📘 সুদ হারাম কর্জে হাসানা একটি সমাধান > 📄 গাইড লাইন

📄 গাইড লাইন


কর্জ-গ্রহীতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করা উচিত। নিম্নে এর একটি তালিকা দেওয়া হলো।

১. কর্জ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রস্তাবিত উদ্যোগের প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা উচিত। প্রস্তাবিত উদ্যোগ সব দিক থেকে গ্রহণযোগ্য মনে হলেই কেবল কর্জ দেওয়া হবে।

২. প্রস্তাবিত উদ্যোগের বা সংস্থার কার্যক্রম কর্জে হাসানা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার সাথে যায় কিনা তা খাতিয়ে দেখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ সমাজের জন্য ক্ষতি হয় এমন কোনো উদ্যোগে বিনিয়োগ করার জন্য কর্জ অনুমোদন দেওয়া যাবে না।

৩. কর্জ আবেদনকারীদের মধ্যে কারা সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য এবং কারা কর্জের অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ করবে ও সময়মত পরিশোধ করতে পারবে তা তদন্ত করে দেখতে হবে। এই ব্যাপারে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে স্থানীয় বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তি। এমনকি তারা কর্জগ্রহীতার কাছ থেকে কিস্তি সংগ্রহের কাজেও সহায়তা করতে পারেন।

স্থানীয় কর্জ সমন্বয়কারীর গল্প
হাজি সামির রহমান দক্ষিণ-পূর্ব বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার উস্টিকোলিনা শহরে ইসলামিক রিলিফের কর্জ সমন্বয়কারী। পেশায় তিনি ছোট একটি ক্যাফের মালিক। বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে তিনি সবার কাছে পরিচিত। ইসলামিক রিলিফের অফিস তার শহর উস্টিকোলিনা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা দূরত্বে অবস্থিত হলেও কর্জের জন্য তার শহর থেকে প্রচুর আবেদন আসে। এই আবেদনকারীদের ঋণ গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বস্ততা সম্পর্কে হাজি সামির ইসলামিক রিলিফকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যেহেতু তার নিজ শহরের জনগণ সম্পর্কে তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি উস্টিকোলিনা শহরের পাশাপাশি নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে শত শত কর্জ বিতরণ করেছেন এবং এই কর্জগুলোর প্রায় ১০০% পরিশোধিত হয়েছে।
আরেকটি মজার তথ্য হচ্ছে তার এলাকার সমস্ত কর্জ সামিরের ক্যাফে থেকে বিতরণ করা হয়। নতুন আবেদনকারীরা হাজি সামিরের কাছ থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। এমনকি কর্জ-গ্রহীতারাও তাদের মাসিক কিস্তিও তার কাছে রেখে যেতে পারেন। ইসলামিক রিলিফের কর্জ কর্মকর্তা প্রতি দুই মাস পরপর সামিরে কাছ থেকে সব টাকা একসাথে সংগ্রহ করে আনে। হাজি সামিরের সহায়তা ছাড়া উস্টিকোলিনায় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং অজানা কর্জ-গ্রহীতাদের কর্জ দেওয়া সম্ভব হতো না।
ইসলামিক রিলিফ হাজি সামিরকে অর্থ প্রদান করে না, কিন্তু তিনি তার সম্প্রদায়ের লোকদের কর্জ গ্রহণ এবং তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিকাশে সহায়তা করার জন্য সন্তুষ্টি অর্জন করেন। আর একই সাথে তিনি ইসলামিক রিলিফের কর্জ সমন্বয়কারী এবং সম্প্রদায়কে সহায়তা করার জন্য মর্যাদা অর্জন করেছেন।

৪. কর্জ আবেদনকারী যেই প্রকল্পের জন্য আবেদন করছেন সেই ব্যাপারে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কিনা এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে কিনা তা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

৫. কর্জ কর্মকর্তার উচিত গ্রাহকদের ব্যাপারে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য খুঁজে বের করা এবং সকল “প্রাসঙ্গিক” তথ্য খুলে প্রকাশ করা। এর দ্বারা কর্জের সঠিক ব্যবহার এবং প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। তবে, কর্জ-আবেদনকারী, কর্জ-দাতা ও কর্জ-গ্রহীতা সকলের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেন বজায় থাকে। এটাও আমাদের জন্য বড় একটা আমানত।

৬. কর্জের আকারের কোনো সর্বনিম্ন সীমা থাকা উচিত না, তবে একটি সর্বোচ্চ সীমা থাকতে পারে। বিশেষ ক্ষেত্রে যেমন গ্রুপ উদ্যোগ বা ব্যবসায়ের কর্জে এই সীমা অতিক্রম করা যেতে পারে।

