📄 সুদের অর্থনৈতিক অনিষ্টকারিতা
সুদের ফলে গুটিকতক লোকের উপকার এবং সমগ্র মানব সম্প্রদায়ের ক্ষতি হয়- এছাড়া সুদের মধ্যে যদি অন্য কোন দোষ নাও থাকতো তবে এ দোষটিই সুদ নিষিদ্ধ ও ঘৃণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। অথচ এতে এছাড়া আরও অর্থনৈতিক অনিষ্ট এবং আত্মিক বিপর্যয় বিদ্যমান রয়েছে।
সুদের মাধ্যমে সমগ্র জাতির বিপর্যয় ঘটিয়ে বিশেষ একটি শ্রেণীর উপকার কীভাবে হয়, প্রথমে তাই দেখা যাক। সুদের মহাজনী ও অধুনালুপ্ত পদ্ধতি এমন বিশ্রী ছিল যে, বৃহত্তম মানব সমাজের ক্ষতি ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গের উপকারের বিষয়টি যে কোন স্কুল-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষেও বোঝা কঠিন ছিল না। কিন্তু আজকালকার নতুন প্রেক্ষাপটে যেভাবে মদকে মেশিনে পরিশোধিত করে, ডাকাতির নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে, এবং ব্যভিচার ও নির্লজ্জতার নতুন নতুন কৌশল বের করে এ সবগুলোকেই সভ্যতার খোলস পরিয়ে দিয়েছে-যাতে এদের অভ্যন্তরীণ অনিষ্ট বাহ্যদর্শীদের দৃষ্টিগোচর না হয়, তেমনিভাবে সুদের জন্য ব্যক্তিগত গদির পরিবর্তে যৌথ কোম্পানী গঠন করেছে-যাকে ব্যাংক বলা হয়। এখন জগদ্বাসীর চোখে ধূলি দেওয়ার জন্য বলা হয় যে, সুদের এ আধুনিক পদ্ধতি দ্বারা সমগ্র জাতির উপকার হয়। কেননা, যে জনগণ নিজ টাকা দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে জানে না কিংবা স্বল্প পুঁজির কারণে করতে পারে না, তাদের সবার টাকা-পয়সা ব্যাংকে জমা হয়ে প্রত্যেকেই অল্প হলেও কিছু না কিছু মুনাফা পেয়ে যায়। বড় বড় ব্যবসায়ীরাও ব্যাংক থেকে সুদের উপর ঋণ নিয়ে বড় ব্যবসা করে উপকৃত হওয়ার সুযোগ পায়। এভাবে সুদ বর্তমানে একটি কল্যাণকর বস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং গোটা জাতি এর দ্বারা উপকার পাচ্ছে।
কিন্তু ইনসাফের দৃষ্টিতে দেখলে এটি একটি প্রতারণা বৈ কিছুই নয়। মদের দুর্গন্ধময় দোকানকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হোটেলে এবং পতিতাবৃত্তির আড্ডাগুলোকে সিনেমা ও নৈশ ক্লাবে রূপান্তরিত করে, বিষকে প্রতিষেধক এবং ক্ষতিকরকে উপকারীরূপে দেখাবার প্রয়াসে এ প্রতারণাকে কাজে লাগানো হয়েছে। চক্ষুষ্মান ব্যক্তিদের সামনে যেমন একথা দিবালোকের মত সুস্পষ্ট যে, চরিত্র বিধ্বংসী অপরাধসমূহকে আধুনিক পোশাক পরিয়ে দেওয়ার ফলে যেমন এসব অপরাধের ব্যাপকতা পূর্বের চাইতে বেড়েই গেছে, তেমনি সুদখোরীর এ নতুন পদ্ধতি-শতকরা কয়েক টাকা সুদ জনগণের পকেটে পুরে দিয়ে একদিকে তাদেরকে এ জঘন্য অপরাধে শরীক করেছে এবং অপরদিকে নিজেদের জন্য এ অপরাধের অসীম ক্ষেত্র প্রস্তুত করে নিয়েছে।
