📄 প্রথম মুরাদ
[পিতা: ওরহান গাজি, মাতা: নেয়ুফার খাতুন, জন্ম: ১৩২৬, শাসনকাল: ১৩৬২-১৩৮৯, মৃত্যু: ১৩৮৯]
সুলতান প্রথম মুরাদ ছিলেন সাহসী যোদ্ধা, দানশীল, ধার্মিক, শৃঙ্খলাপরায়ণ, প্রজারঞ্জক, ন্যায়বিচারক ও নির্মাণপ্রিয়। তাঁর চারপাশে জড়ো হয়েছিল অভিজ্ঞ ও দক্ষ একদল সমরবিশারদ—যাদের সমন্বয়ে তিনি গঠন করেছিলেন মজলিশ-উশ-শূরা। তাঁর আমলে যুগপৎভাবে তুর্কি সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত হয়েছিল এশিয়া মাইনরে ও ইউরোপে।
রাজ্যবিস্তার
প্রথম মুরাদ এশিয়া মাইনর ও পূর্ব ইউরোপে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করেন। তবে ক্ষমতায় আরোহণের কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে কারামানিয়ার রাজার বিদ্রোহ দমন করতে হয়। সুলতান ওরহানের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে কারামানিয়ার রাজা আলাউদ্দিন বিদ্রোহ করে বসে। শুধু তাই নয়; তিনি পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র রাজাদেরও বিদ্রোহে উসকানি দিতে থাকেন। মুরাদ আলাউদ্দিনকে পরাজিত করে তার রাজধানী আঙ্কারা জয় করেন। বড়ো বড়ো শহর হারিয়ে অবশেষে আলাউদ্দিন বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হয়। সবশেষে উপায়ন্তর না দেখে নিজের মেয়েকে সুলতানের সাথে বিয়ে দিয়ে মসনদ রক্ষা করেন। অতঃপর মুরাদ পূর্ব ইউরোপে রাজ্যবিস্তারে মনোনিবেশ করেন।
আদ্রিয়ানোপল জয়
বিদ্রোহ দমনের পর সুলতান দলবলসহ হেলেসপন্ট অতিক্রম করেন (১৩৬০)। একই বছর (১৩৬০ খ্রিষ্টাব্দ/৭৬২ হিজরি) বাকলারবেগ লালা শাহিন পাশা গ্রিক মহানগরী আদ্রিয়ানোপলও জয় করেন। ত্রিনদীর মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বলকান অঞ্চলে এই শহরটির কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। সুলতান শহরটির নতুন নাম রাখেন এদিন (Edirne) এবং ব্রুসা হতে সেখানে রাজধানী স্থানান্তর করেন (১৩৬৩)। এটিই ইউরোপে তুর্কিদের প্রথম রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। ৯০ বছর পর সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ কর্তৃক কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর এদিন রাজধানীর মর্যাদা হারায়। ৩১
আদ্রিয়ানোপলের পর মুরাদ সাগ্রা ও ফিলিপোলিস জয় করেন। ফলে থ্রেস ও মেসিডোনিয়ার এক বৃহদাংশ তুর্কিদের করতলগত হয়। ১৩৬৫ সালে রাঙসা রিপাবলিকের সঙ্গে মুরাদের এক বাণিজ্যচুক্তি হয়। শর্তানুসারে দেশটির প্রতিরক্ষার ভার মুরাদের হাতে আসে। এ চুক্তি সম্পাদনের সময় কলমের অভাবে সুলতান আঙুলে কালি মেখে স্বাক্ষর করেন। এ থেকেই তুগ্রা বা সুলতানের সাংকেতিক লেখার উৎপত্তি হয়। তুগ্রা আরবি লিপিকলার এক বিশেষ রীতিও বটে। বাইজেন্টাইন সম্রাট পেলিওলোগাস দেখলেন, সুলতানের সাথে তিনি পেরে উঠবেন না, তাই চার পুত্রসহ তিনি হীনতা স্বীকার করে মুরাদের দরবারে ধরনা দিতে থাকেন। সদাশয় সুলতানও হস্তক্ষেপ করেননি সম্রাটের রাজ্যে। এবার তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় দানিয়ুব ও অড্রিয়াটিক-এর মধ্যবর্তী জনপদে। কিন্তু এ আশা পূরণ করতে গিয়ে তিনি খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। ৩২
ক্রুসেডীয় কনফেডারেসি
দানিয়ুব নদী ও অড্রিয়াটিক সাগরের মধ্যবর্তী ভূ-ভাগে দৃষ্টি দেওয়ায় তুর্কিদের সাথে সার্বিয়া, বসনিয়া, হাঙ্গেরি ও ওয়ালেচিয়ার (বর্তমান রোমানিয়া) যুদ্ধপ্রিয় জাতিগুলোর সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। গ্রিক ব্যতীত অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিগুলো ছিল রোমান ক্যাথলিক। গ্রিকরা ক্যাথলিকদের ন্যায় যীশু, মেরি বা সেন্টদের মূর্তিপূজা করত না। তাই তাদের দৃষ্টিতে গ্রিকরা ছিল বিধর্মী।
এত দিন তুর্কিরা গ্রিস ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এলাকায় হানা দিয়েছিল। তাই ক্যাথলিক ধর্মগুরুরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলেন। এখন তুর্কিরা ক্যাথলিক জনগোষ্ঠীর এলাকায় দৃষ্টিপাত করতেই সক্রিয় হয়ে উঠেন ধর্মযাজকবৃন্দ। খোদ পোপ পঞ্চম আরবান (পোপ ১৩৬২-১৩৭০) ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ডাক দেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি ও ওয়ালেচিয়া তুর্কিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন।৩৩
ম্যারিটজা (Maritsa) ৩৪ নদীর লড়াই
১৩৭১ সালে প্রথম মুরাদ এশিয়া মাইনরে বিজা শহরে অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন। সার্বিয়ার রাজা ভুকাসিন (কার্যকাল ১৩৬৫-১৩৭১) তুর্কি রাজধানী এদিনে আক্রমণের জন্য এটিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। ৭০,০০০ সৈনিক সমভিব্যহারে ভুকাসিন এবং তাঁর ভ্রাতা ডেসপট চেরনোমেন গ্রামের কাছে ম্যারিটজা নদীর তীরে তুর্কি সেনাপতি লালা শাহিন পাশার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বাহিনীর মুখোমুখি হন। তুর্কি সেনাপতির উন্নতর ট্যাকটিসের কাছে ভুকাসিন পরাজয় বরণ করে। বিশাল সার্বিয়ান বাহিনী পরাজিত হয়। ভুকাসিনসহ হাজারো সৈনিক নিহত হয়। বহু সৈনিক পালাতে গিয়ে নদীতে ডুবে মারা যায়। এ জয়ের ফলে প্রায় সমগ্র মেসিডোনিয়া এবং গ্রিসের অংশবিশেষ তুর্কি সালতানাতভুক্ত হয়। ৩৫
অন্যান্য বিজয়
এভাবে প্রায় বলকান পর্বতমালা পর্যন্ত রাজ্য সম্প্রসারণ করে ১৩৭৫ সালে তুর্কি বাহিনী উত্তরাভিমুখে অগ্রসর হয়। বলকান পার হয়ে তারা দুর্ভেদ্য নিস শহর আক্রমণ করে। ২৫ দিনের অবরোধের পর রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের জন্মভূমি তুর্কিদের কাছে দ্বার খুলে দেয়। নিজ রাজ্যের মধ্যস্থল আক্রান্ত হওয়ায় সার্বিয়ার রাজা ডেসপট সন্ধি প্রার্থনা করেন। বার্ষিক সহস্র পাউন্ড রৌপ্য কর প্রদান এবং তুর্কি বাহিনীতে সহস্র অশ্বারোহী সরবরাহের অঙ্গীকারে তার আবেদন মঞ্জুর হয়।
বুলগেরিয়ার রাজা সিসভান নিজ রাজ্যে তুর্কিদের আগমনের পূর্বেই বিনীতভাবে শান্তি প্রার্থনা করেন। কিন্তু অর্থের পরিবর্তে সুলতানকে কন্যা দান করাকেই তার অধিকতর পছন্দ হয়। পোপ ও ক্যাথলিক জগতের সাহায্য লাভের আশায় বাইজেন্টাইন সম্রাট নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতেও দ্বিধান্বিত হন না। তবুও কারও কাছ থেকে তিনি কোনো সাহায্য পেলেন না। অনন্যোপায় হয়ে দুর্ভাগা সম্রাট নিজেকে মুরাদের জায়গিরদার বলে ঘোষণা করেন।
যুদ্ধবিরতিতে সামরিক সংস্কার
সুলতানের পক্ষে পূর্ব ইউরোপে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেনাপতি লালা শাহিন পাশা। সুলতান ব্যস্ত ছিলেন এশিয়া মাইনরে। অভ্যন্তরীণ সংস্কার সাধনের জন্য তিনি ছয় বছর যুদ্ধ থেকে বিরত রইলেন। ফলে সামরিক প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও জায়গিরপ্রথা পূর্ণরূপ লাভ করে। খ্রিষ্টান প্রজাদের সহায়তায় 'আয়নাক' নামে একদল অনুচর গঠন করা হয়। তারা সেনাবাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করত। যেমন: আস্তাবল পরিষ্কার রাখা, শিবির খাটানো, মালগাড়ি চালানো ইত্যাদি।
বাকলারবেগ লালা শাহিন পাশা মারা গেলে তাইমুর তাশ তার স্থলাভিষিক্ত হন। 'সিপাহি' নামে পরিচিত তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনী গঠনের দায়িত্ব অর্পিত হয় তার ওপর। বাহিনীর নিশান হিসেবে লাল পতাকা ব্যবহার করা হয়—যা এখনও তুরস্কের পতাকায় বিদ্যমান। এ বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে পূর্বের মালিক চাষাবাদের অধিকার সংরক্ষণ করতেন। তিনি উৎপন্ন ফসলের এক অংশ জায়গির মালিক তথা সৈনিককে প্রদান করতেন। 'সিপাহি' বাহিনীর সদস্যদের এ শর্তে জমি বরাদ্দ দেওয়া হতো, তারা শান্তির সময়ে বরাদ্দকৃত ভূমিতে অবস্থান করবে, আর যুদ্ধের সময়ে নিজ খরচে রসদপাতি জোগাড় করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে এবং সেইসঙ্গে আরও একজন সৈনিককে যুদ্ধপ্রস্তুতিতে সাহায্য করবে। কোনো জায়গিরদার মারা গেলে, তার পুরুষ উত্তরাধিকারী ওই সম্পদের মালিক হতো। তবে পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে তা রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে যেত। ৩৬
মনোযোগ এশিয়া মাইনরে
সুলতান মুরাদ এশিয়া মাইনর ও আনাতোলিয়ার অবশিষ্ট রাজ্যগুলোকে সালতানাতভুক্ত করার চেষ্টা শুরু করেন। তবে এবার তরবারির চেয়ে কূটনীতির ওপর জোর দেন বেশি।
