📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 সুদের আত্মিক ক্ষতি

📄 সুদের আত্মিক ক্ষতি


এ পর্যন্ত সুদের অর্থনৈতিক ধ্বংসকারিতা বর্ণিত হলো। এবার সুদের কারবার মানুষের চারিত্রিক ও আত্মিক অবস্থার উপর কিরূপ অশুভ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, সে সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক।
১. মানবচরিত্রে সর্বপ্রধান গুণ হচ্ছে আত্মত্যাগ ও দানশীলতা অর্থাৎ নিজে কষ্ট করে হলেও অপরকে সুখী করার প্রেরণা। সুদের ব্যবসায়ের অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতিতে এ প্রেরণা লোপ পায়। সুদখোর ব্যক্তি অপরের উপকার করা তো দূরের কথা, অপরকে নিজ চেষ্টায় ও নিজ পুঁজি দ্বারা তার সমতুল্য হতে দেখলে তাও সহ্য করতে পারে না।
২. সুদখোরেরা কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি দয়ার্দ্র হওয়ার পরিবর্তে তার বিপদের সুযোগে অবৈধ মুনাফা লাভের চেষ্টায় মত্ত থাকে।
৩. সুদ খাওয়ার ফলে অর্থলালসা বেড়ে যায়। সে এতে এমনই মত্ত হয় যে, ভাল মন্দেরও পরিচয় থাকে না এবং সুদের অশুভ পরিণামের প্রতি সে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়ে।

📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 সুদ ছাড়া কি কোন ব্যবসা চলতে পারে না?

📄 সুদ ছাড়া কি কোন ব্যবসা চলতে পারে না?


