📄 ঈমানদারগণকে তাকওয়া অবলম্বন ও সুদ ত্যাগ করার নির্দেশ
নিশ্চয় যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎকাজ করেছে, (বিশ্লেষত) নামায কায়েম করেছে এবং যাকাত দান করেছে, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে ছওয়াব রয়েছে এবং (পরকালে) তাদের কোন বিপদাশঙ্কা হবে না এবং তারা (কোন উদ্দেশ্য পণ্ড হওয়ার কারণে) দুঃখিতও হবে না।
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যেসব বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। (কেননা, আল্লাহ্র আনুগত্য করাই ঈমানের দাবি) অতঃপর যদি তোমরা (একে কার্যে পরিণত) না কর, তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও (অর্থাৎ তোমাদের বিরুদ্ধে এ কারণে জিহাদ ঘোষণা করা হবে) এবং যদি তোমরা তাওবা করে নাও, তবে তোমাদের মূলধন (ফেরত) পেয়ে যাবে। (এ আইনের পর) তোমরাও কারও প্রতি অত্যাচার করতে পারবে না, (মূলধনের চেয়ে অধিক নিয়ে) তোমাদের প্রতিও অত্যাচার করা হবে না। (মূলধনও ফেরত না দিয়ে) এবং যদি (ঋণগ্রহীতা) অভাবগ্রস্ত হয় (এবং এ কারণে নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ পরিশোধ করতে না পারে,) তবে (তাকে) সময় দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে, সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত। (অর্থাৎ যখন সে পরিশোধ করতে সক্ষম হবে সে সময় পর্যন্ত) এবং (সম্পূর্ণভাবে) ক্ষমা করে দেওয়াই তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা (এ ছওয়াব ও বিনিময় সম্পর্কে) জ্ঞানবান হও।
(হে মুসলমানগণ,) ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা আল্লাহ্র কাছে হাযিরার জন্য প্রত্যাবর্তিত হবে। অতঃপর প্রত্যেকেই তার কৃতকর্ম (অর্থাৎ কৃতকর্মের ফল) পুরোপুরি পাবে এবং তাদের প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবে না। (অতএব হাযিরার জন্য তোমরা স্বীয় কার্যকলাপ ঠিক রাখ এবং 'কানরূপ বিরুদ্ধাচরণ করো না)।
📄 নিঃস্ব খাতকের সাথে নম্রতার শিক্ষাসম্বলিত কতিপয় সহীহ হাদীস
* তিবরানীর এক হাদীসে আছে- যেদিন কোন ব্যক্তি আল্লাহ্ ছায়া ছাড়া মাথা গুঁজবার কোন ছায়া পাবে না সেদিন যে ব্যক্তি তার মাথার উপর আল্লাহ্র রহমতের ছায়া কামনা করে, তার উচিৎ নিঃস্ব খাতকের সাথে নম্র ব্যবহার করা কিংবা তাকে মাফ করে দেওয়া। সহীহ মুসলিমেও এ বিষয়ের হাদীস রয়েছে।
* মুসনাদে আহমাদের এক হাদীসে আছে- যে ব্যক্তি কোন নিঃস্ব দেনাদারকে সময় দেবে, সে প্রত্যহ দেনা পরিমাণ অর্থ সাদাকা করার ছওয়াব পাবে। দেনার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বে সময় দেওয়ার জন্য হবে এ হিসাব। যখন দেনার মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যায় এবং দেনাদার দেনা পরিশোধ করতে সক্ষম না হয়, তখন সময় দিলে প্রত্যহ দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ সাদাকা করার ছওয়াব পাবে।
* এক হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি চায় যে তার দুআ কবুল হোক কিংবা বিপদ দূর হোক, তার উচিৎ নিঃস্ব দেনাদারকে সময় দেওয়া।
এরপর শেষ আয়াতে পুনরায় কেয়ামতের ভয়, হাশরে হিসাব-নিকাশ এবং ছওয়াব ও আযাব উল্লেখ করে সুদ সংক্রান্ত এ আয়াত সমাপ্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে-
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ ۚ
অর্থাৎ ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা সবাই আল্লাহ্র সামনে হাযিরার জন্য আনীত হবে। অতঃপর প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের পুরোপুরি প্রতিদান পাবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, অবতরণের দিক দিয়ে এটি সর্বশেষ আয়াত। এরপর কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। এর একত্রিশ দিন পর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত হয়। কোন কোন রেওয়ায়েতে নয় দিন পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের কথা বর্ণিত আছে। এ পর্যন্ত সুদের বিধি-বিধান সম্পর্কিত সূরা বাকারার আয়াতসমূহের তাফসীর বর্ণিত হলো।
📄 দশ আয়াতে সুদের অবৈধতা বর্ণিত হয়েছে
সুদের অবৈধতা ও নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কুরআন পাকে সূরা বাকারায় সাত আয়াত, সূরা আলে-ইমরানে এক আয়াত এবং সূরা নিসায় দু'টি আয়াত বর্ণিত হয়েছে। সূরা রূমেও একটি আয়াত আছে, যার তাফসীর নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এভাবে কুরআন পাকের দশটি আয়াতে সুদের বিধি-বিধান উল্লিখিত হয়েছে। সুদের পূর্ণ স্বরূপ বর্ণনা করার পূর্বে সূরা আলে-ইমরান, সূরা নিসা এবং সূরা রূমে উল্লিখিত অবশিষ্ট আয়াতসমূহের অনুবাদ এবং ব্যাখ্যাও এ স্থলে করে দেওয়া সমীচীন মনে হয়। তাতে সবগুলো আয়াতই একত্র হওয়ার ফলে সুদের স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হবে।
