📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 শরীয়তের বিধানে ধনী আর গরিবের কোনো পার্থক্য নেই

📄 শরীয়তের বিধানে ধনী আর গরিবের কোনো পার্থক্য নেই


দ্বিতীয় বিভ্রান্তি হলো, যারা সুদ'কে জায়েয বলেন, তাদের বক্তব্য হচ্ছে, সারফী ঋণে কোনো ব্যক্তি যদি সুদ দাবি করে, তা হলে যেহেতু সারফী ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিরা গরিব মানুষ, তাই তাদের থেকে সুদ দাবি করা জুলুম। কিন্তু বাণিজ্যিক ঋণের সুদ এমন নয়। কারণ, এই ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিরা পুঁজিপতি ও ধনী; তাদের থেকে সুদ দাবি করায় জুলুমের কিছু নেই। এটিও একটি ভুল বোঝাবুঝি ও বিভ্রান্তি। অথচ আসল বিষয় হলো, ঋণের উপর সুদ দাবি করা জায়েয, নাকি না-জায়েয? আপনি যদি বলেন, ঋণের উপর সুদ গ্রহণ করা জায়েয নয়, তা হলে তাতে ধনী-গরিবের কোনো পার্থক্য না থাকা উচিত।
বিষয়টি একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বুঝুন। এক ব্যক্তি রুটি বিক্রি করছে। একটি রুটি তৈরি করতে খরচ পড়ে বারো আনা। চার আনা লাভ ধরে একটি রুটির মূল্য নির্ধারণ করেছে এক টাকা। সে ধনী আর গরিবের মাঝে কোনো পার্থক্য রাখেনি যে, গরিবদেরকে কম দামে রুটি দেবে আর ধনীদের থেকে বেশি নেবে। বরং সবাইকে একই দামে রুটি দিচ্ছে। কিন্তু কেউ একথা বলছে না যে, তুমি একটি রুটির বিনিময়ে গরিবদের কাছ থেকে এক টাকা নিয়ে জুলুম করছ। কারণ, সে তার ন্যায্য পাওনা-ই উসুল করছে। আর ধনী- গরিব সকলের কাছ থেকে মুনাফা অর্জন করা জায়েয আছে। এতে কোনো প্রকার অবিচার নেই।
ঠিক তদ্রূপ একজন গরিব মানুষ কারও কাছে থেকে ঋণ চায় আর ঋণদাতা তার নিকট থেকে সুদ দাবি করে। তো আপনি বলছেন, যেহেতু ঋণগ্রহীতা লোকটি গরিব; তাই তার থেকে সুদ দাবি করা অবিচার। প্রশ্ন হলো, এক ব্যক্তি একজন গরিব মানুষের কাছে মুনাফায় রুটি বিক্রি করছে; কিন্তু তাতে কোনো অবিচার হচ্ছে না; কিন্তু আরেকজন সেই গরিব লোকটিকেই ঋণ দিয়ে সুদ দাবি করছে; এটি অবিচার হবে কেন? আপনারা এ কেমন কথা বলছেন?
এর দ্বারা প্রমাণিত হলো, এখানে অবিচারের কারণ 'দারিদ্র্য' নয়। বরং অবিচারের আসল কারণ এখানে অতিরিক্তি 'অর্থ'। আর এই কারণ গরিবের ঋণের মধ্যে যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি ধনী-পুঁজিপতিদের ঋণের মাঝেও পাওয়া যাচ্ছে। আমার আলোচনার ফলাফল দাঁড়াল, রুটি তৈরি করে লাভে বিক্রি করা অবিচার নয়; বরং জায়েয ও সুবিচারের অনুকূল। কিন্তু (ঋণের) অর্থের উপর বাড়তি দাবি করা সুবিচারেরও পরিপন্থী আবার শরীয়তেরও খেলাফ। কারণ, অর্থ এমন কোনো বস্তু নয়, যার উপর মুনাফা দাবি করা যেতে পারে। কাজেই অর্থ ঋণগ্রহণকারী ব্যক্তি ধনী হোক বা গরিব উভয় অবস্থাতেই তার উপর সুদ হারাম হওয়ার বিধান কার্যকর হবে।

📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 লাভ-লোকসান উভয়ে অংশীদার হতে হবে

