📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 প্রথম মুহাম্মদ

📄 প্রথম মুহাম্মদ


[পিতা : সুলতান বায়েজিদ, মাতা: দওলত খাতুন, জন্ম: ১৩৮১, শাসনকাল : ১৪১৩-১৪২১, মৃত্যু: ১৪২১]
সুলতান বায়েজিদ ও দওলত খাতুনের (Devlet Hatun/دولت شاه خاتون) পুত্র মুহাম্মাদ ১৩৮১ (ভিন্নমতে ১৩৭৯) সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাইমুরের খাঁচায় পিতার মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৪১৩ সালে তিনি ক্ষমতায় আরোহণ করেন। ভদ্রতা, দয়া ও মানবিকতার কারণে তিনি মুহাম্মাদ চেলেবি বা 'ভদ্র মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত ছিলেন (a noble representative of the Ottoman state (Vasiliev, 639) ।
তিনি ছিলেন মধ্যম আকৃতির, গোলগাল চেহারা, ফরসা গাত্রবর্ণ, লাল চিবুক, প্রশস্ত বক্ষ ও শক্তিশালী শরীরের অধিকারী। নিজ শাসনামলে তিনি ২৪টি যুদ্ধে অংশ নেন এবং তাঁর শরীরে অনধিক চল্লিশটি আঘাত ছিল। পিতার মৃত্যুর পর উদ্ভূত গৃহযুদ্ধের অবসান ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান কীর্তি। শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং ধৈর্য, দৃঢ়তা ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে একের পর এক ক্ষমতাপ্রার্থী ভাইদের পরাজিত করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। রাজ্য জয়ের চেয়ে বিদ্রোহ দমন ও সাম্রাজ্যের ভিত পুনর্নির্মাণেই তাঁকে বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে। তাই অনেক ইতিহাসবিদ তাঁকে উসমানি সালতানাতের 'দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা' বলে স্বীকার করেন।৬০
গৃহযুদ্ধের সময়টুকু বাদ দিলে প্রথম মুহাম্মাদের শাসন মাত্র আট বছর স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু এ অল্প সময়ের মাঝে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেন। গৃহযুদ্ধোত্তর সময়ে একটি সাম্রাজ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই মুখ্য; রাজ্য বিস্তার নয়। মুহাম্মাদ এটি বেশ বুঝতে পারেন এবং সে লক্ষ্যেই কাজ করেন। এ কাজটিও তিনি শান্তিতে করতে পারেননি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও খ্রিষ্টানদের সাথে তাঁর লড়াই বাধে। ইজিয়ান সাগরের দ্বীপপুঞ্জের (আরখাবিল) খ্রিষ্টান সর্দাররা তুর্কি জাহাজ ও উপকূলে লুণ্ঠন শুরু করলে ভেনিসের সাথে সুলতানের যুদ্ধ বাধে। গ্যালিপোলির কাছে এক নৌযুদ্ধে তুর্কি বহর সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। আরও কয়েকটি যুদ্ধে তিনি হাঙ্গেরি ও স্টাইরিয়ার বিরুদ্ধে পরাজিত হন (১৪১৬-২০), কিন্তু এতে উৎসাহ হারালেন না মুহাম্মাদ। সালতানাতের সঙ্গিন অবস্থা বিবেচনা করে তিনি যুদ্ধ অপেক্ষা সন্ধি স্থাপনে বেশি মনোযোগী হন। পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুসারে তিনি গ্রিক সম্রাটকে থেসালি ও কৃষ্ণসাগর তীরের কয়েকটি দুর্গ ছেড়ে দেন। ভেনিস ও রাঙসা রিপাবলিকের সাথেও চুক্তি সম্পাদিত হয়। যেহেতু এশিয়ার চেয়ে ইউরোপেই শত্রুসংখ্যা অধিক, তাই তিনি এদিনে রাজধানী স্থাপন করেন।
তবে এশিয়ায়ও শান্ত অবস্থা ছিল না। স্মার্নার শাসনকর্তা ছিলেন জুনাইদ। গৃহযুদ্ধের সুযোগে তিনি বিদ্রোহ করেন এবং আয়দিন দখল করে নেন। মুহাম্মাদের অনুপস্থিতিতে কারামানের রাজাও ব্রুসা আক্রমণ করে। ব্রুসা নগর পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেলেও শহরতলির মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা ভস্মীভূত হয়।
সুলতান স্মার্না অবরোধ করলে জুনাইদ ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। সেনাপতি বায়েজিদ পাশা কারামান বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করেন। রাজা মুস্তাফা বে বন্দি হন। সদাশয় সুলতান তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে কারামানরাজ আবারও তুর্কি এলাকা হামলা করেন। আবার পরাজিত হন তিনি। সুলতান আবারও তাকে ক্ষমা করেন। অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজ্য দখল না করে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে সন্তুষ্ট থাকেন সুলতান। ৬১
সুলতান মুহাম্মাদের সাথে বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েলের সুসম্পর্ক ছিল। খ্রিষ্টান শাসকের সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ সুলতান গ্রহণ করেননি। শুধু তাই নয়; সম্রাটের কিছু বাড়াবাড়িও শান্তির খাতিরে উপেক্ষা করেছেন।
একবার কনস্টান্টিনোপলের এক উপশহর অতিক্রমের সময় সুলতানের সাথে সম্রাটের সাক্ষাৎ হয়। দুই নৃপতি নিজ নিজ গ্যালিতে অবস্থান করে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আলাপচারিতা করেন। সুলতান প্রণালি অতিক্রম করে এশীয় তীরে তাঁবুতে অবস্থান নেন। সম্রাট অবশ্য গ্যালি হতে অবতরণ করেননি। রাতে উভয় নৃপতি তাঁদের নৈশভোজের সুস্বাদু ডিশ বিনিময় করেন।৬২
সুলতান মুহাম্মাদ দীর্ঘদিন শান্তি-সাধনা করতে পারলেন না। দরবেশ বিদ্রোহ তাঁর সাধনায় ছেদ ঘটায়। এ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন মুসার সামরিক বাহিনীর বিচারপতি (কাজি আসকার) বদরুদ্দিন। মনিবের পরাজয়ের পর তিনি আজনিকে অবস্থান করতে থাকেন। পরে সেখান থেকে পালিয়ে তার সাম্যবাদী ধর্মমতের প্রচার শুরু করেন। ৬৩ বহুসংখ্যক অনুসারী তার ভাগ্যে জুটে যায়। তাদের মধ্যে মুসলিম তো ছিলই; ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও ছিল। কারণ, তিনি সব ধর্মকে সমান মনে করতেন। পীর কলিজা মুস্তাফা নামে এক ব্যক্তি তাদের আধ্যাত্মিক নেতার ভূমিকা পালন করেন। তাদের আরেক গুরু ছিল ইহুদি, যার নাম ছিল তুরলাক কামাল।
সালাতানাতের বহু স্থানে তাদের উৎপাত বেড়ে গেলে সুলতানকে অস্ত্রধারণ করতে হয়। তিনি প্রথমে বুলগেরিয়ান প্রিন্স সিসম্যানকে দরবেশ বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করেন। কিন্তু পীর কলিজা মুস্তাফার হাতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। তারপর সুলতান মুহাম্মাদ তাঁর প্রথম উজির বায়েজিদ পাশাকে পাঠান। ইজমিরের উপকণ্ঠে 'কারা বুর্ন' নামক স্থানে সংঘটিত এক যুদ্ধে সাম্যবাদীদের বাহিনী পরাজিত হয়। তাদের নেতা মুস্তাফা ধৃত ও নিহত হন। এই গোষ্ঠীর অপর নেতা বদরুদ্দিন ঘাঁটি গেড়েছিলেন মেসিডোনিয়ায়। তীব্র প্রতিরোধের পর তিনি পরাজিত এবং বহু অনুচরসহ মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ৬৪
মধ্যযুগে সুলতান মুহাম্মাদের ন্যায় শান্তিবাদী নৃপতির দেখা মেলা ভার। কিন্তু তাঁর কপালে শান্তি জুটল না। সাম্যবাদী আন্দোলনের সমস্যা সমাধান হতে না হতেই বিদ্রোহী ভ্রাতা মুস্তাফার উদ্ভব হয়। সুলতানের ভাই
মুস্তাফা তাঁর পিতা বায়েজিদের সাথে বন্দি হয়েছিলেন তাইমুরের হাতে। তারপর থেকে তার খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৪২০ সালে হঠাৎ এক ব্যক্তি ইউরোপে নিজেকে বায়েজিদ-পুত্র মুস্তাফা বলে ঘোষণা করে সাম্রাজ্যের অংশ দাবি করে। অনেক তুর্কি তার দাবি মেনে নেয়। সুলতানের ক্ষমাপ্রাপ্ত জুনাইদও তার দলে যোগ দেয়। তবে সেলোনিকার যুদ্ধে মুস্তাফা পরাজিত হয়ে কনস্টান্টিনোপলে পালিয়ে যায়।
বাইজেন্টাইন সম্রাট বিপুল অর্থ লাভের অঙ্গীকারে মুস্তাফাকে সুলতানের মৃত্যু পর্যন্ত নজরবন্দি করে রাখতে রাজি হন। পরের বছর ১৪২১ সালে (৮২৪ হিজরি) সুলতান মুহাম্মাদ মাত্র ৪৩ বছর বয়সে এদিনে মারা যান। তাঁকেও ব্রুসার সবুজ কবরে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর উত্তরাধিকারীর জন্য ৮৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাম্রাজ্য রেখে যান।
অন্যান্য উসমানি সুলতানের তুলনায় সুলতান প্রথম মুহাম্মাদের শাসনকাল সংক্ষিপ্ত ছিল। তার ওপর প্রথমদিকে তাঁকে গৃহযুদ্ধে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। ফলে তিনি রাজ্য সম্প্রসারণ করতে পারেননি। তারপরও সদ্ব্যবহার, সদাশয়তা, ন্যায়বিচার, শান্তিপ্রিয়তা, সাহিত্য ও শিল্পকলায় উৎসাহ দানের জন্য তিনি চেলেবি বা ভদ্রলোক বলে পরিচিতি লাভ করেন। তিনিই প্রথম তুর্কি সুলতান, যিনি আমিরে মক্কার প্রতি বার্ষিক হাদিয়া প্রেরণের প্রথা চালু করেন। এ উপহারকে সাররা বলা হতো। ব্রুসায় তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, চীনামাটির প্রসাধন ছিল বলে সেটি সবুজ মসজিদ বলে খ্যাতি লাভ করে। এটি মুসলিম স্থাপত্যের ও খোদাই কাজের সবচেয়ে সুন্দর নমুনা বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। সদাশয় সুলতান মসজিদের কাছে একটি মাদরাসা স্থাপন এবং গরিবের জন্য সম্পদ ওয়াকফ করেন। তিনি অন্ধ ভাইকে ব্রুসার কাছে ভূ-সম্পত্তি দান করেন। গৃহযুদ্ধে নিহত ভাই সুলায়মানের এক কন্যাকে রক্ষা করে তাকে বিয়ে দেন। শাহজাদির সন্তান হলে তাকে তিনি সম্পদ ও অর্থ প্রদান করেন। ৬৫

টিকাঃ
৬০. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬
৬১. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮-৩৯
৬২. জর্জ ফ্রান্তেজ ১১১-১২ qt. Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৩. বদরুদ্দিনের চিন্তাধারার কয়েকটি দিক: ক. জান্নাত ও জাহান্নামের বস্তুগত অস্তিত্ব অস্বীকার; খ. ক-এর ক্রমধারায় পুনরুত্থান ও কিয়ামত অস্বীকার; গ. ঈমানের দিক দিয়ে ইহুদি, নাসারা ও খ্রিষ্টানরা সমান; ঘ. মুহাম্মাদ অন্য রাসূলগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন, তাঁর রিসালাতও ভিন্ন কিছু নয়; ঙ. মালিকানার অধিকার অস্বীকার এবং রাষ্ট্রের সম্পদে সকল নাগরিকের সমানাধিকারের দাবি। (উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৮)
৬৪. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১
৬৫. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১

📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 মহামতি মুরাদ

📄 মহামতি মুরাদ


[পিতা : প্রথম মুহাম্মাদ, মাতা : দিলকাদির উন্নু আমিনা খাতুন, জন্ম : ১৪০৩, শাসনকাল : ১৪২১-১৪৫১, মৃত্যু : ১৪৫১]

সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ চার পুত্র রেখে মারা যান। পিতার মৃত্যুর সময় জ্যেষ্ঠপুত্র মুরাদের (জন্ম : আমাসিয়া, ১৪০৩ বা ১৪০৪) বয়স ছিল আঠারো, দ্বিতীয় পুত্র মুস্তাফার তেরো, বাকি দুজন শিশু। স্বাভাবিকভাবে মুরাদই হবেন পরবর্তী সুলতান। মৃত্যুর প্রাক্কালে দুই শিশুপুত্রকে বাইজেন্টাইন সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অসিয়ত করেন সুলতান। দুই মন্ত্রী বায়েজিদ পাশা ও ইবরাহিম তা-ই করেন। মুরাদ ছিলেন এশিয়ায়। পিতা অসুস্থ বলে তাঁকে সংবাদ দেওয়া হয়। ক্ষমতারোহণ নির্ঝঞ্জাট করার জন্য ৪০ দিন পর্যন্ত সুলতানের মৃত্যুর খবর গোপন রাখেন মন্ত্রীরা। এরই মাঝে মুরাদ এসে অভিষিক্ত হন।
প্রত্যেক তুর্কি সুলতানের ন্যায় মুরাদকেও এশিয়া-ইউরোপে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়। মুরাদ প্রথমে কারমান-রাজ ও হাঙ্গেরির রাজার সাথে ইতঃপূর্বে সম্পাদিত পাঁচ বছরের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সালতানাতের এশীয় অংশের বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমনে একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হওয়া।

মুস্তাফার বিদ্রোহ দমন
কিন্তু বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেন না। আঠারো বছরের কিশোরের ক্ষমতাসীন হওয়াকে সম্রাট সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। সুলতান মুহাম্মাদের সাথে কৃত চুক্তিবলে তার ভাই (বর্তমান সুলতান মুরাদের চাচা) মুস্তাফা সম্রাটের কাছে নজরবন্দি ছিল। ম্যানুয়েল তাকে শুধু মুক্তই করেননি; বরং তরুণ সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন। সেনাপতি দিমিত্রি লাসকারিসের নেতৃত্বে ২০টি সামরিক নৌযান দিয়ে মুস্তাফাকে সমৃদ্ধ করেন সম্রাট। নিজেকে সুলতান দাবি করে মুস্তাফা এ বলে প্রচারকাজ শুরু করেন, পিতৃব্য বেঁচে থাকতে ভ্রাতুষ্পুত্রের সুলতান হওয়ার কোনো অধিকার নেই। সালতানাতের ইউরোপীয় প্রদেশগুলো একে একে মুস্তাফার হস্তগত হয়। এক পর্যায়ে সুলতানের সেনাপতি বায়েজিদ পাশা এগিয়ে এলেন সালতানাত রক্ষায়। কিন্তু মুস্তাফা নিজেকে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রকৃত সুলতান দাবি করে বায়েজিদের বহু সৈনিককে বাগিয়ে নেন। যুদ্ধে মুরাদের সেনাপতি পরাজিত ও নিহত হন। আত্মবিশ্বাসী মুস্তাফা সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এশিয়ায় প্রবেশ করেন। ব্রুসার কাছে উলুবাদ নদীর তীরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। কিন্তু এবার লড়াই হয় না, কেবল ভ্রাতুষ্পুত্রের কৌশলের কাছে হেরে যান মুস্তাফা। তিনি পালিয়ে গ্যালিপোলি দুর্গে আশ্রয় নিলেন। সুলতান সহসা তা জয় করেন এবং ম্যানুয়েলের হাতের পুতুল মুস্তাফা ধৃত ও নিহত হয়। ৬৬

কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ
সুলতান মুরাদ বিপদমুক্ত হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বাইজেন্টাইন সম্রাটকে শিক্ষা দিতে মনস্থ করেন। ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট (৩ রমজান, ৮২৫ হি.) তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করে আক্রমণ শানান। কিন্তু ৬৪ দিন স্থায়ী এ অবরোধে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য অর্জিত হয় না। সম্রাট ম্যানুয়েলের ধূর্ততা কনস্ট্যান্টিনোপলকে রক্ষা করে। তিনি সুলতানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৩ বছর বয়সি মুস্তাফাকে বিদ্রোহে উৎসাহ দেন। জামিয়ান ও কারামানের রাজারা সৈন্য দিয়ে শাহজাদাকে সাহায্য করেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থান দখল করে মুস্তাফা ব্রুসা অবরোধ করেন। কিন্তু মুরাদ এত দ্রুত সেখানে উপস্থিত হন যে, বাধা প্রদান অর্থহীন দেখে মুস্তাফা পালিয়ে যান। সুলতানের কিছু সৈনিক দ্রুতই বিদ্রোহী ভ্রাতা ও তার বহু অনুচরকে ধরে হত্যা করে। ৬৭
বিদ্রোহ দমনে সুলতানের সাফল্য দেখে সম্রাট ম্যানুয়েল ভয় পেলেন। তিনি বার্ষিক ৩০ হাজার (কোনো কোনো সূত্রে ৩ লাখ) ডুকাট কর দানের অঙ্গীকার করে এবং ডার্কোস ও সেলিম্বিয়া ব্যতীত স্টাইমন নদী ও কৃষ্ণসাগর তীরের সমস্ত গ্রিক নগর ছেড়ে দিয়ে সুলতানের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন (১৪২৪ খ্রি)। ১৪২৩ সালে ক্যাস্টামোনু-এর শাসক তার অর্ধেক রাজ্য সুলতানকে দিয়ে দেন এবং বিশ্বস্ততার নিদর্শনস্বরূপ তার মেয়ের সাথে মুরাদের বিয়ে দেন। তুর্কি সৈন্যরা গ্রিসে অভিযান চালিয়ে করিন্থের ইস্থমাস প্রাচীর ভেঙে ফেলে। সম্রাট ম্যানুয়েল এটি নির্মাণ করেছিলেন। মোরিয়াও তুর্কিদের পদানত হয়। ৬৮

বিদ্রোহ দমন পরের বছর পুরোনো বিশ্বাসঘাতক কারা জুনাইদ আয়দিন দখল করে। অচিরেই সেনাপতি বায়েজিদ পাশার ভাই হামজা বেগ তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। এ লোকটি সুলতান প্রথম মুহাম্মাদের কাছ থেকেও দুবার ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এবার তার মৃত্যুর মাধ্যমে সালতানাত একজন জাত শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পায়।
আয়দিন, সারুখান ও মিনতশাসহ কয়েকটি ক্ষুদ্ররাজ্য আবারও সালতানাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। তাইমুর লং এগুলোকে স্বাধীন করে দিয়েছিলেন। সুলতানের বাহিনীর হাতে কামরান শাসক মুহাম্মাদ বেক নিহত হলে তার রাজ্যও মুরাদের হাতে আসে। সুলতান অবশ্য সাবেক শাসকের পুত্র ইবরাহিমকে আনুগত্যের শর্তে পিতৃরাজ্য শাসন করতে দেন।
১৪২৮ সালে জামিয়ানের বয়োবৃদ্ধ রাজা ইয়াকুব বেগ মারা যান। তার কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায় তিনি নিজেই রাজ্যটি (কুতাহিয়া) সুলতানকে দিয়ে যান। তাইমুর যে রাজ্যগুলোকে তুর্কি সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন করেছিল, এভাবে সেগুলো পুনরায় সালতানাতভুক্ত হয়। ৬৯

ইউরোপে সুলতানের কার্যাবলি এশিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর মুরাদ ইউরোপে মনোযোগী হন। প্রথমেই হাঙ্গেরির সাথে যুদ্ধ বাধে। দানিয়ুব নদীর উত্তর তীরের শহর কলম্বাস ৭০ দখল করার পর হাঙ্গেরির রাজা সুলতানের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। চুক্তির ফলে দানিয়ুবের ডান তীরে তুর্কি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হাঙ্গেরির পরিণতি দেখে সার্বিয়ার রাজা জর্জ ব্রাঙ্কোভিচ বার্ষিক ৫০০০০ ডুকাট স্বর্ণমুদ্রা কর প্রদান ও যুদ্ধের সময় সুলতানের সাহায্যে একদল উৎকৃষ্ট সৈনিক প্রেরণের শর্তে চুক্তি করেন। তিনি হাঙ্গেরির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও সম্মত হন। তা ছাড়া বিশ্বস্ততার প্রমাণস্বরূপ সুলতানের সাথে আপন কন্যা মারা ব্রাঙ্কোভিচের বিবাহ দেন।
১৪৩০ সালে ১৫ দিন অবরোধের পর তিনি Thessalonica পুনর্দখল করেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট অষ্টম জনের এক ভাই ডেসপট উপাধি ধারণ করে এই শহর শাসন করতেন। তার একার পক্ষে তুর্কিদের প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় দেখে কিছু অর্থের বিনিময়ে শহরটি ভেনিসের কাছে বিক্রি করে দেন। ভেনিসিয়ানরা বাণিজ্যের উন্নতির মাধ্যমে এটিকে দ্বিতীয় ভেনিস বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তুর্কিরা এটা মেনে নেয়নি। সুলতান নিজে অভিযানে বের হয়ে Thessalonica জয় করেন।
এবার তিনি কনস্টান্টিনোপল জয়ে মনস্থ করেন। কিন্তু এর পূর্বে তিনি বাইজেন্টাইন রাজধানীর সাথে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সম্পর্কচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ লক্ষ্যে প্রথমেই আলবেনিয়া অভিযান পরিচালনা করেন। জেনিনাসহ কয়েকটি শহরের বাসিন্দারা স্বশাসনের সুযোগ বহাল রাখার শর্তে আনুগত্য স্বীকার করে। আলবেনিয়ার উত্তরাংশের শাসক জন কাস্ট্রিয়ট তার চার পুত্রকে সুলতানের কাছে বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। ১৪৩১ সালে তার মৃত্যু হলে রাজ্যটি সালতানাতভুক্ত হয়।
১৪৩১ সালে ওয়ালেচিয়ার রাজা ড্রাকুল তুর্কিদের বশ্যতা স্বীকার করে। তবে একাকী যুদ্ধ করা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই সে এমনটা করেছিল। কিছুদিনের মধ্যে হাঙ্গেরির উসকানিতে ড্রাকুল ও সার্বিয়ার রাজা বিদ্রোহ করে বসে। ফলে সুলতান তাদের দমন করতে বাধ্য হন। বহু জনপদ ধ্বংস করে ১৪৩৮ সালে ৭০ হাজার বন্দিসহ তিনি ফিরে যান। পরের বছর সার্বিয়ার রাজা ব্রাঙ্কোভিচের বিদ্রোহ প্রকাশ পায়। ফলস্বরূপ সুলতান আন্দরিয়া দখল করে বেলগ্রেড অবরোধ করেন। ৭১
অচিরেই জন হুনিয়াডি নামে এক মারাত্মক চতুর শত্রুর আবির্ভাব হয়। হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমান্ড ও এলিজাবেথ মর্সিনি নামে এক সুন্দরী বালিকার অবৈধ সংশ্রবের ফল জন হুনিয়াডি। তিনি সাদা কাপড় পরতেন বলে খ্রিষ্টানরা তাকে 'শ্বেত নাইট' বলত। ইতালির যুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে ট্রান্স সিলভানিয়ার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। ইতোমধ্যে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার রাজা লেডিসলাস হাঙ্গেরির সিংহাসনে বসেন।
১৪৪২ সালে মুরাদের বেলগ্রেড অভিযান ব্যর্থ হয়। ওদিকে তুর্কি সেনাপতি মজিদ বে ট্রানসিলভানিয়ার অন্তর্গত হার্মনস্টাড অবরোধ করেন। লেডিসলাস তখনও নাবালক, তাই হাঙ্গেরির প্রকৃত শাসক ছিলেন হুনিয়াডি। ১০ হাজার সৈনিক নিয়ে নগর উদ্ধারে এগিয়ে এলেন তিনি। যুদ্ধে তুর্কিরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয়। ২০ হাজার মুসলিম নিহত হয়। মজিদ বে পুত্রসহ ধরা পড়েন। হুনিয়াডি সবার সামনে তাদের খণ্ড-বিখণ্ড করে নৃশংসতার স্বাক্ষর রাখলেন।
এবার সুলতান আরেক সেনাপতি শিহাবুদ্দিন পাশাকে ৮০ হাজার সৈনিকসহ প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনিও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ১৪৪৩ সালে হুনিয়াডি আরও বড়ো বাহিনী প্রস্তুত করেন। তার সাথে যোগ দিলো পোল্যান্ড, সার্বিয়া ও ওয়ালেচিয়ার বাছাবাছা সৈনিকেরা। ইতালি হতে পোপও একদল সৈনিক পাঠালেন কার্ডিনাল জুলিয়ানের নেতৃত্বে। ফ্রান্স ও জার্মানিও বাদ গেল না। রাজা লেডিসলাস নিজে সৈন্যদের সাথে ময়দানে অবতীর্ণ হন। ওদিকে কারামানরাজও পূর্বপরিকল্পনামতো বিদ্রোহ করেন। সুলতানকে বাধ্য হয়ে এশিয়া মাইনরে গমন করতে হয়। মুরাদের অনুপস্থিতিতে তাঁর সৈন্যরা হুনিয়াডির বাহিনীর সাথে পেরে উঠল না। মোরাভা নদীর তীরে দুই দলের মাঝে লড়াই হয়। পরাজিত তুর্কি বাহিনী পালিয়ে যায় বলকানের দক্ষিণে। মাঝে মারা যায় ১ হাজার তুর্কি আর বন্দি হয় ৪ হাজার।
তখন ছিল শীতের মৌসুম। প্রাকৃতিক বাধা মাড়িয়ে হুনিয়াডি বলকান অতিক্রম করে ইসলাদি গিরি সংকটের পথে দক্ষিণের সমতল ভূমিতে অবতরণ করেন। বারংবার পরাজয়ে এমনিতেই তুর্কিদের মনোবল ছিল না। ফলে ইউরোপীয় তুরস্ক সহজেই হুনিয়াডির পদানত হয়।
সুলতান মুরাদ এশিয়ায় সফল হলেও ইউরোপে তাঁর সেনাপতিরা বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন। তা ছাড়া হুনিয়াডির মতো সেনাপতির নেতৃত্বে খ্রিষ্টান সংঘের বাহিনীও হয়ে উঠেছিল অদম্য। তাই তিনি দূরবর্তী প্রদেশগুলো ছেড়ে সালতানাতের অবশিষ্টাংশে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মনস্থ হন। ওদিকে তাঁর ভগ্নিপতি মাহমুদ চেলেবি হুনিয়াডির হাতে বন্দি হন। তাকে উদ্ধার করার জন্য বোনের বিশেষ অনুরোধও সুলতানকে শান্তি-আলোচনায় উৎসাহ দিলো। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ১০ বছরের জন্য শান্তিরক্ষা করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে দুই পক্ষ সেজেদিনে এক সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন (জুলাই ১৩, ১৪৪৪/২৬ রবিউল আউয়াল, ৮৪৮ হিজরি)। এর ফলে সার্বিয়া স্বাধীনতা পায় এবং ওয়ালেচিয়া হাঙ্গেরির অন্তর্ভুক্ত হয়। সুলতানের ভগ্নিপতি মাহমুদ মুক্তি পান; বিনিময়ে হুনিয়াডি ৬০,০০০ ডুকাট মুক্তিপণ লাভ করেন। ৭২

মুরাদের সিংহাসন ত্যাগ
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কিছুদিন পর মুরাদের বড়ো পুত্র আলাউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। পুত্রশোকে কাতর সুলতান দুনিয়াদারি বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। মেজো পুত্র ১৪ বছর বয়সি মুহাম্মাদের অনুকূলে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি আয়দিনে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। সেখানে মুত্তাকি-পরহেজগার ব্যক্তিদের সাথে ইবাদত- বন্দেগিতে মশগুল হন।

চুক্তি ভঙ্গ করেন হুনিয়াডি
সুলতানের পদত্যাগের খবর পৌঁছামাত্র সক্রিয় হয়ে উঠলেন কার্ডিনাল জুলিয়ান সিজারেনি (১৩৯৮-১৪৪৪)। তিনি লেডিসলাসকে সন্ধিভঙ্গে প্ররোচিত করতে লাগলেন এই বলে, মুসলমানদের সাথে সম্পাদিত সন্ধি ভঙ্গ করলে কোনো পাপ হবে না। বুলগেরিয়ার সিংহাসন লাভের প্রতিশ্রুতি পেয়ে হুনিয়াডির মন গলল। তিনি সন্ধি ভঙ্গ করতে সম্মত হন। এমন ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা হুনিয়াডির মতো শ্রেষ্ঠ সেনাপতির জীবনে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করে। ৭৩

বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম
সরাসরি যুদ্ধে হুনিয়াডি বহুবার তুর্কি বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু সুলতানের অবসরের সুযোগে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের প্ররোচনায় মুসলিম দমনের যে কূটকৌশল গ্রহণ করেন, তা সফল হয়নি। চুক্তির বছরের ১ সেপ্টেম্বর লেডিসলাস ও জুলিয়ানের সহযোগিতায় ২০ হাজার সৈনিক নিয়ে তুর্কি দলনে অগ্রসর হন হুনিয়াডি। মাঝপথে ওয়ালেচিয়ার রাজা ড্রাকুলও যোগ দেন তাদের সাথে।
ক্যাথলিক বাহিনী বুলগেরিয়ার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়ার পথে দেশীয় অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের গ্রাম ও গির্জা পুড়িয়ে দেয়। এটি ছিল অপ্রয়োজনীয় নৃশংসতা। দানিয়ুব পার হয়ে তারা কৃষ্ণসাগরের তীরে পৌঁছায়। সেখানে তারা একটি ক্ষুদ্র তুর্কি নৌবহর ধ্বংস করে। সুন্নিয়াম, পেজেসসহ বহু দুর্গ তাদের দখলে আসে; তুর্কি রক্ষীদের হত্যা বা উচ্চ স্থানে নিক্ষেপ করা হয়। কাভার্না জয় করে খ্রিষ্টান সৈন্যরা কৃষ্ণতীরের শহর ভার্না অবরোধ ও দখল করে। লেডিসলাসের স্বপ্ন ছিল তিনি দ্রুত কনস্ট্যান্টিনোপলে পৌঁছে বাইজেন্টাইন সম্রাটের জামাতা হিসেবে অভিষিক্ত হবেন।
তুর্কি সালতানাতের কল্যাণকামীরা ভয়াবহ বিপদ আঁচ করতে পেরে মুরাদকে নির্জনবাস থেকে ফিরিয়ে আনেন। মুরাদ আবার রাজদণ্ড হাতে নেন। ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে অক্লান্ত সুলতান বসফরাস পাড়ি দিয়ে দ্রুত সামনে অগ্রসর হন। ১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর (২৮ রজব, ৮৪৮ হিজরি) দুই পক্ষ পরস্পরের মুখোমুখি হয়। ভগ্ন সন্ধির একখানা প্রতিলিপি হয় তুর্কিদের পতাকা। উদ্দেশ্য : দুনিয়াবাসী যেন দেখে, বিশ্বাসঘাতকের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ লড়াই একটি ন্যায্য সংগ্রাম। আর আসমান-জমিনের মালিক যেন ন্যায়ের পক্ষে বিজয় দান করেন।
যুদ্ধের প্রাক্কালে অকস্মাৎ এক ঝড় এসে খ্রিষ্টানদের সমস্ত পতাকা ভূমিস্যাৎ করে দেয়। কেবল রাজার পতাকা উড্ডীন থাকে। প্রাণপণ লড়াই করে খ্রিষ্টানরা দুর্লক্ষণ মিথ্যা প্রমাণে সচেষ্ট হয়। হুনিয়াডি তুর্কি বাহিনীর এশীয় সৈনিকদের হটিয়ে দেন। অপর পাশে ওয়ালেচিয়ার সৈনিকরা সফল হয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল-খ্রিষ্টানদেরই জয় হবে। এমন সময় আনাতোলিয়ার বেগলার বেগ কারাজা তার বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রভাগে চলে আসেন। অবস্থা বেগতিক দেখে মুরাদ পশ্চাদপসরণ করার জন্য অশ্ব ফেরালেন। তুর্কিদের সৌভাগ্যই বলতে হবে, কারাজা নিকটেই ছিলেন। তিনি সুলতানের অশ্বের লাগাম ধরে তাঁকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। এক লহমায় সুলতানের হুঁশ ফিরে আসে। তিনি জেনিসেরিদের প্রাণপণে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। ফলে অল্পকালের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। হাঙ্গেরির রাজা লেডিসলাসের অশ্ব মারা পড়ে। তুর্কি সৈন্যরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। খাদার আগা নামের এক বৃদ্ধ জেনিসেরি এক আঘাতে তার মাথা কেটে ভগ্ন সন্ধিপত্রের সাথে বর্শাগ্রে বিদ্ধ করে।
এই একটি ঘটনা যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে পালটে দেয়। হাঙ্গেরির অভিজাতরা তাদের রাজার পরিণতি দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাতে থাকে। রাজার মৃতদেহ উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা শেষে হুনিয়াডি অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যান। খ্রিষ্টান বাহিনীর নেতৃহীন পশ্চাৎ সৈন্যরা পরদিন প্রতুষ্যে তুর্কিদের হাতে বেঘোরে কাটা পড়ে। এই ঘৃণিত সন্ধি ভঙ্গের প্রধান উসকানিদাতা ও যুক্তিদাতা জুলিয়ান নিজেও নিহত হন। ভার্নার বিজয় সার্বিয়া ও বসনিয়াকে আবারও তুর্কি সালতানাতভুক্ত করে। এভাবে তুর্কিদের হাত থেকে বলকান অঞ্চলকে বাঁচানোর সর্বশেষ কেন্দ্রীভূত প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।৭৪
নিকোপলিসের পর আবারও সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তুর্কিরা জয়লাভ করে। এ বিজয়ে মুসলিম দুনিয়ায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ভার্নার বিজয়ের খবর কায়রোতে পৌঁছলে (১/০৪/১৪৪৪) মামলুক সুলতান জাকমাক পরবর্তী জুমার খুতবায় আব্বাসি খলিফার পাশাপাশি সুলতান মুরাদের নাম উচ্চারণের নির্দেশ দেন। শহিদদের জন্য দুআ করা এবং কায়রোর সড়কে বিজয় শোভাযাত্রা বের হয়। ৭৫