৭. প্রাথমিকভাবে ছোট এবং স্বল্পমেয়াদি কর্জ দেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এর দ্বারা গ্রাহকের কর্জ পরিশোধ করার সদিচ্ছা যাচাই করে দেখা যাবে। একই সাথে কর্জের দ্বারা অর্থায়ন করা প্রকল্পটি সত্য সত্যই লাভজনক কিনা এবং আরও কর্জ পাবার যোগ্য কিনা তা যাচাই করে দেখা যাবে। গ্রাহক যদি সময়মত সব কর্জ পরিশোধ করতে পারে তাহলে ক্রমান্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং বড় অঙ্কের কর্জ প্রদান করা যেতে পারে।

৮. 'যথাযথ কারণ' ব্যতীত গ্রেস পিরিয়ড বা কর্জের মেয়াদ বাড়ানো উচিত নয়। একবার মেয়াদ বৃদ্ধি করলেই সবাই ভেবে বসতে পারে যে দেরি করে কর্জ পরিশোধ করলেও চলবে। তাই একটু গড়িমসি করলেই বা ক্ষতি কী?
আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকের আয়ের একাধিক উৎস থাকে। এক উৎসে আয়ের ভাটা পড়লে অন্যান্য উৎস থেকে কর্জ পরিশোধ করে দেওয়া খুব কঠিন কাজ না। যিনি কর্জ আদায়ে তৎপর হবেন, তিনি এই ব্যাপারে গ্রাহকদের পরামর্শ দিতে পারেন।

৯. কর্জ-গ্রহীতারা প্রায়শই এমনভাবে তথ্য দিয়ে থাকেন যা তাদের কর্জ পাওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। তাই অতিরিক্ত আশাবাদী প্রাক্কলন সরল মনে মেনে না নিয়ে বরং কর্জ অনুমোদন কমিটির কর্মকর্তাদের উচিত 'সবচেয়ে খারাপ সম্ভাব্য পরিস্থিতি' বিবেচনাপূর্বক কর্জ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। তাহলে অর্থায়ন করা প্রকল্প অসুবিধার সম্মুখীন হলেও কর্জ-গ্রহীতা কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন।

১০. দুই বা ততোধিক উৎস থেকে কর্জ গ্রহণ করতে গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করা উচিত। একথা মনে রাখতে হবে যে কর্জ নেওয়ার কারণ সর্বদা বিশেষ প্রয়োজন নয়। লোভ, বিলাসিতা, উন্নত জীবনের স্বপ্ন ইত্যাদিও কর্জ আবেদনের কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কর্জের পরিণতি সর্বনাশা হতে পারে। এই কর্জ প্রায়শই ভালোর চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে।

১১. কাকে কত টাকা কর্জ দেয়া হবে, এটা নির্ধারণের একটা চমৎকার একটা পদ্ধতি আছে। সেটা হলো, আয়ের অনুপাতে কর্জের পরিমাণ নির্ধারণ করা। অর্থনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলে থাকেন যে, কর্জ-গ্রহীতার মাসিক আয়ের এক-তৃতীয়াংশের অধিক কর্জের অনুমতি দেওয়া অনুচিত এবং এই অনুপাত ৪০% অতিক্রম করাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সোজা বাংলায় এর মানে হলো, কারো আয় মাসে ১২ হাজার টাকা হলে এবং ১ মাসের মেয়াদে কর্জ লাগলে তাকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা কর্জ দেয়া যেতে পারে। আবার সেই ব্যক্তি ১০ মাসের জন্য কর্জ চাইলে তাকে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা দেওয়া যেতে পারে। এতে করে সে এই কর্জ মাসিক আয়ের ৩ ভাগের ১ ভাগ বা ৪ হাজার টাকা করে দিয়ে পরিশোধ করতে পারবে। এটা এজন্য যে, তার নিজের খরচ আছে। আমি যদি তাকে এমন একটা অঙ্কের টাকা কর্জ দেই যেটা শোধ করতে গিয়ে তারা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, তাহলে তো হবে না।
ধরেন, এই ব্যক্তিকে ৮০ হাজার টাকার কর্জ দিয়ে বসলাম, হয়তো তার এটা লাগতও কোনো কারণে। কিন্তু ১০ মাসে তার আয় ১২০ হাজার টাকা, সে কর্জ শোধ করবে কীভাবে? সুতরাং কর্জের পরিমাণ, মেয়াদ, কর্জ যে নিবে তার মাসিক আয় এগুলার মধ্যে একটা চমৎকার সমন্বয় থাকতে হবে। নইলে খবর আছে!

১২. কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কর্জ-গ্রহীতাদের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে না। তাদের স্পষ্টভাবে বলা উচিত যে কেন্দ্রীয় কমিটিই কর্জ অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিবে। তবে কমিটির সিদ্ধান্ত কর্জ-গ্রহীতাদের খুব দ্রুত অবহিত করা উচিত, যাতে এই জায়গা থেকে কর্জ না পেলে তারা অন্য উৎস থেকে কর্জ নেয়ার চেষ্টা করতে পারে।

১৩. কর্জ পরিশোধের সময়সূচি এবং নীতিমালা সহজ রাখা উচিত। আর কর্জ আদান প্রদানে এবং নীতিমালায় সব ধরনের জটিলতা পরিহার করা উচিত যেন সবাই সুন্দর বুঝতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00