📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 গৃহযুদ্ধ এবং খণ্ড-বিখণ্ড সালতানাত

📄 গৃহযুদ্ধ এবং খণ্ড-বিখণ্ড সালতানাত


বায়েজিদ-বধের কৃতিত্বে তাইমুর পশ্চিমাদের অভিনন্দনে সিক্ত হন। এহেন কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্য ও মহান বিজয়ে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ক্যাস্টাইলের রাজা ও বাইজেন্টাইন সম্রাট তাইমুরকে অভিনন্দিত করেন। ইউরোপীয় রাজারা মনে করল, তুর্কিদের হুমকি হতে তারা চিরদিনের জন্য মুক্তিলাভ করেছে।
বায়েজিদের পরাজয়ের পর তাইমুর আজনিক, ব্রুসাসহ কয়েকটি শহর ও দুর্গ অধিকার করেন। তারপর রোডসের নাইটদের হাত থেকে আজমির মুক্ত করেন। 'উসমানি সাম্রাজ্য ধ্বংস করে তাইমুর ইসলামের ওপরই আঘাত হেনেছেন'- সাধারণ মুসলিমদের মাঝে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। খুব সম্ভবত এটি দূর করার জন্য তিনি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত কিছু এলাকাও দখল করেন।
এশিয়ার মাইনরের ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো বিলীন হয়ে উসমানি সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তাইমুরের কৃপায় ভূ-স্বামীরা পুনরায় রাজ্য ফিরে পায়। শুধু তাই নয়; উসমানি সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী তথা বায়েজিদের পুত্রদেরও পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেন তাইমুর; অর্থাৎ উসমানি সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়। ৫৮
বায়েজিদ-পুত্রদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ
সুলতান বায়েজিদের সর্বাপেক্ষা তেজোদ্দীপ্ত পুত্র আরতুগরুল সিবাস যুদ্ধে তাইমুরের হাতে নিহত হন। সুলতানের মৃত্যুর পর তাঁর অন্য সন্তানরা সাম্রাজ্যের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। অপরদিকে ইউরোপীয় নৃপতিরাও একেক ভাইয়ের পক্ষাবলম্বন করে আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। বায়েজিদের মৃত্যুকালে জ্যেষ্ঠ পুত্র সুলায়মান এদিন বা আদ্রিয়ানোপল শাসন করছিলেন।
দ্বিতীয় পুত্র ঈসা ব্রুসায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কনিষ্ঠপুত্র মুহাম্মাদ আমাসিয়ায় একটি ক্ষুদ্র রাজ্য স্থাপন করেন।
ঈসা ও মুহাম্মাদের যুদ্ধ দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই শুরু হয়। এরমেনি-বেলি ও উলুবাদ-এর যুদ্ধে (মার্চ-মে, ১৪০৩) পরাজিত হয়ে ঈসা কনস্ট্যান্টিনোপলে পালিয়ে যান, আর মুহাম্মাদ ব্রুসা দখল করে নেন। দুই ভায়ের মাঝে কারাসিতে আবারও যুদ্ধ হয়। এবারও ঈসা পরাজিত হয়ে কারামানে পালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি এক গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ হারান।
অপর ভ্রাতা মুসা আঙ্কারার যুদ্ধে পিতাসহ তাইমুরের হাতে বন্দি হয়েছিলেন। তাইমুর তাকে জামিয়ানের ইয়াকুবের আশ্রয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদের অনুরোধে মুসা মুক্তিলাভ করেন। ঈসার মৃত্যুর পর সুলায়মান বিশাল বাহিনী নিয়ে বসফোরাস অতিক্রম করেন। শুরুতে তিনি বেশ সাফল্যও পেয়েছিলেন; ১৪০৪ সালেই তিনি আনাতোলিয়ায় অভিযান চালিয়ে ব্রুসা ও আঙ্কারা দখল করে নেন। এরপর এমন এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, মুহাম্মাদ ও সুলায়মান কেউ কাউকে হারাতে পারছিলেন না। এ অবস্থা প্রায় পাঁচ বছর (১৪০৫-১৪১০) অব্যাহত থাকে।
অচলাবস্থা ভাঙার লক্ষ্যে মুসাকে থ্রেসে প্রেরণ করেন মুহাম্মাদ। দক্ষিণ-পূর্বে ইউরোপে নিজের এলাকা আক্রান্ত হতে দেখে সুলায়মান ছুটে আসেন থ্রেসে। কসমিডিয়নের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সুলায়মানই জিতলেও (১৪১০) পরের বছর ইদিনের যুদ্ধে সুলায়মান পরাজিত ও নিহত হন। তখন থ্রেসে উসমানি এলাকার শাসক হন মুসা। ওদিকে তুর্কিদের এশীয় অংশে যথারীতি ক্ষমতায় বহাল আছেন মুহাম্মাদ।
বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল দ্বিতীয় পেলিওলোগাস ছিলেন সুলায়মানের মিত্র। তাই মুসা কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেন। সম্রাটের অনুরোধে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন মুহাম্মাদ। তুর্কিদের দুটি বাহিনী দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। কিছুদিন লড়াইয়ের পর মুহাম্মাদের এলাকায় বিদ্রোহ হলে তাকে বসফোরাস পাড়ি দিয়ে নিজ রাজ্যে ফিরে আসতে হয়। ওদিকে মুসা কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ অব্যাহত রাখেন। মুহাম্মাদ এবার থ্রেসে আক্রমণ করেন। তিনি সার্বিয়ান ডেসপট স্টিফেন লাজারভিচ-এর সমর্থন পান। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই ভ্রাতার বাহিনী চামূর্লির সমভূমিতে (বর্তমান সামুকভ, বুলগেরিয়া) মুখোমুখি হন। যুদ্ধে মুসা পরাজিত ও নিহত হন। পরবর্তী সময়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায়, বায়েজিদের পুত্রদের মাঝে মুহাম্মাদ ছাড়া আর কেউ বেঁচে রইল না।
শেষ পর্যন্ত তিনি হন উসমানি সালতানাতের পরবর্তী সুলতান। ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের সময়টুকু 'অটোম্যান ইনটেরেগনাম' নামে পরিচিত। ৫৯
বায়েজিদের মৃত্যুর ১২ বছরের মধ্যে উসমানি সালতানাত আবারও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায়। অথচ অনেকে ধারণা করেছিল, ভ্রাতৃবিরোধে তাদের সাম্রাজ্য চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাদের এই বিস্ময়কর পুনরুত্থানের পেছনে সেই কারণগুলো সক্রিয়-যা তাদের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। তন্মধ্যে তিনটি কারণ বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।
প্রথমত : ধর্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও সামরিক পারদর্শিতায় সমকালীন অন্যান্য জাতির ওপর তুর্কিদের শ্রেষ্ঠত্ব।
দ্বিতীয়ত: অড্রিয়াটিক, কৃষ্ণসাগর, দানিয়ুব নদী ও ইজিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী ভূভাগে নানা জাতিভুক্ত জনগোষ্ঠীর বসবাস। তৃতীয়ত: গ্রিস সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা হ্রাস, বিচার ও শাসন বিভাগের ভয়াবহ অধঃপতন এবং গ্রিক জাতির নৈতিক অবনতি।
তা ছাড়া তুর্কিদের ন্যায় ধারাবাহিকভাবে যোগ্য নৃপতি লাভে ধন্য হয়েছে-এমন রাজবংশ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব একটা পাওয়া যায় না। সালতানাতের প্রতিষ্ঠার পর থেকে তুর্কিরা পরপর আটজন উপযুক্ত নরপতি লাভে ধন্য হয়েছে। আর কোনো রাজবংশ একাধিক্রমে এ রকম উপযুক্ত শাসক লাভের জন্য গর্ব করতে পারে না। নিস বিজয়ী ও জেনিসেরি সৈন্যের প্রতিষ্ঠাতা ওরহান, কসোভো বিজয়ী মুরাদ, নিকোপলিসজয়ী বায়েজিদ, বিধ্বস্ত সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ, হুনিয়াডির প্রতিদ্বন্দ্বী মহামতি মুরাদ, কনস্ট্যান্টিনোপল বিজেতা মুহাম্মাদ ফাতিহ, সিরিয়া ও মিশরজয়ী ভিম সেলিম, মোহাক্সজয়ী ও ভিয়েনা অবরোধকারী মহামান্বিত সুলায়মানের ন্যায় এত সুযোগ্য নরপতি পরপর আর কোনো দেশেই আবির্ভূত হয়নি।
তুর্কি শাহজাদাদের প্রতিপালন পদ্ধতিও যোগ্য শাসকপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। জেনিসেরি সৈনিকরা যেরূপ কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত, শাহজাদাকেও অনুরূপ সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হতো। তা ছাড়া তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে (প্রধানত প্রাদেশিক শাসনকর্তা) নিয়োগ প্রদান করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হতো। তুর্কি রাজপ্রাসাদে অলস ও কর্মবিমুখ বিলাসিতার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই তাইমুরের ধ্বংসলীলা-উত্তর ভ্রাতৃঘাতীর যুদ্ধের সমাপ্তিতে তুর্কি সাম্রাজ্য আবারও সগৌরবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

