওদিকে নগরবাসীও প্রাণান্ত পরিশ্রমে প্রাচীর সংস্কার করে ফেলত। ফলে যুদ্ধ-পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছিল না। ওদিকে সুলতান নতুন পন্থা উদ্ভাবনের চিন্তায় বিভোর ছিলেন। তিনি দেখলেন, শত্রুদের যুদ্ধে ব্যস্ত করতে না পারলে সাফল্য আসবে না।
পানির জাহাজ পাহাড় দিলো পাড়ি
গোল্ডেন হর্নে নৌশক্তির প্রবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। ভৌগোলিক দিক দিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল এতটা সুরক্ষিত, স্থল ও জলপথের যৌথ আক্রমণ ছাড়া এই শহর অধিকার করা অসম্ভব ছিল। আর জলপথের সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট গোল্ডেন হর্ন এলাকা। অথচ এ দিকটায় তুর্কিদের উপস্থিতি ছিল না। তা ছাড়া গ্যালাটার জেনোয়ানদের ওপর নজর রাখা এবং রোমেলি হিসারের সাথে যোগাযোগের সহজ পথ সৃষ্টির জন্যও গোল্ডেন হর্নের ওপর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য ছিল।
ইতঃপূর্বে তুর্কি নৌবাহিনী বহুবার চেষ্টা করেও বন্দরের প্রবেশমুখে স্থাপিত প্রকাণ্ড শিকল ছিন্ন করতে পারেনি। এই শিকলের একদিক ছিল জেনোয়ান শহর গ্যালাটায়। তারা মনে মনে স্বধর্মী কনস্ট্যান্টিনোপলের জয় কামনা করত, কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় প্রকাশ্যে তুর্কিদের বিরোধিতা করত না। তাই তাদের শত্রুর কাতারে রাখতে হয়। সুলতান এমন একটি উপায় বের করার চিন্তায় ব্যাপৃত ছিলেন—যাতে জলপথ এড়িয়ে গোল্ডেন হর্নে নৌযান নামানো যায়। তাহলে স্থল ও জলপথের যৌথ আক্রমণে কনস্ট্যান্টিনোপলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।
অভিনব একটি ভাবনা সুলতানের মনে বিদ্যুতের ন্যায় খেলে যায়। আর তা হলো, বাশাকতাশের অ্যাঙ্করেজ হতে জলপথ এড়িয়ে দূরবর্তী স্থলপথ দিয়ে গোল্ডেন হর্নে নৌযান স্থানান্তর। দুই বন্দরের মাঝে স্থল দূরত্ব ছিল তিন মাইল আর রাস্তাও মসৃণ ছিল না; বরং ছোটোখাটো টিলা দ্বারা পূর্ণ ছিল।
কয়েক ঘণ্টা চিন্তা-ভাবনা করার পর সুলতান স্থির সিদ্ধান্ত নেন। তারপর তিনি সামরিক উপদেষ্টাদের ডাকলেন। সবাই তাঁর চিন্তার অভিনবত্বের প্রশংসা করে। অনতিবিলম্বে সুলতানের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কর্মীরা রাত-দিন পরিশ্রম করে রাস্তা সমান করে। তারপর গাছের তক্তা ফেলে তার ওপর তৈল ও ঘি মর্দন করে পিচ্ছিল করা হয়। টিলাগুলোর ওপর দিয়ে নৌকা পার কম হওয়ায় নৌকা পারাপারে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু তুর্কি নৌযানের আকার ও ওজন কম হওয়ায় সেটাও সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়নি।
কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই তুর্কিরা বফরাস থেকে ৭০টি নৌযান (bireme) গোল্ডেন হর্নে নিয়ে যায় (২২ এপ্রিল ১৪৫৩)। এই কাজ সহজ করার জন্য তুর্কি নৌযান থেকে ২১ এপ্রিল সারাদিন গোল্ডেন হর্নে গোলা নিক্ষেপ করা হয়। ফলে একটি শত্রুজাহাজ ডুবে যায়। বাকিগুলো গ্যালাটা প্রাচীরের দিকে ঘেঁষে। তুর্কিরা শিকল ছিন্নের চেষ্টাও করে, কিন্তু বরাবরের মতো এবারও ব্যর্থ হয়। তবে নগরপ্রাচীরের ওপর গোলার আক্রমণ অব্যাহত ছিল- যাতে নাগরিকদের মনে ভীতির সঞ্চার হয়। ১৪০
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের প্রত্যক্ষদর্শী খ্রিষ্টান ধর্মযাজক লিওনার্ড-এর মতে- 'ভেনিসিয়ানরা লেক গার্ডায় যে কৌশল অবলম্বন করেছিল, তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তুর্কিরা এমন উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পেরেছিল।'১৪১
আর্চবিশপের অনুমান সত্য হলেও স্থলপথে জলযান স্থানান্তরের এ পরিকল্পনা সেই যুগের বিবেচনায় অত্যন্ত প্রাগ্রসর একটি চিন্তা বলে গণ্য করা যায়। এটির বাস্তবায়নের দ্রুততা এবং সুক্ষ্মতাও ছিল অভাবনীয়। স্থলপথে জলযান স্থানান্তরের চেয়ে বেশি বিস্ময়ের বিষয় ছিল-এতগুলো রণতরি রাস্তা ও পাহাড় পাড়ি দিয়ে গোল্ডেন হর্নে নিয়ে যাওয়া হলো অথচ বাইজেন্টিয়ান ও জেনোয়ানরা কিছুই ঘূর্ণাক্ষরে আঁচ করতে পারল না!
পরদিন ২২ এপ্রিল, ১৪৫৩ সালের প্রত্যুষে তাদের চক্ষু তড়াক। গোল্ডেন হর্নে উপস্থিত ৭০টি তুর্কি নৌযান! তুর্কি সৈনিকদের রণসংগীতে চারদিক মুখরিত। একটি পুরোনো ভবিষ্যদ্বাণী মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে; কান থেকে কানে- 'যখন দেখা যাবে নৌযান ডাঙা পাড়ি দিচ্ছে, তখনই কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন হবে।'১৪২
সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিক ডুকাস সবিস্ময়ে লিখেছেন-
"Who has ever seen such a thing before, or even heard of it? Xerxes indeed made a bridge over the sea, and his army passed over it as if on dry land. But this new Alexander, surely, it is to be hoped, the last of his kind, made the land into an ocean, and drew his ships over the peaks of the mountains as if they were the crests of the waves. And in this he surpassed Xerxes, who crossed the Hellespont but had to return back after being defeated by the Athenians: Mehmet crossed the land as if it were the sea and then overhelmed the Greeks, the ornament of the world, and captured the Queen of the Cities. 143
ইতঃপূর্বে কেউ কি এমন ঘটনা দেখেছে না শুনেছে? হ্যাঁ, [পারস্য সম্রাট] জেরজেস সাগরের ওপর সেতু নির্মাণ করেছিলেন এবং তাঁর বাহিনী ওটার ওপর দিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল, যেন তারা শুকনো মাটির ওপর দিয়েই পার হয়েছিল। কিন্তু এই নতুন আলেকজান্ডার- আশা করা যায় এমন আরেকজন হবেন না-তো স্থলভাগকে সাগর বানিয়ে ফেললেন এবং পর্বতের শৃঙ্গের ওপর দিয়ে নৌকাগুলো টেনে নিয়ে যান, ওগুলো যেন ঢেউয়ের চূড়া। এক্ষেত্রে তিনি- জেরজেসকে ছাড়িয়ে যান, যিনি হেলেসপন্ট অতিক্রম করেছিলেন বটে, তবে আথেনীয়দের কাছে পরাজিত হয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিল। মুহাম্মাদ স্থলকে সাগর বানিয়ে অতিক্রম করেন। তারপর বিধ্বস্ত করেন গ্রিকদের, যারা ছিল বিশ্বের শোভা এবং জয় করেন নগরসমূহের রানি।'
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের প্রত্যক্ষদর্শী আর্চবিশপ লিওনার্ড এটিকে সুলতানের Brilliant Stroke বলে অভিহিত করেছেন।
ভাসমান পিপাসেতু
গোল্ডেন হর্নে স্থলপথে রণতরি নামিয়েও সন্তুষ্ট হননি সুলতান মুহাম্মাদ। তিনি গ্যালাটার ক্যাম্প হতে সৈনিকদের গমনাগমনের জন্য সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর নির্দেশে ১ হাজার পিপা সংগ্রহ করা হয়। তারপর দুটি করে পিপা বেঁধে একটি সারি তৈরি করা হয়। পাশে আরও দুটি করে পিপা বেঁধে আরেকটি সারি তৈরি করা হয়। এভাবে দুই তীর সংযুক্ত হওয়ার পর তক্তা ফেলে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। পাশাপাশি পাঁচজন সৈনিক এই সেতুর ওপর দিলে চলাচল করতে পারত। এটি গ্যালাটার Ceramaria-কে নগরপ্রাচীর সংলগ্ন Phanari (বর্তমান নাম Fener)-এর সাথে যুক্ত করে। ফলে গ্যালাটায় অবস্থিত জাগনুস পাশার ক্যাম্প হতে সৈনিকরা সহজে এই পাড়ে যাতায়াতের সুযোগ পায় (Chalcocondylas 46; Ducas 91)। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের এহেন কীর্তিকে খ্রিষ্টান ধর্মযাজক লিওনার্ড তুলনা করেছেন পারস্য সম্রাট প্রথম জেরজেস-এর কীর্তির সাথে, যিনি ৪৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তার বাহিনী নিয়ে এশিয়া হতে থ্রেসে যাওয়ার সময় নৌকাসেতু তৈরি করে বসফোরাস পাড়ি দিয়েছিলেন। ১৪৪
পিপাসেতুর নির্মাণ ও গোল্ডেন হর্নে তুর্কি যুদ্ধ জাহাজের উপস্থিতিতে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার পরিকল্পনা পালটাতে বাধ্য হন। ইতঃপূর্বে তিনি প্রধানত রোমানাস গেটে সর্বাধিক নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। সাগরের দিকে নিরাপত্তার জন্য প্রাচীরই যথেষ্ট ছিল। এখন গোল্ডেন হর্নের দিকেও নিরাপত্তার জন্য সৈনিক মোতায়েন করতে হয়। তারপর চিফ কমান্ডার গিওভান্নিসহ অন্যান্য সমরনায়কদের সাথে পরামর্শ করেন। সবাই একমত হয়, নগর বাঁচাতে হলে গোল্ডেন হর্ন থেকে তুর্কিদের তাড়াতে হবে এবং তা করতে হবে রাতের আঁধারে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
তুর্কি জাহাজের ওপর হামলা দায়িত্ব অর্পিত হয় জ্যাকোমো কোকোর ওপর। কিন্তু তার প্রস্তুতির খবর গ্যালাটার জেনোয়ানদের কাছে পৌঁছে যায়। তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় দুই দিকে সম্পর্ক রাখত। তাদের মারফত সুলতান যথাসময়ে বাইজেন্টাইন অভিযানের সংবাদ পেয়ে যান। জেনোয়ানরা সম্রাটকে অনুরোধ করে অভিযান একদিন পিছিয়ে দিতে-যেন তারাও অংশগ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে সময় পেয়ে সুলতানও তাঁর নৌবাহিনীকে সতর্ক ও প্রস্তুত করতে পারলেন। ২৪ এপ্রিল ভোরে সুলতান আবারও জেনোয়ানদের বার্তা পান। তারপর তিনিও গোল্ডেন হর্নে প্রয়োজনীয় যোদ্ধা ও রসদ পাঠান।
২৮ এপ্রিল অত্যন্ত সঙ্গোপনে বাইজেন্টাইন জাহাজ গ্যালাটা বন্দর ত্যাগ করে। উদ্দেশ্য, গোল্ডেন হর্নে নোঙররত তুর্কি নৌযান ধ্বংস। তাদের রওয়ানার সাথে সাথে গ্যালাটার টাওয়ার শীর্ষে আগুন জ্বলে ওঠে, যেন তুর্কিদের বিপদের খবর দেওয়া হয়। ১৪৫ বাইজেন্টাইন নৌপতি তীব্রগতিতে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
অনেকটা এমন, তিনি তুর্কি জাহাজ ধ্বংস করে বিরাট সাফল্যের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। কিন্তু আচানক দুটো গোলা পরপর তার জাহাজকে আঘাত করে দুই টুকরো করে দেয়। বাইজেন্টাইন বাহিনীর অন্য জাহাজগুলো মনে করে তাদের কমান্ডার এখনও অগ্রসরমান। আরেকটি জাহাজ এগিয়ে যেতেই তুর্কি গোলার মুখে পড়ে। কমান্ডার ও তার সঙ্গীর পরিণতি দেখে বাকি নৌসেনারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়। অনেকে আধ-ডুবা অবস্থায় তুর্কিদের হাতে ধরা পড়ে প্রাণ হারায়।
সম্রাট এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলেন এভাবে, কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের ওপর ২৬০ জন তুর্কি বন্দিকে তুলে তাদের ভাইদের চোখের সামনে তাদের শিরচ্ছেদ করেন। ১৪৬ তারপরও সম্রাট তুর্কি নৌযান ধ্বংসের পরিকল্পনা থেকে সরে এলেন না। এবার দায়িত্ব পড়ে গিওভান্নি গিউস্টিনিয়ানির ওপর। দ্বিতীয় প্রচেষ্টার পরিণতি প্রথমবারের চেয়ে ভিন্ন হয়নি। বিরাটাকার রোমান জাহাজের ওপর তুর্কি নৌযানের শ্রেষ্ঠত্ব বহাল থাকে। গিওভান্নি মৃত্যুর মুখ থেকে কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচেন।
সাগরে নৌবাহিনীর উপর্যুপরি পরাজয়ে অবরুদ্ধ বাইজেন্টাইনবাসীর মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। নিজেদের নৌবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে তাদের দর্প চূর্ণ হয়। হতাশার ছাপ ছড়িয়ে পড়ে সম্রাট, সেনাপতিসহ সকল নাগরিকের মাঝে। অন্যদিক কনস্ট্যান্টিনোপলে অবস্থানরত জেনোয়ান ও ভেনিসিয়ানদের মাঝে শুরু হয় তীব্র বিবাদ। দুই দলকে সমর্থন করতে গিয়ে শহরবাসীও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিতণ্ডার মূল বিষয় ছিল গ্যালাটার নৌযুদ্ধে পরাজয়ের কারণ নির্ণয়। দুই পক্ষই পরস্পরকে দুষছিল। খ্রিষ্টবাদের দোহাই দিয়ে সম্রাট দুই পক্ষকে বিবাদ থামিয়ে আশু বিপদ মোকাবিলায় ভূমিকা পালনের জন্য অনুরোধ করেন।
অপরদিকে পরিকল্পনা মোতাবেক তুর্কিরা নগরপ্রাচীরে আঘাত হানা অব্যাহত রাখে। বাইজেন্টিয়ানরাও দিবানিশি অক্লান্ত শ্রমে ভঙ্গুর দেয়াল মেরামত ও পরিখা পরিষ্করণে ব্যস্ত থাকে। প্রাচীর ছিল দীর্ঘ ও দুর্বল। ওদিকে তুর্কিদের নির্দয় আঘাতও অব্যাহত ছিল। ফলে অবরুদ্ধ শহরের অনেক মানুষ মারা যায়। বাইরের কোনো জনশক্তি আসার সুযোগ না থাকায় তাদের সৈনিক ও স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যাও কমে আসে। এভাবে তারা এপ্রিলের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। একসময় রাজধানীতে খাদ্যপণ্যের, বিশেষত রুটি ও মদের সংকট দেখা দেয়।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সম্রাট দুটি জাহাজ পাঠান ইতালির পানে, উদ্দেশ্য ভেনিসিয়ান নৌবহরের সাহায্য কামনা। বিশেষত মর্মর সাগরের দ্বীপপুঞ্জে অবস্থানরত ভেনিসিয়ান নৌকমান্ডারকে যেন দ্রুত প্রেরণের অনুরোধ করা হয়। কনস্টান্টিনোপলের অস্তিত্বের শেষ আশা ছিল এ পদক্ষেপের সাফল্যের ওপর। কিন্তু সমুদ্র ডেলিগেট জানতে পারে, দ্বীপপুঞ্জের ভেনিসিয়ান নৌবহর ইতোমধ্যে বন্দর ত্যাগ করেছে। ফলে তাদের শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়।
নিবিড় আক্রমণ যুদ্ধের এই পর্যায়ে সুলতান নগর-প্রাচীরে হামলা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। আদেশ মোতাবেক উসমানি বাহিনী নগরপ্রাচীরে হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অনেক জানবাজ সৈনিক প্রাচীর অতিক্রমের ঝুঁকি নিতে গিয়ে প্রাণও হারান। তুর্কি সৈনিকদের তাকবির ধ্বনি-যা তাদের কাছে বজ্রধ্বনি বলে প্রতিভাত হতো- সবচেয়ে বেশি ত্রাস সৃষ্টি করত শহরবাসীর মনে।
প্যাট্রিয়ার্থ ও কমান্ডারগণ মনে করেন, সম্রাটের উচিত হবে শহর ত্যাগ করে ভিন্ন স্থান হতে যুদ্ধ পরিচালনা করা-যাতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে খ্রিষ্টান বিশ্বের সাহায্য প্রার্থনা করতে পারেন। তাদের আশা ছিল, এর মাধ্যমে তুর্কি অবরোধের অবসান ঘটানো যাবে। গিউস্টিনিয়ানি নিজের একটি জাহাজও এ কাজের জন্য প্রস্তুত করেন। কিন্তু সম্রাট প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে, এই বিপদে জনগণের সাথে অবস্থান করাকে তিনি নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন। অতএব, তিনি কিছুতেই শহর ও জনগণ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গমন করবেন না। এ কথা বলার সময় তার গণ্ড বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষিত হয়। অশ্রুসিক্ত সম্রাটকে দেখে উপদেষ্টাদের কেউ-ই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ১৪৭
তবে সম্রাট খ্রিষ্টান রাজাদের নিকট দূত প্রেরণ করেন। প্রতিনিধি দল পাঠানো হলো ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও সকল পশ্চিমা রাজ্যে। বার্তার বিষয়বস্তু পরিষ্কার: 'সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগে তারা যেন খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্যকেন্দ্র রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।' ওদিকে গোল্ডেন হর্নে তুর্কি জাহাজের উপস্থিতির সুযোগে এদিক হতেও অবরোধে কড়াকড়ির সুযোগ আসে। তুর্কিরা গ্যালাটার পশ্চাতে অবস্থিত টিলার ওপরে কামান স্থাপন করে। শুরু হয় গ্যালাটা বন্দরে গোলা নিক্ষেপ। একবার একটি গোলা পড়ে জেনোয়ান বাণিজ্যতরির ওপর। ফলে অন্য জাহাজগুলো দ্রুত পালিয়ে গিয়ে গ্যালাটা প্রাচীরের কাছে আশ্রয় নেয়।
বাহ্যত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনকারী গ্যালাটানরা সুলতানের কাছে অভিযোগ করলে তিনি ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
উসমানি নৌবাহিনীর জাহাজগুলো গোল্ডেন হর্নে একের পর এক হামলা চালাচ্ছিল, কিন্তু শিকল ছিন্ন করার ঈপ্সিত সাফল্য অর্জিত হচ্ছিল না। অন্যদিকে স্থলবাহিনীর আক্রমণও অব্যাহত ছিল। চূড়ান্ত হামলার আগে সুলতান শত্রুদের ক্লান্ত, দুর্বল ও হীনবল করতে চেয়েছিলেন। কনস্ট্যান্টিনোপলবাসী ধীরে ধীরে এই পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল। ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে তারা এমন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তুর্কিদের দ্বারা শহর দখল হওয়ার পর তাদের সাথে কী আচরণ করা হবে, সে চিন্তা ব্যতীত তারা আর কোনো কিছু ভাবতে পারছিল না।
এমন পরিস্থিতিতে সম্রাট দ্বিতীয় সম্মেলন আহ্বান করেন। একজন প্রস্তাব করেন, তুর্কিদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়ে একটি প্যাসেজ তৈরি করা হোক-যাতে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করা যায়। আলোচনার মাঝে একজন সৈনিক ছুটে এসে খবর দেয়, তুর্কিরা লিকুস উপত্যকার ওপর প্রবল আক্রমণ চালাচ্ছে। এ সংবাদে পেয়ে সম্রাট তৎক্ষণাৎ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করে সসৈন্যে নগর-প্রাচীরের দিকে ছোটেন। তার সাথে রিজার্ভ ফোর্সও যোগ দেয়। লড়াই চলে শেষরাত্রি পর্যন্ত। অবশেষে তুর্কিরা অপসারিত হয়।
১৪ মে ১৪৫৩, সুলতান গ্যালাটার টিলাশীর্ষের কামানগুলোকে সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে আনার নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্টে হামলা জোরদার করা। আক্রমণ ও প্রতিরোধ চলে সমান তালে। শহরের রোমান ও ল্যাটিন নাগরিকরা প্রাণপণ লড়াই করে এবারও তুর্কিদের ঠেকিয়ে দেয়। তরুণ সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ অত্যন্ত উদ্ভাবনী বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রায়শ নতুন নতুন যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করে শত্রুদের চমকে দিতেন। তেমনই এক লড়াই ছিল সুড়ঙ্গ যুদ্ধ।