স্বীয় কন্যা নিফিসাকে বিয়ে দেন কারামানিয়ার শক্তিশালী ভূপতি আলাউদ্দিনের সাথে। এ বিয়ে উসমানি সাম্রাজ্য ও কারামানিয়ার মাঝে শান্তির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। অপরদিকে জামিয়ান৩৭ রাজবংশের রাজপুত্র সুলায়মান শাহ চেলেবির কন্যা দওলত খাতুনের সঙ্গে জ্যেষ্ঠপুত্র বায়েজিদের বিয়ে দেন মহাআড়ম্বরে, ব্রুসায়। রাজধানী কুতাহিয়াসহ শ্বশুর-রাজ্যের অধিকাংশ যৌতুক হিসেবে পেলেন শাহজাদা। ফলে ১০টি সেলজুক রাজ্যের মধ্যে চারটি উসমানিয়া সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
বাইজেন্টাইন সম্রাট পেলিওলোগাসের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে সুসম্পর্ক থাকলেও সুলতান মুরাদ তাঁকে বিশ্বাস করতেন না। সম্রাটের তৃতীয় পুত্র থিওডোরাস তুর্কি বাহিনীতে চাকরি করার অনুমতি প্রার্থনা করায় সুলতানের অবিশ্বাস দূর হয়। এ সময় সম্রাটের অপর পুত্র এড্রোনিকাসের সাথে মুরাদের কনিষ্ঠ পুত্র সাবচি বে-এর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব জন্মায়। এর পরিণাম হয় অত্যন্ত বিষময়। এশিয়ায় এক বিদ্রোহ দমনের জন্য সাবচি বে-এর হাতে সাম্রাজ্যের ইউরোপীয় অংশের দায়িত্ব দিয়ে মুরাদ রাজধানী এদিন ত্যাগ করেন। এ সুযোগে দুই পুত্র দুই পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। খবর পেয়ে মুরাদ দ্রুত ফিরে আসেন এবং তাঁর ও পেলিওলোগাসের যৌথ বাহিনীর হাতে সাবচি বে ও এড্রোনিকাস পরাজিত হয়। মুরাদ নিজ পুত্রকে প্রথমে অন্ধ করে দেন, তারপর তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। অপরদিকে এড্রোনিকাস তুলনামূলকভাবে লঘু শাস্তি ভোগ করেন। সির্কা ঢেলে তার এক চোখ অন্ধ করে দেওয়া হলেও অপর চোখের দৃষ্টিশক্তি বহাল থাকে। শুধু তাই নয়; পরবর্তী সময়ে তিনি বাইজেন্টাইন সম্রাট হওয়ারও গৌরব অর্জন করেন।
কারামানিয়ার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও এশিয়া মাইনরে তুর্কিদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উসমানি বাহিনী এবং বেগ-শাসিত অন্যান্য তুর্কি ক্ষুদ্র রাজ্যের মাঝে দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে। ১৩৮৭ সালে এ দুই রাজ্যের মাঝে ঘোরতর যুদ্ধ বাঁধে। শাহজাদা বায়েজিদ বিদ্যুদ্বেগে পুনঃপুন আক্রমণ করে
শত্রুদের পরাভূত করেন। ফলে এই সময় হতে বায়েজিদ 'ইলদিরিম' বা বিদ্যুৎ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ৩৮
শাহজাদি নিফিসার অনুরোধে সুলতান মুরাদ কারামান রাজকে ক্ষমা করে দেন। ফলে তার রাজ্য ও প্রাণ দুই-ই রক্ষা পায়। তবে তাকে সুলতান মুরাদের অধীনতা মেনে নিতে হয়। ১৩৮৮ সালের মাঝে প্রাচীন থ্রেসের সম্পূর্ণ অংশ ও রোমেলিয়া তুর্কিদের হস্তগত হয়। এশিয়া মাইনর তো আছেই। চিরাচরিত নিয়মে এসব স্থানে তুর্কিরা আরব ও তুর্কি উপনিবেশ স্থাপন করতে থাকে। মূলত সীমান্ত প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার জন্য এমনটি করা হয়। তবে ইউরোপীয়রা এটিকে ভাবী সংগ্রামের লক্ষণ বলেই গণ্য করে।
কসোভো যুদ্ধ পূর্ব ইউরোপের খ্রিষ্টান রাজারা মনে করে, সম্প্রসারণমান তুর্কি সাম্রাজ্যকে ঠেকানোর একমাত্র উপায় ধর্মভিত্তিক যুদ্ধের ডাক দেওয়া। আর তাই সার্বিয়া, বুলগেরিয়া-ও বসনিয়ার স্লাভরা তুরস্কের বিরুদ্ধে 'ক্রুসেড' ঘোষণা করে। পোল্যান্ডের স্লাভরা-ও সৈনিক পাঠিয়ে ক্রুসেডে সহায়তা করে। আলবেনিয়ার রাজা, ওয়ালেচিয়ার অর্ধ-রোমান অধিবাসী ও হাঙ্গেরির ম্যাগিয়ারেরাও বিধর্মী তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দেয়। এ ক্রুসেডের নেতা হয় সার্বিয়া।
বুলগেরিয়া ও বসনিয়া প্রথম যুদ্ধ শুরু করে। ১৩৮৮ খ্রিষ্টাব্দে একদল তুর্কি সৈনিক বসনিয়ার মধ্য দিয়ে গমন করছিল। কোনোরূপ ঘোষণা ছাড়াই খ্রিষ্টান মিত্রশক্তি আচানক তাদের ওপর হামলা করে। এতে বিশ হাজার তুর্কি সৈন্যের মাঝে মাত্র পাঁচ হাজার কোনো রকমে প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
বুলগেরিয়ার রাজা সিসভান এ পর্যন্ত বিশ্বস্ত থাকার ভান করে হঠাৎ শত্রুপক্ষে যোগদান করায় সুলতান মুরাদ তার ওপর সর্বাধিক ক্ষুব্ধ হন। সেনাপতি আলি পাশা ১৩৮৯ সালে ৩০ হাজার সৈন্য নিয়ে বলকানের পার্বত্য এলাকা অতিক্রম করেন। স্কুমলা তার নিকট সমর্পিত হয়। উত্তর বুলগেরিয়ার শহর তির্নোভা ও প্রভাদিয়া তুর্কি সেনাপতির হস্তগত হলে সিসভান আরও উত্তরের শহর নিকোপোলিসে পালিয়ে যায়। তুর্কিরা তা অবরোধ করলে সিসভান আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। তারপর সুলতানকে নিয়মিত কর প্রদান এবং বন্দরনগরী সিলিস্ট্রয়া ছেড়ে দেওয়ার শর্তে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু বুলগেরিয় রাজা
শর্ত পালন না করায় পুনরায় যুদ্ধ বাধে। তুর্কিরা দুর্ভেদ্য রিজা ও হিরস্কোভা দুর্গ অধিকার করে নিকোপোলিস অবরোধ করলে সিসভান বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেন। রাজার জীবন রক্ষা পায় বটে, কিন্তু বুলগেরিয়া তুর্কি সালতানাতের অংশ হয়ে যায়। ফলে তুর্কি সাম্রাজ্যের সীমানা দানিয়ুব নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
বুলগেরিয়ার শেষ রাজা সিসভানের পতনের পর সক্রিয় হয়ে উঠেন সার্বিয়ার রাজা লাজারাস (শাসনকাল ১৩৭৩-১৩৮৯)। তার অধীনে মিত্রশক্তির এত সৈন্য একত্রিত হয় যে, তিনি সুলতান মুরাদকে প্রকাশ্যে যুদ্ধে আহ্বান করে কসোভা প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন। দুর্গম পার্বত্য পথ অতিক্রম করে সুলতান খ্রিষ্টীয় মিত্রশক্তির মুখোমুখি হন।
২৭ আগস্ট, ১৩৮৯ সালে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। বহুদিন পর্যন্ত এই যুদ্ধের ফলাফল অনির্ণীত ছিল। সার্বিয়া ও বসনিয়ার সৈন্যদের পরাক্রমে একবার বাম পার্শ্বস্থ তুর্কি সৈন্যরা পালাতে উদ্যত হয়, কিন্তু দক্ষিণ দিক হতে বিদ্যুদ্বেগে বায়েজিদের আগমনে বিপদ কেটে যায়। তুর্কিদের বিজয় যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন Molish Obilic নামক এক সার্ব যোদ্ধা গোপনীয় কথা বলার ভান করে সুলতান মুরাদের কাছে আসে এবং আচানক তাঁর বুকে বিষমাখা ছুরি বসিয়ে দেয়। পরে জেনিসেরির হাতে সে প্রাণ হারায়। আঘাত তীব্র হলেও মুরাদের অসাধারণ প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব তুর্কি বাহিনীকে সমুদয় বিপর্যয় হতে রক্ষা করে। তিনি দেহরক্ষী বাহিনীকে শত্রুদের ওপর চড়াও হওয়ার আদেশ দেন। মুরাদপুত্র বায়েজিদের নেতৃত্বে তুর্কিরা সার্বদের ওপর এমন তীব্র আক্রমণ করে, তারা কূল-কিনারা না পেয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু সার্ব রাজা লাজারাস ধৃত হন। তার প্রাণদণ্ডের ঘোষণা দিয়ে তবেই চোখ মুদলেন সুলতান মুরাদ। ইতোমধ্যে তিনি রাজত্ব করেছেন ৩১ বছর এবং বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তাঁর লাশ ব্রুসায় নিয়ে শহরের পশ্চিমাংশে সমাহিত করা হয়। যেখানটায় তিনি শহিদ হন, কসোভোর সেই প্রান্তরে একটি অট্টালিকা নির্মিত হয়। বলকানের মুসলিমদের কাছে এটি 'মাশহাদ খোদাওয়ান্দকার' নামে পরিচিত।৩৯
কসোভো যুদ্ধের বছরটিকে সার্বিয়ার পতনের বছর বলে গণ্য করা যায়। দুর্দশাগ্রস্ত সার্বিয়ার যে অবশিষ্টাংশ পরবর্তী ৭০ বছর টিকে ছিল, তাকে রাষ্ট্র বলা যায় না। ১৩৮৯ সালেই সার্বিয়ার শাসক নিজ রাজ্যের ওপর তুর্কি সুলতানের কর্তৃত্ব (Suzerainty) মেনে নেয়।৪০ রাজ্য সম্প্রসারণের দৃষ্টিতে সুলতান প্রথম মুরাদ ছিলেন অন্যতম সফল তুর্কি নৃপতি। তিনি ৯৫০০০ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড
তাঁর পিতা হতে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর রাজ্যের আয়তন ছিল পাঁচ লাখ বর্গকিলোমিটার (ইউরোপীয় ভূখণ্ডের আয়তন ২ লাখ ৯১ হাজার বর্গকিলোমিটার, আনাতোলিয়ায় ২ লাখ ৮ হাজার বর্গকিলোমিটার)।
সুলতান প্রথম মুরাদ সদাশয় শাসক ছিলেন। প্রজারা তাঁকে ভালোবাসতো। তবে তিনি কথাবার্তা কম বলতেন, তাই তাঁর মনোভাব সহজে বোঝা যেত না। তাঁর মেজাজ ছিল নরম, তিনি সাদামাটা পোশাক পরতেন এবং বিদ্বানের কদর করতেন। সমকালীন বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ ফ্রান্টেস বলেন-'মুরাদ ৩৭টি যুদ্ধে সশরীরে অংশগ্রহণ করেছেন এবং প্রতিটিতে বিজয়ী হয়েছেন। ফলে অজেয় সেনাপতি হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে তিনি পরিকল্পনা করতেন। বার্ধক্যেও তাঁর ক্ষমতা ও বিচক্ষণতায় কোনো ঘাটতি আসেনি।' (বন সংস্করণ, ৮১)
