📄 হযরত শাহ অলিউল্লাহ্ রহ.-এর বক্তব্য
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) 'হুজ্জাতুল্লাহিল-বালিগাহ' গ্রন্থে বলেনঃ “এক প্রকার হচ্ছে সরাসরি ও প্রকৃত সুদ এবং অন্য এক প্রকার প্রকৃত বা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ ও নির্দেশগত। সত্যিকার সুদ ঋণ দিয়ে বেশি নেওয়াকে বলা হয় এবং নির্দেশগত সুদ বলে হাদীসে বর্ণিত সুদকে বোঝান হয়। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক বিশেষ বস্তুর ক্রয়-বিক্রয়ে বেশি নেওয়া। এক হাদীসে বলা হয়েছে:
لَا رِبَا إِلَّا فِي النَّسِيَةِ (رواه البخاري)
অর্থাৎ রিবা বা সুদ শুধু বাকি দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর অর্থও তা-ই যে, সত্যিকার ও আসল সুদ, যাকে সাধারণভাবে সুদ মনে করা ও বলা হয়, তা বাকি দিয়ে মুনাফা নেওয়াকেই বলা হয়। এছাড়া যত প্রকার সুদ এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে সবগুলো নির্দেশগত সুদের অন্তর্ভুক্ত।
এ বর্ণনা থেকে কয়েকটি বিষয় ফুটে উঠেছেঃ
১. কুরআন অবতরণের পূর্বে রিবা একটি সুপরিচিত বিষয় ছিল। ঋণের ওপর মেয়াদের হিসাবে বেশি নেওয়াকে রিবা বলা হত।
২. কুরআনে রিবার নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সাহাবায়ে কিরাম তা বর্জন করেন। এর অর্থ বোঝা ও বোঝানোর ব্যাপারে কারও মনে কোনরূপ খটকা বা সন্দেহ দেখা দেয়নি।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছয়টি বস্তু সম্পর্কে বলেছেন যে, এগুলোর পারস্পরিক ক্রয়-বিক্রয়ে সমান হওয়া শর্ত। কম-বেশি হলে এবং বাকি দিলে রিবা হয়ে যাবে। এ ছয় বস্তু হলো সোনা, রূপা, গম, যব, খেজুর ও আঙ্গুর। এ আইনের অধীনেই আরবে প্রচলিত 'মুযাবানা' ও 'মুহাকালা' ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়কেও হারাম করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বক্তব্যের মাঝে বুঝবার ও চিন্তা-ভাবনার বিষয় ছিল এই যে, এ নির্দেশ বর্ণিত ছয়টি বস্তুর সাথেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না অন্যান্য বস্তুতেও বিস্তার লাভ করবে? যদি তাই করে, তবে তা কোন বিধি অনুসারে? এ বিধির ব্যাপারে ফিক্হবিদগণ চিন্তা-ভাবনা ইজতিহাদ করে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। যেহেতু এ বিধি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বর্ণিত হয়নি, তাই হযরত ফারুকে আযম (রাযি.) আফসোস করেছেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এর কোন বিধি বর্ণনা করে দিলে কোনরূপ সন্দেহ বাকি থাকতো না। এরপর তিনি বলেছেন যে, যেখানে সুদের সন্দেহও হয় সেখান থেকেও বেঁচে থাকা উচিত।
৪. জানা গেল, আরবে পরিচিত সুদই ছিল আসল ও সত্যিকার 'রিবা এবং একে ফিকহবিদগণ 'রিবাল-কুরআন' বা 'রিবাল-কর্জ' নামে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ ঋণের উপর মেয়াদের হিসাবে মুনাফা নেওয়া। হাদীসে বর্ণিত দ্বিতীয় প্রকার সুদ প্রথম প্রকারের সুদের সাথে যুক্ত এবং একই নির্দেশের আওতাভুক্ত। মুজতাহিদগণের মধ্যে যত মতভেদ হয়েছে, সব দ্বিতীয় প্রকার সুদের মধ্যেই হয়েছে। প্রথম প্রকার সুদ অর্থাৎ রিবাল-কুরআন যে হারাম, এ ব্যাপারে উম্মতে-মুহাম্মাদীর মধ্যে কখনো কোন মতভেদ হয়নি। আজকাল যে সুদকে প্রচলিত অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ মনে করা হয় এবং যে সুদের প্রশ্নটি এখানে আলোচনাধীন, সে সুদের অবৈধতা কুরআনের সাতটি আয়াত, (সব মিলিয়ে প্রায় দশখানা আয়াত) চল্লিশটিরও বেশি হাদীস এবং ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।