সুড়ঙ্গ যুদ্ধ: যুদ্ধের কৌশল হিসেবে সুড়ঙ্গ খননের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে সুলতানের বাহিনীতে একদল খনিকর্মী সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিল নভো ব্রড হতে আগত এক দক্ষ খনিশ্রমিক। সুলতানের নির্দেশে তারা ১৪টি স্থানে সুড়ঙ্গ খনন করে; উদ্দেশ্য ছিল কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের ক্ষতিসাধন ও শহরে প্রবেশের পথ বের করা। ১৬ মে কয়েকজন অবরুদ্ধ কনস্ট্যান্টিনোপলবাসী ভূতলে তীব্র আওয়াজ শুনতে পায়। সাথে সাথে এ খবর সম্রাট ও তার যুদ্ধপরিষদকে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে।
জার্মানি হতে আগত চৌকস যোদ্ধা জন গ্রান্ট বুঝতে পারেন, তুর্কিরা ভূগর্ভে সুড়ঙ্গ খনন করে মাটির নিচ দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে চাইছে। বাইজেন্টাইন নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয় তুর্কি সুড়ঙ্গের বিপরীতে শহরের অভ্যন্তরে সুড়ঙ্গ খননের। ফলে সুড়ঙ্গপথে শহরে ঢোকামাত্র তুর্কিদের ওপর আক্রমণ করে পরাস্ত করা যাবে। ওদিকে তুর্কিরা এসব পরিকল্পনার কিছুই জানতে পারেনি। তারা সুড়ঙ্গ খনন করতে করতে এক পর্যায়ে গ্রিকদের খননকৃত সুড়ঙ্গে পৌঁছে যায়। শহরে প্রবেশের রাস্তা পেয়ে গেছে মনে করে তারা খুশি হয়। কিন্তু অচিরেই তাদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। শত্রুরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তুর্কিদের দেখামাত্র তারা সুড়ঙ্গের ভেতর বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস, তেল ও দাহ্য পদার্থ ঢেলে দেয়। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও আগুনে পুড়ে মারা যায় অনেক তুর্কি, বাকিরা পালিয়ে বাঁচে। ১৪৮
সুড়ঙ্গ যুদ্ধে বাইজেন্টাইনবাসী জয়ী হলেও তুর্কিদের এ পরিকল্পনা তাদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। পায়ের নিচে আওয়াজ হলে তারা মনে করত, সুড়ঙ্গপথে তুর্কিরা এগিয়ে আসছে। অনেক সময় তাদের মনে হতো, মাটি ফুঁড়ে বুঝি তুর্কি সৈনিকের উদয় হবে! তারা সদা-সতর্ক থাকত এবং ডানে-বামে তাকিয়ে মাঝে মাঝেই চিৎকার দিয়ে উঠত—'এই যে তুর্কি... এটা তুর্কি।' সন্ধ্যায় আবছা ছায়াকে তুর্কি সৈনিক মনে করে তারা পালিয়ে যেত। এভাবে সমস্ত কনস্ট্যান্টিনোপলে ভয়ের রাজত্ব কায়েম হয়। মনে হচ্ছে তারা মাতাল, অথচ মাতাল নয়। কেউ পালাচ্ছে, কেউ আকাশ পানে তাকিয়ে আছে, আরেক দল ভূমি নিরীক্ষা করছে।
ওদিকে প্রথমবারের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও সুলতান সুড়ঙ্গ খননের পরিকল্পনা বাদ দেননি; বরং ‘আকরি কাপি’ হতে গোল্ডেন হর্ন পর্যন্ত প্রলম্বিত সীমানায় আরও সুড়ঙ্গ খননের নির্দেশ দেন। কাজটি সত্যিকার অর্থে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সুড়ঙ্গে অনেক তুর্কি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। কেউ-বা রোমানদের হাতে ধৃত হয়—যাদের একমাত্র পরিণতি ছিল, তাদের কর্তিত মস্তক মুহূর্তের মধ্যেই প্রাচীরের বাইরে নিক্ষিপ্ত হতো। এই কৌশলের তাৎক্ষণিক ফল ছিল না, তবে এটি খ্রিষ্টানদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। তুর্কিদের সাহসিকতা ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা দেখে তারা বিস্মিত হয়।
ত্রিতল কাষ্ঠকেল্লা
ওদিকে সাময়িক ব্যর্থতা সুলতানকে মোটেও হতোদ্যম করতে পারেনি; বরং তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তার গতি বাড়িয়ে দেয়। এবার তিনি এমন এক কৌশল উদ্ভাবন করেন-যা সেই যুগের বিবেচনায় অত্যন্ত অভিনব ও বিরল বলে বিবেচিত হয়েছিল। এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর অবরোধ কৌশল ছিল। একদিন কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীর তো চোখ ছানাবড়া-বিশাল এক কাষ্ঠকেল্লা তাদের সামনে দৈত্যের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে! ত্রিতল কেল্লাটির উচ্চতা শহরের বহিঃপ্রাচীরের চেয়ে বেশি। কেল্লাটির বহিরাবরণ ভেজা মৎস্যচর্মে আচ্ছাদিত-যা আগুন ও তিরের আক্রমণ নস্যাৎ করার জন্য যথেষ্ট। এর প্রতি তলায় ছিল গোলা ও অস্ত্রসজ্জিত সৈনিক। কেল্লার নিচে ছিল মাটি-বালু ও কাঠের টুকরো-এগুলো পরিখা ভরাটের কাজে লাগত। আর কেল্লার ওপরে ছিল আঁটাযুক্ত কতগুলো মোটা দড়ির সিঁড়ি। প্রাচীরের ওপর ফেলে ঝুলন্ত ব্রিজ তৈরি করে সৈন্য পারাপারের জন্য এগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। আর প্রতিটি তলার সৈনিকরা তির-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত ছিল-প্রাচীরের ওপর যখনই কোনো প্রতিরোধকারীর মাথা দেখা যেত, তখনই তারা তির ও বর্শা ছুঁড়ত। ১৪৯
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের কৌশলগুলো বাইজেন্টানিয়ানদের মনে যুগপৎ ভয় ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। এটি দেখে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান। এ সময় তাঁর পরিষদবর্গও সাথে ছিলেন। সম্রাটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভেনিসিয়ান ইতিহাসবিদ নিকোলা বারবারোর প্রতিক্রিয়া-
'কনস্ট্যান্টিনোপলের সকল খ্রিষ্টান একযোগে চেষ্টা করলেও একমাসে এমন একটি কেল্লা নির্মাণ করতে পারবে না, অথচ তুর্কি মুসলিমরা এটি বানিয়েছে এক রাতে; না, বরং চার ঘণ্টারও কম সময়ে। '১৫০
অভিনব ও বিস্ময়কর এ কেল্লাটি স্থাপন করা হয়েছিল সেন্ট রোমানাস গেটের সামনে-যেটির সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন জেনোয়ান সেনাপতি গিওভান্নি। নতুন কেল্লাটি রোমানদের প্রাচীর সংস্কারে বড়ো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তুর্কিদের গোলা নিক্ষেপের বিরতিতে ইতঃপূর্বে রোমানরা প্রাচীর মেরামত করত। এখন প্রহরীর ন্যায় উঁচু মাথায় দাঁড়িয়ে যায় কাঠকেল্লাটি। ফলে যখনই কোনো খ্রিষ্টান সৈনিক প্রাচীর মেরামতে এগিয়ে আসত, তখনই কেল্লা থেকে তির নিক্ষেপ করে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। একদিন কিছুসংখ্যক তুর্কি সৈনিক দড়ির সিঁড়ি দিয়ে বানানো ঝুলন্ত ব্রিজ দিয়ে প্রাচীর পার হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের অভ্যন্তরে পা রাখে। সাম্রাজ্যের প্রতিরোধ যোদ্ধারা খোদ সম্রাটের নেতৃত্বে প্রাণপণ প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেল্লার ওপর তারা আগুনে গোলা নিক্ষেপ করে। ফলে কাঠকেল্লার বহিরাবরণ আগুনে পুড়ে খসে পড়ে। ধীরে ধীরে আগুন ছড়ায় পুরো কেল্লায়। বুর্জসমতে কেল্লাটি পড়ে যায়। আরেকবার তুর্কিদের অপসারণ করতে সমর্থ হয় বাইজেন্টিয়ামের প্রতিরোধ যোদ্ধারা।১৫১ তুর্কি ইতিহাসবিদ দিয়া শাকির লিখেছেন-
'কাঠকেল্লাটিকে ছাই হতে দেখে মৃদু হাসলেন সুলতান, আর তাঁর প্রকৌশলী মুসলিহুদ্দিনকে বললেন-'আগামীকাল আমরা আরও চারটা বানাব। '১৫২
তুর্কিদের ঠেকিয়ে দিতে পারলেও বাইজেন্টাইনবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর হয় না। এটা খুব স্বাভাবিক। কারণ, প্রবল প্রতাপান্বিত শত্রু চারদিকে শহর ঘিরে রেখেছে। কোনো দিক থেকে কোনো সরবরাহ নেই। পুরোনো ও দুর্বল নগরপ্রাচীর কতদিন ঠেকিয়ে রাখা যায়? অনিবার্য বিপদের মুখে অসহায় মানুষ অলৌকিকতায় বিশ্বাস স্থাপন করে। কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীর হলো একই অবস্থা। নির্মম বাস্তবতা হতে মুক্তি লাভে অনেকে কল্পনাবিলাস ও দিবাস্বপ্নের শরণ নেয়। কেউ কল্পনা করে, হুনিয়াডির নেতৃত্বে হাঙ্গেরির এক বিরাট বাহিনী তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসছে। অনেকে ভাবে, সাগরপথে বিরাট এক নৌবহর এসে তাদের মুক্ত করবে। কেউ-বা ধর্মাশ্রয়ী হয়ে এই ভেবে স্বস্তি পায়, শেষ মুহূর্তে দেবদূতরা এসে শত্রুনাশ করবে। তবে এসব কল্পনা হাওয়া হয়ে সময় লাগত না-যখন তারা দেখত যে, বিরাটাকারের তুর্কি কামানগুলো তীব্র নিনাদ সৃষ্টি করে অনবরত আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে যাচ্ছে।
যুদ্ধের এ পর্যায়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার প্রাসাদে একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশটা ছিল খুবই গুরুগম্ভীর। সম্রাটের মুখাবয়বে বেদনা ও ক্লান্তির ছাপ। অর্থোডক্স ধর্মযাজক প্যাট্রিয়ার্খের প্রতিনিধি সম্রাটকে শহর ত্যাগের উপদেশ দেন। ইতঃপূর্বেও সম্রাট নিরাপদ আশ্রয়ে গমনের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। পূর্বের মতো এবারও তিনি জনগণকে বিপদে ফেলে শহর ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে গমনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে শহরে অবস্থানের ঘোষণা দেন। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এমন করুণ পরিস্থিতি ও আবেগঘন পরিবেশে অশ্রু সংবরণ করা কঠিন। সভাসদরাও কাঁদলেন অঝোরে। শোক ও কান্নার এই অধিবেশন যখন চলছিল, তখনও বিকট আওয়াজে নগরপ্রাচীরে গোলা বর্ষিত হচ্ছিল। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় কান্নামগ্ন সম্রাট মূর্ছা যান।
২৬ মে, ১৪৫৩ সাল। কনস্ট্যান্টিনোপলের আকাশে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা। শহরবাসী প্রাকৃতিক এ দৃশ্য কুলক্ষণ বলেই গণ্য করে। হঠাৎ আকাশ হতে প্রচণ্ড আওয়াজে একটি বজ্রের পতন হয় আয়া সোফিয়ার গম্বুজের ওপর। এতে নগরবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। দিবসটির অলক্ষুণতা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো সন্দেহ থাকে না। তাদের প্রাণ হয় ওষ্ঠাগত। এমতাবস্থায় ধর্মযাজকরা আবারও সম্রাটের কাছে গিয়ে তাকে গোপনে দেশত্যাগের আকুল আবেদন জানান। কারণ, ঈশ্বর তাঁর সুরক্ষা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় নগর পতনের সব চিহ্ন সুস্পষ্ট হয়েছে। সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন এ কথা শুনে মূর্ছা গিয়ে ভূপতিত হন। হুঁশ ফিরে এলে সম্রাট বলেন- 'এটি যদি হয় ঈশ্বরের ইচ্ছা, তাঁর ক্রোধ হতে পালাব কোথায়?' সম্রাটেরই যদি হয় এ অবস্থা, সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হয়েছিল-তা সহজেই অনুমেয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শেষ দিনগুলোতে এই ছিল রাজধানীর অবস্থা; ভয়াবহ পেরেশানি, খুনে অস্থিরতা এবং বাস্তবতা হতে বহু দূরের স্বপ্ন।
আবু আইউব আনসারির কবর আবিষ্কার অভিযানের এক পর্যায়ে বিশিষ্ট সাহাবি আবু আইউব আনসারির কবর আবিষ্কৃত হয়। এই মহান সাহাবি ৫৩ হিজরিতে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বিজয়ের পর এখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। পরবর্তীকালে একটি প্রচলিত প্রথা ছিল এই, উসমানি সুলতানগণ অভিষেকের সময় এই মসজিদে উসমান গাজির তরবারি গলায় বেঁধে নিতেন। ১৫৩
সাত সপ্তাহ পার হলো-অবরোধও বহাল এবং যুদ্ধও চলমান। প্রাচীরের বড়ো অংশ খসে পড়েছে, বর্জ্য-আবর্জনায় পরিখাও ভরাট হয়ে গেছে। এতদিনের অবরোধ ও গোলাবর্ষণের পর সুলতানের বুঝতে পারেন, সর্বাত্মক আক্রমণ করতে হলে তিনটি পয়েন্টের কোনো একটি বেছে নিতে হবে। একটি হলো তাকফুর সরাই ও এদিন গেটের মধ্যবর্তী পয়েন্ট। দ্বিতীয়টি হলো রোমানাস গেটের কাছে লিকুস উপত্যকা-এটি ছিল সর্বাধিক আক্রম্য। আরেকটি পয়েন্ট হলো তৃতীয় সামরিক তোরণের কাছে।
শেষবারের মতো দূত প্রেরণ চূড়ান্ত আক্রমণের পূর্বে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইনকে শেষবারের মতো সুযোগ দিতে চাইলেন। বার্তাবাহক হিসেবে তিনি বাছাই করেন দামাদ কাসিম বে ইসফান্দিয়ারকে। এ ব্যক্তির সাথে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। বার্তায় সুলতান জানান-
'যুদ্ধের জন্য আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন। যে কাজ সম্পাদনের জন্য আমরা বহু দিন ধরে উদ্গ্রীব হয়ে আছি, সেটি বাস্তবায়নের সময় এসেছে। আমরা লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব কি না আল্লাহই ভালো জানেন। হয় আমি শহর জয় করব অথবা শহরটি আমাকে জয় করবে; জীবিত বা মৃত। আপনি কি শহর ত্যাগ করবেন? তাহলে আপনাকে আমি নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেবো। আপনার ভাইদের অন্য প্রদেশগুলোতে শাসক হিসেবে বহাল রাখব এবং আমরা মিত্র হিসেবে থাকব। আপনার মন্ত্রীরাও নিজেদের সহায়-সম্পদসহ নগর ত্যাগ করতে পারবে। আপনার প্রজারাও কোনো শাস্তির মুখোমুখি হবে না। আর যদি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখেন, তাহলে আপনি ও আপনার অমাত্যবর্গ জীবন ও সম্পদ হারাবেন। বন্দিত্ব বরণের জন্য আপনার প্রজাদের আমার সৈনিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে, শহরটিই কেবল আমার জন্য থাকবে। '১৫৪
যুদ্ধের এ পর্যায়ে দূত প্রেরণে বিস্মিত হন সম্রাট। তবে তত্ত্বানুন্ধান করে জানতে পারেন, এটি মুসলিমদের ধর্মীয় রীতি। তারা শান্তিপূর্ণভাবে নগর-জয়ের কোনো সুযোগ বাদ দিতে চায় না এবং শত্রুদের জন্য কোনো অজুহাত অবশিষ্ট রাখতে চায় না। ১৫৫ পুরোনো বন্ধুর সাথে সম্রাট মন খুলে কথা বলেন। এস্ফেন্দিয়ারও তাকে বোঝানোর সুযোগ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন-'সুলতানকে প্রতিরোধের কোনো ক্ষমতা গ্রিকদের নেই। গ্রিক-মুসলিম দ্বন্দ্ব নিরসনের এরচেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর আসবে না। সুপ্রতিবেশীসুলভ সদাচরণ চর্চার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বসবাস করার এটাই সুযোগ।' পাশাপাশি সম্রাটকে আরও জানানো হয়, আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হলে অনতিবিলম্বে অভিযান চালানো হবে। ফলে সম্রাট ও নগরবাসী যে নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হবেন, তা ঠেকানোর কেউ থাকবে না।
সম্রাট তার পারিষদের সাথে বসেন। অনেকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব করেন। কারণ, ইতোমধ্যে যুদ্ধের ফলাফল সুস্পষ্ট হয়েছে। তবে গিওভান্নিসহ কয়েকজন সামরিক কমান্ডার জোরালো বক্তব্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ফলে বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণের সকল সম্ভাবনা তিরোহিত হয়। পুরোনো বন্ধুকে সম্রাট এই বলে বিদায় করেন— 'আমরা সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আত্মসমর্পণ নয়; মৃত্যুকে বরণ করব। শহর রক্ষায় প্রাণ বিসর্জন দিতে আমরা কুণ্ঠিত হব না।' সম্রাটের জবাব যখন সুলতানের কাছে পৌঁছল, তখন তিনি বললেন—
'ভালো! হয় কনস্ট্যান্টিনোপলে আমাদের সিংহাসন হবে, নতুবা আমার কবর।' ১৫৬
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ কামানের গোলা নিক্ষেপের তীব্রতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। তাঁর প্রকৌশলীরা নতুন ধরনের কামান আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়—যা থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা অনেক উঁচুতে ওঠে। এটি ছিল অনেকটা আধুনিক যুগের মর্টারের মতো। নব-আবিষ্কৃত কামান হতে অব্যাহতভাবে শহরের কেন্দ্রস্থলে গোলা নিক্ষেপ করা হয়। অনবরত গোলা নিক্ষেপে কিছু কিছু এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নাগরিকদের মনে ব্যাপক ভয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
সুলতানের সর্বশেষ পরামর্শসভা
শেষ মুহূর্তের করণীয় নির্ধারণে সুলতান তাঁর ক্যানোপিতে বৈঠক ডাকেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রীবর্গ, সিনিয়র কমান্ডারবৃন্দ, আলিম ও শাইখবৃন্দ। সবাইকে অকপটে মতামত জ্ঞাপনের জন্য অনুরোধ করা হয়। কেউ কেউ অনতিবিলম্বে চূড়ান্ত হামলা হানার পরামর্শ দেন। অন্যথায় ফলাফলহীন দীর্ঘ অবরোধে সৈনিকদের মাঝে হতাশা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ-বা ভিন্ন পরামর্শ রাখেন। পরামর্শসভার আলোচনার সারমর্ম দুটি পয়েন্টে উপস্থাপন করা যায়—
এক: সুলতানের উজির খলিল আগার পরামর্শ
