📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 কারণ ও বিধানে পার্থক্য

📄 কারণ ও বিধানে পার্থক্য


এই দলিলের মধ্যে একাধিক ভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। প্রথম ভ্রান্তিটি হলো, এই দলিলের মধ্যে 'অবিচার'কে রিবা হারাম হওয়ার কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ অবিচার দূর করা রিবা হারাম হওয়ার কারণ নয়; বরং এটি রিবা হারাম হওয়ার হেকমত। আর বিধান নির্ভর করে কারণের উপর - হেকমতের উপর নয়। কারণ পাওয়া গেলেই বিধান জারি হয়ে যায় – হেকমতের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকুক আর না থাকুক।
এর একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত হলো, আপনারা দেখে থাকবেন, রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল (এর লাইট) বসানো থাকে। তাতে তিন ধরনের বাতি থাকে। লাল, হলুদ ও সবুজ। যখন লাল বাতি জ্বলে, তখনকার জন্য বিধান হলো, থেমে যাও। আর সবুজ বাতি জ্বলার অর্থ হলো, চলো। সিগন্যালের এই ব্যবস্থাপনা এজন্য চালু করা হয়েছে যে, এর মাধ্যমে ট্রাফিকে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দুর্ঘটনা রোধ হবে। তো এখানে এই যে লাল বাতি দ্বারা বুঝানো হয়েছে, থেমে যাও; এটি হলো, বিধানের কারণ। আর এর মাধ্যমে দুর্ঘটনা রোধ হওয়া এই বিধানের হেকমত। এক ব্যক্তি রাত বারোটার সময় গাড়ি চালিয়ে সিগন্যালের কাছে এল। তখন লাল বাতি জ্বলছিল। কিন্তু চার দিকে কোথাও আর কোনো গাড়ি নেই। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা নেই। এমতাবস্থায় তার জন্য আইন কী হবে? বলা বাহুল্য যে, এ সময়েও তার জন্য বিধান হলো, থেমে যাও। কারণ, এই মুহূর্তে যদিও সিগন্যাল মান্য করার হেকমত বিদ্যমান নেই; কিন্তু কারণ বিদ্যমান আছে। আর কারণ বিদ্যমান থাকলে হেকমত বিদ্যমান থাকুক আর না থাকুক বিধান কার্যকর হবে। কাজেই এই অবস্থায়ও চালকের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া জরুরি। যদি সে না দাঁড়ায়, তাহলে আইন অমান্য করার দায়ে তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং শাস্তির মুখোমুখী করা হবে।

📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 মদ হারাম হওয়ার হেকমত

📄 মদ হারাম হওয়ার হেকমত


অনুরূপভাবে শরীয়তের যত বিধান আছে, সমস্ত বিধান কারণের উপর নির্ভরশীল – হেকমতের উপর নয়। দুনিয়ার আইনেও এই নীতি কার্যকর, শরীয়তের আইনেও এই নীতি কার্যকর। পবিত্র কুরআন মদ সম্পর্কে বলেছে:
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلُوةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ ﴾
'শয়তান মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে চায়। তারপরও কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?' (সূরা মায়েদা, ৯১ আয়াত)
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মদ ও জুয়া হারাম হওয়ার একটি হেকমত বর্ণনা করেছেন যে, মদপান ও জুয়ার ফলে পরস্পর শত্রুতা ও বিদ্বেষ জন্ম নেয় এবং মানুষ এর কারণে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন হয়ে যায়। এখন যদি কেউ বলে, মদ-জুয়া তখনই হারাম হবে, যখন এসবের ফলে পরস্পর শত্রুতা সৃষ্টি হবে, বিদ্বেষ জন্ম নেবে। যদি শত্রুতা ও বিদ্বেষ না জন্মায়, তা হলে এগুলো হারাম হবে না। বলা অনাবশ্যক যে, এই বক্তব্য সঠিক বলে গ্রাহ্য হবে না। কারণ, শত্রুতা ও বিদ্বেষ জন্ম নেওয়া মদ-জুয়ার হারাম হওয়ার হেকমত – কারণ নয়।
অন্যথায় আজকাল তো মানুষ বলে থাকে, মদ শত্রুতা সৃষ্টি করার পরিবর্তে বন্ধুত্ব তৈরি করে। আর সেজন্যই বর্তমানে দুই বন্ধু যখন মিলিত হয়, তখন একজনের মদের পেয়ালা আরেকজনের মদের পেয়ালার সঙ্গে ধাক্কা খায়। এটিই প্রমাণ করে, মদ আমাদের দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, মদ যদি দুজনের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করার পরিবর্তে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে, তা হলে কি মদ হালাল হয়ে যাবে? কিংবা যদি কেউ বলে, আমি তো মদপান করছি; কিন্তু কই আল্লাহর স্মরণ থেকে তো আমি উদাসীন হচ্ছি না; কাজেই আমার জন্য মদ হালাল। তো এই ব্যক্তির জন্য মদ হালাল হয়ে যাবে কি? বলা বাহুল্য যে, এই ব্যক্তির জন্য মদ হালাল হবে না। কারণ, আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন হওয়া মদ হারাম হওয়ার হেকমত – কারণ নয়। আর বিধানের নির্ভরতা কারণের উপর – হেকমতের উপর নয়।
সুদের ব্যাপারটিও ঠিক অনুরূপ যে, 'অবিচার' সুদ হারাম হওয়ার কারণ নয় - হেকমত। 'তোমরাও অবিচার করবে না; আবার তোমাদের উপরও অবিচার করা হবে না' কথাটি সুদ হারাম হওয়ার হেকমত হিসেবে বলা হয়েছে। এটি সুদ হারাম হওয়ার কারণ নয়। কাজেই সুদ হারাম হওয়ার সম্পর্ক অবিচার পাওয়া-না-পাওয়ার সঙ্গে নয়। বরং এর সম্পর্ক হলো, সুদের হাকীকত পাওয়া না পাওয়ার সঙ্গে। যেখানেই সুদের হাকীকত পাওয়া যাবে, সেখানেই হারামের বিধান কার্যকর হয়ে যাবে-অবিচার পাওয়া যাক আর না যাক। এ হলো একটি বিভ্রান্তি।

📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 শরীয়তের বিধানে ধনী আর গরিবের কোনো পার্থক্য নেই

