📄 বাণিজ্যিক ঋণের উপর সুদের স্বরূপ
কিন্তু বর্তমান যুগের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণগ্রহীতা ব্যক্তিরা এমন কোনো গরিব-অসহায় মানুষ নয়, যাদের পেটে খাবার নেই, গায়ে কাপড় নেই, লাশ দাফনের ব্যবস্থা নেই। ব্যাংক এমন নিঃস্ব লোকদেরকে ঋণ দেয়ই না। আপনি-আমি যদি ব্যাংকে লোনের জন্য যাই, তা হলে ব্যাংকওয়ালারা আমাদেরকে পিটিয়ে ব্যাংক থেকে বেরই করে দেবে। বরং ব্যাংক থেকে যারা লোন নেয়, তারা বড়-বড় পুঁজিপতি ও ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ। আর তারা পেটের দায়ে লোন নেয় না। বরং তাদের লোন নেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে, এই অর্থকে ব্যবসায় বিনিয়োগ করে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা, মুনাফা করা। যেমন- ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একে দুলাখ টাকায় পরিণত করা।
তা ছাড়া তারা ব্যাংক থেকে যে অর্থ লোন নেয়, সেগুলো জনগণেরই অর্থ। যারা তাদের উপার্জন থেকে বাঁচিয়ে-বাঁচিয়ে ব্যাংকে আমানত রেখেছে। এমতাবস্থায় এই অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যাংক যদি সুদের নামে কিছু মুনাফা গ্রহণ করে, তা হলে এতে দোষের কী আছে! এখানে অবিচারের কী আছে! কাজেই সে যুগে যে সুদের প্রচলন ছিল, তাতে ঋণগ্রহীতার উপর অবিচার হতো। আর সেজন্যই পবিত্র কুরআন সেই সুদকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। কাজেই বর্তমান যুগের ব্যাংকের সুদ হারাম নয়।
কথাটি এভাবেও বলা যায় যে, এক ধরনের ঋণ আছে, যাকে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের জন্য গ্রহণ করে থাকে। এমন ঋণকে 'সাফি ঋণ' বলা হয়। আরেক ধরনের ঋণ আছে, যাকে মানুষ বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে থাকে। এমন ঋণকে 'বাণিজ্যিক ঋণ' বা 'উৎপাদনি ঋণ' বলা হয়। সুদের বৈধতার প্রবক্তাদের দাবি হলো, পবিত্র কুরআন 'সাফি ঋণ'-এর উপর সুদকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। 'বাণিজ্যিক ঋণের সুদ' হারাম নয়।
📄 সুদ জায়েয হওয়ার ভ্রান্ত দলিল
যারা সুদকে জায়েয ও বৈধ লেনদেন বলে দাবি করছে, তারা পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি দ্বারা দলিল উপস্থাপন করে থাকে। আল্লাহপাক বলেছেন:
أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَوا
'আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন।' (সূরা বাকারা, ২৭৫ আয়াত)
এই আয়াতটি উপস্থাপন করে তারা বলছে, এখানে সুদ বোঝাতে আল্লাহপাক الرِّبوا )'আর-রিবা') শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শুরুতে আলিফ লাম যুক্ত করে শব্দটিকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
কাজেই এখানে 'রিবা' বলতে সেই রিবাকে বোঝানো হয়েছে, জাহেলি যুগে ও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুরু যুগে যার প্রচলন ছিল। আর সে যুগে সুদ বলতে শুধু 'সাফি ঋণের সুদে'রই প্রচলন ছিল। 'বাণিজ্যিক ঋণের সুদ'-এর প্রচলন সে যুগে ছিল না। কাজেই একথাটি বলে বোঝানোর আবশ্যকতা নেই যে, একটি যুগে যার প্রচলন থাকে না, তাকে হারাম বা অবৈধ ঘোষণা করার কোনো মানে হয় না। কাজেই পবিত্র কুরআন যে সুদকে হারাম ঘোষণা করেছে, সেটি সেই সুদ, যার প্রচলন সে যুগে ছিল। আর তা হলো, একান্ত ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণের সুদ। অর্থাৎ-'সাফি ঋণে'র উপর সুদ। 'বাণিজ্যিক ঋণে'র উপর সুদ হারাম হবে না।