খলিল আগা ছিলেন সুলতানের পিতার উজির। জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার কল্যাণে তিনি তরুণ সুলতানের মন্ত্রণা পরিষদে জায়গা পান। অনেকে তার বিরুদ্ধে বাইজেন্টাইনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছিল। সুলতান তার সাথে খুব একটা সম্পৃক্ত হতেন না, তবে অভিজ্ঞতার কারণে তাকে স্বপদে বহাল রেখেছিলেন। খলিল আগার প্রস্তাবের সারমর্ম হলো—প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অব্যাহত সরবরাহ এবং গ্রিক ও লাতিনোদের ঐক্যের কারণে এ মুহূর্তে কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করা সম্ভব নয়। সুলতানের পিতা, দাদা ও পূর্বপুরুষ অনেক চেষ্টা করেও এই শহর জয় করতে পারেননি। তা ছাড়া কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন হতে দেখলে খ্রিষ্টানজগৎ নীরব থাকবে না। অতএব, প্রজাদের শান্তিতে থাকতে দিন। জেনোয়ান ও তাদের প্রতিবেশী ভেনিসিয়ানরা তো আপনার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। সুতরাং তাদের শত্রু বানাবেন না। অন্য খ্রিষ্টান জাতিগুলোর মাঝে ক্রোধের সঞ্চার করবেন না। শক্তিতে আপনি মহীয়ান। যুদ্ধ নয়; শান্তির সময়ে আপনি তা আরও বাড়িয়ে নিতে পারবেন। যুদ্ধের সমাপ্তি সব সময় অনিশ্চিত, বিপর্যয় প্রায়শই সমরের সঙ্গী হয়ে থাকে। তাই উত্তম হবে কিছুদিনের অভিযান স্থগিত রাখা-যাতে তুর্কিদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। বিনিময়ে সম্রাটের কাছ থেকে বার্ষিক ৭০,০০০ স্বর্ণমুদ্রা কর দাবি করা যেতে পারে। হয়তো ভবিষ্যতে সহজেই নগর জয় করা সম্ভব হবে। ১৫৭
ফ্লোরেন্সের বণিক টেডালডি (যিনি অবরোধের সময় কনস্ট্যান্টিনোপলে অবস্থান করছিলেন) উল্লেখ করেছেন, খলিল পাশার পরামর্শে প্রভাবিত হয়ে সুলতান অবরোধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন। বিকল্প হিসেবে তাঁর অর্জনের স্মারক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। ১৫৮ তবে জাগনুস পাশার পরামর্শে সুলতানের মনোভাব পরিবর্তিত হয়।
দুই: জাগনুস পাশা আলবানির পরামর্শ আলবেনীয় বংশোদ্ভূত জাগনুস (বা জাগান) পাশা আলবানি একজন নওমুসলিম হলেও জিহাদের ময়দানে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তাই সুলতানের বিশ্বস্ততা অর্জন করে তিনি অনিয়মিত বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছিলেন। খলিল আগা ও তার মাঝে সুপ্ত ঈর্ষা ও তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। তিনি বলেন- 'কেউ সুলতানের বিরাট শক্তির সামনে দাঁড়াতে পারবে না। তাই গ্রিকদের ওপর হামলা জোরদার করতে হবে। তাদের রসদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে এসেছে। কামান হামলায় প্রাচীর অতিক্রম করা সম্ভব। অতএব, খলিলের উচিত হবে না কুপরামর্শ দিয়ে সুলতানকে বিভ্রান্ত করা। জেনোয়ানরা বিভক্ত, ভেনিস ইতোমধ্যে মিলানের ডিউকের আক্রমণের শিকার। অতএব, কেউ তাদের সাহায্য করতে আসবে না।'১৫৯
তুর্কি বাহিনীর থ্রাসিয়ান কমান্ডের প্রধান তুরাহান জাগনুস পাশাকে সমর্থন করে সুলতানকে অভিযান অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। সেনা কমান্ডারগণও জাগনুস পাশা ও তুরাহানকে সমর্থন করেন। এ প্রস্তাব আলিমদের সমর্থন লাভেও ধন্য হয়। বিশেষত শাইখ আক শামসুদ্দিন ও শাইখ আহমদ আল-কুরানি সোৎসাহে অভিযানের প্রস্তাব সমর্থন করেন। সকলের মতামত অবহিত হয়ে সুলতান মন্ত্রণাসভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। অপেক্ষমাণ উৎসুক জনতা জানল-চূড়ান্ত অভিযান অত্যাসন্ন। ১৬০
২৯ মে চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত হয়। তার পূর্বে সৈনিকদের পরপর তিনদিন সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন সুলতান। ১৬১ উদ্দেশ্য ছিল, তাদের মন পবিত্র করা ও সংকল্প দৃঢ় করা। তিনি নিজে যান গোল্ডেন হর্নের নিকটবর্তী মর্মর সাগরের তীরে নগর-প্রাচীর নিরীক্ষা করতে। কামানের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রাচীরের সর্বাধিক নাজুক পয়েন্টগুলো তিনি পরখ করে দেখেন। তারপর কামান বাহিনীর আর্টিলারি কমান্ডারকে লিকুস উপত্যকার সন্নিকটে নিবিড়ভাবে গোলা নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। অতঃপর ব্যাপক অভিযানের জন্য (হুজুম আম) সৈন্যবিন্যাস সম্পন্ন করেন।
সৈনিকদের মনোবল চাঙা ও অটুট রাখার জন্য সুলতান আকস্মিক দেখা দিয়ে তাদের উৎসাহ দেন। তাদের মাঝে আত্মোৎসর্গের প্রেরণা ও বিজয়ের আশা জাগিয়ে তোলেন। তিনি বলেন- 'যুদ্ধে সাফল্যের পূর্বশর্ত তিনটি; বিজয়াকাঙ্ক্ষা, অপমানের লজ্জা এবং সেনাপতির আনুগত্য। '১৬২
জেনোয়াবাসী যুদ্ধে সম্পৃক্ত না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে অবরুদ্ধ শহরে কোনোরূপ সাহায্য প্রেরণ করা থেকে তাদের বিরত থাকতে বলেন সুলতান। তবে যুদ্ধে জেনোয়ার কোনো ক্ষতি হলে তার ক্ষতিপূরণ প্রদানের ওয়াদা করেন। তারপর সৈনিকদের মাঝে ঘোষণা দেন, শহরটি তিন দিনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে; তবে শহরের স্থাপনা ও প্রাচীর ধ্বংস করা যাবে না।
গনিমতের প্রতিশ্রুতি সৈনিকদের আগ্রহ ও প্রতিজ্ঞা আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারেও সুলতান তাদের সতর্ক করেন। যুদ্ধের ময়দানে কমান্ডারের পূর্ণ আনুগত্য যেন বজায় রাখে। কেউ যেন অনুমতি ব্যতীত স্বস্থান ত্যাগ না করে। শৃঙ্খলাভঙ্গের শাস্তি সম্পর্কেও তিনি সৈনিকদের হুঁশিয়ার করে দেন।
২৭ মে রাতের বেলায় সুলতানের নির্দেশে পুরো ক্যাম্পজুড়ে বাতি জ্বালানো হয়। বর্শাগ্রেও জ্বালানো হয় শত শত মশাল। বিরাট অগ্নিশিখা প্রজ্জলিত হয়, আর কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠে আকাশে। সাথে সাথে ব্যাপক শোরগোল, তবলা ও দামামা বেজে ওঠে। ফলে সৃষ্টি হয় এক অসাধারণ দৃশ্য। বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ ডুকাস এ দৃশ্যের বিবরণ দিয়ে বলেন—
'জলে ও স্থলে বিস্তৃত সেই আগুনের আলো যেন কনস্ট্যান্টিনোপল, জেনোয়া, তথাকার নৌযান ও স্কুটারির (বর্তমান উদ্বুদার) পশ্চাতে নোঙরকৃত জলযানের ওপর সূর্যের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে প্রতিভাত হয়। জলের পৃষ্ঠতল এমনভাবে ঝলমল করে, তা যেন বজ্রের ঝলকানিতে চমকিত।'
তুর্কি শিবিরে আগুন লেগেছে মনে করে প্রথমে খুশি হয়েছিল কনস্ট্যান্টিনোপলবাসী; কিন্তু প্রকৃত বিষয় বুঝতে পেরে অচিরেই তাদের আনন্দ পরিণত হয় বিষাদে।১৬৩ সার্বিক প্রস্তুতির তত্ত্বাবধানে কেটে যায় সুলতানের পরের দিন। এক ফাঁকে তিনিও প্রাচীর নিরীক্ষা করে আসেন। বাশাকতাসে তুর্কি নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন আমিরুল বাহর হামজা পাশা সমভিব্যহারে। সর্বাত্মক আক্রমণে (হুজুম আম) নৌবহরের সকল জাহাজ যেন অংশ নেয়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। সুলতান আরও নির্দেশ দেন ওয়ার ফ্রিগেটের একাংশ যেন মর্মর সাগর সংলগ্ন নগরপ্রাচীরের কাছে মোতায়েন করা হয়-যাতে যোদ্ধারা প্রয়োজনে নৌযান ব্যবহার করে প্রাচীর পাড়ি দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে পারে।
সর্বাত্মক অভিযানের নৈকট্য বুঝতে পেরে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন (২৮ মে) মহা প্রার্থনাসভার আয়োজন করেন। শহরে বিরাট এক শোভাযাত্রা বের হয়-যাতে অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক ধর্মগুরু, শিশু, নারী ও পুরুষরা অংশ নেয়। নগর প্রদক্ষিণকালে ঈশ্বরের করুণা লাভের আশায় তারা কুমারী মাতা মেরির পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন বহন করে। সকরুণ রোদনে বিষাদময় ধর্মগীতই (হে ঈশ্বর! আমাদের ওপর দয়া করো!) ছিল তাদের স্লোগান। ঈশ্বরের কাছে তাদের একমাত্র প্রার্থনা ছিল, তিনি যেন ধ্বংসের হাত থেকে তাদের রক্ষা করেন এবং বিপদ হতে উদ্ধার করেন। ১৬৪
নগর প্রদক্ষিণ শেষে শোভাযাত্রা যায় প্রাচীরের দিকে। যাজক ও পুরোহিতরা কুমারী মাতা মেরির প্রতিকৃতি নিয়ে রোমানাস গেটের কাছে প্রাচীরের ওপর আরোহণ করেন। এ সময় পুরো সমাবেশে বিরাজ করছিল পিনপতন নীরবতা।
পারিষদবেষ্টিত হয়ে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন উপস্থিতিকে সম্বোধন করে ভাষণ দেন। জনগণকে তিনি ধৈর্যধারণ ও মাতৃভূমির জন্য আত্মোৎসর্গ করার আহ্বান জানান। তারপর জেনোয়ান ও ভেনিসিয়ানদের দিকে ফিরে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তাদেরও মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও খ্রিষ্টধর্ম রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সিংহাসনের মর্যাদা রক্ষায় আমৃত্যু লড়াই করার প্রত্যয়ও ঘোষণা করেন সম্রাট। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষণ শেষ করে সম্রাট কান্নায় ভেঙে পড়েন। উপস্থিতির মধ্যে এমন কেউ ছিল না-যার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়নি। সর্বসাধারণের কাছে মনে হয়, পৃথিবীর আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। করুণ রোদনে তারা তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঈশ্বরের সাহায্য কামনা করে। কারণ, তারা তাঁর প্রিয় বান্দাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে।
ওই দিন সন্ধ্যায় আয়া সোফিয়ায় মহা প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। প্রসিদ্ধ গির্জায় এটিই ছিল সর্বশেষ প্রার্থনা। প্রার্থনার সময় কেমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছি, তা সহজেই অনুমেয়। ফ্রান্টেজ লিখেছেন-
'কান্না ও রোনাজারির বিবরণ কে দেবে? সেই পরিবেশে, এমনকী কাষ্ঠ ও প্রস্তরনির্মিত মানুষও কান্না সংবরণ করতে পারত না।'১৬৫
২৯ মে, মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে সর্বব্যাপী আক্রমণ (হুজুম আম) শুরু হয়। বেজে উঠল যুদ্ধ ঘোষণাকারী নাগারা। তুর্কি ডঙ্কার আওয়াজ শুনে কনস্ট্যান্টিনোপলের গির্জায়ও বেজে উঠে ঘণ্টাধ্বনি। কিন্তু তা কেবল শহরবাসীর ভয়-ই বাড়িয়ে দেয়। অনেকে ত্রস্তপদে আশ্রয় নেয় গির্জায়। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে অটোমান বাহিনী জলে ও স্থলে যুগপৎ হামলা চালায়।
সুলতান তাঁর বাহিনীকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করেন। প্রথম অংশে ছিলেন রোমেলি যোদ্ধারা; যাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন জার্মান, হাঙ্গেরি, গ্রিক ও ইতালির খ্রিষ্টান যোদ্ধারা। এই গ্রুপের একবারে সামনের কাতারে ছিল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধারা। অগ্রসরমান দলটি প্রাচীর হতে এক তিরের দূরত্বে পৌঁছে থামে। তারপর শুরু হয় বৃষ্টির ন্যায় তির নিক্ষেপ। ওদিকে আর্টিলারি বাহিনী কামান থেকে অনবরত গোলা নিক্ষেপ করছিল প্রাচীরে। প্রতিরোধকারীরাও প্রতিরোধ করছিল সমানতালে।
এরপর আসে তুর্কি বাহিনীর দ্বিতীয় দল। অব্যাহত তিরবৃষ্টির নিচেই তারা প্রাচীরে অনেকগুলো সিঁড়ি স্থাপন করে। কিন্তু বাইজেন্টাইন যোদ্ধারা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রস্তর নিক্ষেপ করতে থাকায় সিঁড়ি উলটে বহু তুর্কি সৈন্য ভূপতিত হয়। অনেকে মারা পড়ে। কিন্তু এতেও তারা দমে না। সিডি দিয়ে প্রাচীর পার হওয়ার জন্য তারা অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। এভাবে দুই ঘণ্টা লড়াই চলার পর সুলতান যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেন।
তুর্কি সৈন্যদের পশ্চাদপসরণ দেখে বাইজেন্টাইন সৈন্যদের মাঝে একটু শৈথিল্য আসে। আর তখনই সুলতান তাঁর বাহিনীর দ্বিতীয় দল তথা আনাতোলিয়ান কমান্ডকে একই পয়েন্টে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন তার প্রতিরক্ষা রেখার নড়বড়ে অবস্থা উপলব্ধি করতে পারেন। তারপরও গিওভান্নি ও তার বর্মধারী সৈনিকরা গোলা ও তিরের সাহায্যে প্রাণপণ প্রতিরোধ চালিয়ে যান। তুর্কিদের বেশ কিছু সিঁড়ি রোমানরা এমনভাবে উলটিয়ে দেয় যে, বহু তুর্কি সৈনিক তার নিচে চাপা পড়ে।
তারপর সুলতান আবারও পদাতিক বাহিনী সরিয়ে আর্টিলারিকে কামান দাগাতে বলেন। এবার প্রাচীরের আরও কাছ থেকে গিওভান্নি বাহিনীর ওপর গোলা ফেলা হয়। ঘন ধোঁয়ার নিচে তুর্কি সৈন্যরাও ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু প্রতিরোধ যোদ্ধারা অটল পাহাড়ের ন্যায় অনড় হয়ে থাকেন।
ওদিকে সাগরেও চলছিল লড়াই। অ্যাডমিরাল হামজা পাশার নেতৃত্বে তুর্কি নৌবাহিনীর প্রধান অংশ অবস্থান করছিল মর্মর সাগরে। গোল্ডেন হর্নেও ছিল কিছু তুর্কি যুদ্ধযান। তুর্কি জাহাজের পাটাতন থেকে মই লাগিয়ে এবং প্রাচীরে আন্টাযুক্ত দড়ি লাগিয়ে প্রাচীর অতিক্রমের চেষ্টা করছিল নৌ-সেনারা। ওদিকে বাইজেন্টাইন সৈনিকরা আগুয়ান তুর্কি সৈনিকদের ওপর তির, বর্শা ও গরম তেল নিক্ষেপ করছিল। সত্যিকার অর্থে এটি ছিল একটি প্রাণান্তকর লড়াই। একদিকে রোমানরা মাতৃভূমি রক্ষার্থে জানবাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, অপরদিকে বহুবার ব্যর্থ হওয়ার পর তুর্কিরা এবার সফল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। শহরের উত্তর দিক দখলের চেষ্টা করছিলেন কারাজা বেগের বাহিনী। তার সৈনিকদের প্রবল আক্রমণে বাইজেন্টাইন সৈন্যরা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়। কিছু সৈনিক নগরপ্রাচীর পার হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। হাতাহাতি লড়াইয়ে বহিঃপ্রাচীরের এই অংশের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত বাইজেন্টাইন কমান্ডার নিহত হলে তার অধীনস্থ সৈন্যরা পালিয়ে যায়। তারপর ভাঙা প্রাচীরের ছিদ্রপথে তুর্কি যোদ্ধারা প্রবল স্রোতের বেগে শহরে ঢুকতে শুরু করে।
তুর্কি বাহিনীর জেনিসেরি সৈন্যরা এতক্ষণ অব্যবহৃত ছিল। শহরে প্রবেশের একটি পথ উন্মুক্ত হওয়ায় সুলতান তাদের এদিক দিয়ে শহরে অভিমুখে মার্চ করার নির্দেশ দেন। স্রোতের বেগে জেনিসেরি সৈন্যরা লিকুস উপত্যকার দিকে ধেয়ে যায়।
তাকবির ধ্বনি দিয়ে তারা অন্তঃপ্রাচীরের দিকে এগিয়ে যায়। জেনিসেরিদের একটি দল শহরে পৌঁছে রোমান সাম্রাজ্য ও ভেনিসিয়ান পতাকা নামিয়ে অটোম্যান পতাকা লাগিয়ে দেয়। এই দিন প্রত্যুষে বাইজেন্টাইন বাহিনীর চিফ কমান্ডার গিওভান্নি গিওস্টিনিয়ানি গোলার আঘাতে গুরুতর আহত হন। কাউকে স্থলাভিষিক্ত না করে এবং সম্রাটের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি শল্যচিকিৎসকের সেবা নেওয়ার জন্য জাহাজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। তার জন্য নগরের একটি তোরণ খুলে দেওয়া হলে সেপথে যেমনিভাবে তুর্কিরা শহরে প্রবেশের সুযোগ পায়, তেমনি হতোদ্যম গ্রিক সৈন্যরাও পালিয়ে যায়।
গোল্ডেন হর্নের শেকলের পেছনে নোঙর করা নিজস্ব জাহাজে গিয়ে যখন গিওভান্নি শুনতে পান, কনস্ট্যান্টিনোপল তুর্কি সৈন্যে সয়লাব হয়ে গেছে, তখন তার অনুসারী সৈনিক ও নাবিকদের ফিরে আসার আদেশ দিয়ে ঢাক পেটানোর আদেশ দেন। তারপর Chios দ্বীপে পালিয়ে যান। সেখানে হয় আঘাতের প্রভাবে অথবা মনস্তাপে তার মৃত্যু হয়; যদিও কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরের অভ্যন্তরে তলোয়ার হাতে লড়াই করে গৌরবের মৃত্যু বরণ করার সুযোগ এসেছিল তার সামনে। কারও মতে-যাত্রাপথেই তার মৃত্যু হয়। তবে হাসলাক লিখেছেন-ওই দ্বীপে এখনও তার সমাধি বিদ্যমান রয়েছে। ১৬৬
কমান্ডার-ইন-চিফ গিওভান্নি গিউস্টিনিয়ানি যখন আহত অবস্থায় পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সম্রাট উজ্জীবনী ভাষণে তাকে ফেরাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত না করে জেনোয়ান অভিযাত্রী পালিয়ে যান। এতে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তারা বিশৃঙ্খল অবস্থায় পালাতে থাকে। এমতাবস্থায় রাজধানীর পতনের ব্যাপারে সম্রাট নিশ্চিত হন। গ্রেফতার হওয়ার লজ্জা এড়ানোর জন্য তিনি চিৎকার দিয়ে বলেন-'ঈশ্বরের দোহাই! আমার জোয়ান সৈনিকদের মাঝে এমন কেউ কি নেই, যে আমার তরবারি দিয়ে আমার জীবনের সমাপ্তি টানবে?' কিন্তু তাকে ফেলে সবাই পালিয়ে যায়। এক পর্যায়ে দুজন তুর্কি যোদ্ধার আঘাতে সাধারণ সৈন্যের মতো মৃত্যু হয় সর্বশেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন ড্রাগাসেসের। ১৬৭
সম্রাট নিহত হওয়ার পর তুর্কি অগ্রযাত্রায় আর কেউ বাধা হতে পারল না। ঢেউয়ের ন্যায় তুর্কিরা আছড়ে পড়তে থাকে কনস্ট্যান্টিনোপলে। ওদিকে সমানতালে চলছিল নৌযুদ্ধ। কনস্ট্যান্টিনোপল যখন তুর্কি সৈন্যে সয়লাব, তখনও পোতাশ্রয় রক্ষাকারী শিকলের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইতালীয় যুদ্ধতরির হাতে। কিন্তু নগরের পতন দেখে প্রতিরোধ নিরর্থক জেনে তারা পিছু হটে। ওই সময় সমুদ্রতীরে সহস্র পলায়নপর মানুষের ভিড়। সেই তুলনায় নৌযানদের সংখ্যা অনেক কম। তাই ভেনিসিয়ান জাহাজগুলো যতটা সম্ভব স্বদেশি শরণার্থী বহন করে পালিয়ে যায়। হুড়োহুড়ি করে ছোটো নৌকায় আরোহণ করতে গিয়ে নৌযান উলটে অনেকে ডুবে মারা যায়। এমন বিহ্বল পরিস্থিতিতে যেমনটি হয়, প্রতিটি মানুষ কোনোরূপ শৃঙ্খলা ছাড়াই যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়। এমনকী সুলতানের বারংবার প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা না রেখে অনেক জেনোয়ান মূল্যবান সম্পদ নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যায়।১৬৮