ইস্কান্দার বেগ সৃষ্ট গোলমাল
ভার্নার বিজয়ের পর মুরাদ আবারও ম্যাগনেসিয়ায় নির্জনবাস গ্রহণ করেন। অচিরেই জেনিসেরিরা অবাধ্য হয়ে রাজধানী এদিন লুট করে। সালতানাতের শুভাকাঙ্ক্ষীরা অশনি সংকেত দেখেন। তাদের অনুরোধে ১৪৪৪ সালের প্রারম্ভে মুরাদ আবারও রাজদণ্ড হাতে নেন। বিদ্রোহের হোতাদের শাস্তি দিয়ে অন্যদের ক্ষমা করেন। এবার তিনি ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন। জেনিসেরি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখার লক্ষ্যে তিনি বাইজেন্টাইন ভূমিতে অভিযান পরিচালনা করেন। সম্রাট ম্যানুয়েলের সাম্রাজ্য বণ্টনের সিদ্ধান্ত মুরাদের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল ও তার উপকণ্ঠ জনকে এবং মোরিয়া ও থেসালিয়ার অংশবিশেষ কনস্ট্যান্টাইনকে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সুলতানের অভিপ্রায় জানতে পেরে কনস্ট্যান্টাইন করিন্থ যোজক বরাবর ছয় মাইল দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেন। সুলতানের সৈন্যরা কামান দাগিয়ে প্রাচীর ছিদ্র করে করিন্থ শহর দখল করে নেয়।
তবে মোরিয়া অধিকারের প্রচেষ্টা সফল হয়নি সুলতানের। কারণ, আলবেনিয়ায় ইস্কান্দর বেগের বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ বেড়ে গিয়েছিল। উত্তর আলবেনিয়ার শাসক জন ক্যাস্ট্রিয়টের চার পুত্র মুরাদের কাছে বন্ধক ছিল। এদেরই একজন ইস্কান্দার বেগ। সে বাহ্যিকভাবে মুসলিম হয়েছিল। ১৪৪৩ সালে সুলতান যখন হুনিয়াডির সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত, তখন সে সালতানাতের প্রথম সচিবের কাছ থেকে এই মর্মে একটি আদেশ জারি করান যে, তাকে আলবেনিয়ার আক হিসারের শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণ করার সাথে সাথে আরনাউদ গোত্রসমূহের সর্দারদের সে তার গোপন অভিসন্ধি প্রকাশ করে এই বলে, সে পিতৃভূমিকে তুর্কিদের হাত হতে মুক্ত করতে চায়। তাদের আর্থিক ও জনবলের সাহায্যে সে একটি বাহিনী গঠন করে ১৪৪৩ সালে তুর্কি সেনাপতি আলি পাশাকে পরাজিত করে। সুলতানের নির্জনবাস ও হাঙ্গেরির সাথে যুদ্ধব্যস্ততাকে সে প্রভাব বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। ভার্না যুদ্ধের সমাপ্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে ইস্কান্দার বেগের প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পেলেন মুরাদ। ১ লাখ সৈনিক সমভিব্যহারে এগিয়ে গিয়ে ১৪৪৭ সালেই তিনি তার হাত হতে দুটি নগরী ছিনিয়ে নেন।

দ্বিতীয় কসোভো যুদ্ধ
ইতোমধ্যে আবারও হুনিয়াডির প্রাদুর্ভাব ঘটে। এবার তিনি সার্বিয়া মাড়াচ্ছিলেন, সাথে ছিল ২৪ হাজার সৈন্য; যাদের মধ্যে ১০ হাজার ওয়ালেচিয়ান। ১৪৪৮ সালে সুলতান নিজে পুনরায় হুনিয়াডির মুখোমুখি হন কসোভো প্রান্তরে। এটিকে দ্বিতীয় কসোভো যুদ্ধ বলে। ১৩৮৮ সালে ইউরোপীয়রা কসোভোর ময়দানে সুলতান প্রথম মুরাদের হাতে পরাজিত হয়েছিল। ৬০ বছর পর ১৪৪৮ সালে একই ময়দানে তারা দ্বিতীয় মুরাদের হাতেও পরাজিত হয়।
এখানে হুনিয়াডিকে পরাজিত করে সুলতান আবার ছোটেন ইস্কান্দার বেগকে দমন করতে। কিন্তু কিছুদিন আক হিসার শহর অবরোধ করেও তাকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হন। এমনকী কর প্রদানের বিনিময়ে সে চুক্তি করতেও রাজি হয়নি। দীর্ঘ যুদ্ধে বহু সৈন্যের প্রাণহানি ও অবশিষ্টদের ক্লান্তির কারণে সুলতান রাজধানীতে ফিরে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে ইস্কান্দারকে শিক্ষা দিতে মনস্থ হন। কিন্তু তার আগেই ১৪৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি (৫ মুহাররম ৮৫৫ হি.) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৩০ বছর ধরে রাজ্য শাসনকারী সুলতানের বয়স হয়েছিল ৪৯। তাঁর মরদেহ ব্রুসায় স্থানান্তরিত করা হয়।
বহুবিধ গুণাবলি ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ। তিনি কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। শান্তির সময়ে তিনি সপ্তাহে দুই দিন কবিদের মজলিসে উপবেশন করতেন। তাদের ভাতা দিতেন-যাতে তারা জীবিকার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত না হয়ে কাব্যসাধনায় নিমগ্ন হতে পারেন। সুলতান নিজেও কাব্যচর্চা করতেন। কবিরা সুলতানকে এতই ভালোবাসতেন, তারা তাঁর সাথে যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করতেন।
তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, ধর্মপরায়ণ, সৎ, সাহসী, সহিষ্ণু, সদয়, মুক্তহস্ত ও মহামান্য সুলতান। শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁর চেয়ে বেশি উৎসাহ আর কেউ দেয়নি। তাঁর আমলে জনগণ সুখী ও নিরাপদ ছিল। যখনই তিনি কোনো জনপদ জয় করতেন, সেখানে তিনি মসজিদ, মাদরাসা, সরাইখানা, ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতেন। আরকানা নদীর ওপর তিনি ৩৯২ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করেন। সেতুটি নির্মাণ করতে ১৬ বছর সময় লেগেছিল। প্রতিবছর তিনি মক্কা-মদিনা ও জেরুজালেমের ধার্মিক বাসিন্দাদের ৩৫০০ স্বর্ণমুদ্রা দান করতেন। যুদ্ধ ও সন্ধিতে তাঁর সততা ছিল অতুলনীয়। তিনি কখনো সন্ধি ভঙ্গ করেননি। সে যুগের খ্রিষ্টান রাজারা সততায় তাঁর ধারে কাছেও ছিল না। তাঁর উদারতাও প্রশংসনীয়। হাঙ্গেরির রাজা লেডিসলাস যেখানে নিহত হন, সেখানে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করে তার সাহসের প্রশংসা ও দুর্ভাগ্যের জন্য শোক প্রকাশ করে শিলালিপি খোদাই করেন।
সেই যুগে তাঁর ন্যায় স্নেহপরায়ণ ও দয়াদ্র শাসকের দেখা মেলা ভার। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অনেক সময় শাসকরা নির্দয় আচরণ করেন। সুলতান মুরাদ কখনো তা করেননি। ভ্রাতৃহত্যা তো দূরের কথা; তিনি তাদের সসম্মানে ও সস্নেহে পালন করেছেন। জামিয়ানের এক রাজার সাথে সুলতানের এক বোনের বিয়ে হয়। বিদ্রোহী তৎপরতার কারণে সুলতান তাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন, কিন্তু বোনের খাতিরে ভগ্নীপতিকে ক্ষমা করে দেন। তাঁর আরেক ভগ্নিপতি মাহমুদ চেলেবি হুনিয়াডির কাছে বন্দি ছিলেন। মুখ্যত তাঁকে উদ্ধারের জন্যই তিনি সেজেদিনের সন্ধি করেন।
সুলতান পুত্রস্নেহে এত কাতর ছিলেন, ১৪ বছর বয়সি পুত্রের হাতে সালতানাতের দায়িত্ব দিয়ে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। আবার পুত্র বিপদে পড়লে নির্জনতা ছেড়ে রাজদণ্ড গ্রহণ করেন। রাজার পক্ষে এমন স্নেহপরায়ণতা জগতে দুর্লভ। সত্যিই তিনি মহামতি। ৭৮
সুলতানের সম্পর্কে সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ কানকুনডাইলাস বলেন— 'তিনি ছিলেন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ।'
ইতিহাসবিদ ভন হ্যামার বলেন—
'সুলতান মুরাদ ন্যায়পরায়ণতা ও গৌরবের সাথে ৩০ বছর রাজ্য শাসন করেছেন। তিনি ধর্মভেদ বিবেচনায় না এনে সকল নাগরিকের সাথে ন্যায়ানুগ আচরণ করতেন। যুদ্ধে ও শান্তিতে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেন। তিনি সন্ধিকে প্রাধান্য দিতেন। তবে প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে কুণ্ঠিত হতেন না। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের থেকে তিনি কঠিন প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর বিচক্ষণতা এক মুহূর্তের জন্যও লোপ পায়নি।'৭৯

টিকাঃ
৬৬. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩; আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০; Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৭. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩-৫৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০; Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৮. Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৯. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ ১৫৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১২১
৭০. এটি কোসেভু শহর, যা বেলগ্রেডের পূর্ব দিকে অবস্থিত।
৭১. Vasiliev, op.cit. p. 641; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৫
৭২. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬-৫৭
৭৩. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫
৭৪. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭-৫৮; Marsh, op.cit. p. 548
৭৫. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭
৭৬. আক মানে সাদা আর কারা এর অর্থ কালো; অনেক উসমানি শহরের নামে আক ও কারা শব্দ দেখা যায়। আক হিসার মানে সাদা দুর্গ বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-৫৯
৭৮. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩০; হারব, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৬
৭৯. qt. in উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩০।

📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 মুহাম্মদ ফাতিহ : প্রাথমিক জীবন

📄 মুহাম্মদ ফাতিহ : প্রাথমিক জীবন


[পিতা: দ্বিতীয় মুরাদ, মাতা: হুমা খাতুন, জন্ম: ১৪২৮, শাসনকাল : ১৪৫১-১৪৮১, মৃত্যু : ১৪৮১]

সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ও হুমা খাতুনের পুত্র মুহাম্মাদ ১৪২৮ (কারও মতে ২০ এপ্রিল, ১৪২৯) সালে (৮৩৩ হিজরি) ইদিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উসমান বংশের সপ্তম সুলতান। ইতঃপূর্বে মুহাম্মাদ নামে আরও একজন সুলতান ছিলেন বলে তিনি 'দ্বিতীয় মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত। কনস্ট্যান্টিনোপল বিজেতা এই সুলতানের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উপাধি হলো 'ফাতিহ'। আরবি বিশেষণ 'ফাতিহ'-এর অর্থ হলো বিজেতা। তাঁর আরেকটি উপাধি হলো 'আবুল খায়রাত' (নেক আমলের জনক)।
বাল্যকাল থেকেই মুহাম্মাদ বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি যেমনি ছিলেন শক্তিশালী ও সাহসী, তেমনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচলিত শাখায়ও তাঁর বুৎপত্তি ছিল। প্রিন্স কলেজে অধ্যয়নকালে জ্ঞানচর্চায় তাঁর প্রতিভার বিকাশ লক্ষ করা যায়। সেকালের সেরা বিদ্বানদের তাঁর শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তিনি ছিলেন বহুভাষী। মাতৃভাষা তুর্কি ছাড়াও আরও ছয়টি ভাষা জানতেন। যেমন-আরবি, ফারসি, হিব্রু, ল্যাটিন, গ্রিক ও স্লাভ। খ্রিষ্টান শিক্ষক ইউরগিওস আমিরুটজেস (Yorgios Amirutzes)-এর কাছে তিনি ক্লাসিক্যাল গ্রিক শেখেন। সিরিআকো অ্যানকোনিট্যাটো [Ciriaco Anconitato (1391-1455)] নামে এক ইতালীয় শিক্ষকের থেকে তিনি লাতিন ভাষা, প্রাচীন ইতিহাস ও ভূগোল অধ্যয়ন করেন। গিওভানি মারিও অ্যানজিয়েলেলো (Giovanni Mario Angiolello) নামে এক ভেনিসিয়ান পরিব্রাজক ও ইতিহাসবিদদের কাছে তিনি ইউরোপ ও ইতালির ইতিহাস অধ্যয়ন করেন।
ডলফিন লিখেছেন, শাহজাদা মুহাম্মাদ তাঁর শিক্ষকদের কাছে গ্রিক ইতিহাসবিদ Laertius ও Herodotus এবং রোমান ইতিহাসবিদ Livy ও Quintus Curtius-এর গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করেন। এভাবে তিনি আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, জুলিয়াস সিজারসহ অন্যান্য সম্রাটদের জীবনী এবং ফ্রান্স, লম্বার্ডির রাজা ও পোপদের কাহিনি গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করেন। ৮০
জনৈক বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদের বর্ণনায় দেখা যায়-সুলতান মুহাম্মাদ সমকালীন বিজ্ঞানের নানা শাখা, বিশেষত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলের জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন। ইউরোপের রাজ্যেগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করে তিনি একটি বড়ো মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। গণিতশাস্ত্রেও তাঁর মোটামুটি জ্ঞান ছিল। পিতার মতো সুলতান ফাতিহও মৌলভি ছিলেন। ইসলামি শাস্ত্র শিক্ষাদানের জন্য পিতা সুলতান মুরাদ অনেক শিক্ষক নিয়োগ দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমির আদিল চেলেবি, শাইখ আহমদ কুরানি, শাইখ আক শামসুদ্দিন, শাইখুল ইসলাম মওলা খসরু, নিশানজি মোল্লা সিরাজুদ্দিন পাশা প্রমুখ। এই শিক্ষকদের মধ্যে শাইখ আক শামসুদ্দিন ও শাইখ আহমদ কুরানির বিপুল প্রভাব ছিল সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের ওপর। বিজয়াভিযানের আলোচনায় এ বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
শিল্পকলার প্রতি তাঁর আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায় ইতালীয় চিত্রকরদের আমন্ত্রণ জানানো ও তাদের পুরস্কৃত করার ঘটনায়। ফাতিহ কর্তৃক নিমন্ত্রিত চিত্রকরদের মাঝে ছিলেন বিখ্যাত ভেনিসিয়ান চিত্রকর ম্যাথু পাসি ও জেন্টাইল বেলিনি। ৮১ প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চা সুলতানের জীবনে ব্যর্থ হয়নি। পরবর্তী জীবনে শাসনকাজে ও বিজয়াভিযানে এ অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল।
তুর্কি প্রাসাদের রেওয়াজ অনুসারে কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মাঝে বেড়ে উঠেন মুহাম্মাদ। ভবিষ্যতের তুর্কি সুলতানের জন্য শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস ও ভাষাজ্ঞান যথেষ্ট ছিল না; সামরিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন ছিল। তাই সেকালের দক্ষ সমরবিদ ও কৌশলবিদগণকে তাঁর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। সমরবিদ্যায় তাঁর প্রশিক্ষক ছিলেন উজির সারিজা কাসিম পাশা (১৪৬০), দামাদ জাগানুশ মুহাম্মাদ পাশা (১৪৬২), খাদার চেলেবি (১৪৫৯) ও খাদিম সুলায়মান পাশা (১৪৯৩)। এভাবে কঠোর সামরিক, বৈষয়িক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেড়ে উঠেন ভবিষ্যতের উসমানি সুলতান শাহজাদা মুহাম্মাদ।
প্রথমবার সিংহাসন লাভ: ১৪৪৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে শাহজাদা মুহাম্মাদ প্রথমবারের মতো সিংহাসনে আসীন হন, যখন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ সিংহাসন ত্যাগ করে আয়দিনে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। ওই বছর সুলতান মুরাদ হুনিয়াডির সাথে শান্তিচুক্তি করেন। এর কিছুদিনের মধ্যে সুলতানের বড়ো পুত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আলাউদ্দিন মারা যান। এ শোকে সুলতানের কাছে দুনিয়াদারি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। মেজোপুত্র মুহাম্মাদের হাতে ক্ষমতা ত্যাগ করে তিনি মুত্তাকি পরহেজগার লোকদের সাথে সময় কাটাতে থাকেন। তবে শাহজাদা মুহাম্মাদের এই ক্ষমতারোহণ মোটেও স্থায়ী হয়নি।
ওই বছরই হুনিয়াডি বিদ্রোহ করলে সালতানাতের কল্যাণকামীরা মহা দুর্যোগের পূর্বাভাস দেখে সুলতানকে ক্ষমতায় ফিরে আসার অনুরোধ জানান। মুরাদ রাজদণ্ড গ্রহণ করে হুনিয়াডিকে উপযুক্ত শাস্তি দেন। ১৪৪৫ সালে সুলতান আবারও ক্ষমতা ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এবার জেনিসেরি বিদ্রোহের কারণে তাঁর অবসর নেওয়া হয় না।
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের ক্ষমতারোহণ : অবশেষে ১৪৫১ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের মৃত্যু হলে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মাদ ক্ষমতারোহণ।
আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কার: ক্ষমতারোহণের সাথে সাথে সুলতান মুহাম্মাদ প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো সংস্কারে মনোযোগী হন। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয় এমনভাবে নির্ধারণ করেন-যাতে অপচয়, অপব্যয় ও বিলাসিতার পথ রুদ্ধ হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের উন্নয়ন ও সংস্কার সাধন, তাদের বেতন বাড়ানো এবং সমকালীন সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হয়।
তারপর তিনি প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার প্রতি মনোযোগী হন। কয়েকজন সাবেক শাসককে স্বপদে বহাল রাখেন। দায়িত্ব পালনে যাদের ব্যাপারে ত্রুটির অভিযোগ এসেছিল, তাদের অপসারণ করেন। এভাবে অভ্যন্তরীণ সংস্কার সাধন শেষে তিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতি মনোযোগী হন; বহু বছর ধরে তাঁর পূর্বপুরুষরা যে শহর জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন।
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের জীবনে সর্বাধিক কৃতিত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল জয়। এ বিষয়টি এ বইয়ের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সর্বাধিক বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ শহর কনস্ট্যান্টিনোপলের ওপর প্রথমে কিছুটা আলোচনা করা দরকার।

টিকাঃ
৮০. Zorzi Dolfin, "Coronaca" (ff. 313-322), in J. R. Melville Jones, The Siege of Constantinopole: Seven Contemporary Accounts, p. 126.
৮১. Edward Gibbon, The History of the Decline and fall of the Roman Empire, v. 12, p. 8; George Phrantzes, 93-95 qt in উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮১, ১৮৪

📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 বিশ্রুত নগরী কন্সট্যান্টিনোপল

📄 বিশ্রুত নগরী কন্সট্যান্টিনোপল


বিশ্রুত নগরী কনস্ট্যান্টিনোপল! কনস্ট্যান্টিনোপলের পূর্বনাম বাইজেন্টিয়াম এবং বর্তমান নাম ইস্তাম্বুল। এই শহরের ঐতিহ্য, ঐশ্বর্য ও গৌরব রূপকথাকেও হার মানায়। আড়াই হাজার বছর ধরে এটি নানা ধর্ম, সংস্কৃতি ও শাসকগোষ্ঠীর দ্বন্দ্বমুখর কল্লোল অবলোকন ও সহ্য করে সগৌরবে টিকে আছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় এটিকে পৃথিবীর সর্বাধিক আকাঙ্ক্ষিত শহর বলে গণ্য করা হতো। এ শহরের প্রতিষ্ঠার আদি বৃত্তান্ত-কিছুটা ঐতিহাসিক বিবরণ আর কিছুটা কিংবদন্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রাচীনকালে বসফোরাস প্রণালির তীরে বাইজেন্টিয়াম (Byzantium) নামে একটি শহর ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৬৫৭ সালে একদল গ্রিক অভিবাসী মেগারা শহর থেকে এসে এখানকার থ্রাসিয়ান মেষচালক জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে বসতি স্থাপন করে। তাদের নেতার নাম ছিল বাইজাস (Byzas)। অভিবাসীদের সর্দারের নামানুসারে শহরটির নাম রাখা হয় বাইজেন্টিয়াম। অতি অল্প সময়ের মধ্যে নগরটি উন্নতি ও সমৃদ্ধির চূড়ায় উপনীত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত হয়।
আয়তনে শহরটি খুব একটা বড়ো ছিল না। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রতিরক্ষার গুণে এটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর পোতাশ্রয়ে বিপুলসংখ্যক জাহাজ নোঙর করার সুযোগ থাকায় অল্পদিনের মধ্যে বাইজেন্টিয়াম বর্ধিষ্ণু বন্দরে পরিণত হয়। কৃষ্ণসাগরের প্রবেশপথে অবস্থানের সুযোগে বন্দরটি প্রাচীনকালে ওই অঞ্চলের নৌবাণিজ্যের বিরাট অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। শহরের উত্তরে প্রলম্বিত উপসাগর 'গোল্ডেন হর্ন' নামে পরিচিতি লাভ করে। কারণ, এখানে উৎকৃষ্ট মানের প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এবং নানা দেশের পণ্যবাহী জাহাজ এখানকার পোতাশ্রয়ে আশ্রয় গ্রহণ করত। ৮২
মূল শহরটি ছিল ত্রিভুজাকৃতির। দক্ষিণ কোনায় আছে শৈলান্তরীপ, যা থ্রাসিয়ান মূলভূমি হতে বেরিয়ে এশিয়ান অংশের দিকে ঢুকে পড়েছে। শহরটির দক্ষিণে মর্মর সাগর, উত্তরে গোল্ডেন হর্নের সংকীর্ণ খাঁড়ির জলরাশি (৬ মাইল বা ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ); ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রণালি তথা বসফোরাসের তীরে এর অবস্থান। এই জলখণ্ড এশিয়া ও ইউরোপকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং কৃষ্ণসাগরের জলরাশিকে মর্মর সাগরে ফেলছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাইজেন্টিয়াম ছিল আক্ষরিক অর্থেই দুর্লঙ্ঘ ও দুর্ভেদ্য। ৮৩
প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত বন্দরনগরীটি স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ববর্তী জাতিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ফলে এটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এশীয় ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর লড়াই লেগেই থাকত। তাই শহরটির হাতবদলের বিবরণ অনেক দীর্ঘ। এখানে অতি সংক্ষেপে তা উল্লেখ করা হচ্ছে।
পারস্যসম্রাট প্রথম দারিউস (শাসনকাল ৫২২-৪৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) ৫১২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বাইজেন্টিয়াম দখল করে নেন। আইওনিয়ান বিদ্রোহের ফলে ৪৯৬ সালে নগরটি পারস্যরাজের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। তবে অচিরেই আবারও প্রাচ্যশক্তিটি বাইজেন্টিয়ামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কয়েক বছর পর (৪৭৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এথেন্সের সামরিক নৌ-বহর সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধের সময় এথেন্সের প্রভাব খর্ব হলে বাইজেন্টিয়াম চলে যায় আরেক নগররাষ্ট্র স্পার্টার নিয়ন্ত্রণে। এথেন্সের জেনারেল আলসিবিয়াডেস শহরটি পুনর্দখল করেন। তবে এথেন্সের এবারের কর্তৃত্ব স্বল্পস্থায়ী হয়েছিল। কারণ, ৪০৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে শহরটি আবারও স্পার্টার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের প্রারম্ভে মেসিডোনিয়ান বীর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট বাইজেন্টিয়াম দখল করেন। মহাবীরের মৃত্যুর পর মেসিডোনিয়ান সাম্রাজ্য খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার সুযোগে বাইজেন্টিয়াম স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হয়।
তারপর নগররাষ্ট্রটি রোমের সাথে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হয়; কিন্তু অচিরেই রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ান (শাসনকাল: ৬৯-৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) চুক্তি ভঙ্গ করে বাইজেন্টিয়াম দখলে নেন। ১৯৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট সেপটিমিয়াস সেভেরাস (Septimius Severus, 193-211) শহরটি দখল করে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালান। তখন বাইজেন্টিয়ামের বহু নাগরিক হত্যা, নগরপ্রাচীর ও দালানকোঠা ধ্বংস করা হয় এবং এর বাণিজ্যিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অভিযোগ করা হয়- সেপটিমিয়াস সেভেরাস ও সিরিয়ার শাসক পেসেনিয়াস নাইজারের (Pescennius Niger) মধ্যকার গৃহযুদ্ধে বাইজেন্টিয়াম সম্রাটের প্রতিপক্ষকে সাহায্য করেছিল।
রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস (২৬৮-২৭০)-এর আমলে বাইজেন্টিয়ামের বাসিন্দারা গথিক আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। সম্রাট ডিউক্ল্যাসিয়ানের (২৮৪-৩০৫) মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নির্ধারণ করতে গিয়ে কনস্ট্যান্টাইন ও তার প্রতিপক্ষরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় প্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট লিসিনিয়াস বাইজেন্টিয়ামে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাই শহরটি কনস্ট্যান্টাইনের রোষের শিকার হয়। ৩২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তার হাতে নগরটি পদানত হয়। ফলে কনস্ট্যান্টাইন দ্যা গ্রেট রোমান সাম্রাজ্যের উভয় অংশ—তথা পূর্ব ও পশ্চিম অংশের নিরঙ্কুশ শাসকে পরিণত হন। ৮৪ সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন দ্যা গ্রেট (শাসনকাল : ৩০৬-৩৩৭) কর্তৃক জয়ের পর বাইজেন্টিয়ামের উপর্যপুরি হাতবদলের ধারা সমাপ্ত হয়। এরপর শহরটি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করে।
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের গোড়া হতেই রোমান সম্রাটগণ রাজধানী পরিবর্তনের কথা চিন্তা করছিলেন। তখন বহিঃশত্রুর আক্রমণে রোমান সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্বর জাতিগুলো বিভিন্ন সীমান্তে হামলা করে গল, রাইন ও দানিয়ুবসহ বহু প্রদেশে নৈরাজ্য ছড়িয়ে দিয়েছিল। অপরদিকে পূর্ব সীমান্তে সাসানিরা অগ্রসর হচ্ছিল। উত্তর ও পূর্ব সীমান্তে বর্বর জাতিগুলোর উৎপাতও চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। সম্রাট ক্লডিয়াস (২৬৮-২৭০) তো কপটিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে মারা যান। আর সম্রাট ভ্যালেরিয়ান (২৫৩-২৬০) জীবনের শেষ অধ্যায় অতিবাহিত করেন পারস্যের বন্দিশালায় (ফাহমি, ৪৫-৪৬)। সুদূর রোম হতে দানিয়ুব ও ফোরাত তীরের দূরবর্তী সীমানা সুরক্ষা করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
তাই এটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল যে, রোমান সম্রাটরা রাজধানী পরিবর্তনের চিন্তা করেছিলেন। এ ব্যাপারে প্রথম ভাবনা আসে সম্রাট ডিউক্ল্যাসিয়ানের (২৮৪-৩০৫) মাথায়। তিনি রাজধানী স্থাপন করেন নিকোমিডিয়ায়—যা মর্মর সাগরের এশীয় তীরে অবস্থিত ছিল। পরবর্তী সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনও এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, রাজধানী হিসেবে রোম অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। তবে নিকোমিডিয়া তার পছন্দ হলো না। তিনি বাইজেন্টিয়ামকে রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেন। বিরাট বন্দর ও নিরাপদ পোতাশ্রয়ে সমৃদ্ধ শহরটি এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তা ছাড়া এটি কৃষ্ণসাগরের নৌ-বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করে। অতএব, দুই মহাদেশে বিস্তৃত সাম্রাজ্যের রাজধানী বানানোর জন্য এর চেয়ে বেশি উপযুক্ত স্থান আর হতে পারে না।
৩২৪ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টিয়ামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে নগর পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন। রোম শহরের নকশা ও পরিকল্পনার সচেতন অনুকরণে বাইজেন্টিয়ামের সংস্কার কাজ শুরু হয়। পুরোনো শহরটি ছিল চারটি টিলার ওপর, সংস্কারের সময় তিনটি নতুন টিলার ওপর নগর সম্প্রসারণ করা হয়। টিলাগুলো ছিল পূর্ব হতে পশ্চিমে ক্রমশ উঁচু এবং উপত্যকা দ্বারা বিচ্ছিন্ন। সপ্ত টিলায় অবস্থিত বাইজেন্টিয়ামকে রোমের ন্যায় ১৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্ত করা হয়।
সম্রাট নতুন রাজধানীর সৌন্দর্যকরণে বিন্দুমাত্র কসুর করেননি। রোম, এথেন্স, এন্টিয়ক ও সিসিলি হতে বহু নিদর্শন এনে এখানে স্থাপন করা হয়। প্রতিটি টিলার শীর্ষে কোনো না কোনো ভাস্কর্য বা শানদার প্রাসাদ ছিল—যা দ্বারা সেটি চিহ্নিত হতো। সংস্কারের পর বাইজেন্টিয়াম শহরের আকার তিনগুণ বেড়ে যায়। সম্রাট সেভেরাস যে হিপোক্রমের (বর্তমানে আত ময়দানি) নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন, সেটি আজ পূর্ণতা পায়।
নবনির্মিত স্থাপনার মধ্যে ছিল একটি বিশাল প্রাসাদ, আইনসভার অধিবেশনকক্ষ ও কয়েকটি চার্চ। প্রতিদ্বন্দ্বী শহরগুলো হতে ভাস্কর্য এনে তা বাইজেন্টিয়ামের রাস্তায় স্থাপন করে নগরের শোভা বর্ধন করা হয়। এভাবে পৌত্তলিক রোমান শহরের আদলে নির্মাণ ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার পর ঈপ্সিত রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জনের লক্ষ্যে নতুন রাজধানীর নাম রাখা হয় ‘নয়া রোম’।
কনস্ট্যান্টাইন যেন ইতালির রোমকে বাইজেন্টিয়ামে নিয়ে এলেন। তবে স্থপতির নাম চিরস্থায়ী করার জন্য ‘কনস্ট্যান্টিনোপল’ নামটিও চালু হয়। কালের আবর্তে ‘নয়া রোম’ নামটি বিলুপ্ত হয়ে ‘কনস্ট্যান্টিনোপল’ই স্থায়ী হয়। নতুন রোমান রাজধানীর অভিষেক হয় ১১ মে, ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে। আর সম্রাটের অভিষেক সম্পন্ন হয় হিপদ্রুম স্কয়ারে—যা ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে এখনও টিকে আছে। ৮৫
সম্রাটের অভিষেক অনুষ্ঠানাদি ৪০ দিন ধরে চলে। এই প্রথমবারের মতো রোমান সম্রাটের অভিষেক অনুষ্ঠানে খ্রিষ্টধর্মের আচার পালন করা হয়। কনস্ট্যান্টাইন প্রথম রোমান সম্রাট-যিনি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন (৩১২ খ্রিষ্টাব্দ)।
রাজধানী স্থানান্তরের পর রোমের প্রশাসনযন্ত্র সম্পূর্ণরূপে কনস্ট্যান্টিনোপলে স্থানান্তরিত হয়। তাদের অনুকরণে সাম্রাজ্যের নানা অংশের বণিকশ্রেণি, সৈনিকদল ও সম্পদশালী ব্যক্তিরা নতুন রাজধানীতে বসতি স্থাপন করেন। অচিরেই নতুন রাজধানীতে ৪০০ সুরম্য প্রাসাদ ও প্রায় দেড় শতাধিক স্নানাগার তৈরি হয়। ক্রমে ক্রমে শহরের বাসিন্দা বেড়ে যায় এবং কনস্ট্যান্টিনোপলের কাছে রোম বিবর্ণ হয়ে যায়।
কনস্ট্যান্টাইনের আমলের স্থাপনা বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অবশিষ্টাংশের মধ্যে রয়েছে-সাগরের নিকটে সেন্ট আইরিনের গির্জা এবং হেপদ্রুম স্কোয়ারে স্থাপিত সর্পস্তম্ভ; এটি কনস্ট্যান্টাইন রোমের প্রাচীন নিদর্শনের অবশিষ্টাংশ হতে এনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে টিলাশীর্ষের কিছু রোমান স্থাপনা সংস্কার করা হয় এবং তুর্কি আমলে কিছু নতুন স্থাপনাও নির্মিত হয়। সপ্ত টিলার শীর্ষে রোমান ও তুর্কি আমলে স্থাপিত উল্লেখযোগ্য স্থাপনার বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো (গোল্ডেন হর্ন সংলগ্ন শৈলান্তরীপের চূড়াটিকে প্রথম টিলা ধরে পশ্চিমাভিমুখী বিবরণ)-
প্রথম পাহাড় এক্রোপলিস, আয়া সোফিয়া, চার্চ অব সেন্ট ইরেনি, কিচুক আয়াসোয়া মসজিদ, সোকুল্লু মেহমেত পাশা মসজিদ, প্রথম আহমদ মসজিদ (ব্লু মস্ক), তৃতীয় আহমদ ফোয়ারা, জাদুঘর, চিনিলি কিওস্ক (প্যাভিলিয়ন অব টাইলস), ব্যাসিলিকান চৌবাচ্চা (ইয়েরেবাটান সরাই), হিপদ্রুম (সুলতান আহমেত ময়দানি), তোপকাপি প্রাসাদ (সেরাগ্লিও), মর্মর সাগর প্রাচীর।
দ্বিতীয় পাহাড় নুর উসমানিয়ে মসজিদ, কলাম অব কনস্ট্যান্টাইন, বড়োবাজার।
তৃতীয় পাহাড় ভেফা কিলিস মসজিদ, দ্বিতীয় বায়েজিদ মসজিদ, লালেই মসজিদ, শেহজাদ মসজিদ, সুলাইমান মসজিদ ও সমাধি, বোদরুম মসজিদ, কালেন্দারহানে মসজিদ (আকাটালেপটস মঠ), অ্যাকুউডাক্ট অব ভ্যালেন্স।
চতুর্থ পাহাড় ফাতিহ মসজিদ, মোল্লা জাইরেক সমজিদ, এস্কি ইমারত মসজিদ।
পঞ্চম পাহাড় আহমদ পাশা মসজিদ, গুল মসজিদ, ফেতহিয়ে মসজিদ, চার্চ অব সেন্ট মেরি অব দ্যা মোঙ্গলস, গ্রিক প্যাট্রিয়ার্খাল চার্চ অব সেন্ট জন।
ষষ্ঠ পাহাড় কারি মসজিদ, মিহরিমাহ মসজিদ, আড্রিয়ানোপল গেট, তেকফুর সরাই (প্যালেস অব কনস্ট্যান্টাইন)।
সপ্তম পাহাড় হেকিমউগ্ন আলি পাশা মসজিদ, রমজান এফেন্দি মসজিদ, সেভেন টাওয়ার ক্যাস্টল, কোচা মোস্তফা পাশা মসজিদ, ইমরাহর মসজিদ। ৮৬