কে না জানে যে, জনগণ সেভিংস ব্যাংক (একাউন্ট) ও পোস্ট অফিস থেকে যে শতকরা কয়েক টাকা সুদ পায়, তদ্বারা কিছুতেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারে না। তাই তারা ভরণ-পোষণের জন্য কোন মজুরি কিংবা চাকুরী খুঁজতে বাধ্য। ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে প্রথমত তাদের দৃষ্টি যায় না। যদি কেউ এদিকে মনোনিবেশও করে তবে গোটা জাতির পুঁজি ব্যাংকে জমা হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য যে আকার ধারণ করেছে, তাতে কোন স্বল্প পুঁজির অধিকারীর পক্ষে ব্যবসায়ে প্রবেশ করা স্বপ্ন বিলাসের পর্যায়েই থেকে যায়। কেননা, যে ব্যবসায়ীর বাজারে প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে এবং বড় কারবার আছে, ব্যাংক তাকেই বড় পুঁজি ঋণ দিতে পারে। দশ লক্ষের মালিক এক কোটি ঋণ পেতে পারে। সে তার ব্যক্তিগত টাকার তুলনায় দশগুণ বেশি টাকার ব্যবসা চালাতে পারে। পক্ষান্তরে স্বল্প পুঁজির অধিকারী ব্যক্তির কোন প্রভাব-প্রতিপত্তিই থাকে না এবং ব্যাংকও তাকে বিশ্বাস করে না যে, পুঁজির দশগুণ বেশি দিয়ে দেবে। এক লাখ দূরের কথা, তার এক হাজার পাওয়াই কঠিন। মনে করুন, কেউ এক লাখ টাকার মালিক। সাথে ব্যাংকের নয় লাখ টাকার পুঁজি খাটিয়ে দশ লাখ টাকার ব্যবসা করে। যদি তার শতকরা এক টাকা মুনাফা হয়, তবে তার নিজস্ব এক লাখ টাকায় যেন শতকরা দশ টাকা মুনাফা হলো। পক্ষান্তরে যদি কোন ব্যক্তি শুধু ব্যক্তিগত টাকা দ্বারা এক লাখ টাকার ব্যবসা করে, তবে এক লাখের মুনাফা শতকরা এক টাকাই হবে। এ মুনাফা তার প্রয়োজনীয় খরচাদির জন্যও হয়ত যথেষ্ট নয়। এদিকে বাজারে বড় পুঁজিপতি যে দর ও সুবিধাসহ কাঁচামাল পায়, ছোট পুঁজিপতি তা পায় না। ফলে স্বল্প পুঁজিওয়ালা পঙ্গু ও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। যদি তার কপাল মন্দ হয় এবং সেও কোন বড় ব্যবসায়ে প্রবেশ করে, তবে বৃহৎ পুঁজিপতিরা তাকে অনধিকার প্রবেশকারী মনে করে নিজের ক্ষতি স্বীকার করেও বাজার এমন পর্যায়ে নিয়ে আসে যে, ক্ষুদ্র পুঁজিপতিরা আসল ও মুনাফা উভয়ই খুইয়ে বসে। ফলে বৃহৎ পুঁজিপতিদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
📄 ব্যাংকের সুদী ঋণের ক্ষতিসমূহ
১. জাতির প্রতি এটা কত বড় অবিচার যে, গোটা জাতি প্রকৃত ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে শুধু বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা বখশিশ হিসেবে যতটুকু ইচ্ছা তাদেরকে মুনাফা দেবে।
২. এর চাইতেও বড় দ্বিতীয় আর একটি ক্ষতির কবলে সারাদেশ পতিত হয়ে আছে। তা এই যে, উপরোক্ত অবস্থায় বৃহৎ পুঁজিপতিরাই দ্রব্যমূল্য নির্ধারণের অধিকারী হয়ে যায়। তারা উচ্চতর মূল্যে বিক্রয় করে স্বীয় গাঁট মজবুত করে নেয় এবং জাতির গাঁট খালি করে দেয়। তারা মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য যখন ইচ্ছা মাল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। যদি গোটা জাতির পুঁজি ব্যাংকের মাধ্যমে টেনে এসব স্বার্থপরদের লালন-পালন না করা হতো এবং সবাই ব্যক্তিগত পুঁজি দ্বারা ব্যবসা করতে বাধ্য হতো, তবে ক্ষুদ্র পুঁজিপতিরা এ বিপদের সম্মুখীন হতো না এবং এসব স্বার্থপর হিংস্ররাও গোটা ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্ণধার