এভাবে যুদ্ধ ও লড়াইয়ে পূর্ণ ৫৪ দিন পার হওয়ার পর সুরক্ষিত বাইজেন্টাইন রাজধানীর পতন হয়, এমন এক বীর সুলতানের হাতে-যার বয়স মাত্র ২৩। এই তরুণ উসমানি সুলতান মুসলমানদের বহুদিনের আরাধ্য এক স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। কনস্টান্টিনোপল জয়ের ব্যাপারে রাসূল ﷺ সুসংবাদ দিয়েছিলেন আটশো বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ে বহু মুসলিম শাসক রাসূলের সেই সুসংবাদ বাস্তবায়নের গৌরব অর্জনের লক্ষ্যে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা সবাই ব্যর্থ হন। অবশেষে আটশো বছর পর এক তরুণ সুলতানের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সেই সুসংবাদ বাস্তবায়িত করেন। কনস্ট্যান্টাইন দ্যা গ্রেট বাইজেন্টিয়ামে যে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন, সেই রাজধানী ও সাম্রাজ্যের পতন হয় সর্বশেষ কনস্ট্যান্টাইনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।
তুর্কি সৈন্যে সয়লাব
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশ্ববিশ্রুত রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপলের বহিঃপ্রাচীর ও অন্তঃপ্রাচীরের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে পড়ার পর তুর্কি সৈন্যরা বানের স্রোতের বেগে চারদিক থেকে প্রবেশ করতে থাকে। নগরবাসী প্রথমে ভয়ই পেয়েছিল। সম্রাট ও তার দেহরক্ষীরা নিহত হয়েছেন। অভিজাত ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকে মারা পড়েছেন। কেউ কেউ নিজের গায়ের চামড়া নিয়ে পালিয়েছেন। দুঃখ, বেদনা ও হতাশায় অনেকে মারা যায়। কেউ-বা আত্মহত্যা করে। হুড়োহুড়ি করে বন্দরের দিকে পালাতে গিয়ে বহু মানুষ-বিশেষত নারী ও শিশু পদদলিত হয়েও মারা যায়। অনেকে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে অজানা ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায় পড়ে থাকেন। বহু নারী-পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নেয় আয়া সোফিয়ায়। তাদের আশা ছিল, সাধুসন্তরা তাদের বাঁচাবেন।
দেবদূতরা এগিয়ে আসবেন বিধর্মী দলনে। গির্জায় প্রবেশের পর তার এর দরজা বন্ধ করে দিয়ে যীশু ও মাতা মেরির কাছে প্রার্থনা করতে থাকে। তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, উসমানি তুর্কিরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর জাতি; পরাজিতদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।১৬৯
তাদের এমন ধারণা ও বিশ্বাসের যুক্তিসংগত কারণ ছিল। বিজয়ী বাহিনী বিজিতদের সাথে কেমন আচরণ করে, তা তাদের অজানা নয়। আড়াই শতাব্দী আগে স্বজাতির ক্রুসেডাররা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে যে ধ্বংসলীলা ও লুটপাট চালিয়েছিল, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তারা শুনে এসেছে। তুর্কিরা তো বিধর্মী, অতএব, তাদের পক্ষ থেকে আরও নিষ্ঠুর ও নির্মম ব্যবহারের আশঙ্কা অযৌক্তিক ও অবান্তর নয়।
তুর্কি সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করে। ইতোমধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, দুই পক্ষেই বহু মানুষ নিহত হয়েছে। শহরে প্রবেশে পর তারা অবশিষ্ট প্রতিরোধ পকেটগুলো ধ্বংস করে। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। কারণ, অনেক যোদ্ধা ও সাধারণ নাগরিক প্রাচীর থেকে পালিয়ে এসে ঘরের ছাদে বা গলির মুখে লুকিয়ে তুর্কি সৈন্যদের ওপর তির, বর্শা, কাষ্ঠখণ্ড, পাথর ও আগুনে গোলা নিক্ষেপ করছিল। তাই শহরে প্রবেশের পরও মুসলিমদের শত্রুনিধন অব্যাহত রাখতে হয়।
পূর্বঘোষণা অনুসারে-শহরটি তিনদিন হালাল ছিল। এ সময় তুর্কিরা বহু গনিমত লাভ করে এবং অনেক নারী-পুরুষকে বন্দি করে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের পর বিজিত নগরে কমবেশি ধ্বংসলীলার চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। অনেক ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ (যেমন-Fyodor Ivanovich Uspensky ১৮৪৫-১৯২৮) মনে করেন, ১২০৪ সালে ক্রুসেডাররা স্বজাতীয় শহর কনস্ট্যান্টিনোপল দখলের সময় যে নিষ্ঠুর ধ্বংসলীলার স্বাক্ষর রেখেছিল, সেই তুলনায় ১৪৫৩ সালের কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়াভিযানে তুর্কিরা যথেষ্ট নম্র ও মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছে। ১৭০
এ সময় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ শহরের বাইরে অবস্থান করে তৃপ্ত নয়নে বিজয়দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। সুরক্ষিত নগরী-যা বহু বিজেতাকে প্রতিরোধ করেছে-তা আজ তাঁর পদানত। কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরে উড়ছে তুর্কি নিশান। সৈন্যরা ঘোড়া হাঁকিয়ে তুর্কি পতাকা উড়িয়ে ছুটোছুটি করছে-নয়ন ভরে এ দৃশ্য উপভোগ করেন সুলতান। ঘনিষ্ঠ সভাসদের অভিনন্দনে সিক্ত হন তিনি। বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ সুলতানের সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল-'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর! আল্লাহ শহিদগণকে রহমত করুন, মুজাহিদদের মর্যাদা দান করুন এবং আমার জাতিকে গৌরবান্বিত করুন।'
কনস্ট্যান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন
বিজয়ের পর কনস্ট্যান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন করে ইসলামবুল (ইসলামের নগরী) রাখা হয়। কালক্রমে তুর্কি ভাষার প্রভাবে নামটি ইস্তাম্বুলে পরিণত হয়। Ehrlich অবশ্য ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন-'ত্রয়োদশ শতকে কনস্ট্যান্টিনোপলের নাম হিসেবে আরবরা eis ten polin ব্যবহার করতে শুরু করে। এটি মূলত একটি গ্রিক বাক্যাংশ- যার অর্থ হয় in the city। কয়েক শতাব্দীর প্রচলনের ফলে ধ্বনিগত পরিবর্তন সাধিত হয়ে eis ten polin রূপান্তরিত হয়ে Istanbul-এ পরিণত হয়।'১৭১
বিজয়ী সুলতানের নগর প্রবেশ
দ্বিপ্রহরের পর বিজয়ী সুলতান মুহাম্মাদ জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রাসহ ঘোড়ায় চড়ে রোমানাস গেট দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন। তাঁর সাথে ছিল মন্ত্রীবর্গ এবং জ্যেষ্ঠ সেনাপতিবৃন্দ। শহরের জাঁকজমকপূর্ণ দালান ও প্রাচীন নিদর্শনাদি তাঁকে বিস্মিতই করে। শোভাযাত্রার চারপাশে দাঁড়ানো তুর্কিদের ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হচ্ছিল-'মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, আমাদের সুলতান দীর্ঘজীবী হোন, আমাদের সুলতান দীর্ঘজীবী হোন!'
মধ্যশহরে পৌঁছে সুলতান থামেন এবং উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি পরিষ্কার আরবিতে রাসূল ﷺ-এর সুসংবাদবাহী হাদিসটি উল্লেখ করেন। আর এই গৌরবের অংশ হওয়ায় সবাইকে অভিনন্দিত করেন। তিনি উপদেশ দেন দৃঢ়তা, আমানতদারি, উন্নত চরিত্র ও সদাচরণ এবং শহরবাসীর সাথে নম্র আচরণের। হত্যা ও লুটতরাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশও দেন সুলতান। ঐতিহাসিক এই দিন থেকে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ 'ফাতিহ' উপাধিতে ভূষিত হন। আরবি শব্দ ফাতিহ-এর অর্থ বিজয়ী।
বিজয়ী শোভাযাত্রা এগিয়ে যায় কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রধান গির্জা আয়া সোফিয়ার দিকে। কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রধান গির্জার অভ্যন্তরে বহু শিশু ও নারী-পুরুষ আশ্রয় নিয়েছিল। স্পেনীয় শহরগুলোর পতনের সময় মসজিদে আশ্রয় নেওয়া মুসলমানরা যে আচরণের শিকার হয়েছিলেন, এই শহরের খ্রিষ্টানদের তেমন অভিজ্ঞতা হয়নি। আশ্রয় গ্রহণকারীদের সাথে কোনোরূপ দুব্যবহার না করে সুলতানের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে বিজয়ী সৈনিকরা। গির্জাফটকের কিছুটা দূরে সুলতান ফাতিহ ঘোড়া থেকে নামেন। তারপর একটু ঝুঁকে মাটি নিয়ে মাথায় লাগান। ফটকের কাছে গেলে তিনি সকরুণ রোদন ও প্রার্থনার আওয়াজ শুনতে পান। সুলতান সুরক্ষিত প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যান। তাঁর আগমনের খবর পেয়ে ফটকের দুই পাল্লাই খুলে দেওয়া হয়। বিরাট পাগড়ি মাথায় সুলতানকে দেখতে পেয়ে লোকজন ভয়ে কুঁকড়ে যায়। তাদের প্রার্থনাধ্বনি বন্ধ হয়ে যায়। ১৭১ সবাই অনিবার্য পরিণতির ভয়ে কম্পমান। সুলতান এগিয়ে যান গির্জাবেদির দিকে। সেখানে অর্থোডক্স পুরোহিতরা তাঁর মুখোমুখি হন। ভীত পুরোহিতদের কেউ-বা টেবিল ও পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। সুলতান তাদের শুধু অভয়ই দেন না; বরং সুরক্ষার ওয়াদাও দেন। প্রধান যাজককে নির্ভয়ে পূর্ববৎ প্রার্থনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আল্লাহর প্রশংসায় সুলতান আবারও সিজদাবনত হন। তারপর প্রার্থনারত ব্যক্তিদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তাসহ নিজ নিজ ঘরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৭৩
অতঃপর সুলতানের নির্দেশে এক মুয়াজ্জিন আয়া সোফিয়ার বেদিতে উঠে আজান দেন। প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত গির্জার বেদিতেই সর্বপ্রথম আজানের আওয়াজ বুলন্দ হয়। সেদিন থেকেই এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান মসজিদে পরিণত হয়। তুরস্ক সরকার কর্তৃক ১৯৩৪ সালে জাদুঘরে রূপান্তরের পূর্ব পর্যন্ত এটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৭৪ তারপর সুলতান ঘোষণা দেন, এই প্রাচীন স্থাপনার মসজিদে রূপান্তরের অভিষেক হবে পরবর্তী জুমার সালাত আদায়ের মাধ্যমে। সাথে সাথে কাজে লেগে যায় নির্মাণ শ্রমিকরা। ক্রুশ নামিয়ে, সেন্ট ও নানদের ছবি অপসারণ করে এবং দেয়ালে চুনকাম করে গির্জাটির অংশীবাদী চিহ্ন দূর করা হয়। এভাবে গির্জাটি মসজিদের উপযুক্ত হয়। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে কনস্ট্যান্টিনোপলের খ্রিষ্টান জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় এবং মুসলিমদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শহরের অর্ধেক গির্জা মসজিদে রূপান্তর করা হয়। বাকিগুলো গির্জা হিসেবে বহাল থাকে। ১৭৫
এবার সুলতানের গন্তব্য হয় সম্রাটের প্রাসাদ। এখানে তিনি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পান। সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন, প্রধান সেনাপতি গিওভান্নি ও গ্রান্ড ডিউক লুকাস নোটারাস-এর পরিণতি সম্পর্কে জানতে চান সুলতান। তাদের মাঝে কেবল নোটারাসকে পাওয়া যায়। তিনি অবরোধের সময় শহরের বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান ছিলেন। সুলতান তার সাথে ভালো আচরণ করেন। সুলতানের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সম্রাটের পরিণতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। আর গিওভান্নি আহত হয়ে গোল্ডেন হর্নে নোঙর করা এক জাহাজে উঠে পালিয়েছেন-এতটুকুই জানেন।
নোটারাস, তার পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করেন সুলতান। একই সঙ্গে তিনি সম্রাটের সন্ধানে একদল লোককে রোমানাস গেটে এবং আরেক দলকে গিওভান্নির খোঁজে গোল্ডেন হর্নে প্রেরণ করেন।
ইতোমধ্যে এক সার্ব সৈনিক ধূলি ও রক্তমাখা একটি মস্তক নিয়ে এসে দাবি করে-এটি নিহত সম্রাটের মুণ্ড। নোটারাসের সত্যায়নে ফাতিহ নিশ্চিত হন, এটি সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের কর্তিত মস্তক। মৃত সম্রাটের লাশের সাথে এমন আচরণ দেখে সুলতান ব্যথিত হন। যথাযোগ্য মর্যাদায় সম্রাটের দেহ সমাহনের নির্দেশ দেন সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ। ১৭৬
সর্বশেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন পরাজিত হয়েছেন বটে, তবে তিনি কাপুরুষ ছিলেন না। সাম্রাজ্য, স্বজাতি ও স্বধর্মের জন্য তিনি জানবাজ সৈনিকের মতো সম্মুখসমরে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক সম্রাট ও রাজা-বাদশাহর নাম পাওয়া যায়-যারা সম্পদের বিনিময়ে কিংবা শুধু নিজ প্রাণের বিনিময়ে সাম্রাজ্য বিক্রি করেছে কিংবা জনগণকে বিপদে ফেলে পালিয়ে গেছে। কিন্তু বারংবার অনুরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন প্রজাদের ছেড়ে পালিয়ে যাননি।
নোটারাসের কাছ থেকে বাইজেন্টাইন প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করেন। তারপর সম্রাটের আত্মসমর্পণ না করার কারণ জানতে চান। উত্তরে নোটারাস জানান, ভেনিস ও জেনোয়া সর্বদা সম্রাটকে আত্মসমর্পণ না করতে উৎসাহিত করেছে। তা ছাড়া সুলতানের প্রথম উজির খলিল পাশাও পত্র মারফত সম্রাটকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সমকালীন রোমান ধর্মযাজক ও গ্রিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে যারা কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের ইতিহাস লিখেছেন, তাদের প্রায় সকলে সুলতানের প্রথম উজির খলিল পাশাকে খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাদের বিবরণে দেখা যায়—খলিল পাশার মাধ্যমেই সুলতানের শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বাইজেন্টাইন সম্রাট জানতে পারতেন। তিনিই সম্রাটকে প্রতিরোধযুদ্ধে সুদৃঢ় থাকার পরামর্শ দিয়ে বলতেন, পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলোর মতো এবারও কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। চূড়ান্ত অভিযানের পূর্বে আয়োজিত পরামর্শ সভায়ও খলিল পাশা অবরোধ তুলে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সম্ভবত এসব কারণে সুলতান ফাতিহের মনে খলিল পাশার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়। বিজয়ের দুদিন পর ১ জুন খলিল পাশাকে পদচ্যুত ও গ্রেফতার করে এদিনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১০ জুলাই তা কার্যকর করা হয়। ১৭৭
কনস্ট্যান্টিনোপলের বাসিন্দাদের সাথে সুলতান কোমল আচরণই করেন। বন্দিদের সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেন তিনি। অনেক বন্দিকে সুলতান মুহাম্মাদ নিজ অর্থে মুক্ত করেছেন—বিশেষত গ্রিক প্রিন্স ও ধর্মযাজকদের। তারপর সুলতান বিশপদের সাথে বৈঠকে বসেন। তাদের ভয় দূর করা হয়। খ্রিষ্টানদের উপাসনালয়ের সুরক্ষা ও স্বাধীনভাবে ধর্মপালনের নিশ্চয়তা দেন তিনি। পরদিন অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু তথা প্যাট্রিয়ার্থকে বরখাস্ত করেন। গির্জাপরিষদকে নতুন প্যাট্রিয়ার্থ নির্বাচনের নির্দেশ দেন। তারা গেন্নাদিয়াসকে (Gennadius II) নতুন প্যাট্রিয়ার্থ হিসেবে নির্বাচন করেন। নয়া যাজকপ্রধান বিশপদের নিয়ে শোভাযাত্রাসহ সুলতানের প্রাসাদে যান। ইতোমধ্যে সুলতান সম্পর্কে তাঁর ধারণাই পালটে গেছে। তিনি অনুভব করেন, তিনি একজন শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, মার্জিত সুলতানের সামনে বসে আছেন—যিনি সুদৃঢ় ধর্ম, উচ্চতর মানবিকতা এবং পরিপূর্ণ পৌরুষের অধিকারী।
সুলতান মুহাম্মাদ অর্থোডক্স প্যাট্রিয়ার্থের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি পুনর্নির্ধারণ করেন—তাকে রোমান নাগরিকদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারের অধিকার দেওয়া হয়। এজন্য গির্জার যাজকদের নিয়ে একটি পরিষদ গঠন করা হয়। প্রদেশসমূহের খ্রিষ্টান নাগরিকদের জন্যও অনুরূপ বিধান জারি করা হয়। বিপরীতে তাদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ করা হয়। তবে যাজক ও উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিদের এ কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১৭৮
প্যাট্রিয়ার্থকে বিদায় জানাতে গিয়ে সুলতান উঠে দাঁড়ান। তারপর তাঁকে সুদর্শন ঘোড়ায় আরোহণে সাহায্য করেন। হৃষ্টপুষ্ট অশ্বটি সুলতানই তাকে উপহার দিয়েছিলেন। মন্ত্রী ও সভাসদগণকে ফাতিহ নির্দেশ দেন, তাঁরা যেন প্যাট্রিয়ার্থকে বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসেন।১৭৯ শুধু তাই নয়; অর্থোডক্স ধর্মগুরুকে তিনি মন্ত্রীর মর্যাদা দেন। সুলতানের হৃদ্যতাপূর্ণ মেলামেশা ও আন্তরিক ব্যবহারে প্যাট্রিয়াসহ সকল যাজক প্রভাবিত হন।
রোমান নাগরিকদের সাথে সুলতানের আচরণ ভিন্ন ছিল না। মুসলিমদের দিক থেকে তারা কল্পনাতীত সদাচরণ পায়। অথচ নিশ্চিত মৃত্যুকে নিজেদের ভবিতব্য ধরে নিয়েছিল তারা। এটা সত্য যে, এত বড়ো যুদ্ধের পর বিজিত জনগোষ্ঠীর অনেকে পালিয়ে গিয়েছিলে। কিন্তু সুলতানের পক্ষ থেকে জীবনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং মুক্তভাবে ধর্মচর্চার অধিকার পেয়ে তারা দলে দলে ফিরে আসে। আর তাই কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের কিছুদিনের মধ্যেই শহরে স্বস্তি ফিরে আসে। নতুনভাবে শান্তি ও নিরাপত্তায় তারা জীবন শুরু করে। ১৪৫৩ সালের ১ জুন প্রথমবারের মতো জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় আয়া সোফিয়ায়। শাইখ আক শামসুদ্দিন তাঁর শিষ্য সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের নামে খুতবা পাঠ করেন।১৮০