নগরপ্রাচীর নগরপ্রাচীরের বর্ণনা ব্যতীত কনস্ট্যান্টিনোপলের বিবরণ অপূর্ণ রয়ে যাবে। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল সুরক্ষিত শহর। তবুও বাইজেন্টাইন সম্রাটগণ প্রাচীর নির্মাণ করে রাজধানীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। প্রাকৃতিক সুরক্ষা ও নগরপ্রাচীর মিলে কনস্ট্যান্টিনোপলকে আক্ষরিক অর্থেই দুর্ভেদ্য করে তুলেছিল। রোমান আমলে নির্মিত প্রাচীরের নিদর্শন এখনও ইস্তাম্বুলে দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে কনস্ট্যান্টিনোপলের নগরপ্রাচীর মাত্র একবার লঙ্ঘন করা সম্ভব হয়েছিল। আর তা করেছেন তুর্কি সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ। তাঁর প্রাচীর ভাঙার কাহিনিই বর্তমান গ্রন্থের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। কনস্ট্যান্টিনোপলের নিরাপত্তায় দুটি প্রাচীর ও একটি পরিখা খনন করা হয়। অন্তঃপ্রাচীর নির্মাণ করা হয় ৪১৩ খ্রিষ্টাব্দে আর বহিঃপ্রাচীর ৪৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। ভেতরের প্রাচীরটি ৩০ ফুট (৯ মিটার) উঁচু ও ১৬ ফুট চওড়া; প্রতি ১৮০ ফুট অন্তর রয়েছে ৬০ ফুট উঁচু টাওয়ার। বহিঃপ্রাচীরে ৯২টি দুর্গকূট নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে ৫৬টি এখনও অক্ষত রয়েছে। ৮৭
সমুদ্রপ্রাচীর নির্মিত হয়েছিল ৪৩৯ খ্রিষ্টাব্দে। এটির উচ্চতা ছিল ৩০ ফুট। গোল্ডেন হর্নের সংলগ্ন প্রাচীরের কিছু অংশ ছাড়া বাকি অংশের অস্তিত্ব এখন আর নেই। এ প্রাচীরে ১১০টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং ১৪টি গেট ছিল।
মর্মর সাগরের দিকে রয়েছে আরেকটি সমুদ্রপ্রাচীর-যেটি সেরাগ্লিও পয়েন্ট হতে পাঁচ মাইল এগিয়ে গিয়ে উপদ্বীপের গোড়ার কাছাকাছি স্থানে বাঁক নিয়ে স্থলপ্রাচীরের সাথে মিলেছে। এটিতে ১৮৮টি টাওয়ার ছিল। অবশ্য ওগুলো মাত্র ২০ ফুট উঁচু ছিল। কারণ, মর্মর সাগরের ঢেউ শত্রুর অবতরণের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরক্ষা দিত।৮৮ এই দিকের প্রাচীরের বৃহদাংশ এখনও টিকে আছে।
কনস্ট্যান্টিনোপল যে সাতটি পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, তার সবগুলো ছিল নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে। নগরপ্রাচীর ও সমুদ্রপ্রাচীর কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে শত শত বছর ধরে বাইজেন্টাইন রাজধানী বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও অবরোধ উপেক্ষা করে টিকে ছিল।

মিশ্র সংস্কৃতির সংশ্লেষ রোমান স্থাপত্যশিল্প ও নগর পরিকল্পনার আলোকে নির্মিত হলেও কনস্ট্যান্টিনোপলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নিরঙ্কুশ প্রাধান্য ছিল না; বরং এটির ব্যক্তিত্ব, প্রথা, শিল্প ও স্থাপত্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। হেলেনিক সংস্কৃতির প্রাধান্যও ছিল লক্ষ্যণীয়। কারণ, এর বেশিরভাগ অধিবাসী ছিল গ্রিক বংশ্য; রোমান নয়।
এখানে এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাজধানী স্থানান্তরের পশ্চাতে আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল। আর তা হলো-সম্রাট কনস্টান্টাইন এমন একটি নগর প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেটিতে খ্রিষ্টীয় ছাপ থাকবে। দৃষ্টিনন্দন গির্জা ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর বসবাসের ফলে সম্রাটের সেই অভিপ্সা পূর্ণ হয়েছিল। তবে ইউরোপের বিভিন্ন পৌত্তলিক শহর হতে আমদানিকৃত ভাস্কর্য দ্বারা অলংকৃত রাজধানী শহরটির পক্ষে পরিপূর্ণরূপে পৌত্তলিক প্রভাব বর্জন করা সম্ভব হয়নি। কনস্ট্যান্টিনোপলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্ম খ্রিষ্টবাদ, শাসনব্যবস্থা রোমান এবং ভাষা গ্রিক; আরও ছিল পৌত্তলিক ধর্মমতের প্রতি সহনশীলতা এবং ইহুদিদের জন্য শুভ কামনা। মিশ্র সংস্কৃতির সংশ্লেষের এরচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হতে পারে! ৮৯

অর্থোডক্স খ্রিষ্টবাদের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল খ্রিষ্টবাদের ইতিহাসে প্রথম তিনশো বছর ছিল নির্যাতন, নিষ্পেষণ ও দেশান্তরের ইতিহাস। ইউরোপ ও এশিয়ার কোনো দেশেই খ্রিষ্টবাদ স্বীকৃত ধর্ম ছিল না। ফলে এ ধর্মের অনুসারীরা জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতো। কনস্ট্যান্টাইন শুধু খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণই করেননি; বরং তিনি এটিকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনশো বছরের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা ও পালিয়ে বেড়ানোর পর খ্রিষ্টানরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সময় পেলেন। পৌত্তলিক শহর ছেড়ে দলে দলে খ্রিষ্টানরা কনস্ট্যান্টিনোপলে আসতে থাকে। সম্রাটগণও নিঃসংশয়ে তাদের রাজধানীকে খ্রিষ্টবাদের রাজধানী বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজধানীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানানসই গির্জা নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। চতুর্দিক হতে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর আগমনে কনস্ট্যান্টিনোপল খ্রিষ্টানপ্রধান শহরে পরিণত হয়। সম্রাটগণের আগ্রহ ও উদ্যোগের বদৌলতে 'নয়া রোম' অচিরেই খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্য রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে; যদিও প্রাচ্যেরই অপর দুটি শহর তথা এন্টিয়ক ও আলেকজান্দ্রিয়া খ্রিষ্টবাদের আদি শহর হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল।
খ্রিষ্টবাদের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে কনস্ট্যান্টিনোপল। ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন খ্রিষ্টান-গির্জার ঐক্যের লক্ষ্যে প্রথম কাউন্সিল আহ্বান করেন। নাইসিয়া (বর্তমান ইজনিক, তুরস্ক) শহরে অনুষ্ঠিত এ কাউন্সিলে অ্যারিয়ানিজমের সমালোচনা করা হয়। ৩৮১ সালে কনস্ট্যান্টিনোপলেই অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি কাউন্সিল। এর মাধ্যমে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্থ বা প্রধান ধর্মযাজক পুরোহিততন্ত্রে পোপের অব্যবহিত পরের স্থান লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে আরও চারটি চার্চ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় কনস্ট্যান্টিনোপল শহরে।
১০৫৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমান ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স চার্চের বিভাজন চূড়ান্তরূপে সম্পন্ন হলে কনস্ট্যান্টিনোপল অর্থোডক্স চার্চের অবিসংবাদিত রাজধানীতে পরিণত হয়। ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিরা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে নেয়। তারপরও ইস্তাম্বুল খ্রিষ্টবাদের প্রাচ্য-রাজধানীর মর্যাদা হারায়নি। এখনও কনস্ট্যান্টিনোপল তথা ইস্তাম্বুলের প্যাট্রিয়ার্থ হন অর্থোডক্স চার্চের প্রধান।
কনস্ট্যান্টিনোপল-কেন্দ্রিক রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাংশ ধীরে ধীরে পশ্চিমাংশ হতে পৃথক বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে থাকে। সেইসঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যের নানা প্রান্ত হতে খ্রিষ্টানরা এখানে এসে বসবাস করতে থাকে। এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের বৈশিষ্ট্য এতটা স্বতন্ত্র হয়ে পড়ে যে, সম্রাট থিওডোসিয়াস দ্যা গ্রেট (৩৮৯-৩৯৫) তার মৃত্যুর পূর্বে সাম্রাজ্যকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দুই পুত্রের মাঝে বণ্টন করে দেন। একটি অংশ হয় পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য; এর রাজধানী রোম। আর অপর অংশটি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য; এর রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল।
এই বিভাজনের পর পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্বর জাতিগুলোর আক্রমণে ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রধানত এর প্রাকৃতিক সুরক্ষার কারণে এটি আরও প্রায় এক হাজার বছর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। ৯১

