📄 সর্বপ্রথম পরিত্যাগ করা সুদ
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে যখন সুদ হারাম হওয়ার ঘোষণা প্রদান করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন:
وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُ رِبَانَا رِبَا عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَإِنَّهُ مَوْضُوعٌ كُلُّهُ 'জাহেলিয়াতের সুদ রহিত করা হলো। সবার আগে আমি আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদ রহিত করলাম। তার সম্পূর্ণ সুদ রহিত করা হলো।' (মুসলিম, হাদীস নং ১২৩৭, আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬২৮, দারেমী, হাদীস নং ১৭৭৪)
হযরত আব্বাস (রাযি.) সুদের উপর ঋণ দিতেন। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিলেন, আমি আমার চাচা আব্বাস-এর সম্পূর্ণ সুদ রহিত করে দিলাম। যার-যার কাছে তিনি সুদ পাওনা আছেন, সেগুলো আর পরিশোধ করতে হবে না।
বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্বাস (রাযি.)-এর যে সুদ রহিত ঘোষণা করেছিলেন, তার পরিমাণ ছিল দশ হাজার মিছকাল সোনা। প্রায় চার মাশায় এক মিছকাল হয়। আর এই দশ হাজার মিছকাল মূলধন ছিল না। বরং এই পরিমাণটি ছিল সুদ, যা তিনি মানুষের কাছে পাওনা ছিলেন। আপনারাই বলুন, যে বিনিয়োগের বিপরীতে দশ হাজার মিছকাল সোনা সুদ আসে, সেই ঋণ কি শুধু খাওয়া-পরার প্রয়োজনে গ্রহণ করা হয়েছিল? বলা অনাবশ্যক যে, উক্ত ঋণ ব্যবসার জন্যই নেওয়া হয়েছিল।
📄 সাহাবাযুগে ব্যাংকিং-এর একটি দৃষ্টান্ত
বুখারী শরীফের কিতাবুল জিহাদে আছে, হযরত যুবায়র ইবনে আওয়ام (রাযি.) নিজের কাছে হুবহু এ-যুগের ব্যাংকিং সিস্টেমের মতো একটি সিস্টেম বানিয়ে নিয়েছিলেন। মানুষ তাঁর কাছে বড়-বড় অংকের আমানত রাখত। তখন তিনি বলে নিতেন : سَلَفٌ لَكِنَّهُ 'আমানত নয় - এই অর্থ আমি ঋণ হিসেবে গ্রহণ করছি।' (বুখারী হাদীস নং ২৮৯৭) অর্থাৎ- তোমার এই অর্থ আমার দায়িত্বে ঋণ হিসেবে থাকল।
প্রশ্ন হলো, তিনি এমনটি কেন করতেন? হাফিয ইবনে হাজর রহ. ফাহুল বারীতে তার কারণ এই লিখেছেন যে, ঋণের এই পদ্ধতিতে উভয় পক্ষেরই লাভ ছিল। যারা আমানত রাখত, তাদের লাভ এই ছিল যে, যদি অর্থগুলো আমানত হিসেবে রাখা হতো, তা হলে হেফাজতের সঙ্গে রাখা সত্ত্বেও যদি তা খোয়া যেত বা চুরি হয়ে যেত, তা হলে হযরত যুবাইর ইবনে আওয়ামকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হতো না। কারণ, আমানতের কোনো ক্ষতিপূরণ (অনেক সময়) দিতে হয় না।
পক্ষান্তরে ঋণের অর্থ হারিয়ে গেলে বা চুরি হয়ে গেলেও তার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ঋণ গ্রহীতাকে তার জরিমানা আদায় করতে হয়। কাজেই হযরত যুবাইর ইবনে আওয়ام (রাযি.) অর্থগুলো ঋণ হিসেবে রাখার কারণে যারা আমানত রাখত, তাদের লাভ হলো যে, তাদের সম্পদগুলো নিরাপদ হয়ে গেল এবং ক্ষতিপূরণযোগ্য হয়ে গেল। আবার বিপরীতে হযরত যুবাইর ইবনে আওয়ام (রাযি.)-এর লাভ হলো, তাঁর এই অধিকার অর্জিত হয়ে গেল যে, এই অর্থগুলোকে তিনি তাঁর ইচ্ছানুযায়ী কাজে লাগাতে পারতেন। এই অর্থকে তিনি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় মৃত্যুর সময় তাঁর দায়িত্বে যে ঋণ ছিল, সে সম্পর্কে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়র (রাযি.) বলেন:
فَحَسِبْتُ مَا عَلَيْهِ مِنَ الدِّيْنِ فَوَجَدْتُه أَلْفَيْ أَلْفٍ وَمِأَتَى أَلْفٍ 'আমি তাঁর ঋণগুলো হিসাব করে দেখলাম, তার পরিমাণ বাইশ লাখ দিনার।'
বলাবাহুল্য, এত বড় ঋণ 'বাণিজ্যিক ঋণ'ই ছিল। 'সাফি ঋণ' ছিল না। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে 'বাণিজ্যিক ঋণে'র প্রচলন ছিল।
তারীখে তাবারীতে আছে, হযরত উমর (রাযি.)-এর খেলাফত আমলে আবু সুফিয়ান (রাযি.)-এর স্ত্রী হিন্দ বিনতে উত্ত্বা উমর (রাযি.)-এর কাছে এসে বাইতুল মাল থেকে ঋণ চেয়েছিল। হযতর উমর (রাযি.) তাকে ঋণ প্রদান করেছিলেন। হিন্দ বিনতে উত্তা বিলাদে কাল্ব গিয়ে সেই অর্থ দ্বারা ব্যবসা করেছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উক্ত ঋণ জঠরজ্বালা মেটানোর জন্য কিংবা মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের জন্য গ্রহণ করা হয়নি; বরং ব্যবসার জন্য গ্রহণ করেছিলেন।
নবুয়ত ও সাহাবাযুগে এরকম আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। আমি তাকমিলায়ে ফাল্গুল মুহিম-এ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। প্রয়োজনবোধ করলে সেখানে দেখে নেওয়া যেতে পারে।
উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল, একথা একদম ভুল যে, নবীযুগে বাণিজ্যিক ঋণ ছিল না। বরং ইতিহাস প্রমাণ করছে, সে যুগেও বাণিজ্যিক ঋণের প্রচলন ছিল। ইসলাম সুদ হারাম ঘোষণা করার পর তার উপর সুদের লেনদেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাজেই যে যুক্তি ও দলিলের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক সুদকে হালাল বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তার ভূমিকা ও ফলাফল দু-ই ভুল প্রমাণিত হলো।