📄 অপব্যবহার
কর্জের অপব্যবহারের সুযোগ অনেক। একজন চিন্তা করল জমির দাম খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই কিছু কর্জ করে যদি একটি জমি কিনে রাখি, পরবর্তীতে অধিক মূল্যে বিক্রয় করে কর্জ পরিশোধ করে দিব। এমন উদ্দেশ্যে কর্জ চাওয়া অসম্ভব নয়। এগুলো হচ্ছে স্পেকুলেশন বা ফাটকাবাজি। এগুলো কোনো ব্যবসা নয়। ফাটকাবাজি করে কোনো উৎপাদন হয় না, তাই এই ধরনের কাজে কর্জ দেওয়া যাবে না। এটা অর্থনৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য না এবং আপনার কর্জে হাসানা ফান্ডের অপব্যবহার ও অযথা ঝুঁকি বাড়বে।
📄 উপহার
উপহার প্রোগ্রামের সাফল্য কর্জ কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের উপর একটি বড় মাত্রায় নির্ভর করতে পারে। তাই তাদের অবশ্যই ভালো আচরণ এবং সততা বজায় রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তাদের উপহার এবং ঘুস গ্রহণ করা উচিত নয়, তা যত বড় বা ছোটই হোক না কেন। প্রকৃতপক্ষে, এই বিষয়ে একটি প্রাসঙ্গিক হাদিস আছে। আবু উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করল এবং সেই সুপারিশের প্রতিদান স্বরূপ তাকে কিছু উপহার দিল। যদি সে তা গ্রহণ করে তাহলে সে রিবার দরজাসমূহের একটি বড় দরজায় উপস্থিত হলো" -মিশকাত, হা/৩৭৫৭, সনদঃ হাসান
অর্থাৎ কর্জে হাসানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কর্মকর্তাদের জন্য রিবার দরজায় সহজেই হাজির হয়ে যাওয়া সম্ভব! সুতরাং যারাই এই কাজে ব্রতী হবেন, তারা তাদের তাকওয়া, আমল ও জ্ঞানচর্চা বাড়িয়ে দিবেন। আল্লাহ আপনাদের হেফাজত করুন।
📄 মৃত ব্যক্তির কর্জ
যিনি কর্জ নিয়েছেন তিনি হঠাৎ মারা যেতে পারেন। এই সমস্যা ঠেকাতে ব্যাংক গ্রাহকের নামে জীবনবিমা করিয়ে রাখে। সাধারণ বিমাগুলো ইসলামি শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম, তাই এই পথা আপনার যাওয়ার সুযোগ নেই। নিজেরা নতুন কোনো হালাল বিমা করতে পারলে ভালো। তবে যথাযথ কাগজপত্র যেমন কর্জের চুক্তি, মেয়াদ, সময়, দাতা, গ্রহীতা, সাক্ষী ইত্যাদি থাকায় এই মৃত ব্যক্তির এই কর্জ ওয়ারিশদের উপর বর্তাবে। এটা অনেক বড় একটা কাজ শরিয়তে। মৃত ব্যক্তির কর্জ শোধ না হলে রসুল (সা.) সেই ব্যক্তির জানাজা পড়তে চাইতেন না।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রসুল (সা.)-এর কাছে যখন কোনো কর্জ-গ্রস্ত ব্যক্তির জানাজা উপস্থিত করা হতো, তিনি জিজ্ঞেস করতেন, সে তার কর্জ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সম্পদ রেখে গেছে কি? যদি বলা হতো যে সে তার কর্জ পরিশোধের মতো সম্পদ রেখে গেছে। তখন তার জানাজার সালাত আদায় করতেন। নতুবা বলতেন, তোমাদের সাথির জানাজা আদায় করে নাও।' -বুখারি, ২২৯৮
কর্জ বান্দার হক, আর বান্দার হক বান্দা মাফ না করলে আল্লাহ মাফ করবেন না। এটা আদায় করতেই হবে। তাহলে, আপনি কী করতে পারেন? ওয়ারিশরা কর্জ আদায় নাও করতে পারে, এমন সম্ভাবনার মুখে কোনো কর্জ নেয়ার সময় যেমন জামিনদার থাকেন, তেমনি ওয়ারিশদের হলফনামা যোগ করা যেতে পারে, যেখানে তারা ঐ ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে সেই কর্জ শোধ করে দেয়ার অঙ্গীকার করবে।
পাকিস্তানের আখুওয়াত এজন্য একটি পরিবারকে কর্জ দেয়, যেন কোনো ব্যক্তি মারা গেলে কর্জ আদায়ে জটিলতা তৈরি হয় না। একই সাথে তারা নিজ উদ্যোগে কর্জ-গ্রহীতাদের সাথে সুদ-মুক্ত বিমার মতো ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
📄 শরিয়া আইন
আমরা যদি কর্জে হাসানাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই, আমাদের জানতে হবে কর্জ আদানপ্রদান করার শরঈ বিধান কী? আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
"হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্জ নিয়ে ব্যবসা করবে, তখন তা লিখে রাখবে, তোমাদের মধ্যে যেন কোনো একজন লেখক ন্যায্যভাবে লিখে দেয়, লেখক যেন লিখতে অস্বীকার না করে, যেরূপ মহান আল্লাহ্ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। কাজেই সে যেন লিখে এবং কর্জ-গ্রহীতা যেন লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয় এবং তার প্রতিপালক মহান আল্লাহ ভয় রাখে এবং প্রাপ্য থেকে যেন কোনো প্রকারের কাটছাঁট না করে। যদি কর্জ-গ্রহীতা স্বল্প-বুদ্ধি অথবা দুর্বল কিংবা লেখার বিষয়বস্তু বলতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক যেন লেখার বিষয়বস্তু ন্যায্যভাবে বলে দেয় এবং তোমাদের আপন পুরুষ লোকের মধ্য থেকে দু'জন সাক্ষী রাখো, যদি দু'জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু'জন স্ত্রী লোক, যাদের সাক্ষ্য সম্পর্কে তোমরা রাজি আছ, এটা এজন্য যে, যদি একজন ভুলে যায় তবে অন্যজন স্মরণ করিয়ে দিবে এবং যখন সাক্ষীগণকে ডাকা হবে, তখন যেন সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার না করে। ছোট হোক বা বড় হোক তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদসহ লিখে রাখাকে তাচ্ছিল্যভরে উপেক্ষা করো না। এ লিখে রাখা মহান আল্লাহ নিকট ইনসাফ বজায় রাখার জন্য দৃঢ়তর, সঠিক প্রমাণের জন্য সহজতর এবং তোমরা যাতে কোনো সন্দেহে পতিত না হও এর নিকটবর্তী। কিন্তু যদি কোনো সওদা তোমরা পরস্পর নগদ নগদ সম্পাদন করো, তবে না লিখলেও তোমাদের কোনো দোষ নেই। আর তোমরা যখন পরস্পর কেনাবেচা করো তখন সাক্ষী রেখো। কোনো লেখক ও সাক্ষীকে যেন কষ্ট দেয়া না হয় এবং যদি এরূপ কর, তাহলে তোমাদের গুনাহ হবে। কাজেই মহান আল্লাহ্ কে ভয় কর এবং মহান আল্লাহ্ তোমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন এবং মহান আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সুপরিজ্ঞাত।।"
-সুরা বাকারা, আয়াত ২৮২
আল্লাহ এই আয়াতে সমস্ত প্রক্রিয়া সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছেন। একটি বিষয় লক্ষণীয় যে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেছিলেন হাজার বছর আগের আরব ভূমিতে, যখন আজকের মতো কাগজ সহজলভ্য ছিল না। মানুষ লিখত পাতা, চামড়া, হাড়ের উপরে। কলমও ছিল দুর্লভ। পড়ালেখা জানত হাতেগোনা কয়েকজন। সেই অবস্থায়ও তিনি কর্জের ব্যাপারে লিখতে বলেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় লিখিত চুক্তি করা কতটা জরুরি।
কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় করা ইসলামে জায়েজ আছে। কিস্তিতে বেচাকেনা সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারিরা (রা.) এসে বলল, আমি ৯ উকিয়ার বিনিময়ে নিজেকে গোলামি থেকে মুক্ত করার চুক্তি করেছি, প্রতিবছর এক উকিয়া করে দিতে হবে। সুতরাং আপনি আমাকে সাহায্য করুন। -বুখারি, ৩/১৫২
কর্জের বিনিময়ে মাল বন্ধক রাখাও ইসলামে জায়েজ পন্থা, আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “নবি করিম (সা.) এক ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে কিছু খাবার খরিদ করেছিলেন এবং বিনিময়ে তার একটি লৌহবর্মও সেই ইহুদির কাছে বন্ধক রেখেছিলেন।" -বুখারিঃ হাদিস নং ২০৬৮
কর্জ পরিশোধকারী নিজ পক্ষ থেকে বৃদ্ধি করে কর্জ আদায় করতে পারে। হযরত জাবের (রা.) বলেন, "নবি করিম (সা.) এর কাছে আমার কিছু কর্জ ছিল। আমি তাঁর কাছে এলাম, তখন তিনি মসজিদে ছিলেন। তিনি আমার কর্জ পরিশোধ করলেন এবং কিছু বাড়িয়ে দিলেন।" -বুখারি, ১/৩২২
অর্থাৎ নিজ পক্ষ থেকে বেশি করে ফেরত দেওয়াটাই একটি সুন্নত। কেবল অর্থ সম্পত্তি বেশি দেওয়াটাই সুন্নত নয়, কর্জ দাতার সাথে সুন্দর ব্যবহার করাটাও সুন্নত। তবে কেউ যদি এভাবে চুক্তি করে যে আমাকে বেশি টাকা ফেরত দিলে বা আমাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলে আমি তোমাকে কর্জ দিব অন্যথায় নয় কেবল তখন এইটা সুদ হবে। তাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম হচ্ছে নিজ পক্ষ থেকে কর্জদাতাকে বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।
এগুলো কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো কিছু কর্জবিষয়ক কিছু মূলনীতি তুলে ধরার জন্য। এই বইয়ের প্রতিটা অংশেই দেখবেন শরঈ সতর্কতা ও লেনদেন বিষয়ক পন্থা বলা আছে। এগুলো সবই আপনাকে শিখতে ও জানতে হবে এক বা একাধিক আলেমের তত্ত্বাবধানে। শরঈ বিষয়ে কাজ করার আগে নিজে ভালো করে না শিখলে সেখানে হারাম, রিবা, ও খিয়ানত খুব সহজেই প্রবেশ করবে। শয়তানের ধোঁকায় আপনার জান্নাতের দিকে রওনা দেয়ার উদ্যোগ পরিণত হতে পারে জাহান্নাম খরিদের রসিদ হিসেবে। সুতরাং, প্রথমে জানুন, এরপর আমলের দিকে অগ্রসর হন। আল্লাহ আপনাদের শ্রম ও শিক্ষার কষ্ট কবুল করে নিন।