সমকালীন আরেক ইতিহাসবিদ কানকাইডালাস বলেন- 'মুরাদ আনাতোলিয়া ও ইউরোপে ৩৭টি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে প্রতিটিতে বিজয় লাভ করেছেন। যৌবন ও বার্ধক্য-দুই বয়সেই তিনি ছিলেন সাহসী, তৎপর ও সক্রিয়। সুলতান মুরাদ ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ; পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা ব্যতীত তিনি কোনো কাজে হাত দিতেন না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সাথে তিনি কোমল ব্যবহার করতেন। তবে কেউ শত্রুতা করলে তাকে কঠোর হস্তে পাকড়াও করেছেন। তিনি শত্রু-মিত্র সকলের আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছেন।' (প্যারিস সংস্করণ, ২৯)
ফরাসি ইতিহাসবিদ গ্রেনার্ড বলেন- 'মুরাদের মানের কোনো শাসক সমকালীন ইউরোপীয় নৃপতিদের মাঝে পাওয়া যাবে না। তিনি শুধু একজন বিচক্ষণ সমরবিদ ও স্ট্রাটেজিক উস্তাদই ছিলেন না; বরং সংবেদনশীল কূটনীতিকও ছিলেন। তিনি ছিলেন জাত-শাসক। সুলতান প্রথম মুরাদ উসমানীয়দের এক জাতিতে পরিণত করেন।'৪১
গিবনস বলেন-'উসমান একটি জাতিকে সংগঠিত করেন, ওরহান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, আর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন মুরাদ।'
টিকাঃ
৩১. Vasiliev, op.cit., p. 624; ইসমাইল ইয়াগি, আদ-দাওলা আল-উসমানিয়্যাহ ফিত তারিখিল ইসলামি আল-হাদিস, পৃ. ৩৮
৩২. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮-২৯
৩৩. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯
৩৪. পশ্চিম বুলগেরিয়ায় উৎপন্ন হয়ে ম্যারিটজা নদী ইজিয়ান সাগরে পতিত হয়েছে
৩৫. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩১
৩৬. বেক, প্রাগুক্ত, ১৩২
৩৭. জার্মিয়ান (বা কার্মিয়ান) ও কারামানিয়া অভিন্ন রাজ্য নয়। জার্মিয়ান অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত আনাতোলিয়ার এস্কি শহর এবং আফিমুন কারা হিসারের মধ্যবর্তী অঞ্চলে এটি অবস্থিত।
৩৮. উজতুনা, প্রাগুক্ত ১০০
৩৯. উজতুনা, প্রাগুক্ত ১০১; Vasiliev, op.cit., p. 624.
৪০. Vasiliev, op.cit., p. 624; Walsh, op.cit., p. 548.
৪১. q. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০২; সালিম রশিদি, মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ, পৃ. ৩০; আবদুল আজিজ আল-উমারি, আল-ফুতুহুল ইসলামিয়্যাহ আবর আল-উসুর, পৃ. ৩৮৯
📄 প্রথম বায়েজিদ
[পিতা : প্রথম মুরাদ, মাতা : কুল জাজাক খাতুন, জন্ম: ১৩৬০, শাসনকাল : ১৩৮৯-১৪০২, মৃত্যু: ১৪০৩]
সুলতান মুরাদের মৃত্যুর পর কসোভোর ময়দানেই বায়েজিদ সুলতান হিসেবে অভিষিক্ত হন। সিংহাসন লাভের কিছুদিন পর তিনি কনিষ্ঠ ভ্রাতা ইয়াকুবকে হত্যা করেন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ এহেন নিষ্ঠুর পদক্ষেপের সমর্থনে শরয়ি ফতোয়ার দোহাই দিয়েছেন এ যুক্তির ভিত্তিতে যে, ভবিষ্যৎ ফিতনার আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয়। ৪২
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি বিদ্যুদ্বেগে যুদ্ধের ময়দানে নেমে প্রবল পরাক্রমে শত্রুদের পরাভূত করতেন। তাই ইলদিরিম বা বিদ্যুৎ নামে পরিচিত লাভ করেছিলেন। সুলতান হওয়ার পরও এশিয়া-ইউরোপে তাঁর বিজয়াভিযান অব্যাহত থাকে। চতুর্দশ শতকের সবচেয়ে বড়ো ক্রুসেড বাহিনীকে তিনি পরাজিত করেন। তবে তাঁর শেষ পরিণতি ভালো হয়নি। তাইমুর লঙ্গের কাছে তিনি পরাজিত হন। পাশাপাশি উসমানি সালতানাতের গৌরবও সাময়িক সময়ের জন্য স্তিমিত হয়।
সার্বিয়ার সাথে চুক্তি তুর্কিদের বিরুদ্ধে গঠিত ক্রুসেড কনফেডারেসির উদ্যোক্তা ও নেতা ছিলেন সার্বিয়ার রাজা লাজারাস। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নিহত হলে বায়েজিদ সার্বিয়ার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রাজ্যটি সালতানাত ও হাঙ্গেরির মাঝে বাফার স্টেট হিসেবে কাজ করত।
অপরদিকে লাজারাস-পুত্র স্টিফেনও শান্তির জন্য ব্যগ্র ছিলেন। ফলে উভয় পক্ষে সন্ধি হয়। এই সন্ধির শর্ত ছিল-কারাটোভার রৌপ্যখনির একটি নিদিষ্ট অংশ সুলতানকে দেওয়া হবে এবং প্রতিটি যুদ্ধে বায়েজিদের সাথে স্টিফেন অংশগ্রহণ করবেন। বায়েজিদের সাথে লাজারাসের মেয়ে অলিভিরার বিয়েও সুসম্পন্ন হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে সুলতান সার্বিয়ার শত্রুতা হতে দীর্ঘ সময়ের জন্য মুক্তি লাভ করেন। স্টিফেন অন্যান্য ইউরোপীয় রাজাদের মতো ছিলেন না। তিনি কখনো চুক্তি ভঙ্গ করেননি। ৪৩
বাইজেন্টাইন গৃহযুদ্ধে বায়েজিদের ভূমিকা
বায়েজিদের সমকালীন বাইজেন্টাইন সম্রাট ছিলেন পঞ্চম জন। তিনি তাঁর পুত্র ম্যানুয়েলকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। ঘোষণাটি ছিল ইতঃপূর্বে সম্পাদিত এক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই সম্রাটের পৌত্র (তাঁর নামও জন) বিদ্রোহ করেন।
১৩৯০ সালে তরুণ জন (অষ্টম জন নামে) কনস্ট্যান্টিপোল অবরোধ করে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। তবে এ বিদ্রোহ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, সুলতান বায়েজিদের সমর্থনে তরুণ জন ক্ষমতারোহণ করতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়; ভেনিসের সিনেট তো ধরেই নিয়েছিল, ওই সময়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বায়েজিদ উপবেশন করেছেন। তাই ভেনিস সিনেট কনস্ট্যান্টিনোপলে এ নির্দেশ দিয়ে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছিল যে, 'তোমরা যদি কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে মুরাদপুত্রকে (বায়েজিদকে) দেখতে পাও, তবে তাঁর কাছে ভেনিসিয়ান বাণিজ্যতরি ক্রোকের আদেশ প্রত্যাহারের দাবি করবে। '৪৪
পরবর্তী সময়ে বায়েজিদের সাথে সম্রাট ম্যানুয়েলের সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল-এমন প্রমাণ ঐতিহাসিক নথিপত্রে পাওয়া যায়। ১৩৯২ সালে সুলতান বায়েজিদ কৃষ্ণসাগরে সাইনপের উদ্দেশ্যে এক সমুদ্রাভিযানে বের হন। তবে সুলতান তাঁর নৌযানের সামনে সম্রাট ম্যানুয়েলকে বসিয়ে দেন। ফলে ভেনিসিয়ানরা মনে করে এটি তুর্কি অভিযান নয়; বরং তুর্কিদের সহায়তায় পরিচালিত গ্রিক অভিযান। তাদের আরও ধারণা হয়, এ অভিযানের লক্ষ্য সাইনপ নয়; বরং দার্দানেলিসের দক্ষিণে দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত ভেনিসিয়ান উপনিবেশসমূহ।
অবশ্য বায়েজিদ-ম্যানুয়েলের এ সখ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; কয়েকদিন যেতে না যেতেই সম্রাট পশ্চিমাভিমুখী হন। ৪৫
বুলগেরিয়া ও ওয়ালেচিয়া
সুলতান বায়েজিদ কসোভো যুদ্ধ সাফল্যের সাথে সমাপ্ত করার পর এশিয়ায় ফিরে আসেন। নিকটবর্তী রাজারা তাদের রাজ্যের কিছু কিছু অংশ বায়েজিদকে দিতে বাধ্য হন। ১৩৯০ সালে তিনি আবার বিদ্যুদ্বেগে ইউরোপে আপতিত হন। পরের বছর ওয়ালেচিয়ার রাজা মাইরচিয়া (শাসনকাল ১৩৮৬-১৩৯৪) অধীনতা স্বীকার করেন। ১৩৯২ সালে হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমান্ড বুলগেরিয়ার অংশবিশেষ দখল করেন, কিন্তু পরিশেষে তিনি সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়ে নিজ রাজ্যে বিতাড়িত হন।
কারামানরাজ বধ
খ্রিষ্টানদের সৌভাগ্যই বলতে হয়, ইউরোপে অবস্থানকালে হঠাৎ বায়েজিদ শুনতে পান যে, কারামানরাজ তুর্কি রাজ্য এনিয়া দখল করে সুলতানের প্রতিনিধি তাইমুর তাশকে বন্দি করেছে। সংবাদ পেয়ে বায়েজিদ ঘূর্ণিবাতের ন্যায় এশিয়া মাইনরে হাজির হয়ে এক লহমায় কারামানরাজকে (বায়েজিদের ভগ্নিপতি) বন্দি করে তাইমুর তাশের হাতে অর্পণ করেন। সেনাপতি তার সুলতানের নির্দেশের অপেক্ষা না করে অপরিণামদর্শী ভূপতিকে হত্যা করে। কারামানের পতনের পর সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া মাইনর বায়েজিদের অধীনে চলে আসে। তারপর তিনি পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে মনোযোগী হন। অল্পদিনের মধ্যে সিবাস, কাস্তমোনি ও আমাসিয়া তাঁর অধিকারে আসে। এভাবে এশিয়া মাইনরের সকল ক্ষুদ্ররাজ্যের অবসান ঘটে। ৪৬
বহুজাতিক খ্রিষ্টান জোট