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের কারণ প্রায় এগারো শত বছর ধরে কনস্ট্যান্টিনোপল শহর, পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে টিকে ছিল। খ্রিষ্টান জাতির প্রতিরক্ষার শেষ রেখাও ছিল এই শহর। এই একাদশ শতবর্ষে এগারোটি রাজবংশ সাম্রাজ্য শাসন করেছে। সম্রাটগণের মাঝে কেউ ছিলেন প্রাজ্ঞ ও সুশাসক, কেউ-বা অত্যাচারী ও দুরাচারী। যে সাম্রাজ্যে অবিচার ও অনাচারের প্রাদুর্ভাব ঘটে, সেটির পতন অবশ্যম্ভাবী। তার ওপর বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চে মুসলিমদের উত্থান ক্ষয়িষ্ণু বনেদি সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করে। প্রতাপশালী সাম্রাজ্যটি একদিনে দুর্বল হয়নি। কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে এক পর্যায়ে পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়-এখন তা নিয়ে আলোচনা করব।
সম্রাট জাস্টিনিয়ানের (কার্যকাল : ৫২৭-৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) আমলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য গৌরবের চূড়ায় উপনীত হয়েছিল। তিনি বিশ্বনেতার আসনে সমাসীন হওয়ার উচ্চাভিলাষ পোষণ করতেন। তাই তিনি এশিয়ায় পারস্য সাম্রাজ্য ও ইউরোপে বর্বর জাতিগুলোর সাথে অব্যাহত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিজয়াভিযানে উত্তর আফ্রিকা সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। তিনি জাঁকঝমকপূর্ণ বহু প্রাসাদ ও কয়েকটি অনুপম গির্জা নির্মাণ করেন। ইস্তাম্বুলের অনন্য স্থাপনা 'আয়া সোফিয়া (Hagia Sofia)' এখনও তাঁর সময়ের নির্মাণ সৌকর্যের সাক্ষ্য বহন করে চলছে। এটির গম্বুজ ভূপৃষ্ঠ হতে ১৮০ ফুট উঁচু। আর মেঝে ছিল অলংকৃত চৌখুপি দ্বারা সজ্জিত; সিলিং ও দেয়ালে ছিল খ্রিষ্টধর্মের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির চিত্রকর্ম, শ্বেত মার্বেলের পিলারের ওপর ছিল খিলান। গির্জার বেদিতে স্বর্ণ ও রৌপ্যরেণুর প্রলেপ থাকায় তা চকচক করত।৯২
জাস্টিনিয়ানের শাসনামলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসে। সাংস্কৃতিক ধারায় রোমের প্রভাব হ্রাস করার জন্য গ্রিক ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়; পরিত্যক্ত হয় ল্যাটিন ভাষা। মোদ্দাকথা-শিল্প, স্থাপত্য, জীবনাচারসহ সকল বিষয়ে বাইজেন্টাইন রাজধানীর একটি স্বতন্ত্র ছাপ এ সময় ফুটে ওঠে-যা বাইজেন্টাইন শৈলী নামে পরিচিতি লাভ করে। এ নামকরণ যথার্থই ছিল; এতে প্রাচীন গ্রিক বা রোমান-কোনো সভ্যতারই অনুসরণ ছিল না। এ ছিল খাঁটি বাইজেন্টাইন।
ষষ্ঠ শতকে জাস্টিনিয়ানের নেতৃত্বে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সমৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠা, খ্যাতি ও দাপটের চূড়ায় পৌঁছে যায়। বড়ো বড়ো প্রদেশে কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হয়; বিশেষত এশিয়া মাইনর, সিরিয়া ও মিশরে। প্রদেশগুলোর রাজধানীর অর্থাৎ অ্যান্টিয়খ ও আলেকজান্দ্রিয়ার খ্যাতি কনস্ট্যান্টিনোপলের চেয়ে কম ছিল না। এগুলো শিল্প ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখান থেকে সারা বিশ্বে বস্ত্র, প্যাপিরাস, কাচ ও ধাতু-ঘট রপ্তানি করা হতো। আবার আফ্রিকা উপকূল, ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও চীনের মতো দূরবর্তী দেশ হতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানি করা হতো। নীলনদের বাণিজ্যপথের শেষপ্রান্ত ছিল মিশর। এশিয়ার স্থলপথের শেষ প্রান্ত ছিল সিরিয়া। তেমনিভাবে কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল আর্মেনিয়া ও কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যপথের শেষ সীমান্ত।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে সমুদ্রকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য বলা যায়। ভূমধ্যসাগরের উত্তর ও দক্ষিণ কূলব্যাপী বিস্তৃত ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই সম্রাটগণ নৌবাহিনীর গঠনের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষত ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গোল্ডেন হর্ন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নৌবাহিনী গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। তাদের শাসনব্যবস্থাটাই ছিল সাগরকেন্দ্রিক।
জাস্টিনিয়ান (৫৬৫), হিরাক্লিয়াস (৬৪১)-সহ মহান সম্রাটগণ সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা ও দ্বীপাঞ্চল জয়ে মনোযোগী ছিলেন। তারা মহাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না। ভূমধ্যসাগরে রোমানদের একচ্ছত্র আধিপত্যের আরেকটি কারণ ছিল-সাগরে তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অনেকটা আধুনিক যুগের প্রারম্ভে ব্রিটিশদের ন্যায়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল স্পেনের দক্ষিণ উপকূল, আফ্রিকার উত্তর উপকূল, সার্দিনা, কর্স, সিসিলি, ক্রিট, সাইপ্রাস, আলেকজান্দ্রিয়া, জেনোয়া, নাপোলি, দার্দানেলিস ও ক্রিমিয়া। সাম্রাজ্যের প্রভাব শুধু ভূমধ্যসাগরে সীমাবদ্ধ ছিল না; অন্যান্য সাগর ও তদ্‌সন্নিহিত অঞ্চলেও এর প্রভাব ছিল। বিষয়টা যেন এমন যে, সেই যুগে জলের পরাশক্তি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আর স্থলের পরাশক্তি পারস্য সাম্রাজ্য। আর এই দুই বড়ো সাম্রাজ্যের মাঝে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগেই থাকত। ৯৩
কাল-পরিক্রমায় কনস্ট্যান্টিনোপল সেই কালের বিশ্বসেরা রাজধানীতে পরিণত হয়। এই শহরের প্রাচুর্য, সমৃদ্ধি, গির্জা, রাজপ্রাসাদ-সবই ছিল অতুলনীয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এর লাইব্রেরিতে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য পুনর্জীবন লাভ করেছিল। সেই ত্রিভুজ পর্বতে-যাকে সাগরের জল আঘাত করত, আর সমুদ্রবায়ু পরশ বোলাত -এমন একটি মানবপ্রজন্ম গড়ে উঠল, নগরসভ্যতা বেঁচে রইল তাদের সাথে। তবে অধিকাংশ সম্রাট ছিলেন অনাচারী। এমনকী শ্রেষ্ঠজনরাও ছিলেন নিষ্ঠুর ও নির্মম। কিন্তু নাগরিকরা ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়। কৌশলগত অবস্থানে এটি ছিল অনন্য। প্রতিটি দিকের শত্রুদের ঠেকিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিল এই নগরী। একের পর এক আক্রমণ হয়েছে শহরটির ওপর: তাতার, বুলগার, হুন, গথিক ও স্লাভদের পক্ষ থেকে। কিন্তু চর্তুমুখী আক্রমণ ঠেকিয়ে ঠিকই টিকে ছিল কনস্ট্যান্টাইনের শহর।
কনস্ট্যান্টিনোপল যখন মর্যাদার শীর্ষে আরোহণ করছিল, তখন বর্বর জাতিগুলো ইউরোপ দখল করে নিয়েছে। রোমকেন্দ্রিক পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য তখন ডুবে গেছে বিশৃঙ্খলা, অজ্ঞতা ও বর্বরতায়। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অনুরূপ অবস্থার সৃষ্টি হতে বেশি সময় লাগেনি। সম্রাট জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য জবেহকৃত পাখির মতো হয়ে যায়-যে কিনা শেষবারের মতো লুটিয়ে পড়ার জন্যই কেবল উঠে দাঁড়ায়।
তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের চারদিকে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সম্রাট হিরাক্লিয়াসের (৬১০-৬৪১) আবির্ভাবে তারা দ্বিতীয়বারের মতো উঠে দাঁড়াতে সক্ষম। পারস্যের কবল হতে তিনি মিশর, সিরিয়া ও এশিয়া মাইনর পুনর্দখল করেন। রোমানদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, এ সময় দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে প্রবলভাবে আবির্ভূত হয় মুসলিম জাতি। তারা সামনে যা কিছু পায়, সবকিছুকে ঝড়ের বেগে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিলো। সমতল ও অসমতল সবকিছু ছিল তাদের কাছে সমান। একই সঙ্গে তারা মনোযোগ দিলো পারস্য ও রোমান এলাকায়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যভুক্ত মিশর, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকা অধিকার করে অতি অল্প সময়ের মাঝে। ফলে প্রাচীন সাম্রাজ্যটি বিশাল এক ভূখণ্ড হতে বঞ্চিত হয়-যা তাদের অব্যাহতভাবে জনবল, অর্থ ও বিভিন্ন উৎপাদন জোগান দিয়ে আসছিল।
শুধু আরব মুসলিমদের কারণেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়েছে-এমন নয়; উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে স্লাভ ও বুলগাররা বলকান দখল করে নিয়েছিল। তারা অব্যাহতভাবে বাইজেন্টাইন এলাকায় হামলা করত, এমনকী মাঝে মাঝে তাদের হামলা কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌঁছে যেত।
মুসলিম অভিযান শুরুর পূর্বে পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে লাগাতার লড়াইয়েও রোমানরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে তাদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের জয় সহজ হয়ে পড়েছিল। ইসলামের সৌন্দর্যের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ; বিজয়ালোচনায় যা সাধারণত উপেক্ষিত থাকে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বহু অঞ্চল ইতোমধ্যে মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ায় ওইসব এলাকার লোকজন ইসলামের সাম্যনীতি ও আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। ইসলামের নৈতিক প্রভাব ভগ্নাবশিষ্ট সাম্রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাম্রাজ্যটি ভেতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে টিকে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছিল। তা ছাড়া উপদলীয় সংঘাত, ধর্মীয় লড়াই মানুষকে দাস বানিয়ে রাখার মতো বিষয়গুলো তো ছিলই। ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া সাম্রাজ্য তাই তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। এর প্রমাণ হলো-একটি যুদ্ধ তথা ইয়ারমুকের যুদ্ধই (১৫ হিজরি/৬৩৬ সাল) যেভাবে সিরিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল, তেমনিভাবে ব্যাবিলন দুর্গের (২০ হিজরি/৬৪১সাল) বিজয়ের মাধ্যমে মিশর পদানত হয়। ৯৪
বিজিত এলাকার অধিবাসীদের তাদের ভূমিতে বহাল রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে সাবেক সাম্রাজ্যের পক্ষে কোনো বিদ্রোহ দেখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, তারা ইসলামের সৌন্দর্যে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন এবং পুরোনো সাম্রাজ্য এতটাই ভঙ্গুর ছিল যে, সেটির প্রতি জনগণের কোনো নৈতিক সমর্থন ছিল না। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন এবং ইসলামের অভাবনীয় প্রসারের আলোচনায় এই দিকটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
পরপর অনেকগুলো পরাজয়ের পর সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো ছিল না; গ্রাস করেছিল ব্যাপক দারিদ্র্য। ফলে সম্রাটকে যুদ্ধজাহাজ বিক্রি এবং খরচ কমানোর জন্য সৈন্য কমাতে হয়। শুধু তাই নয়; অনেকগুলো শহর ও বন্দর জেনোয়া ও ভেনিসের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। যার একটি উদাহরণ হলো, ১৪২৩ সালে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান শহর স্যালেনিকা ভেনিসিয়ান ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ৯৫

রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অবস্থা
পতনের প্রাক্কালে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল ষড়যন্ত্রের লীলাভূমি। রাজপ্রাসাদ ছিল লোভী ও ক্ষমতালিপ্পু অভিজাতদের দ্বারা পূর্ণ; জনগণের প্রতি যাদের কোনো দৃষ্টি ছিল না। ফলে অপশাসন ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। আর সাম্রাজ্যের কর্মচারীদের মাঝে বিশৃঙ্খলা ও অবহেলা বিস্তার লাভ করে। তবে আর্থিক দুরবস্থা সত্ত্বেও রাজপ্রাসাদের বিলাসিতায় কোনো ঘাটতি ছিল না।
রাজপরিবার ও অভিজাতদের বিলাসিতা ও সৌখিনতার আহ্লাদ পূরণের জন্য প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় কমানো হয়। ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে অত্যন্ত খোঁড়া যুক্তিতে নৌবাহিনী একপ্রকার পরিত্যক্ত হয়। এর ব্যবস্থাপনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়; তা ছাড়া এটি অপ্রয়োজনীয়ও বটে। আর্থিক সংকটের কারণে স্থলবাহিনীর বাজেট ও সৈন্যসংখ্যাও কমে যায়। ক্রমে ক্রমে সাম্রাজ্যের দেউলিয়াপনা সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়। ফলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ভাব-গাম্ভীর্য বিলুপ্ত হয়।
সাম্রাজ্যের করুণ অবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যায় সম্রাট পঞ্চম জন পেলিওলোগাসের অভিষেক অনুষ্ঠানের বিবরণে।
১৩৪৭ সালে সম্রাট পঞ্চম জন পেলিওলোগাসের অভিষেক অনুষ্ঠানে স্বর্ণ ও রৌপ্যের কোনো প্লেট ব্যবহার করা হয়নি; বরং মাটি ও টিনের প্লেট ব্যবহার করা হয়। সম্রাটের পোশাকে মণি-মুক্তার দানা ছিল না; বরং কিছু সাধারণ পাথরের দানা ছিল। আর্থিক দৈন্যদশায় পেলিওলোগাস বংশের শেষ সম্রাটগণ তাদের হিরা-জহরতসহ মূল্যবান ধাতু বিক্রয় করার পর কয়েক হাজার ডুকাটের জন্য সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড বিক্রি করতে থাকেন। তারপর তাদের অবস্থা এতটাই সঙ্গিন হয়ে পড়ে যে, ব্যবসায়ীদের কাছে বড়ো বড়ো শহর বিক্রি করতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে ইতঃপূর্বে সেলোনিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক দৈন্যদশা, অপশাসন, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার পাশাপাশি সাম্রাজ্যে প্লেগ এবং অন্যান্য ভয়ংকর রোগবালাই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে-যার প্রভাবে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। মহামারির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল ১৩৪৭ সালে; যখন 'কালো মৃত্যু' নামে পরিচিত মহামারি সমগ্র পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
১৪৩১ সালে বাইজেন্টাইন রাজধানী আরেকটি ভয়াবহ মহামারিতে আক্রান্ত হয়। ওই সময় এত বেশিসংখ্যক মানুষ মারা যায়, বহু পরিবারে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার মতো লোকও ছিল না।
সাম্প্রদায়িক বিভাজন কনস্ট্যান্টিনোপলের পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। ওই সময়ের খ্রিষ্টান বিশ্ব রোমান ক্যাথলিক ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স-এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অর্থোডক্স মতের অনুসারী ছিল, অপরদিকে রোম ছিল ক্যাথলিক ধর্মমতের রাজধানী। মতভেদের বিষয় গুরুতর না হলেও তা গভীরে প্রোথিত ছিল।
রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে কনস্ট্যান্টিনোপলের যাত্রা শুরুর আগে থেকেই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। তাই ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বের বিভাজন সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান ধর্মগুরু ছিলেন পোপ। অপরদিকে কনস্টান্টিনোপল কেন্দ্রিক অর্থোডক্স অংশের মুখ্য ধর্মবেত্তা ছিলেন প্যাট্রিয়ার্থ। রোমের পোপ কনস্টান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্থকে তার অধীন মনে করতেন। পক্ষান্তরে পোপকে নিজের সমানই মনে করতেন প্যাট্রিয়ার্থ। দুই ধর্মগুরুর রেষারেষির একটি নমুনা হলো, নবম শতকে পোপ প্রথম নিকোলাস কনস্ট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্খকে ধর্ম হতে বহিষ্কার করেন। প্রত্যুত্তরে প্যাট্রিয়ার্থও পোপকে বহিষ্কার করেন।
ধর্মীয় গোঁড়ামির পাশাপাশি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের ব্যাপক ছড়াছড়ি ছিল। সকল স্তরের মানুষ ধর্মীয় বিষয়ে তর্কবিতর্কে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়ে থাকত-তা তাদের অবিচ্ছেদ্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বিতর্কসভায় তার্কিক হিসেবে ধর্মবেত্তারা উপস্থিত থাকত, তবে দর্শক ও শ্রোতা হিসেবে সাধারণ মানুষ হাজির হতো। রোমান নাগরিকদের বড়ো একটি অংশ ধর্মতাত্ত্বিক গূঢ় আলোচনা এত বেশি উপভোগ করত যে, অনেক সময় তারা পার্থিব কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে থাকত। ধীরে ধীরে বৈষয়িক বিষয়াদিতে সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
পশ্চিমের লাতিন ধর্মমতের অনুসারী তথা ক্যাথলিকরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে দুই দৃষ্টিকোণে বিচার করত। একদিকে তারা মনে করত, এটি একটি খ্রিষ্টান সাম্রাজ্য-যা বিধর্মীদের হুমকির মুখে পতনোন্মুখ। অতএব, তাদের সাহায্য করা দরকার। অন্যদিকে তারা এটাও মনে করত, বাইজেন্টাইন ধর্মমত বৈধর্মে দুষ্ট এবং রোমের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী-যে কিনা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে যেকোনো মিশনারি তৎপরতার বিরোধী। অতএব, তাদের সাহায্য করা কোনো জরুরি ধর্মীয় কর্তব্যের আওতায় পড়ে না।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও ক্রুসেড যুদ্ধ
আনাতোলিয়ায় তুর্কি সালতানাত প্রতিষ্ঠার বহু আগেই ক্রুসেডের যুদ্ধ শুরু হয়। এখানে তা আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে তুর্কিদেরও কয়েকটি ক্রুসেডের লড়াই মোকাবিলা করতে হয়েছে। ক্রুসেডের যুদ্ধে মুসলিমদের সম্মিলিত খ্রিষ্টান বাহিনীর মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাই এমন ধারণা আসা অস্বাভাবিক নয়, ক্রুসেডের লড়াইগুলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে সাহায্য করেছে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা ছিল ভিন্ন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় বাইজেন্টাইনের খ্রিষ্টধর্মকে বৈধর্মের দোষে দুষ্ট বলে মনে করত। আর তাই ইউরোপকেন্দ্রিক ক্যাথলিক জোট পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কোনো উপকারে আসেনি; বরং ক্ষতিই করেছে। পশ্চিমের ক্যাথলিকরা সব সময় পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য কবজা করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করত। রবার্ট গুইসকার্ড (Robert Guiscard), তদীয় পুত্র বোহেমন্ড (Bohemond) এবং তাদের আত্মীয় সিসিলির রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড ও দ্বিতীয় উইলিয়াম অকপটে অনুরূপ অভিমত প্রকাশ করেছেন। উত্তরের অভিবাসীদের মত এই ছিল, তারা বাইজেন্টানিয়ানদের দক্ষিণ ইতালি হতে বিতাড়িত করেছিল। বাইজেন্টাইনদের প্রতিশোধ গ্রহণের পূর্বেই তারা তাদের নির্মূল করার বাসনা পোষণ করত। ব্যাবসা সম্প্রসারণের লোভে ভেনিসিয়ান বণিকরাও অনুরূপ অভিপ্সা পোষণ করত। আগুনে ঘৃতাহুতি মতো ব্যাপার ছিল এই যে, অনেকবার পোপতন্ত্রও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংসের প্রস্তুতি নিয়েছিল।
খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের দুই অংশের মাঝে বৈরিতার ফলাফল এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজনও নেই, প্রসঙ্গও নেই। ইসলামি প্রাচ্যকে পুনর্দখলের ক্রুসেডীয় প্রচেষ্টা বারংবার ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণও ছিল খ্রিষ্টানদের দুই সম্প্রদায়ের শত্রুতা ও ধর্মীয় বিভেদ। আর এর অন্তরালে যে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও পার্থিব স্বার্থ সক্রিয় ছিল, তার ভূমিকাও কম ছিল না। শুধু তাই নয়; চতুর্থ ক্রুসেডের তো লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করা হয়। ইউরোপের সম্মিলিত বাহিনীর যোদ্ধারা ১২০৪ সালে জেরুজালেমের পরিবর্তে কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে নেয়। কুসেডারদের লুটপাট অব্যাহত ছিল বছরের পর বছর। এরপর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে কায়েম করা হয় ল্যাটিন রাজত্ব। ৯৭ অনেক ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ স্বীকার করেছেন, ক্রুসেডাররা তাদের স্বধর্মী ভাইদের রাজধানী তথা কনস্ট্যান্টিনোপলে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার অনুরূপ বিনষ্টি আড়াই শত বছর পর মুসলিম অধিকারের সময়ও সংঘটিত হয়নি। রাজধানী পুনরুদ্ধারে বাইজেন্টানিয়ানদের অর্ধশতাব্দী লেগে যায়। যদি এটি ধরেও নেওয়া হয়, এ ঘটনার পূর্বে খ্রিষ্টান বিশ্বের দুই অংশের অবস্থা ছিল এমন, তাদের মাঝে পারস্পরিক ভালবাসা অন্তর্হিত হয়েছিল, এ ঘটনার পরের অবস্থা তাহলে চিন্তা করুন। অচিরেই বাইজেন্টাইনবাসীর ভালোবাসাহীনতা প্রবল ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। যারা তাদের রাজধানী ধ্বংস করেছে এবং পাঁচ দশক ধরে জবরদখল করে রেখেছে, স্বধর্মী হলেও কি তাদের ক্ষমা করা যায়?
১২৬১ সালে সম্রাট অষ্টম মিখাইল (১২৬১-১২৮২) ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের দখল হতে কনস্ট্যান্টিনোপল পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। কিন্তু শহরটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। এত কিছুর পরও সম্রাট পশ্চিমাদের শত্রুতার মুখে পড়েন। ক্যাথলিক পোপ ইউরোপীয় রাজাদের কনস্ট্যান্টিনোপল পুনর্দখলে উসকানি দেওয়া শুরু করে। সম্রাটের কার্যকলাপকে তিনি গির্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে গণ্য করেন।
ওইদিকে এশিয়ায় তুর্কিদের উৎপাত। ফলে পশ্চিমের শত্রুতা বহন করার মতো ক্ষমতা সম্রাটের ছিল না। তাই তিনি পোপের সাথে সদ্ভাব প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হন। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দুই চার্চ তথা অর্থোডক্স ও ক্যাথলিক চার্চকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে কনস্ট্যান্টিনোপলের যাজকগোষ্ঠী ও সাধারণ নাগরিক এ সম্মিলন মেনে নিতে রাজি ছিল না। অনিচ্ছুক জাতির ওপর সম্রাট এ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন এবং এর বিরোধীদের উৎপাটন করেন। ফলে অনেকে পালিয়ে যায়। ধর্মনেতাদের চাপে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্ক এক কাউন্সিল আহ্বান করেন-যেখানে ঐক্য প্রচেষ্টার অগ্রদূত সম্রাট মিখাইলকে ইস্টার্ন চার্চ হতে বহিষ্কার করা হয়।
অপরদিকে রোমে আগের পোপ মারা যায়। নতুন পোপ ফ্রেখম্যান মার্টিন (১২৮১-১২৮৫) রোমান ধর্মমতের (অর্থোডক্স মতের) কট্টর বিরোধী ছিলেন। বাইজেন্টাইন সম্রাটের বিরুদ্ধে কপটতা ও স্তাবকতার অভিযোগ এনে তিনিও তাকে বহিষ্কার করেন। এ অবস্থায় সম্রাট অষ্টম মিখাইল মারা যান (১২৮২ খ্রিষ্টাব্দ)। অর্থাৎ দুই চার্চের মিলন প্রচেষ্টার পুরস্কার হিসেবে দুই পক্ষের বহিষ্কারাদেশ লাভে ধন্য হয়ে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। ১৮
এভাবে দুই চার্চের মিলন প্রচেষ্টা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু উদ্যোগ লক্ষণীয়। ১২৭৪ সালে লিও শহরে অনুষ্ঠিত চার্চ কাউন্সিল এবং ১৪৩৭ সালে তারার শহরে অনুষ্ঠিত চার্চ কাউন্সিলে দুই গির্জার মিলন নিয়ে আলোচনা করা হয়, কিন্তু কনস্ট্যান্টিনোপলের যাজকদের বিরোধিতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯ পশ্চিমা চাপ এড়ানোর জন্য বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রয়োজন ছিল তুর্কিদের বিরুদ্ধে বড়ো ধরনের বিজয় অর্জন। কিন্তু সাম্রাজ্যের সেই সক্ষমতা ছিল না। ফলে পোপ ও প্যাট্রিয়ার্কের প্রতিযোগিতাজনিত কারণে সৃষ্ট ফাটল রয়েই যায়; বরং তা আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের বিভাজন ও অনৈক্য অটোম্যানদের সামনে ইউরোপে অনুপ্রবেশের সুযোগ এনে দেয়। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, কীভাবে উসমানি সাম্রাজ্য দানিয়ুব নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এত কিছুর পরও দুই মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত কনস্ট্যান্টিনোপল উসমানীয়দের কাছে অধরাই থেকে যায়। ১৪৫৩ সালে তারা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে সমর্থ হয়। সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী তথা কনস্ট্যান্টিনোপল শহর জয় করে রাসূল-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নকারী আমির হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
অনেক উন্নাসিক মানুষ ইতিহাসকে মরা মানুষের কাহিনি বলে মনে করে। সেই মরা মানুষের কাহিনি অধ্যয়নের একটি বড়ো উপযোগিতা হলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির পূর্বাভাস দেওয়া-যাতে মৃতদের বৃত্তান্ত থেকে জীবিতরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তা ছাড়া মানবেতিহাসের কাল-কালান্তরে সাদৃশ্যপূর্ণ বহু ঘটনা পাওয়া যায়। এর কারণ হলো, দুনিয়া পরিচালনায় আল্লাহর নিয়মের অপরিবর্তনশীলতা:
سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا -
'এটিই আল্লাহর বিধান-যা পূর্বের যুগ হতে চলে আসছে, আর তুমি আল্লাহর বিধানে কখনো কোনো পরিবর্তন পাবে না।' সূরা আল-ফাতহ: ২৩
আল্লাহর বিধানের অপরিবর্তনশীলতার কারণে দুনিয়ার ইতিহাসে কার্যকারণের পুনরাবৃত্তিতে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাই ইতিহাসের বিশ্লেষণী অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা জাতিসমূহের উত্থান ও পতনের কারণ জেনে নিজেদের চলার পথের দিশা গ্রহণ করতে পারি। এ প্রসঙ্গে বলতে পারি, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস আলোচনায় মুসলিম জাতির জন্য শিক্ষণীয় বিষয় আছে। এ বিষয়ে আমরা সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই।
আমরা দেখেছি, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ ধর্মীয় বিভক্তি এবং জনসাধারণের উল্লেখযোগ্য অংশের ধর্মীয় বিতর্কে নিমজ্জিত হওয়া। অনুরূপ মনোবৃত্তি আমরা মুসলিম সমাজের একাংশে দেখতে পাই। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিতর্কমূলক ধর্মালোচনায় ভরপুর। সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শোভন/অশোভন বিতর্কগুলোতে অংশগ্রহণ করছে। আলিম-ওলামা তো বটেই; চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদসহ সকল পেশার মানুষ ধর্মীয় বিতর্কে নিমজ্জিত। এটি একটি অশনি সংকেত। সমাজের অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় বিতর্কে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করলে দুনিয়ার আবাদ বা সভ্যতা নির্মাণকারী কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। ফলে পার্থিব অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। তুমুল প্রতিযোগিতার এই যুগে ধর্মীয় বিভেদ ও বিতর্কের প্রসার মুসলিম জাতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
মনে রাখা দরকার, ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ও কূটতর্কে নিমজ্জিত হওয়া এক বিষয় নয়। ইবাদত পালন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে যেটুকু ধর্মীয় জ্ঞান প্রয়োজন, তা অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কর্তব্য। কিন্তু প্রতিটি মাসয়ালার দলিল জানা এবং খুঁটিনাটি মতভেদের বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেকে মুসলিমের কর্তব্য নয়। এটি বিশেষজ্ঞদের আওতায় পড়ে। আর কুতর্ক ও বাড়াবাড়ি সর্বদা পরিত্যাজ্য।
সেইসঙ্গে আরও মনে রাখা দরকার, উন্নতিমূলক পার্থিব কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে থেকে কেবল ধর্মজ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়া তো বটেই; নিজেদের পরিচালনা করাও অসম্ভব। আল্লাহ তায়ালা সকল মুমিনকে ধর্মীয় জ্ঞানে পণ্ডিত হতে বলেননি; বরং মুমিনদের একটি ক্ষুদ্র অংশের ওপর এই দায়িত্ব দিয়েছেন-
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْ لَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لْيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
'মুমিনদের একসঙ্গে বের হওয়া সংগত নয়। তাদের প্রত্যেক দলের একাংশ কেন বের হয় না-যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে, তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে-যাতে তারা সতর্ক হয়।' সূরা আত-তাওবা : ১২২
তিনি সাধারণ মুসলমানদের বলেছেন, অজানা বিষয় জ্ঞানীদের কাছ থেকে জেনে নিতে-
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ -
'তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।' সূরা নাহল: ৪৩
আসমানি কিতাবগুলোতে বর্ণিত আল্লাহর সুন্নাহ ও সভ্যতাসমূহের উত্থান-পতনের ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয়, পৃথিবীতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পার্থিব যোগ্যতা ও নৈতিকতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নিরন্তর গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে পার্থিব শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়। আর ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ও অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত হয় নৈতিকতা। বিষয়টি প্রত্যেক মুসলিমের উপলব্ধি করা কর্তব্য। মুসলমানদের পতনরোধ করতে হলে ধর্মীয় তর্কে সময়ের নাশ বন্ধ করতে হবে। মৌলিক বিষয়ে জ্ঞানার্জনের পর ধর্মানুলীশনের মাধ্যমে নৈতিকতা অর্জন করে দুনিয়া আবাদে মনোযোগী হতে হবে। তাহলে আশা করা যায়, পতন রোধ করে মুসলমানরা পুনরায় মর্যাদা এবং দুনিয়ার নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে।

কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা মহানবি হজরত মুহাম্মাদ -কে কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। গৌরবময় এই শহর মুসলিমদের পদানত হওয়ার সুসংবাদ দিয়ে তিনি বলেছেন-
'অচিরেই কনস্ট্যান্টিনোপল বিজিত হবে। সেই বিজেতা আমির কতই না উত্তম! আর ওই বিজয়ী বাহিনী কতই না মহৎ!'১০০
রাসূলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় মদিনা হতে বহু দূরে অবস্থিত কনস্ট্যান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা অসম্ভব ছিল। তারপরও সুসংবাদ বাস্তবায়নের পন্থার প্রতি ইঙ্গিতবাহী কর্মকাণ্ড তিনি পরিচালনা করেছেন।
ষষ্ঠ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর যুদ্ধাবস্থার অবসান হলে তিনি আরবের চারপাশে অনেক শাসকের প্রতি দাওয়াতি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। এই মিশনের অংশ হিসেবে তিনি বিশিষ্ট সাহাবি দাহইয়া কালবি -এর মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছেও পত্র প্রেরণ করেন। বুখারির বর্ণনায় দেখা যায়, ওই সময় কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বাণিজ্যের কাজে সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। সম্রাট হিরাক্লিয়াসও তখন পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে জেরুজালেমের পবিত্র উপাসনালয়ে কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য এসেছিলেন। কুরাইশ নেতার কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে পত্রপ্রেরকের ব্যাপারে সম্রাট ইতিবাচক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সভাসদদের বিরোধিতায় তিনি সে মনোভাব পরিবর্তন করেন। ১০১
মদিনা মুনাওয়ারা হতে উত্তরমুখী অভিযান পরিচালনাকেও ভবিষ্যতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য জয়ের ইঙ্গিত হিসেবে গণ্য করা যায়। মহানবি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যভুক্ত বুসরা অঞ্চলের শাসকের নিকট দাওয়াতি পত্রসহ হারিস ইবন উমাইর আল আজদিকে প্রেরণ করেছিলেন। পথিমধ্যে বালকা-এর শাসক শুরাহবিল ইবন আমর আল গাসসানি রাসূল-এর দূতকে হত্যা করে (ফাহমি, ৬১)। এ ঘটনার সমাধান ও প্রতিশোধের লক্ষ্যে মহানবি রোমান এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য অষ্টম হিজরিতে/৬২৯ সালে জায়িদ ইবন হারিসা-এর নেতৃত্বে ৩ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। বালকা-এর পূর্ব সীমান্তে মুতা প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী রোমানদের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে পরপর তিন মুসলিম সেনাপতি যথাক্রমে জায়িদ ইবন হারিসা, জাফর ইবন আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা শহিদ হন। এ যুদ্ধে মুসলিমরা খুব একটা গৌবরজনক বিজয় লাভ করতে পারেনি। অপরদিকে রোমানরা সীমান্ত রক্ষা করতে সমর্থ হয়। ১০২ তবে তারা এ অভিযান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। তারা মনে করেছিল, এটি হয়তো বেদুইনদের নিয়মিত লুটপাটের অভিযান। অথচ তা নয়; এটি ছিল আদর্শিক লড়াই। এ যুদ্ধে তিন মুসলিম সেনাপতির শাহাদাত পরবর্তী অভিযানের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। দ্বিতীয় খলিফা উমর-এর শাসনামলেই রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চল সিরিয়া ও মিশর বিজিত হয়। তারপর মুসলিমরা ভূমধ্যসাগরে দৃষ্টিপাত করে-শতশত বছর ধরে যা রোমান সম্পদ বলেই গণ্য হয়ে আসছিল।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, আরবরা নৌবিদ্যায় পারদর্শী ছিল না। দক্ষিণ আরব তথা ইয়ামেনের অধিবাসীরা বাণিজ্য কাজে সমুদ্র গমন করত। কিন্তু নজদ ও হেজাজের মানুষের সমুদ্রারোহণের খুব একটা অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক রাজধানীগুলো সমুদ্র হতে দূরে স্থাপন করা হয়। যেমন: মদিনা, দামেস্ক, ফুসতাত ইত্যাদি।
অন্যদিকে রোমানরা নৌবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। শত শত বছর ধরে ভূমধ্যসাগরে তাদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের রাজধানীগুলোও ছিল সাগর-তীরবর্তী। যেমন: কনস্ট্যান্টিনোপল, আলেকজান্দ্রিয়া, অ্যান্টিয়ক ইত্যাদি। তাই নৌ-যুদ্ধে বা সমুদ্র অভিযানে রোমানদের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। তবে সমুদ্র-সন্নিহিত অঞ্চল জয়ের পর নৌবিদ্যায় গুরুত্ব দেওয়া মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। মুসলিমরা আলেকজান্দ্রিয়া দখলের কিছুদিন পর ২৫ হিজরিতে/৬৪৫ সালে রোমানরা নৌবাহিনী প্রেরণ করে আলেকজান্দ্রিয়া পুনর্দখল করে। তখন মুসলিমদের কোনো নৌবাহিনী ছিল না। ১০৩ এ ঘটনার পর মুসলিমরা নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে পারে। তা ছাড়া ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
উমর ইবনুল খাত্তাব -এর খিলাফতকালে সিরিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান । সিরিয়ার সাথে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমান্ত ছিল। ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য নৌবাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা তিনি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন। তাই তিনি খলিফার কাছে নৌবহর প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রার্থনা করেন। উমর খোঁজখবর নিয়ে সমুদ্রারোহণের সংকুলতা দেখে মুয়াবিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
তৃতীয় খলিফা উসমান -এর সময়ে মুয়াবিয়া আবারও নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি প্রার্থনা করেন। খলিফা তাঁকে এ শর্তে অনুমতি দেন, কোনো মুসলিমকে যেন জোর করে সমুদ্রাভিযানে যেতে বাধ্য করা না হয়। অনুমতি পেয়ে মুয়াবিয়া নৌবহর গড়ে তোলেন। এভাবে তিনি মুসলিম নৌবহরের প্রথম প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা লাভ করেন।
মুয়াবিয়ার প্রথম নৌ-অভিযান ছিল সাইপ্রাসে-যেখানে তিনি বিজয়ী হন। ফলে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এটি ছিল ২৮ হিজরির ঘটনা। তিন বছর পর (৩১ হিজরি/৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলিমরা ভূমধ্যসাগরে আবারও রোমানদের সাথে নৌ-যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এটিকে জাতুস সাওয়ারি (Battle of the Masts) যুদ্ধ বলা হয়। এ যুদ্ধে মুসলিমরা গৌরবোজ্জ্বল বিজয় লাভ করে।
মিশর ও সিরিয়ার যৌথ মুসলিম নৌবহরে নৌযান ছিল ২০০টি। আর রোমানদের নৌযান ছিল প্রায় এক হাজার। এমন অসম প্রতিযোগিতায় নবীন ও অনভিজ্ঞ মুসলিম নৌবহরই জয়লাভ করে। ফলে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। ভূমধ্যসাগরের বহু দ্বীপ যেমন: সাইপ্রাস, ক্রিট, সার্দিনিয়া ও সিসিলিতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। রোমান (বাইজেন্টাইন) সম্রাট কনস্ট্যান্স সিসিলি দ্বীপে পালিয়ে যান। ১০৪
জাতুস সাওয়ারি যুদ্ধের পর মুসলিমদের ব্যাপারে রোমানদের নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়। তারা বুঝতে পারল, এ আক্রমণগুলো বেদুইনদের লুটপাটের আক্রমণ নয়; বরং একটি লক্ষ্যাভিসারী দলের অভিযান। তারা আরও উপলব্ধি করে, সিরিয়া ও আলেকজান্দ্রিয়া পুনরুদ্ধারের আশা দুরাশা মাত্র। এখন কর্তব্য হল, সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ হেফাজতের চেষ্টা করা। মুসলিমদের রোমান এলাকায় অভিযান চালানোর উদ্দেশ্য ছিল কনস্ট্যান্টিনোপল জয়। তবে দূরবর্তী ওই শহর দখলের পূর্বে রোমানদের অন্যান্য এলাকায় অভিযান চালানো অপরিহার্য ছিল। আর এজন্যই তারা নৌবাহিনী গঠন করে। কারণ, কেবল স্থলবাহিনী দ্বারা কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করা একেবারে অসম্ভব।
অস্ট্রিয়ান ইতিহাসবিদ জোসেফ ভন হ্যামার (১৭৭৪-১৮৫৬)-এর মতে- কনস্ট্যান্টিনোপল শহরটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২৯ বার অবরুদ্ধ হয়েছে। ১০৫ 'বাইজেন্টাইন রাজধানী মুসলিমদের পদানত হবে'-এ মর্মে রাসূল-এর সুসংবাদ বর্ণিত হওয়ায় নৌবহর প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলিমরা ওই শহর অবরোধের চেষ্টা চালায়।
মুয়াবিয়া গভর্নর হিসেবে যেমন রোমান এলাকায় অভিযান চালিয়েছেন, খলিফা হওয়ার পরও এ লক্ষ্যে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন। ৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লাগাতার সাত বছর মুসলিম নৌবহর কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের লক্ষ্যে তৎপরতা চালিয়েছে। তবে এগুলো অব্যাহত অভিযান ছিল না। মুসলিম বাহিনী শীতের মৌসুম কাটাত Cyzicus দ্বীপে। বসন্তে তারা স্থল ও জলপথে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করত-যা খারিফ (হেমন্ত) পর্যন্ত অব্যাহত থাকত। শীত মৌসুমে তাঁরা আবার সাইজিকাস দ্বীপে ফিরে যেত।
কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের গৌরবে শরিক হওয়ার প্রেষণায় বহু সাহাবি ওই অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণ করতেন। ৫৩ হিজরিতে (৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) বিশিষ্ট সাহাবি আবু আইউব আনসারি, ইবনে উমর, ইবন আব্বাস ও ইবনে জুবাইর কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বৃদ্ধ সাহাবি আবু আইউব আনসারি অসুস্থ হন। সেনাপতি তাঁকে দেখতে গেলে তিনি বলেন—'আমাকে নিয়ে শত্রুভূমিতে প্রবেশ করে যেখানে সুযোগ পাবে, সেখানে দাফন করবে।'
আবু আইউব আনসারি মারা গেলে তাঁকে কনস্ট্যান্টিনোপলের তোরণের সন্নিকটে দাফন করা হয়। সেনাপতির নির্দেশে তাঁর কবর মাটির সাথে সমান করে দেওয়া হয়—যাতে খ্রিষ্টানরা তাঁর কবরের অমর্যাদা করতে না পারে। অবশ্য খ্রিষ্টানরা মহান সাহাবির কবরকে সম্মান করত, অনাবৃষ্টিতে তাঁর সান্নিধ্যে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করত!
সাত বছরব্যাপী খণ্ড অভিযান চালালেও মুসলিমরা কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করতে ব্যর্থ হয়। ৬৮০ সালে খলিফা মুয়াবিয়া -এর মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খলিফা হয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। ১০৬
এরপর উমাইয়া খিলাফত দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্রোহ ও অভ্যন্তরীণ গোলযোগের শিকার হয়। ফলে বিজয়াভিযান একপ্রকার স্তিমিত হয়। তারপরও কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবে এগুলো স্বীকৃত হয়ে থাকবে।
বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার অবসানে অষ্টম শতকের প্রারম্ভে খলিফা ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিকের (৮৬-৯৬ হি./৭০৫-৭১৫) আমলে আবারও বিজয়াভিযান শুরু হয়। কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেন খলিফা, কিন্তু অভিযান শুরুর পূর্বেই তিনি মারা যান। তখন তাঁর ভাই এবং পরবর্তী খলিফা সুলায়মান ইবন আবদুল মালিক (৯৬-৯৯/৭১৫-৭১৭) এই মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যান। অভিযানের জন্য অনেক বড়ো ও অস্ত্রশস্ত্রে সমৃদ্ধ একটি বাহিনী ও নৌবহর প্রস্তুত করে খলিফার ভাই মাসলামাকে সেনাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। ১০৭
৭১৭ সালের (৯৮ হি.) ১৫ আগস্ট মুসলিম স্থলবাহিনী কনস্ট্যান্টিনোপলের নগর প্রাচীরের কাছে পৌঁছে। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে মুসলিম নৌবহরও বসফোরাসে পৌছে যায়। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে মুসলিম বাহিনী ভালোভাবে শহর অবরোধ করতে পারল না। হঠাৎ বিপরীত দিক হতে বাতাস ছুটলে মুসলিম নৌবহরের সারি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে পড়ে একটির ওপর আরেকটি আছড়ে পড়ে। এ সময় রোমান নৌবহর গ্রিক ফায়ার নিয়ে আক্রমণ শানায়। ফলে মুসলিমদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং তারা পরাজিত হয়। ওদিকে শীত এগিয়ে আসায় স্থলবাহিনীও বেশিদিন অবরোধ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তী বসন্তে মুসলিমরা আবারও নতুন করে আশায় বুক বাঁধে। নৌবাহিনীতে নতুন নৌযান ও রসদ যুক্ত হয়। কিন্তু এবারেও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। বিগত অভিযানের ফলাফল পুনরাবৃত্ত হওয়ার আশঙ্কায় নতুন খলিফা উমর ইবন আবদুল আজিজ ৭১৮ সনে (৯৯ হি.) ১২ মাস স্থায়ী অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরবর্তী সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিষ্ঠিত কিছু মুসলিম ক্ষুদ্ররাজ্য বাইজেন্টাইন সীমান্তে অভিযান চালায়। এসব অভিযানের মাধ্যমে রোমানদের অনেক ভূমি দখল করা সম্ভব হয়, কিন্তু কনস্টান্টিনোপল জয়ের আশা সুদূর পরাহতই থেকে যায়।
ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে সেলজুকদের আবির্ভাবের পর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারিত হয়। সেলজুক সুলতান আলপ আরসালান (৫৫৫-৫৬৫হি./১০৬৩-১০৭২) ১০৭১ সালে সম্রাট রোমানোস ডিওজেনাসকে (Romanos Diogenes) মানজিকার্টের (Manzikert) যুদ্ধে পরাজিত করেন। ১০৮ শুধু তাই নয়; তিনি তাকে বন্দি করে বেত্রাঘাতও করেন। তারপর বহু শর্তের নিগড়ে বন্দি করে তাকে ছেড়ে দেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট এক ক্ষুদ্র শাসককে বার্ষিক কর প্রদান করতে বাধ্য হন।
কনস্ট্যান্টিনোপলে এই ঘটনার অনুরণন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। এক পর্যায়ে সমগ্র এশিয়া মাইনর সেলজুকদের পদানত হয়। ওদিকে রোমান এলাকা কুনিয়ায় সেলজুকদের নতুন একটি শাখা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ইতিহাসে এরা 'রোমান সেলজুক' নামে পরিচিতি লাভ করে। ১০৯ রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণুতায় তাদের বিরাট অবদান রয়েছে। পশ্চিমে তারা ইজিয়ান সাগরের তীর পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়।
ত্রয়োদশ শতকের শেষার্ধে এশিয়া মাইনরে উসমানি তুর্কিরা রোমান সেলজুকদের স্থলাভিষিক্ত হয়। উসমানি সালতানাত প্রতিষ্ঠার শুরু হতে কনস্ট্যান্টিনোপল জয় তাদের অন্যতম লক্ষ্যে পরিণত হয়। সেই যুগে তুর্কি জাতিই ছিল ইসলামের জন্য সর্বাধিক উদ্যমী জনগোষ্ঠী। জিহাদের ব্যাপারেও তাঁরা ছিলেন একনিষ্ঠ।
তুর্কি-বিপদ আঁচ করতে পেরে বাইজেন্টাইন সম্রাটগণ স্বধর্মী ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সাহায্য চান। সম্রাট পঞ্চম জন (১৩৪১-১৩৭৬) রোমে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম বাইজেন্টাইন সম্রাট, যিনি ইউরোপ সফর করেন। শুধু তাই নয়; সেন্ট পিটার্স বেদিতে পোপের সামনে সিজদাবনত হয়ে লাতিন ধর্মমত তথা ক্যাথলিক ধর্মমত গ্রহণের ঘোষণাও দেন। এতে পোপ খুশি হন বটে, কিন্তু সম্রাটের খুব একটা লাভ হয় না। তিনি রোমের ধর্মগুরুর কাছ থেকে মাত্র দুটি জাহাজ, তিনশো সৈন্য এবং কিছু ডুকাট লাভ করেন।
পরবর্তী সম্রাট ম্যানুয়েলও (শাসনকাল ১৩৯১-১৪২৫) সাহায্যের আশায় যথারীতি ইউরোপ সফর করেন। কয়েক বছর ইউরোপীয় রাজাদের দ্বারে দ্বারে ঘোরার পরও শূন্য হাতে কনস্ট্যান্টিনোপলে ফিরে আসেন।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, উসমানি সুলতান প্রথম বায়েজিদ ১৩৯৪ খ্রিষ্টাব্দে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাইমুর লং উসমানি সালতানাতে আক্রমণ করলে বায়েজিদকে বাইজেন্টাইন রাজধানীর অবরোধ তুলে নিয়ে মোঙ্গল-বিপদ প্রতিরোধে ছুটে যেতে হয়। তাইমুরের হাতে বায়েজিদের পতনের পর তাঁর চার পুত্র সিংহাসন লাভের প্রতিযোগিতায় ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ দৃশ্য দেখে বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল খুশি হন, কিন্তু সুযোগের খুব একটা সদ্ব্যবহার করতে পারেননি; বরং কয়েক বছর অতিবাহিত হতে না হতেই দেখলেন, তুর্কিরা আবার জেগে উঠেছে। সুলতান মুহাম্মাদের নেতৃত্বে সালতানাতের ভিত আবার মজবুত হয়েছে।
দ্বিতীয় মুরাদের সময় তুর্কি সালতানাতের গৌরব এশিয়া-ইউরোপে আবার ছড়িয়ে পড়ে। এই সুলতানও কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেছিলেন (১৪২২)। কিন্তু সম্রাট ম্যানুয়েলের ধূর্ততার কারণে সফল হতে পারেননি। বাইজেন্টাইন সম্রাটের উসকানি ও প্ররোচনায় তুর্কি শাহজাদা মুস্তাফা তাঁর বড়ো ভাই সুলতান মুরাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ফলে মুরাদ কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হন। আবারও বেঁচে যায় বাইজেন্টাইন রাজধানী। তবে তিন দশক অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই পরবর্তী সুলতান মুহাম্মাদের হাতে কনস্ট্যান্টিনোপলের বিজয় সুসম্পন্ন হয়। ১১০

টিকাঃ
৮২. Ehrlich, "Istanbul" in The New Encyclopedia Britanica, v. 22, p. 148; ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪
৮৩. Walsh, op.cit., p. 543.
৮৪. Ehrlich, op.cit p. 152.
৮৫. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬; (Ehrlich, op.cit, p. 152)
৮৬. Ehrlich, op.cit, p. 150.
৮৭. Ehrlich, op.cit, p. 152.
৮৮. Ehrlich, op.cit, p. 148.
৮৯. Ehrlich, op.cit, p. 152; Walsh, op.cit, p. 544.
৯০. Ehrlich, op.cit, p. 152; Dean Peterson, A Concise History of Christianity, p. 165-66.
৯১. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬।
৯২. G. Ostrogrosky, History of Byzantine Empire, p. 67.
৯৩. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১-৫২
৯৪. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪
৯৫. Vasiliev, op.cit., p. 641.
৯৬. Vasiliev, op.cit., pp. 626, 637, 641.
৯৭. Ehrlich, op.cit., p. 153; ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮
৯৮. Vasiliev, op.cit., p. 657-58.
৯৯. Peterson, op.cit., p. 166.
১০০. বুখারি, আত-তারিখুস সাগির, পৃ. ৩৪১
১০১. বুখারি, সাহিহুল বুখারি, খ. ১, পৃ. ৫-৭
১০২. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, খ. ৩, পৃ. ১১২-১৫
১০৩. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক, আমীরুল মু'মিনীন উসমান ইবনু আফফান, পৃ. ২০৩
১০৪. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১১
১০৫. উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অবরোধ: পারস্য অবরোধ (৬২৬); আরবদের অবরোধ (৬৭৪ হতে ৬৭৮, আবার ৭১৭-৭১৮); বুলগার অবরোধ (৮১৩ ও ৯১৩); রাশিয়ান অবরোধ (৯৪১ ও ১০৪৩), তুর্কি বেদুইনদের অবরোধ (১০৯০-৯১)। কোনোটি সফল হয়নি। (Ehrlich, 153)
১০৬. Walsh, op.cit., p. 546; ইবনুল আসির, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ৩৪৪; ইবন কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ১১, পৃ. ২৭০।
১০৭. ইবন কাসির, প্রাগুক্ত, খ. ১২, পৃ. ৬২১; Walsh, op.cit., p. 546.
১০৮. Vasiliev, op.cit., p. 356-57; ইবনুল আসির, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৩১৫
১০৯. ফাহমি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৮
১১০. Vasiliev, op.cit., p. 633, 671.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00