কনস্ট্যান্টিনোপলের নগর প্রাচীরের অভ্যন্তরে ৫০,০০০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস ছিল না। কারণ, ১২০৪ সালের লাতিন আগ্রাসনের সময় বাইজেন্টাইন রাজধানী ১০ লাখের বেশি লোক হারায়। পরবর্তী সময়ে নগরের জনসংখ্যা আরও হ্রাস পায়। তাই কনস্ট্যান্টিনোপলের জনমিতির ভারসাম্য রক্ষার্থে সেপ্টেম্বর মাস অতিবাহিত হওয়ার আগেই আনাতোলিয়া ও রোমেলি হতে ৫০০০ পরিবার নতুন রাজধানীতে আনা হয়। সুলায়মান পাশাকে শহরের গভর্নর নিয়োগ দিয়ে প্রাচীর সংস্কার ও প্রাসাদ পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন সুলতান। রোমান বন্দিদের অনেকে নগরের পুনর্মাণে কায়িক শ্রম ব্যয় করে। কর্ম শেষে সুলতানের নির্দেশে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। কারণ, শ্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তাদের মুক্তিপণ আদায় হয়ে গেছে। ১৮১
গ্যালাটার সাথে চুক্তি
কনস্ট্যান্টিনোপলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর সুলতান গ্যালাটা প্রজাতন্ত্রের প্রতি মনোযোগী হন। যুদ্ধের সময় গ্যালাটার জেনোয়ানরা নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছিলেন। জাগনুস পাশাকে সেখানে প্রেরণ করেন সুলতান। তিনি দেখেন, বহু মানুষ পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ নিয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেছে। পাশা বুঝতে পারেন, পলাতকরা গোপনে বাইজেন্টাইন সম্রাটকে সহায়তা করেছিল, অপরাধবোধ ও শাস্তির ভয়ে তারা পালিয়ে গেছে। তবুও তিনি সুলতানের পক্ষ থেকে তাদের অভয়দান করেন। পূর্বে তাদের সাথে সম্রাটের যে চুক্তি ছিল, তার চেয়ে ভালো চুক্তি সম্পাদনের প্রতিশ্রুতি দেন।
গ্যালাটার নাগরিকরা নিজেদের মাঝে আলাপ-আলোচনার পর নগরীর চাবিসহ তাদের চিফ ম্যাজিস্ট্রেট (Podesta)-এর নেতৃত্বে সুলতানের কাছে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। তারা নগরীর চাবি হস্তান্তরপূর্বক চুক্তিভঙ্গের জন্য ক্ষমা চাইলে সুলতান তাদের মহানুভবতার সাথে গ্রহণ করেন এবং সদয় আচরণ ও সুন্দর আলাপচারিতায় তাদের বিদায় জানান। ১৮২ জাগনুস পাশা সুলতানের নামে জেনোয়ানদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত অধিকারসংবলিত ফরমান জারি করেন—
'গ্যালাটার নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। তাদের গির্জাগুলো পূর্ববৎ বহাল রাখা হবে। নিজেদের শাসক নির্বাচনের অধিকারও তাদের থাকবে। উসমানি সালতানাতের সর্বত্র জলে-স্থলে তারা অবাধে বাণিজ্য করতে পারবে। তবে তাদের বার্ষিক জিজিয়া কর দিতে হবে এবং নগরপ্রাচীর ভেঙে ফেলতে হবে।'
জেনোয়ার শৃঙ্খল হতে মুক্তি পায় গ্যালাটা।
এ ফরমান জারির পাঁচ দিন পর সুলতান ফাতিহ জেনোয়ান গ্যালাটা সফর করেন। প্রথমেই একটি জনগণনার মাধ্যমে পলাতক ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করেন। তারপর তাদের ঘরের তালা ভেঙে সম্পদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
ঘোষণা দেওয়া হয় : ‘পলাতকরা তিন মাসের মধ্যে ফিরে এলে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া হবে, অন্যথায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাবসা-বাণিজ্য রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে যাবে।’ তারপর সুলতান ওই শহরের অবাধ্যতার সকল উপকরণ অপসারণ করেন। তুর্কি বাহিনীর অবাধ গমনাগমনের সুবিধার্থে গ্যালাটা নগরের স্থলপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। তবে জলসীমানার প্রাচীর অক্ষত এবং শহরটিকে অস্ত্রমুক্ত করা হয়। ১৮৩
এদিনে প্রত্যাবর্তন
বিজয়পরবর্তী কার্যাদি সম্পন্ন করে কনস্ট্যান্টিনোপলকে সালতানাতের নতুন রাজধানী ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে কনস্ট্যান্টিনোপলের নতুন নামকরণ ইসলামবুল বা ইস্তাম্বুল সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানী স্থানান্তরের কার্যক্রম শেষ করতে কিছুদিন লেগে যাবে। তাই ২১ জুন সুলতান এদিনে ফিরে যান। ১৮৪
বিজয়ের আধ্যাত্মিক প্রেরণা-আক শামসুদ্দিন
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধকালে অনেক আলিম সুলতানের সহযাত্রী হয়েছিলেন। তাঁদের মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুলতানের শিক্ষক আক শামসুদ্দিন। তাঁর প্রেরণা ও উৎসাহে সুলতান অভিযানের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। আলোচনার ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে অবরোধের আলোচনায় এই মহান আলিমের অবদান সম্পর্কে সবিস্তারে আলোকপাত করা সম্ভব হয়নি। মূলত তিনি ছিলেন সুলতানের আধ্যাত্মিক প্রেরণাদাতা। কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ে নৈতিক ও মানসিক শক্তির জোগানদাতা হিসেবে আক শামসুদ্দিনের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
তাঁর পুরো নাম মুহাম্মাদ হামজা আদ-দিমাশকি আর-রুমি। জন্ম ৭৯২ হিজরি/১৩৮৯ সালে দামেস্কে। তাঁর নসবনামা প্রথম খলিফা আবু বকর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। সাত বছর বয়সে তিনি কুরআন হিফজ করেন। তারপর আমাসিয়া, আলেপ্পো ও আঙ্কারায় পড়ালেখা করেন। ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি বুৎপন্ন হন।
সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ আক শামসুদ্দিনকে শাহজাদা মুহাম্মাদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। শাহজাদা তাঁর শিক্ষকের নিকট সেই সময়ের মৌলিক জ্ঞান অর্থাৎ কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি, ফারসি ও তুর্কি ভাষা শিক্ষালাভ করেন। পাশাপাশি প্রায়োগিক জ্ঞান তথা গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস ও যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান অর্জন করেন। শাহজাদা মুহাম্মাদ যখন ম্যাগনেসিয়ার শাসক নিযুক্ত হন, তখন যেসব আলিম তাঁকে শাসনব্যবস্থার মূলনীতি ও প্রশাসন প্রণালি শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত হন, আক শামসুদ্দিন ছিলেন তাঁদের একজন।
শাহজাদা মুহাম্মাদ সুলতানের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাঁর শাইখ তাঁকে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ে উপর্যুপরি উৎসাহ দিতে থাকেন যে, রাসূলে সুসংবাদ বাস্তবায়নের যোগ্যতা তাঁরই আছে। তাই এ গৌরব অর্জনে তাঁকে দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে।
বিজয়াভিযানের আলোচনায় আমরা দেখেছি, অবরোধকালে মাঝেমধ্যে রোমানরা সাফল্য লাভ করেছিল। এতে অনেক তুর্কি সেনাপতি হীনবল হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য চূড়ান্ত অভিযানের আগে সুলতান বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্তাদের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন। অভিজ্ঞ সেনাপতি খলিল পাশা অবরোধ তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। অনেকে এটাও বলতে কুণ্ঠিত হননি, একজন শাইখের প্ররোচনায় কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করে সুলতান বড়ো ভুল করেছেন। এ কথা শুনে সুলতান তাঁর উজির অলিউদ্দিন আহমদ পাশাকে শাইখ আক শামসুদ্দিনের কাছে প্রেরণ করেন। তখন তিনি এই বলে জবাব দেন, 'আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই বিজয় দান করবেন।' (আল-খতিব, ১৪৬; হারব, ৩৪৩)
শাইখের কাছ থেকে প্রেরণামূলক উৎসাহ পেয়ে সুলতান সর্বাত্মক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তারপরও সুলতান শাইখের সাথে সাক্ষাৎ করে আত্মিক তৃপ্তি লাভ করতে চান। ওদিকে আক শামসুদ্দিন তাঁবুরক্ষীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেউ যেন তাঁর ক্যানোপিতে প্রবেশ করতে না পারে। সুলতান উপস্থিত হলে তাঁবুরক্ষী শাইখের নির্দেশের কথা শুনিয়ে তাঁকে বাধা দেন। সামান্য কর্মচারীর আচরণে বিরক্ত হয়ে সুলতান তলোয়ারের আঘাতে তাঁবু ছিন্ন করে ভেতরে উঁকি দেন। যা দেখলেন, তাতে তিনি অবাক-বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। শাইখ দীর্ঘ সিজদায় মগ্ন; তাঁর পাগড়ি, মাথার লম্বা শ্বেত চুল মাটিতে গড়াচ্ছে, সাদা দাড়ি ও চুল মিলে যেন আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। যখন তিনি মাথা তুললেন- দেখা যায়, তাঁর দুই গণ্ড বেয়ে অশ্রু পড়ছে। বিজয় প্রার্থনায় তিনি সিজদাবনত হয়েছিলেন। ১৮৫
তারপর সুলতান ফিরে যান কমান্ডিং পজিশনে। দেখেন, তুর্কি গোলায় কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাচীরে ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে। তুর্কি সৈন্যরা লাফিয়ে লাফিয়ে ঢুকছে শহরে। এই দৃশ্য দেখে তৃপ্ত হয়ে সুলতান বলেন-
'কনস্ট্যান্টিনোপল জয় হবে, তাই আমি খুশি নই; বরং আমার আনন্দ এই যে, আমার যুগেও এমন মানুষ আছেন।'১৮৬
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের গির্জা আয়া সোফিয়া মসজিদে রূপান্তরিত হয়। সুলতানের ঘোষণানুযায়ী পরবর্তী শুক্রবারে জুমার সালাতের মাধ্যমে মসজিদ হিসেবে আয়া সোফিয়ার অভিষেক সম্পন্ন হয়। সেই নামাজে ইমামতি করেছিলেন আক শামসুদ্দিন। কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রেরণাদাতা হিসেবে ইমামতি করার জন্য তাঁর চেয়ে বেশি উপযুক্ত আর কেউ ছিলেন না।
আক শামসুদ্দিন কেবল বিজয়াভিযানে উৎসাহই দেননি; বরং বিজয়ী সৈনিকদের সংযত রাখতেও ভূমিকা পালন করেছেন। বিজয়ের পর গনিমতের সম্পদ বণ্টন শেষে সুলতান মুহাম্মাদ সৈনিক ও সাধারণ মানুষের জন্য ভোজের আয়োজন করেন-যা তিন দিন ধরে অব্যাহত ছিল। ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আক শামসুদ্দিন সুলতান, সেনাপতি ও সাধারণ সৈনিকদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন-
'ওহে সৈনিক সমাবেশ! জেনে রেখ, তোমরা হলে সেই সৌভাগ্যবান দল, যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- “অবশ্যই কনস্ট্যান্টিনোপল বিজিত হবে। কতই-না উত্তম সেই আমির! আর কতই-না উত্তম সেই সেনাদল!” আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সাফল্য দান করেন এবং ক্ষমা করেন। সাবধান! অর্জিত গনিমতের সম্পদে বাড়াবাড়ি করো না, অপব্যয় করো না; বরং এ শহরের বাসিন্দাদের কল্যাণে তা ব্যয় করো। তোমাদের সুলতানের আনুগত্য করবে, তাঁকে ভালোবাসবে।'
তারপর আক শামসুদ্দিন সুলতানের দিকে ফিরে বললেন-
'হে আমার সুলতান! আপনি আলে উসমানের চোখের মণিতে পরিণত হয়েছেন। আল্লাহর পথে সংগ্রামের এই ধারা অব্যাহত রাখুন।'
তারপর তিনি বুলন্দ আওয়াজে তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করেন। ১৮৭
আক শামসুদ্দিনের আরেকটি অবদান হয়, বিশিষ্ট সাহাবি আবু আইউব আল-আনসারি -এর কবর চিহ্নিতকরণ। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ৫৩ হিজরিতে কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানের সময় তিনি মারা গেলে তাকে শহরের অদূরে কবর দেওয়া হয়। আক শামসুদ্দিনের সহায়তায় তাঁর কবর চিহ্নিত হলে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। তুর্কিদের নিকট এটি 'মসজিদ আইউব সুলতান' নামে পরিচিত।
আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী আক শামসুদ্দিনকে মানসিক রোগের চিকিৎসকও বলা হতো। তবে তিনি শারীরিক চিকিৎসকও ছিলেন। সেকালে তাঁকে সংক্রামক রোগের একজন বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য করা হতো। তিনি জীবনধাতু (মাদ্দাতুল হায়াত) নামে সংক্রামক রোগসংক্রান্ত একটি (তুর্কি ভাষায়) গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে তিনি বলেছেন-
'অনেকে মনে করে, ব্যক্তির শরীরে রোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়; আসলে এটি ভুল ধারণা। সংক্রমণের মাধ্যমেও রোগবালাই একজনের শরীর থেকে অন্যের শরীরে ছড়ায়। সংক্রমণের জীবাণু এত ছোটো ও সূক্ষ্ম যে, খালি চোখে তা দেখা যায় না। তবে দৃষ্টি-উত্তর হলেও এটি প্রাণবান বীজ।'
এভাবে দেখা যাচ্ছে, পঞ্চদশ শতকেই জীবাণু সম্পর্কে আক শামসুদ্দিন ধারণা পেশ করেছেন; যদিও জীবাণু সনাক্তকারী মাইক্রোসকোপ আবিষ্কৃত হয়েছে আরও চার শত বছর পরে-যখন ফরাসি রসায়নবিদ ও জীববিজ্ঞানী লুই পাস্তর যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন।
আক শামসুদ্দিন ক্যানসার সম্পর্কেও লিখেছেন। তাঁর রচিত এ সংক্রান্ত গ্রন্থ হল কিতাবুত তিব্ব। এটি তুর্কি ভাষায় রচিত। এ ছাড়াও আরবিতে তাঁর সাতটি গ্রন্থ রয়েছে। যেমন: আর-রিসালাহ আন-নুরিয়্যা, মাকালাতুল আউলিয়া, রিসালাহ ফি যিকরিল্লাহ, তালখিসুল মাতাইন, দাফউল মাতাইন, রিসারালাহ ফি শারহ হাজি বায়রাম ওয়ালি।
৮৬৩ হিজরিতে/১৪৫৯ সালে আক শামসুদ্দিন কুনিউকে মারা যান। তৎপূর্বে সুলতানের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি ইস্তাম্বুল ত্যাগ করেছিলেন। ১৮৮
ইসলামের ইতিহাসে অনুরূপ দৃষ্টান্ত আরও অনেক রয়েছে; বহু আলিম-ওলামা, সুফি-দরবেশ আত্মিক ও নৈতিক প্রেরণা দিয়ে ন্যায়পরায়ণ শাসকগণকে সাহায্য করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মরক্কোর মুরাবিত রাজ্যে শাইখ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন কর্তৃক ইয়াহয়া ইবন ইবরাহিমকে, কাজি ফাদিল কর্তৃক সালাহউদ্দিন আইয়ুবিকে প্রেরণা দানের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
ফাতিহের সাফল্যের কারণ
ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা করেও মুসলিমরা সফল হতে পারেনি। মুয়াবিয়া থেকে শুরু করে অনেক খলিফা ও সুলতান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী জয়ের চেষ্টা করেছেন। সুলতান ফাতিহ-এর পূর্বে কমপক্ষে দুজন তুর্কি সুলতান কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন।
১৪০০ সালে সুলতান প্রথম বায়েজিদ ও ১৪২২ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ কনস্ট্যান্টিনোপল অধিকারের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা সফল হতে পারেননি। অবশেষে তুর্কি সালতানাত প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৬০ বছর পর সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করে রাসূলুল্লাহ-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হওয়ার অবিস্মরণীয় গৌরব অর্জন করেন। এ বিজয়ের কারণে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ 'ফাতিহ' উপাধি লাভ করেন। আরবি শব্দ ফাতিহ-এর অর্থ বিজয়ী। এখানে আমরা সুলতান ফাতিহ-এর বিজয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।
প্রথমত : বাইজেন্টিয়াম বা কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক অবস্থান অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল। ত্রিভুজাকৃতির শহরটির দুই দিকের জলভাগ প্রাকৃতিক নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করত। তাই স্থলপ্রাচীরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে শহরের প্রতিরক্ষা নিয়ে দুর্ভাবনা থাকত না। অন্যদিকে, শক্তিশালী স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনীর সমন্বিত অভিযান ব্যতীত কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করা ছিল একপ্রকার অসম্ভব। রোমানরা শত শত বছর ধরে ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রক ছিল। তাদের নৌবাহিনীর ছিল কয়েক শতকের অভিজ্ঞতা। অপরদিকে সাগরে তুর্কিদের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে বাইজেন্টিয়াম দখলের পূর্ববর্তী তুর্কি প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। পঞ্চদশ শতকে আর্থিক দ্বীনতার কারণে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের নৌবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। ওদিকে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনীর ওপর সমান গুরুত্বারোপ করেন। গোল্ডেন হর্নে তিনি স্থলপথ ব্যবহার করে নৌযান নামানোর ব্যবস্থা করেন। ফলে পূর্ববর্তী সুলতানদের চেষ্টায় যে অপূর্ণতা ছিল, তা দূর হয় এবং সমন্বিত ও নিবিড় অভিযানে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজিত হয়।
দ্বিতীয়ত: ওই সময়ের আঞ্চলিক রাজনীতির পরিস্থিতি থেকে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন কোনো ফায়দা হাসিল করতে পারেননি। ইতঃপূর্বে ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান বায়েজিদ কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু তখন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সুলতানকে অবরোধ তুলে নিয়ে তাইমুরের মোকাবিলায় ছুটতে হয়। তাইমুরের এশিয়া মাইনর আগমনের ক্ষেত্রে সম্রাটের কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু অকস্মাৎ সম্রাটের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং কনস্ট্যান্টিনোপল বেঁচে যায়। সম্রাট একাদশ কনস্ট্যান্টাইন আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোনো সুবিধা পাননি-যা পূর্ববর্তী সম্রাট ম্যানুয়েল পেয়েছিলেন।
