📄 কর্জ থেকে দূরে থাকা
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে এই দুআ করতেন, "ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই। মসীহ দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই। জীবনের ফেতনা ও মৃত্যুর ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই। ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে গুনাহ ও কর্জ থেকে আশ্রয় চাই।"
কেউ (অন্য বর্ণনায় আছে বর্ণনাকারী নিজেই) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কর্জ থেকে এত বেশি আশ্রয় চান! তিনি বললেন, মানুষ যখন কর্জগ্রস্ত হয় তখন কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে। -সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৩২
অর্থাৎ, খুব বেশি বিপদে না পড়লে কারো কাছে কর্জের জন্য হাত পাতা উচিত নয়। রসুলল্লাহ (সা.) বলেন, হে মুসলমানরা কর্জ গ্রহণ থেকে বেঁচে থাক। কেননা, কর্জ রাত্রীকালে মর্ম বেদনা ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে এবং দিনের বেলায় অপমান ও লাঞ্ছনায় লিপ্ত করে। -বায়হাকি
📄 কর্জ থেকে বাঁচার জন্য করণীয়
১। বিশেষ প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধের প্রবল ধারণা ছাড়া কর্জ না নেওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
২। আয় ও ব্যয়ের মাঝে সমন্বয় করে চলা।
৩। কর্জ হয়ে গেলে পরিশোধের জন্য নিচের দুয়াটা পাঠ করাঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
বাংলা উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ'উযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়া আ'উযু বিকা মিনাল-'আজযি ওয়াল- কাসালি, ওয়া আ'উযু বিকা মিনাল-বুখলি ওয়াল-জুবনি, ওয়া আ'উযু বিকা মিন দ্বলাবাতিদ্দাইনি ওয়া গলাবাতির রিজা-ল।
অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, কর্জের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে।
এই দুয়াটা নেয়া হয়েছে নিচের হাদিসটি থেকেঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন; একদিন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে আনসারি একজন লোককে দেখতে পেলেন, যার নাম আবু উমামা। রসুল তাকে বললেন, “আবু উমামা! ব্যাপার কী, নামাজের সময় ছাড়াও তোমাকে মসজিদে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে?” আবু উমামা বললেন, “ইয়া রসুলাল্লাহ! অনেক কর্জ এবং দুনিয়ার চিন্তা আমাকে গ্রাস করে রেখেছে।” তখন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, “আমি কি তোমাকে এমন কিছু কালিমা শিখিয়ে দেব, যেগুলো বললে আল্লাহ তায়ালা তোমার চিন্তাকে দূর করে দেবেন এবং তোমার কর্জগুলো আদায় করে দেবেন।” তিনি বলেন: "জি হ্যাঁ ইয়া রসুলাল্লাহ! অবশ্যই বলুন।” তখন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উপর্যুক্ত দোয়াটি শিখিয়ে দেন এবং তা সকাল সন্ধ্যায় পড়তে বলেন। আবু উমামা বলেন, “আমি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দোয়াটি পড়তে লাগলাম ফলে আল্লাহ তায়ালা আমার চিন্তা দূর করে দিলেন এবং আমার কর্জগুলোও আদায় করে দিলেন।"
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমাদেরকে কর্জ-মুক্ত, সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করে দিন এবং কর্জ হয়ে গেলে সেটা উত্তমভাবে সময়মত পরিশোধ করার তওফিক দিন। আমিন।
📄 কর্জ পরিশোধ করতে দেরি হওয়া
যদি কেউ কর্জ গ্রহণ করার পর তা দিতে অপারগ হয় বা কষ্টে পতিত হয়, সে সময় ঋণদাতার করণীয় বিষয়েও মহান আল্লাহতায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন, "যদি সেই কর্জ-গ্রহণকারী দরিদ্র হয়, তবে সচ্ছল অবস্থা আসা পর্যন্ত অবকাশ দিবে আর মাফ করে দেয়া তোমাদের পক্ষে অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!” -সুরা বাকারা, আয়াত ২৮০
