📄 ইমাম রাযী রহ.-এর বক্তব্য
ইমাম রাযী স্বীয় তাফসীরে বলেন: 'রিবা' দু'রকম, ক্রয়-বিক্রয়ের রিবা ও ঋণের রিবা। জাহিলিয়াত যুগের আরবে দ্বিতীয় প্রকার রিবাই প্রচলিত ও সুবিদিত ছিল। তারা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কাউকে অর্থ প্রদান করতো এবং প্রতি মাসে তার মুনাফা আদায় করতো। নির্দিষ্ট মেয়াদে আদায় না হলে সুদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার শর্তে মেয়াদও বাড়িয়ে দিত। জাহিলিয়াত যুগের সেই রিবাই কুরআন হারাম করেছে।
📄 ইমাম আবু বকর জাস্সাস রহ.-এর বক্তব্য
ইমাম জাসসাস রহ. 'আহকামুল কুরআন'-এ রিবার অর্থ বর্ণনা করে বলেন-
هُوَ الْقَرْضُ الْمَشْرُوطُ فِيهِ الْأَجَلُ وَزِيَادَةُ مَالٍ عَلَى الْمُسْتَقْرِضِ.
অর্থাৎ, এ এমন ঋণ, যা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এ শর্তে দেওয়া হয় যে, খাতক তাকে মূলধন থেকে কিছু বেশি পরিমাণ অর্থ ফেরত দেবে।
📄 রিবার সংজ্ঞা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শব্দে
হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিবার সংজ্ঞা বর্ণনা করে বলেন-
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبَاءُ.
অর্থাৎ যে ঋণ কোন মুনাফা টানে, তাই-রিবা। (জামে সগীর)
📄 আলোচনার সারাংশ
মোটকথা, কাউকে ঋণ দিয়ে তার মাধ্যমে মুনাফা গ্রহণ করাই সুদ বা রিবা। জাহিলিয়াত আমলে তা-ই প্রচলিত ও সুবিদিত ছিল। কুরআন পাকের উল্লিখিত আয়াত একে সুস্পষ্টভাবে হারাম করেছে। এসব আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সাহাবায়ে কিরাম এ কারবার পরিত্যাগ করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইনগত বিধি-বিধানে একে প্রয়োগ করেন। এতে কোনরূপ অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থতা ছিল না এবং এ ব্যাপারে কেউ সন্দিগ্ধতারও সম্মুখীন হয়নি।
তবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক রকম ক্রয়-বিক্রয়কেও রিবার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আরবরা এগুলোকে রিবা মনে করতো না। উদাহরণত তিনি ছয়টি বস্তু সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, এগুলো অদল-বদল করতে হলে সমান সমান এবং হাতে হাতে হওয়া দরকার। কম-বেশি কিংবা বাকি হলে তাও রিবা হবে। এ ছয়টি বস্তু হচ্ছে সোনা, রূপা, গম, যব, খেজুর ও আঙ্গুর।
আরবে কাজ-কারবারে 'মুযাবানা' ও 'মুহাকালা' নামে কয়েকটি প্রকার প্রচলিত ছিল।¹ সুদের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকেও সুদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। (ইবনে কাসীর) এতে প্রণিধানযোগ্য বিষয় ছিল এই যে বিশেষ করে উপরোক্ত ছয়টি বস্তুর মধ্যেই সুদ সীমাবদ্ধ, না এগুলো ছাড়া আরও কিছু বস্তু এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত হবে? হযরত ফারূকে আযম (রাযি.) এ সব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েই নিম্নোক্ত উক্তি করেছিলেন।
إِنَّ آيَةَ الرِّبُوا مِنْ آخِرِ مَا نُزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ وَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُبِضَ قَبْلَ أَنْ يُبَيِّنَهُ لَنَا فَدَعُوا الرِّبُوا وَالرَّيْبَةَ. احكام القرآن للجصاص. ص و تفسير ابن كثير بحواله ابن ماجه : ۳۲۸/۱)
অর্থাৎ, সুদের আয়াত হচ্ছে কুরআন পাকের সর্বশেষ আয়াতসমূহের অন্যতম। এর পূর্ণ বিবরণ দান করার পূর্বেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাই এখন সতর্ক পদক্ষেপ জরুরী। সুদ তো অবশ্যই বর্জন করতে হবে, তদুপরি যেসব ব্যাপারে সুদের সন্দেহও হয়, সেগুলোও পরিহার করা উচিত। (আহকামুল কুরআন, জাসসাস পৃ. ৫৫১, ইবনে কাসীর, ইবনে মাজাহ সূত্রে, ১/৩২৮)
টিকাঃ
১. বৃক্ষস্থিত ফলকে বৃক্ষ থেকে আহরিত ফলের বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রি করাকে 'মুযাবানা, বলা হয় এবং ক্ষেতে অকর্তিত খাদ্যশষ্য; যথা-গম, বুট ইত্যাদিকে শুকনা পরিষ্কার করা খাদ্য যথাঃ গম, বুট ইত্যাদির বিনিময়ে অনুমান করে বিক্রি করাকে 'মুহাকালা' বলা হয়। যেহেতু অনুমানে কম বেশি হওয়ার আশংকা থাকে তাই এগুলো নিষিদ্ধ হয়েছে।