📄 বড় এক পুঁজিপতির উক্তি
করাচিতে বড় মাপের একজন পুঁজিপতি আছেন। পাকিস্তানের নামকরা শীর্ষস্থানীয় দু-চারজন ধনীর একজন। মিলিয়নপতি-বিলিয়নপতি হবেন হয়তো। একদিন তিনি আমার কাছে এলেন। আমি তাকে বললাম, আল্লাহ পাক আপনাকে অনেক অর্থ দান করেছেন। আপনার অনেকগুলো মিল- কারখানা আছে। সব কিছুই আপনি করে নিয়েছেন। এবার মুনাফার চিন্তা বাদ দিয়ে কিছু কাজ আল্লাহর জন্য করুন। যেমন- এমন একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করুন, যেটি সুদ ছাড়া চলবে। আপনার কাছে যেহেতু বিপুল অর্থ আছে; তাই আপনি এ কাজটি করতে পারেন।
তিনি বললেন, মাওলানা ছাহেব! সেই ব্যাংকটি কীভাবে চলবে? আমি বললাম, আল্লাহ চাহেন তো চলবে। কিন্তু আপনি এই ব্যাংকটি এই নিয়তে করবেন যে, এখানে যা বিনিয়োগ করলাম, সবই গেছে। বিলিয়ন-মিলিয়ন টাকা যেহেতু আপনার আছে, এমতাবস্থায় কয়েক কোটি গেলে তাতে আপনার এমন কী আর আসবে-যাবে। এখানে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তার কথা আপনি ভুলে যাবেন।
তিনি চেহারায় বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন, কী বললেন; এই টাকার কথা আমি ভুলে যাব? আমি বললাম, হ্যাঁ, আপনি ভুলে যাবেন যে, আপনার এই টাকাগুলো কোথাও গেছে। তবে আল্লাহপাক চাইলে তাতে মুনাফাও দিতে পারেন। কিন্তু আপনাকে তার কথা ভুলে যেতে হবে। শেষে তিনি বললেন, মাওলানা ছাহেব! কথা তো আপনি ঠিকই বলছেন; কিন্তু হাতের খুজলিকে আমি কী করব?
📄 গরিব ও ধনীর ব্যয়ের পার্থক্য
এ হলো সম্পদ বাড়ানোর খুজলি। হযরত থানভী রহ. বলেন, এই কৃপণতাও পরে ধীরে-ধীরে খুজলির রূপ ধারণ করে। তারপর মানুষের কাছে যত সম্পদই আসুক-না কেন, তার লোভ মিটে না। আমি নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি, গরিব মানুষেরা যতটা মনের খুশিতে দান করে, মসজিদ- মাদরাসায় চাঁদা দেয়, কোটিপতি-মিলিয়নপতি-বিলিয়নপতিরা অতটুকু মনের খুশিতে দান করে না। অথচ ধনী লোকটির কাছে সুযোগ বেশি আছে। গরিবের অতটা সুযোগ নেই। এসবই সম্পদের লোভের কুফল।
📄 সুদখুরির মানসিকতা কৃপণতা জন্ম দেয়
এই কৃপণতার সবচেয়ে বড় উপকরণ হলো সুদ। কারণ, সুদের অর্থ হলো, কাজ কিছুই করবে না, কোনো ঝুঁকি মাথায় নেবে না; কিন্তু পয়সা দিয়ে পয়সা বানাও। এটি কৃপণের কাজ। আর সুদখুরির মানসিকতা যেহেতু মানুষের মধ্যে কৃপণতা সৃষ্টি করে, তাই দুনিয়াতে যত সুদখোর জাতি অতীত হয়েছে, সব চেয়ে বেশি কাঞ্জুসীও তাদেরই মাঝে বিদ্যমান আছে। জগতে সব চেয়ে বড় সুদখোর জাতি হলো ইহুদি। কুরআন ইহুদিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছে:
وَأَخْذِهِمِ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ
'...আর তাদের সুদ গ্রহণ করার কারণে। অথচ তাদেরকে সুদ খেতে বারণ করা হয়েছিল।' (সূরা নিসা, ১৬১ আয়াত)
আজও পৃথিবীর সমস্ত সুদি কারবার সেই ইহুদিদেরই হাতে। আর এরা- ই জগতের সব চেয়ে কাঞ্জুস জাতি। সারা পৃথিবীতে এরা কৃপণ জাতি হিসেবে পরিচিত।
📄 এক সুদখোর ইহুদির ঘটনা
আপনারা 'শাইলাক'-এর ঘটনা শুনে থাকবেন। এটি রোমের একটি ঘটনা। এক ইহুদি ছিল। তার নাম 'শাইলাক'। এক লোক ঠেকায় পড়ে তার কাছে কিছু টাকা ধার আনতে গিয়েছিল। শাইলাক বলল, আমি সুদ ছাড়া ঋণ দেই না। লোকটি বাধ্য হয়ে সুদের চুক্তিতে ঋণ গ্রহণ করল। শাইলাক তাকে বলে দিল, এত দিনের মধ্যে পারিশোধ করতে হবে আর আমাকে মূল টাকার অতিরিক্ত এত টাকা সুদ দিতে হবে।