📄 শরীয়তের বিধানে ধনী আর গরিবের কোনো পার্থক্য নেই


দ্বিতীয় বিভ্রান্তি হলো, যারা সুদ'কে জায়েয বলেন, তাদের বক্তব্য হচ্ছে, সারফী ঋণে কোনো ব্যক্তি যদি সুদ দাবি করে, তা হলে যেহেতু সারফী ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিরা গরিব মানুষ, তাই তাদের থেকে সুদ দাবি করা জুলুম। কিন্তু বাণিজ্যিক ঋণের সুদ এমন নয়। কারণ, এই ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিরা পুঁজিপতি ও ধনী; তাদের থেকে সুদ দাবি করায় জুলুমের কিছু নেই। এটিও একটি ভুল বোঝাবুঝি ও বিভ্রান্তি। অথচ আসল বিষয় হলো, ঋণের উপর সুদ দাবি করা জায়েয, নাকি না-জায়েয? আপনি যদি বলেন, ঋণের উপর সুদ গ্রহণ করা জায়েয নয়, তা হলে তাতে ধনী-গরিবের কোনো পার্থক্য না থাকা উচিত।
বিষয়টি একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বুঝুন। এক ব্যক্তি রুটি বিক্রি করছে। একটি রুটি তৈরি করতে খরচ পড়ে বারো আনা। চার আনা লাভ ধরে একটি রুটির মূল্য নির্ধারণ করেছে এক টাকা। সে ধনী আর গরিবের মাঝে কোনো পার্থক্য রাখেনি যে, গরিবদেরকে কম দামে রুটি দেবে আর ধনীদের থেকে বেশি নেবে। বরং সবাইকে একই দামে রুটি দিচ্ছে। কিন্তু কেউ একথা বলছে না যে, তুমি একটি রুটির বিনিময়ে গরিবদের কাছ থেকে এক টাকা নিয়ে জুলুম করছ। কারণ, সে তার ন্যায্য পাওনা-ই উসুল করছে। আর ধনী- গরিব সকলের কাছ থেকে মুনাফা অর্জন করা জায়েয আছে। এতে কোনো প্রকার অবিচার নেই।
ঠিক তদ্রূপ একজন গরিব মানুষ কারও কাছে থেকে ঋণ চায় আর ঋণদাতা তার নিকট থেকে সুদ দাবি করে। তো আপনি বলছেন, যেহেতু ঋণগ্রহীতা লোকটি গরিব; তাই তার থেকে সুদ দাবি করা অবিচার। প্রশ্ন হলো, এক ব্যক্তি একজন গরিব মানুষের কাছে মুনাফায় রুটি বিক্রি করছে; কিন্তু তাতে কোনো অবিচার হচ্ছে না; কিন্তু আরেকজন সেই গরিব লোকটিকেই ঋণ দিয়ে সুদ দাবি করছে; এটি অবিচার হবে কেন? আপনারা এ কেমন কথা বলছেন?
এর দ্বারা প্রমাণিত হলো, এখানে অবিচারের কারণ 'দারিদ্র্য' নয়। বরং অবিচারের আসল কারণ এখানে অতিরিক্তি 'অর্থ'। আর এই কারণ গরিবের ঋণের মধ্যে যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি ধনী-পুঁজিপতিদের ঋণের মাঝেও পাওয়া যাচ্ছে। আমার আলোচনার ফলাফল দাঁড়াল, রুটি তৈরি করে লাভে বিক্রি করা অবিচার নয়; বরং জায়েয ও সুবিচারের অনুকূল। কিন্তু (ঋণের) অর্থের উপর বাড়তি দাবি করা সুবিচারেরও পরিপন্থী আবার শরীয়তেরও খেলাফ। কারণ, অর্থ এমন কোনো বস্তু নয়, যার উপর মুনাফা দাবি করা যেতে পারে। কাজেই অর্থ ঋণগ্রহণকারী ব্যক্তি ধনী হোক বা গরিব উভয় অবস্থাতেই তার উপর সুদ হারাম হওয়ার বিধান কার্যকর হবে।

📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 লাভ-লোকসান উভয়ে অংশীদার হতে হবে

📄 লাভ-লোকসান উভয়ে অংশীদার হতে হবে


যারা বাণিজ্যিক সুদকে জায়েয বলেন, তারা একটি কথা এও বলেন যে, বাণিজ্যিক সুদে জুলুম নেই। এটিও একদম ভুল কথা। বিষয়টিকে খানিক বিশ্লেষণের সঙ্গে বোঝা দরকার। দেখুন, শরীয়ত এই মূলনীতি বর্ণনা করেছে যে, তুমি যদি কাউকে ঋণ প্রদান কর, তা হলে আগে এই সিদ্ধান্ত নাও, এই ঋণের মাধ্যমে তুমি তাকে সাহায্য করতে চাও, নাকি তার কারবারে অংশীদার হতে চাও। যদি ঋণ প্রদানে তোমার উদ্দেশ্য হয় তাকে সাহায্য করা, তা হলে তাকে শুধু সাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দাও। তখন এই ঋণের বিপরীতে তোমার জন্য তার থেকে বাড়তি দাবি করা জায়েয হবে না। আর যদি এই অর্থের মাধ্যমে তুমি তার কারবারে অংশীদার হতে চাও, তা হলে তোমাকে তার কারবারের লাভ-লোকসান উভয়ের অংশীদার হতে হবে। এটা হতে পারবে না যে, আপনি তাকে বলে দেবেন, আমি তোমার লাভের অংশীদার হব; কিন্তু লোকসানের অংশীদার হব না।
সুদে বাণিজ্যিক ঋণদাতা ব্যাংক পুঁজিপতিকে বলে দেয়, আমি এই ঋণের উপর তোমার থেকে পনেরো শতাংশ সুদ নেব। তোমার ব্যবসায় লাভ হোক বা লোকসান হোক আমি তা দেখব না। তোমার লাভ-লোকসানের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার কেবল সুদ দরকার। বলা বাহুল্য যে, এই চরিত্র ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00