তৃতীয়ত : পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তুর্কি সালতানাতে স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ ছিল। কোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বা বহিঃশত্রুর চাপ ছিল না। ফলে সুলতান মুহাম্মাদ একাগ্রভাবে কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানে মনোযোগী হতে পেরেছিলেন।
ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদও কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু ধূর্ত সম্রাট ম্যানুয়েল অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজাদের সহযোগিতায় সুলতানের ভাই মুস্তাফাকে বিদ্রোহে উসকানি দেন। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এতটা সঙ্গিন হয়ে পড়ে যে, সুলতানকে অবরোধ প্রত্যাহার করে ভ্রাতৃবিদ্রোহ দমনে মনোযোগী হতে হয়। ফলে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের ওই প্রচেষ্টা ও ব্যর্থ হয়। সুলতান ফাতিহের অভিযানের সময় তুর্কি রাজত্বে কোনো ধরনের বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা ছিল না। তা ছাড়া কনস্ট্যান্টাইন কৌশল নির্ধারণে তার পিতা ম্যানুয়েলের ন্যায় ধূর্তও ছিলেন না। তার পক্ষে সুলতানকে অন্য কোনো ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখাও সম্ভব হয়নি।
চতুর্থত: বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের অন্যতম কারণ। পঞ্চদশ শতকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ে। কনস্ট্যান্টিনোপলের বাইরে মাত্র দুই-একটি দ্বীপ ছিল পুরোনো এই সাম্রাজ্যের অধিকারে। চারদিকে ছিল তুর্কি সালতানাতের ভূমি। ফলে বাইরের সাহায্য ছাড়া কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন ঠেকানো অসম্ভব ছিল। জেনোয়ান দুঃসাহসিক অভিযাত্রী গিওভান্নির ৭০০ সৈন্য ব্যতীত আক্ষরিক অর্থেই সম্রাট অন্য কোনো বিদেশি সহায়তা পাননি।
১৪০০ সালের দিকে সম্রাট ম্যানুয়েল প্রায় দুই বছর ইউরোপের রাজন্যবর্গের দ্বারে দ্বারে ঘুরে খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্য-রাজধানীকে রক্ষার আবেদন করেছিলেন। ম্যানুয়েল যথোচিত আতিথেয়তা লাভ করেছিলেন, কিন্তু সাহায্য বলতে যা বোঝায় তার ছিটেফোঁটাও পাননি।
মূলত পঞ্চদশ শতকে ক্ষয়িষ্ণু বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এতটা সংকুচিত হয়েছিল যে, তুর্কিদের হাতে পতন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ১৪০০ সালেই কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন হতে পারত। কিন্তু এশিয়া মাইনরে খোদার গজবের উপস্থিতির কারণে সে যাত্রায় শহরটি রক্ষা পায়। ১৪২২ সালেও কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। কিন্তু সম্রাট ম্যানুয়েলের ধূর্ততার ফলে বেঁচে যায়। ১৪৫৩ সালে এসে আর কোনোভাবেই স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারল না। প্রাকৃতিক বা বস্তুগত কোনো পরিস্থিতি সম্রাটের অনূকুলে ছিল না। নিভু নিভু বাতিটি একেবারেই নিভে যায়।
ইতিহাসবিদদের আলোচনায় সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের পরাজয়ের নৈতিক কারণ উপেক্ষিত থেকে যায়। মানবগোষ্ঠীর শাসক নির্ধারণে আল্লাহ তায়ালা যে নিয়ম নির্ধারণ করেছেন, সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করে তা জানা যায়।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়-সাম্রাজ্যগুলোর স্থিতি ও জাতিসমূহের প্রতাপ মৌলিকভাবে দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমটি হলো-দেশ ও দশের জন্য কল্যাণকর, উন্নতিমূলক ও গঠনমূলক কাজ অর্থাৎ দুনিয়ার আবাদি সংক্রান্ত কাজ। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, শাসকগোষ্ঠী ও জনগণের নৈতিক মান। নৈতিক মান নির্ধারিত হতে পারে দুটো দৃষ্টিকোণে। একটি সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের বিচারে, অপরটি হলো সৃষ্টির সাথে সৃষ্টির সম্পর্কের বিচারে। অর্থাৎ জনগণের সাথে শাসকগোষ্ঠীর আচরণের নিরিখে। তবে গঠনমূলক পার্থিব কর্মকাণ্ডের পর সাম্রাজ্যের স্থিতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক মান বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ যে সাম্রাজ্যে গঠনমূলক কাজ যত বেশি, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের পরিব্যাপ্তি যত ব্যাপক-সেই সাম্রাজ্যের স্থিতি তত বেশি। এক্ষেত্রে জনগণ ও শাসকের ধর্মবিশ্বাস ধর্তব্য নয়।
কতিপয় আলিম এমন মত পোষণ করেন, 'ন্যায়পরায়ণ অমুসলিম শাসক জুলুমবাজ মুসলিম শাসকের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।' আরও বর্ণিত হয়েছে-'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকে সহায়তা করেন; যদিও সেটি অমুসলিম হয়। পক্ষান্তরে যে দেশ অবিচারে পূর্ণ, সেটিকে আল্লাহ সাহায্য করেন না; যদিও সেটি মুসলমানের দেশ হয়।' অর্থাৎ রাষ্ট্রের স্থিতি ও প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য শাসকের ধর্ম নয়; বরং ইনসাফ গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসের নানা ঘটনার সংশ্লেষণ থেকে সাম্রাজ্যের স্থিতিসংক্রান্ত যে মূলনীতি আমরা পাই, তার আলোকে বলা যায়, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে সংকুচিত হতে হতে সাম্রাজ্যটি একটি ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। গঠনমূলক কাজ অর্থাৎ পার্থিব উন্নয়নমূলক কাজ স্থবির হয়ে পড়েছিল। নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ নিজ পেশা ও কাজে মনোযোগী না হয়ে ধর্মীয় বিতর্কে নিমজ্জিত হয়েছিল। ফলে ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ পার্থিব কর্মকাণ্ডে নেমে এসেছিল স্থবিরতা।
সাম্রাজ্যের আয় কমে যাওয়ায় সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা হ্রাস করা হয়েছিল। এমতাবস্থায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যটির একমাত্র আশা ছিল, ইউরোপের স্বধর্মীয় ভাইদের সহায়তায় টিকে থাকা। কিন্তু ইতিহাসই বলে—নিজের শক্তিতে টিকে থাকার ক্ষমতা যার নেই, অপরের সাহায্য তাকে বাঁচাতে পারে না। ইউরোপীয়দের সাহায্য নিয়ে কনস্টান্টিনোপল টিকতে পারেনি, যেমনিভাবে মরক্কোর মুরাবিত শক্তির সাহায্য নিয়ে স্পেনীয় মুসলিমরাও টিকতে পারেনি।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে খ্রিষ্টীয় পশ্চিম ক্রমাগতভাবে উন্নত হচ্ছে, পক্ষান্তরে ইসলামি প্রাচ্যে পশ্চাৎপসারণতা দূর করা যাচ্ছে না। অথচ গত শতাব্দীর মধ্যভাগে মুসলিম দেশগুলো ঔপনিবেশিকতার জাল ছিন্ন করে স্বাধীন হলে সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, মুসলমানদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। তারা আবার বিশ্বনেতৃত্বে সমাসীন হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ও ভৌগোলিক অবস্থানসহ বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার অনেক উপাদান থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা আগের মতোই নিগৃহীত, উপেক্ষিত ও পরনির্ভর। এখনও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে গঠনমূলক কাজের তুলনায় ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড অনেক বেশি, পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবর্তে উপদলীয় কোন্দল বিরাজমান। মুসলিম মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধের সাথে তুলনা করা যায়। পতনযুগের মুসলিম স্পেনের কথাও স্মরণ করা যায়, যখন ওই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম শাসকরা একে অপরকে শায়েস্তা করার জন্য খ্রিষ্টান শক্তির সাহায্য গ্রহণ করত।
এখনও মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো মুসলিম শাসক জ্ঞাতি ভাইদের শায়েস্তা করার জন্য খ্রিষ্টান শক্তির সাহায্য গ্রহণ করছে। অর্থাৎ আন্তঃধর্মীয় সুসম্পর্কের বিচারে মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের চেয়ে দুই থেকে আড়াই শত বছর পিছিয়ে আছে।
ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শাসকদের নৈতিক মানও সন্তোষজনক নয়। পৃথিবীর নিপীড়ক ও স্বৈরশাসকদের তালিকা করলে মুসলিম শাসকগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন। মুসলমানদের বসতগুলোতে ইনসাফের পরিবর্তে জুলুমের বিস্তার। অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষরা যেসব গুণাবলির কারণে পৃথিবীব্যাপী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেগুলোর বিপরীতধর্মী গুণগুলো আমাদের মাঝে বিদ্যমান। পক্ষান্তরে মধ্যযুগে বাইজেন্টান সাম্রাজ্যসহ বড়ো বড়ো শক্তিগুলো যেসব ত্রুটির কারণে ধ্বংস হয়েছিল, সেগুলোও পূর্ণমাত্রায় মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান। এমতাবস্থায় বিরাট জনশক্তি ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী হওয়ার পরও মুসলমানদের পক্ষে বিশ্বনেতার আসনে আসীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সুদূর পরাহত। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনসহ বিশ্বসভ্যতার উত্থান-পতনের বৃত্তান্ত আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে।
বিশ্বপ্রতিক্রিয়া
তুর্কি মুসলিমদের হাতে বিশ্রুত রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানীর পতনে বিশ্বময় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রতিক্রিয়া অভিন্ন ছিল না। ৮০০ বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ যে সুসংবাদ দিয়েছিলেন, সেটির বাস্তবায়ন দেখে ইসলামি প্রাচ্যে খুশির বন্যা বয়ে যায়।
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন-সংবাদ খ্রিষ্টীয় ইউরোপে বজ্রের ন্যায় আঘাত হানে। ভীতি ও বেদনার অনুভূতি তাদের আচ্ছন্ন করে। লোকেরা একে অপরকে কবিতা, গল্প, নাটকের মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণে উৎসাহ দিতে থাকে। রাজা-প্রিন্সদের মাঝে বহু সম্মেলন-বৈঠক হয়। পুরোনো ক্রুসেডের চেতনা আবার জেগে ওঠে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সব মতভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান আসে। কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের খবরে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন পোপ পঞ্চম নিকোলাস (কার্যকাল: ১৪৪৭-৫৫)। হলি রোমান সাম্রাজ্যের রাজা তৃতীয় ফ্রেডারিখের (শাসনকাল ১৪৫২-১৪৯৩) উদ্দেশ্যে প্রেরিত এক পত্রে তিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনকে 'খ্রিষ্টান বিশ্বাসের মহা বিপর্যয়' বলে আখ্যায়িত করেন। তার মতে- 'কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল সাহিত্য ও মানববিদ্যার প্রকৃত বাসস্থান।'
হৃত নগরের জন্য শোক প্রকাশ করে কার্ডিনাল বেসারিউ এটিকে 'সর্বোত্তম শিল্পের বিদ্যাপীঠ' বলে অভিহিত করেন। ইনিয়া সিলভিও পিকোলোমিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের অসংখ্য গ্রন্থের কথা উল্লেখ করে ওই শহরের পতনকে হোমার ও প্লেটোর দ্বিতীয় মৃত্যু বলে অভিহিত করেন। ১৮৯ স্বধর্মী রাজাদের উৎসাহিত করে তিনি বলেন-
'ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, অ্যারাগন, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া, জেনোয়া ও জার্মানি- প্রতিটি দেশ থেকে স্বল্পসংখ্যক যোদ্ধাও যদি পবিত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নাম লেখায়, তাহলে বিধর্মী (তুর্কিদের) হটানো সম্ভব হবে।'
মজার ব্যাপার হলো, গিবন লিখেছেন-
'পরবর্তী সময়ে এই ইনিয়া যখন দ্বিতীয় পিউস নামে পোপের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন (কার্যকাল ১৪৫৮-১৪৬৪), তখন মন্টোয়া কাউন্সিলেও (১৪৫৯ সালে) তিনি কিছু কৃত্রিম উদ্দীপনা ছড়িয়েছিলেন। তিনি যখন ব্যক্তিগতভাবে তুর্কিবিরোধী ক্রুসেড বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মধ্য ইতালির মার্শেই অঞ্চলের অ্যানকোনা শহরে উপস্থিত হন, তখন নানা অজুহাতে অভিযান উধাও হয়ে যায়। একদিনের যাত্রাবিলম্ব অনির্দিষ্টকালের স্থগিতকরণে রূপ নেয়। পোপ তার বাহিনীকে (যাদের অধিকাংশ ছিল জার্মান তীর্থযাত্রী) পাপক্ষেপণ ও দানদক্ষিণার বিনিময়ে ভেঙে দিতে বাধ্য হন।'১৯০
কনস্ট্যান্টিনোপল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পোপ পঞ্চম নিকোলাস (কার্যকাল ১৪৪৭-১৪৫৫) ইতালীয় রাজ্যগুলোর একত্রীকরণে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালান। অটোমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাদের লেলিয়ে দেন। রোমে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের এক সম্মেলনে পোপ সভাপতিত্বও করেন-যেখানে সাধারণ শত্রু অর্থাৎ তুর্কিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে অংশগ্রহণকারী রাজ্যগুলো সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয়। এই ক্রুসেড কনফেডারেসি প্রায় পূর্ণ রূপ পেতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পঞ্চম নিকোলাস মারা যান। কনস্ট্যান্টিনোপল পতনের খবরে তার মনে যে আঘাত ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, সে আঘাতেই তিনি মারা যান (২৫ মার্চ ১৪৫৫)।১৯১
কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনে খ্রিষ্টান রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন-বুগুন্ডির ডিউক ফিলিপ দ্যা গুড। ১৪৫৩ সালে কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের খবর নিয়ে পোপের দূত তার কাছে এলে তিনি উত্তেজনায় জ্বলে ওঠেন। সকল খ্রিষ্টানকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানান। তিনি নিজে জার্মানির সম্রাট তৃতীয় ফেডারিকের কাছে যান। ফ্রেডারিকও দূত পাঠান ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের কাছে। চার্লস (কার্যকাল ১৪২২-১৪৬১) ছিলেন আগে থেকেই উদ্দীপ্ত। তবে এ মুহূর্তে তুর্কিবিরোধী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার মতো অবস্থা তার ছিল না। তার নাকের ডগায় নিশ্বাস ফেলছিল ইংরেজরা। কাছের শত্রুকে পরাজিত না করে বহু দূরে তুর্কি দলনে ব্যস্ত হওয়া সমীচীন মনে করেন না সপ্তম চার্লস। তবুও তিনি রোডস দ্বীপের প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় করতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।
ডিউক ফিলিপ দ্যা গুড শুধু রাজাদের উদ্দীপ্ত করে ক্ষান্ত হলেন না; তুর্কিদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান জনগণকে লেলিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি লিলে শহরে এক নাটক মঞ্চায়নের আয়োজন করেন। দর্শক সারিতে অনেক অভিজাত ও গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। নাটকে কনস্ট্যান্টিনোপল শহরের পতন ও স্বধর্মী খ্রিষ্টান ভাইদের সকরুণ রোনাজারির দৃশ্য মঞ্চায়িত হয়। অনুষ্ঠান শেষে ডিউক ঘোষণা দেন-তিনি সশরীরে তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন। উপস্থিত ব্যারেন, নাইট, ও গোঁড়া খ্রিষ্টানরাও ডিউকের সহযাত্রী হওয়ার ঘোষণা দেন। এভাবেই ধীরে ধীরে তুর্কিবিরোধী লড়াই মুসলিম বিরোধিতায় রূপ নেয়। ১৯২
তুর্কি সালতানাতের সন্নিহিত খ্রিষ্টানরাও তাদের ধর্মীয় রাজধানীর পতনে ব্যথিত হন। কিন্তু সালতানাতের নৈকট্যের কারণে বেদনা চেপে রেখে তারা খুশির ভাবই প্রকাশ করে। এদিনে সুলতানকে অভিনন্দন জানাতে তারা প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। তাদের মাঝে নিহত সম্রাটের দুই ভাইও ছিলেন-যারা মোরিয়া শাসন করছিলেন।
ইসলামি প্রাচ্যে মহাবিজয়ের প্রতিক্রিয়া
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের খবর প্রচারিত হতে না হতেই এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে খুশি ও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ৮০০ বছর আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ যে সুসংবাদ দিয়েছেন, তা আজ বাস্তবায়িত হলো! শত শত বছর ধরে সারা বিশ্বের মুসলিম এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছে। মুসলিমদের আনন্দিত হওয়ারই কথা। সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ বিজয় সংবাদ দিয়ে দূত পাঠান মিশর, হিজাজ, পারস্য ও ভারতে। ইসলামি বিশ্বের নানা প্রান্তে এ বিজয় উদ্যাপন করা হয়। উদ্যাপন পদ্ধতিও ছিল মার্জিত ও রুচিসম্মত। যেমন : মসজিদের মিনারে বিজয়ের ঘোষণা, সালাতুশ-শুকর আদায়, বাড়িঘর ও দোকানপাট অলংকরণ এবং দেয়ালে চিত্রবিচিত্র পতাকা স্থাপন ইত্যাদি।
