📄 ‘সুদী ঋণে’র বিকল্প শুধু ‘করজে হাসানা’-ই নয়
দ্বিতীয় কথাটি হলো, কিছু লোক মনে করে, 'ইন্টারেস্ট' (সুদ) – যাকে পবিত্র কুরআন হারাম সাব্যস্ত করেছে- তার অর্থ হলো, আগামীতে যখন কাউকে ঋণ প্রদান করা হবে, তখন তাকে সুদবিহীন ঋণ দেবে এবং তার জন্য কোনো মুনাফা দাবি করবে না। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, যখন 'ইন্টারেস্ট' (সুদ) বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন আমরা সুদবিহীন ঋণ পাব আর সেই ঋণের টাকা দ্বারা আমরা বাড়ি নির্মাণ করব, মিল-কারখানা স্থাপন করব এবং আমাদের নিকট থেকে কেউ 'ইন্টারেস্ট' দাবি করবে না। আর এই চিন্তার উপরই ভিত্তি করে মানুষ বলছে, এই পন্থাটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এই ঋণ কেউ দেবে না।
📄 সুদী ঋণের বিকল্প ‘অংশীদারিত্ব’
মনে রাখবেন, Interest-এর বিকল্প (Alternative) 'করজে হাসানা' নয় যে, আপনি কাউকে এমনিতেই ঋণ দিয়ে দেবেন। বরং তার বিকল্প হলো, 'অংশীদারিত্ব'। অর্থাৎ- কেউ যদি ব্যবসার জন্য ঋণ গ্রহণ করে, তা হলে ঋণদাতা একথা বলতে পারে, আমি তোমার ব্যবসায় অংশীদার হতে চাই। ব্যবসায় যদি তোমার লাভ হয়, তা হলে তার একটি অংশ আমাকে দিতে হবে। আর যদি লোকসান হয়, তা হলে আমি তাতেও তোমার অংশীদার হব। এভাবে ঋণদাতা এই ব্যবসার লাভ-লোকসানে অংশীদার হয়ে যাবে এবং ব্যবসাটি অংশীদারত্বের ব্যবসায় পরিণত হবে। এই হলো Interest-এর বিকল্প পদ্ধতি (Alternative System)
এই অংশীদারিত্বের তাত্ত্বিক দিকটি আমি আপনাদের সম্মুখে আগেও উপস্থাপন করেছি যে, Interest পদ্ধতিতে সম্পদের অতি সামান্য অংশ ডিপোজিটারদের হাতে যায়। কিন্তু যদি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কারবার পরিচালনা করা হয় এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পুঁজিবিনিয়োগ (Financing) করা হয়, তা হলে এই পদ্ধতিতে ব্যবসায় যা মুনাফা হবে, তার একটি যৌক্তিক অংশ বিনিয়োগকারীদের হাতে যাবে। আর এই পদ্ধতিতে সম্পদের বণ্টন (Distribution Of Wealth) উপরের দিকে যাওয়ার পরিবর্তে নিচের দিকে আসবে। কাজেই ইসলাম যে বিকল্প ব্যবস্থা উপস্থাপন করেছে, সেটি হলো, 'অংশিদারিত্বের ব্যবস্থা'।
📄 অংশীদারিত্বের শুভ ফলাফল
কিন্তু এই অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা যেহেতু বর্তমান পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত কোথাও চালু হয়নি এবং তার অনুসরণ শুরু হয়নি, তাই তার বরকতও মানুষের সম্মুখে আসছে না। সাম্প্রতিককালে এই ২০-২৫ বছর হলো, মুসলমানদের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পদ্ধতিটি চালু করার চেষ্টা চালানো হয়েছে যে, এমন কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করা হবে, যেটি 'ইন্টারেস্ট' (সুদী) পদ্ধতির পরিবর্তে ইসলামী আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। আপনাদের জানা থাকার কথা যে, বর্তমানে সারা পৃথিবীতে অন্ততপক্ষে ৮০ থেকে ১০০টি ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোর দাবি হলো, আমরা ইসলামী নিয়ম-নীতি অনুসারে কারবার পরিচালনা করছি এবং সুদমুক্ত ব্যবসা করছি।
আমি একথা বলছি না যে, তাদের এই দাবি শতভাগ সঠিক। বরং হতে পারে, তাতে কিছু ভুল-ত্রুটিও আছে। কিন্তু একথাটি সত্য যে, বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক সুদবিহীন ব্যবস্থার উপর কাজ করছে। উক্ত ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদারি পদ্ধতির বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছে। আর যেখানেই অংশীদারি পদ্ধতিটিকে গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানেই তার ভালো সুফল পাওয়া গেছে। আমরা পাকিস্তানে একটি ব্যাংকে এই পদ্ধতিটি পরীক্ষা করেছি। আমি নিজে উক্ত ব্যাংকের 'মাযহাবী নেগরান কমিটি'র (ধর্মীয় তত্ত্বাবধান পরিষদ) একজন সদস্য হওয়ার সুবাদে ব্যাংকটির কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত আছি। এই ব্যাংক 'অংশীদারিত্ব' নীতির ভিত্তিতে ডিপোজিটারদের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা প্রদান করেছে। কাজেই যদি এই 'অংশীদারিত্ব' পদ্ধতিটিকে ব্যাপকভাবে চালু করা যায়, তা হলে এর ফলাফল আরও ভালো হতে পারে।
📄 অংশীদারিত্বের বাস্তবায়নগত জটিলতা
কিন্তু এই পদ্ধতির বাস্তবায়নগত একটি জটিলতাও আছে। তা হলো, যেমন- এক ব্যক্তি অংশিদারির ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে অর্থ নিল। আর অংশীদারি মানে লাভে ও লোকসানে অংশগ্রহণ। অর্থাৎ- যদি ব্যবসায় লাভ হয়, তাতেও অংশীদার হবে এবং যদি লোকসান হয়, তাতেও অংশীদার হবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, খোদ আমাদের মুসলিম বিশ্বে অসততা ও অবিশ্বস্ততা এত বেশি ও এত ব্যাপক যে, কোনো ব্যক্তি যদি এই ভিত্তির উপর ব্যাংক থেকে অর্থ নিতে পারে যে, লাভ হলে লাভ এনে দেব আর লোকসান হলে ব্যাংকও তার অংশীদার হবে, তা হলে বিনিয়োগ গ্রহীতা বিনিয়োগ গ্রহণ করে ব্যাংক থেকে বিদায় নেওয়ার পর আর ফিরে আসবে না। সে ব্যাংককে শুধু লোকসানই দেখাবে এবং মুনাফা দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো ব্যাংকের কাছে লোকসানের ভর্তুকি দাবি করবে।