টিকাঃ
৫৮. মুস্তাফা, ৫৯
৫৯. Dimitris J. Kastritsis, The Sons of Bayezid: Empire Building and Representation in the Ottoman Civil War of 1402-1413, Brill, 2007.

📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 প্রথম মুহাম্মদ

📄 প্রথম মুহাম্মদ


[পিতা : সুলতান বায়েজিদ, মাতা: দওলত খাতুন, জন্ম: ১৩৮১, শাসনকাল : ১৪১৩-১৪২১, মৃত্যু: ১৪২১]
সুলতান বায়েজিদ ও দওলত খাতুনের (Devlet Hatun/دولت شاه خاتون) পুত্র মুহাম্মাদ ১৩৮১ (ভিন্নমতে ১৩৭৯) সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাইমুরের খাঁচায় পিতার মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৪১৩ সালে তিনি ক্ষমতায় আরোহণ করেন। ভদ্রতা, দয়া ও মানবিকতার কারণে তিনি মুহাম্মাদ চেলেবি বা 'ভদ্র মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত ছিলেন (a noble representative of the Ottoman state (Vasiliev, 639) ।
তিনি ছিলেন মধ্যম আকৃতির, গোলগাল চেহারা, ফরসা গাত্রবর্ণ, লাল চিবুক, প্রশস্ত বক্ষ ও শক্তিশালী শরীরের অধিকারী। নিজ শাসনামলে তিনি ২৪টি যুদ্ধে অংশ নেন এবং তাঁর শরীরে অনধিক চল্লিশটি আঘাত ছিল। পিতার মৃত্যুর পর উদ্ভূত গৃহযুদ্ধের অবসান ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান কীর্তি। শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং ধৈর্য, দৃঢ়তা ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে একের পর এক ক্ষমতাপ্রার্থী ভাইদের পরাজিত করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। রাজ্য জয়ের চেয়ে বিদ্রোহ দমন ও সাম্রাজ্যের ভিত পুনর্নির্মাণেই তাঁকে বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে। তাই অনেক ইতিহাসবিদ তাঁকে উসমানি সালতানাতের 'দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা' বলে স্বীকার করেন।৬০
গৃহযুদ্ধের সময়টুকু বাদ দিলে প্রথম মুহাম্মাদের শাসন মাত্র আট বছর স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু এ অল্প সময়ের মাঝে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেন। গৃহযুদ্ধোত্তর সময়ে একটি সাম্রাজ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই মুখ্য; রাজ্য বিস্তার নয়। মুহাম্মাদ এটি বেশ বুঝতে পারেন এবং সে লক্ষ্যেই কাজ করেন। এ কাজটিও তিনি শান্তিতে করতে পারেননি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও খ্রিষ্টানদের সাথে তাঁর লড়াই বাধে। ইজিয়ান সাগরের দ্বীপপুঞ্জের (আরখাবিল) খ্রিষ্টান সর্দাররা তুর্কি জাহাজ ও উপকূলে লুণ্ঠন শুরু করলে ভেনিসের সাথে সুলতানের যুদ্ধ বাধে। গ্যালিপোলির কাছে এক নৌযুদ্ধে তুর্কি বহর সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। আরও কয়েকটি যুদ্ধে তিনি হাঙ্গেরি ও স্টাইরিয়ার বিরুদ্ধে পরাজিত হন (১৪১৬-২০), কিন্তু এতে উৎসাহ হারালেন না মুহাম্মাদ। সালতানাতের সঙ্গিন অবস্থা বিবেচনা করে তিনি যুদ্ধ অপেক্ষা সন্ধি স্থাপনে বেশি মনোযোগী হন। পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুসারে তিনি গ্রিক সম্রাটকে থেসালি ও কৃষ্ণসাগর তীরের কয়েকটি দুর্গ ছেড়ে দেন। ভেনিস ও রাঙসা রিপাবলিকের সাথেও চুক্তি সম্পাদিত হয়। যেহেতু এশিয়ার চেয়ে ইউরোপেই শত্রুসংখ্যা অধিক, তাই তিনি এদিনে রাজধানী স্থাপন করেন।
তবে এশিয়ায়ও শান্ত অবস্থা ছিল না। স্মার্নার শাসনকর্তা ছিলেন জুনাইদ। গৃহযুদ্ধের সুযোগে তিনি বিদ্রোহ করেন এবং আয়দিন দখল করে নেন। মুহাম্মাদের অনুপস্থিতিতে কারামানের রাজাও ব্রুসা আক্রমণ করে। ব্রুসা নগর পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেলেও শহরতলির মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা ভস্মীভূত হয়।
সুলতান স্মার্না অবরোধ করলে জুনাইদ ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। সেনাপতি বায়েজিদ পাশা কারামান বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করেন। রাজা মুস্তাফা বে বন্দি হন। সদাশয় সুলতান তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে কারামানরাজ আবারও তুর্কি এলাকা হামলা করেন। আবার পরাজিত হন তিনি। সুলতান আবারও তাকে ক্ষমা করেন। অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজ্য দখল না করে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে সন্তুষ্ট থাকেন সুলতান। ৬১
সুলতান মুহাম্মাদের সাথে বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েলের সুসম্পর্ক ছিল। খ্রিষ্টান শাসকের সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ সুলতান গ্রহণ করেননি। শুধু তাই নয়; সম্রাটের কিছু বাড়াবাড়িও শান্তির খাতিরে উপেক্ষা করেছেন।
একবার কনস্টান্টিনোপলের এক উপশহর অতিক্রমের সময় সুলতানের সাথে সম্রাটের সাক্ষাৎ হয়। দুই নৃপতি নিজ নিজ গ্যালিতে অবস্থান করে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আলাপচারিতা করেন। সুলতান প্রণালি অতিক্রম করে এশীয় তীরে তাঁবুতে অবস্থান নেন। সম্রাট অবশ্য গ্যালি হতে অবতরণ করেননি। রাতে উভয় নৃপতি তাঁদের নৈশভোজের সুস্বাদু ডিশ বিনিময় করেন।৬২
সুলতান মুহাম্মাদ দীর্ঘদিন শান্তি-সাধনা করতে পারলেন না। দরবেশ বিদ্রোহ তাঁর সাধনায় ছেদ ঘটায়। এ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন মুসার সামরিক বাহিনীর বিচারপতি (কাজি আসকার) বদরুদ্দিন। মনিবের পরাজয়ের পর তিনি আজনিকে অবস্থান করতে থাকেন। পরে সেখান থেকে পালিয়ে তার সাম্যবাদী ধর্মমতের প্রচার শুরু করেন। ৬৩ বহুসংখ্যক অনুসারী তার ভাগ্যে জুটে যায়। তাদের মধ্যে মুসলিম তো ছিলই; ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও ছিল। কারণ, তিনি সব ধর্মকে সমান মনে করতেন। পীর কলিজা মুস্তাফা নামে এক ব্যক্তি তাদের আধ্যাত্মিক নেতার ভূমিকা পালন করেন। তাদের আরেক গুরু ছিল ইহুদি, যার নাম ছিল তুরলাক কামাল।
সালাতানাতের বহু স্থানে তাদের উৎপাত বেড়ে গেলে সুলতানকে অস্ত্রধারণ করতে হয়। তিনি প্রথমে বুলগেরিয়ান প্রিন্স সিসম্যানকে দরবেশ বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করেন। কিন্তু পীর কলিজা মুস্তাফার হাতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। তারপর সুলতান মুহাম্মাদ তাঁর প্রথম উজির বায়েজিদ পাশাকে পাঠান। ইজমিরের উপকণ্ঠে 'কারা বুর্ন' নামক স্থানে সংঘটিত এক যুদ্ধে সাম্যবাদীদের বাহিনী পরাজিত হয়। তাদের নেতা মুস্তাফা ধৃত ও নিহত হন। এই গোষ্ঠীর অপর নেতা বদরুদ্দিন ঘাঁটি গেড়েছিলেন মেসিডোনিয়ায়। তীব্র প্রতিরোধের পর তিনি পরাজিত এবং বহু অনুচরসহ মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ৬৪
মধ্যযুগে সুলতান মুহাম্মাদের ন্যায় শান্তিবাদী নৃপতির দেখা মেলা ভার। কিন্তু তাঁর কপালে শান্তি জুটল না। সাম্যবাদী আন্দোলনের সমস্যা সমাধান হতে না হতেই বিদ্রোহী ভ্রাতা মুস্তাফার উদ্ভব হয়। সুলতানের ভাই
মুস্তাফা তাঁর পিতা বায়েজিদের সাথে বন্দি হয়েছিলেন তাইমুরের হাতে। তারপর থেকে তার খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৪২০ সালে হঠাৎ এক ব্যক্তি ইউরোপে নিজেকে বায়েজিদ-পুত্র মুস্তাফা বলে ঘোষণা করে সাম্রাজ্যের অংশ দাবি করে। অনেক তুর্কি তার দাবি মেনে নেয়। সুলতানের ক্ষমাপ্রাপ্ত জুনাইদও তার দলে যোগ দেয়। তবে সেলোনিকার যুদ্ধে মুস্তাফা পরাজিত হয়ে কনস্টান্টিনোপলে পালিয়ে যায়।
বাইজেন্টাইন সম্রাট বিপুল অর্থ লাভের অঙ্গীকারে মুস্তাফাকে সুলতানের মৃত্যু পর্যন্ত নজরবন্দি করে রাখতে রাজি হন। পরের বছর ১৪২১ সালে (৮২৪ হিজরি) সুলতান মুহাম্মাদ মাত্র ৪৩ বছর বয়সে এদিনে মারা যান। তাঁকেও ব্রুসার সবুজ কবরে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর উত্তরাধিকারীর জন্য ৮৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাম্রাজ্য রেখে যান।
অন্যান্য উসমানি সুলতানের তুলনায় সুলতান প্রথম মুহাম্মাদের শাসনকাল সংক্ষিপ্ত ছিল। তার ওপর প্রথমদিকে তাঁকে গৃহযুদ্ধে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। ফলে তিনি রাজ্য সম্প্রসারণ করতে পারেননি। তারপরও সদ্ব্যবহার, সদাশয়তা, ন্যায়বিচার, শান্তিপ্রিয়তা, সাহিত্য ও শিল্পকলায় উৎসাহ দানের জন্য তিনি চেলেবি বা ভদ্রলোক বলে পরিচিতি লাভ করেন। তিনিই প্রথম তুর্কি সুলতান, যিনি আমিরে মক্কার প্রতি বার্ষিক হাদিয়া প্রেরণের প্রথা চালু করেন। এ উপহারকে সাররা বলা হতো। ব্রুসায় তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, চীনামাটির প্রসাধন ছিল বলে সেটি সবুজ মসজিদ বলে খ্যাতি লাভ করে। এটি মুসলিম স্থাপত্যের ও খোদাই কাজের সবচেয়ে সুন্দর নমুনা বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। সদাশয় সুলতান মসজিদের কাছে একটি মাদরাসা স্থাপন এবং গরিবের জন্য সম্পদ ওয়াকফ করেন। তিনি অন্ধ ভাইকে ব্রুসার কাছে ভূ-সম্পত্তি দান করেন। গৃহযুদ্ধে নিহত ভাই সুলায়মানের এক কন্যাকে রক্ষা করে তাকে বিয়ে দেন। শাহজাদির সন্তান হলে তাকে তিনি সম্পদ ও অর্থ প্রদান করেন। ৬৫