ইউরোপের খ্রিষ্টান শক্তি বায়েজিদকে স্থির হতে দিলো না। তারা তুর্কিদের ইউরোপ হতে বিতাড়নের চিন্তা কখনোই ত্যাগ করতে পারেনি। তা ছাড়া বসফরাসের এশীয় তীরে বায়েজিদ 'কুজাল হিসার' নামে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট এটিকে তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল বলে গণ্য করে
ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ ও পোপের কাছে সাহায্য চাইলেন। অপরদিকে সুলতান বায়েজিদ ইজিয়ান সাগরের লাতিন ধর্মমতের অনুসারী তথা ক্যাথলিকদের বহিষ্কার করার চেষ্টা করেছিলেন। ৪৭
এগুলো চতুর্দশ শতকের সর্বশেষ ক্রুসেড সংঘটনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। ইতঃপূর্বে মুরাদের বিরুদ্ধে গঠিত খ্রিষ্টান জোটের নেতৃত্বে ছিলেন সার্বিয়ার রাজা লাজারাস। তার পুত্র স্টিফেন তখন সুলতানের অনুগত। ১৩৯৪ সালে পোপ নবম বোনিফেস (পোপ ১৩৮৯-১৪০৪) তুর্কিদের বিরুদ্ধে নতুন ক্রুসেড ঘোষণা করেন। পরাজয়ের গ্লানিতে মগ্ন হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমান্ড৪৮ সর্বাগ্রে সাড়া দেন। ফ্রান্সের রাজা প্রেরণ করেন ২০০০ নাইট ও ৬০০০ আর্চারসহ ১০০০০ হাজার সৈন্যের একটি দল। জার্মানির হোহেনজোলার্নের কাউন্ট ফ্রেডারিক যোগ দেন তাঁর সাথে। রাইনের প্যালাটিনের ‘ইলেক্টর’ ব্যাভেরিয়া হতে একদল নাইট নিয়ে আসেন। সেন্ট জনের নাইটদের ৪৯ গ্রান্ডমাস্টার রোডস হতে এবং স্টাইরিয়া হতে চিলির কাউন্ট শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে হাজির হন। ভেনিস পাঠাল একটি নৌবহর। ওয়ালেচিয়ার মাইরচি ও বুলগেরিয়ার সিসভানও যোগ দেন ক্রুসেডারদের সাথে। ক্যাস্টাইল, অ্যারাগন ও টোটন হতেও সৈন্য আসে। পোল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও কয়েকটি ক্ষুদ্র রাজ্যও সৈনিক পাঠায়। বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল সরাসরি সৈনিক প্রেরণ করেননি বটে, তবে তিনি যুদ্ধব্যয়ে অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। করদ রাজাদের মাঝে কেবল সার্বিয়ার স্টিফেনই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। এভাবে ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল খ্রিষ্টান বাহিনী ক্রুসেডের জন্য প্রস্তুত হয়।
সৈন্যসংখ্যা ও তাদের দক্ষতার বিচারে এটি ছিল চতুর্দশ শতাব্দীর সবচাইতে বড়ো ক্রুসেড বাহিনী।৫০
নিকোপলিস যুদ্ধ
ক্রুসেড কমান্ডাররা প্রথমে মিলিত হন বুদাপেস্টে। হাঙ্গেরির রাজা সিগিসমান্ড জেনারেল কমান্ডার নিযুক্ত হন। যুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন; সিগিসমান্ড তুর্কিদের আগমনের অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অন্যদের পীড়াপীড়িতে তিনি মত পরিবর্তন করেন। সুলতানের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার কারণে প্রথম আঘাতটা আসে স্টিফেনের ওপর। মিত্রশক্তি তার রাজ্য লুণ্ঠনের মাধ্যমে তছনছ করে দিলো। তুর্কিদের হাত থেকে কেড়ে নেয় দানিয়ুব তীরের বন্দর নগরী ভিদিন। আরেক বন্দর শহর অর্সোভার প্রতিরোধ পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। রাকোয়ার (Rachowa) সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করলেও তাদের হত্যা করা হয়।
রাকোয়ার হত্যাকাণ্ডের পর ক্রুসেডাররা নিকোপলিস (নিম্ন দানিয়ুবের উত্তর তীরে অবস্থিত) অবরোধ করে। জল ও স্থলপথে ছয় দিন ধরে অব্যাহতভাবে আক্রমণ চলে। তবুও অস্ত্র সমর্পণ করেন না সাহসী দুর্গাধ্যক্ষ জোগলান। দুর্গ রক্ষার্থে সুলতানের আগমনের ব্যাপারে তাঁর ছিল দৃঢ় আস্থা। অন্যদিকে ওই সময়ে বায়েজিদ বাস্তবিকই বসফোরাস পাড়ি দিয়ে বিদ্যুদ্বেগে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। খ্রিষ্টানরা স্বপ্নেও ভাবেনি, যুদ্ধক্ষেত্রে এত দ্রুত তুর্কি বাহিনী এসে পড়বে।
২৪ সেপ্টেম্বর গোয়েন্দারা খবর দেয়, সুলতান যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাত্র ৬ ঘণ্টা দূরে। ক্রুসেডাররা এ সংবাদ হেসেই উড়িয়ে দেয়। কিন্তু ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৩৯৬ (২৩ জিলকদ, ৭৯৮ হি.) তুর্কি বাহিনীর অগ্রবর্তী দল অর্থাৎ আজব ও আকিঞ্জিরা শত্রুশিবিরের কাছে পৌঁছে যায়। এবার তারা বিশ্বাস করে। কিছু তুর্কি সৈনিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পেয়ে খ্রিষ্টানদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। ক্রুসেডাররা প্রথমে তাদের হত্যা করে। তারপর ছয় হাজার ফরাসি নাইট তুর্কি বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের প্রবল আক্রমণে অনিয়মিত সৈন্যরা ছারখার হয়ে যায়। ১০ হাজার জেনিসেরিকে তছনছ করে তারা তুর্কি সিপাহিদের ওপর আপতিত হয়। ৫ হাজার অশ্বারোহীকে হত্যা করে শত্রুব্যুহের বাইরে এসে ফরাসিরা মনে করে যুদ্ধজয় সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু অদূরে ছিল এক অনুচ্চ টিলা।
তুর্কি সিপাহিদের তাড়িয়ে টিলার চূড়ায় উঠতেই ক্রুসেডাররা দেখে, স্বয়ং বায়েজিদ ৪০ হাজার উৎকৃষ্ট সৈন্য সমভিব্যহারে দাঁড়িয়ে আছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নাইটরা হতভম্ব হয়ে দেখল, তারা তুর্কি সৈন্য দ্বারা পরিবৃত হয়ে পড়েছে। প্রাণপণে লড়াই করে মারা পড়ে নাইটরা, অনেকে ধৃত হয়। অল্প কয়েকজন নাইট মিত্রদের কাছে এ ভয়াবহ বিপর্যয়ের খবর দেওয়ার জন্য পালিয়ে বাঁচে।
ফরাসিদের দর্প খর্ব করে বায়েজিদ সৈন্যদের আবারও সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত করে সম্মুখে অগ্রসর হন। তাঁকে দেখে খ্রিষ্টান বাহিনীর দুই প্রান্ত কোনো যুদ্ধ না করেই পালিয়ে যায়। কেন্দ্রভাগে ছিলেন হাঙ্গেরির রাজা, চিলির কাউন্ট ও প্যালাটিনের ইলেক্টর। তারা ১২ হাজার সৈনিক নিয়ে তুর্কিদের প্রতিরোধে সচেষ্ট হন। জেনিসেরিদের হটিয়ে দিয়ে তারা সিপাহিদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেন। এমন সময় সুলতানের বিশ্বস্ত মিত্র স্টিফেন এসে ৫ হাজার সৈনিক নিয়ে ক্রুসেডারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এবার শতাব্দীর সবচেয়ে বড়ো ক্রুসেড বাহিনীর পরাজয়ের ষোলোকলা পূর্ণ হয়। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অপরিসীম। হাঙ্গেরির সৈন্যরা প্রায় সমূলে ধ্বংস হয়। ব্যাভেরিয়ার নাইটদের সবাই এবং স্টাইরিয়ার সৈন্যদের সংহভাগ নিহত হয়। মোট ১ লাখ খ্রিষ্টান সৈন্য নিহত হয়। নিহতদের মাঝে বহু শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ও কমান্ডার ছিলেন। ফরাসি নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল জোয়ান ডে ভিয়েনেও এই যুদ্ধে মারা পড়েন। ১০ হাজার সৈন্য ধৃত হয়। সিগিসমান্ড ও রোডসের নাইট সর্দার অল্প কজন অনুচরসহ কৃষ্ণ সাগরে নোঙর করা এক নৌকায় চড়ে পালিয়ে যান কনস্টান্টিনোপলে। তারপর ঘুরপথে দ্বীপপুঞ্জ ও অড্রিয়াটিক সাগর হয়ে হাঙ্গেরি পৌঁছান।
ফরাসি বন্দিদের মাঝে অনেক অভিজাত শ্রেণির লোক ছিল। সুলতান তাদের অনেককে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেন। এ সময় ফরাসি অভিজাত কঁতে ডে নেফার সুলতানের বিরুদ্ধে আর কখনো যুদ্ধ না করার শপথ ঘোষণা করেন। বায়েজিদ বলেন-
'আমি আপনাকে শপথ ভঙ্গের অনুমতি দিচ্ছি। আপনি আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারেন। সারা ইউরোপের খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী হওয়ার চেয়ে অন্য কোনো কিছু আমার কাছে অধিক প্রিয় নয়। '৫১
বস্তুত সৈন্যসংখ্যা, প্রস্তুতি ও অর্থব্যয়ের দৃষ্টিতে এটি ছিল চতুর্দশ শতকের সর্ববৃহৎ ক্রুসেড। খ্রিষ্টান সৈন্যদের আবেগ, বীরত্ব, দেশপ্রেম, ধর্মপ্রেম ও প্রচেষ্টার কমতি ছিল না; তবুও তারা পরাজিত হয়। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সৈনিকরা পরস্পরের ভাষা বুঝত না। তা ছাড়া এত বড়ো বাহিনী তারা আগে কখনো দেখেনি। তারা বিচ্ছিন্নভাবে পাঁচ বা দশ হাজার সৈন্যের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এমন একটি যুদ্ধ-যাতে লক্ষাধিক সৈন্য অংশ নেয়, তা ছিল তাদের অভিজ্ঞতার বাইরে। তা ছাড়া তুর্কিদের যুদ্ধকৌশল সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা ছিল না। ফলে বলকান থেকে তুর্কি-বিতাড়নের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
