📄 দ্বিতীয় বিকল্প পদ্ধতি ‘ইজারা’
তা ছাড়া আল্লাহপাক ইসলামের আদলে আমাদেরকে এমন একটি দ্বীন দান করেছেন, যার মধ্যে 'মুশারাকা' ছাড়াও ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সিং-এর আরও বহু পদ্ধতি আছে। যেমন- একটি পদ্ধতি আছে 'ইজারা' (Leasing)।
পদ্ধতিটি হলো, এক ব্যক্তি বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকে আবেদন জানাল। ব্যাংক তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার কোন কাজে টাকা দরকার? তিনি বললেন, কারখানার জন্য আমার বিদেশ থেকে একটি মেশিন আমদানি করতে হবে। ব্যাংক তাকে টাকা দিল না। বরং নিজেরা মেশিন কিনে ভাড়ার চুক্তিতে তাকে দিয়ে দিল। পরিভাষায় এই কাজটিকে 'ইজারা' বা Leasing বলা হয়। কিন্তু আজকাল ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোতে 'ফাইন্যান্সিং লিজিং'-এর যে-পদ্ধতিটি চালু আছে, তা শরীয়তসম্মত নয়। এর এগ্রিমেন্টে অনেকগুলো ধারা (Clauses) শরীয়ত পরিপন্থী। তবে একে খুব সহজেই শরীয়তসম্মত বানিয়ে নেওয়া যায়। পাকিস্তানে একাধিক ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান এমন আছে, যেগুলোর লিজিং এগ্রিমেন্ট শরীয়তসম্মত।
📄 তৃতীয় বিকল্প পদ্ধতি ‘মুরাবাহা’
অনুরূপ আরও একটি পদ্ধতি আছে, আপনারা যার নাম শুনে থাকবেন। সেটি হলো, 'মুরাবাহা ফাইন্যান্সিং'। এটিও অপরের সঙ্গে লেনদেন করার একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে লাভের ভিত্তিতে পণ্যটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। মনে করুন, এক ব্যক্তি কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণের আবেদন জানাল। কিন্তু ব্যাংক তাকে টাকা না দিয়ে সেই মালটি ক্রয় করে লাভের ভিত্তিতে তার কাছে বিক্রি করল। ইসলামে এই পদ্ধতিও জায়েয। অনেকে মনে করে, এই পদ্ধতি তো হাত ঘুরিয়ে কান ধরার মতো হয়ে গেল। কারণ, এখানে ব্যাংক এক পদ্ধতির পরিবর্তে আরেক পদ্ধতিতে মুনাফা আদায় করে নিল। কিন্তু তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেছেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
'আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন আর রিবাকে করেছেন হারাম।' (সূরা বাকারা, ২৭৫)
ক্রয়-বিক্রয় হালাল আর রিবা (সুদ) হারাম এটি আল্লাহপাকের সিদ্ধান্ত। কাজেই এখানে মানুষের প্রশ্ন তুলবার কোনোই সুযোগ নেই। তা ছাড়া মক্কার মুশরিকরাও এই যুক্তির অবতারণা করত। তারা বলত, ক্রয়-বিক্রয় তো রিবারই মতো। ক্রয়-বিক্রয়েও মানুষ মুনাফা অর্জন করে, রিবায়ও মুনাফা অর্জন করে। কাজেই দুয়ের মাঝে পার্থক্যটা কী? পবিত্র কুরআন তাদেরকে একটিই উত্তর দিয়েছিল যে, এটি আমার বিধান যে, রিবা হারাম আর ক্রয়-বিক্রয় হালাল। এর অর্থ হলো, অর্থের উপর অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া যায় না এবং অর্থের উপর অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া যায় না। কিন্তু মধ্যখানে যদি কোনো বস্তু কিংবা ব্যবসাপণ্য এসে পড়ে এবং সেই পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করে, তা হলে আমি তাকে হালাল ঘোষণা করলাম। আর মুরাবাহা পদ্ধতিতে মধ্যখানে পণ্য আসছে। এজন্য ইসলামের আইনে এই ক্রয়-বিক্রয় বৈধ।
📄 পছন্দনীয় বিকল্প কোনটি?