আবদুল্লাহ ইবনে আবী কাতাদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু কাতাদা (রা.) তার এক কর্জগ্রহীতাকে খুঁজলে সে আত্মগোপন করল। পরে তাকে পাওয়া গেল। তখন সে বলল, "আমি অসচ্ছল।” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "আল্লাহর কসম?" সে বলল, “আল্লাহর কসম (আমি অসচ্ছল)!” আবু কাতাদা (রা.) বললেন, “আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যার পছন্দ যে আল্লাহ তাকে কিয়ামতের বিপদসমূহ থেকে মুক্তি দিন সে যেন অসচ্ছলকে সুযোগ দেয় অথবা মাফ করে দেয়।" -সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৬৩
মুসনাদে আহমদে আছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি কোনো দরিদ্র লোকের উপর স্বীয় প্রাপ্য আদায়ের ব্যাপারে নম্রতা প্রকাশ করে এবং তাকে অবকাশ দেয়, অতঃপর যতদিন পর্যন্ত সে তার কাছে প্রাপ্য পরিশোধ করতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত সে প্রতিদিন সেই পরিমাণ দান করার সাওয়াব পেতে থাকবে।" অন্য রেওয়াতে এসেছে - "সে প্রতিদিন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দান করার সওয়াব পেতে থাকবে।" একথা শুনে বুরাইদা (রা.) বলেন, “হে আল্লাহর রসুল! পূর্বে আপনি ঐ পরিমাণ দানের সওয়ার প্রাপ্তির কথা বলেছিলেন। আর এখন ওর দিগুণ পরিমাণ প্রাপ্তির কথা বললেন?" রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ, যে পর্যন্ত মেয়াদ অতিক্রান্ত না হবে সেই পর্যন্ত ওর সমপরিমাণ দানের সওয়াব লাভ করবে এবং যখন মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন ওর দ্বিগুণ পরিমাণ দানের সওয়াব লাভ করবে।"
অর্থাৎ, কর্জ প্রদানকারী ব্যক্তি খাতকের সময় বৃদ্ধি করতে বাধ্য নয় কিন্তু সময় বৃদ্ধি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। একটি বার চিন্তা করুন, শ্রেষ্ঠতম বিচারক আল্লাহ তায়ালা আইন প্রণয়ন করে দিয়েছেন, কোনো খাতক বাস্তবিকই নিঃস্ব হলে বা কর্জ পরিশোধে অক্ষম হলে তাকে অতিষ্ঠ না করতে। আর সেই তুলনায় বর্তমান সমাজব্যবস্থা কেমন? বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির থেকে জোরপূর্বক সুদের উপর অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
হাদিসে আরো এসেছে, “তোমাদের পূর্ববর্তী এক লোকের হিসাব নেওয়া হলে তার কোনো নেক আমল পাওয়া যায়নি। তবে সে মানুষের সাথে লেনদেন করত এবং বিত্তবান ছিল। কর্মচারীদের প্রতি তার এ নির্দেশ ছিল যে, অক্ষমদের যেন তারা মাফ করে দেয়। আল্লাহ বললেন, "মাফ করার সক্ষমতা তো ওর চেয়ে আমার বেশি।" এরপর তিনি ফিরিশতাদেরকে আদেশ দেন তাকে মাফ করে দেওয়ার।" -সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৬১। অন্য এক হাদিসে এসেছে, “যে অক্ষমকে সুযোগ দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়াতলে জায়গা দিবেন- যখন আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে।" -সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৩০৬
📄 দেশীয় আইন
বাংলাদেশ সরকার ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাকে অত্যন্ত উৎসাহিত করে। কেউ চাইলে খুব সহজেই এই সংস্থার নিবন্ধন করতে পারেন, বিশেষ কোনো ঝক্কি পোহাতে হবে না। ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা নিবন্ধন করতে যে সুদভিত্তিক হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সুদের হার ০% ধরে খুব সহজেই আপনি আপনার প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধিত করতে পারবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে অনেকেই নিজ উদ্যোগে নিবন্ধন সহ বা ছাড়াই বিনা সুদে কর্জ প্রদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের কিছু কর্জে হাসানার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগঃ
১. কর্জে হাসানাহ্ ম্যানেজমেন্ট-শীলকূপ ইউনিয়ন (চট্টগ্রাম)
২. কুড়িগ্রাম কর্জে হাসানা প্রজেক্ট (কুড়িগ্রাম)
৩. অক্ষর কর্জে হাসানা প্রজেক্ট (চকবাজার, চট্টগ্রাম)
৪. কর্জে হাসানা ফাউন্ডেশন যশোর (যশোর)
৫. কর্জে হাসানা প্রজেক্ট মাদারীপুর (মাদারীপুর)
৬. আল খিদমাহ ফাউন্ডেশন (সিলেট)
৭. আল রাইয়্যান কর্জে হাসানা ম্যানেজমেন্ট (মৌলভীবাজার)
৮. রামচন্দ্রপুর যুব সমাজ কর্জে হাসনা ফান্ড (দিনাজপুর)
৯. প্রিয়জন (প্রিয়জনের প্রয়োজনে) (ময়মনসিংহ)
১০. কর্জে হাসানাহ্ প্রজেক্ট নোয়াখালী (নোয়াখালী)