নিকোপলিস যুদ্ধে চতুর্দশ শতকের সবচেয়ে বড়ো ক্রুসেড বাহিনীর পরাজয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মনোবল ভেঙে যায়। ক্রুসেডের অন্যতম উদ্যোক্তা শক্তিশালী রাজ্য হাঙ্গেরির মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয় সবচেয়ে বেশি। অপরদিকে সুলতান বায়েজিদ আরোহণ করেন ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে। এশিয়ার ইউফ্রেটিস হতে ইউরোপের দানিয়ুব পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগে তাঁর অপ্রতিরোধ্য প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
এবার তিনি ঘোষণা করেন- 'শীঘ্রই আমি রোম জয় করে সেন্ট পিটার্সের বেদিতে আমার ঘোড়াকে যব খেতে দেবো।' তাঁর সেনাপতিরা স্টাইরিয়া ও দক্ষিণ হাঙ্গেরি জয় করেন, আর সুলতান অগ্রসর হন গ্রিস জয়ের পথে। কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তিনি অধিকার করেন লোক্রিস, ফোকিস ও বুশিয়া। অপরদিকে তাঁর সেনাপতিরা করিন্থযোজক পার হয়ে সমগ্র পেলোপেনেসাস দখল করেন। এথেন্সে তুর্কি পতাকার উড্ডয়নে গ্রিক জয় সম্পূর্ণ হয়। বিজিত এলাকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সুলতান কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন: ৩০ হাজার গ্রিককে এশিয়ায় স্থানান্তর এবং এলিস, আর্গোলিস, লেকোনিয়া ও মেসোনিয়ায় তুর্কি উপনিবেশ স্থাপন। ৫২
আব্বাসি খলিফার স্বীকৃতি
ইউরোপে বিশাল বিজয় অর্জনের পর বায়েজিদ 'রোমান সুলতান' উপাধি ধারণ করেন। ব্যাপারটি যেন এমন, রোমান সেলজুকদের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি আনাতোলিয়ার শাসনভার গ্রহণ করেছেন। অতঃপর তাঁর পদবি অনুমোদনের জন্য কায়রোতে অবস্থানরত আব্বাসি খলিফার কাছে পত্র প্রেরণ করেন। সুলতান আশা পোষণ করছিলেন, খলিফার অনুমোদনে তাঁর পদ শরঈ মর্যাদা লাভ করবে
এবং মুসলিম অঞ্চলগুলোতে তাঁর ভাব-গাম্ভীর্য বৃদ্ধি পাবে। আব্বাসি খলিফার রক্ষক মামলুক সুলতান বারকুক বায়েজিদের এ আবেদন সমর্থন করেন। কারণ, তৈমুর লং-এর বাহিনীর ধ্বংসলীলা প্রতিরোধে তিনি বায়েজিদকেই একমাত্র যোগ্য নৃপতি বলে মনে করতেন। বায়েজিদের আবেদন মঞ্জুর হয়, আব্বাসি খলিফা তাঁকে সুলতান উপাধিতে ভূষিত করেন।
কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ
নিকোপলিসের উদ্দেশ্যে যুদ্ধযাত্রার পূর্বে সুলতান বায়েজিদ বাইজেন্টাইন সম্রাটের কাছ থেকে কনস্ট্যান্টিনোপলের মুসলিমদের জন্য কিছু সুবিধা আদায় করেছিলেন। সুলতানের দাবি পূরণে সম্রাট ম্যানুয়েল কনস্ট্যান্টিনোপলের মুসলিম নাগরিকদের জন্য কাজি নিয়োগ দিয়ে স্বতন্ত্র আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। শহরের অভ্যন্তরে মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম কমিউনিটির জন্য ৭০০টি বাড়ি নির্দিষ্ট করা হয়। বাইজেন্টাইন উপনিবেশ গ্যালাটার অর্ধাংশে তুর্কি কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া হয় এবং সেখানে ৬০০০ সৈন্যের একটি তুর্কি গ্যারিসন স্থাপন করা হয়। সুলতানের রাজস্ব বিভাগ বাইজেন্টাইন রাজধানীর বাইরে উৎপাদিত ফসলের ওপর করারোপের অধিকারও লাভ করে। ৫৩
বাইজেন্টাইন সম্রাট বাহ্যিকভাবে বায়েজিদের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করলেও গোপনে তাঁর পতন কামনা করতেন। এর প্রমাণ হলো-নিকোপলিস যুদ্ধে সম্রাট কর্তৃক ক্রুসেড বাহিনীকে সৈন্য ও রসদ সরবরাহ করা। তাই নিকোপলিস থেকে প্রত্যাবর্তন করে ১৪০০ সালে বায়েজিদ কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধে মনস্থ করেন।
কার্যকরভাবে অবরোধ আরোপের জন্য সুলতান প্রথমেই কনস্ট্যান্টিনোপলে সহায়তা আগমনের পথগুলো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অভিযানের পূর্বেই থেসালিয়া আত্মসমর্পণ করেন। তুর্কি সৈনিকরা কিছু সময়ের জন্য এথেন্সও অবরোধ করে। সম্রাটের ভ্রাতা ডেসপট উপাধি ধারণ করে মোরিয়া শাসন করতেন। তুর্কিরা সেই রাজ্যেও অভিযান চালায়। এভাবে সবদিক থেকে বাইজেন্টাইন রাজধানীকে বিচ্ছিন্ন করে সুলতান বায়েজিদ পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী অবরোধ করেন। বিপন্ন সম্রাট ম্যানুয়েল পশ্চিম ইউরোপ এবং রাশিয়ার রাজার কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। পোপ, ইংল্যান্ড, ভেনিস, অ্যারাগন ও রাশিয়া অর্থ সাহায্য প্রেরণ করে, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য আসে ফ্রান্স হতে।
ফ্রান্সের রাজা পঞ্চম চার্লস, দুঃসাহসী ফরাসি যোদ্ধা Marshal Boucicaut এর নেতৃত্বে ২২০০ ফরাসি সৈন্য কনস্ট্যান্টিনোপল অভিমুখে প্রেরণ করেন। সম্রাট ও সেনাপতি মিলে বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালিতে, এমনকী কৃষ্ণসাগরেও কিছু সফল অভিযান চালালেন। কিন্তু অবরোধ ভেঙে ফেলার এক বছরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে ফরাসি যোদ্ধারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে। তাদের পরামর্শে ম্যানুয়েল তার ভ্রাতুষ্পুত্র জনকে ক্ষমতা দিয়ে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডসহ ইউরোপ সফরে বের হন। ওদিকে বায়েজিদ অবরোধ অব্যাহত রাখেন। তবে এশিয়ায় নতুন এক বিপদের আবির্ভাব এবারের জন্য সম্রাটকে বাঁচিয়ে দেয়। ৫৪
তাইমুর ঝঞ্ঝা
সুলতান বায়েজিদ যখন কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধে ব্যস্ত, তখন এশিয়া মাইনরের দিকে ধেয়ে আসছিল প্রলয়ংকরী এক ঝঞ্ঝা; যার নাম তাইমুর লং। ১৩৩৬ সালে মা ওরাউন নাহারের (ট্রান্স ওক্সিয়ানা) সামান্য এক তুর্কি সর্দারের ঘরে জন্ম নেন তাইমুর।
১৩৬৯ সালে তিনি খোরাসানের রাজধানী সমরকন্দের মসনদে বসেন। তারপর ঝড়ের বেগে বের হয়ে মুসলিম দুনিয়ার অধিকাংশ এলাকা দখল করতে সক্ষম হন। দিল্লি হতে দামেস্ক ও উরাল সাগর হতে পারস্য উপসাগরের মধ্যস্থিত বিশাল ভূভাগের পারস্য, আর্মেনিয়া, উচ্চ ফোরাত, দজলা, কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চল-এ বিশাল ভূখণ্ড তার পদানত হয়। পুরো পৃথিবী দখলের বাসনা প্রকাশ করে তিনি বলতেন- 'আসমানে যেমন একজন ইলাহ, তেমনি দুনিয়ার বাদশাহও হবেন একজন।' তাইমুর ছিলেন সাহসী সেনাপতি; অসামান্য যুদ্ধপ্রতিভা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী। কোথাও অভিযান চালানোর পূর্বে তিনি গোয়েন্দা পাঠিয়ে খোঁজখবর নিতেন, তারপর ধীরে-সুস্থে পূর্ণ প্রস্তুতির সাথে অভিযান পরিচালনা করতেন। সৈনিকের ওপর তার প্রভাব এতটা বেশি ছিল যে, তারা সেনাপতির যেকোনো নির্দেশ মেনে নিতেন। বায়েজিদের তুর্কি সালতানাতের ওপর তাইমুরের অভিযান পরিচালনার মুখ্য কারণ ছিল এই যে, ইরাক ও বাগদাদের আমির আহমদ জালায়ের তাইমুরের কাছে পরাজিত হয়ে সুলতান বায়েজিদের কাছে আশ্রয় নেন। তাইমুর লং তার প্রত্যার্পণ দাবি করলে সুলতান তা অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এটিই তাইমুরের অভিযানের তাৎক্ষণিক কারণ।
দিগ্বিজয়ী তাইমুর তুর্কি সাম্রাজ্যে অভিযান চালানোর ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না; বরং তিনি চীনে অভিযান পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। তবে বায়েজিদের অদূরদর্শিতা তাকে তুর্কি সাম্রাজ্যে হামলা চালাতে প্রলুব্ধ করে। বায়েজিদ বয়সে তরুণতর ছিলেন। তা ছাড়া অপরাজেয় সেনাপতি হিসেবে তাঁর সুখ্যাতিও ছিল। কয়েক বছর আগেই তিনি সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। এ অর্জন বায়েজিদকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। তিনি তাইমুর-বিপদকে গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। যে সংকট তিনি কূটনীতির মাধ্যমে দূর করতে পারতেন, সেখানে শক্তিনির্ভর সমাধান পেতে গিয়ে তিনি বিপদ ডেকে আনেন। ৫৫
তাইমুরের সিবাস দখল
কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধকালে তাইমুরের অগ্রসরতার খবর পেয়ে বায়েজিদ তাঁর সর্বাপেক্ষা তেজোদ্দীপ্ত পুত্র আরতুগরুলকে একদল সৈন্যসহ সিবাসে প্রেরণ করেন। ১৪০০ সালে তাইমুর সিবাস অবরোধ করেন। তুর্কি সৈনিকদের বীরত্ব এবং দুর্গপ্রাচীরের দৃঢ়তা প্রথম দফা শত্রু-আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। অবশেষে তাইমুর হাজারো লোক লাগিয়ে প্রাচীরের নিচে পরিখা খনন করে তা কাঠ দিয়ে পূর্ণ করে আগুন লাগিয়ে দেন। ফলে নগর-প্রাচীর ধ্বংস হয়ে যায়। ভয়ার্ত নগরবাসীর ক্ষমা প্রার্থনা তাইমুরের নিষ্ঠুরতায় হারিয়ে যায়। শাহজাদা ও তাঁর সৈন্যদের হত্যা করা হয়।