সুদের স্বরূপ এবং এর জাগতিক ও ধর্মীয় অনিষ্টকারিতা বিস্তারিতভাবেই বর্ণিত হয়েছে। এখন তৃতীয় আলোচ্য বিষয় এই যে, অর্থনৈতিক ও আত্মিক অনিষ্টকারিতা এবং কুরআন ও সুন্নাহয় এ সম্পর্কিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার কথা জানা গেল। কিন্তু বর্তমান যুগে সুদই হচেছ কাজ-কারবারের প্রধান অবলম্বন। সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য সুদের উপরই চলছে। এ থেকে মুক্তি লাভের উপায় কি? বর্তমান যুগে ব্যাংকের সাথে সম্পর্ক বর্জন করার অর্থ ব্যবসায়ের তল্পিতল্পা গুটানো। এর জওয়াব এই যে, কোন রোগ যখন ব্যাপক হয়ে মহামারীর আকার ধারণ করে, তখন তার চিকিৎসা কঠিন অবশ্যই হয়। কিন্তু নিষ্ফল কখনো হয় না। নিষ্ঠার সাথে যে কোন সংশোধন প্রচেষ্টাই পরিণামে সফল হয়। তবে এজন্যে ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং সাহসিকতা অবশ্যই প্রয়োজন।
কুরআন পাকেই আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদেরকে কোনরূপ সংকীর্ণতায় ফেলেন নি। (সূরা হাজ্জ, ৭৮ আয়াত)
তাই সুদ থেকে বেঁচে থাকার জন্য এমন কোন কার্যকর ও ফলপ্রসূ পথ অবশ্যই রয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক ক্ষতিও নেই, অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যের দ্বারও রুদ্ধ হয় না এবং সুদ থেকে মুক্তিও পাওয়া যায়।¹
এ ব্যাপারে প্রথম কথা এই যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বর্তমান পদ্ধতি দেখে বাহ্য দৃষ্টিতে মনে করা হয় যে, সুদের উপরই ব্যাংক নির্ভরশীল। সুদ ছাড়া ব্যাংক চলতে পারে না। কিন্তু এ ধারণা নিশ্চিতরূপে নির্ভুল নয়। সুদ ছাড়াও ব্যাংক ব্যবস্থা এমনিভাবে ফলপ্রসূ ও কার্যকরী ভূমিকা সহকারেই কায়েম থাকতে পারে; শুধু তাই নয় বরং আরও উত্তম উপকারী ভূমিকা নিয়েই তা প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। তবে এর জন্য কিছুসংখ্যক শরীয়ত-বিশেষজ্ঞ ও কিছুসংখ্যক ব্যাংক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। তাঁরা নতুনভাবে এর পদ্ধতি নির্ধারণ করলে সাফল্য দূরে নয়। শরীয়তের নিয়মানুযায়ী ব্যাংক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে ইনশাআল্লাহ্ সমগ্র বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে যে এতে জাতির কিরূপ মঙ্গল সাধিত হয়। ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনা করার পদ্ধতি ও নীতি ব্যাখ্যা করার স্থান এটা নয়, তাই এ সম্পর্কে আলোচনা সংক্ষিপ্ত করতে হচ্ছে।' ও²
কিছু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সুদের প্রয়োজন দেখা দেয়। ব্যাংকের বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন করে এর ব্যবস্থা করা যায়। সুদের দ্বিতীয় প্রয়োজন অসহায় দরিদ্র লোকদের সাময়িক অভাব পূরণ করা। এর চমৎকার প্রতিকার ইসলামেই পূর্ব থেকে যাকাত ও ওয়াজিব সাদাকার আকারে বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু ধর্ম ও ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও উদাসীনতা আজকাল যাকাত ব্যবস্থাকেও পঙ্গু করে দিয়েছে। অসংখ্য মুসলমান নামাযের মত যাকাতের ধারে-কাছেও যায় না। যারা যাকাত দেয় তাদের মধ্যে অনেক বৃহৎ পুঁজিপতি হিসাব করে পূর্ণ যাকাতও প্রদান করে না। যারা সম্পূর্ণ যাকাত প্রদান করে, তারা শুধু যাকাত পকেট থেকে বের করতেই জানে। অথচ আল্লাহ্ তা'আলা শুধু যাকাত পকেট থেকে বের করার নির্দেশ দেননি- তা আদায় করারও নির্দেশ দিয়েছেন। প্রদত্ত যাকাত যথার্থ হকদারকে পৌঁছিয়ে তার অধিকারভুক্ত করে দিলেই যাকাত আদায় করা শুদ্ধ হতে পারে।
'সুতরাং চিন্তা করার বিষয় হলো, এমন মুসলমান কয়জন আছে, যারা যথার্থ হকদার খুঁজে তাদের কাছে যাকাত পৌঁছিয়ে দিতে যত্নবান। মুসলমান জাতি যতই গরীব হোক, যাদের উপর যাকাত ফরয, তারা প্রত্যেকেই যদি পুরোপুরি যাকাত প্রদান করে এবং বিশুদ্ধ পন্থায় স্বীয় অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে, তবে কর্জের তাগিদে সুদের কাছে যাওয়া প্রয়োজন কোন মুসলমানেরই থাকতে পারে না।
যদি শরীয়তের বিধি অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হয়ে যায়, এর অধীনে বায়তুলমাল থেকে প্রত্যেক অভাবগ্রস্তেরই অভাব পূরণ করা সম্ভব। বেশি টাকার প্রয়োজন হলে সুদবিহীন কর্জও প্রদান করা যেতে পারে। এভাবে বেকার ও কর্মহীনদের ছোট ছোট দোকান করে দিয়ে কিংবা কোন শিল্পকর্মে নিয়োগ করেও কাজে লাগানো যায়। জনৈক ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ ঠিকই বলেছেন যে, মুসলমানরা যাকাত-ব্যবস্থার অনুবর্তী হয়ে গেলে তাদের মধ্যে কোন নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত লোক দেখা যাবে না।
মোটকথা, বর্তমান যুগে সুদকে মহামারী আকারে প্রসার লাভ করতে দেখে এরূপ মনে করা ঠিক নয় যে, সুদের ব্যবসা বর্জন করা অর্থনৈতিক আত্মহত্যার নামান্তর এবং এ যুগের লোক সুদের ব্যবসায়ের ব্যাপারে ক্ষমার্হ।
হ্যাঁ, এটা অবশ্য ঠিক যে, যতদিন সমগ্র জাতি কিংবা উল্লেখযোগ্য দল কিংবা কোন ইসলামী সরকার পূর্ণ মনোযোগ সহকারে এ কাজে সংকল্পবদ্ধ না হয়, ততদিন দু'-চার-দশজনের পক্ষে সুদ বর্জন করা কঠিন, কিন্তু ক্ষমার্হ তবুও বলা যায় না।