টিকাঃ
৬০. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬
৬১. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮-৩৯
৬২. জর্জ ফ্রান্তেজ ১১১-১২ qt. Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৩. বদরুদ্দিনের চিন্তাধারার কয়েকটি দিক: ক. জান্নাত ও জাহান্নামের বস্তুগত অস্তিত্ব অস্বীকার; খ. ক-এর ক্রমধারায় পুনরুত্থান ও কিয়ামত অস্বীকার; গ. ঈমানের দিক দিয়ে ইহুদি, নাসারা ও খ্রিষ্টানরা সমান; ঘ. মুহাম্মাদ অন্য রাসূলগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন, তাঁর রিসালাতও ভিন্ন কিছু নয়; ঙ. মালিকানার অধিকার অস্বীকার এবং রাষ্ট্রের সম্পদে সকল নাগরিকের সমানাধিকারের দাবি। (উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৮)
৬৪. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১
৬৫. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১

📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 মহামতি মুরাদ

📄 মহামতি মুরাদ


[পিতা : প্রথম মুহাম্মাদ, মাতা : দিলকাদির উন্নু আমিনা খাতুন, জন্ম : ১৪০৩, শাসনকাল : ১৪২১-১৪৫১, মৃত্যু : ১৪৫১]

সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ চার পুত্র রেখে মারা যান। পিতার মৃত্যুর সময় জ্যেষ্ঠপুত্র মুরাদের (জন্ম : আমাসিয়া, ১৪০৩ বা ১৪০৪) বয়স ছিল আঠারো, দ্বিতীয় পুত্র মুস্তাফার তেরো, বাকি দুজন শিশু। স্বাভাবিকভাবে মুরাদই হবেন পরবর্তী সুলতান। মৃত্যুর প্রাক্কালে দুই শিশুপুত্রকে বাইজেন্টাইন সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অসিয়ত করেন সুলতান। দুই মন্ত্রী বায়েজিদ পাশা ও ইবরাহিম তা-ই করেন। মুরাদ ছিলেন এশিয়ায়। পিতা অসুস্থ বলে তাঁকে সংবাদ দেওয়া হয়। ক্ষমতারোহণ নির্ঝঞ্জাট করার জন্য ৪০ দিন পর্যন্ত সুলতানের মৃত্যুর খবর গোপন রাখেন মন্ত্রীরা। এরই মাঝে মুরাদ এসে অভিষিক্ত হন।
প্রত্যেক তুর্কি সুলতানের ন্যায় মুরাদকেও এশিয়া-ইউরোপে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়। মুরাদ প্রথমে কারমান-রাজ ও হাঙ্গেরির রাজার সাথে ইতঃপূর্বে সম্পাদিত পাঁচ বছরের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সালতানাতের এশীয় অংশের বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দমনে একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হওয়া।

