📄 চুক্তি ব্যতিরেকে বেশি দেওয়া ‘সুদ’ নয়
আগেই স্থির করে নেওয়ার শর্ত এজন্য আরোপ করা হয়েছে যে, যদি ঋণ দেওয়ার সময় অতিরিক্ত পরিশোধের কথা স্থির করে না নেওয়া হয়, তাহলে প্রদত্ত অর্থের বাড়তি দেওয়া সুদ হবে না। যেমন- আমি কাউকে একশো টাকা ঋণ প্রদান করলাম। আমি তার থেকে এই দাবি করলাম না যে, তুমি আমাকে একশো দুই টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু পরিশোধের সময় ঋণগ্রহীতা নিজের খুশিতে আমাকে একশো দুই টাকা ফেরত দিল। তো এটা সুদ নয়। এটা হারাম নয়; বরং এটা জায়েয।
📄 ঋণ পরিশোধের উত্তম পন্থা
স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে প্রমাণিত আছে, তিনি যখন কারও নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করতেন, তখন পরিশোধ করার সময় কিছু বেশি দিতেন, যাতে ঋণদাতা খুশি হয়। কিন্তু বাড়তি আদান-প্রদানের কথা যেহেতু পূর্ব থেকে স্থির করা থাকত না, তাই এটা ‘সুদ’ হতো না। হাদীসের পরিভাষায় একে ‘হুসনুল কাযা’ বা ‘উত্তম পরিশোধ’ বলা হয়। অর্থাৎ- ‘উত্তম পন্থায় ঋণ পরিশোধ করা, পরিশোধের সময় ভালো আচরণ করা এবং কিছু বেশি দেওয়া সুদ নয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন পর্যন্ত বলেছেন যে: إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً ‘তোমাদের মধ্যে ঋণপরিশোধের পন্থা যার যত সুন্দর, সে তত ভালো মানুষ।’ -বুখারী হাদীস নং ২২১৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮৭৪৩, নাসায়ী হাদীস নং ৪৫৩৯
কিন্তু যদি ঋণ দেওয়ার সময় সিদ্ধান্ত করে নেওয়া হয়, ফেরত দেওয়ার সময় অতিরিক্ত এত টাকাসহ দিতে হবে, একেই ‘সুদ’ বলা হয়। পবিত্র কুরআন একেই কঠোর ও শক্ত ভাষায় হারাম সাব্যস্ত করেছে। সূরা বাকারার প্রায় পৌনে দুই রুকু এই সুদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।
📄 পবিত্র কুরআন কোন ‘সুদ’কে হারাম সাব্যস্ত করেছে?
অনেকে বলে থাকেন, পবিত্র কুরআন যে সুদকে হারাম সাব্যস্ত করেছে, তার প্রকৃতি ছিল ভিন্ন রকম। সে যুগে যারা ঋণ গ্রহণ করত, তারা গরিব মানুষ ছিল। তাদের কাছে রুটি-রুজির জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। অসুখ হলে তাদের কাছে চিকিৎসার অর্থ থাকত না। কেউ মারা গেলে কাফন- দাফনের ব্যবস্থা থাকত না। ফলে গরিব মানুষগুলো কারও নিকট থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হতো। কিন্তু ঋণদাতারা বলত, আমরা তোমাদের ঋণ দেব বটে; কিন্তু শতকরা এত টাকা বেশি দিতে হবে। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি মানবতাবিরোধী ছিল যে, একজনের ব্যক্তিগত একটি প্রয়োজন – তার পেটে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই; এমতাবস্থায় তাকে সুদ ছাড়া ঋণ না দেওয়া অবিচার ও বাড়াবাড়ি ছিল বিধায় আল্লাহপাক 'সুদ'কে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং সুদখোর মহাজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
কিন্তু আমাদের এযুগে এবং বিশেষভাবে ব্যাংকগুলোতে সুদভিত্তিক যে লেনদেন হয়, সেগুলোতে ঋণগ্রহীতারা গরিব বা অভাবী হয় না। বরং অধিকাংশ সময় তারা বড় বিত্তশালী ও পুঁজিপতি হয়ে থাকে। তারা এজন্য ঋণ গ্রহণ করে না যে, তাদের ঘরে খাবার নেই বা পরনে কাপড় নেই কিংবা চিকিৎসা করাবার অর্থ নেই আর তার জন্য এরা ঋণ গ্রহণ করছে। বরং তারা এজন্য ঋণ গ্রহণ করছে যে, এই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে এবং তার দ্বারা মুনাফা অর্জন করবে। এমতাবস্থায় ঋণদাতা যদি একথা বলে, তুমি আমার অর্থ তোমার ব্যবসায় বিনিয়োগ করে লাভবান হও আর লাভের ১০ ভাগ আমাকে দিয়ো, তা হলে এতে দোষের কী আছে? এ সেই 'সুদ' নয়, পবিত্র কুরআন যাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে আজ এই যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে।
📄 বাণিজ্যিক ঋণ (Commercial Loan) সে যুগেও ছিল
তো বলা হচ্ছে, এই বাণিজ্যিক সুদ (কমার্শিয়াল ইন্টারেস্ট) ও এই বাণিজ্যিক ঋণ (কমার্শিয়াল লোন) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর যুগে ছিল না। বরং সে যুগে ব্যক্তিগত ব্যয় ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ঋণ নেওয়া হতো। কাজেই পবিত্র কুরআন সেই সুদকে কী করে হারাম ঘোষণা করতে পারে, সে যুগে যার অস্তিত্বই ছিল না। এই যুক্তির উপর নির্ভর করে কেউ-কেউ বলে থাকেন, পবিত্র কুরআন যে সুদকে হারাম সাব্যস্ত করেছে, সেটি গরিব-অসহায় জনগোষ্ঠী সম্পর্কিত সুদ ছিল। আমাদের এই কারবারি সুদ হারাম নয়।