প্রিয়তম পুত্রের মৃত্যু ও সিবাস পতনের খবর পেয়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে এশিয়া মাইনরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন বায়েজিদ। ইতোমধ্যে তাইমুর দক্ষিণ এশিয়া মাইনরে ধ্বংসলীলা সম্পন্ন করে সিরিয়ায় তাণ্ডব শুরু করেছেন। ফলে দুই বছরের আগে দুজনের মধ্যে সাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব হয় না।
সিবাস পতনের পরও তাইমুর সরাসরি বায়েজিদের সাথে লড়াই করতে চাননি। তাঁর সেনাপতি ও পুত্র-পৌত্ররাও অনিচ্ছুক ছিলেন। 'খ্রিষ্টান দমনকারী, সুন্নি ধর্মাবলম্বী আর তুর্কিভাষী সুলতান বায়েজিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের শক্তিক্ষয় ছাড়া আর কিছু অর্জন করা যাবে না'-এটিই ছিল তাদের যুক্তি। তাই তাইমুর আশা করছিলেন, বায়েজিদ তার বশ্যতা স্বীকার করবে। কিন্তু বায়েজিদ আনুগত্যের পরিবর্তে অপমানকর পত্র প্রেরণ করেন। ফলে তাইমুর তাঁর বিরুদ্ধে
অভিযানের অজুহাত পেয়ে যান। তার সেনাপতিদের কোনো যুক্তিও ধোপে টিকল না। ৫৬
যুদ্ধবিরতির সময়ে তাইমুরের গুপ্তচরেরা তুর্কি সৈনিকদের মাঝে প্রচারকাজ চালিয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে তাদের মন বিষিয়ে তোলে। সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর আলেপ্পো, দামেস্ক, বাগ্রাস ধ্বংস করেন তাইমুর। তারপর কায়সারিয়া দখল করে সিবকাবাদের বিস্তৃত ময়দানে সৈন্য সমাবেশ করেন।
শিবির স্থাপনের জন্য বায়েজিদ উৎকৃষ্ট স্থান লাভে ব্যর্থ হন। পরে বাধ্য হয়ে উত্তর পাশে সৈন্য সমাবেশ করেন। শত্রুর প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের জন্য তিনি খুব দ্রুত এক মৃগয়ায় বের হন। তাঁর স্থান নির্বাচন এতটাই খারাপ ছিল, কসোভো ও নিকোপলিসের যুদ্ধজয়ী পাঁচ হাজার লড়াকু যোদ্ধাকে কেবল পানির অভাবে প্রাণ দিতে হয়। আত্মঘাতী শিকার হতে ফিরে এসে বায়েজিদ দেখেন, তাইমুর তাঁর শিবির দখল করে ফেলেছেন। শত্রুরা নিকটবর্তী জলাধারও ভরাট করে ফেলেছিল। নিজের উপেক্ষা ও বোকামির কারণে ৭০ বছরের বৃদ্ধের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে বায়েজিদ তৃষ্ণার্ত সৈনিকদের নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পেলেন না। সুলতানের সৈন্যসংখ্যা ছিল এক লাখ, আর তাইমুরের আট লাখ। কাজেই অলৌকিক কিছু না ঘটলে সুলতানের জয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
১৪০২ সালের ২ জুলাই অ্যাঙ্গোরার প্রান্তরে প্রায় দশ লাখ সৈন্য পরস্পরের মুখোমুখি হয়। জেনিসেরিরা প্রাণপণে লড়াই করে, সার্ভিয়াজরাও যথেষ্ট বীরত্ব প্রদর্শন করে। এক ঘণ্টা যুদ্ধের পর মনে হয় সুলতানেরই জয় হবে। কিন্তু কিছু সৈন্যের পক্ষত্যাগ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। করদ রাজ্য আয়দিন, মানতিশা, সারুখান ও জার্মিয়ান-এর বহু সৈন্য ছিল সুলতানের বাহিনীতে। তারা পক্ষত্যাগ করে তাইমুরের দলে যোগ দিলে বায়েজিদের সৈন্য সংখ্যা আরও কমে যায়।
পশ্চাদপসরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বস্ত কিছু সৈনিক নিয়ে একটি উচ্চ ভূমিতে উঠে সারাদিন সৈন্যসাগর ঠেকিয়ে রাখেন সুলতান। কিন্তু প্রভুভক্ত জেনিসেরিরা পিপাসা, ক্ষুধা ও আঘাতের ফলে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর উপায়ন্তর না দেখে ইলদিরিম বায়েজিদ পালাতে চাইলেন। হয়তো একেই বলে দুর্ভাগ্য! নিয়তির ফেরে তিনি পালাতেও পারলেন না। তাঁর ঘোড়া হোঁচট খাওয়ায় তিনি অশ্বপৃষ্ঠ হতে পড়ে যান। শত্রুরা তাঁকে বন্দি করে।
শাহজাদা মুসা ও মুস্তাফা ধরা পড়েন। বায়েজিদের অপর পুত্ররা তথা সুলায়মান, মুহাম্মাদ ও ঈসা পালাতে সক্ষম হন।
বিধির কী বিধান! দেড়শো বছর আগে যে অ্যাঙ্গোরায় তুর্কি সাম্রাজ্যের সূচনা, ঠিক সেখানেই 'খোদার গজবের' হাতে তাঁর পতন ঘটল।
চীন থেকে অড্রিয়াটিক-এই বিশাল ভূভাগ, ভাগাভাগি করে শাসন করতেন দুজন নৃপতি, বায়েজিদ ও তাইমুর। দুজনেই ছিলেন ধর্মে মুসলিম আর জাতিতে তুর্কি। আঙ্কারার যুদ্ধে তাঁরা দুজনই আপন আপন সন্তান-সন্ততিসহ অংশগ্রহণ করেছেন। সমগ্র মধ্যযুগে পৃথিবীতে এত বড়ো স্থলযুদ্ধ আর একটিও সংঘটিত হয়নি। তাই আঙ্কারা যুদ্ধ অটোম্যান তুর্কিদের ইতিহাসে অনেক বড়ো বিপর্যয়-যা তাদের বিজয়াভিযানকে অর্ধ শতাব্দীর জন্য পিছিয়ে দেয়। তেমনিভাবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং মধ্যযুগের বয়স পঞ্চাশ বছর বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য বাইজেন্টিয়ামের প্রলম্বিত জীবন মোটেও সুখকর ছিল না। তেমনিভাবে আনাতোলিয়ার ঐক্য প্রক্রিয়াকেও পিছিয়ে দিয়েছিল। সমগ্র আনাতোলিয়াকে পুনরায় তুর্কি শাসনাধীনে আনতে আরও ১১৫ বছর লেগে গিয়েছিল।
বন্দিজীবনের প্রথম দিকে বায়েজিদ যথেষ্ট সম্মান পেয়েছেন। কিন্তু একবার তিনি পালাতে গিয়ে ব্যর্থ হন। তারপর থেকে তাইমুর তাঁর সাথে কঠোর ব্যবহার করতে শুরু করেন। অনেক প্রহরী তাঁকে দিন-রাত পাহারা দিত, রাতে তাঁকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হতো। তাইমুর যেখানে যেতেন, বাহকেরা শিবিকায় করে বায়েজিদকে সেখানে নিয়ে যেত।
বন্দি বায়েজিদ বেশিদিন তাঁর শত্রুকে আনন্দ দিতে পারলেন না। অপমান আর অত্যাচারে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। বন্দিদশায় ৭ মাস ১২ দিন কাটানোর পর ১৪০৩ সালের মার্চ মাসে ইলদিরিম বায়েজিদ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাইমুর লাশের প্রতি অবজ্ঞা করেননি। বায়েজিদের মরদেহ ব্রুসায় নিয়ে যথাসম্মানে সমাহিত করার অনুমতি দেওয়া হয়। পিতা সুলতান মুরাদের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৪ বছর, আর শাসনের মেয়াদ ছিল ১৩ বছর।
আঙ্কারা যুদ্ধের পূর্বে বায়েজিদের সালতানাতের আয়তন ছিল ৯,৪২,০০০ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ তিনি সালতানাতের আয়তন ৪,৪৩,০০০ বর্গকিলোমিটার বৃদ্ধি করেছিলেন। ৫৭
টিকাঃ
৪২. Gibbons, op.cit., p. 182; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৭
৪৩. ইয়াগি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১
৪৪. Vasiliev, op.cit., p. 586.
45. Vasiliev, op.cit., p. 630.
৪৬. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৯
৪৭. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৬-০৭
৪৮. সম্ভবত চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধ্বে সিগিসমান্ডের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র ইউরোপে ছিল না। তিনি ছিলেন হাঙ্গেরির রাজা (১৩৮৭-১৪৩৭), রোমানিয়ার রাজা (১৪১১-১৪৩৩), জার্মানির সম্রাট (১৪৩৩-১৪৩৭) ও বোহেমিয়ার রাজা (১৪১৯-১৪৩৭)। খ্রিষ্টান ধর্মসংস্কারক জন হাসকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরও তিনি তাকে পুড়িয়ে মেরেছিলেন। (পিটারসন, ১৫৯; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪০-১৪১)
৪৯. সেন্ট জনের নাইট: একাদশ শতকে ক্রুসেড যুদ্ধের সময় একদল খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ‘সেন্ট জনের নাইট' নাম ধারণ করে জেরুজালেমে গমন করেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের সেবা করা। ১১৮৭ সালে সালাহ উদ্দিন আইউবি জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করলে এরা রোডস দ্বীপে বসবাস করতে শুরু করে। এখান থেকেই তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করত। চতুর্দশ শতকের শেষ ক্রুসেডেও তারা অংশগ্রহণ করে। সুলতান সুলায়মান কানুনি ১৫২২ সালে রোডস দ্বীপ দখল করলে তারা মাল্টায় পালিয়ে যায়। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশরে অভিযান চালানোর পথে মাল্টা দখল করলে এ সম্প্রদায়ের নাম-নিশানা মুছে যায়। (বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১)
৫০. আলি হাসুন, আল-উসমানিয়্যুন ওয়াল বালকান, পৃ. ২৪-২৫; আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩; বেক, প্রাগুক্ত, ১৪০-১৪১; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৭; Vasiliev, op.cit.p. 630.
৫১. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪; বেগ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪; Vasiliev, op.cit. p. 631; Marsh, op.cit. p. 548.