হয়ে বসতে পারতো না। ক্ষুদ্র পুঁজিপতিদের ব্যবসায়ের মুনাফা ভালো হলে অন্যরাও সাহস করত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক হয়ে যেত। এতে করে প্রত্যেকের পক্ষেই কিছু কিছু লোক নিয়োগ করার সুযোগ হতো। এতে অনেক বেকার সমস্যারও সমাধান হতো এবং বাণিজ্যিক মুনাফাও ব্যাপক হয়ে পড়ত। এছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতেও এর নিশ্চিত প্রভাব পড়ত। কেননা, পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই ব্যবসায়ীরা কম মুনাফা অর্জনে সম্মত হয়। এ প্রতারণামূলক কর্মপদ্ধতি গোটা জাতিকে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত করে দিয়েছে এবং তাদের চিন্তাধারাকেও বিকৃত করে দিয়েছে। ফলে তারা এ রোগকেই সুস্থতা মনে করে বসেছে।
৩. ব্যাংকের সুদ দ্বারা জাতির তৃতীয় অর্থনৈতিক ক্ষতিও লক্ষণীয়। যার পুঁজি দশ হাজার এবং সে ব্যাংক থেকে সুদের উপর কর্জ নিয়ে এক লাখের ব্যবসা করে যদি কোথাও তার পুঁজি ডুবে যায় এবং ব্যবসায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সে দেউলিয়া হয়ে যায়, তবে চিন্তা করুন, ক্ষতির শতকরা দশ ভাগ তার নিজস্ব এবং অবশিষ্ট শতকরা নব্বই ভাগই গোটা জাতির হয়েছে, যাদের পুঁজি ব্যাংক থেকে নিয়ে সে ব্যবসা করেছিল।
যদি ব্যাংক নিজেই দেউলিয়ার ক্ষতি বহন করে, তবে ব্যাংক তো জাতিরই পকেট। পরিণামে এ ক্ষতি জাতিরই হবে। এর সারমর্ম হলো এই যে, যতক্ষণ মুনাফা হচ্ছিল, ততক্ষণ সে একা ছিল মুনাফার মালিক, তাতে জাতির কোন অংশ ছিল না এবং যেই ক্ষতি হলো, তখন শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষতি জাতির ঘাড়ে চেপে বসলো।
৪. সুদের আরও একটি অর্থনৈতিক ক্ষতি এই যে, সুদখোর যখন অবক্ষয়ে পড়ে, তখন তার পুনরায় মাথা তোলার যোগ্যতা থাকে না। কেননা, ক্ষতি বরদাশত করার মত পুঁজি যে তার ছিলই না। ক্ষতির সময় তার উপর দ্বিগুণ বিপদ চাপে। একে তো নিজের মুনাফা ও পুঁজি গেল, তদুপরি ব্যাংকের ঋণও চেপে বসল। এ ঋণ পরিশোধের কোন উপায় তার কাছে নেই। সুদহীন ব্যবসায়ে যদি কোন সময় সমগ্র পুঁজিও বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে এর দ্বারা মানুষ ফকীর হয়, ঋণী হয় না।
১৯৫৪ সালে পাকিস্তানে তুলা ব্যবসায়ে কুরআনের ভাষায় 'মুহাক' তথা অবক্ষয়ের বিপদ দেখা দেয়। সরকার কোটি কোটি টাকার ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবসায়ীদেরকে সামাল দেন। কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে চিন্তা করেনি যে, এটা ছিল সুদের অশুভ পরিণতি। তুলা ব্যবসায়ীরা এ কারবারের অধিকাংশ পুঁজি ব্যাংকের ঋণ থেকে বিনিয়োগ করেছিল। নিজস্ব পুঁজি ছিল নামে মাত্র। আল্লাহ্ মর্জিতে তুলার বাজারে এমন মন্দা দেখা দেয় যে, দর ১২৫ থেকে ১০ টাকায় নেমে আসে। ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের ঋণ (মার্জিন) পূর্ণ করার জন্য টাকা ফেরত দেওয়ারও যোগ্য ছিল না। তারা বাধ্য হয়ে তুলার বাজার বন্ধ করে দিল। সরকারের কাছে তারা দরখাস্ত করার পর সরকার ১০ এর পরিবর্তে ৯০ টাকা দরে মাল কিনে নিল এবং কোটি কোটি টাকার ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবসায়ীদেরকে দেউলিয়াত্বের কবল থেকে উদ্ধার করে নিল। সরকারের টাকা কার ছিল? দরিদ্র জনগণেরই। মোটকথা, ব্যাংকসমূহের কারবারের পরিষ্কার ফল এই যে, জনগণের পুঁজি দ্বারা গুটিকতেক লোক মুনাফা উপার্জন করে এবং ক্ষতি হয়ে গেলে তা জনগণের ঘাড়েই চাপে।
📄 আত্মসেবা ও জাতি হত্যার আরও একটি অপকৌশল
সুদের মাধ্যমে সমগ্র জাতির সর্বনাশ সাধন করে কতিপয় ব্যক্তির আত্মসেবার সংক্ষিপ্ত চিত্র পেশ করা হলো। এর সাথে আরও একটি প্রতারণা লক্ষণীয়। সুদখোররা যখন অভিজ্ঞতা দ্বারা বুঝতে পারল যে, কুরআনের উক্তি يَمْحَتُ اللَّهُ الرِّبُوا অক্ষরে অক্ষরে সত্য অর্থাৎ মালের অবক্ষয় আসা অবশ্যম্ভাবী, যার ফলে দেউলিয়া হতে হয়, তখন এসব অবক্ষয়ের কবল থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা দু'টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললো। একটি বীমা অপরটি স্টক এক্সচেঞ্জ। কেননা, ব্যবসায়ে ক্ষতি হওয়ার দুটি কারণ হতে পারে।
১. একটি দৈব-দূর্বিপাক যথা জাহাজ ডুবে যাওয়া, অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া ইত্যাদি এবং
২. অপরটি পণ্যদ্রব্যের দাম ক্রয়-মূল্যের নিচে নেমে আসা।
বিনিয়োগকৃত পুঁজি যেহেতু নিজস্ব নয় জাতির যৌথ সম্পদ তাই উভয় অবস্থাতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কম এবং জাতির ক্ষতি বেশি হয়। কিন্তু তারা এ অল্প ক্ষতির বোঝাও জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য একদিকে বীমা কোম্পানী খুলেছে, যাতে ব্যাংকের মত সমগ্র জাতির পুঁজি নিয়োজিত থাকে। দৈব-দুর্বিপাকে সুদখোরদের ক্ষতি হয়ে গেলে, বীমার মাধ্যমে সমগ্র জাতির যৌথ পুঁজি থেকে তাকে উদ্ধার করে নেওয়া হয়।
জনগণ মনে করে বীমা কোম্পানীগুলো আল্লাহ্ রহমত, ডুবন্ত ব্যক্তির আশ্রয়স্থল। কিন্তু এদের স্বরূপ দেখলে ও বুঝলে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, এখানেও প্রতারণা ছাড়া কিছুই নেই। আকস্মিক দুর্ঘটনার সময় সাহায্যের লোভ দেখিয়ে জাতির পুঁজি সঞ্চয় করা হয়; কিন্তু এর মোটা অংকের টাকা দ্বারা বৃহৎ ব্যবসায়ীরাই উপকৃত হয়। তারা মাঝে-মাঝে নিজেই স্বীয় ক্ষয়প্রাপ্ত মোটরে অগ্নিসংযোগ করে কিংবা কোন কিছুর সাথে ধাক্কা লাগিয়ে ধ্বংস করে দেয় এবং বীমা কোম্পানী থেকে টাকা আদায় করে নতুন মোটর ক্রয় করে। শতকরা দু'একজন গরীব হয়তো আকস্মিক মৃত্যুর কারণে কিছু টাকা পেয়ে যায়।
