📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 বেশি অবিচার ঋণদাতার উপর

📄 বেশি অবিচার ঋণদাতার উপর


এই বাণিজ্যিক সুদ একটি গোলকধাঁধা। এর প্রতিটি পদ্ধতি অবিচার। যদি পুঁজিপতি ব্যবসায়ীর মুনাফা হয়, তা হলেও জুলুম, যদি লোকসান হয়, তা হলেও জুলুম। লাভ হলে ঋণদাতার উপর জুলুম। আর লোকসানের সময় ঋণগ্রহীতার উপর জুলুম। বর্তমান বিশ্বের ব্যাংকগুলোতে যে ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু আছে, তাতে বেশি জুলুম হচ্ছে ঋণদাতার উপর।
কথাটি বুঝতে হলে আগে আরও একটি বিষয় বুঝতে হবে যে, সাধারণত ব্যাংকগুলোতে জনসাধারণের রাখা আমানত থাকে। দেশের সাধারণ মানুষের অর্থ দ্বারা-ই একটি ব্যাংক অস্তিত্ব লাভ করে। কিন্তু এই জনসাধারণই যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে যায়, তা হলে ব্যাংক তাদের ঋণ দেবে না। বরং ব্যাংক ঋণ দেবে সেই পুঁজিপতিকে, যার কাছে আগে থেকেই পুঁজি আছে; এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি তার ব্যবসার পরিধি আরও সম্প্রসারিত করতে চাচ্ছেন। কিংবা এমন পুঁজিপতিকে দেবে, যার মিল-ফ্যাক্টরি আছে; তিনি তার এই ব্যবসাকে আরও বড় করতে চাচ্ছেন।
এবার হচ্ছে কী? ধরুন, একজন পুঁজিপতি পনেরো শতাংশ সুদের ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিল। তার সঙ্গে নিজের থেকে আরও কিছু যোগ করে কারবার শুরু করল। অনেক সময় কারবারে শতভাগ মুনাফা হয়ে যায়। আবার অনেক সময় কমও হয়। মনে করুন, এই ব্যবসায়ী তার কারবারে শতভাগ মুনাফা করল, যার ফলে তার এক লাখ টাকা দুলাখ টাকা হয়ে গেল। এক লাখ আসল পুঁজি আর এক লাখ মুনাফার অর্থ। এই মুনাফা থেকে সে পনেরো শতাংশ ব্যাংকের সুদ পরিশোধ করল। অবশিষ্ট পঁচাশি হাজার টাকা নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর ব্যাংক এই পনেরো হাজার টাকা থেকে নিজের খরচাদি কেটে রাখার পর সাত হাজার টাকা সেই জনসাধারণকে দিল, যাদের অর্থ দ্বারা ব্যবসায়ী ব্যবসা করে এক লাখ টাকা আয় করেছিল এবং তার থেকে পঁচাশি হাজার টাকা নিজের পকেটে রেখেছে।
এর দ্বারা অনুমান করুন, এই জনসাধারণের উপর কী পরিমাণ অবিচার হচ্ছে! কিন্তু সেই জনসাধারণ খুবই আনন্দিত যে, আমি সাত হাজার টাকা মুনাফা পেয়ে গেছি। অথচ তার এক লাখ টাকায় এক লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল!
আরও দেখুন, জনসাধারণ যে সাত হাজার টাকা পেয়েছিল, পুঁজিপতি ব্যবসায়ী সেই টাকাগুলোও অন্যভাবে জনসাধারণ থেকে উসুল করে নিচ্ছে। তা এভাবে যে, ব্যবসায়ীদের নিয়ম হলো, তারা ব্যাংককে যে সুদ প্রদান করে, তা তাদের পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যোগ করে নেয়।
যেমন- এই ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে নেওয়া এক লাখ টাকা দ্বারা কাপড় প্রস্তুত করলেন। তিনি এই কাপড়গুলোর বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের আগে হিসাব করে দেখবেন, এগুলো প্রস্তুত করতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে। তখন সেই ব্যয়ের সঙ্গে ব্যাংকের সুদ বাবদ প্রদত্ত পনেরো হাজার টাকাও যোগ করে নিচ্ছেন। তারপর নিজের মুনাফা ধার্য করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেন। তাতে এই কাপড়গুলোর উৎপাদনব্যয় আপনা-আপনি পনেরো শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। তারপর জনসাধারণ যখন বাজারে গিয়ে এই কাপড়গুলো ক্রয় করবে, তখন তারা সেই পনেরো শতাংশ সুদের টাকাও পরিশোধ করে আসবে, যা ব্যবসায়ী ব্যাংককে দিয়ে এসেছে। এভাবে একজন পুঁজিপতি একদিকে জনসাধারণকে মাত্র সাত শতাংশ মুনাফা প্রদান করছে, অপরদিকে তাদের থেকে সুদ বাবত পনেরো শতাংশ উসুলও করে নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও জনসাধারণ খুশি যে, আমি সাত শতাংশ মুনাফা পেয়ে গেছি। অথচ বাস্তবতা হলো, তিনি যে-এক লাখ টাকা ব্যাংকে আমানত রেখেছিলেন, তার থেকে ফেরত পেয়েছেন মাত্র বিরানব্বই হাজার পাঁচশত টাকা!
এই বিশ্লেষণ সেই অবস্থার জন্য, যেখানে ব্যবসায়ী ব্যবসা করে লাভবান হলেন। কিন্তু যদি তার লোকসান হয়ে যায়, তা হলে সে ক্ষেত্রে তার লোকসানের প্রতিকারের জন্য সে ব্যাংক থেকে আরও ঋণ গ্রহণ করে। এভাবে তার ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে, যার ফলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যায়। আর একটি ব্যাংকের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, যে লোকগুলো এই ব্যাংকে আমানত রেখেছিল, তারা সেসব আর ফেরত পাবে না। যেমনটি কিছুদিন আগে আমাদের বিসিআইসি ব্যাংকের বেলায় ঘটেছিল। যেন এই ক্ষেত্রে সমস্ত লোকসান জনসাধারণেরই হলো। ব্যবসায়ীর কোনোই ক্ষতি হলো না।
এর দ্বারা অনুমান করে নিন, 'বাণিজ্যিক ঋণের সুদ'-এর কারণে যে অবিচারটি হচ্ছে, তা 'সারফি ঋণের সুদ'কেও হার মানিয়ে দিল। কারণ, ব্যবসায় অর্থের ব্যবহার হচ্ছে পুরোটা জনসাধারণের। কিন্তু লাভ হলে তার মালিক পুঁজিপতি আর লোকসান হলে তার দায় জনসাধারণের। এর চেয়ে বড় জুলুম আর কী হতে পারে? এ হলো লোকসানের সেই সুরত, যেখানে স্বয়ং ব্যাংকই দেউলিয়া হয়ে যায়। কিন্তু যদি ব্যবসা চলাকালে পুঁজির আংশিক ক্ষতি হয়ে যায়; যেমন- ব্যবসায়ী কাপড় তৈরি করার জন্য তুলা ক্রয় করেছিল। সেই তুলায় আগুন ধরে গেল। তো এই ক্ষতির প্রতিকারের জন্য উক্ত পুঁজিপতির সামনে আরেকটি পথ খোলা আছে। তা হলো, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00