📄 পবিত্র কুরআন কোন ‘সুদ’কে হারাম সাব্যস্ত করেছে?
অনেকে বলে থাকেন, পবিত্র কুরআন যে সুদকে হারাম সাব্যস্ত করেছে, তার প্রকৃতি ছিল ভিন্ন রকম। সে যুগে যারা ঋণ গ্রহণ করত, তারা গরিব মানুষ ছিল। তাদের কাছে রুটি-রুজির জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। অসুখ হলে তাদের কাছে চিকিৎসার অর্থ থাকত না। কেউ মারা গেলে কাফন- দাফনের ব্যবস্থা থাকত না। ফলে গরিব মানুষগুলো কারও নিকট থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হতো। কিন্তু ঋণদাতারা বলত, আমরা তোমাদের ঋণ দেব বটে; কিন্তু শতকরা এত টাকা বেশি দিতে হবে। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি মানবতাবিরোধী ছিল যে, একজনের ব্যক্তিগত একটি প্রয়োজন – তার পেটে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই; এমতাবস্থায় তাকে সুদ ছাড়া ঋণ না দেওয়া অবিচার ও বাড়াবাড়ি ছিল বিধায় আল্লাহপাক 'সুদ'কে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং সুদখোর মহাজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
কিন্তু আমাদের এযুগে এবং বিশেষভাবে ব্যাংকগুলোতে সুদভিত্তিক যে লেনদেন হয়, সেগুলোতে ঋণগ্রহীতারা গরিব বা অভাবী হয় না। বরং অধিকাংশ সময় তারা বড় বিত্তশালী ও পুঁজিপতি হয়ে থাকে। তারা এজন্য ঋণ গ্রহণ করে না যে, তাদের ঘরে খাবার নেই বা পরনে কাপড় নেই কিংবা চিকিৎসা করাবার অর্থ নেই আর তার জন্য এরা ঋণ গ্রহণ করছে। বরং তারা এজন্য ঋণ গ্রহণ করছে যে, এই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে এবং তার দ্বারা মুনাফা অর্জন করবে। এমতাবস্থায় ঋণদাতা যদি একথা বলে, তুমি আমার অর্থ তোমার ব্যবসায় বিনিয়োগ করে লাভবান হও আর লাভের ১০ ভাগ আমাকে দিয়ো, তা হলে এতে দোষের কী আছে? এ সেই 'সুদ' নয়, পবিত্র কুরআন যাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে আজ এই যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে।
📄 বাণিজ্যিক ঋণ (Commercial Loan) সে যুগেও ছিল
তো বলা হচ্ছে, এই বাণিজ্যিক সুদ (কমার্শিয়াল ইন্টারেস্ট) ও এই বাণিজ্যিক ঋণ (কমার্শিয়াল লোন) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর যুগে ছিল না। বরং সে যুগে ব্যক্তিগত ব্যয় ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ঋণ নেওয়া হতো। কাজেই পবিত্র কুরআন সেই সুদকে কী করে হারাম ঘোষণা করতে পারে, সে যুগে যার অস্তিত্বই ছিল না। এই যুক্তির উপর নির্ভর করে কেউ-কেউ বলে থাকেন, পবিত্র কুরআন যে সুদকে হারাম সাব্যস্ত করেছে, সেটি গরিব-অসহায় জনগোষ্ঠী সম্পর্কিত সুদ ছিল। আমাদের এই কারবারি সুদ হারাম নয়।
📄 আকৃতির পরিবর্তনে প্রকৃতি বদলায় না
এই যুক্তির জবাবে আমাদের প্রথম কথা হলো, কোনো বস্তুর হারাম হওয়ার জন্য জরুরি নয় যে, বস্তুটি হুবহু ওই আকৃতিতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে বিদ্যমান থাকতে হবে। পবিত্র কুরআন যখন কোনো বস্তুকে হারাম ঘোষণা করে, তখন সেই বস্তুটির একটি প্রকৃতি তার সামনে থাকে। কুরআন সেই প্রকৃতিকে হারাম সাব্যস্ত করে। চাই তার বিশেষ কোনো আকার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে বিদ্যমান থাকুক বা না থাকুক।
একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে কথাটি বুঝুন। পবিত্র কুরআন মদকে হারাম ঘোষণা করেছে। মদের প্রকৃতি হলো, এটি এমন একটি পানীয়, যার মধ্যে নেশা থাকে। এখন যদি কেউ একথা বলতে শুরু করে যে, জনাব, এ যুগের হুইস্কি, বিয়ার ও ব্রান্ডি নবীজির যুগে ছিল না; কাজেই এগুলো হারাম নয়, তা হলে তার এই দাবি সঠিক বলে বিবেচিত হবে না। কারণ, এই পানীয়গুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে ঠিক এই আকারে ছিল না বটে; কিন্তু প্রকৃতি, তথা 'বস্তুটি নেশাকর হওয়া' বিদ্যমান ছিল। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নেশাকর বস্তুকে হারাম ঘোষণা করেছেন। কাজেই যে কোনো নেশাকর বস্তু চিরদিনের জন্য হারাম হয়ে গেছে। চাই তার নাম ও আকার যা-ই হোক। নাম হুইস্কি হোক কিংবা বিয়ার। ব্রান্ডি হোক কিংবা কোকেন। নেশাকর বস্তুমাত্রই হারাম।
📄 মজার একটি গল্প শুনুন
একটি মজার গল্প মনে পড়ল। হিন্দুস্তানে এক গায়ক ছিল। একবার সে হজে গেল। হজ সমাপনের পর মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পথে এক মনযিলে যাত্রাবিরতি করল। সেযুগে চলার পথে বিভিন্ন মনযিল থাকত। মানুষ সেসব মনযিলে রাত্রিযাপন করত এবং পরদিন সকালে সম্মুখপানে রওনা হতো। নিয়ম অনুযায়ী হিন্দুস্তানি গায়ক রাত্রিযাপনের জন্য এক মনযিলে অবস্থান গ্রহণ করল। উক্ত মনযিলে এক আরব গায়কও গিয়ে উপস্থিত হলো এবং ওখানে বসে আরবিতে গান গাইতে শুরু করল। আরব গায়কের কণ্ঠ ছিল খানিক কর্কশ ও কাঠখোট্টা। হিন্দুস্তানি গায়কের কাছে তার গান খুব বিশ্রী ও বিরক্তিকর ঠেকল। তাই সে বলে উঠল, আজ আমার বুঝে এসেছে, আমাদের নবীজি গান-বাজনাকে কেন হারাম সাব্যস্ত করেছিলেন। তার কারণ হলো, তিনি বেদুঈনদের বেসুরো ও কর্কশ গান শুনেছিলেন। তাই তিনি গানকে হারাম সাব্যস্ত করেছেন। তিনি যদি আমার গান শুনতেন, তা হলে গান-বাজনাকে তিনি হারাম ঘোষণা করতেন না।