মুস্তাফার বিদ্রোহ দমন
কিন্তু বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেন না। আঠারো বছরের কিশোরের ক্ষমতাসীন হওয়াকে সম্রাট সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। সুলতান মুহাম্মাদের সাথে কৃত চুক্তিবলে তার ভাই (বর্তমান সুলতান মুরাদের চাচা) মুস্তাফা সম্রাটের কাছে নজরবন্দি ছিল। ম্যানুয়েল তাকে শুধু মুক্তই করেননি; বরং তরুণ সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন। সেনাপতি দিমিত্রি লাসকারিসের নেতৃত্বে ২০টি সামরিক নৌযান দিয়ে মুস্তাফাকে সমৃদ্ধ করেন সম্রাট। নিজেকে সুলতান দাবি করে মুস্তাফা এ বলে প্রচারকাজ শুরু করেন, পিতৃব্য বেঁচে থাকতে ভ্রাতুষ্পুত্রের সুলতান হওয়ার কোনো অধিকার নেই। সালতানাতের ইউরোপীয় প্রদেশগুলো একে একে মুস্তাফার হস্তগত হয়। এক পর্যায়ে সুলতানের সেনাপতি বায়েজিদ পাশা এগিয়ে এলেন সালতানাত রক্ষায়। কিন্তু মুস্তাফা নিজেকে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রকৃত সুলতান দাবি করে বায়েজিদের বহু সৈনিককে বাগিয়ে নেন। যুদ্ধে মুরাদের সেনাপতি পরাজিত ও নিহত হন। আত্মবিশ্বাসী মুস্তাফা সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এশিয়ায় প্রবেশ করেন। ব্রুসার কাছে উলুবাদ নদীর তীরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। কিন্তু এবার লড়াই হয় না, কেবল ভ্রাতুষ্পুত্রের কৌশলের কাছে হেরে যান মুস্তাফা। তিনি পালিয়ে গ্যালিপোলি দুর্গে আশ্রয় নিলেন। সুলতান সহসা তা জয় করেন এবং ম্যানুয়েলের হাতের পুতুল মুস্তাফা ধৃত ও নিহত হয়। ৬৬

কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ
সুলতান মুরাদ বিপদমুক্ত হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বাইজেন্টাইন সম্রাটকে শিক্ষা দিতে মনস্থ করেন। ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট (৩ রমজান, ৮২৫ হি.) তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করে আক্রমণ শানান। কিন্তু ৬৪ দিন স্থায়ী এ অবরোধে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য অর্জিত হয় না। সম্রাট ম্যানুয়েলের ধূর্ততা কনস্ট্যান্টিনোপলকে রক্ষা করে। তিনি সুলতানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৩ বছর বয়সি মুস্তাফাকে বিদ্রোহে উৎসাহ দেন। জামিয়ান ও কারামানের রাজারা সৈন্য দিয়ে শাহজাদাকে সাহায্য করেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থান দখল করে মুস্তাফা ব্রুসা অবরোধ করেন। কিন্তু মুরাদ এত দ্রুত সেখানে উপস্থিত হন যে, বাধা প্রদান অর্থহীন দেখে মুস্তাফা পালিয়ে যান। সুলতানের কিছু সৈনিক দ্রুতই বিদ্রোহী ভ্রাতা ও তার বহু অনুচরকে ধরে হত্যা করে। ৬৭
বিদ্রোহ দমনে সুলতানের সাফল্য দেখে সম্রাট ম্যানুয়েল ভয় পেলেন। তিনি বার্ষিক ৩০ হাজার (কোনো কোনো সূত্রে ৩ লাখ) ডুকাট কর দানের অঙ্গীকার করে এবং ডার্কোস ও সেলিম্বিয়া ব্যতীত স্টাইমন নদী ও কৃষ্ণসাগর তীরের সমস্ত গ্রিক নগর ছেড়ে দিয়ে সুলতানের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন (১৪২৪ খ্রি)। ১৪২৩ সালে ক্যাস্টামোনু-এর শাসক তার অর্ধেক রাজ্য সুলতানকে দিয়ে দেন এবং বিশ্বস্ততার নিদর্শনস্বরূপ তার মেয়ের সাথে মুরাদের বিয়ে দেন। তুর্কি সৈন্যরা গ্রিসে অভিযান চালিয়ে করিন্থের ইস্থমাস প্রাচীর ভেঙে ফেলে। সম্রাট ম্যানুয়েল এটি নির্মাণ করেছিলেন। মোরিয়াও তুর্কিদের পদানত হয়। ৬৮

বিদ্রোহ দমন পরের বছর পুরোনো বিশ্বাসঘাতক কারা জুনাইদ আয়দিন দখল করে। অচিরেই সেনাপতি বায়েজিদ পাশার ভাই হামজা বেগ তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। এ লোকটি সুলতান প্রথম মুহাম্মাদের কাছ থেকেও দুবার ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এবার তার মৃত্যুর মাধ্যমে সালতানাত একজন জাত শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পায়।
আয়দিন, সারুখান ও মিনতশাসহ কয়েকটি ক্ষুদ্ররাজ্য আবারও সালতানাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। তাইমুর লং এগুলোকে স্বাধীন করে দিয়েছিলেন। সুলতানের বাহিনীর হাতে কামরান শাসক মুহাম্মাদ বেক নিহত হলে তার রাজ্যও মুরাদের হাতে আসে। সুলতান অবশ্য সাবেক শাসকের পুত্র ইবরাহিমকে আনুগত্যের শর্তে পিতৃরাজ্য শাসন করতে দেন।
১৪২৮ সালে জামিয়ানের বয়োবৃদ্ধ রাজা ইয়াকুব বেগ মারা যান। তার কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায় তিনি নিজেই রাজ্যটি (কুতাহিয়া) সুলতানকে দিয়ে যান। তাইমুর যে রাজ্যগুলোকে তুর্কি সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন করেছিল, এভাবে সেগুলো পুনরায় সালতানাতভুক্ত হয়। ৬৯

