📄 এই জটিলতার সমাধান
অংশীদারিত্ব পদ্ধতির বাস্তবায়নগত দিকের এটি একটি গুরুতর সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার সম্পর্ক অংশীদারিত্ব সিস্টেমের সঙ্গে নয়। বরং এর সম্পর্ক সেই মানুষের ত্রুটির সঙ্গে, যারা এই ব্যবস্থার অনুসরণ করছে। তাদের মাঝে উত্তম চরিত্র, সততা ও আমানত নেই। আর এ-কারণে 'অংশীদারিত্ব' পদ্ধতির মাঝে এই ঝুঁকি বিরাজমান যে, মানুষ ব্যাংক থেকে 'অংশীদারিত্বে'র চুক্তিতে ঋণ নেবে আর পরে ব্যবসায় লোকসান দেখিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে ডিপোজিটারদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
কিন্তু এটি সমাধান-অযোগ্য কোনো সমস্যা নয়। এটি এমন কোনো সমস্যা নয় যে, এর কোনো সমাধান খুঁজে বের করা যাবে না। কোনো রাষ্ট্র যদি 'অংশীদারিত্ব' ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নেয়, তা হলে সেই দেশ অনায়াসেই এই সমস্যার সমাধান বের করে নিতে সক্ষম হবে। যার সম্পর্কে প্রমাণিত হবে, বিনিয়োগের জন্য অর্থ গ্রহণের পর সে অসততার পরিচয় দিয়েছে এবং তার একাউন্টস্ প্রদর্শনে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তা হলে সরকার তাকে দীর্ঘ একটি সময়ের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে দেবে এবং ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক তাকে ফাইন্যান্সিং-এর কোনো সুবিধা প্রদান করবে না। এই ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মানুষ অসততা প্রদর্শন ও দুর্নীতির আশ্রয় নিতে ভয় পাবে। বর্তমানেও বিভিন্ন 'জয়েন্ট স্টক কোম্পানী' কাজ করছে এবং তারা তাদের ব্যালেন্সসীট প্রকাশ করছে। সেই সীটে দুর্নীতিও হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তাতে মুনাফা দেখাচ্ছে।
কাজেই 'অংশীদারিত্ব' ব্যবস্থাকে যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করে নেওয়া হয়, তা হলে এই সমাধানটিকেও অবলম্বন করা যেতে পারে।
কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এই ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গ্রহণ করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে এই ব্যবস্থার বাস্তবায়ন খুবই কঠিন কাজ। তবে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিলেক্টেড (যাচাই করা কিছু) ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে স্বচ্ছ কথাবার্তার মাধ্যমে 'অংশীদারিত্ব' করতে পারে।
📄 দ্বিতীয় বিকল্প পদ্ধতি ‘ইজারা’
তা ছাড়া আল্লাহপাক ইসলামের আদলে আমাদেরকে এমন একটি দ্বীন দান করেছেন, যার মধ্যে 'মুশারাকা' ছাড়াও ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সিং-এর আরও বহু পদ্ধতি আছে। যেমন- একটি পদ্ধতি আছে 'ইজারা' (Leasing)।
পদ্ধতিটি হলো, এক ব্যক্তি বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকে আবেদন জানাল। ব্যাংক তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার কোন কাজে টাকা দরকার? তিনি বললেন, কারখানার জন্য আমার বিদেশ থেকে একটি মেশিন আমদানি করতে হবে। ব্যাংক তাকে টাকা দিল না। বরং নিজেরা মেশিন কিনে ভাড়ার চুক্তিতে তাকে দিয়ে দিল। পরিভাষায় এই কাজটিকে 'ইজারা' বা Leasing বলা হয়। কিন্তু আজকাল ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোতে 'ফাইন্যান্সিং লিজিং'-এর যে-পদ্ধতিটি চালু আছে, তা শরীয়তসম্মত নয়। এর এগ্রিমেন্টে অনেকগুলো ধারা (Clauses) শরীয়ত পরিপন্থী। তবে একে খুব সহজেই শরীয়তসম্মত বানিয়ে নেওয়া যায়। পাকিস্তানে একাধিক ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান এমন আছে, যেগুলোর লিজিং এগ্রিমেন্ট শরীয়তসম্মত।
📄 তৃতীয় বিকল্প পদ্ধতি ‘মুরাবাহা’