কিন্তু এই 'মুরাবাহা' ও 'লিজিং' কাঙ্ক্ষিত ও পছন্দনীয় বিকল্প নয় এবং এর দ্বারা সম্পদ বণ্টনের উপর মৌলিক কোনো প্রভাব পড়ে না। পছন্দনীয় বিকল্প হলো 'মুশারাকা'। কিন্তু আগামীতে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে, তাদের জন্য পরীক্ষামূলক মেয়াদে মুরাবাহা ও লিজিং পদ্ধতির উপর কাজ করার সুযোগ আছে। বর্তমানেও কিছু ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন এসব ভিত্তির উপর কাজ করছে।
এ হলো, সুদ ও এতৎসম্পর্কিত বিষয়ে সাধারণ কথা, যা আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করলাম। সুদসম্পর্কিত আরও একটি মাসআলা আছে, যার প্রতিধ্বনি বারবার কানে আসছে। তা হলো, অনেকে বলছে, দারুল হারবে -যেখানে অমুসলিমদের শাসন চলছে- সুদি লেনদেনে কোনো সমস্যা নেই। সেসব দেশে অমুসলিম সরকার থেকে সুদ নেওয়া যায়। এ মাসআলাটির উপর সুদীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাই দারুল হারব হোক, চাই দারুল ইসলাম, সুদ সবখানেই হারাম। সুদ দারুল ইসলামে যেমন হারাম, তেমনি দারুল হারবেও হারাম।
তবে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানগণ যেন অবশ্যই ব্যাংকে কারেন্ট একাউন্ট ব্যবহার করে, যেখানে আমানতের উপর কোনো সুদ আসে না। যদি কেউ ভুলবশত সেভিংস একাউন্ট ব্যবহার করে ফেলে, তা হলে তাতে যে সুদ আসে, পাকিস্তানে তো আমরা মানুষদের বলে দেই যে, সুদের অর্থ ব্যাংকেই রেখে দিন। কিন্তু যেসব দেশে এমন অর্থ ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যয় হয়, সেসব দেশে মুসলমানদের উচিত, সুদের অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে ছাওয়াবের নিয়ত ব্যতীত যাকাত খাওয়ার উপযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে সাদাকা করে দেওয়া এবং সেই অর্থ নিজের কাজে না লাগানো।
📄 আধুনিক যুগে ইসলামী অর্থনীতির প্রতিষ্ঠান
আমি আরও একটি কাজের কথা বলতে চাই। কাজটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কঠিন মনে হচ্ছে। কিন্তু তথাপি সাধ্যপরিমাণ চেষ্টা করা দরকার।
কাজটি হলো, আমরা নিজেরা এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাব, যেটি ইসলামী ভিত্তির উপর কাজ করবে। আর যেমনটি আমি এইমাত্র বলেছি যে, 'মুশারাকা', 'মুরাবাহা' ও 'লিজিং' পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রস্তুত আছে এবং সেসব ভিত্তির উপর মুসলমানগণ নিজস্ব প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারে।
এখানকার মুসলমানগণ মাশাআল্লাহ এই বিষয়টি বোঝে এবং এর মাঝে স্বয়ং তাদের জন্য সমস্যাবলির সমাধানও আছে। তাদের উচিত, এখানে বসে 'ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠিত করা। আমেরিকায় আমার জানামতে কমপক্ষে হাউজিং-এর সীমা পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান আছে এবং তারা সঠিক ইসলামী ভিত্তির উপর কাজ করছে। তার একটি টরেন্টোতে, অপরটি লসএঞ্জেল্স-এ। এখন এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো দরকার এবং মুসলমানদেরকে নিজেদের মতো করে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো আবশ্যক। কিন্তু তার জন্য বুনিয়াদি শর্ত হলো, কাজটি করতে হবে বিজ্ঞ ফকীহ ও মুফতীদের পরামর্শ অনুপাতে। আপনারা যদি এ কাজে আমার থেকেও সহযোগিতা নিতে চান, আমি আপনাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছি। যেমনটি আমি বলেছি, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং প্রায় পাঁচ বছর যাবত আমি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেদমতে নিয়োজিত আছি। মহান আল্লাহ আপনাদেরকেও এই কাজের তাওফীক দান করুন এবং মুসলমানদের জন্য ভালো একটি পথ বের করে দিন। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