মেয়াদ শেষ হয়ে গেল এবং ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত দিনটি এসে পড়ল। শাইলাক ঋণের টাকা উসুল করার জন্য ঋণগ্রহীতার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। কিন্তু যেহেতু ঋণগ্রহীতা লোকটি গরিব ছিল; তাই সে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলো। বলল, আমার কাছে তো কোনোই টাকা নেই যে, আপনাকে দেব। থাকলে দিয়ে দিতাম। শাইলাক আরেকটি তারিখ ধার্য করে দিয়ে বলল, এই তারিখের মধ্যে দিয়ে দিয়ো আর তোমার সুদ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তখন তোমাকে ডাবল সুদ আদায় করতে হবে।
সেই তারিখটিও এল। শাইলাক তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। ঋণগ্রহীতা বলল, আপনি তো সুদ ডাবল করে দিয়েছেন; যা আদায় করতে আমি অপারগ। কাজেই সুদের অংশটা বাদ দিয়ে আসল টাকাটা নিয়ে নিন এবং আমাকে এই ঋণের দায় থেকে মুক্তি দিন। শাইলাক বলল, না, তা হবে না-আমাকে পুরোপুরি-ই দিতে হবে। একটি টাকাও আমি তোমাকে মাফ করতে পারব না। তবে এটুকু করতে পারি যে, আমি তোমাকে আরেকটি তারিখ ঠিক করে দিয়ে যাচ্ছি; সেই তারিখে যদি না দাও, তা হলে আমি তোমার শরীর থেকে এক পাউন্ড গোশত কেটে নিয়ে তা চিবিয়ে খাব। আর টাকা তো আলাদা উসুল করবই।
সেই তারিখটিও এসে পড়ল। গরিব ঋণগ্রহীতা বেচারা টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলো। শাইলাক তার ঘরে ছুরি নিয়ে হাজির হলো। গরিব বেচারা পেরেশান হয়ে গেল এবং কোনোমতে পালিয়ে রাজদরবারে রাজার কাছে চলে গেল। গিয়ে রাজাকে বলল, মহারাজ! আমি একটি বিপদে পড়েছি; আপনি আমাকে রক্ষা করুন। শাইলাক আমার গায়ের গোশত কেটে নিতে চাচ্ছে।
আদালতে মামলা হলো। ঋণগ্রহীতা লোকটিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলো। বিচারের জন্য এজলাস বসল। শাইলাক আদালতে জোরালো বক্তব্য দিল। তাতে সে বলল, মাননীয় আদালত! আমার সঙ্গে সুবিচার করুন। এই লোকটি এতদিন যাবত আমার সঙ্গে টালবাহানা করছে। আমার থেকে সুদের উপর ঋণ নিয়ে এখন পরিশোধ করছে না। শেষ পর্যন্ত সে নিজেই আমাকে তার গায়ের গোশত কেটে দেবে বলে এখন তাও দিচ্ছে না। আমি আদালতের কাছে এর সুবিচার কামনা করছি। আমি আশা করি, আদালত আমার পক্ষে এই ডিক্রি জারি করবেন, যাতে আমি তার গোশত কেটে নিতে পারি। কারণ, আমার জানামতে এটি-ই ন্যায় বিচারের দাবি।
ঋণগ্রহীতা গরিব লোকটি কারাগারে বন্দী ছিল। তাকে আদালতে হাজির করা হয়নি। তার পক্ষে তার স্ত্রী আদালতে এল। সে স্বামীর পক্ষে বক্তব্য দিল। বলল, মহামান্য আদালত! সুদখোর শাইলাক আপনার কাছে সুবিচার দাবি করেছে। তার দাবি অনুসারে সুবিচার হলো, তাকে আমার ঋণগ্রহীতা স্বামীর গায়ের গোশত কেটে নেওয়ার অধিকার প্রদান করা। আমি আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, আল্লাহ যদি আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে সুবিচারই করেন, তা হলে আমাদের ঠিকানা কোথায় হবে? এই জগতে সুবিচারই সব কিছু নয়। দয়া বলেও একটি কথা সংসারে আছে। আল্লাহপাক আমাদের উপর দয়া করবেন। আল্লাহর দয়া ছাড়া আমরা মুক্তি পাব না।
বাদশাহ দয়ার ভিত্তিতে লোকটির পক্ষে রায় প্রদান করলেন।
তো আমি বলতে চাচ্ছিলাম, শাইলাক-এর মতো ইহুদি জাতি সারা জগতে কৃপণ হিসেবে প্রসিদ্ধ।