মিশরীয় ইতিহাসবিদ ইবন তুগ্রা বার্দি হাওয়াদিস আল-দুহর গ্রন্থে লিখেছেন, ৮৫৭ হিজরির ২৩ শাওয়াল (২৭ অক্টোবর, ১৪৫৩) সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ এর দূত কায়রোয় উপস্থিত হন। তাঁর সাথে ছিল সুলতান কর্তৃক প্রেরিত দুজন অভিজাত রোমান বন্দি ও বিভিন্ন উপঢৌকন। তাঁরা মিশরের সুলতান সায়ফুদ্দিন ইনালের (কার্যকাল ১৪৫৩-১৪৬১) কাছে যান। এই মহান বিজয়ের খবরে সুলতান ও সাধারণ মানুষ অত্যন্ত খুশি হন। খোশখবর ঘোষণায় বেজে উঠে ডঙ্কা। এ উপলক্ষ্যে কায়রোর রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও দোকানপাট সুসজ্জিত করা হয়। শাওয়ালের ২৫ তারিখ সুলতানের কাসেদ ও দুই রোমান বন্দি কায়রোর রাস্তা প্রদক্ষিণের পর কেল্লার ওপর আরোহণ করেন।
সুলতান ফাতিহ মুসলিম শাসকদের কাছে যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন, তার নমুনা হিসেবে শরিফে মক্কার প্রতি প্রেরিত পত্রের অনুবাদ উপস্থাপন করছি-
'(হামদ ও সানা-এর পর) আমরা একটি খোশখবরসহ এ পত্র প্রেরণ করছি। আর তা হলো, এ বছর আল্লাহ তায়ালা আমাদের এমন এক বিজয় দান করেছেন-যা কোনো চোখ দেখেনি, আর না কোনো কান শুনেছে। সেটি হলো-কনস্ট্যান্টিনোপল জয়। মহোদয়ের কাছে আশা হলো, এই বিরাট দান ও মহান বিজয়ের খবর সবাইকে জানাবেন-পবিত্র হারামাইনের বাসিন্দা, আলিম, নেতৃবৃন্দ, ধ্যানী তাপস, সৎ আবেদ, ওলামা-মাশায়েখ, ইমাম, ছোটো-বড়ো, বায়তুল্লাহর চাঁদোয়া ধরে যারা অবস্থান করে, (এটি তো এমন সুশক্ত রজ্জু, যা কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না), রাসূলের সান্নিধ্যে এতেকাফকারী, আর যারা আমাদের দৌলতের কল্যাণ ও স্থায়িত্বের জন্য আরাফাতের ময়দানে কাতর প্রার্থনারত, তাঁদের সবাইকে সুসংবাদ জানাবেন। কাসেদের সাথে আপনার জন্য কিছু হাদিয়াও প্রেরণ করোম। আর তা হলো-আপনার জন্য ২ হাজার খাঁটি সোনার ফ্লুরি-যা গনিমতের সম্পদ থেকে পাওয়া। সাথে আরও ৭ হাজার ফ্লুরি প্রেরণ করলাম, তন্মধ্যে ২ হাজার ফুরি সর্দার ও নকিবদের জন্য, ১ হাজার ফুরি হারামাইনের খাদেমদের জন্য, বাকিটা মক্কা ও মদিনার (আল্লাহ তায়ালা দুই পবিত্র স্থানের মর্যাদা বৃদ্ধি করুন) মুহতাজ ও মিসকিনের জন্য। আশা করি আপনি প্রয়োজনানুসারে বণ্টন করে দেবেন। আপনাদের দুআ প্রত্যাশা করি। আল্লাহ আপনাদের হেফাজত করুন, চিরস্থায়ী সৌভাগ্য ও শাশ্বত নেতৃত্ব দান করুন। '১৯৩
সুলতানের পত্রের জবাবে শরিফ লিখেন- 'আপনার পত্রটি আমরা পরিপূর্ণ শিষ্টাচারের সাথে খুলেছি, তারপর হিজাজবাসী ও আরব সন্তানদের সামনে তা পাঠ করেছি। আমরা ওই পত্রে কুরআনের আয়াত দেখতে পেয়েছি-যাতে আছে মুমিনদের জন্য শেফা ও রহমত। সেখানে আমরা রাসূলের মুজিজার প্রকাশও দেখতে পেয়েছি, আর তা হলো-কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের সংবাদ। এটি তো বিশ্ববিশ্রুত শহর-যার প্রতিরক্ষার দৃঢ়তা সাধারণ-বিশেষ সবার কাছে পরিচিত। আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি, তিনি এত কঠিন কাজ সহজ করে দিয়েছেন। এ সংবাদে আমরা অত্যন্ত খুশি হয়েছি...'১৯৪
দক্ষিণ ভারতের বাহমনি শাসক আলাউদ্দিন আহমদ শাহ বাহমনির কাছ থেকেও সুলতান অভিনন্দনবার্তা লাভ করেন।১৯৫
অন্যান্য বিজয়
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ-এর অক্ষয় ও অনন্য কীর্তি হয় কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখন অন্যান্য বিজয় সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয় সুসম্পন্ন হওয়ার পর সুলতান মুহাম্মাদ অন্যান্য অঞ্চলের প্রতি মনোযোগী হন। প্রথমেই তিনি মোরিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন। সর্বশেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের দুই ভাই দিমিত্রিস ও টমাস এ অঞ্চল শাসন করতেন। সুলতানের আগমনের খবর পেয়ে তারা স্ব-উদ্যোগে দূত পাঠিয়ে বার্ষিক ১২ হাজার ডুকাট কর দেওয়ার শর্তে সন্ধি প্রার্থনা করেন। ফাতিহ তাদের আবেদন মঞ্জুর করে সার্বিয়া অভিমুখে রওয়ানা করেন।
তুর্কিরা প্রথমেই হুনিয়াডির বাহিনী দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়। হাঙ্গেরির রাজা সার্বদের সহায়তা চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। ক্যাথলিক হাঙ্গেরিয়ানদের সাহায্য করতে স্বীকৃত হয়নি অর্থোডক্স সার্বরা। তাদের রাজা এগিয়ে এসে সুলতানের কাছে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব পেশ করেন। বার্ষিক ৮০ হাজার ডুকাট কর প্রদানের অঙ্গীকার করলে ফাতিহ সার্বদের প্রস্তাব মেনে নেন। পরের বছর সুলতান মুহাম্মাদ ৫০ হাজার সৈনিক এবং ৩০০ কামানসহ সার্বিয়া অতিক্রম করে বেলগ্রেড অবরোধ করেন।
সুলতানের আগমনের পূর্বেই হাঙ্গেরির রাজা হুনিয়াডি শহরে প্রবেশ করেছিলেন। তার বাহিনী বীরত্বব্যঞ্জক প্রতিরোধে তুর্কিদের ঠেকিয়ে দেয়। ফলে ১৪৫৫ সালে সুলতান অবরোধ উঠিয়ে নিতে বাধ্য হন।
বেলগ্রেড অভিযানের ব্যর্থতার মধ্যে তুর্কি বাহিনী এই খবরে স্বস্তি পায় যে, প্রতিরোধ লড়াইয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়ে ২০ দিন পর হুনিয়াডি মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে তুর্কিরা ভীষণ এক শত্রুর হাত থেকে রেহাই পায়।
১৪৫৮ সালে সুলতান তাঁর প্রধান উজির মাহমুদ পাশাকে সার্বিয়া জয় সম্পন্ন করার জন্য প্রেরণ করেন। দুই বছর প্রতিরোধের পর রাজ্যটি চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। ফলে ১৪৬০ সালে সার্বিয়া তুর্কি সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এখানে একটি তুর্কি সানজাক প্রতিষ্ঠা করা হয়-যার সদর দপ্তর ছিল সার্বিয়ার তৎকালীন রাজধানী Smederevo। বেলগ্রেড বিজয়ের আগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল ছিল। ১৯৬
১৪৫৮ সালে সুলতান করিন্থ ও নিকটবর্তী গ্রিক জনপদগুলো জয় করেন। কিছুদিন পর পেলোপানেসাস ও গ্রিসের অন্যান্য এলাকা সুলতানের কাছে আত্মসমর্পণ করে। প্রাচীনকালের পার্থেনন বা মধ্যযুগের চার্চ অব হলি ভার্জিন সুলতানের নির্দেশে মসজিদে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, টমাস পেলিওলোগাসকে (সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের ভ্রাতা) রাজ্যশূন্য করা হয়েছিল। তার অপর ভাই দিমিত্রিস কর প্রদানের শর্তে মোরিয়ার শাসক হিসেবে বহাল ছিলেন। তবে সুলতান ফিরে যেতে না যেতেই টমাস বিদ্রোহ করে তুর্কি ও দিমিত্রিসের বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে। ফলে সুলতান আবারও মোরিয়ায় অভিযান চালান। মোরিয়ায় ৩০০টি দুর্গ ছিল, তন্মধ্যে ২৯২টি ধ্বংস করে তুর্কি বাহিনী। ১৪৬০ সালে এ অভিযান সমাপ্ত হয়। টমাস পালিয়ে ইতালিতে আশ্রয় নেন, আর দিমিত্রিস নির্বাসিত হয়। একই সময়ে Thasus ও Imbrus-সহ ভূমধ্যসাগরের আরও কিছু দ্বীপ বিজিত হয়। ১৯৮
গ্রিস থেকে ফিরে সুলতান ইস্কান্দার পাশার সাথে সাময়িক সন্ধি করেন। চুক্তি বলে পাশা লাভ করেন আলবেনিয়া ও ইপিরুস (Epirus) শাসনের অধিকার। এই সময়ে এসে একনিষ্ঠভাবে এশিয়া মাইনরে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পান ফাতিহ।
১৪৬১ সালে তিনি আচানক আমাসট্রিস (Amastris) বন্দরে উপস্থিত হন। এটি ছিল জেনোয়ান বণিকদের বাণিজ্যকেন্দ্র। পৃথিবীর সবখানে সব সময় ব্যবসায়ীরা অবাধে ব্যাবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পেলে শাসকের ধর্ম বা জাতীয়তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। এখানেও একই অবস্থা হলো।
জেনোয়ান বণিকরা বিনাযুদ্ধে নগরদোর খুলে দিলেন। তারপর সুলতান অগ্রসর হন সিনোভের দিকে। সুলতানের বাহিনীতে বিপুল নৌযানের উপস্থিতি দেখে নগরপাল এস্ফেন্দিয়ার আত্মসমর্পণ করেন। বিনাশর্তে আনুগত্য প্রকাশ করায় সুলতান বিথিনিয়া (Bithynia) অঞ্চলের বিরাট ভূখণ্ড জায়গির প্রদান করে তাকে পুরস্কৃত করেন। ১৯৯
তারপর সুলতান ট্রাবজোনের (Trabzon) দিকে এগিয়ে যান এবং একপ্রকার বিনা বাধায় নগরটি জয় করেন। শহরের শাসক ও তার পরিবারবর্গ বন্দি হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলে প্রেরিত হয়। ২৫৭ সাল থেকে কমনেনাস নামে যে রাজবংশ ট্রাবজোন শাসন করে আসছিল, সেটির বিলুপ্তির মাধ্যমে সর্বশেষ গ্রিক টেরিটোরি সুলতানের করগত হয়। আর কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ উপকূলের সকল রাজ্য সালতানাতভুক্ত হয়। ২০০
এশিয়া মাইনরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর সুলতান আবারও ইউরোপে পা রাখেন। এবার তিনি ওয়ালেচিয়ার নিষ্ঠুর শাসক ড্রাকুলকে দমন করতে মনস্থ হন। এ রাজা তাঁর অঞ্চলে বাণিজ্যের কাজে আগত বহু তুর্কি বণিককে হত্যা করেছিল। সুলতান এগিয়ে এলে ড্রাকুল ইতঃপূর্বে সুলতান বায়েজিদের সাথে ওয়ালেচিয়ার তৎকালীন রাজার সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক বার্ষিক ১০ হাজার ডুকাট কর প্রদানের শর্তে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেন। ফাতিহ প্রস্তাব মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে ফিরে যান। সন্ধির দোহাই দিয়ে বিপদ ঠেকানোর পরপরই ড্রাকুল হাঙ্গেরির রাজার সাথে জোট বেঁধে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেন। খবর পেয়ে সুলতান দুজন দূত প্রেরণ করেন। ড্রাকুল নিষ্ঠুরভাবে দুজনকেই হত্যা করে। তারপর বুলগেরিয়া তছনছ করে ২৫ হাজার মানুষকে বন্দি করে নিয়ে যায়। এবারও সুলতান প্রতিনিধি পাঠিয়ে প্রতিবিধানের চেষ্টা করেন, কিন্তু উদ্ধত ড্রাকুল ফাতিহের দূতদের সাথে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করে।
এরপর আর দেরি না করে সুলতান মুহাম্মাদ দেড় লাখ সৈন্য নিয়ে ওয়ালেচিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। ড্রাকুলের বাহিনীকে তছনছ করে তিনি রাজধানী বুখারেস্ট জয় করেন। তবে নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী শাসক ড্রাকুলকে বন্দি করতে পারলেন না। সে পালিয়ে গিয়ে হাঙ্গেরিরাজের কাছে আশ্রয় নেয়। ওয়ালেচিয়াকে সালতানাতে অন্তর্ভুক্ত করে সুলতান ড্রাকুলের অনুজ রাউলকে শাসক নিয়োগ দেন।
১৪৬২ সালে সুলতানকে আবার ইউরোপ-যাত্রা করতে হয়। এ অভিযানের লক্ষ্য ছিল বসনিয়া। ওই দেশের শাসক ছিল ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী, কিন্তু প্রজারা ছিল বোগোমিল খ্রিষ্টান। দুরাচারী রাজার নির্যাতন-নিষ্পেষণে জনসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। সুলতান বসনিয়ার বিদ্রোহ দমন করে ওই অঞ্চলের শাসককে সপুত্রক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
১৪৬৪ সালে সুলতানকে আবারও বসনিয়া অভিযানে বের হতে হয়। হাঙ্গেরির রাজা ম্যাথিয়াস কার্ভিনাস (হুনিয়াডির পুত্র) বসনিয়া দখলের চেষ্টা করলে ফাতিহ তাকে পরাজিত করেন। এবার বসনিয়ার বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ণ করে সরাসরি সালতানাতের শাসনাধীনে আনয়ন করা হয়। এ রাজ্য থেকে ৩০ হাজার যুবক জেনিসেরি বাহিনীতে যোগদান করে এবং বসনিয়ার বেশিরভাগ অভিজাত (যারা পূর্বে বোগোমিল খ্রিষ্টান ছিলেন) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হাঙ্গেরির রাজা আরও তিনবার (১৪৬৫, ১৪৭১, ১৪৭৯) বসনিয়া দখলের চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিবার তার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
১৪৬৩ সালে ভেনিসের বণিকদের সাথে উসমানীয়দের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তুর্কি বাহিনী প্রথমেই আর্গুসসহ (Argos) কয়েকটি অঞ্চল দখল করে। ভেনিসিয়ানরা পালটা ব্যবস্থা হিসেবে সাগরে নৌবহর নামিয়ে মোরিয়া হতে তুর্কিদের তাড়িয়ে দেয়। তারা করিন্থ যোজকের সীমানাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে-যা ইতঃপূর্বে তুর্কিরা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। তা ছাড়া তারা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণ হতে আর্গুসও কেড়ে নেয়। ভেনিসিয়ানদের এ কর্তৃত্ব অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
৮০,০০০ সৈন্য সমভিব্যহারে সুলতান মুহাম্মাদ এগিয়ে আসছেন জেনে ভেনিসিয়ানরা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। তুর্কিরা তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই মোরিয়া (Morea) পুনর্দখল করে। তা ছাড়া হাতছাড়া হয়ে যাওয়া অন্যান্য এলাকাও তাদের আয়ত্তে আসে।২০১
ওদিকে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে পোপতন্ত্র আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবার পোপ দ্বিতীয় পিউস ক্রুসেডের ডাক দেন, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা পূরণের আগেই তিনি মারা যান। অপরদিকে সক্রিয় হয়ে উঠেন পুরোনো দুশমন ইস্কান্দার বেক আলবানি। অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরও তুর্কিরা তাকে পরাস্ত করতে পারে না। পঁচিশ বছর একাদিক্রমে লড়াই করার পর ১৪৬৭ সালে ইস্কাদারের মৃত্যু হয়, আর তুর্কিরা ভীষণ এক শত্রুর উৎপাত হতে বেঁচে যায়।
এক বছর বিরতির পর ১৪৭০ সালে সুলতান আবারও ভেনিস আক্রমণ করেন। এবার তিনি Euboia দ্বীপ জয় করেন। ওদিকে এশিয়া মাইনরের কারামানিয়া রাজ্যে তখন অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এ সুযোগে সুলতান কারামনের শাসক ইসহাক বেগকে তাড়িয়ে দিয়ে পদচ্যুত রাজার জ্যেষ্ঠ ভাইকে ক্ষমতায় বসান। এরপর ইউরোপ অভিমুখী হতে না হতেই ইসহাক বেগ আবারও রাজধানী কুনিয়া দখল করে নেন। বাধ্য হয়ে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ আবারও কারামানিয়ায় ফিরে আসেন। এবার ইসহাক বেগকে উৎখাত করেই ক্ষান্ত হন না; বরং কারামান রাজ্যকে তুর্কি সালানতানাভুক্ত করে নেন।২০২
কিছুদিন যেতে না যেতেই নতুন উৎপাত এসে হাজির। পূর্বদিক থেকে এগিয়ে আসে আরেক বিপদ; তাইমুরের অন্যতম উত্তরসূরি 'আক্কুয়ুনলু তুর্কমেন' শাসক উজুন হাসান উসমানি সালতানাতভুক্ত সিবাস ও তোকাত দখল করে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সুলতান উপলব্ধি করতে পারেন, এটি একটি বড়ো ষড়যন্ত্রের অংশ-যাতে ইউরোপের সকল বৃহৎ শক্তি জড়িত। উদ্দেশ্য হলো-পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে যুগপৎ আক্রমণ চালিয়ে উসমানি সালতানাতকে ধ্বংস করা, তা সম্ভব না হলে অন্তত সংকুচিত করা। তাই সুলতান ফাতিহকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হয়। রোমেলি অর্থাৎ সালতানাতের ইউরোপীয় অংশে পর্যাপ্ত সৈন্য মোতায়েন করেন সুলতান। তারপর দুই শাহজাদাকে যুদ্ধপ্রস্তুতির নির্দেশ দেন।
আনাতোলিয়ার শাসক শাহজাদা দাউদ ও কারামানিয়ার শাসক বাকলারবেগ মুস্তাফা পাশার বাহিনী বাকশহরি হ্রদের পূর্বদিকে কিরেলি ময়দানে সংঘটিত যুদ্ধে উজুন হাসানকে নিকৃষ্টভাবে পরাজিত করেন (১৪৭১)। আকুয়ুনলু বাহিনী প্রায় সমূলে ধ্বংস হয়। কিছুদিন পর সুলতান নিজেই ১ লাখ সৈনিক নিয়ে বহির্গত হয়ে উতলুকবেলি ময়দানে উজুন হাসানকে আবারও পরাজিত করেন। তারপর তিনি আজারবাইজান পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর অভিযানের ফল হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী। পরবর্তী সময়ে আর কখনো উজুন হাসান সালতানাতের ধারে কাছে ঘেঁষেনি। ২০৩
ওদিকে এই বছরগুলোতে তুর্কিদের সাথে ভেনিসের যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। ভেনিসিয়ানরা পোপ ও নাপোলির রাজার থেকে সহায়তা নেয়। এসব যুদ্ধে বিজয়ের পাল্লা সব সময় তুর্কিদের দিকেই ছিল। ভেনিসিয়ানরা কোনো এলাকা পুনর্দখল করতে পারেনি।
১৪৭৫ সালে সুলতান বাগদান (বর্তমান মোলদাভিয়া) অভিযানে মনস্থ করেন। প্রথমেই ওই শহরের শাসক স্টিফেনকে কর প্রদানের বিনিময়ে বশ্যতা স্বীকারের প্রস্তাব দেন। বাগদানের শাসক কেবল কর প্রদানে অস্বীকারই করেননি; বরং প্রচণ্ড প্রতিরোধের পর তুর্কি বাহিনীকে ঠেকিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে ক্রুদ্ধ সুলতান ক্রিমিয়া (القرم) দখলের পরিকল্পনা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, ওই অঞ্চলের অশ্বারোহীদের সমন্বয়ে বাগদানে অভিযান পরিচালনা করা।
ক্রিমিয়া উপদ্বীপের কাফা শহরটি (Feodosia) ছিল জেনোয়া প্রজাতন্ত্রের একটি উপনিবেশ। সুলতান মুহাম্মাদ একটি নৌবহর পাঠান। তাঁর যোদ্ধারা শুধু কাফা শহরই দখল করেন না; বরং ক্রিমিয়া উপকূলের সকল জেনোয়ান এলাকাও অধিকার করেন। সুলতান অধিকৃত এলাকায় সরাসরি শাসন প্রবর্তন না করে করারোপ করেই সন্তুষ্ট থাকেন।
কিছুদিন পর উসমানি নৌবহর আক কারমান (Akkerman/Bilhorod-Dnistrovskyi) বন্দর দখল করে। সেখান থেকে দানিয়ুব মোহনা অতিক্রম করে তুর্কি বাহিনী বাগদানের ওপর আবার আক্রমণ শানায়। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ব্যাপক সাফল্য লাভ করলেও স্থলে অবতরণের পর পার্বত্য এলাকা অতিক্রমের সময় বাগদান বাহিনী আচানক হামলা চালিয়ে মুসলিমদের পর্যদুস্থ করে দেয় (১৪৭৬)। এই সাফল্যের ফলে সারা ইউরোপে তুর্কি প্রতিরোধকারী হিসেবে চতুর্থ স্টিফেনের নাম ছড়িয়ে পড়ে। ইতঃপূর্বে অনুরূপ কৃতিত্ব প্রদর্শন করে হাঙ্গেরিয়ান হুনিয়াডি ও আলবেনিয়ান ইস্কান্দার বেক খ্যাতি লাভ করেছিলেন। পোপের তরফ থেকে 'খ্রিষ্টান বীর' ও 'খ্রিষ্টান ধর্মের সংরক্ষক' উপাধিতে ভূষিত হন স্টিফেন। ২০৪