টিকাঃ
১. বেশ কিছু দিন পূর্বে কয়েকজন আলেমের পরামর্শক্রমে আমি সুদবিহীন ব্যাংক-ব্যবস্থা সম্পর্কিত একটা পরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম। কোন কোন ব্যাংক-বিশেষজ্ঞ একে বর্তমান যুগে বাস্তবায়নযোগ্য বলেও স্বীকার করেছিলেন এবং কেউ কেউ একে শুরু করার জন্য উদ্যোগী ভূমিকাও গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাধারণ ব্যবসায়ীদের আনুকূল্য এবং সরকারী মঞ্জুরির অভাবে চালু হতে পারেনি।
২. আলহামদু লিল্লাহ! বেশ কয়েক বছর যাবত এ ধরনের সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশে চালু হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ভাল ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে আরো সতর্কতা ও সদিচ্ছার প্রয়োজন। (সংকলক)

📘 সুদ পরিষ্কার বিদ্রোহ > 📄 আমাদের এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য দু’টি

📄 আমাদের এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য দু’টি


১. مسلمانوں বিভিন্ন দল ও সরকারসমূহকে এদিকে আকৃষ্ট করা। কেননা, তারাই এ কাজ যথার্থভাবে করতে পারে এবং তাদের উদ্যোগ শুধু মুলমানদেরকেই নয়, সারা বিশ্বকেই সুদের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে।
২. কমপক্ষে সবার জ্ঞান বিশুদ্ধ হোক এবং তারা রোগকে সত্যিকারভাবেই রোগ মনে করুক। কেননা, হারামকে হালাল মনে করা আরেকটি গোনাহ্। এটা সুদের গোনাহ্র চাইতেও বড় ও মারাত্মক। তারা কমপক্ষে এ গোনাহে লিপ্ত না হোক। গোনাহে কিছু-না-কিছু বাহ্যিক উপকারও আছে। কিন্তু যেটা জ্ঞানগত ও বিশ্বাসগত গোনাহ্ অর্থাৎ হারামকে হালাল প্রমাণিত করার চেষ্টা করা, এ প্রথম গোনাহ্ চাইতেও মারাত্মক এবং নিরর্থক। কেননা সুদকে হারাম মনে করা এবং স্বীয় গোনাহ্ স্বীকার করার মধ্যে কোন আর্থিক ক্ষতিও হয় না। এবং এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যায়। হ্যাঁ, অপরাধ স্বীকার করার ফল এটা অবশ্যই যে, কোন সময় তাওবা করার তাওফীক হলে সুদ থেকে আত্মরক্ষার উপায় চিন্তা করা যাবে।
এ উদ্দেশ্যের পরিপ্রেক্ষিতেই উপসংহারে কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করছি। এগুলো সুদ সম্পর্কিত আলোচ্য আয়াতসমূহেরই ব্যাখ্যা। উদ্দেশ্য, গোনাহ্ যে গোনাহ্-এ অনুভূতি জাগ্রত হোক, এ থেকে বেঁচে থাকার চিন্তা হোক, কমপক্ষে হারামকে হালাল করে এক গোনাহৰ্কে দুই গোনাহ্ না করুক। বড় বড় নেককার ও দ্বীনদার মুসলমান রাত্রিবেলা তাহাজ্জুদ ও যিকিরে অতিবাহিত করে। সকাল বেলায় যখন তারা দোকানে কিংবা কারখানায় পৌঁছে, তখন এ কল্পনাও তাদের মনে জাগে না যে, তারা সুদ ও জুয়ার কাজ-কারবারে লিপ্ত হয়ে মারাত্মক কিছু গোনাহ্ করে চলছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00