📄 লাভ-লোকসান উভয়ে অংশীদার হতে হবে


যারা বাণিজ্যিক সুদকে জায়েয বলেন, তারা একটি কথা এও বলেন যে, বাণিজ্যিক সুদে জুলুম নেই। এটিও একদম ভুল কথা। বিষয়টিকে খানিক বিশ্লেষণের সঙ্গে বোঝা দরকার। দেখুন, শরীয়ত এই মূলনীতি বর্ণনা করেছে যে, তুমি যদি কাউকে ঋণ প্রদান কর, তা হলে আগে এই সিদ্ধান্ত নাও, এই ঋণের মাধ্যমে তুমি তাকে সাহায্য করতে চাও, নাকি তার কারবারে অংশীদার হতে চাও। যদি ঋণ প্রদানে তোমার উদ্দেশ্য হয় তাকে সাহায্য করা, তা হলে তাকে শুধু সাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দাও। তখন এই ঋণের বিপরীতে তোমার জন্য তার থেকে বাড়তি দাবি করা জায়েয হবে না। আর যদি এই অর্থের মাধ্যমে তুমি তার কারবারে অংশীদার হতে চাও, তা হলে তোমাকে তার কারবারের লাভ-লোকসান উভয়ের অংশীদার হতে হবে। এটা হতে পারবে না যে, আপনি তাকে বলে দেবেন, আমি তোমার লাভের অংশীদার হব; কিন্তু লোকসানের অংশীদার হব না।
সুদে বাণিজ্যিক ঋণদাতা ব্যাংক পুঁজিপতিকে বলে দেয়, আমি এই ঋণের উপর তোমার থেকে পনেরো শতাংশ সুদ নেব। তোমার ব্যবসায় লাভ হোক বা লোকসান হোক আমি তা দেখব না। তোমার লাভ-লোকসানের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার কেবল সুদ দরকার। বলা বাহুল্য যে, এই চরিত্র ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী।

📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 বেশি অবিচার ঋণদাতার উপর

📄 বেশি অবিচার ঋণদাতার উপর


এই বাণিজ্যিক সুদ একটি গোলকধাঁধা। এর প্রতিটি পদ্ধতি অবিচার। যদি পুঁজিপতি ব্যবসায়ীর মুনাফা হয়, তা হলেও জুলুম, যদি লোকসান হয়, তা হলেও জুলুম। লাভ হলে ঋণদাতার উপর জুলুম। আর লোকসানের সময় ঋণগ্রহীতার উপর জুলুম। বর্তমান বিশ্বের ব্যাংকগুলোতে যে ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু আছে, তাতে বেশি জুলুম হচ্ছে ঋণদাতার উপর।
কথাটি বুঝতে হলে আগে আরও একটি বিষয় বুঝতে হবে যে, সাধারণত ব্যাংকগুলোতে জনসাধারণের রাখা আমানত থাকে। দেশের সাধারণ মানুষের অর্থ দ্বারা-ই একটি ব্যাংক অস্তিত্ব লাভ করে। কিন্তু এই জনসাধারণই যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে যায়, তা হলে ব্যাংক তাদের ঋণ দেবে না। বরং ব্যাংক ঋণ দেবে সেই পুঁজিপতিকে, যার কাছে আগে থেকেই পুঁজি আছে; এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি তার ব্যবসার পরিধি আরও সম্প্রসারিত করতে চাচ্ছেন। কিংবা এমন পুঁজিপতিকে দেবে, যার মিল-ফ্যাক্টরি আছে; তিনি তার এই ব্যবসাকে আরও বড় করতে চাচ্ছেন।
এবার হচ্ছে কী? ধরুন, একজন পুঁজিপতি পনেরো শতাংশ সুদের ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিল। তার সঙ্গে নিজের থেকে আরও কিছু যোগ করে কারবার শুরু করল। অনেক সময় কারবারে শতভাগ মুনাফা হয়ে যায়। আবার অনেক সময় কমও হয়। মনে করুন, এই ব্যবসায়ী তার কারবারে শতভাগ মুনাফা করল, যার ফলে তার এক লাখ টাকা দুলাখ টাকা হয়ে গেল। এক লাখ আসল পুঁজি আর এক লাখ মুনাফার অর্থ। এই মুনাফা থেকে সে পনেরো শতাংশ ব্যাংকের সুদ পরিশোধ করল। অবশিষ্ট পঁচাশি হাজার টাকা নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর ব্যাংক এই পনেরো হাজার টাকা থেকে নিজের খরচাদি কেটে রাখার পর সাত হাজার টাকা সেই জনসাধারণকে দিল, যাদের অর্থ দ্বারা ব্যবসায়ী ব্যবসা করে এক লাখ টাকা আয় করেছিল এবং তার থেকে পঁচাশি হাজার টাকা নিজের পকেটে রেখেছে।
এর দ্বারা অনুমান করুন, এই জনসাধারণের উপর কী পরিমাণ অবিচার হচ্ছে! কিন্তু সেই জনসাধারণ খুবই আনন্দিত যে, আমি সাত হাজার টাকা মুনাফা পেয়ে গেছি। অথচ তার এক লাখ টাকায় এক লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল!
আরও দেখুন, জনসাধারণ যে সাত হাজার টাকা পেয়েছিল, পুঁজিপতি ব্যবসায়ী সেই টাকাগুলোও অন্যভাবে জনসাধারণ থেকে উসুল করে নিচ্ছে। তা এভাবে যে, ব্যবসায়ীদের নিয়ম হলো, তারা ব্যাংককে যে সুদ প্রদান করে, তা তাদের পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যোগ করে নেয়।
যেমন- এই ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে নেওয়া এক লাখ টাকা দ্বারা কাপড় প্রস্তুত করলেন। তিনি এই কাপড়গুলোর বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের আগে হিসাব করে দেখবেন, এগুলো প্রস্তুত করতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে। তখন সেই ব্যয়ের সঙ্গে ব্যাংকের সুদ বাবদ প্রদত্ত পনেরো হাজার টাকাও যোগ করে নিচ্ছেন। তারপর নিজের মুনাফা ধার্য করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেন। তাতে এই কাপড়গুলোর উৎপাদনব্যয় আপনা-আপনি পনেরো শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। তারপর জনসাধারণ যখন বাজারে গিয়ে এই কাপড়গুলো ক্রয় করবে, তখন তারা সেই পনেরো শতাংশ সুদের টাকাও পরিশোধ করে আসবে, যা ব্যবসায়ী ব্যাংককে দিয়ে এসেছে। এভাবে একজন পুঁজিপতি একদিকে জনসাধারণকে মাত্র সাত শতাংশ মুনাফা প্রদান করছে, অপরদিকে তাদের থেকে সুদ বাবত পনেরো শতাংশ উসুলও করে নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও জনসাধারণ খুশি যে, আমি সাত শতাংশ মুনাফা পেয়ে গেছি। অথচ বাস্তবতা হলো, তিনি যে-এক লাখ টাকা ব্যাংকে আমানত রেখেছিলেন, তার থেকে ফেরত পেয়েছেন মাত্র বিরানব্বই হাজার পাঁচশত টাকা!
এই বিশ্লেষণ সেই অবস্থার জন্য, যেখানে ব্যবসায়ী ব্যবসা করে লাভবান হলেন। কিন্তু যদি তার লোকসান হয়ে যায়, তা হলে সে ক্ষেত্রে তার লোকসানের প্রতিকারের জন্য সে ব্যাংক থেকে আরও ঋণ গ্রহণ করে। এভাবে তার ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে, যার ফলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যায়। আর একটি ব্যাংকের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, যে লোকগুলো এই ব্যাংকে আমানত রেখেছিল, তারা সেসব আর ফেরত পাবে না। যেমনটি কিছুদিন আগে আমাদের বিসিআইসি ব্যাংকের বেলায় ঘটেছিল। যেন এই ক্ষেত্রে সমস্ত লোকসান জনসাধারণেরই হলো। ব্যবসায়ীর কোনোই ক্ষতি হলো না।
এর দ্বারা অনুমান করে নিন, 'বাণিজ্যিক ঋণের সুদ'-এর কারণে যে অবিচারটি হচ্ছে, তা 'সারফি ঋণের সুদ'কেও হার মানিয়ে দিল। কারণ, ব্যবসায় অর্থের ব্যবহার হচ্ছে পুরোটা জনসাধারণের। কিন্তু লাভ হলে তার মালিক পুঁজিপতি আর লোকসান হলে তার দায় জনসাধারণের। এর চেয়ে বড় জুলুম আর কী হতে পারে? এ হলো লোকসানের সেই সুরত, যেখানে স্বয়ং ব্যাংকই দেউলিয়া হয়ে যায়। কিন্তু যদি ব্যবসা চলাকালে পুঁজির আংশিক ক্ষতি হয়ে যায়; যেমন- ব্যবসায়ী কাপড় তৈরি করার জন্য তুলা ক্রয় করেছিল। সেই তুলায় আগুন ধরে গেল। তো এই ক্ষতির প্রতিকারের জন্য উক্ত পুঁজিপতির সামনে আরেকটি পথ খোলা আছে। তা হলো, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00