অপরদিকে দর কমে যাওয়ার বিপদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার গরম করেছে। এ বিশেষ প্রকার জুয়া দ্বারা গোটা জাতিকে প্রভাবিত করা হয়েছে, যাতে মূল্য হ্রাসের কারণে যে ক্ষতির আশংকা রয়েছে, তাও জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়। এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে একথা প্রতীয়মান হয় যে, ব্যাংকের সুদ ও বাণিজ্য গোটা মানব সামজের দারিদ্র্য ও আর্থিক দুরবস্থার কারণ। হ্যাঁ, গুটিকতেক ধনীর ধন-সম্পদ এর বদৌলতে আরও বেড়ে যায়। জাতির ধ্বংস এবং গুটিকতক লোকের উন্নতিই এর ফলাফল। এ বিরাট অনিষ্ট সাধারণ সরকারসমূহের দৃষ্টি এড়ায়নি। এর প্রতিকারার্থে তারা বৃহৎ পুঁজিপতিদের আয়করের হার বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এমনকি, সর্বশেষ হার টাকায় সাড়ে পনের আনা করা হয়েছে, যাতে পুঁজি তাদের হাত থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আবার জাতীয় তহবিলে পৌঁছে যায়।
কিন্তু সবাই জানেন যে, এ আইনের ফলেই সাধারণভাবে মিল-কারখানার হিসাবে জালিয়াতি হচ্ছে এবং সরকারের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য ও হিসাবাদি গোপন করার উদ্দেশ্যে অনেক পুঁজি গুপ্তধনের আকারে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
মোটকথা, ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে কয়েক ব্যক্তির হাতে আবদ্ধ হওয়া যে দেশের অর্থনীতির জন্য সমূহ ক্ষতির কারণ, এ সম্পর্কে সবাই পরিজ্ঞাত আছেন। এ কারণেই আয়করের হার বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয় যে এ কর্মপন্থাও রোগ নিরাময়ে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। রোগের আসল কারণ নির্ণয়ে ব্যর্থতাই এর বড় কারণ। কাজেই এ প্রতিকার যে
در به بست ودشمن اندر خانه بود
অর্থাৎ শত্রুকে ভিতরে রেখেই গৃহের দরজা এঁটে দেওয়ার মত হয়ে গেছে।
📄 একটি সন্দেহ ও তার উত্তর
এ স্থানে প্রশ্ন উত্থিত হতে পারে যে, ব্যাংকের মাধ্যমে গোটা জাতির পুঁজি সঞ্চিত হয়ে কিছু-না-কিছু উপকার তো জনগণেরও হয়েছে যদিও তা খুব কম। অবশ্য এটা সত্য যে, বৃহৎ পুঁজিপতিরা এর দ্বারা বেশি উপকৃত হয়েছে। তবে হ্যাঁ, যদি ব্যাংকে সম্পদ সঞ্চিত করার রীতি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে এর ফল আগেকার যুগের মতই হবে অর্থাৎ জনগণের সম্পদ গুপ্তধন ও গুপ্তভাণ্ডারের আকারে ভুগর্ভে চলে যাবে। এতে না জনগণের উপকার হবে, না অন্য কারো।
এর উত্তর এই যে, ইসলাম সুদ হারাম করে যেমন সমগ্র জাতির সম্পদ বিশেষ বিশেষ পুঁজিপতির হাতে আবদ্ধ হওয়ার দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, তেমনি পুঁজি-করের আকারে যাকাত আরোপ করে প্রত্যেক ধনীকে সম্পদ স্থাবর অবস্থায় না রেখে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত রাখতে বাধ্য করেছে। কেননা, পুঁজি-করের আকারে যাকাতের বিধান আরোপিত হওয়ার কারণে যদি কোন ব্যক্তি টাকা-পয়সা অথবা সোনা-রূপা মাটির নিচে পুঁতে রাখে, তবে প্রতি বছর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত যেতে যেতে তার মূল নিঃশেষ হয়ে যাবে। কাজেই প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিই পুঁজিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত করে তদ্বারা নিজে উপকৃত হতে, অপরের উপকার করতে এবং মুনাফা থেকেই যাকাত আদায় করতে বাধ্য হবে।