সূরা আলে-ইমরানের ১৩০তম আয়াতটি এই : يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبُوا أَضْعَافًا مُضْعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ অর্থাৎ-“হে ঈমানদারগণ, তোমরা সুদ খেয়ো না দ্বিগুণ, চতুর্গুণ এবং আল্লাহকে ভয় কর। আশা করা যায় যে, তোমরা সফল হবে”। (সূরা আলে ইমরান, ১৩০)
এ আয়াত অবতরণের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট রয়েছে। জাহিলিয়াত আমলের আরবে সুদ গ্রহণের সাধারণ নীতি ছিল এই যে, একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সুদের উপর বাকি দেওয়া হতো। মেয়াদ এসে গেলে দেনাদার যদি দেনা শোধ করতে অক্ষম হতো, তবে সুদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার শর্তে তাকে আরও সময় দেওয়া হতো। এমনিভাবে দ্বিতীয় মেয়াদেও যদি দেনা শোধ করতে অক্ষম হতো, তবে সুদের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেওয়া হতো। সাধারণ তাফসীর গ্রন্থসমূহে এবং বিশেষভাবে 'লুবাবুন্নুকুল' গ্রন্থে মুজাহিদ রহ.-এর রেওয়ায়েতক্রমে এ বিবরণ উল্লিখিত আছে। জাহিলিয়াত যুগের সে সর্বনাশা প্রথা বিলোপ করার জন্যই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এ কারণেই আয়াতে أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً (অর্থাৎ কয়েকগুণ অতিরিক্ত) বলে তাদের প্রচলিত পদ্ধতির নিন্দা এবং অপরের চরম সর্বনাশ সাধন করে স্বার্থ উদ্ধার করার ঘৃণ্য মানসিকতা সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে একে হারাম করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, কয়েকগুণ অতিরক্তি না হলে সুদ হারাম হবে না। কেননা, সূরা বাকারা ও সূরা নিসায় যে কোন ধরনের সুদের অবৈধতা পরিষ্কার বর্ণিত হয়েছে; কয়েকগুণ বেশি হোক বা না হোক। এর দৃষ্টান্ত যেমন কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে:
وَلَا تَشْتَرُوا بِأَيْتِي ثَمَنًا قَلِيلًا.
অর্থাৎ আমার আয়াতের বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করো না। (সূরা বাকারা, ৪১)
এতে 'অল্প মূল্য' বলার কারণ এই যে, খোদায়ী আয়াতের বিনিময়ে যদি সপ্তরাজ্যও গ্রহণ করা হয়, তবে অল্প মূল্যই হবে। এর অর্থ এই নয় যে, কুরআনের আয়াতের বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করা তো হারাম, বেশি মূল্য হারাম নয়। এমনিভাবে এ আয়াতে أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً শব্দটি তাদের লজ্জাকর পদ্ধতি সম্পর্কে চিন্তা করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এটি অবৈধতার শর্ত নয়।
সুদের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে চিন্তা করলে একথাও বলা যায় যে, সুদের অভ্যাস গড়ে উঠলে সুদ শুধু সুদই থাকে না, বরং অপরিহার্যভাবে দ্বিগুণ চতুর্গুণ হয়ে ক্রমবর্ধিত অস্তিত্ব পেয়ে যায়। কারণ, সুদের যে টাকা সুদখোরের মালের অন্তর্ভুক্ত হয়, সে অতিরিক্ত টাকাটিও পুনর্বার সুদেই খাটানো হয়। ফলে সুদ কয়েকগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ম অব্যাহত থাকলে সুদের টাকা أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً অর্থাৎ কয়েকগুণেরও কয়েকগুণ হয়ে যায়। এমনিভাবে প্রত্যেক সুদ পরিমাণে দিগুণ চতুর্গুণই হয়।
📄 সুদ সম্পর্কে সূরা নিসার দুটি আয়াত
فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا ﴿٢٠﴾ وَأَخْذِهِمُ الرِّبُوا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ * وَاعْتَدْنَا لِلْكَفِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا ﴿١٦١
অর্থাৎ- "ইহুদীদের এসব বড় বড় অপরাধের কারণে আমি অনেক পবিত্র বস্তু-যা তাদের জন্য হালাল ছিল- তাদের উপর হারাম করে দিয়েছি এবং তা এ কারণে যে, তারা অনেক মানুষের সুপথ প্রাপ্তির পথে অন্তরায় হয়ে যেত এবং তা একারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করতো। অথচ তাদেরকে সুদ গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করত। আমি তাদের মধ্যে যারা কাফির, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরি করে রেখেছি”। (সূরা নিসা ১৬০-১৬১ আয়াত)
এ দু'আয়াত থেকে জানা গেলে যে, মূসা (আ.)-এর শরীয়তেও সুদ হারাম ছিল। ইহুদীরা যখন এর বিরুদ্ধাচরণ করে, তখন দুনিয়াতেও তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয় অর্থাৎ তারা জাগতিক লালসার বশবর্তী হয়ে হারাম খেতে শুরু করলে আল্লাহ্ তা'আলা কতক পবিত্র বস্তুও তাদের জন্য হারাম করে দেন।