৫২. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৭-০৮; রাশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩; আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪
৫৩. হালিম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩-৫৫
৫৪. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৮-০৯; Vasiliev, op.cit. p. 631-32.
৫৫. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৬; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৯
৫৬. উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১০
৫৭. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৬-১৪৭; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১; Vasiliev, op.cit. p. 635-36; Walsh, op.cit. p. 548.
📄 গৃহযুদ্ধ এবং খণ্ড-বিখণ্ড সালতানাত
বায়েজিদ-বধের কৃতিত্বে তাইমুর পশ্চিমাদের অভিনন্দনে সিক্ত হন। এহেন কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্য ও মহান বিজয়ে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ক্যাস্টাইলের রাজা ও বাইজেন্টাইন সম্রাট তাইমুরকে অভিনন্দিত করেন। ইউরোপীয় রাজারা মনে করল, তুর্কিদের হুমকি হতে তারা চিরদিনের জন্য মুক্তিলাভ করেছে।
বায়েজিদের পরাজয়ের পর তাইমুর আজনিক, ব্রুসাসহ কয়েকটি শহর ও দুর্গ অধিকার করেন। তারপর রোডসের নাইটদের হাত থেকে আজমির মুক্ত করেন। 'উসমানি সাম্রাজ্য ধ্বংস করে তাইমুর ইসলামের ওপরই আঘাত হেনেছেন'- সাধারণ মুসলিমদের মাঝে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। খুব সম্ভবত এটি দূর করার জন্য তিনি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত কিছু এলাকাও দখল করেন।
এশিয়ার মাইনরের ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো বিলীন হয়ে উসমানি সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তাইমুরের কৃপায় ভূ-স্বামীরা পুনরায় রাজ্য ফিরে পায়। শুধু তাই নয়; উসমানি সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী তথা বায়েজিদের পুত্রদেরও পরস্পরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেন তাইমুর; অর্থাৎ উসমানি সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়। ৫৮
বায়েজিদ-পুত্রদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ
সুলতান বায়েজিদের সর্বাপেক্ষা তেজোদ্দীপ্ত পুত্র আরতুগরুল সিবাস যুদ্ধে তাইমুরের হাতে নিহত হন। সুলতানের মৃত্যুর পর তাঁর অন্য সন্তানরা সাম্রাজ্যের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। অপরদিকে ইউরোপীয় নৃপতিরাও একেক ভাইয়ের পক্ষাবলম্বন করে আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। বায়েজিদের মৃত্যুকালে জ্যেষ্ঠ পুত্র সুলায়মান এদিন বা আদ্রিয়ানোপল শাসন করছিলেন।
দ্বিতীয় পুত্র ঈসা ব্রুসায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কনিষ্ঠপুত্র মুহাম্মাদ আমাসিয়ায় একটি ক্ষুদ্র রাজ্য স্থাপন করেন।
ঈসা ও মুহাম্মাদের যুদ্ধ দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই শুরু হয়। এরমেনি-বেলি ও উলুবাদ-এর যুদ্ধে (মার্চ-মে, ১৪০৩) পরাজিত হয়ে ঈসা কনস্ট্যান্টিনোপলে পালিয়ে যান, আর মুহাম্মাদ ব্রুসা দখল করে নেন। দুই ভায়ের মাঝে কারাসিতে আবারও যুদ্ধ হয়। এবারও ঈসা পরাজিত হয়ে কারামানে পালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি এক গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ হারান।
অপর ভ্রাতা মুসা আঙ্কারার যুদ্ধে পিতাসহ তাইমুরের হাতে বন্দি হয়েছিলেন। তাইমুর তাকে জামিয়ানের ইয়াকুবের আশ্রয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদের অনুরোধে মুসা মুক্তিলাভ করেন। ঈসার মৃত্যুর পর সুলায়মান বিশাল বাহিনী নিয়ে বসফোরাস অতিক্রম করেন। শুরুতে তিনি বেশ সাফল্যও পেয়েছিলেন; ১৪০৪ সালেই তিনি আনাতোলিয়ায় অভিযান চালিয়ে ব্রুসা ও আঙ্কারা দখল করে নেন। এরপর এমন এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, মুহাম্মাদ ও সুলায়মান কেউ কাউকে হারাতে পারছিলেন না। এ অবস্থা প্রায় পাঁচ বছর (১৪০৫-১৪১০) অব্যাহত থাকে।
অচলাবস্থা ভাঙার লক্ষ্যে মুসাকে থ্রেসে প্রেরণ করেন মুহাম্মাদ। দক্ষিণ-পূর্বে ইউরোপে নিজের এলাকা আক্রান্ত হতে দেখে সুলায়মান ছুটে আসেন থ্রেসে। কসমিডিয়নের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সুলায়মানই জিতলেও (১৪১০) পরের বছর ইদিনের যুদ্ধে সুলায়মান পরাজিত ও নিহত হন। তখন থ্রেসে উসমানি এলাকার শাসক হন মুসা। ওদিকে তুর্কিদের এশীয় অংশে যথারীতি ক্ষমতায় বহাল আছেন মুহাম্মাদ।
বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল দ্বিতীয় পেলিওলোগাস ছিলেন সুলায়মানের মিত্র। তাই মুসা কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ করেন। সম্রাটের অনুরোধে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন মুহাম্মাদ। তুর্কিদের দুটি বাহিনী দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। কিছুদিন লড়াইয়ের পর মুহাম্মাদের এলাকায় বিদ্রোহ হলে তাকে বসফোরাস পাড়ি দিয়ে নিজ রাজ্যে ফিরে আসতে হয়। ওদিকে মুসা কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধ অব্যাহত রাখেন। মুহাম্মাদ এবার থ্রেসে আক্রমণ করেন। তিনি সার্বিয়ান ডেসপট স্টিফেন লাজারভিচ-এর সমর্থন পান। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই ভ্রাতার বাহিনী চামূর্লির সমভূমিতে (বর্তমান সামুকভ, বুলগেরিয়া) মুখোমুখি হন। যুদ্ধে মুসা পরাজিত ও নিহত হন। পরবর্তী সময়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায়, বায়েজিদের পুত্রদের মাঝে মুহাম্মাদ ছাড়া আর কেউ বেঁচে রইল না।
শেষ পর্যন্ত তিনি হন উসমানি সালতানাতের পরবর্তী সুলতান। ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের সময়টুকু 'অটোম্যান ইনটেরেগনাম' নামে পরিচিত। ৫৯
বায়েজিদের মৃত্যুর ১২ বছরের মধ্যে উসমানি সালতানাত আবারও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায়। অথচ অনেকে ধারণা করেছিল, ভ্রাতৃবিরোধে তাদের সাম্রাজ্য চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাদের এই বিস্ময়কর পুনরুত্থানের পেছনে সেই কারণগুলো সক্রিয়-যা তাদের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। তন্মধ্যে তিনটি কারণ বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।
প্রথমত : ধর্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও সামরিক পারদর্শিতায় সমকালীন অন্যান্য জাতির ওপর তুর্কিদের শ্রেষ্ঠত্ব।
দ্বিতীয়ত: অড্রিয়াটিক, কৃষ্ণসাগর, দানিয়ুব নদী ও ইজিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী ভূভাগে নানা জাতিভুক্ত জনগোষ্ঠীর বসবাস। তৃতীয়ত: গ্রিস সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা হ্রাস, বিচার ও শাসন বিভাগের ভয়াবহ অধঃপতন এবং গ্রিক জাতির নৈতিক অবনতি।
তা ছাড়া তুর্কিদের ন্যায় ধারাবাহিকভাবে যোগ্য নৃপতি লাভে ধন্য হয়েছে-এমন রাজবংশ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব একটা পাওয়া যায় না। সালতানাতের প্রতিষ্ঠার পর থেকে তুর্কিরা পরপর আটজন উপযুক্ত নরপতি লাভে ধন্য হয়েছে। আর কোনো রাজবংশ একাধিক্রমে এ রকম উপযুক্ত শাসক লাভের জন্য গর্ব করতে পারে না। নিস বিজয়ী ও জেনিসেরি সৈন্যের প্রতিষ্ঠাতা ওরহান, কসোভো বিজয়ী মুরাদ, নিকোপলিসজয়ী বায়েজিদ, বিধ্বস্ত সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ, হুনিয়াডির প্রতিদ্বন্দ্বী মহামতি মুরাদ, কনস্ট্যান্টিনোপল বিজেতা মুহাম্মাদ ফাতিহ, সিরিয়া ও মিশরজয়ী ভিম সেলিম, মোহাক্সজয়ী ও ভিয়েনা অবরোধকারী মহামান্বিত সুলায়মানের ন্যায় এত সুযোগ্য নরপতি পরপর আর কোনো দেশেই আবির্ভূত হয়নি।
তুর্কি শাহজাদাদের প্রতিপালন পদ্ধতিও যোগ্য শাসকপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। জেনিসেরি সৈনিকরা যেরূপ কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত, শাহজাদাকেও অনুরূপ সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হতো। তা ছাড়া তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে (প্রধানত প্রাদেশিক শাসনকর্তা) নিয়োগ প্রদান করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হতো। তুর্কি রাজপ্রাসাদে অলস ও কর্মবিমুখ বিলাসিতার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই তাইমুরের ধ্বংসলীলা-উত্তর ভ্রাতৃঘাতীর যুদ্ধের সমাপ্তিতে তুর্কি সাম্রাজ্য আবারও সগৌরবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
টিকাঃ
৫৮. মুস্তাফা, ৫৯
৫৯. Dimitris J. Kastritsis, The Sons of Bayezid: Empire Building and Representation in the Ottoman Civil War of 1402-1413, Brill, 2007.