১৪৭৭ সালে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ পুনরায় ইউরোপ অভিযানে বের হন। এবারে প্রথমেই অতিক্রম করেন ক্রোয়েশিয়া (كرواسيا) ও দালমাসিয়া (Dalmatia) নামক দুটো অঞ্চল। তারপর Friuli অভিযান পরিচালনা করেন। নিজেদের রাজ্যের কেন্দ্রস্থলের পতনের ভয়ে ভেনিসিয়ানরা কারোয়া (Kruja) ছেড়ে দিয়ে সুলতানের সাথে চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব দেন। তবে সুলতান এস্কোদারা (Shkodra)-এর ওপর অধিকার দাবি করে বসলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। স্থানীয়রা তুর্কিদের দাবি অগ্রাহ্য করলে সুলতানের বাহিনী শহরটি অবরোধ করে ছয় সপ্তাহ ধরে কামানের গোলাবর্ষণ করেন। কিন্তু প্রতিরোধের দৃঢ়তায় ফাতিহের প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখল না। তখন সুলতান এস্কোদারার আশপাশের এলাকা ও দুর্গগুলো দখল করে নেন। ফলে নগরটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ভেনিসিয়ানরা শহরটি সুলতানের হাতে সমর্পণ করেন। বিনিময়ে তারা কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করে।
১৪৭৯ সালে ২৮ জানুয়ারি (৩ জিলকদ, ৮৮৩ হি.) এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর উল্লেখযোগ্য শর্তাবলি ছিল নিম্নরূপ:
১. যুদ্ধের সময় মোরিয়া ও দিলমাসিয়ার যে অঞ্চলগুলো অধিকৃত হয়েছে, উভয় পক্ষ সেগুলো পূর্ববর্তী কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যার্পণ করবে।
২. কুরিয়া, আকসা হিসার ও আগরিবুজ দ্বীপ তুর্কিদের অধিকারে থাকবে।
৩. অবরুদ্ধ এস্কোদারা এবং এর কাছাকাছি অঞ্চল উসমানীয়দের হাতে সমর্পণ করা হবে।
৪. সামরিক গ্যারান্টি হিসেবে প্রতি দুই বছর সালতানাতকে দুই লাখ ডুকাট করে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করবে ভেনিস।
৫. তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দ্বীপগুলোতে ভেনিস অবাধে ব্যাবসা-বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগ পাবে। বিনিময়ে প্রতিবছর তারা তুর্কিদের ১২ হাজার ডুকাট স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করবে।
৬. লিমনি ও বুযজাসহ অন্যান্য দ্বীপগুলো উসমানীয়দের কাছে প্রত্যার্পণ করা হবে।
৭. দুই পক্ষের যুদ্ধবন্দি বিনিময় করা হবে।
৮. ভেনিসিয়ানরা ইস্তাম্বুলে একজন কনসাল নিয়োগ দেবেন, যিনি তাদের ব্যাবসায়িক স্বার্থ দেখাশোনা করবে।
ইউরোপীয় বিষয়ে উসমানীয়দের হস্তক্ষেপের এটি প্রথম নমুনা। সেকালে ভেনিসের মতো শক্তিশালী কোনো রাজ্য ইউরোপ মহাদেশে ছিল না। ব্যাবসা-বাণিজ্যে সে দেশের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জেনোয়া প্রজাতন্ত্র। ২০৫
১৪৭৬ সালের ১৩ অক্টোবর তুর্কি বাহিনীর হাতে ট্রানসিলভানিয়ার পতন হয়। তবে এ যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মুসলিম যোদ্ধা নিহত হন। হাঙ্গেরির সৈনিকরা চরম নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষর রাখে। তারা সকল বন্দিকে হত্যা করে এবং মৃতদেহের ওপর ভোজের আয়োজন করে। ১৪৮০ সালে গ্রিস ও ইতালির মধ্যবর্তী গ্রিক দ্বীপগুলো বিজিত হয়। তারপর নৌ-অধিপতি কাদাক আহমদ পাশা ইতালির উরান্ট (Otranto) শহর অভিমুখে বাহিনী প্রেরণ করেন। সুলতান তো পুরো ইতালি জয়ে কৃতসংকল্প ছিলেন। তিনি প্রপিতামহ বায়েজিদের সংকল্প বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন- যিনি বলেছিলেন, 'আমি সেন্ট পিটার্সের বেদিতে আমার ঘোড়াকে খাবার দেবো।' ১৪৮০ সালের ১১ আগস্ট (৪ জমাদিউস সানি, ৮৮৫ হি) উরান্ট বিজিত হয়। ২০৬
রোডস দ্বীপ অবরোধ
রোডস দ্বীপ ছিল সেন্ট জন নামক এক খ্রিষ্টান যাজকের আস্তানা। এ দ্বীপের অশ্বারোহীরা উসমানিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বহু ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেছিল। সালতানাতের সীমানা কণ্টকমুক্ত করার লক্ষ্যে সুলতান গোড়া খ্রিষ্টানদের আস্তানাটিতে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। ওদিকে রোডসের শাসক ছিলেন পিয়েরে দুবোসোন। তার সাথে মিশরের সুলতান ও তিউনিসিয়ার বাই-এর দ্বন্দ্ব ছিল। তুর্কি বিপদ প্রতিরোধের সুবিধার্থে তিনি তাদের সাথে শান্তিচুক্তি করেন।
১৪৮০ সালের মে মাসে মসিহ পাশার নেতৃত্বে তুর্কি বাহিনী প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত রোডস দ্বীপ অবরোধ করে। তিন মাস ধরে কামান থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু ফলাফল ছিল শূন্য। দিনে তুর্কিরা নগরপ্রাচীরের যে ক্ষতি করত, স্থানীয়রা রাতে তা মেরামত করে ফেলত।
রোডসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেল্লা সেন্ট নিকোলাই দুর্গ দখলের লক্ষ্যে ১৪৮০ সালের ২৮ জুলাই তুর্কিরা ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। তবে রোডসের নাইটরা প্রাণপণ প্রতিরোধে তুর্কিদের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। বহু সৈনিক নিহত হলে উসমানি সৈন্যরা রোডসের অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ব্যর্থতার দায়ে সেনাপতি মসিহ পাশা অপসারিত হন। ২০৭ প্রপিতামহ সুলতান বায়েজিদের স্বপ্ন পূরণে ইতালি অধিকারের পরিকল্পনাও ছিল ফাতিহের, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পূর্বেই তিনি মারা যান।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের অভিষেকের সময় উসমানি সালতানাতের আয়তন ছিল ৯ লাখ ৬৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। আবার আনাতোলিয়া ও বলকান অঞ্চলে সালতানাতের আয়তন ছিল প্রায় সমান। অর্থাৎ প্রতি অংশে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার করে। নিম্নোক্ত সাম্রাজ্য, রাজ্য ও ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো তিনি সালতানাতভুক্ত করেন: ক. দুটি সাম্রাজ্য; পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও ট্রাবজোন সাম্রাজ্য; খ. চারটি রাজ্য; ক্রিমিয়া, কারামানিয়া, বসনিয়া ও সার্বিয়া; গ. ১১টি ক্ষুদ্র রাজ্য। ফাতিহের মৃত্যুর সময় তুর্কি সালতানাতের আয়তন দাঁড়ায় ২২ লাখ ১৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। তম্মধ্যে ১৭ লাখ ৩ হাজার বর্গকিলোমিটার রোমেলি বা ইউরোপে এবং ৫ লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার আনাতোলিয়ায় (এশিয়ায়)। ২০৮
টিকাঃ
১১১. Ducas, op.cit., p. 77.
১১২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭০-৭১; Ducas, op.cit., p. 61.
১১৩. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২
১১৪. Ducas, op.cit., p. 81; Vasiliev, op.cit., p. 647; Ostrogorsky, op.cit., p. 505.
১১৫. Vasiliev, op.cit., p. 647; Ostrogorsky, op.cit., p. 506.
১১৬. Ducas, op.cit., p. 82.
১১৭. Vasiliev, op.cit., p. 647; Ostrogorsky, op.cit., p. 506.
১১৮. Ehrlich, op.cit., p. 152.
১১৯. Leonard of Chios, The History of the Loss and Captivity of the City of Constantinopole, pp. 26, 29.
১২০. Ducas, op.cit., p. 65-6.
১২১. Ducas, op.cit., p. 66.
১২২. Laonicus Chalcocondylas, Turkish History (Book VIII), p. 42; Ducas, op.cit., p. 66; বেক, প্রাগুক্ত, ১৬১; উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৩১; Gibbon, op.cit., p. 11; Vasiliev, op.cit., p. 646- 47; Walsh, op.cit., p. 548.
১২৩. Ducas, op.cit., p. 70.
১২৪. Ducas, op.cit., p. 65; Vasiliev, op.cit., p. 646.
১২৫. Ducas, op.cit., p. 71; Dolfin, op.cit., p. 127.
১২৬. এক রতল = ৪০ তোলা
১২৭. Jones, op.cit., p. 53; 70-71.
১২৮. Leonard, op.cit., pp. 16, 18; বেক, প্রাগুক্ত পৃ., ১৬১; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২; Vasiliev, op.cit., p. 650; Ostrogorsky, op.cit., p. 506; Gibbon, op.cit., p. 13; Ducas, op.cit., p. 77-78.
১২৯. Vasiliev, op.cit., p. 647; Gibbon, op.cit., p. 11.
১৩০. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৭-৭৮
১৩১. Tedaldi, op.cit., p. 9; Chalcocondylas, op.cit., p. 43-4; Ducas, op.cit., p. 84.
১৩২. Tedaldi, op.cit., p. 9; Leonard, op.cit., p. 20; Chalcocondylas, op.cit., p. 43-4; Ducas, op.cit., p. 84.
১৩৩. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১-৮৫
১৩৪. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯২
১৩৫. Leonard, op.cit., p. 17.
১৩৬. Ducas, op.cit., p. 84.
১৩৭. Ducas, op.cit., p. 83, 88-9.
১৩৮. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১
১৩৯. উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৩৪; Leonard, op.cit., p. 22; Chalcocondylas, op.cit., p. 47; Ducas, op.cit., p. 84.
১৪০. Chalcocondylas, op.cit., p. 46; Ducas, op.cit., p. 85-6; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৪-৩৫; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৩; Vasiliev, op.cit., p. 650; Walsh, op.cit., p. 548.
১৪১. Leonard, op.cit., p. 20.
১৪২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, ১০২
১৪৩. Ducas, op.cit., p. 86.
১৪৪. Leonard, op.cit., p. 21.
১৪৫. Vasiliev, op.cit., p. 651.
১৪৬. Leonard, op.cit., p. 24; Chalcocondylas, op.cit., p. 46; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৫
১৪৭. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬
১৪৮. Tedaldi, op.cit., p. 5; Leonard, op.cit., p. 17-8; Chalcocondylas, op.cit., p. 45.
১৪৯. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪
১৫০. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১
১৫১. Tedaldi, op.cit., p. 5; Leonard, op.cit., p. 18; Chalcocondylas, op.cit., p. 45.
১৫২. ফাহমি, প্রাগুক্ত, ১১২
১৫৩. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬১-৬২। গিবনের মতে, কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পর তৃতীয় দিনে আবু আইউব আনসারি-এর কবর আবিষ্কৃত হয় (Gibbon, op.cit., p. 29).
১৫৪. Ducas, op.cit., p. 89; 91; বেক, প্রাগুক্ত ১৬৩-৬৪; Akgunduz & Ozturk, Otoman History: Misperceptions and Truths, p. 133)
১৫৫. Leonard, op.cit., p. 25.
১৫৬. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৬; উমারি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৬; Ducas, op.cit., p. 92.
১৫৭. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৪, ১৩৬; মুহাম্মদ সাফওয়াত, ফাতহুল কুসতানতিনিয়্যাহ ওয়া সিরাতুস সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ, পৃ. ১০৩; Leonard, op.cit., p. 31-2.
১৫৮. Tedaldi, op.cit., p. 6.
১৫৯. Leonard, op.cit., p. 32.
১৬০. উজতুনা, প্রাগুক্ত ১৩৭; রাশিদি, প্রাগুক্ত ১২২; Leonard, op.cit., p. 32.
১৬১. Leonard, op.cit., p. 33.
১৬২. Vasiliev, op.cit., p. 651.
১৬৩. Ducas, op.cit., p. 92.
১৬৪. Leonard, op.cit., p. 33; Vasiliev, op.cit., p. 651.
১৬৫. Vasiliev, op.cit., p. 651-52; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৭
১৬৬. Tedaldi, op.cit., p. 8; Leonard, op.cit., p. 36-7; Chalcocondylas, op.cit., p. 50; Ducas, op.cit., p. 101; Riccherio, op.cit., p. 122-23; Vasiliev, op.cit., p. 652; Ostrogorsky. op.cit., p. 507.
১৬৭. Leonard, op.cit., p. 37; Chalcocondylas, op.cit., p. 50, 52; Ducas, op.cit., p. 95-6.
১৬৮. Chalcocondylas, op.cit., p. 50-1; Gibbon, op.cit.. p. 26.
১৬৯. কতিপয় ইউরোপীয় ইতিহাসবিদের মতে-আয়া সোফিয়ায় আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষ তুর্কিদের হাতে নিহত হয়েছিল। (Vasiliev, op.cit., p. 653)
১৭০. Vasiliev, op.cit., p. 653; Ostrogorsky, op.cit., p. 507.
১৭১. Ehrlich, op.cit., p. 148; Vasiliev, op.cit., p. 654.
১৭১. একদল খ্রিষ্টান এখনও বিশ্বাস করে, প্যাট্রিয়ার্থ ও পবিত্র মূর্তি প্রার্থনা শেষ না করেই গির্জার দেয়াল কেটে অন্তর্হিত হয়েছেন। যেদিন তুর্কিরা কনস্ট্যান্টিনোপল ত্যাগ করবে, সেদিন প্যাট্রিয়ার্থ আবার বের হবেন এবং অবশিষ্ট প্রার্থনা শেষ করবেন। (বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪; Vasiliev, op.cit., p. 653.
১৭৩. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪০
১৭৪. ১০ জুলাই, ২০২০ তারিখের তুরস্কের আদালত আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে ঘোষণা করে। ওই দিনই তুর্কি প্রেসিডেন্ট আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন। ২৪ জুলাই, ২০২০ তারিখে জুমার সালাত আদায়ের মাধ্যমে মসজিদ হিসেবে আয়া সোফিয়ার নতুন যাত্রা শুরু হয়। এ বিষয়ে নানামুখী প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এই বইয়ের শেষে সংযুক্ত পরিশিষ্টে আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
১৭৫. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৫
১৭৬. Mahomet bestowed on his rival the honours of a decent funeral (Gibbon, op.cit., p. 27).
১৭৭. Leonard, op.cit., pp. 16, 31-2, 39-40; Chalcocondylas, op.cit., p. 51; Ducas, op.cit., p. 104.
১৭৮. বেক, প্রাগুক্ত, ১৬৫; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১-৪২; Chalcocondylas, op.cit., pp. 53-4.
১৭৯. Gibbon, op.cit., p. 29.
১৮০. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১; Gibbon, op.cit., p. 29.
১৮১. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১
১৮২. Ducas, op.cit., p. 102.
১৮৩. Ducas, op.cit., p. 112; Lomellino 133.
১৮৪. উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৪১
১৮৫. মুহাম্মাদ হারব, আল-উসমানিয়ান ফিত তারিখ ওয়াল হাদারাহ, পৃ. ৩৪৩, ৩৪৭.
১৮৬. আশ-শাওকানি, আল-বাদর আল-তালি' পৃ. ১৬৬-৬৭
১৮৭. রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৯।
১৮৮. হারব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৬
১৮৯. Vasiliev, op.cit., p. 655.
১৯০. Gibbon, op.cit., p. 32.
১৯১. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৭
১৯২. ফাহমি, ১৩৭-৮; Gibbon, op.cit., p. 31-2.
১৯৩. জামাল আবদুল হাদি, আদ-দাওলাহ উসমানিয়্যাহ, পৃ. ৪৭
১৯৪. প্রাগুক্ত, ৪৮
১৯৫. উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৪২
১৯৬. সায়্যিদ মুহাম্মাদ আস-সায়্যিদ মাহমুদ, তারিখুদ দাওলা আল-উসমানিয়্যাহ, পৃ. ১৯৫; বেক, প্রাগুক্ত, ১৬৮।
১৯৭. Vasiliev, op.cit., p. 654; Ostrogorsky, op.cit., p. 508.
১৯৮. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬১; উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১৫০; Ostrogorsky, op.cit., p. 508.
১৯৯. এক্ষেন্দিয়ার ও তার বংশধর দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চল শাসন করেছে। ১৪৭৯ সালে ৬১ বছর বয়সে এস্ফেন্দিয়ার মারা যান। তার সাথে ফাতিহের বোনের বিয়ে হয়েছিল। ফিকহ বিষয়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও রয়েছে। (উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১।)
২০০. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৯; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১; Vasiliev, op.cit., p. 654; Ostrogorsky, op.cit., p. 508.
২০১. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০২-২০৩; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২-৫৩; বেক, প্রাগুক্ত পৃ. ১৭০-৭১
২০২. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৭; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭১-১৭২
২০৩. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৮; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০-৬৬
২০৪. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩-১৭৪; মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৯
২০৫. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৯; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৫
২০৬. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৬
২০৭. মাহমুদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১১-১২; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৬
২০৮. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৮