ইউরোপে সুলতানের কার্যাবলি এশিয়ায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর মুরাদ ইউরোপে মনোযোগী হন। প্রথমেই হাঙ্গেরির সাথে যুদ্ধ বাধে। দানিয়ুব নদীর উত্তর তীরের শহর কলম্বাস ৭০ দখল করার পর হাঙ্গেরির রাজা সুলতানের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। চুক্তির ফলে দানিয়ুবের ডান তীরে তুর্কি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হাঙ্গেরির পরিণতি দেখে সার্বিয়ার রাজা জর্জ ব্রাঙ্কোভিচ বার্ষিক ৫০০০০ ডুকাট স্বর্ণমুদ্রা কর প্রদান ও যুদ্ধের সময় সুলতানের সাহায্যে একদল উৎকৃষ্ট সৈনিক প্রেরণের শর্তে চুক্তি করেন। তিনি হাঙ্গেরির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও সম্মত হন। তা ছাড়া বিশ্বস্ততার প্রমাণস্বরূপ সুলতানের সাথে আপন কন্যা মারা ব্রাঙ্কোভিচের বিবাহ দেন।
১৪৩০ সালে ১৫ দিন অবরোধের পর তিনি Thessalonica পুনর্দখল করেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট অষ্টম জনের এক ভাই ডেসপট উপাধি ধারণ করে এই শহর শাসন করতেন। তার একার পক্ষে তুর্কিদের প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় দেখে কিছু অর্থের বিনিময়ে শহরটি ভেনিসের কাছে বিক্রি করে দেন। ভেনিসিয়ানরা বাণিজ্যের উন্নতির মাধ্যমে এটিকে দ্বিতীয় ভেনিস বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তুর্কিরা এটা মেনে নেয়নি। সুলতান নিজে অভিযানে বের হয়ে Thessalonica জয় করেন।
এবার তিনি কনস্টান্টিনোপল জয়ে মনস্থ করেন। কিন্তু এর পূর্বে তিনি বাইজেন্টাইন রাজধানীর সাথে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সম্পর্কচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ লক্ষ্যে প্রথমেই আলবেনিয়া অভিযান পরিচালনা করেন। জেনিনাসহ কয়েকটি শহরের বাসিন্দারা স্বশাসনের সুযোগ বহাল রাখার শর্তে আনুগত্য স্বীকার করে। আলবেনিয়ার উত্তরাংশের শাসক জন কাস্ট্রিয়ট তার চার পুত্রকে সুলতানের কাছে বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। ১৪৩১ সালে তার মৃত্যু হলে রাজ্যটি সালতানাতভুক্ত হয়।
১৪৩১ সালে ওয়ালেচিয়ার রাজা ড্রাকুল তুর্কিদের বশ্যতা স্বীকার করে। তবে একাকী যুদ্ধ করা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই সে এমনটা করেছিল। কিছুদিনের মধ্যে হাঙ্গেরির উসকানিতে ড্রাকুল ও সার্বিয়ার রাজা বিদ্রোহ করে বসে। ফলে সুলতান তাদের দমন করতে বাধ্য হন। বহু জনপদ ধ্বংস করে ১৪৩৮ সালে ৭০ হাজার বন্দিসহ তিনি ফিরে যান। পরের বছর সার্বিয়ার রাজা ব্রাঙ্কোভিচের বিদ্রোহ প্রকাশ পায়। ফলস্বরূপ সুলতান আন্দরিয়া দখল করে বেলগ্রেড অবরোধ করেন। ৭১
অচিরেই জন হুনিয়াডি নামে এক মারাত্মক চতুর শত্রুর আবির্ভাব হয়। হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমান্ড ও এলিজাবেথ মর্সিনি নামে এক সুন্দরী বালিকার অবৈধ সংশ্রবের ফল জন হুনিয়াডি। তিনি সাদা কাপড় পরতেন বলে খ্রিষ্টানরা তাকে 'শ্বেত নাইট' বলত। ইতালির যুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে ট্রান্স সিলভানিয়ার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। ইতোমধ্যে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার রাজা লেডিসলাস হাঙ্গেরির সিংহাসনে বসেন।
১৪৪২ সালে মুরাদের বেলগ্রেড অভিযান ব্যর্থ হয়। ওদিকে তুর্কি সেনাপতি মজিদ বে ট্রানসিলভানিয়ার অন্তর্গত হার্মনস্টাড অবরোধ করেন। লেডিসলাস তখনও নাবালক, তাই হাঙ্গেরির প্রকৃত শাসক ছিলেন হুনিয়াডি। ১০ হাজার সৈনিক নিয়ে নগর উদ্ধারে এগিয়ে এলেন তিনি। যুদ্ধে তুর্কিরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয়। ২০ হাজার মুসলিম নিহত হয়। মজিদ বে পুত্রসহ ধরা পড়েন। হুনিয়াডি সবার সামনে তাদের খণ্ড-বিখণ্ড করে নৃশংসতার স্বাক্ষর রাখলেন।
এবার সুলতান আরেক সেনাপতি শিহাবুদ্দিন পাশাকে ৮০ হাজার সৈনিকসহ প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনিও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ১৪৪৩ সালে হুনিয়াডি আরও বড়ো বাহিনী প্রস্তুত করেন। তার সাথে যোগ দিলো পোল্যান্ড, সার্বিয়া ও ওয়ালেচিয়ার বাছাবাছা সৈনিকেরা। ইতালি হতে পোপও একদল সৈনিক পাঠালেন কার্ডিনাল জুলিয়ানের নেতৃত্বে। ফ্রান্স ও জার্মানিও বাদ গেল না। রাজা লেডিসলাস নিজে সৈন্যদের সাথে ময়দানে অবতীর্ণ হন। ওদিকে কারামানরাজও পূর্বপরিকল্পনামতো বিদ্রোহ করেন। সুলতানকে বাধ্য হয়ে এশিয়া মাইনরে গমন করতে হয়। মুরাদের অনুপস্থিতিতে তাঁর সৈন্যরা হুনিয়াডির বাহিনীর সাথে পেরে উঠল না। মোরাভা নদীর তীরে দুই দলের মাঝে লড়াই হয়। পরাজিত তুর্কি বাহিনী পালিয়ে যায় বলকানের দক্ষিণে। মাঝে মারা যায় ১ হাজার তুর্কি আর বন্দি হয় ৪ হাজার।
তখন ছিল শীতের মৌসুম। প্রাকৃতিক বাধা মাড়িয়ে হুনিয়াডি বলকান অতিক্রম করে ইসলাদি গিরি সংকটের পথে দক্ষিণের সমতল ভূমিতে অবতরণ করেন। বারংবার পরাজয়ে এমনিতেই তুর্কিদের মনোবল ছিল না। ফলে ইউরোপীয় তুরস্ক সহজেই হুনিয়াডির পদানত হয়।
সুলতান মুরাদ এশিয়ায় সফল হলেও ইউরোপে তাঁর সেনাপতিরা বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন। তা ছাড়া হুনিয়াডির মতো সেনাপতির নেতৃত্বে খ্রিষ্টান সংঘের বাহিনীও হয়ে উঠেছিল অদম্য। তাই তিনি দূরবর্তী প্রদেশগুলো ছেড়ে সালতানাতের অবশিষ্টাংশে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মনস্থ হন। ওদিকে তাঁর ভগ্নিপতি মাহমুদ চেলেবি হুনিয়াডির হাতে বন্দি হন। তাকে উদ্ধার করার জন্য বোনের বিশেষ অনুরোধও সুলতানকে শান্তি-আলোচনায় উৎসাহ দিলো। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ১০ বছরের জন্য শান্তিরক্ষা করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে দুই পক্ষ সেজেদিনে এক সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন (জুলাই ১৩, ১৪৪৪/২৬ রবিউল আউয়াল, ৮৪৮ হিজরি)। এর ফলে সার্বিয়া স্বাধীনতা পায় এবং ওয়ালেচিয়া হাঙ্গেরির অন্তর্ভুক্ত হয়। সুলতানের ভগ্নিপতি মাহমুদ মুক্তি পান; বিনিময়ে হুনিয়াডি ৬০,০০০ ডুকাট মুক্তিপণ লাভ করেন। ৭২

মুরাদের সিংহাসন ত্যাগ
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কিছুদিন পর মুরাদের বড়ো পুত্র আলাউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। পুত্রশোকে কাতর সুলতান দুনিয়াদারি বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। মেজো পুত্র ১৪ বছর বয়সি মুহাম্মাদের অনুকূলে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি আয়দিনে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। সেখানে মুত্তাকি-পরহেজগার ব্যক্তিদের সাথে ইবাদত- বন্দেগিতে মশগুল হন।

চুক্তি ভঙ্গ করেন হুনিয়াডি
সুলতানের পদত্যাগের খবর পৌঁছামাত্র সক্রিয় হয়ে উঠলেন কার্ডিনাল জুলিয়ান সিজারেনি (১৩৯৮-১৪৪৪)। তিনি লেডিসলাসকে সন্ধিভঙ্গে প্ররোচিত করতে লাগলেন এই বলে, মুসলমানদের সাথে সম্পাদিত সন্ধি ভঙ্গ করলে কোনো পাপ হবে না। বুলগেরিয়ার সিংহাসন লাভের প্রতিশ্রুতি পেয়ে হুনিয়াডির মন গলল। তিনি সন্ধি ভঙ্গ করতে সম্মত হন। এমন ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা হুনিয়াডির মতো শ্রেষ্ঠ সেনাপতির জীবনে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করে। ৭৩

বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম
সরাসরি যুদ্ধে হুনিয়াডি বহুবার তুর্কি বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু সুলতানের অবসরের সুযোগে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের প্ররোচনায় মুসলিম দমনের যে কূটকৌশল গ্রহণ করেন, তা সফল হয়নি। চুক্তির বছরের ১ সেপ্টেম্বর লেডিসলাস ও জুলিয়ানের সহযোগিতায় ২০ হাজার সৈনিক নিয়ে তুর্কি দলনে অগ্রসর হন হুনিয়াডি। মাঝপথে ওয়ালেচিয়ার রাজা ড্রাকুলও যোগ দেন তাদের সাথে।
ক্যাথলিক বাহিনী বুলগেরিয়ার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়ার পথে দেশীয় অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের গ্রাম ও গির্জা পুড়িয়ে দেয়। এটি ছিল অপ্রয়োজনীয় নৃশংসতা। দানিয়ুব পার হয়ে তারা কৃষ্ণসাগরের তীরে পৌঁছায়। সেখানে তারা একটি ক্ষুদ্র তুর্কি নৌবহর ধ্বংস করে। সুন্নিয়াম, পেজেসসহ বহু দুর্গ তাদের দখলে আসে; তুর্কি রক্ষীদের হত্যা বা উচ্চ স্থানে নিক্ষেপ করা হয়। কাভার্না জয় করে খ্রিষ্টান সৈন্যরা কৃষ্ণতীরের শহর ভার্না অবরোধ ও দখল করে। লেডিসলাসের স্বপ্ন ছিল তিনি দ্রুত কনস্ট্যান্টিনোপলে পৌঁছে বাইজেন্টাইন সম্রাটের জামাতা হিসেবে অভিষিক্ত হবেন।
তুর্কি সালতানাতের কল্যাণকামীরা ভয়াবহ বিপদ আঁচ করতে পেরে মুরাদকে নির্জনবাস থেকে ফিরিয়ে আনেন। মুরাদ আবার রাজদণ্ড হাতে নেন। ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে অক্লান্ত সুলতান বসফরাস পাড়ি দিয়ে দ্রুত সামনে অগ্রসর হন। ১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর (২৮ রজব, ৮৪৮ হিজরি) দুই পক্ষ পরস্পরের মুখোমুখি হয়। ভগ্ন সন্ধির একখানা প্রতিলিপি হয় তুর্কিদের পতাকা। উদ্দেশ্য : দুনিয়াবাসী যেন দেখে, বিশ্বাসঘাতকের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ লড়াই একটি ন্যায্য সংগ্রাম। আর আসমান-জমিনের মালিক যেন ন্যায়ের পক্ষে বিজয় দান করেন।
যুদ্ধের প্রাক্কালে অকস্মাৎ এক ঝড় এসে খ্রিষ্টানদের সমস্ত পতাকা ভূমিস্যাৎ করে দেয়। কেবল রাজার পতাকা উড্ডীন থাকে। প্রাণপণ লড়াই করে খ্রিষ্টানরা দুর্লক্ষণ মিথ্যা প্রমাণে সচেষ্ট হয়। হুনিয়াডি তুর্কি বাহিনীর এশীয় সৈনিকদের হটিয়ে দেন। অপর পাশে ওয়ালেচিয়ার সৈনিকরা সফল হয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল-খ্রিষ্টানদেরই জয় হবে। এমন সময় আনাতোলিয়ার বেগলার বেগ কারাজা তার বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রভাগে চলে আসেন। অবস্থা বেগতিক দেখে মুরাদ পশ্চাদপসরণ করার জন্য অশ্ব ফেরালেন। তুর্কিদের সৌভাগ্যই বলতে হবে, কারাজা নিকটেই ছিলেন। তিনি সুলতানের অশ্বের লাগাম ধরে তাঁকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। এক লহমায় সুলতানের হুঁশ ফিরে আসে। তিনি জেনিসেরিদের প্রাণপণে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। ফলে অল্পকালের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। হাঙ্গেরির রাজা লেডিসলাসের অশ্ব মারা পড়ে। তুর্কি সৈন্যরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। খাদার আগা নামের এক বৃদ্ধ জেনিসেরি এক আঘাতে তার মাথা কেটে ভগ্ন সন্ধিপত্রের সাথে বর্শাগ্রে বিদ্ধ করে।
এই একটি ঘটনা যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে পালটে দেয়। হাঙ্গেরির অভিজাতরা তাদের রাজার পরিণতি দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাতে থাকে। রাজার মৃতদেহ উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা শেষে হুনিয়াডি অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যান। খ্রিষ্টান বাহিনীর নেতৃহীন পশ্চাৎ সৈন্যরা পরদিন প্রতুষ্যে তুর্কিদের হাতে বেঘোরে কাটা পড়ে। এই ঘৃণিত সন্ধি ভঙ্গের প্রধান উসকানিদাতা ও যুক্তিদাতা জুলিয়ান নিজেও নিহত হন। ভার্নার বিজয় সার্বিয়া ও বসনিয়াকে আবারও তুর্কি সালতানাতভুক্ত করে। এভাবে তুর্কিদের হাত থেকে বলকান অঞ্চলকে বাঁচানোর সর্বশেষ কেন্দ্রীভূত প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।৭৪
নিকোপলিসের পর আবারও সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তুর্কিরা জয়লাভ করে। এ বিজয়ে মুসলিম দুনিয়ায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ভার্নার বিজয়ের খবর কায়রোতে পৌঁছলে (১/০৪/১৪৪৪) মামলুক সুলতান জাকমাক পরবর্তী জুমার খুতবায় আব্বাসি খলিফার পাশাপাশি সুলতান মুরাদের নাম উচ্চারণের নির্দেশ দেন। শহিদদের জন্য দুআ করা এবং কায়রোর সড়কে বিজয় শোভাযাত্রা বের হয়। ৭৫

ইস্কান্দার বেগ সৃষ্ট গোলমাল
ভার্নার বিজয়ের পর মুরাদ আবারও ম্যাগনেসিয়ায় নির্জনবাস গ্রহণ করেন। অচিরেই জেনিসেরিরা অবাধ্য হয়ে রাজধানী এদিন লুট করে। সালতানাতের শুভাকাঙ্ক্ষীরা অশনি সংকেত দেখেন। তাদের অনুরোধে ১৪৪৪ সালের প্রারম্ভে মুরাদ আবারও রাজদণ্ড হাতে নেন। বিদ্রোহের হোতাদের শাস্তি দিয়ে অন্যদের ক্ষমা করেন। এবার তিনি ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন। জেনিসেরি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখার লক্ষ্যে তিনি বাইজেন্টাইন ভূমিতে অভিযান পরিচালনা করেন। সম্রাট ম্যানুয়েলের সাম্রাজ্য বণ্টনের সিদ্ধান্ত মুরাদের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল ও তার উপকণ্ঠ জনকে এবং মোরিয়া ও থেসালিয়ার অংশবিশেষ কনস্ট্যান্টাইনকে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সুলতানের অভিপ্রায় জানতে পেরে কনস্ট্যান্টাইন করিন্থ যোজক বরাবর ছয় মাইল দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেন। সুলতানের সৈন্যরা কামান দাগিয়ে প্রাচীর ছিদ্র করে করিন্থ শহর দখল করে নেয়।
তবে মোরিয়া অধিকারের প্রচেষ্টা সফল হয়নি সুলতানের। কারণ, আলবেনিয়ায় ইস্কান্দর বেগের বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ বেড়ে গিয়েছিল। উত্তর আলবেনিয়ার শাসক জন ক্যাস্ট্রিয়টের চার পুত্র মুরাদের কাছে বন্ধক ছিল। এদেরই একজন ইস্কান্দার বেগ। সে বাহ্যিকভাবে মুসলিম হয়েছিল। ১৪৪৩ সালে সুলতান যখন হুনিয়াডির সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত, তখন সে সালতানাতের প্রথম সচিবের কাছ থেকে এই মর্মে একটি আদেশ জারি করান যে, তাকে আলবেনিয়ার আক হিসারের শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণ করার সাথে সাথে আরনাউদ গোত্রসমূহের সর্দারদের সে তার গোপন অভিসন্ধি প্রকাশ করে এই বলে, সে পিতৃভূমিকে তুর্কিদের হাত হতে মুক্ত করতে চায়। তাদের আর্থিক ও জনবলের সাহায্যে সে একটি বাহিনী গঠন করে ১৪৪৩ সালে তুর্কি সেনাপতি আলি পাশাকে পরাজিত করে। সুলতানের নির্জনবাস ও হাঙ্গেরির সাথে যুদ্ধব্যস্ততাকে সে প্রভাব বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। ভার্না যুদ্ধের সমাপ্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে ইস্কান্দার বেগের প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পেলেন মুরাদ। ১ লাখ সৈনিক সমভিব্যহারে এগিয়ে গিয়ে ১৪৪৭ সালেই তিনি তার হাত হতে দুটি নগরী ছিনিয়ে নেন।