📄 প্রথম মুহাম্মদ
[পিতা : সুলতান বায়েজিদ, মাতা: দওলত খাতুন, জন্ম: ১৩৮১, শাসনকাল : ১৪১৩-১৪২১, মৃত্যু: ১৪২১]
সুলতান বায়েজিদ ও দওলত খাতুনের (Devlet Hatun/دولت شاه خاتون) পুত্র মুহাম্মাদ ১৩৮১ (ভিন্নমতে ১৩৭৯) সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাইমুরের খাঁচায় পিতার মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৪১৩ সালে তিনি ক্ষমতায় আরোহণ করেন। ভদ্রতা, দয়া ও মানবিকতার কারণে তিনি মুহাম্মাদ চেলেবি বা 'ভদ্র মুহাম্মাদ' নামে পরিচিত ছিলেন (a noble representative of the Ottoman state (Vasiliev, 639) ।
তিনি ছিলেন মধ্যম আকৃতির, গোলগাল চেহারা, ফরসা গাত্রবর্ণ, লাল চিবুক, প্রশস্ত বক্ষ ও শক্তিশালী শরীরের অধিকারী। নিজ শাসনামলে তিনি ২৪টি যুদ্ধে অংশ নেন এবং তাঁর শরীরে অনধিক চল্লিশটি আঘাত ছিল। পিতার মৃত্যুর পর উদ্ভূত গৃহযুদ্ধের অবসান ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান কীর্তি। শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং ধৈর্য, দৃঢ়তা ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে একের পর এক ক্ষমতাপ্রার্থী ভাইদের পরাজিত করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। রাজ্য জয়ের চেয়ে বিদ্রোহ দমন ও সাম্রাজ্যের ভিত পুনর্নির্মাণেই তাঁকে বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে। তাই অনেক ইতিহাসবিদ তাঁকে উসমানি সালতানাতের 'দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা' বলে স্বীকার করেন।৬০
গৃহযুদ্ধের সময়টুকু বাদ দিলে প্রথম মুহাম্মাদের শাসন মাত্র আট বছর স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু এ অল্প সময়ের মাঝে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেন। গৃহযুদ্ধোত্তর সময়ে একটি সাম্রাজ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই মুখ্য; রাজ্য বিস্তার নয়। মুহাম্মাদ এটি বেশ বুঝতে পারেন এবং সে লক্ষ্যেই কাজ করেন। এ কাজটিও তিনি শান্তিতে করতে পারেননি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও খ্রিষ্টানদের সাথে তাঁর লড়াই বাধে। ইজিয়ান সাগরের দ্বীপপুঞ্জের (আরখাবিল) খ্রিষ্টান সর্দাররা তুর্কি জাহাজ ও উপকূলে লুণ্ঠন শুরু করলে ভেনিসের সাথে সুলতানের যুদ্ধ বাধে। গ্যালিপোলির কাছে এক নৌযুদ্ধে তুর্কি বহর সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। আরও কয়েকটি যুদ্ধে তিনি হাঙ্গেরি ও স্টাইরিয়ার বিরুদ্ধে পরাজিত হন (১৪১৬-২০), কিন্তু এতে উৎসাহ হারালেন না মুহাম্মাদ। সালতানাতের সঙ্গিন অবস্থা বিবেচনা করে তিনি যুদ্ধ অপেক্ষা সন্ধি স্থাপনে বেশি মনোযোগী হন। পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুসারে তিনি গ্রিক সম্রাটকে থেসালি ও কৃষ্ণসাগর তীরের কয়েকটি দুর্গ ছেড়ে দেন। ভেনিস ও রাঙসা রিপাবলিকের সাথেও চুক্তি সম্পাদিত হয়। যেহেতু এশিয়ার চেয়ে ইউরোপেই শত্রুসংখ্যা অধিক, তাই তিনি এদিনে রাজধানী স্থাপন করেন।
তবে এশিয়ায়ও শান্ত অবস্থা ছিল না। স্মার্নার শাসনকর্তা ছিলেন জুনাইদ। গৃহযুদ্ধের সুযোগে তিনি বিদ্রোহ করেন এবং আয়দিন দখল করে নেন। মুহাম্মাদের অনুপস্থিতিতে কারামানের রাজাও ব্রুসা আক্রমণ করে। ব্রুসা নগর পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেলেও শহরতলির মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা ভস্মীভূত হয়।
সুলতান স্মার্না অবরোধ করলে জুনাইদ ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। সেনাপতি বায়েজিদ পাশা কারামান বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করেন। রাজা মুস্তাফা বে বন্দি হন। সদাশয় সুলতান তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে কারামানরাজ আবারও তুর্কি এলাকা হামলা করেন। আবার পরাজিত হন তিনি। সুলতান আবারও তাকে ক্ষমা করেন। অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজ্য দখল না করে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে সন্তুষ্ট থাকেন সুলতান। ৬১
সুলতান মুহাম্মাদের সাথে বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েলের সুসম্পর্ক ছিল। খ্রিষ্টান শাসকের সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ সুলতান গ্রহণ করেননি। শুধু তাই নয়; সম্রাটের কিছু বাড়াবাড়িও শান্তির খাতিরে উপেক্ষা করেছেন।
একবার কনস্টান্টিনোপলের এক উপশহর অতিক্রমের সময় সুলতানের সাথে সম্রাটের সাক্ষাৎ হয়। দুই নৃপতি নিজ নিজ গ্যালিতে অবস্থান করে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আলাপচারিতা করেন। সুলতান প্রণালি অতিক্রম করে এশীয় তীরে তাঁবুতে অবস্থান নেন। সম্রাট অবশ্য গ্যালি হতে অবতরণ করেননি। রাতে উভয় নৃপতি তাঁদের নৈশভোজের সুস্বাদু ডিশ বিনিময় করেন।৬২
সুলতান মুহাম্মাদ দীর্ঘদিন শান্তি-সাধনা করতে পারলেন না। দরবেশ বিদ্রোহ তাঁর সাধনায় ছেদ ঘটায়। এ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন মুসার সামরিক বাহিনীর বিচারপতি (কাজি আসকার) বদরুদ্দিন। মনিবের পরাজয়ের পর তিনি আজনিকে অবস্থান করতে থাকেন। পরে সেখান থেকে পালিয়ে তার সাম্যবাদী ধর্মমতের প্রচার শুরু করেন। ৬৩ বহুসংখ্যক অনুসারী তার ভাগ্যে জুটে যায়। তাদের মধ্যে মুসলিম তো ছিলই; ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও ছিল। কারণ, তিনি সব ধর্মকে সমান মনে করতেন। পীর কলিজা মুস্তাফা নামে এক ব্যক্তি তাদের আধ্যাত্মিক নেতার ভূমিকা পালন করেন। তাদের আরেক গুরু ছিল ইহুদি, যার নাম ছিল তুরলাক কামাল।
সালাতানাতের বহু স্থানে তাদের উৎপাত বেড়ে গেলে সুলতানকে অস্ত্রধারণ করতে হয়। তিনি প্রথমে বুলগেরিয়ান প্রিন্স সিসম্যানকে দরবেশ বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করেন। কিন্তু পীর কলিজা মুস্তাফার হাতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। তারপর সুলতান মুহাম্মাদ তাঁর প্রথম উজির বায়েজিদ পাশাকে পাঠান। ইজমিরের উপকণ্ঠে 'কারা বুর্ন' নামক স্থানে সংঘটিত এক যুদ্ধে সাম্যবাদীদের বাহিনী পরাজিত হয়। তাদের নেতা মুস্তাফা ধৃত ও নিহত হন। এই গোষ্ঠীর অপর নেতা বদরুদ্দিন ঘাঁটি গেড়েছিলেন মেসিডোনিয়ায়। তীব্র প্রতিরোধের পর তিনি পরাজিত এবং বহু অনুচরসহ মৃতুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ৬৪
মধ্যযুগে সুলতান মুহাম্মাদের ন্যায় শান্তিবাদী নৃপতির দেখা মেলা ভার। কিন্তু তাঁর কপালে শান্তি জুটল না। সাম্যবাদী আন্দোলনের সমস্যা সমাধান হতে না হতেই বিদ্রোহী ভ্রাতা মুস্তাফার উদ্ভব হয়। সুলতানের ভাই
মুস্তাফা তাঁর পিতা বায়েজিদের সাথে বন্দি হয়েছিলেন তাইমুরের হাতে। তারপর থেকে তার খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৪২০ সালে হঠাৎ এক ব্যক্তি ইউরোপে নিজেকে বায়েজিদ-পুত্র মুস্তাফা বলে ঘোষণা করে সাম্রাজ্যের অংশ দাবি করে। অনেক তুর্কি তার দাবি মেনে নেয়। সুলতানের ক্ষমাপ্রাপ্ত জুনাইদও তার দলে যোগ দেয়। তবে সেলোনিকার যুদ্ধে মুস্তাফা পরাজিত হয়ে কনস্টান্টিনোপলে পালিয়ে যায়।
বাইজেন্টাইন সম্রাট বিপুল অর্থ লাভের অঙ্গীকারে মুস্তাফাকে সুলতানের মৃত্যু পর্যন্ত নজরবন্দি করে রাখতে রাজি হন। পরের বছর ১৪২১ সালে (৮২৪ হিজরি) সুলতান মুহাম্মাদ মাত্র ৪৩ বছর বয়সে এদিনে মারা যান। তাঁকেও ব্রুসার সবুজ কবরে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর উত্তরাধিকারীর জন্য ৮৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাম্রাজ্য রেখে যান।
অন্যান্য উসমানি সুলতানের তুলনায় সুলতান প্রথম মুহাম্মাদের শাসনকাল সংক্ষিপ্ত ছিল। তার ওপর প্রথমদিকে তাঁকে গৃহযুদ্ধে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। ফলে তিনি রাজ্য সম্প্রসারণ করতে পারেননি। তারপরও সদ্ব্যবহার, সদাশয়তা, ন্যায়বিচার, শান্তিপ্রিয়তা, সাহিত্য ও শিল্পকলায় উৎসাহ দানের জন্য তিনি চেলেবি বা ভদ্রলোক বলে পরিচিতি লাভ করেন। তিনিই প্রথম তুর্কি সুলতান, যিনি আমিরে মক্কার প্রতি বার্ষিক হাদিয়া প্রেরণের প্রথা চালু করেন। এ উপহারকে সাররা বলা হতো। ব্রুসায় তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, চীনামাটির প্রসাধন ছিল বলে সেটি সবুজ মসজিদ বলে খ্যাতি লাভ করে। এটি মুসলিম স্থাপত্যের ও খোদাই কাজের সবচেয়ে সুন্দর নমুনা বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। সদাশয় সুলতান মসজিদের কাছে একটি মাদরাসা স্থাপন এবং গরিবের জন্য সম্পদ ওয়াকফ করেন। তিনি অন্ধ ভাইকে ব্রুসার কাছে ভূ-সম্পত্তি দান করেন। গৃহযুদ্ধে নিহত ভাই সুলায়মানের এক কন্যাকে রক্ষা করে তাকে বিয়ে দেন। শাহজাদির সন্তান হলে তাকে তিনি সম্পদ ও অর্থ প্রদান করেন। ৬৫
টিকাঃ
৬০. রশিদি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭; উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬
৬১. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮-৩৯
৬২. জর্জ ফ্রান্তেজ ১১১-১২ qt. Vasiliev, op.cit. p. 640.
৬৩. বদরুদ্দিনের চিন্তাধারার কয়েকটি দিক: ক. জান্নাত ও জাহান্নামের বস্তুগত অস্তিত্ব অস্বীকার; খ. ক-এর ক্রমধারায় পুনরুত্থান ও কিয়ামত অস্বীকার; গ. ঈমানের দিক দিয়ে ইহুদি, নাসারা ও খ্রিষ্টানরা সমান; ঘ. মুহাম্মাদ অন্য রাসূলগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন, তাঁর রিসালাতও ভিন্ন কিছু নয়; ঙ. মালিকানার অধিকার অস্বীকার এবং রাষ্ট্রের সম্পদে সকল নাগরিকের সমানাধিকারের দাবি। (উজতুনা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৮)
৬৪. বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১
৬৫. আবদুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; বেক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১