অনুরূপ আরও একটি পদ্ধতি আছে, আপনারা যার নাম শুনে থাকবেন। সেটি হলো, 'মুরাবাহা ফাইন্যান্সিং'। এটিও অপরের সঙ্গে লেনদেন করার একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে লাভের ভিত্তিতে পণ্যটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। মনে করুন, এক ব্যক্তি কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণের আবেদন জানাল। কিন্তু ব্যাংক তাকে টাকা না দিয়ে সেই মালটি ক্রয় করে লাভের ভিত্তিতে তার কাছে বিক্রি করল। ইসলামে এই পদ্ধতিও জায়েয। অনেকে মনে করে, এই পদ্ধতি তো হাত ঘুরিয়ে কান ধরার মতো হয়ে গেল। কারণ, এখানে ব্যাংক এক পদ্ধতির পরিবর্তে আরেক পদ্ধতিতে মুনাফা আদায় করে নিল। কিন্তু তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেছেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
'আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন আর রিবাকে করেছেন হারাম।' (সূরা বাকারা, ২৭৫)
ক্রয়-বিক্রয় হালাল আর রিবা (সুদ) হারাম এটি আল্লাহপাকের সিদ্ধান্ত। কাজেই এখানে মানুষের প্রশ্ন তুলবার কোনোই সুযোগ নেই। তা ছাড়া মক্কার মুশরিকরাও এই যুক্তির অবতারণা করত। তারা বলত, ক্রয়-বিক্রয় তো রিবারই মতো। ক্রয়-বিক্রয়েও মানুষ মুনাফা অর্জন করে, রিবায়ও মুনাফা অর্জন করে। কাজেই দুয়ের মাঝে পার্থক্যটা কী? পবিত্র কুরআন তাদেরকে একটিই উত্তর দিয়েছিল যে, এটি আমার বিধান যে, রিবা হারাম আর ক্রয়-বিক্রয় হালাল। এর অর্থ হলো, অর্থের উপর অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া যায় না এবং অর্থের উপর অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া যায় না। কিন্তু মধ্যখানে যদি কোনো বস্তু কিংবা ব্যবসাপণ্য এসে পড়ে এবং সেই পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করে, তা হলে আমি তাকে হালাল ঘোষণা করলাম। আর মুরাবাহা পদ্ধতিতে মধ্যখানে পণ্য আসছে। এজন্য ইসলামের আইনে এই ক্রয়-বিক্রয় বৈধ।
📄 পছন্দনীয় বিকল্প কোনটি?
কিন্তু এই 'মুরাবাহা' ও 'লিজিং' কাঙ্ক্ষিত ও পছন্দনীয় বিকল্প নয় এবং এর দ্বারা সম্পদ বণ্টনের উপর মৌলিক কোনো প্রভাব পড়ে না। পছন্দনীয় বিকল্প হলো 'মুশারাকা'। কিন্তু আগামীতে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে, তাদের জন্য পরীক্ষামূলক মেয়াদে মুরাবাহা ও লিজিং পদ্ধতির উপর কাজ করার সুযোগ আছে। বর্তমানেও কিছু ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন এসব ভিত্তির উপর কাজ করছে।
এ হলো, সুদ ও এতৎসম্পর্কিত বিষয়ে সাধারণ কথা, যা আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করলাম। সুদসম্পর্কিত আরও একটি মাসআলা আছে, যার প্রতিধ্বনি বারবার কানে আসছে। তা হলো, অনেকে বলছে, দারুল হারবে -যেখানে অমুসলিমদের শাসন চলছে- সুদি লেনদেনে কোনো সমস্যা নেই। সেসব দেশে অমুসলিম সরকার থেকে সুদ নেওয়া যায়। এ মাসআলাটির উপর সুদীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাই দারুল হারব হোক, চাই দারুল ইসলাম, সুদ সবখানেই হারাম। সুদ দারুল ইসলামে যেমন হারাম, তেমনি দারুল হারবেও হারাম।
তবে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানগণ যেন অবশ্যই ব্যাংকে কারেন্ট একাউন্ট ব্যবহার করে, যেখানে আমানতের উপর কোনো সুদ আসে না। যদি কেউ ভুলবশত সেভিংস একাউন্ট ব্যবহার করে ফেলে, তা হলে তাতে যে সুদ আসে, পাকিস্তানে তো আমরা মানুষদের বলে দেই যে, সুদের অর্থ ব্যাংকেই রেখে দিন। কিন্তু যেসব দেশে এমন অর্থ ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যয় হয়, সেসব দেশে মুসলমানদের উচিত, সুদের অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে ছাওয়াবের নিয়ত ব্যতীত যাকাত খাওয়ার উপযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে সাদাকা করে দেওয়া এবং সেই অর্থ নিজের কাজে না লাগানো।