দ্বিতীয় কসোভো যুদ্ধ
ইতোমধ্যে আবারও হুনিয়াডির প্রাদুর্ভাব ঘটে। এবার তিনি সার্বিয়া মাড়াচ্ছিলেন, সাথে ছিল ২৪ হাজার সৈন্য; যাদের মধ্যে ১০ হাজার ওয়ালেচিয়ান। ১৪৪৮ সালে সুলতান নিজে পুনরায় হুনিয়াডির মুখোমুখি হন কসোভো প্রান্তরে। এটিকে দ্বিতীয় কসোভো যুদ্ধ বলে। ১৩৮৮ সালে ইউরোপীয়রা কসোভোর ময়দানে সুলতান প্রথম মুরাদের হাতে পরাজিত হয়েছিল। ৬০ বছর পর ১৪৪৮ সালে একই ময়দানে তারা দ্বিতীয় মুরাদের হাতেও পরাজিত হয়।
এখানে হুনিয়াডিকে পরাজিত করে সুলতান আবার ছোটেন ইস্কান্দার বেগকে দমন করতে। কিন্তু কিছুদিন আক হিসার শহর অবরোধ করেও তাকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হন। এমনকী কর প্রদানের বিনিময়ে সে চুক্তি করতেও রাজি হয়নি। দীর্ঘ যুদ্ধে বহু সৈন্যের প্রাণহানি ও অবশিষ্টদের ক্লান্তির কারণে সুলতান রাজধানীতে ফিরে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে ইস্কান্দারকে শিক্ষা দিতে মনস্থ হন। কিন্তু তার আগেই ১৪৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি (৫ মুহাররম ৮৫৫ হি.) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৩০ বছর ধরে রাজ্য শাসনকারী সুলতানের বয়স হয়েছিল ৪৯। তাঁর মরদেহ ব্রুসায় স্থানান্তরিত করা হয়।
বহুবিধ গুণাবলি ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ। তিনি কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। শান্তির সময়ে তিনি সপ্তাহে দুই দিন কবিদের মজলিসে উপবেশন করতেন। তাদের ভাতা দিতেন-যাতে তারা জীবিকার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত না হয়ে কাব্যসাধনায় নিমগ্ন হতে পারেন। সুলতান নিজেও কাব্যচর্চা করতেন। কবিরা সুলতানকে এতই ভালোবাসতেন, তারা তাঁর সাথে যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করতেন।
তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, ধর্মপরায়ণ, সৎ, সাহসী, সহিষ্ণু, সদয়, মুক্তহস্ত ও মহামান্য সুলতান। শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁর চেয়ে বেশি উৎসাহ আর কেউ দেয়নি। তাঁর আমলে জনগণ সুখী ও নিরাপদ ছিল। যখনই তিনি কোনো জনপদ জয় করতেন, সেখানে তিনি মসজিদ, মাদরাসা, সরাইখানা, ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতেন। আরকানা নদীর ওপর তিনি ৩৯২ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করেন। সেতুটি নির্মাণ করতে ১৬ বছর সময় লেগেছিল। প্রতিবছর তিনি মক্কা-মদিনা ও জেরুজালেমের ধার্মিক বাসিন্দাদের ৩৫০০ স্বর্ণমুদ্রা দান করতেন। যুদ্ধ ও সন্ধিতে তাঁর সততা ছিল অতুলনীয়। তিনি কখনো সন্ধি ভঙ্গ করেননি। সে যুগের খ্রিষ্টান রাজারা সততায় তাঁর ধারে কাছেও ছিল না। তাঁর উদারতাও প্রশংসনীয়। হাঙ্গেরির রাজা লেডিসলাস যেখানে নিহত হন, সেখানে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করে তার সাহসের প্রশংসা ও দুর্ভাগ্যের জন্য শোক প্রকাশ করে শিলালিপি খোদাই করেন।
সেই যুগে তাঁর ন্যায় স্নেহপরায়ণ ও দয়াদ্র শাসকের দেখা মেলা ভার। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অনেক সময় শাসকরা নির্দয় আচরণ করেন। সুলতান মুরাদ কখনো তা করেননি। ভ্রাতৃহত্যা তো দূরের কথা; তিনি তাদের সসম্মানে ও সস্নেহে পালন করেছেন। জামিয়ানের এক রাজার সাথে সুলতানের এক বোনের বিয়ে হয়। বিদ্রোহী তৎপরতার কারণে সুলতান তাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন, কিন্তু বোনের খাতিরে ভগ্নীপতিকে ক্ষমা করে দেন। তাঁর আরেক ভগ্নিপতি মাহমুদ চেলেবি হুনিয়াডির কাছে বন্দি ছিলেন। মুখ্যত তাঁকে উদ্ধারের জন্যই তিনি সেজেদিনের সন্ধি করেন।
সুলতান পুত্রস্নেহে এত কাতর ছিলেন, ১৪ বছর বয়সি পুত্রের হাতে সালতানাতের দায়িত্ব দিয়ে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। আবার পুত্র বিপদে পড়লে নির্জনতা ছেড়ে রাজদণ্ড গ্রহণ করেন। রাজার পক্ষে এমন স্নেহপরায়ণতা জগতে দুর্লভ। সত্যিই তিনি মহামতি। ৭৮
সুলতানের সম্পর্কে সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ কানকুনডাইলাস বলেন— 'তিনি ছিলেন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ।'
ইতিহাসবিদ ভন হ্যামার বলেন—
'সুলতান মুরাদ ন্যায়পরায়ণতা ও গৌরবের সাথে ৩০ বছর রাজ্য শাসন করেছেন। তিনি ধর্মভেদ বিবেচনায় না এনে সকল নাগরিকের সাথে ন্যায়ানুগ আচরণ করতেন। যুদ্ধে ও শান্তিতে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেন। তিনি সন্ধিকে প্রাধান্য দিতেন। তবে প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে কুণ্ঠিত হতেন না। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের থেকে তিনি কঠিন প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর বিচক্ষণতা এক মুহূর্তের জন্যও লোপ পায়নি।'৭৯

টিকাঃ
৬৬. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩; আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০; Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৭. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩-৫৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০; Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৮. Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৯. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ ১৫৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, ১২১
৭০. এটি কোসেভু শহর, যা বেলগ্রেডের পূর্ব দিকে অবস্থিত।
৭১. Vasiliev, op.cit. p. 641; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৫
৭২. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬-৫৭
৭৩. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫
৭৪. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭-৫৮; Marsh, op.cit. p. 548
৭৫. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭
৭৬. আক মানে সাদা আর কারা এর অর্থ কালো; অনেক উসমানি শহরের নামে আক ও কারা শব্দ দেখা যায়। আক হিসার মানে সাদা দুর্গ বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-৫৯
৭৮. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩০; হারব, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৬
৭৯. qt. in উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩০।

📘 সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ > 📄 মুহাম্মদ ফাতিহ : প্রাথমিক জীবন

📄 মুহাম্মদ ফাতিহ : প্রাথমিক জীবন


[পিতা: দ্বিতীয় মুরাদ, মাতা: হুমা খাতুন, জন্ম: ১৪২৮, শাসনকাল : ১৪৫১-১৪৮১, মৃত্যু : ১৪৮১]

সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ও হুমা খাতুনের পুত্র মুহাম্মাদ ১৪২৮ (কারও মতে ২০ এপ্রিল, ১৪২৯) সালে (৮৩৩ হিজরি) ইদিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উসমান বংশের সপ্তম সুলতান। ইতঃপূর্বে মুহাম্মাদ নামে আরও একজন সুলতান ছিলেন বলে তিনি 'দ্বিতীয় মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত। কনস্ট্যান্টিনোপল বিজেতা এই সুলতানের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উপাধি হলো 'ফাতিহ'। আরবি বিশেষণ 'ফাতিহ'-এর অর্থ হলো বিজেতা। তাঁর আরেকটি উপাধি হলো 'আবুল খায়রাত' (নেক আমলের জনক)।
বাল্যকাল থেকেই মুহাম্মাদ বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি যেমনি ছিলেন শক্তিশালী ও সাহসী, তেমনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচলিত শাখায়ও তাঁর বুৎপত্তি ছিল। প্রিন্স কলেজে অধ্যয়নকালে জ্ঞানচর্চায় তাঁর প্রতিভার বিকাশ লক্ষ করা যায়। সেকালের সেরা বিদ্বানদের তাঁর শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তিনি ছিলেন বহুভাষী। মাতৃভাষা তুর্কি ছাড়াও আরও ছয়টি ভাষা জানতেন। যেমন-আরবি, ফারসি, হিব্রু, ল্যাটিন, গ্রিক ও স্লাভ। খ্রিষ্টান শিক্ষক ইউরগিওস আমিরুটজেস (Yorgios Amirutzes)-এর কাছে তিনি ক্লাসিক্যাল গ্রিক শেখেন। সিরিআকো অ্যানকোনিট্যাটো [Ciriaco Anconitato (1391-1455)] নামে এক ইতালীয় শিক্ষকের থেকে তিনি লাতিন ভাষা, প্রাচীন ইতিহাস ও ভূগোল অধ্যয়ন করেন। গিওভানি মারিও অ্যানজিয়েলেলো (Giovanni Mario Angiolello) নামে এক ভেনিসিয়ান পরিব্রাজক ও ইতিহাসবিদদের কাছে তিনি ইউরোপ ও ইতালির ইতিহাস অধ্যয়ন করেন।
ডলফিন লিখেছেন, শাহজাদা মুহাম্মাদ তাঁর শিক্ষকদের কাছে গ্রিক ইতিহাসবিদ Laertius ও Herodotus এবং রোমান ইতিহাসবিদ Livy ও Quintus Curtius-এর গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করেন। এভাবে তিনি আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, জুলিয়াস সিজারসহ অন্যান্য সম্রাটদের জীবনী এবং ফ্রান্স, লম্বার্ডির রাজা ও পোপদের কাহিনি গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করেন। ৮০
জনৈক বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদের বর্ণনায় দেখা যায়-সুলতান মুহাম্মাদ সমকালীন বিজ্ঞানের নানা শাখা, বিশেষত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলের জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন। ইউরোপের রাজ্যেগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করে তিনি একটি বড়ো মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। গণিতশাস্ত্রেও তাঁর মোটামুটি জ্ঞান ছিল। পিতার মতো সুলতান ফাতিহও মৌলভি ছিলেন। ইসলামি শাস্ত্র শিক্ষাদানের জন্য পিতা সুলতান মুরাদ অনেক শিক্ষক নিয়োগ দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমির আদিল চেলেবি, শাইখ আহমদ কুরানি, শাইখ আক শামসুদ্দিন, শাইখুল ইসলাম মওলা খসরু, নিশানজি মোল্লা সিরাজুদ্দিন পাশা প্রমুখ। এই শিক্ষকদের মধ্যে শাইখ আক শামসুদ্দিন ও শাইখ আহমদ কুরানির বিপুল প্রভাব ছিল সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহের ওপর। বিজয়াভিযানের আলোচনায় এ বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
শিল্পকলার প্রতি তাঁর আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায় ইতালীয় চিত্রকরদের আমন্ত্রণ জানানো ও তাদের পুরস্কৃত করার ঘটনায়। ফাতিহ কর্তৃক নিমন্ত্রিত চিত্রকরদের মাঝে ছিলেন বিখ্যাত ভেনিসিয়ান চিত্রকর ম্যাথু পাসি ও জেন্টাইল বেলিনি। ৮১ প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চা সুলতানের জীবনে ব্যর্থ হয়নি। পরবর্তী জীবনে শাসনকাজে ও বিজয়াভিযানে এ অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল।
তুর্কি প্রাসাদের রেওয়াজ অনুসারে কঠিন নিয়মানুবর্তিতার মাঝে বেড়ে উঠেন মুহাম্মাদ। ভবিষ্যতের তুর্কি সুলতানের জন্য শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস ও ভাষাজ্ঞান যথেষ্ট ছিল না; সামরিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন ছিল। তাই সেকালের দক্ষ সমরবিদ ও কৌশলবিদগণকে তাঁর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। সমরবিদ্যায় তাঁর প্রশিক্ষক ছিলেন উজির সারিজা কাসিম পাশা (১৪৬০), দামাদ জাগানুশ মুহাম্মাদ পাশা (১৪৬২), খাদার চেলেবি (১৪৫৯) ও খাদিম সুলায়মান পাশা (১৪৯৩)। এভাবে কঠোর সামরিক, বৈষয়িক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেড়ে উঠেন ভবিষ্যতের উসমানি সুলতান শাহজাদা মুহাম্মাদ।
প্রথমবার সিংহাসন লাভ: ১৪৪৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে শাহজাদা মুহাম্মাদ প্রথমবারের মতো সিংহাসনে আসীন হন, যখন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ সিংহাসন ত্যাগ করে আয়দিনে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। ওই বছর সুলতান মুরাদ হুনিয়াডির সাথে শান্তিচুক্তি করেন। এর কিছুদিনের মধ্যে সুলতানের বড়ো পুত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আলাউদ্দিন মারা যান। এ শোকে সুলতানের কাছে দুনিয়াদারি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। মেজোপুত্র মুহাম্মাদের হাতে ক্ষমতা ত্যাগ করে তিনি মুত্তাকি পরহেজগার লোকদের সাথে সময় কাটাতে থাকেন। তবে শাহজাদা মুহাম্মাদের এই ক্ষমতারোহণ মোটেও স্থায়ী হয়নি।
ওই বছরই হুনিয়াডি বিদ্রোহ করলে সালতানাতের কল্যাণকামীরা মহা দুর্যোগের পূর্বাভাস দেখে সুলতানকে ক্ষমতায় ফিরে আসার অনুরোধ জানান। মুরাদ রাজদণ্ড গ্রহণ করে হুনিয়াডিকে উপযুক্ত শাস্তি দেন। ১৪৪৫ সালে সুলতান আবারও ক্ষমতা ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এবার জেনিসেরি বিদ্রোহের কারণে তাঁর অবসর নেওয়া হয় না।
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের ক্ষমতারোহণ : অবশেষে ১৪৫১ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের মৃত্যু হলে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মাদ ক্ষমতারোহণ।
আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কার: ক্ষমতারোহণের সাথে সাথে সুলতান মুহাম্মাদ প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো সংস্কারে মনোযোগী হন। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয় এমনভাবে নির্ধারণ করেন-যাতে অপচয়, অপব্যয় ও বিলাসিতার পথ রুদ্ধ হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের উন্নয়ন ও সংস্কার সাধন, তাদের বেতন বাড়ানো এবং সমকালীন সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হয়।
তারপর তিনি প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার প্রতি মনোযোগী হন। কয়েকজন সাবেক শাসককে স্বপদে বহাল রাখেন। দায়িত্ব পালনে যাদের ব্যাপারে ত্রুটির অভিযোগ এসেছিল, তাদের অপসারণ করেন। এভাবে অভ্যন্তরীণ সংস্কার সাধন শেষে তিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতি মনোযোগী হন; বহু বছর ধরে তাঁর পূর্বপুরুষরা যে শহর জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন।
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের জীবনে সর্বাধিক কৃতিত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল জয়। এ বিষয়টি এ বইয়ের মুখ্য আলোচ্য বিষয়। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সর্বাধিক বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ শহর কনস্ট্যান্টিনোপলের ওপর প্রথমে কিছুটা আলোচনা করা দরকার।

টিকাঃ
৮০. Zorzi Dolfin, "Coronaca" (ff. 313-322), in J. R. Melville Jones, The Siege of Constantinopole: Seven Contemporary Accounts, p. 126.
৮১. Edward Gibbon, The History of the Decline and fall of the Roman Empire, v. 12, p. 8; George Phrantzes, 93-95 qt in উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮১, ১৮৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00